বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

হাসান আজিজুল হকের প্রবন্ধ : মহাদেশের কথক --গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

লাতিন আমেরিকার বাস্তব লাতিন আমেরিকার উপন্যাসে। আমাদের কাছে এই বাস্তবের অনেকটাই চেনা নয়। লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যও এ জন্য আমাদের কাছে অচেনা মনে হয়। অসম্ভব উদ্ভট অসঙ্গত এক বাস্তব, দুঃস্বপ্নে ভরা, কল্পলোকের মায়ায় আচ্ছন্ন, উপকথা আর লোকবিশ্বাসে সরস, অকহতব্য নিষ্ঠুরতায় হিঙ্গুল।

এই বাস্তবের ছায়াপাত যে সাহিত্যে, সে সাহিত্যকে মনে হয় বুদ্বুদের কাচঘর, সূর্যের আলো যেখানে ইন্দ্রিয়সীমার বাইরে গিয়ে রং ও রক্তের মুমূর্ষু তল দেখায়। তবে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য সাধারণত বাস্তবের ছায়া আঁকে না, পুরো বাস্তবকেই বাস্তবতরূপে পুনর্নির্মাণ করে; এমন বাস্তব যা এই মহাদেশের পাঁচশ’ বছরের রক্তস্রোত, মানুষের মাংস থ্যাঁতলানোর আওয়াজ, লক্ষ-কোটি মানুষের শ্বাসরোধের নিদারুণ স্নায়ুবিক্ষেপ অতিক্রম করে আজ এক অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা তৈরি করতে পারে। সাহিত্যে নির্মিত এই নিষ্ঠুরতার তুলনা মেলে না; লাতিন আমেরিকাকে যে বহুজাতিক পুঁজি আজ শকুনের মতো ছিঁড়ে খাচ্ছে, যে অমানুষিক নিষ্ঠুরতার দৈনন্দিন অনুষ্ঠান সেখানে ঘটছে তাকে ছাড়িয়ে গেছে লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যের নিষ্ঠুরতার ছবি। তাতে বাস্তবের নিষ্ঠুরতা হালকা হয় না, শিল্প যে বাস্তবকে কতটা ঝিকিয়ে তুলতে পারে, সেটাই দেখতে পাই। লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যিক এই দক্ষতা অর্জন করেছেন। উপন্যাস শিল্পে এটা নতুন, আধুনিক সাহিত্যের মাতব্বরির দাবিদার ইয়োরোপের লেখক এইখানে অসহায়। যাঁরা উপন্যাস দিয়েছেন, উপন্যাস আজ তাঁদের হাতে মৃত, অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার উপন্যাস অন্যান্য শিল্পের জমির দখল নিয়ে এই মহাদেশেরই জীবনবেদ সৃষ্টির কাজে নেমেছে। ইতিহাস আর দর্শনের দুই প্রবল ঘোড়া উপন্যাসের কাছে বাগ মেনেছে।
এই প্রশ্ন আজ সহজেই উঠতে পারে যে, লাতিন আমেরিকার উপন্যাস সাহিত্যকে অতিক্রম করে যাচ্ছে কিনা অর্থাৎ সাহিত্য বিচারের প্রচলিত সব ক’টি মানদণ্ড প্রয়োগ করেও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপভোগ অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে কিনা। যে কোন শিল্পমাধ্যম একবার দাঁড়িয়ে গেল সেটা একটা শরীরী অস্তিত্বের ব্যাপার হিসেবে দেখা দেয়, তাকে বিচারের তত্ত্বগুলোও প্রায় শারীরিকভাবেই জায়গাজুড়ে থাকে, কোনমতেই নড়তে চায় না। এই জন্যে ইয়োরোপীয় উপন্যাস পড়া আমাদের প্রত্যাশা ও অভ্যাস যখন লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের কাছে ধাক্কা খায়, তখন এক ধরনের বিমূঢ়তায় পেয়ে বসে আমাদের। উপন্যাস বলে বহু কষ্টে ও যতেœ তাকে চিনতে হয়েছে, হোর্হে আমাদো বা আলেহে কার্পোন্তিয়েরের উপন্যাস তা থেকে এতই দূরে যে, এই নতুন রচনাকে উপন্যাস বলে মানতে গেলে উপন্যাস সম্বন্ধে ধারণাটাই আগাগোড়া বদলে ফেলতে হয়। শিল্প বিপ্লবের ফলে সমাজে যে ব্যক্তির জন্ম হচ্ছিল, উনিশ শতকে সেই ব্যক্তি ধূসর ও লেপা-মোছা যৌথ জীবন থেকে শক্ত পায়ে হেঁটে বসে আলাদা হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল, সেই আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তি পশ্চিমী উপন্যাসে প্রচণ্ড দাপট দেখিয়েছে। একশ’ দেড়শ’ বছর ধরে ইয়োরোপে গড়ে উঠেছে ব্যক্তিমুখ্য উপন্যাস। তাকে বিচার করার উপযুক্ত নন্দনতত্ত্বও ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে উঠেছে। আমাদের মহা ক্ষতি এই যে, গত দুশ’ বছর ধরে আমাদের কাছে মাত্রই ইয়োরোপের জানালা খোলা ছিল, ডালপালা ওই মুখেই বেড়েছে। আমেরিকানদের কথা আমি এখন ভাবছি না।

লাতিন আমেরিকার উপন্যাস এই জন্যেই আমাদের কাছে এমন অসম্ভব নতুন লাগে। খুব কড়া সংস্কারের বিমুখতা এগিয়ে দিয়ে প্রতিরোধ করতে ইচ্ছে হয় : না, এ বস্তু উপন্যাস নয়। কিন্তু উপন্যাস ইতিহাসেরই সৃষ্টি, ইতিহাস অর্থাৎ কালগঙ্গা হচ্ছে এক নিয়ত প্রবাহিত পরিবর্তন স্রোত আর পরিবর্তন স্রোত ফাঁকা যদি না হয় তাহলে পূর্ণ হয় দেশ সমাজ মানুষের ঘটনাপুঞ্জে। লাতিন আমেরিকার উপন্যাস এই কালগঙ্গার বিপুল প্রবাহ ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

লাতিন আমেরিকার ইতিহাস থেকে তাই তার উপন্যাস সাহিত্য বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। অবিকল এই কারণেই ইয়োরোপের উপন্যাস সাহিত্যের পথ থেকে ভিন্ন পথ ধরেছে লাতিন আমেরিকর উপন্যাস। ইতিহাস এখানে যে বাঁকা পথ ধরেছে, সেই পথের রেখাগুলিকেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে উপন্যাস। মহাদেশের ঘটনাপুঞ্জ প্রায় দুর্ভিক্ষের ক্ষুধায় উপন্যাস তার বিরাট জঠরে পুরেছে আর সেখানে নিষ্ঠুর রক্তপাত, ভয়ানক শোষণ, অবিরাম দ্রোহ ইত্যাদি জারিত হয়ে জীর্ণ হয়ে যে অভিনব বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে, তাকে কিছুতেই প্রচলিত সাহিত্যের মাপে পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে না। সাহিত্য ঠিক এইভাবেই সাহিত্যকে অতিক্রম করে যাচ্ছে।

সবাই জানেন লাতিন আমেরিকার ইয়োরোপীয় বিজেতারা ওই মহাদেশের পুরনো জনসমষ্টিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ষোড়শ শতকে প্রধানত স্পেন পর্তুগালের ডাকাত অভিযানকারীরা এই মহাদেশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং এরাই আজকের মহাদেশের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর মানচিত্রে এক নতুন ধরনের মানব অস্তিত্বের সূচনা করে। এই ইতিহাসটা তেমন পুরনো নয়, মাত্রই পাঁচশ’ বছরের কাছাকাছি। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বে লাতিন আমেরিকা তার সমুদ্র, পর্বত, অরণ্য, সুবিপুল জলরাশি আর স্মৃতিভারাতুর দু হাজার বছর নিয়ে, মাটির নিচের রক্ত-মাখানো লোভ আর পাপ বুকে পুরে এমন এক অদ্ভুত বাস্তব হাজির করেছে, যার তুলনা কোথাও মিলবে না। ইতিহাসের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে এই বাস্তবকে দেখতে না পারলে তো কিছুতেই ধরা দেবে না। লাতিন আমেরিকার উপন্যাসেও না। এই বাস্তব অতীত আর বর্তমানের দুমুখো বিপরীতকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। বর্তমান থেকে যে রক্তপ্লাবন বইছে, তা ধেয়ে চলেছে অতীতের দিকে। মাটি থেকে, পাহাড় ও অরণ্য থেকে লৌকিক জীবনের গভীর তলদেশ থেকে ফোয়ারার মতো যে মনুষ্যরক্ত ছুটছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসকে তা রঞ্জিত করেছে। লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যের গায়ে সেই রক্তের পুরনো পাটলবর্ণ দেখা যায়। স্পেন ও পর্তুগালের যেসব মানুষ কম-বেশি পাঁচশ’ বছরের মধ্যে একটা গোটা মানবগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ লোপাট করে দেবার মতো অসাধ্য সাধন করেছে, আজ তারাই লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে এমন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যেখানে ভ‚মি আর ভ‚তলের সম্পদের উপর মুষ্টিমেয়ের অধিকার, যেখানে বর্তমান বিশ্বের হিংস্র সাম্রাজ্যবাদ অবলীলায় থাবা চালিয়ে যাচ্ছে। যে নিষ্ঠুরতায় আদি ভারতীয় মানবগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হলো, সেই একই নিষ্ঠুরতা লাতিন আমেরিকার হৃদয় বিদীর্ণ করেছে আজ। স্পেনীয় বিজেতারা যে কোন উপনিবেশ স্থাপনকারীদের মতোই নির্লজ্জ উলঙ্গ পৈশাচিকতা দেখিয়েছে, লোকজনসহ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে ইনকা সভ্যতা। আমরা জানি মায়া ও আজটেক সভ্যতা পার হয়ে এই সভ্যতা মানব জীবনের জন্যে অভিনব স্বাদ সৃষ্টি করেছিল। প্রত্যেক আদি ভারতীয়ের পাশে স্পেনীয়রা বেঁধে দিয়েছিল বেড়ি, গলায় পরিয়েছিল লোহার শিকল। এক একটা পুরো জনপদ উৎখাত করে তাদের পাঠিয়ে দিয়েছিল মাটির নিচে, খনির আঁধারে। অসম্ভব বিশ্বাসঘাতকতা, রক্তলোলুপতা, সংঘবদ্ধ নরহত্যায় স্পেনীয় বিজেতারা সম্ভবত এখনো অনতিক্রম্য রয়ে গেছে।

বিজয়ের একেবারেই প্রথম যুগের একটা হিশেব নেওয়া যাক। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের প্রথম অভিযানের সময় এসপ্যানোলায় (হাইতি, সান্তো ডোমিনগোর কলম্বাসের দেয়া নাম) মূল আদিবাসীর সংখ্যা ছিল দুই লক্ষের বেশি, তিন লক্ষের কিছু কম। ১৫০৮ সালে সেটা দাঁড়ায় ৬০ হাজারে। ৪৬ হাজারে ১৫১০-এ, ২০ হাজারে ১৫১২-তে, ১৪ হাজারে ১৫১৪ সালে। ১৫৪৮ সালে মোট ৫০০ আধিবাসী টিকে ছিল কিনা সন্দেহ। বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একজন অধিবাসীর দাম ছিল ৪ পেসো। যে কর্টেজের মুগ্ধ বিস্ময়স্তব্ধ দৃষ্টির তুলনা দিয়েছেন কীট্স্ তাঁর কবিতায়, সেই কর্টেজ মহাদেশ বিজয়ের আগে ছিলেন ক্রীতদাস শিকারী। মেহিকো এই রকমই এক ক্রীতদাস-শিকারী দলের অভিযানের ফলে আবিষ্কৃত হয়। কর্টেজের মঞ্চপ্রবেশ এরপর। অস্থাবর সম্পত্তির মতো ক্রীতদাস চালানের জমজমাট ব্যবসার যুগ পার হয়ে উপনিবেশ স্থাপনের সময় যে বর্বরতার পরিচয় বিজেতারা দিয়েছিল, তার বর্ণনা দেওয়া কঠিন। রানী ইসাবেলা ক্রীতদাস ব্যবসা বন্ধ করে দিলে, কলম্বাস নতুন বিশ্বে ‘এন্কামিয়েন্ডা’ প্রথা চালু করেন। ‘এন্কামিয়েন্ডা’ হচ্ছে বিজেতাদের ভ‚মিদান যার সঙ্গে থাকবে মূল আদিবাসীর বিনা মজুরির বাধ্যতামূলক সারা জীবন স্থায়ী শ্রম। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যা ঘটেছিল তা কল্পনা করাও কঠিন। অস্থাবর সম্পত্তিতুল্য ভারতীয় দাসদের মৃত্যু না ঘটা পর্যন্ত খাটানো হতো। এমন ভয়ানক ছিল জীবন তাদের যে, তারা গণআত্মহত্যা করত, ব্যাপক শিশুনিধন ঘটাত এবং পুরো জনগোষ্ঠী যৌনসংসর্গ বর্জন করত যাতে কোনো শিশু না জন্মায়। উন্মত্ত স্পেনীয় বিজেতাদের লক্ষ্য ছিল তাল-তাল সোনা, ভ‚গর্ভের অন্ধকার পাতালে যা মাটি-মাখা ম্লান অপেক্ষা করছিল ভারতীয়দের রক্তে পালিশ হবার জন্যে। অজ্ঞাত সোনার দেশ ‘এল দোরাদো’ এখনো তাই স্বর্ণলুদ্ধতার প্রতীক।

লাতিন আমেরিকার বিচিত্র বাস্তবতার উল্টো পিঠ এখন ভেসে উঠছে মানচিত্রের উপর। মাটির ভেতরের সম্পদ লুট করে নেবার পর বড়ো বড়ো ধস নেমেছিলো, মানচিত্রে আছে তার চিহ্ন। সেইসব ধস বেয়ে মহাদেশের আদি ভারতীয়রা চিরকালের জন্যে মাটির তলায় নেমে গেছে। স্পেন পর্তুগাল জাঁকিয়ে বসে শত শত বছরের জন্যে উপনিবেশ স্থাপন করেছে। সেই ঔপনিবেশিক জগৎও গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। লাতিন আমেরিকার কোন দেশই আজ ইয়োরোপের উপনিবেশ নয়। প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে ছোট বড় প্রত্যোকটি দেশই আজ স্বাধীন। কিন্তু কারা স্বাধীন? আদি ভারতীয়রা? প্রভ‚ত কর্মসংরক্ষা সত্ত্বেও আজ মহাদেশের অধিকাংশই ইয়োরোপীয় বংশোদ্ভ‚ত। কিন্তু তাদের স্বাধীনতা পেতে হয়েছে রক্ত দিয়েই। লাতিন আমেরিকার উদ্ভট অবাস্তব অসঙ্গত দুর্জ্ঞেয় বাস্তবতার মূল চেহারাটা ঠিকই রয়ে গেছে।

মানচিত্রটি নিজেই যেন তার অপরিচয়ের উৎস। প্রায় সমস্ত পশ্চিম উপক‚লজুড়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ধরে চার হাজার মাইল লম্বা প্রস্তরময় কাঁকড়া বিছের মতো আন্দিজ—পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতশৃঙ্খল। হিমালয়ের পরে উচ্চতমও বটে। চার ভাগের তিন ভাগেরও বেশি অঞ্চল উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় তপ্ত। বিশাল আমাজন পেরুর আন্দিজ থেকে বেরিয়ে প্রায় চার হাজার মাইল প্রবাহিত হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। এত পানি পৃথিবীর আর কোনো নদী সমুদ্রে বয়ে নিয়ে যায় না—সেকেন্ডে ৪০ লক্ষ কিউবিক ফুট। যে আমাজন বেসিন থেকে আমাজন পানি বয়ে নিয়ে যায়, তার আয়তন সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি। এই বিশাল সমভ‚মির উষ্ণ আবহাওয়ায় আর অপরিমিত বর্ষণে শত শত মাইল জুড়ে প্রাগৈতিহাসিক নির্জনতায় ভরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘন অরণ্য অঞ্চল। সমগ্র মহাদেশে ছায়াময় বিশালতা। জনগোষ্ঠীর পিছনে সেই বিশালতা। এক স্থির আদিম বিশাল পরিপ্রেক্ষিত। তার প্রতিফলন সাহিত্যে সংস্কৃতিতে শিল্পে। মহাকাব্যিক অনিঃশেষ পটভ‚মি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের পিছনে। এই ব্যাপ্তিকে মহাদেশীয় বলা ছাড়া উপায় নেই। এই জন্যে ছোট দেশ কলম্বিয়ার মার্কেজ যখন লেখেন, তখন তিনি তাঁর মহাদেশের পক্ষ থেকেই লেখেন, কলম্বিয়ার পক্ষ থেকে নয়। পাবলো নেরুদা মহাদেশীয় প্রতিনিধি হিসেবেই দেখা দেন তাঁর কবিতায়, কেবল চিলির কবি হিশেবে নয়। তবে একে কেবল মহাদেশীয় ভ‚গোলের দিক থেকে দেখা ঠিক হবে না। মহাদেশের ইতিহাস থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার সমতা আর যে হিস্পানি ভাষা তার নিজস্ব বিরাট ঐতিহ্য নিয়ে বহুকাল থেকেই সমৃদ্ধ তাদের দিক থেকেও দেখা দরকার। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মহাদেশের ইতিহাস। মহাকাব্যের ব্যাপ্তি সেখান থেকেই পাওয়া যায়। ইতিহাসের বিশাল সূত্রে লাতিন আমেরিকা আজ এক জায়গায় বাঁধা পড়েছে। রাষ্ট্রের সীমানাগুলি আলাদা আলাদাভাবে চিহ্নিত থাকলেও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি তাদের অধিকাংশকেই একই বিশাল পেষণ-যন্ত্রে নিক্ষেপ করেছে। যে অযুতকণ্ঠের আর্তনাদ আজ মহাদেশের বুকের ভিতর থেকে উঠে আসছে তাকে লাতিন আমেরিকারই বলতে হবে। লাতিন আমেরিকার যে কোন জায়গায় যে কোন বড় সাহিত্যিক যখন আজ কিছু রচনা করেন, তখন তিনি সমস্ত মহাদেশের জন্যেই লেখেন।

এই বাস্তবতা যা আজ অবাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে, অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য, মানুষের অস্তিত্ব, যা আজ উদ্ভট, অসঙ্গত ও বেখাপ্পা, এই ইতিহাস যা কেবলই বাঁকা পথে গেছে, গলায় গলায় ডুবে আছে হত্যা লুণ্ঠন পরস্বাপহরণের ক্লেদের মধ্যে; জনপদসমূহের স্থাপন ও উচ্ছেদ, জনগণের অভ্যুত্থান ও বিনাশ, সাম্প্রতিক বিশ্বের শোষণের রথনির্ঘোষ—এসবের মধ্যেই লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে। মার্কেজ তাঁর নোবলে পুরস্কার ভাষণে হিস্পানি স্বাধীনতা থেকে মুক্ত লাতিন আমেরিকার ছোটো বড়ো নানা মহাদেশের কথা এমনভাবে বলেন যেন গোটা মহাদেশই তাঁর নিজের দেশ। তাঁর জন্ম যে কলম্বিয়ায় একথা বিশেষভাবে খেয়াল করার দরকারই পড়ে না। মেহিকো, ইকুয়াদোর, এল সালভাদোর, চিলি, নিকারাগুয়া ইত্যাদি দেশের ঘটনাবলি তিনি ঠিক তেমনিভাবেই বর্ণনা দিতে পারেন যাতে আমরা বলতে পারি লাতিন আমেরিকার বাস্তবতা তাঁর হাতের তালুর মধ্যেই আছে। ইচ্ছে করলেই মুঠো খুলে তিনি তা পুরোপুরি দেখে নিতে পারেন। এই জন্যে নোবেল পুরস্কার ভাষণ যে উদ্ভট বাস্তবের বর্ণনা করে বলেছেন এই হলো লাতিন আমেরিকার অতি সাধারণ বাস্তবতা একটুও অতিরঞ্জিত নয়, একেবারেই শাদামাটা, তাকে ধরার চেষ্টাটাও সেইজন্যে নেহাত শাদামাটা। আমাদের কাছে তা যেমনই লাগুক। তাঁর এই শাদামাটা বাস্তব ছড়িয়ে আছে মেহিকোয়, চিলিতে, আর্হেন্তিনায়, উরুগুয়ে, পেরুতে—একই বাস্তব যেন জালের মতো বিছিয়ে আছে। তিনি লেখেন ‘আমাদের মধ্যরেখালগ্ন আমেরিকা মহাদেশ’ ভ্রমণের সময় ম্যাগেলানের সহযাত্রী আন্তোনিও পিগাফেত্তা তাঁর ভ্রমণপঞ্জিতে জানিয়েছেন, পিছে নাই-কুণ্ডুলিয়াওলা শুয়োর তিনি দেখেছেন, ঠ্যাং-ই নেই এমন পাখি, আর কখনো আরশি দেখেনি এমন মানুষ যে আরশিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আতঙ্কে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। মার্কেজ ওই নোবেল ভাষণেই বলেছেন, এগারো হাজার খচ্চরের প্রত্যেকটির পিঠে চাপানো হয়েছিল একশ’ পাউন্ড করে সোনারতাল। এইসব খচ্চর হারিয়ে যায়। এদের পাঠানো হয়েছিল ইনকা রাজা আতাহুয়ালপার মুক্তিপণ পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। বহুদিন পরে কিছু পালিত মুরগির পেটের মধ্যে পাওয়া যায় ছোট ছোট সোনার দানা। তারপর তিনি জানান পানামা যোজকের মধ্যে দিয়ে রেলপথ তৈরি সম্ভব কিনা জানতে চাওয়ায় এক আলেমান শিবির জানিয়েছিল রেলপথ লোহার বদলে যদি সোনা দিয়ে বানানো যায় তবেই তা তৈরি হতে পারে। কারণ এ অঞ্চলে লোহা মেলা কঠিন। নোবেল বক্তৃতায় মার্কেজ মহাদেশের নানা দেশ অঞ্চল মিশিয়ে একাকার করে যে বাস্তবতার কথা জানাতে চাইছেন তা কি ঠাট্টা? কিন্তু নিশ্চয়ই ঠাট্টা নয় এইসব বর্ণনা যে মেহিকোর তিন তিনবারের ডিক্টেটর হেনেরাল আন্তোনিও লোপেজ সান্তানা নিজের ডান পা-টি খুঁইয়ে সেই পা-টিকে জাঁকজমক করে কবর দিয়েছিলেন, গার্সিয়া মোরোনো ইকুয়াদোর শাসন করেছিলেন একটানা ষোলো বছর তার মৃত্যুর পরে পুরো জাঁকালো পোশাক পরিয়ে তাঁকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রপতি সিংহাসনে (বাংলাদেশের নস্যি ডিক্টেটররা এসব কথা জানতেন না বোধ হয়, হবুরা এখন থেকে এসব ভেবে রাখতে পারেন), এল সালভাদোরের স্বৈরাচারী শাসক মার্তিনেস হত্যা করেছিলেন তিরিশ হাজার চাষীকে চোখের পাতা একটুও না কাঁপিয়ে। ঠাট্টা নয় যখন তিনি চিলির সালভাদোর আইয়েন্দেকে প্রমেথিউসের সঙ্গে তুলনা করেন, উল্লেখ করেন পাঁচ পাঁচটা যুদ্ধ এবং সতেরোটা কু’দেতা-র কথা। নিশ্চয়ই ঠাট্টা নয় যখন তিনি জানান দু’বছর বয়সের আগেই লাতিন আমেরিকার কুড়ি লক্ষ শিশু মরে যাচ্ছে, উধাও হয়ে গেছে এক লক্ষ কুড়ি হাজার মানুষ—উপসালা নগরীর সমস্ত মানুষ উবে যাবার মতো ব্যাপার। জেল-হাজতে বন্দী গর্ভবতী মেয়েরা যে হাজার হাজার শিশু প্রসব করেছে তারা জানে না কোথায় গেছে তাদের সন্তান—তাদের বেচে দেওয়া হয়েছে দত্তক নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছে বা আটকে রাখা হয়েছে অনাথ আশ্রমে। এ রকম ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মহাদেশের প্রায় দুই লক্ষ নারী-পুরুষ নিহত হয়েছে আর নিকারাগুয়া, এল সালভাদোর আর গুয়াতেমেলার মতো তিনটি ছোট দেশে নিগৃহীত হয়েছে একলক্ষ মানুষ (অবস্থান কিছু পরিবর্তন হয়তো এখন হয়েছে, এই বক্তৃতা তো ১৯৮২ সালে দেওয়া)। চিলির জনসংখ্যার দশ ভাগ দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ সে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। উরুগুয়ের প্রতি পাঁচজনে একজন নির্বাসনে আছে।

আর কতো লেখা য়ায়। এক নোবেল পুরস্কারের ভাষণেই মার্কেজ সমগ্র মহাদেশের যে ছবি তুলে ধরেছেন তা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নকেও অতিক্রম করে যায় অথচ তা বাস্তব, মোটেই ঠাট্টা নয়। এই দুঃস্বপ্নের চেয়ে বহুগুণে আতঙ্কজনক বাস্তব—এই বাস্তবকেই তো বলতে পারি অতি-বাস্তব, কুহকী বাস্তব—একে প্রকাশ করার জন্যেই লিখন শৈলীর জাদু বাস্তব কৃৎকৌশল। জাদু বাস্তবের তত্ত্ব ঘরে বসে সভা করে বানাতে হয়নি, লেখকদের পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ করেও স্থির করতে হয়নি। মার্কেজকে তা করতে তো হয়ইনি। আগাগোড়াই তিনি বলে এসেছেন তিনি একেবারেই শাদামাটা বাস্তববাদী লেখক। যখন তাঁর বয়েস মাত্র কুড়ি বছর—সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হচ্ছিল, সাংবাদিকতার ভাষাতেই তাঁকে লিখতে হচ্ছিল দেশের বাস্তব ঘটনার বিবরণ—জাদু বাস্তবতা, কুহকী বাস্তবতা কোনো প্রশ্নই তো নেই তখন তাঁর কাছে, সেই ১৯৪৮ সালে, তখনই তো শুরু হলো ‘বোগোতাসো’। তারপর কুড়ি বছর ধরে একটা সময়—‘লা ভিওলেন্সিয়া’-র সময় কলম্বিয়ায় যা ঘটেছে ঠিক ঠিক বর্ণনা দিতে পারেন কোন উপন্যাস লেখক? কল্পনা আর উদ্ভাবনী ক্ষমতার কোন শীর্ষ স্পর্শ নৈরাজ্যিক অবস্থায়, ভিজিলান্তে বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিদ্রোহী গেরিলা, কম্যুনিস্ট গেরিলা—সরকার যাদের ডাকাত-দস্যু বলতো। ১৯৫৮ সালের দিকে মাসে তিনশ’ লোক মারা যেত। উদারপন্থী, রক্ষণশীল কোনো দলের উপরেই আর সাধারণ মানুষের বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না। সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে মার্কেজের গল্প উপন্যাস লেখার কাজটিও শুরু হয়েছে এই সময় থেকে। সাহিত্যকে তিনি আলাদা করবেন কীভাবে আর কীভাবেই বা উদোম নিষ্ঠুর রক্তক্ষরিত বাস্তবকে সরাসরি প্রকাশ করবেন সংবাদপত্রে আর আড়াল করবেন সাহিত্যে? তা হয় না। হয় না বলেই মার্কেজ সরাসরি বাস্তববাদী সাহিত্যিক বা আদৌ সাহিত্যিকই নন। বাস্তব, সাংবাদিকতা, সাহিত্য অন্তত এই কুড়ি বছর তাঁর জন্যে আলাদা ছিল না। আমাদের মনে পড়বে আশির দশকের গোড়ায় লেখা ‘একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি’ প্রকাশের আগে পর্যন্ত মার্কেজ ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ উপন্যাস বা বড়ো গল্পটিকেই তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা বলতেন। একথা বলার কারণ সম্ভবত তাঁর দেশের ঐ ‘লা ভিওলেন্সিয়া’-র অমোচনীয় কুড়ি বছর। মধ্য পঞ্চাশের ঐ সময়টাতেই লেখা তাঁর আর একটি উপন্যাস ‘অশুভ কাল’ (ইভিল আওয়ার) আমার হাতে পড়ে। ষাট না সত্তর দশকে এখন আর ঠিক মনে নেই। এই আমার প্রথম মার্কেজ পড়া। পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বা পটভূমি সম্বন্ধে মোটামুটি জ্ঞান না থাকলে অন্তত কথাসাহিত্যের যে কতোটা হারিয়ে যায় ‘অশুভ কাল’ পড়ে তা আমি বুঝতে পারি। সত্যি বলতে কি উপন্যাসটিকে আমার অসাধারণ মনে হয়নি। স্বাদটা লেগেছিল নিশ্চয়ই, প্রচণ্ড গরম, প্যাচপেচে বৃষ্টি, দুপুরের রোদে নির্জীব শহর, মানুষেরা দুপুর বেলায় ঘুমোয়, গল গল করে ঘামতে থাকে আর একটি ছোটো জনপদে কলম গেঁথে লেখকের দাঁড়িয়ে থাকা এসব তো ছিলই—আর ছিল আশ্চর্য রকম নতুন উপন্যাস রচনার কৃৎকৌশল। ইংরেজি অনুবাদেই এতটা, হিস্পানি ভাষায় সেটা কেমন একটুও আন্দাজ করতে পারি না। উপন্যাসে তেমন কিছু ঘটে না, খুবই নিচু গলায় বলা, হেমিংওয়ের ‘ফর হুম দি বেল টোল্স্’-এর কথা মনে পড়ে—কিন্তু তাতেও তো প্রচণ্ড ভায়োলেন্স এবং নাটকীয়তার কোনো অভাব নেই কণ্ঠস্বর নিচু হলেও। ‘অশুভ কাল’-এ নাটকীয়তা নেই ভায়োলেন্সের বিবরণ তো অতি সামান্য। ভারি সাধারণ মনে হয়েছিল উপন্যাসটিকে। আজ ঠিক উল্টোটিই মনে হয়—সাধারণ বাস্তববাদী মার্কেজ সিদ্ধির কোন চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন সেই মধ্য পঞ্চাশেই তার প্রমাণ শুধু ‘অশুভ কাল’-ই নয়, ‘মামাগ্রান্দের অন্ত্যেষ্টি’ এবং অবশ্যই ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’। ততোদিনে আমার ‘লা ভিওলেন্সিয়া’র কথা জানা হয়ে গেছে। কলম্বিয়া—যে দেশটি ১৮২০ সালে উপনিবেশী শাসনমুক্ত হয়ে স্বাধীন হয় সেই দেশটিতে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত অন্তত আশিটা গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। মার্কেজের দাদু উদারপন্থীদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। তারপরে তিরিশের দশকের সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির থাবা, কলাবাগানের প্রসার, ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি আর খামার মালিকদের অবিরাম শোষণ, তাদের নিজেদের স্বার্থে রেললাইন পাতা, ডাক ও তারের অফিস বসানো, শহরের পত্তন আর শ্রমিক বস্তির অনবরত বেড়ে চলা—আর কী যে সেই ভয়ংকর নির্যাতন—এসবই মার্কেজ তাঁর পরের লেখাগুলিতে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু মধ্য পঞ্চাশের লেখাতেও তো এই নিঃস্ব, আটকানো, সন্ত্রস্ত, ভবিষ্যৎহীন, অচল স্থবির কলম্বিয়া পটভ‚মি হিসেবে থেকে যায়। চোর বদমাশ বাটপার বেশ্যা অলস অকর্মণ্য প্রশাসন, বড়োলোকদের চাকর আমলার দল, শোষণকারীদের পেটোয়া মেয়র, শুধু বিবেক-পরিষ্কার-রাখা পাদরি, গুপ্ত সংগঠনের তরুণ আর তাদের গোপন সহায়তাকারী ডাক্তার উকিল—এইসব নিয়ে যে জনপদ তার কথা চিৎকার করে বললে কিছুই বোঝা যায় না। মার্কেজের লেখা এই জন্যে যেন রক্তে মৃদু বিষ মিশিয়ে দেবার মতো—যখন তা কাজ করতে শুরু করে তার হাত থেকে কোনোমতেই নিস্তার নেই। ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ আজকাল পড়তে গেলে শারীরিকভাবেই আমার দম আটকে আসে। প্রশাসনের নিষ্ঠুরতা অকৃতজ্ঞতা কতোদূর যেতে পারে, মানুষের কুষ্ঠরোগাক্রান্ত অঙ্গের অসাড়তাও তার কাছে হার মানে, যে জীবন মানুষকে কাটাতে হয় তা কতোদূর ম্যাড়মেড়ে হতে পারে আর সেই সঙ্গেই মানুষের মর্যাদাবোধ, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, কতোটা অজেয় হয়ে ওঠে আমি তা মার্কেজের এই মিত, শান্ত, নিরুদ্বেগ ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ বইটি থেকে জানতে পেরেছি। একটিমাত্র মুহ‚র্ত সৃষ্টি করার জন্যে মার্কেজ কখনো কখনো শত শত পৃষ্ঠার উপন্যাস লেখেন। ‘আর ততোদিন আমরা কি খাবো’—স্ত্রীর এই তিক্ত প্রশ্নের উত্তরে কর্নেল একটিমাত্র শব্দে উত্তর দেন, গু’। মার্কেজ লিখেছেন ‘পঁচাত্তর বছর লাগলো কর্নেলের—তাঁর জীবনের পঁচাত্তরটা বছর, পলের পর পল—এই মুহূর্তটায় পৌঁছুতে।’ মনে হতে পারে স্ত্রীর প্রশ্ন যেমন তিক্ত, কর্নেলের উত্তরও তেমন বিষদিগ্ধ। কিন্তু মোটেই তা নয়, হতাশা নয়, পরাজয় নয়, সংগ্রাম পরিত্যাগ নয়—কর্নেলের ‘নিজেকে শুদ্ধ লাগলো... প্রাঞ্জল লাগলো, অপরাজেয়’... কর্নেল মানুষের মর্যাদার উচ্চতম বিন্দুতে পৌঁছে গেলেন। এইখানেই মার্কেজের পৌরুষ, হীনতম অবস্থার মধ্যে মানুষের অনমনীয় সংগ্রামের সংকল্প তুলে ধরা। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রসঙ্গে মার্কেজ প্রায় একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ৩৪৮ পৃষ্ঠার বই ‘লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা’ উপন্যাসটি তিনি লিখেছেন ভালোবাসার এমনই একটি মুহ‚র্ত গড়ে তোলার জন্যে। পঁচাত্তর বছর বয়সের প্রেমিকা ফারমিনা ভাজার চোখের পাপড়িতে শীত-কুয়াশার প্রথম আভা দেখতে পেলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। তারপর আশি বছর বয়সের প্রেমিক ‘ফ্লোরেনটিনো আরিজাকে দেখলেন, দেখতে পেলেন তাঁর অজেয় শক্তি, নিঃশঙ্ক ভালোবাসা; বিলম্বিত অবস্থায় অভিভ‚ত ক্যাপ্টেন বুঝে গেলেন যে, এই-ই জীবন. মৃত্যুর অধিক, যার কোথাও কোনো সীমা নেই।’

‘এই হতচ্ছাড়া যাওয়া আর আসা আর কতকাল চলবে বলে আপনি মনে করেন’—ক্যাপ্টেনের এই প্রশ্নের জবাবে ফ্লোরেনটিনো আরিজা তিপান্ন বছর সাত মাস এগারো দিন-রাত্রি ধরে যে জবাবটি তৈরি রেখেছিলেন, সেই জবাবটি দিলেন, ‘চিরকাল।’

এইটাই আশ্চর্য যে, বিশাল পরিসরে মানুষের মর্মান্তিক মরণাধিক বর্ণনাতীত পরিণতি দেখেছেন যে মার্কেজ সেই তিনিই মনে করেন মানুষের পরাজয় অসম্ভব। কোনো মতেই তাকে জয় করা, আয়ত্ব করা, বশীভ‚ত করা যায় না। নোবেল পুরস্কার ভাষণে উইলিয়াম ফকনার বলেছিলেন, ‘আমি মানুষের অবসান মেনে নিতে অস্বীকার করি... আমার বিশ্বাস মানুষ শুধুই টিকে থাকবে না—সে সফলতা পাবে।’ ফকনারকে মায়েস্ত্রো বলে মেনে নিয়ে সেই নোবেল পুরস্কার ভাষণেই ফকনারের এই কথাটি উচ্চারণ করে মার্কেজও বলেছেন, ‘এই ভয়াল বাস্তবতার সামনে—সমস্ত মানুষী কালে যাকে মনে হয়েছিল নিছক কোনো কল্পলোক বলেই, আমরা যারা কথা বানাই, কাহন করি, আমরা তবু কিন্তু বিশ্বাস করি সবকিছু বিশ্বাস করবার দাবি ও অনুভ‚তি রাখি যে, এখনও এক বিকল্প/বিরুদ্ধ কল্পরাজ্য গড়বার কাজে আত্মনিয়োগ করার সময় আছে, এখনও সময় চলে যায়নি। এক নতুন ও সব-সমান করা কল্পরাজ্য... যেখানে যে-সব দেশ একশ’ বছরের নিঃসঙ্গতার দণ্ড পেয়েছে, শেষটায়, চিরকালের জন্যে, পাবে পৃথিবীতে এক দ্বিতীয় সুযোগ।’ (এইসব অনুবাদ প্রায় সবই মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের)

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে এখন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজ ইতিহাসকার, মনোশল্যবিদ কী যে বলা যায় জানি না। বোধহয় সবই বলা যায় এবং সেখান থেকেই আসছে শিল্পসাহিত্য বিচারের নতুন পথ খুঁজে বের করার কথা। সেই পথের নাম যাই হোক, আমরা কিন্তু জেনে গিয়েছি মার্কেজ কী নিয়ে লিখবেন আর কী নিয়ে লিখতে পারেন। কীভাবে লিখবেন সেটা পুরোপুরি জানি না—যা কিছু লিখেছেন তা নিয়ে হয়তো বলতে পারি কিন্তু শেষ বাক্যটি তিনি না লেখা পর্যন্ত আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয় কীভাবে তিনি তাঁর কথা লিখবেন। মার্কেজ-আলোচনা প্রসঙ্গে কুহকী বাস্তবতা, জাদু বাস্তবতা ইত্যাদি কথা বারবার উঠছে বটে, কিন্তু তার তেমন দরকার আছে বলে মনে হয় না, অন্তত মার্কেজের লেখা পড়তে গিয়ে তো নয়ই। মার্কেজ নিজে এসব আলোচনায় উৎসাহিত হতে পারবেন না, কারণ ঐতিহাসিকভাবেই কুহকী বাস্তবতা বা জাদু বাস্তবতার কথাবার্তা অনেক আগেই হয়ে গেছে সেই ১৯৪৩ সালে যখন আলেহো কার্পেন্তিয়ের ম্যাজিক রিয়ালিজম কথাটা বলেছিলেন। চল্লিশের দশকেই মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস কুহকী বাস্তবতা কিংবা অলৌকিক বাস্তবতার কথা তুলেছিলেন, ভিন্ন ভিন্ন কারণে এবং ইয়োরোপীয় পটের সঙ্গে ভিন্নতার পরিপ্রক্ষিতে সে আলোচনায় এখানে ঢোকার কোনো প্রয়োজন নেই। যে যাই বলুন না কেন, কার্পেন্তিয়ের কিংবা আস্তুরিয়াস জাদু বাস্তবতার তত্ত্ব নির্মাণ করে তার সঙ্গে মিলিয়ে নিজেদের লেখাগুলি রচনা করেছিলেন একথা একমাত্র বাতুলেই বলতে পারে আর সেই কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে জাদু বাস্তবতা ব্যাপারটা কোনোদিনই বোঝা সম্ভব নয়। তাহলে হুয়ান রুলফো, হুলিও কোর্তাসার, কার্লোস ফুয়েন্তেস বা মারিও ভার্গাস ইয়োসা লাতিন আমেরিকার এইসব লেখকের কেউ-ই কি জাদু বাস্তবতার ব্যবহার করেননি? যদি না করে থাকেন তাহলে জাদু বাস্তবতার কথাটা একটা অলীক কথা, ওর কোনো অস্তিত্ব নেই—আর যদি করে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে কলেছিলেন—কারও লেখাই তো কারও লেখার মতো নয়—সেক্ষেত্রে কয়েক রকমের জাদু বাস্তবতা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যে কথার কোনো অর্থ নেই বা অর্থ থাকা না থাকা সমান কথা। এসব কথা মার্কেজের ভালোই জানা। নিজের শিকড় তিনি চমৎকার জানতেন, ফকনারকে নিজের মায়েস্ত্রো বলেছেন, হেমিংওয়ের প্রতি তাঁর দুর্দম আকর্ষণের কথা জানিয়েছেন, তিনি ঠিকই জানতেন যে, তাঁর জন্যে লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যের কোনো অপেক্ষা নেই, যে বছর তাঁর ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ প্রকাশিত হয়, সেই ১৯৬৭ সালেই মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

আসলে মার্কেজ ক্রমাগত নিজেকে বদলে নিচ্ছিলেন। সময়টাও বদলে যাচ্ছিল। তাঁর নিজের দেশের জন্যেও বটে, তাঁর মহাদেশের জন্যেও বটে। ‘অশুভ কাল’ বা ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ লিখে তিনি একটা পয়সাও পাননি। সাংবাদিকতা পেশায় বিদেশে না খেয়ে মরতে বসেছিলেন। এসব একজন লেখকের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জীবন-মরণের বাস্তব ঘটনা হলেও লেখক-জীবনের ভিতরের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে একথা জোর করে বলার উপায় নেই যে, পঞ্চাশের দশকের সার্কেজ তেমন একটা বড়ো লেখক ছিলেন না, ষাটের দশকে ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ লিখেই তিনি হঠাৎ বড়ো লেখক হয়ে উঠলেন। জনপ্রিয়তা পান আর না পান, রুটি জুটুক আর না জুটুক ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’, ‘অশুভ কাল’, ‘মামা গ্রান্দের অন্ত্যেষ্টি’র লেখক ঠিক ততো বড়ো লেখক, ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের লেখক যতো বড়ো। নিজের লেখা সম্বন্ধে লেখকের মতকে আমরা বাতিল করতে পারি ঠিকই, তবে আমরা কি নিশ্চিত যে ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ উপন্যাসের অসাধারণত্ব তাঁর অন্য কোনো উপন্যাস অতিক্রম করে যেতে পেরেছে? তবে সন্দেহ নেই মার্কেজ বদলাচ্ছিলেন, সময় বদলাচ্ছিল; লেখক জানেন লেখা নিজে নিজেই বদলায়, নারকেল ঝুনো হওয়ার মতো, জীবনে একবার অন্তত দোয়াতের সমস্ত কালি উপুড় করে ঢেলে দিতে ইচ্ছে হয়; বাঁচা, জানা, ক্রোধ, মমতা ভালোবাসা ঘৃণায় ভরা জীবনকে এক জায়গায় সম্পূর্ণ ঢেলে দিতে হবেই লেখককে একবার না একবার। মেহিকো থেকে আকাপুলকো যাবার পথে সূর্যালোকে ঝলমলে উপত্যকায় গাড়ি চালাতে চালাতে তাঁর নিজের আর মহাদেশের বিশাল জীবন একসঙ্গে দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। লিখলেন তিনি ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’, নিজের ধরনটি ছাড়লেন না, মহাদেশজুড়ে ছুটে বেড়াবেন না তিনি, নিজেকে আটকে রাখবেন তিনি ছোট্ট জনপদটিতে, যেখানে তিনি বড়ো হয়েছেন, যা কিছু জানবার জেনেছেন, লাটিমের আল যেমন, এতটুকু মাটি ছুঁয়ে ঘুরতে থাকে, শুধু মহাদেশ কেন, তার সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত মানুষজাতি এই ছোটো জনপদ ঘিরে আবর্তিত হতে থাকবে। স্মৃতি, কল্পনা, ইতিহাস, সময়, সংস্কার, জাদুবিশ্বাস, উদ্ভট, অবাস্তব, অসঙ্গত ঘটনা-অঘটন একাকার করে দিয়ে যে বই দেখা হলো তাকেও মার্কেজ সাধারণ বাস্তববাদী উপন্যাসই বলেছেন। এমনকি এ রকম বাস্তবতার বিবরণের উৎস কী তা-ও তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন : ‘নির্বিকার মুখে, দিদিমা আমায় সারাক্ষণ আশ্চর্য ও আজগুবি সব গল্প শোনাতেন, অথচ মাথার চুল খাড়া হতো না, মনে হতো যা বর্ণনা করছেন তা যেন এইমাত্র দেখতে পেয়েছেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম তাঁর ঐ অবিচল নির্বিকার ভঙ্গি আর তাঁর চিত্রকল্পগুলোর ঐশ্বর্যই তাঁর গল্পগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতো। আমি ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ লিখেছিলাম আমার দিদিমার (গল্প বলার) কৌশল ব্যবহার করেই।’ (পেয়ারার গন্ধ; অনুবাদ : মা. ব.) মার্কেজ আরও বলেছেন, ‘আমরা লেখকরা টিয়ের মতো, বুড়ো হয়ে গেলে আমরা কেউ-ই আর কথা বলতে শিখি না।’ ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাসে এত অজস্র আজগুবি উদ্ভট ঘটনা আছে, ঘনিষ্ঠ কুটুম্বের মতো লৌকিক অলৌকিকের এমন ঘন ঘন যাতায়াত আছে, সময়ের এগুনো-পিছনো, থমকে থাকা, জনপদের অ্যামনেশিয়া, সময়কে একেবারে দাঁড় করিয়ে দেওয়া—এসব এমন টানাভাবে আছে যে, দম নিয়ে থেমে এসবের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ভাবার এতটুকু সময় মেলে না—ভাবার কোনো প্রয়োজন বোধ করা যায় না। যা ঘটে তা বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস্য, ঘটনার কর্কশ বাস্তব বর্ণনা এবং মুহ‚র্তেই তাকে অবাস্তব বানিয়ে তোলা—একই সঙ্গে পর্বতশিলার মতো কঠিন আর পারদের মতো তরল ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ হয়তো মার্কেজের দিদিমার মুখের গল্পের মতোই তবু সমালোচকরা ছাড়বেন না কাফকার ‘মেটামরফসিস’ এবং জিঁদ-এর ‘বিমেমব্রান্স অব থিংস পাস্ট্’-এর কথা মনে করিয়ে দিতে। এবং অবশ্যই কুহকী বাস্তবতার কথা তো আসবেই। অথচ তিন প্রজন্মের এই কাহিনী কী নিষ্ঠুর বাস্তব, মার্কেজের নিজের দেশের ইতিহাসের বীভৎস বাস্তবের কী ভয়ানক ছবি। সময়কে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল এই জনপদ এবং সময়ই তাকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে, কঠিন শাস্তি পেয়ে গেছে এই জনপদ, পরিবর্তন আনতে চেয়েছে যারা নিজেদের স্বার্থে—সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি—ততোদিনে সময় বন্ধ হয়ে গেছে—তাকে চালাতে গিয়ে যে চলেছে তছনছ আর অপবৃদ্ধির দিকে। মাকোন্দো পেয়ে গেছে কঠিনতম শাস্তি—একটি মূক শতাব্দী।

‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’র পরে মার্কেজ আর একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী উপন্যাসের পরিকল্পনা করেন ‘গোষ্ঠীপতির হেমন্ত’। কিন্তু এই দুটি বইয়ের মাঝখানেই লিখে ফেলেন আর একখানি ছোটো উপন্যাস। ইচ্ছে হলে বড়ো গল্পও বলতে পারা যায়, ‘সরলা এরেন্দিরা আর তার নির্দয় পিতামহীর অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনী’। এই গল্পটিকে একটি উপকাহিনী হিসেবে আমরা আগেই ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতার মধ্যে দেখেছি, যেমন মার্কেজের মধ্যে প্রায় দেখা যায় লেখায় লেখায় মেশামেশি, গল্প-উপন্যাস হচ্ছে বা উপন্যাসের মধ্যে গল্প ঢুকে পড়েছে। যেমন মাকোন্দো হাজির হচ্ছে নানা রচনায়। এই লেখাটি কি ঐ দুটি বিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে ছোট্ট একটা সেতু হতে পারে? ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’র জাদু বাস্তবতা এখানে পুরোপুরি আছে, হয়তো আরও পরিণত আর একেবারে চরম পরিণতি ‘গোষ্ঠীপতির হেমন্ত’র মধ্যে। ‘সরলা এরেন্দিরা...’ আমাকে অসম্ভব কষ্ট দেয়, আমি কিছুতেই এই অসহ্য নিষ্ঠুর কাহিনীটি পড়তে পারি না অথচ এই রচনারীতি এমনিই অবাস্তবতার উপাদানে, স্বপ্নে, কৌতুকে, শ্লেষে মজায় পরিপূর্ণ যে, আবেগ কাজ করার কোনো রাস্তাই থাকে না। তবু, হতে পারে, আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতায় এই কাহিনী আমি কিছুতেই পড়ে উঠতে পারি না, আমাকে কেবলই চশমা মুছতে হয়; ঐ যে এরেন্দিরা, কিশোরী, যার স্তন দুটি কুকুরীর মতো; দুশো কুড়ি পেসো আর কিছু খাবারদাবারে যার কৌমার্যের দাম ঠিক হয়ে যাবার পর মুদির দোকানদার তাকে ঘরটার পিছন দিকে নিয়ে যায় আর একটি চড়ে তাকে মাটি ছাড়া করে ফেলে—যে জাদুকাঠি বুলিয়েই মার্কেজ এই গল্প লিখুন না কেন, তা পড়া অতি কঠিন। এরপর থেকে যা ঘটতে থাকে তার কথা তো বলাই বাহুল্য। এ কিসের গল্প? এই লক্ষবার বৈধ বলাৎকার? একি নারী নির্যাতন? এ কি নারীর নারী নির্যাতন? এই গল্প লিখে মার্কেজ পৃথিবীর সমস্ত সক্ষম পুরুষের পুরুষাঙ্গ বিকল করে দিয়েছেন। এমন ঘৃণিত বস্তু কেন থাকবে মানুষের দেহে!

আমি পড়তে পারি আর না পারি ‘সরলা এরেন্দিরা...’ তো আমি যা নিয়েছি শুধু তাই নয়। এই কাহিনীর বহু স্তর, বহু ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা সম্ভব। মার্কেজই তো বলেছেন, তিনি বাস্তব গল্পই লেখেন, তবে পাঠকের হাতে ধরিয়ে দেন একটি আতশ কাচ যাতে তিনি বাস্তবকে আরও ভালোভাবে দেখতে পান। ‘সরলা এরেন্দিরা...’ কি দখলের গল্প? কে কাকে দখল করতে পারে? দিদিমা এরেন্দিরাকে সান্ত¡না দেয়, যখন সে তাকে দেখাশোনার জন্যে থাকবে না, তখন সে নিজেই হবে গণ্যমান্য মানুষ, কতো মানুষ তার কাছে গোলামি করবে। তার মানে এরেন্দিরা এখন হাজারবার দখল হচ্ছে, একসময় সে নিজেও দখলদারির অধিকার পাবে। দিদিমাকে কী চমৎকারভাবেই না এরেন্দিরা আর উলিসিস্ নিকেশ করে দেয়। মার্কেজ বলেছেন : ‘আমি বলবো, নারী ও পুরুষ দুয়ের ক্ষেত্রেই, ম্যাচিসমো আসলে অন্যকারও অধিকারকে আত্মসাৎ করে নেওয়াই বোঝায়। এমনই সহজ সরল ব্যাপারটা।’ পশ্চিমের সাধারণ নারীবাদী আন্দোলনের কি বিপরীতে দাঁড়ায় কথাটা! কথাটা দখলদারিত্বেরই বটে। রক্তমাংসের স্থ‚ল দেহ বলে দখলদারিত্বের কথাটা বেশি মনে আসে, আদতেই তা দখলদারিত্বের। নারীর উপর আজ পুরুষের যে নির্লজ্জ নগ্ন ও বীভৎস দখলদারিত্ব আছে, সেটা উল্টে গিয়ে পুরুষের উপর নারীর ঐ একই রকম দখলদারিত্বে মানুষ নামক প্রজাতির সমস্যার কোনো সমাধান নেই, মানুষকে মুক্ত করাটাই হলো একমাত্র কাজ।

‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ থেকে ‘সরলা এরেন্দিরা...’ একটা সেতু বটে—

রচনারীতিতে পাকিয়ে আনা—তবে ‘গোষ্ঠীপতির হেমন্ত’-এ মার্কেজ আর একবার মহাদেশের রাজনীতির দিকে চোখ ফেরাতে মনস্থ করলেন। হিস্পানি ভাষায় ‘গোষ্ঠীপতির হেমন্ত’র রচনারীতি এবং কৃৎকৌশল কেমন দাঁড়িয়েছিল আমার পক্ষে তা বলা একটুও সম্ভব নয়—তবে আমি ভেবেছি এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের বাংলা ভাষান্তর সম্ভব কিনা। হয়তো সম্ভব—কিন্তু তা পাঠ্যবই কিনা আমি তাতে নিঃসন্দেহ নই। এই বইয়ের অন্তহীন জটিলতা আমাদের স্রেফ হতবুদ্ধি করে দেয়। ভাষার জট খোলা অসম্ভব, তা ছেদহীন, প্রায় বিরামচিহ্নবিহীন, সময়ের হিশেব করা অসম্ভব কারণ তাকে সরাসরি অস্বীকারই করা হয়েছে, এক অন্তহীন স্থির সময় যার মধ্যে ঘটনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে আর বিষয়টি যে কী তা এককথায় বলার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। স্পেন ও পর্তুগালের স্বাধীনতা থেকে প্রায় সমস্ত উনিশ শতক জুড়ে মুক্ত হয়ে লাতিন আমেরিকার স্বাধীন দেশগুলিতে অকল্পনীয় রক্তপাতের সঙ্গে সঙ্গে স্বৈরশাসনের যে মহাদেশ-জোড়া অভিজ্ঞতা হয়—কোটি কোটি সাধারণ মানুষের পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্বৈরশাসনেরই এক ধরনের ব্যবচ্ছেদ বলতে পারা যায় ‘গোষ্ঠীপতির হেমন্ত’ উপন্যাসটিকে। কিন্তু একথায় বইটি সম্বন্ধে প্রায় কিছুই বলা হলো না আমার জানা আছে। মার্কেজ মহাদেশকে আবদ্ধ আটকানো মনে করেন, বারবার সময়কে তিনি থামিয়ে দেন। অনড় করে দেন ইতিহাসকে—যেন ইতিহাসই শুরু হয়নি। লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে যেমন দীর্ঘমেয়াদি অকহতব্য স্বৈরশাসকদের দেখা মিলতে থাকে, তাদের শাসনই প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় স্থির সময়ের। তিরিশ চল্লিশ বছরের এক একজন একনায়কের শাসনের আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে? একেবারে কিছুই না ঘটা। স্বৈরশাসকের মৃত্যু ঘটে না—‘মৃত্যুও তার কাছে মৃত’। কাঁটা যখন নড়লো, সময় যখন শুরু হলো একমাত্র তখনই ‘গোষ্ঠীপতির হেমন্ত’ উপন্যাস সমাপ্ত হলো। কিন্তু তার পরে যা ঘটেছে তাতে কি খুশি হতে পেরেছেন মার্কেজ? লিখেছেন তিনি আরও তিনটি উপন্যাস; ‘একটি পূর্ব ঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি’, ‘কলেরার সময়ে প্রেম’ এবং ‘আপন গোলক ধাঁধায় সেনাপতি’।

‘একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি’-কে মার্কেজ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলেন। সত্যি ঘটনা নিয়ে লেখা। এটি লেখার জন্যে তিরিশ বছর অপেক্ষা করেছিলেন তিনি। এই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে আমার ‘অশুভকাল’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে যায়। একটি ছোটো শহর থমথম করছে, মানুষেরা কথা বলছে না, শহরের মাটির তলাটা যেমন গলন্ত আগুনে ভরা, মাটি ফেটে তা বেরিয়ে আসছে না, কিন্তু তাপটা টের পাওয়া যাচ্ছে।... ‘কালপঞ্জি’-তে সান্তিয়াগো নাসারকে মেরে ফেলা হবে আনহেলা ভিকারিও নামে একটি মেয়ের কৌমার্যহানির অপরাধে। একথা গাঁয়ের সবাই জানে, জানে না শুধু যাকে মেরে ফেলা হবে সেই সান্তিয়াগো নাসার। যেদিন তাকে মারা হবে তার আগের রাতেই আনহেলার বিয়ে হয়ে গেছে এক ধনী রক্ষণশীল জেনারেলের যুবকপুত্রের—যুবকটি গাঁয়ে আগন্তুক এবং ঠিক জানেও না কেন সে আনহেলাকে বিয়ে করবে। বিয়ের রাতে সকলের সঙ্গে সান্তিয়াগো নাসারও নিমন্ত্রিত ছিলো, আনহেলার যে দুই ভাই তাকে হত্যা করবে তারাও নাসারের সঙ্গে সারারাত খানাপিনা হুল্লোড় করেছে। নাসার সত্যিই আনহেলার কৌমার্য নিয়েছিলো কিনা তা কেউ জানে না, উপন্যাসে তার কোনো জবাব নেই। সমস্ত শহর জানলেও কেউ কথাটা নাসারকে জানায়নি কেন তারও কোনো জবাব পাওয়া যায় না। সে কি আরব বংশোদ্ভ‚ত বলে? হত্যাকাণ্ডটি ঠিকমতো ঘটে যায়। মার্কেজ কী যে অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে কাহিনীট লিখেছেন তা একমাত্র বইটা পড়েই জানতে হবে। পূর্বঘোষিত হলেও এ গল্প নিয়তির গল্প নয়, শাদামাটা বাস্তবের গল্পই বটে। সব মিলিয়ে ফাঁদের গল্প। মানুষ এক ফাঁদ থেকে আর এক ফাঁদে পা দিচ্ছে, তারপর এক সময় পুরোপুরি আটকে পড়ছে। ইতিহাসের ফাঁদ, অর্থনীতির ফাঁদ, স্বৈরতন্ত্রের ফাঁদ, সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদ, ভাগ্যের চাকার ফাঁদ, সম্পূর্ণ নির্দোষের অজানা ফাঁদা—আর সেই বিশাল মহাদেশীয় ফাঁদ যার হাত থেকে নিস্তার নেই আজকের পৃথিবীতে কারও। তারই গল্প লেখেন বটে সেই মার্কেজ যিনি মানুষের অবসান অস্বীকার করেন আর বিশ্বাস করেন এখনও সময় আছে, সময় আছে দ্বিতীয় সুযোগের, সময়ের মধ্যে ঢোকার। 


সূত্র : বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন