বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

দীপেন ভট্টাচার্যের ধারাবাহিক উপন্যাস : অদিতার আঁধার--তৃতীয় পর্ব


এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের দুটি পর্ব পড়ার লিঙ্ক--
দ্বিতীয় পর্ব
----------------------------------------------------------------
 তৃতীয় পর্ব
----------------------------------------------------------------
একটা চাপা চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যায় অদিতার। নিজেরই চিৎকার ছিল সেটা। অনেকটা গোঙানীর মত। ঘরটা অন্ধকার, বাইরের পৃথিবী ঝিঁঝির ডাকে কম্পিত। দূরে একটা তক্ষক ডাকে, পাখীর ডাকের মত। তার ওপর দিয়েই নিশাচর পেঁচা ডেকে ওঠে হুহুহু। অদিতা বুঝতে পারে না সে কোথায় আছে, কেন আছে। চারদিকে অন্ধকার। একটা স্বপ্ন দেখছিল সে, না অপসারাদের নিয়ে নয়, তার মাও সেখানে ছিল না।
একটা ছোট, খুবই ছোট ঘরে সে বন্দী। এতটুকু ঘর যে সে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, বাক্সই বলা যায়। বাক্সের মেঝেতে বসে হাঁটুদুটো জড়িয়ে তাতে মুখ গুঁজে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। বাক্সটার দেয়াল নেই, তার বদলে কড়িবর্গা দিয়ে সবদিক আটকানো। বাক্সটা একটা বিশাল সবুজ অরণ্যের ওপর ভাসছে। সে বুঝতে পারছে একটা বিরাট দৈত্য বাক্সটা তার তালুতে রেখে হেঁটে যাচ্ছে। দৈত্যটা এতটাই লম্বা যে গাছগুলোর মাথা তার হাঁটু পর্যন্ত মাত্র পৌঁছাচ্ছে, দু-একটা উঁচু গাছ তার কোমর পর্যন্ত উঠছে। দৈত্যটার মুখ বা শরীরের গঠন অদিতার দেখতে পাবার কথা ছিল না, কিন্ত স্বপ্নে যা হয় - স্বপ্নদ্রষ্টা অদেখাকেও দেখে, তার মস্তিষ্কের গভীরে সব তথ্য সঞ্চিত আছে। অদিতার মনে হয় দৈত্যটা তার অনিষ্ট করতে চায় না, কিন্তু ঘটনার বিপরীত স্রোতে সেই দৈত্য যেন অসহায়, সে পালাতে চাইছে। 

কী হল তারপর সেই স্বপ্নে? মনে করতে চায় অদিতা মুছে-যেতে-থাকা স্বপ্নকে জোর করে মনে করতে। একবার যদি সে স্বপ্নটাকে মনে করতে পারে তাহলে হিপোক্যাম্পাসে সে সেটা গুদামজাত করতে পারত। দৈত্যটা পালাতে চাইছিল কিছু থেকে, তার মুখটা পুরোপুরি মনে না থাকলেও সেখানে যে ভয় ছিল সেটা অদিতার মনে আছে। তারপর একটা গাছের সঙ্গে পা লেগে দৈত্যটা পড়ে যেতে থাকে, হাত থেকে কড়িবর্গার বাক্সটা দিতাসহ ছিটকে পড়ে। আকাশ থেকে মাটির দিকে দ্রুত পড়তে থাকে অদিতা, ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। ঘুম ভেঙে যায়। 

কত বছর ধরে এই বনে আসছে সে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ থেকেছে, কিন্তু নিজেকে এরকম অসহায় অবস্থায় কখনো আবিষ্কার করে নি সে। গতকাল সেই এই কুটিরে আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু এই অরণ্যে সেই কুটিরের থাকার কথা ছিল না। নিজেকে খুব একা লাগে অদিতার। স্লিপিং ব্যাগটা থেকে হাত বাড়িয়ে ডান চিবুকের হাড়টা জোরে স্পর্শ করে সে, তাকে পৃথিবী এখন দেখতে পাবে। চামড়ার নিচে থাকা চিপ পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। অনেক দিন পরে বিষাণের কথা মনে পড়ে, একশ বছর আগে এমনি এক বৃষ্টির দিনে তারা তাঁবুর নিচে শুয়ে ছিল পৃথিবীর আর এক প্রান্তে মাদ্রে দে দিওস নদীর পাশে এক বিশাল উঁচু রামোন গাছের নিচে। এক কালের পেরু আর বলিভিয়ার সীমান্ত ছিল সেটি, পৃথিবী থেকে দেশ আর দেশের সীমানার ধারণা সেই কবেই উঠে গেছে, এক হাজার বছর অন্ততঃ হবে। 

বিষাণ পাশে থাকলেও সেদিনও খুব অসহায় ছিল অদিতা। তার চোখ দিয়েও জল ঝড়ছিল বিষুবীয় বৃষ্টির অবিরাম নির্ঝরতার সঙ্গে, তবে সেই জলের ধারা ছিল নিস্তব্ধ ও শান্ত, সঙ্কোচে ও দ্বিধায় সেই ধারা গাল বেয়ে, থুতনির পাশ দিয়ে গড়িয়ে, গলার ওপর পর্যন্ত যেয়ে উবে যাচ্ছিল বাতাসে, মিশে যাচ্ছিল ত্বকে। বিষাণও তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিল না। অদিতার ডান হাতটা ধরে সে তাকিয়ে ছিল তাঁবুতে ঢোকার উন্মুক্ত প্রবেশপথের বাইরে রামোন গাছের নিচে ছড়ানো অসংখ্য গাছের বীজ, যাকে মায়া বাদাম বলে, তার দিকে। গাছটার বিশাল গোড়া চারদিকে ভাগ হয়ে এক একটা ঢাউস উল্টানো নৌকার মত হয়ে মাটিতে ঢুকে গিয়েছিল। 

এতদিন পরেও সেই সময়টার কথা মনে পড়লে অস্থির হয়ে যায় অদিতা। জোর করে মুছে দিতে চায় সেই স্মৃতি। না কথাটা ঠিক নয়। সেই স্মৃতি মুছে দেবার জন্য পদ্ধতি ছিল, চিকিৎসকরা, উপদেশদাতা মনোবিজ্ঞানীরা বলেছিল খুব সহজেই সেই স্মৃতিকে মুছে দেয়া যাবে, আর মুছে না দিতে চাইলেও তাকে মোলায়েম করে দেয়া যাবে যাতে সেটা মনে পড়লে এত কষ্ট হবে না। কিন্তু অদিতা সায় দেয় নি, জীবনটা তো স্মৃতিরই আধার, সেই স্মৃতি তা যত কষ্টেরই হোক, সেই স্মৃতির সম্মিলনেই তো তার জীবন গড়ে উঠেছে। তাকে বাদ দিলে কি বাকি থাকে? 

অন্ধকার ঘরে আবার সেই দংশানো স্মৃতি ফিরে আসে, একশ বছরেও তার কোনো ক্ষয় হয় নি। হৃদপিণ্ডে একটা প্রচণ্ড ব্যথা হতে থাকে যেন কেউ ছুরি দিয়ে কাটছে তাকে। ওপরের অদৃশ্য কাঠের চাদের দিকে তাকিয়ে থাকে অদিতা। ভোর কখন হবে? সেই সময়ই মনে হয় সে বাঁশির শব্দটা শোনে। হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই। সেই বাঁশিই বাজছে, যে বাঁশি কালো অন্ধকারের মেঘ দূর করে দিয়েছিল। যান্ত্রিক ইলেকট্রনিক শব্দ নয়, কাঠের ছোট বদ্ধ চোঙায় দীঘল শব্দ তরঙ্গ অনুনাদ সৃষ্ট করে, সেটা যান্ত্রিক বাঁশির ভ্রান্তিহীন সুর সৃষ্টি করে না, অমসৃণ কাঠের ত্বক তাকে দেয় এক ধরনের খুতসম্পন্ন গভীরতা। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে থেকে বের হয়ে আসে অদিতা, বাঁ হাতের কব্জিটা অল্প নাড়ায়, সেখানে বাঁধা ছোট একটা ঘড়ির মত গোলাকৃতি চাকতি থেকে হাল্কা লাল আলোয় পুরো ঘরটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ব্যাকপ্যাকের পাশ থেকে একটা জলের বোতল তুলে নিয়ে সেখান থেকে জল খায়। 

মেঝেতে রাখা প্যান্টটা শুকিয়ে গেছে এতক্ষণে। সেটা দ্রুত পরে নিয়ে বাইরে বের হবার দরজাটা খুলতে গিয়ে গতকালের কথা মনে পড়ে যায় অদিতার। ঘরটার একটু দূরেই যে ছোট গিরিখাতটা আছে তার ঐ পাড়ে সে যেন কী একটা দেখেছিল, আবছায়া, মানুষ হতে পারে। মনে হয়েছিল কে যেন তাকে অনুসরণ করছে। কব্জিটা আবার নাড়িয়ে লাল বাতিটা নিভিয়ে দেয় অদিতা, সে যে এই ঘরটা থেকে বের হচ্ছে সেটা সে জানান দিতে চায় না। কিন্তু বাতি নেভান থাকলেও দরজাটা খুলতে আবার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে, সেটা দিতার কানে এমন বিরক্তকর একটা অনুভব সৃষ্টি করে মনে হয় সব ঝিঁঝির ডাক সেই ক্যাঁচক্যাঁচানিতে থেমে গেছে। কিন্তু আসলে থামে নি, ঝিঁঝিরা যেন পূর্ণোদ্যমে ফিরে আসে তাদের ঝিঁঝি নিয়ে, মনে হয় বনের গাছগুলোর মধ্যে যে ফাঁকটুকু আছে সেটুকু তারা শব্দ দিয়ে ভরে দিতে চাইছে যাতে এই বন পরিণত হয় এক ছিদ্রহীন বিরামহীন এক ঘন বস্তুতে। 

ভোর হচ্ছে, কুটিরের সামনে ঊষার ঈষৎ আলো। এরকম ভোর এই অরণ্যে অনেক দেখেছে অদিতা, কিন্তু আজকের মত কোনো বাঁশির শব্দ নিয়ে আকাশকে ধীরে ধীরে নীল হয়ে যেতে সে দেখে নি। দূরে কোথাও, গিরিখাতের ঐ পাড়ে বাঁশি বেজে যায় তার তালে। উঁচু থেকে নিচু, আবার উঁচু কম্পাঙ্কে তার শব্দ ছড়িয়ে পড়ে বনের মাঝে, বাহিত হয়ে গাছের ওপরও। অনেকটা সম্মোহিতের মত গিরিখাতের দিকে এগিয়ে যায় অদিতা, কুটিরে পড়ে থাকে তার স্লিপিং ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, তার ভেতর খাবার। 

খাতটা খুব গভীর নয়, মিটার দশেক হবে, উত্তর থেকে একটা ঝর্ণাধারা এসে পড়ছে। নিচে জল বয়ে যাচ্ছে। ঘাস, কাদামাটি আর বড় বড় পাথরে ভর্তি খাড়াই পাড়টা নেমে গেছে নিচে একটা জলের ধারায়। সেটাতে নিচু হয়ে নামতে গিয়ে পিছলে যায় অদিতা, ছেঁচড়িয়ে নিচে নেমে যায় অনেকখানি। বাকি পথটা সামলিয়ে নিচের অগভীর স্রোতধারায় পা ফেলে। বুটের ফাঁক দিয়ে জল ঢোকে না, কিন্তু বুটের ওপরে হাঁটুর অল্প নিচ পর্যন্ত প্যান্টটা আবার ভিজে যায়। এই নিয়ে চিন্তা করে না সে, এই ধরণের প্যান্ট পাঁচ মিনিটেই শুকিয়ে যায়। জলস্রোত পার হয়ে ঐ পাড়ে উঠতে একটু কসরৎ করতে হয়। পূর্ব পাড়ে উঠে আসলে অদিতা খেয়াল করে তার সারা শরীর কাদামাটি লেপ্টে এক ধরণের কালো বাদামী রঙ ধারণ করেছে। মুখে, চুলে সব জায়গায় কাদা লেগেছে, কিন্তু মুখ ধোবার মত জল হাতের কাছে নেই। 

অদিতা পূর্ব-দক্ষিণে এগোয়, বাঁশির শব্দটা এবার জোরাল হয়। দিগন্তে সূর্যের আলো পাহাড় আর গাছ পেরিয়ে বনের নিচে পৌঁছায় না। কিন্তু আকাশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই, অদিতা জলের ছোট ছোট ডোবা এড়িয়ে দুটি পাহাড়শ্রেণীর মাঝে একটা ছোট অববাহিকা দিয়ে হাঁটে। কিলোমিটার খানেক হাঁটার পরে একটা গাছে-ঢাকা একটা উঁচু টিলা পড়ে। টিলা আর বাঁদিকের পাহাড়শ্রেণীর মাঝ দিয়ে ওপরে ওঠা যায়, বাঁশির শব্দটা মনে হয় ঐখান থেকেই আসছে। ওপরে উঠতে উঠতে অদিতা একটা বাঁকের মুখে আসে, সেইখানে একটা বিশাল পাথর, প্রায় ৭ মিটার উঁচু, রাস্তাটা আটকে বসে আছে। সন্তর্পণে পাথরের ওপর ওঠে অদিতা। আর উঠেই তাকে দেখতে পায়। 

বেশ কিছুটা নিচে একটা ছোট জলাশয়, সেখানে দক্ষিণ আর পশ্চিম থেকে বেশ কয়েকটা ঝর্ণা এসে পড়ছে। জলাশয়ের চারদিকে মাঝারি ধরণের গাছ নুয়ে পড়েছে, তাদের কোনো কোনোটার পাতা জল ছুঁইছে। সেই জলাশয়ের একটু ওপরে একটি পুরুষ তার দিকে পেছন ফিরে বাঁশিটা বাজাচ্ছে। তার পরনে কোনো জামা নেই, পিঠ পুরো খোলা, নিচে ধূসর রঙের একটা কাপড়ের ওপরটা দেখা যাচ্ছে। পিঠের রঙ ঘন বাদামী, মাথার লম্বা কালো চুল পিঠের ওপর ছড়ানো। এরকম ছড়ানো চুলের মানুষ আছে এখনো পৃথিবীতে, অদিতা ভাবে। কিন্তু এই বনে কারুরই থাকার কথা নয়। মানুষটি অদিতার মনে এক অবোধ্য প্রাগৈতিহাসিক অনুভব নিয়ে আসে। 

উঁচু পাথরটার ওপর বসে অদিতা সেই অচেনা মানুষের বাঁশি শোনে। ছোট জলাশয়ে ছাড়িয়ে সেই শব্দ যেন বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তরে উঠতে চায়। বিষন্ন কোনো রাগ, কিন্তু তার মধ্যে কোনো বেদনা নেই, আছে যেন কোনো আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত, প্রকৃতির সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবার আহ্বান। বাঁশীর বিষাদে পাথরের ওপর সমাধিস্থ হয়ে যায় অদিতা। চোখ বুঁজে যায় তার। এরকমভাবে চলে যায় অনেক সময়। হঠাৎ বাঁশি থেমে যায়। চমকে উঠে অদিতা চোখ খোলে। নিচে মানুষটি বাঁশি হেঁটে চলে যাচ্ছে। এবার বুঝল অদিতা, মানুষটি খুবই তরুণ, পঞ্চাশ বছর হতে পারে বয়স। "এই যে," বলে চিৎকার করে ওঠে অদিতা। 

নিচ থেকে ওপরে তাকায় পুরুষটি, দূর থেকে ভাল করে তার মুখ দেখতে পায় না অদিতা। কিন্তু অদিতাকে দেখতে পেয়ে সে যেন হতচকিত হয়ে যায়। মুহূর্তের জন্য দাঁড়ায়, তারপর দৌঁড়ায়। তার পরনে ছিল শুধু এক ধূসর কৌপিন। অদিতা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে, তাল সামলিয়ে যাতে পড়ে না যায়। যতক্ষণে সে নিচে নামল বাঁশুরিয়া গাছের আড়ালে প্রায় চলে গেছে। "এই যে, থামুন, থামুন," চিৎকার করে ওঠে অদিতা, তারপর দৌড়ায় তার দিকে। অদিতাও বনের গাছে মধ্যে হারিয়ে যায়। 

ওদিকে বন-গবেষণা কেন্দ্রে বিনতা সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। সকালের এই সময়টা খুব পছন্দের বিনতার। সূর্য দিগন্তের ওপরে উঠেছে মাত্র, কিন্তু পৃথিবীকে তবু আলো-অন্ধকারে রেখে দিয়েছে। এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় বিনতা। দূরে খরস্রোতা ডামুরি বইছে। জলের সঙ্গে পাথরের আর জলের সঙ্গে জলের ধাক্কায় যে শব্দটা হয় সেটা শুনতে কখনই পুরোনো হয় না বিনতার। হঠাৎ পেছনে ঘর থেকে একটা তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ ভেসে আসে। দৌঁড়ে ঘরে ঢোকে বিনতা। সারা দেয়াল জুড়ে ডামুরি অরণ্যের মানচিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে একটা লাল বিন্দু, জ্বলছে নিভছে। বিনতা জানে ঐ লাল বিন্দুটি কার। সেটি অদিতার। অদিতার শারীরিক সমস্ত তথ্য ফুটে ওঠে পাশে। হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, শরীরে প্রতিটি অংশের তথ্য। বিনতা দেখে অদিতার রক্তচাপ কমে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। হৃদপিণ্ডের কম্পাঙ্ক কমছে। বিনতা চিৎকার করে ওঠে, "অদিতা, অদিতা, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?" অন্য দিক থেকে কেউ উত্তর দেয় না। বিনতা জানে অদিতার সাথে কেউ নেই, অদিতার লাল বিন্দুর পাশে আর কোনো বিন্দু নেই। এক মিনিটের মধ্যে অদিতার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। বিনতার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। সে চিৎকার করে ওঠে, "জরুরী অবস্থা, জরুরী অবস্থা!" 

ঘরের মাঝেই ত্রিমাত্রিক অভিক্ষেপে আবির্ভূত হয় কেন্দ্রের পরিচালক বজসেনক। বিনতার কথা আটকে যায়, কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারে না। তারপর বলে, "অদিতার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে।" এই পৃথিবীতে কেউ 'মারা গেছে' আর বলে না। বজসেনক কিছুক্ষণ সময় নিলেন এই সংবাদটাকে আত্মস্থ করতে। অদিতা এই কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী, বলতে গেলে পৃথিবীব্যাপী তার নাম। এখানে সিদ্ধান্ত নেবার কিছু নেই, বিনতা নিজেই ড্রোনদের পাঠিয়ে দিতে পারত, কিন্তু এই কেন্দ্রের নিয়মানুবর্তিতার গঠ্ন বজায় রাখতে সে পরিচালককে ফোন করেছে। বজসেনক প্রশ্ন করে, "অদিতার চিপ চালু আছে?" মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় বিনতা, বলে "কিন্তু উনি ভিডিও চালু রাখেন নি, তাই আমরা ওনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা জানতে পারছি না।" পরিচালক তার ঘরে হাতটা নাড়ায়, তার দেয়ালে ফুটে ওঠে অরণ্যের মানচিত্র। তারপর দেয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলে, "চার এবং পাঁচ নম্বর ড্রোনকে চালু কর।" অপর দেয়ালে ফুটে ওঠে কয়েকটা ছবি। একটা বড় গুদামের মত ঘর থেকে দুটো হেলিকপ্টারের মত আকাশে ওড়ার মত যন্ত্র বেড়িয়ে যায়। সেই চালকবিহীন যন্ত্রের কাছে ইতিমধ্যে সব তথ্যই চলে গেছে, অদিতা কোথায় আছে, তার হৃদপিণ্ড কখন বন্ধ হয়েছে, তার দেহকে উদ্ধার করে কোথায় নিয়ে আসতে হবে। এইসব যন্ত্র এক একটা কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট, তাদেরকে বিস্তারিত নির্দেশনামা দিতে হয় না। তাদের ইঞ্জিন শব্দহীন, শুধু বাতাসের সঙ্গে প্রপেলারের আঘাতের শব্দ শোনা যায়, সেটাও খুব মিহি। আধঘন্টা থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে অদিতার দেহকে উদ্ধার করে নিয়ে এলে তাকে তার এখনকার মস্তিষ্ক রেখেই বাঁচানো যাবে। এর পরে হলে তাকে তার কপি করা পুরনো মস্তিষ্ককে ব্যবহার করতে হবে। 

বিনতা দুটো ঠোঁট চেপে আর কপালের ত্বক কুঁচকে হেলিকপ্টার দুটোকে পাহাড়ের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে। তার বাঁ চোখটা থেকে শুধুমাত্র একটা জলে ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। অদিতা মারা গেছে, কিভাবে সে মারা গেল? তাকে আবার জীবিত করা সম্ভব হবে, কিন্তু নতুন অদিতা কি পুরনো অদিতার মত হবে?



লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।

মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন