শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

শাহীন আখতারের ধারাবাহিক উপন্যাস : সখী রঙ্গমালা--পর্ব ৪

প্রথম পর্ব : পড়ার লিঙ্ক
দ্বিতীয় পর্ব পড়ার লিঙ্ক
তৃতীয় পর্ব পড়ার লিঙ্ক
চতুর্থ পর্ব------------
৪.

গতকাল নরবাড়ি থেকে ফেরার পথে শ্যামপ্রিয়াকে কাঁথা-মোড়া বস্তার বাড়া আর কিছু মনে হয়নি ফুলেশ্বরীর। ভয়ে হীরার পায়ে-পায়ে বাড়ি খেলেও রাই হনহনিয়ে এগিয়ে যায়। সামনের খোলা জায়গাটা পার হলেই অন্দরবাড়ির পুকুরপাড়, তার পরই খিড়কি-দুয়ার। হাতে সময় কম। চারদিক ফরসা হয়ে গেছে। যা করার রাতারাতি করতে হবে। সেইমতো বাড়ি ঢুকে দুয়ারে খেংরা-ঝাঁটা লটকিয়ে নিজের কর্দমাক্ত চটি জোড়া বিছানায় তুলে দেয় ফুলেশ্বরী। হীরার ঝুলাঝুলি গ্রাহ্য করে না। বাদামের পাখপাখালি ডাকতে শুরু করেছে।
রাজচন্দ্রের বাড়ি ফেরার সময় হলো বলে। রাই হালকা চালে টুনটুনির গলায় দুচরণ গান গাইলে পাখিগুলি জোঁকার দিয়ে ওঠে। দাঁড়ে বসে মজা করে দোল খায় কালাচান। ওসবে আজ মন নেই ফুলেশ্বরীর। সে হীরা দাসীর লম্বা শরীরটা বাজের খাঁচার আড়ালে ঠেলে দিয়ে নিজে শুতে চলে যায় দাসীর শয্যায়। যাওয়ার আগে গোটা ঘরে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেয়। সুন্দরী লয়ে রাত গোজার করার তোফাস্বরূপ আজকের যে আয়োজন, তা মহারাজের উপযুক্তই হয়েছে। দুয়ারে খেংরা-বাড়ি খেয়ে বিছানায় সাক্ষাৎ পাবেন চটি জোড়ার। তখন যে শিবের নাচন শুরু হবে, তা পাখির বাদাম থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবে হীরা দাসী। তারপর দাসীমহলে ছুটে গিয়ে পইপই করে সব বলবে তাকে। ততক্ষণ রাইয়ের ঘুমানো দরকার।

বিছানাটা কণ্টকের মনে হলেও রাত জাগার পেরেশানিতে ফুলেশ্বরীর দুচোখ ভেঙে ঘুম নামে। আয় ঘুম যায় ঘুম। লম্পট সোয়ামিকে শায়েস্তা করার আজ যে খাসা বন্দোবস্তটি হয়েছে, সে তুষ্ট ভাবটা খোয়াবে বহাল থাকে না। স্রোতের টানে সে ভেসে চলে অকূল দরিয়ায়। যজ্ঞেশ্বরীর তবু ধরার মতো হাতের কাছে তক্তা ছিল, রাইয়ের নাগালে খড়কুটোও নেই। ভাসতে ভাসতে আচমকা ফুলেশ্বরীর মনে পড়ে - আরে, তার না দুটি পাখনা রয়েছে, সে নামে মানুষ, আদতে তো পাখি। খামোখা অসহায়ের মতো ভাসছে কেন। জলের বুকে শোয়া অবস্থায় ফুলেশ্বরী ডানা মেলে। দু-চারবার ঝাপটায়। ছোট ছোট জলকণা মুক্তার মতো ঝরে পড়ে মিলিয়ে যায়। তারপর নির্ভার শরীরটা ডানার টানে দরিয়া ছেড়ে উড়তে শুরু করে। খানিকটা উড়েই ধপাস।

রাজচন্দ্রের তর্জন-গর্জনে বাড়ির কড়িবর্গা কাঁপছে। পরক্ষণে মেয়েকণ্ঠে চিৎকার। রাইয়ের ভ্রম হয়, এ গলাছেঁড়া আর্তনাদ তার নিজের নয় তো! মা সুমিত্রাও তা-ই ভেবেছিলেন। ভেজা কাপড়ে দৌড়ানোর ছপছপ আওয়াজ আর সেই সঙ্গে ফুলেশ্বরী শোনে শাশুড়ি চেঁচাচ্ছেন - ‘মারি হালাইলো রে, হতিনের হোলায় বউগারে হিডি মারি হালাইলো।’ আহা, এমন মায়ের এ ছেলে! বউ পরের মেয়ে বৈ তো নয়। শাশুড়িমার আহাজারিতে ফুলেশ্বরী ডুকরে কেঁদে ওঠে। তখনই দুয়ার ঠেলে ঘরে ঢোকে হীরা দাসী। উত্তেজনায় তার নীল চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। তাতে খুশির ঝিলিক। কেননা রাজচন্দ্রের হাতে জন্মের মার খেয়েছে আর কেউ নয়, ক্ষান্তমণি। মাগি গায়ে পড়ে রাতের ঘটনার সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিল। ভোরের ঘুম-লাগা চোখে কি-না-কি দেখেছে। ভেবেছে, সোয়ামি ঘরে নাই তো বউ ঢুঁড়তে বেরিয়েছিল, বাইরে রাত কাটিয়ে বিহানের আগ দিয়ে বাড়ি ফিরেছে। রাজবাড়ির ব্যাটাছেলেরা যা করে, বধূমণির সাবাস কত, ঘরের বউ হয়ে তা করতে লেগেছে! এ বেলায় হীরার গুমর ভাঙাও দরকার। এক ঢিলে দুই পাখি। ক্ষান্তমণি তক্কে তক্কে থাকে - রাজচন্দ্র কখন বাড়ি ফিরবে, কখন খবরটা চাউর করবে। চৌধুরী ফেরামাত্র দৌড়ে গিয়ে তোপের মুখে পড়ে। ‘দিদিমণি গো, দিদিমণি,’ হাঁপাতে হাঁপাতে হীরা বলে, ‘যেন ভাদো মাইস্যা তাল হড়চে - এরুম গুড়ুম-গুড়ুম আবাজ। চৌধ্রী মাইত্তে মাইত্তে চাঁডা ভাঙ্গি দিছে। হেতি এই জন্মে বিছনার তন্ উইঠতো হাইত্যো ন।’ ফুলেশ্বরী বিছানা থেকে উঠতে যাবে, হীরা চোখ টেপে, ‘যাইয়্যেন না, যাইয়্যেন না। চৌধ্রী নিজের গলত বুইঝতে হাইচ্ছে। অন আমনেরে টোগায়।’

ফের বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও ফুলেশ্বরীর আর ঘুম আসে না। মুখের ভেতর কেমন তিতকুটে স্বাদ। কার অপরাধে কে সাজা পেল, নাকি অপরাধী সাজা দিল নিরপরাধকে। মহারাজ তো নির্মল কচুপাতা - কালিমা কিছু গায়ে থাকে না। এতক্ষণে হয়তো পাক-সাফ হয়ে কাছারিঘর আলো করে বসে গেছেন। দাসীর বিছানার ছারপোকার কুটকুট কামড় খাচ্ছে ফুলেশ্বরী। তার ওপর রাত পোহাতেই দাসীমহলে বেধে গেছে তুমুল ঝগড়া। কি মুখ! আর থেকে থেকে চিল-চিৎকার। কানে হাত চাপা দিলেও আঙুল ফুঁড়ে ঢোকে। ফুলেশ্বরী বাতার বেড়ার ফাঁকে চোখ রাখে। এবার গালাগাল ক্ষান্ত দিয়ে দুজন কোমর বাঁধছে। ধেয়েও আসে একজন আরেকজনের দিকে। মাঝখানে বিশালদেহী টেপি দাসী। কোমরে হাত। পা দিয়ে সে যেন জোড়া বল খেলে - বিবদমান দুপক্ষ লাথি খেয়ে উড়ে পড়ে উঠানের দুদিকে। অদূরে একটি শিশু খুনখুনিয়ে কেঁদে ওঠে। খানিক বাদে একজন ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে বাচ্চাটাকে মাই দেয়। অপরজন একপাঁজা বাসি থালা-বাসন লয়ে গান গাইতে গাইতে পুকুরপাড়ে চলে যায়। ব্যস, খেল খতম পয়সা হজম। ফুটা থেকে চোখ সরায় ফুলেশ্বরী। এখানেই শেষ নয়। ওপাশে শুরু হয়ে গেছে হাসিঠাট্টা, নর্তন-কুর্দন। এ দফায় গন্ডা খানেক মিলে চাল থেকে খুদ বাছতে বাছতে যে কিসিমের গুলতানি মারছে, তা কহতব্য নয়। রাই তাজ্জব - এদের হাতেই কিনা রাজবাড়ির নিত্যদিনের চাকাটা বিরতিহীন ঘুরছে!

সকাল গড়িয়ে দুপুর। রাজচন্দ্রের ভয়ে তখনো সবাই সন্ত্রস্ত। মা সুমিত্রা রাইয়ের হদিস পেয়ে হীরার হাত দিয়ে পেতলের বারকোশে খানা পাঠিয়ে দিয়েছেন। এদিকে চাকর-নফরের জন্য আলাদা পাক - পচা-গলা পুঁটি মাছের চচ্চড়ি, লালঝালের শুঁটকি, বাসি কলাইয়ের ডাল। শাশুড়ির সঙ্গে জেদ করে তাই দিয়ে ভাত খেয়ে ওঠে ফুলেশ্বরী। কুলি ফেলে পেছনের দরজায় বারোমাইস্যা পেঁপেগাছের গোড়ায়। শাড়িতে হাত-মুখ মোছাও সারা। মা ছেলের ডরে থরহরি, বুকে তাগত নাই বউকে ঘরে তোলার। চুপিচাপি খাসমহলের বরাদ্দের খাবার পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখানে থাকতে পারলে চাকর-নোকরদের খানা খেতে দোষ কী। নরিনীর হাতের অন্ন গিলছেন না মহারাজ! হীরার বারণ সত্ত্বেও রাই যখন সামনের দুয়ার খোলে, তখন গোবর-ল্যাপা আঙিনায় প্রাসাদের লম্বা ছায়া পড়েছে। বাড়িতে যেন বিয়ে লেগেছে, ছায়ায় সার সার পিঁড়ি পেতে চুল-বাঁধা, উকুন-বাছার ধুম। অদূরে পালাক্রমে ঘোড়া ঘোড়া খেলছে কতকগুলি নেংটা বাচ্চা। হাতে-পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ির ভঙ্গিতে বসেছে একজন। তার পিঠে গাছের ডাল দিয়ে সপাং-সপাং বাড়ি মারছে দিগম্বর ঘোড়সওয়ার - ‘আমহাতা জোড়া জোড়া/মারিয়্যুম চাবুক, ছুইটব ঘোড়া/ওলো বিবি সরি দাঁড়া/আইয়্যে আঁর হাগলা ঘোড়া।’

হাতে তুড়ি বাজিয়ে ফুলেশ্বরী রাই আসরে নামে। পাগলা ঘোড়া পিঠ থেকে সওয়ারি ফেলে দেয়। ধুলায় গড়াগড়ি খায় চাবুক-হাতে নেংটা ঘোড়সওয়ার। দাসীর দল কিংকর্তব্যবিমূঢ় - গাদা গাদা পাছা যেন কাঠের পিঁড়িতে সেঁটে গেছে। চুল-বাঁধায়রত চপল আঙুলগুলিও নিথর। ফুলেশ্বরী শ্যামা পাখির গলায় শিস বাজাতে ভয়-পাওয়া বাচ্চাগুলি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। তার পরই বুমবুম প্যাঁচার ডাক। উঠানে হুড়াহুড়ি লেগে যায়। দেদার মজা খানিক বাদেই। ফুলেশ্বরী মোরগের গলায় ডেকে ওঠে। এবার সহজপাঠ - বাক-বাকুম, বাক-বাকুম। সমস্বরে বাচ্চারা নামতা পড়ার মতো চ্যাঁচায় - কুম-কুম-কুম। একে একে হরেক পাখির ডাক ছাড়তে ছাড়তে ফুলেশ্বরী চেতন পায় না, কখন উঠানে মেলা বসে গেছে। পয়লা লাফিয়ে লাফিয়ে আসে পাখির মতো দুরন্ত, আরেক হরবোলা ছোট্ট প্রফুল্লকুমার। তার পাছ পাছ খাসমহলের তামাম মেয়েমানুষ। যখন শাশুড়ির ভেজা হাত পিঠ স্পর্শ করে, তখন রাই বোঝে যে, উঠানে প্রশংসার চেয়ে তার নিন্দামন্দই বেশি হচ্ছে। এ লজ্জা যেন একা শাশুড়িমার, বউকে বাজু ধরে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কোমরে হাত রেখে সামনে দন্ডায়মান মেজো ঠাকুরানি। তার চোখ ঠিকরে আগুনের গোলা ছুটছে।

শাশুড়ির হাত ধরে সোহাগি বউ চলে গেলে হীরা দাসী উঠানের কোণে পাত্থর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কারও মুখে লাগাম নেই। যা না, তা বলছে। মেজো ঠাকুরানির আস্ফালন দেখে মনে হচ্ছে, ভূত নামানোর ওঝা ডাকবেন। রাজচন্দ্রের হাতে ক্ষান্তমণির মার খাওয়ার দাদ তোলা হবে বউকে শায়েস্তা করে, যে বউয়ের পানে স্বামী ফিরেও তাকায় না। এ হলো একচোখা মেজো গিন্নির বিচার। রাইয়েরও সাহসের বলিহারি। গত রাতে গেল নরবাড়ি। ফিরে এসে দুয়ারে ঝাঁটা লটকাল। এখন দাসীমহলে হরবোলার ডাক ছেড়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছে। একের পর এক যা করে যাচ্ছে - মেয়েটাকে সামলানোই দায়। কিন্তু ওঝা দিয়ে কী হবে? দাওয়াই তো রাজচন্দ্র। বাচ্চাকাচ্চার মা হলে তবু কথা ছিল, উঠতি বয়সের বউকে কে এমন পায়ে ঠেলে? কথাটা আগেভাগে বুঝিয়ে বলার জন্য সুমিত্রা ঠাকুরানির মহলের দিকে পা বাড়ায় হীরা দাসী।

ওখানে আরেক কান্ড। ফুলেশ্বরীর কথা শুনে মা সুমিত্রার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। রাজবাড়ির বউ নিশিরাতে গেছে নরবাড়ি! পথে যদি কোনো অঘটন ঘটত, এ বউকে ঘরে তোলা যেত! যেন ও কিছু নয়, বাপের বাড়ি নাইয়র যাওয়ার মতোই মামুলি ব্যাপার - শাশুড়িকে সাতকাহন শোনাচ্ছে রাই। মেয়েটা পাগল বা সরল যা-ই হোক, যত নষ্টের গোড়া ওই আটকপালি হীরা। মাগির কত তাগবাগ! তেলপড়া আনার গাওনা গেয়ে প্রতাপ নারায়ণের জরুকে ধোঁকা দেয়! ‘শকুন যদিও আকাশে ওড়ে, নজর তার গো-ভাগাড়ে’। কারবারির বাড়িতে বড় হলে কি হবে, ওর জন্ম তো বেশ্যাপাড়ায়। লামচরের ধনরত্নের স্রোতে নোনা-ঘোলা জলও রাজবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। জিবে যেন কটু স্বাদ লেগেছে - মা সুমিত্রা উঠে গিয়ে পিকদানে থুতু ফেলেন। তারপর ফুলেশ্বরীকে নিজের ঘরে আটক রেখে সমন জারি করেন - হীরা দাসী মহল ছেড়ে একচুলও যেন না নড়ে। আজ থেকে রাইয়ের পাখপক্ষীর দেখভালের নকরি বৃদ্ধা দাসী কালীতারার।

রাতে শাশুড়ির পালঙ্কে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবে ফুলেশ্বরী। মাথার ওপর গিলাফ-পরানো পেল্লাই ঝাড়বাতি। এতে অলিন্দের দেয়ালগিরির আলো এসে পড়েছে। মা সুমিত্রা পাশ ফিরে শুয়ে আছেন। সন্ধ্যা থেকে তাঁর মুখ ভার। তিনি বেঁচে থাকতে রাজবাড়ির বউ পায়ে হেঁটে গেছে নরবাড়ি - থেকে থেকে এ এক জপন। যেন আগে জানা থাকলে পাইক-বরকন্দাজ দিয়ে বউকে পালকিতে তুলে দিতেন রঙ্গমালা-রাজচন্দ্রের নটঘট দেখতে। ভেতরে ফাঁপা হলেও বাইরের জলুসই আসল। আচম্বিতে রাইয়ের চোখ ফোটে। শাশুড়ি যে স্বামীর মৃত্যুর পর ঘরের ঝাড়বাতিতে গিলাফ পরিয়ে নিজের গায়ে থানধুতি চড়িয়েছেন, সেসব আদতে লোকদেখানো। বৈধব্যের আচার-বিচারে আঁটাআঁটি খুব। পাথরের থালায় আলুনি নিরামিষ আর আতপ চালের ভাত মেখে বেলাবেলি একবেলা আহার করেন। কপালে উল্কি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। কালো গুচ্ছের চুল মাথা ছাপিয়ে দাঁড়াতে পারে না। দাসীর হাতে মুড়িয়ে নেন। মানুষ শতমুখে বিধবার জয়গান গায়। সেই গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। তিনি গুরুজন। বউকে হয়তো ভালোই বাসেন। অধিক বাসেন বিয়াইয়ের টাকা, যার জোরে মা সুমিত্রার মহলে বাড়ির কর্ত্রী মেজো ঠাকুরানিরও পা ফেলতে অনুমতি লাগে। তিনি এতটাই সুরক্ষিত।

তাতে কী লাভ হলো ফুলেশ্বরীর? শাশুড়িমা বুদ্ধির পাহাড় - শাক দিয়ে মাছ ঢাকছেন। বউয়ের মুখে ছেলের কুচাল চাউর হওয়ার ভয়ে ত্রিসীমানায় কাউকে ঘেঁষতে দেন না। রাই যে পাখপক্ষী নিয়ে আছে, তাতেও তার পোয়াবারো। আজ যখন শিকলি দেয়ার দরকার পড়ল, বউকেই তিনি পিঞ্জরাবদ্ধ করলেন, ছেলেকে বিনা বিচারে খালাস দিয়ে। যে ছেলের আবার মরা-শাশুড়ির কানপাশা চুরি করতেও বিবেকে বাঁধে না।

আসলে কি চুরি করেছে? নরবাড়ির বাঁশঝাড় থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়েও তো রঙ্গির কানে রাই পাশা জোড়া দেখতে পায় নাই। কাল হয়তো পরেনি। আজ পরেছে। আজ অন্য কোনো অপ্সরার আদলে সাজ দিয়েছে। মহারাজ তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে গড়গড়া টানছেন। বাতাসে সুগন্ধি ধোঁয়া উড়ছে। চোখে কামাবেশ। পায়ের কাছে জেওরের ঝমঝম বাজনা থেমে যেতে মহারাজ একঝটকায় কোলে তুলে নিয়েছেন রঙ্গমালাকে। আবেগ বাঁধ মানছে না। উদলা জায়গায় চুমাচুমি - দুর্গা দাসী দৌড়ে পালিয়ে বাঁচে। যুগলমূর্তির ছায়া দুলে ওঠে জলতরঙ্গে। মহারাজ নিজের কাছা সামলে রঙ্গিকে পাঁজাকোলা করে জলটুঙ্গি ঘরে ঢুকছেন। দুজনার কলকল হাসির শব্দ রূপসিংহের পাথার দিয়ে ভাসতে ভাসতে রাজবাড়ির সিংহদরজা টপকে আছড়ে পড়ে মা সুমিত্রার দুয়ারে।

দুয়ার শিকল-বাঁধা। বউকে ফাটকে পুরে মা ঠাকুরানি অঘোরে নিদ্রা যাচ্ছেন। ছেলের গতিবিধির হিসাব নাই। রাগে শাশুড়ির গলা টিপে ধরতে ইচ্ছা করে ফুলেশ্বরীর।



যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা। ঋতুস্রাবের আগে শাশুড়িমার গায় ঠ্যাং তুলে আঙুল চুষতে চুষতে রাই বছর দুই এই শয্যায়ই ঘুমিয়েছে। আঙুল চোষার অভ্যাসটা রয়ে গেছে। কিন্তু রাতদিন পানি ছানায় মা সুমিত্রার শরীরে যে জলপচা আঁইষ্টা গন্ধ, যা গোলাপ-আতরেও সরে না, তা নতুন করে তার নাকে লাগে। প্রহরের পর প্রহর গড়ায়। দিকে দিকে পাখপক্ষী ডেকে ওঠে। মুখে বালিশ চাপা দিয়েও গন্ধটা তাড়াতে পারে না ফুলেশ্বরী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন