বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা’র গল্প ‘ঘোর রাতে ঘরে ফেরা’ নিয়ে আলোচনা

মৌসুমী কাদের

‘ঘোর রাতে ঘরে ফেরা’ একটি অন্যরকম গল্প। খুব সাধারণ একটি বিষয়কে অসাধারণ করে সাজিয়েছেন গল্পকার শামসুজ্জামান হীরা । একজন মধ্য বয়স্ক লোক। নাম মোরশেদ। তিনি জুয়া খেলা শেষে বাড়ি ফিরছেন। সেদিন তিনি খেলায় জিতেছেন,তাই মনটাও ফুরফুরে। মাসের শেষ, তাঁর টাকার খুব দরকার। বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রী, তাঁকে ডাক্তার দেখাতে হবে। সাতদিন হয়ে গেল; জ্বর নামে আবার ওঠে। খেলার সময়ে মোরশেদের সে কথা মনে থাকেনা।
বাড়ি ফেরার সময় সে অনুভব করে, স্ত্রী’কে বার বছরের ছেলের কাছে ফেলে রেখে খেলতে আসাটা মোটেই উচিত হয়নি তাঁর। অনুতপ্ত মোরশেদ বাড়ি ফিরছে আর পাঠকের কাছে গল্পের বিস্তৃতি বাড়ছে। মোরশেদ পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, কি করে তাঁর এই তাসের নেশা হল, কতদিন ধরে তিনি খেলছেন, খেলার মানুষগুলো কে কেমন, চালগুলো কেমন ধূর্ততায় ভরা, তাস এবং মদের নেশা কী করে গ্রাস করল তাঁর জীবন... ইত্যাদি। এই সুবিন্যস্ত বিত্তান্তের ভেতর ওলটপালট খায় অতীত এবং বর্তমান। মনে পড়ে অনিচ্ছা স্বত্তেও আশ্রয়দাতার মন জোগাতে তাস খেলতে শুরু করা... , সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড, সিটি ক্যাফের আড্ডা, কলেজে পড়ার দিন, লেখালেখি, বন্ধুবান্ধব, কত নির্ঘুম রাত! আবার বর্তমানের পাটাতনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় সপ্তাখানেক ধরে স্ত্রীর স্যালাইনের ওপর বেঁচে থাকা, বউকে সময় দিতে না পারা, দাম্পত্য জীবন থেকে খসে পরা তিরিশটা বছর! ইচ্ছে হয় প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেলে বুড়ো বয়সেই হানিমুনে যাবে সে। কিন্তু নিয়তি কি ওর সংগে ছিল? মোরশেদ জূয়োয় জেতা টাকাটা নিয়ে কী করবে এ নিয়ে যখন পাঠক ভাবতে বসে, ঠিক তখনই ঘটনাটা গড়িয়ে আটকে পড়ে একটি মর্মান্তিক দৃশ্যে। অকাংখিত দোলখেলা-অবহেলায় এবং বিনা চিকিৎসায় মোরশেদের স্ত্রীর মৃত্যু হয়। গল্পটিতে কোন এলোমেলো জটিলতা নেই। গল্পকার তাঁর শক্ত লেখার গাঁথুনি দিয়েই অসাধারণ প্রতিভায় পাঠককে গল্পের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন। এবং এই বেঁধে রাখা্র ব্যাপারটাই শামসুজ্জামান হীরার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

‘ঘোর রাতে ঘরে ফেরা’ গল্পে আবর্তিত হয়েছে যে জীবন; তার মাত্রা, ফলাফল সবকিছু পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জীবনের সমস্ত দ্বন্দ-সংঘাত, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকে তুচ্ছ করে গল্পের মূল সিদ্ধান্তটি ছিল ‘জুয়োর বিনিময়ে জীবনের মৃত্যু’। সাতান্ন বছর ছুঁই ছুঁই মোরশেদের চোখে ছানি পড়েছে, অপারেশন দরকার, পাওয়ার বদলানো দরকার, সেসব কিছুই হয়নি। বিয়ের পর স্ত্রী’কে কথা দিয়েও কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেনি সে। গাঁও গেরামের গৃহস্থর মেয়ে বলে তার কোন দুঃক্ষ থাকতে নেই, অসুখ হলে কোঁকাতে নেই, স্বামীর পা মচকে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা তেল মালিশ করে দিতেও তাঁর আপত্তি নেই। বড় অযত্ন আর অবহেলায় প্রতিবাদহীন হয়ে সংসারে দিনের পর দিন পার করে দেয় শামীমা। কেরানির আয়ে কোনটাই ঠিক ঠিক করতে পারার ক্ষমতা হয়না মোরশেদের, কেবল তাস খেলা ছাড়া। একথা জেনেও যে ‘জুয়া জীবনটারে খেয়ে ফোঁপড়া করে দিল।’ আর নিম্নবিত্ত শামীমা’র সব কিছু জেনে বুঝেও মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকেনা।

তাস খেলাটা একসময় খুব পরিচিত দৃশ্য ছিল যখন প্রযুক্তিগত সুবিধা, বা কোন সামাজিক মাধ্যম দৃশ্যমান বা সক্রিয় ছিলনা। একটা প্রচলিত গল্প আছে; ইংল্যান্ডের এক নারী মিসেস হচকিস এগারো বছর পঙ্গু অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। তিনি শুয়ে শুয়ে একার্তে তাস খেলতেন। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তাঁর হাতে ছিল রুহিতনের সাত। হাত থেকে সেই তাস কিছুতেই যখন আলাদা করা গেল না তখন সেই অবস্থাতেই তাঁকে সমাহিত করা হয় (সংগ্রহ)। শামসুজ্জামানের গল্পে তাসের আড্ডার আক্কাস, জাভেদ, মোরশেদ, এদের সবারই উদ্দেশ্য ছিল এক। পৃথিবীটা হাতের মুঠোয় পাওয়া। টাকা থাকলে কী না হয়। এ দৃশ্যটি যে কেবল মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বাঙালীদের চিরাচরিত অভ্যাস বা আচরণ তাও কিন্তু নয়। পৃথিবীর শীর্ষ ধনী বিল গেটস সহ অনেক বড় বড় ধনী-ই না কি ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্রীজ’ খেলাতে আসক্ত ছিলেন। এমন কি বিখ্যাত প্রয়াত অভিনেতা ওমর শরিফ তাস খেলার উপরে এতটাই আসক্ত ছিলেন যে তিনি শিকাগো ট্রিবিউনে ‘ব্রীজ খেলা’ নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখতেন।

মোরশেদের তাস খেলার জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার গল্পটা একধরণের পলাতক চেষ্টা যা যুক্তি এবং সৃষ্টিশীল উভয় আচরণকেই বিপদে ফেলে। মানসিক আসক্তি,অমোঘ অভ্যাস, স্ব-অন্তর্ঘাত, সীমিত বিশ্বাস, এসব থেকেই মোরশেদের পলায়ন প্রবণতা তৈরী হয়েছিল যা থেকে বিষন্নতায় আক্রান্ত মোরশেদ তাস খেলার মধ্য দিয়ে একাকীত্ব ঘোচাতে চেয়েছিল। পাশাপাশি অলসতা, অনুৎসাহ, মনযোগের অভাব এবং চাহিদা পূরণের পর্যাপ্ত চেষ্টা ছিল না বলেই ধীরে ধীরে সে স্ত্রীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই হিসেবে মোরশেদকে শামীমার পরোক্ষ হত্যাকারীও বলা চলে। অন্যদিকে শামীমার যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার অভাব, অজ্ঞতা ইত্যাদি কারণে মোরশেদ বা তাঁর নিজের জীবনেরও খুব বেশী পরিবর্তন হয়নি। সেই হিসেবে তাঁকে পরিস্থিতির শিকারও বলা যেতে পারে।

কথা সাহিত্যিক শামসুজ্জামান হীরা অসাধারণ দক্ষতায় কাহিনীটাকে ধরে রেখেছেন ঘটনার ঘনঘটা ছাড়া। চরিত্রগুলোর বর্ণনা করেছেন কাহিনীর সাথে সামাঞ্জস্য রেখেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ের উপর নির্ভর করেই অতীত এবং বর্তমানের চরিত্র এবং ঘটনাগুলো জোড়া লেগে চূড়ান্ত একটি পরিণতি পেয়েছে গল্পে। যারা তাস খেলা জানেন না, তাঁদের জন্যেও গল্পটি নতুন একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

আশা করছি এখনও যারা পড়েননি তারা ঝটপট পড়ে ফেলবেন গল্পটি; গল্পপাঠের ২০১৬,জুন সংখ্যায়।

---------
মূল গল্পের লিঙ্ক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন