বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

কার্লোস ফুয়েন্তেস' এর প্রবন্ধ : উপন্যাসের মহিমা

অনুবাদ : আফসানা বেগম


বেশি দিন হয়নি, নরওয়ের একাডেমি সারা পৃথিবীর একশো জন লেখককে একটি মাত্র পশ্ন করেছিল: এ পর্যন্ত লিখিত সমস্ত উপন্যাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কোনটি? একশ’ জনের মধ্যে পঞ্চাশ জনেরই উত্তর ছিল: মিগুয়েল দ্য সার্ভান্তেস সাভেদ্রার লেখা ‘দন কিহোতে দ্য লা মাঞ্চা’। এ খবরটা সত্যিই বলতে গেলে ধসিয়ে দেওয়ার মতো, যেখানে পরবর্তী অবস্থানগুলোতে ছিল দস্তয়ইয়েভস্কি, ফকনার আর গার্সিয়া মার্কেজ।
বিতর্কটি চমৎকার একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়। কোনটি বেশি প্রয়োজন, দীর্ঘদিন ধরে বইটি বিক্রি হওয়া—নাকি অনেক বেশি সংখ্যায় বিক্রি হওয়া? সর্বাধিক সংখ্যায় কোনো বই যখন বিক্রি হয়, তা কেন এত বেশি মানুষ কেনে? বহুবছর ব্যাপী যখন একটি বই বিক্রি হতে থাকে, তা কেন মানুষ এতদিন ধরে পড়ে? অবশ্য এটা সত্যি যে, এই প্রশ্নগুলোর এমন কোনো বাঁধাধরা উত্তর নেই যেটা কিনা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

১৬০৫ সালে দন কিহোতে যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন সেটা ছিল সর্বাধিক ও বিশাল সংখ্যায় বিক্রিত উপন্যাস। এমনকি আজও বিক্রি হয়ে চলেছে। নেপলিয়নিক ভালোবাসা, যুদ্ধ আর পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘকায় উপন্যাস হার্ভি অ্যালেনের ‘অ্যানথনি অ্যাডভার্স’ প্রকাশের বছরের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের তালিকায় শীর্ষে ছিল। অথচ উইলিয়াম ফকনারের ‘অ্যাবসালোম, অ্যাবসালোম’ (১৯৩৬)-কে যদি আমরা ওইসব বিশাল সংখ্যায় বিক্রিত বইগুলোর সাথে তুলনা করি তবে বলতে হবে তা অবিশ্বাস্যরকম কম সংখ্যক কপি বিক্রি হয়েছিল।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ভালো বই বিচার করার জন্য বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। যদিও ভালমন্দের ব্যাপারে সময় মাঝে মাঝে সঠিক কিছু বলতে পারে না, কিন্তু সময় ধীরে ধীরে বিক্রি করে তা দেখিয়ে দেয়। সংখ্যার দিকে বিচার করলে ধরে নেয়া যায়, সার্ভান্তেস তার সময়ের সমর্থন পেয়েছিলেন, এবং তিনি ছিলেন তাঁর সময়কার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, যেখানে চেতনায় আলোড়ন তোলার জন্য যিনি ‘ভাগ্যবান সামান্য কজনের জন্য’ লিখতেন সেই স্তাঁদালের বইপত্র তার জীবদ্দশায় সামান্য কিছুই বিক্রি হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর সাহিত্য সমালোচক অঁরি মার্তিনে মৃত্যুর আগে প্রাপ্ত বালজাক পুরস্কার পাওয়ার সময় সমালোচনার মাধ্যমে স্তাঁদালের জন্য ধন্যবাদটুকু রেখে যান অবশ্য ।

কিছু কিছু লেখক এক সময় প্রচুর জনপ্রিয়তা পান তারপর আবার চিরদিনের জন্য হারিয়ে যান। গত পঞ্চাশ বছরের সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায় সামান্য কিছু ‘জীবন্ত বই’ ছাড়া বাকি সব ‘মৃত বইয়ে’র মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে। যদিও ইচ্ছে করলেই চিরকাল টিকে থাকার মতো বই লেখা যায় না, অন্যদিকে একমাত্র অমর হওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ বই লেখে না। কখনও আবার লিখে উপহাসের পাত্রও হতে হয়, আর তারপর লেখাটির মৃত্যুও থাকে অবধারিত। প্লেটোর দৃষ্টিতে অমর মানেই অসীম। আর সময়ের ক্ষেত্রে এই সীমাহীনতা যেন একরকম থমকে যাওয়া। আর উইলিয়াম বেøক তো পুরো ব্যাপারটাকে একেবারে সহজ করে বলেছেন যে, সময়ের সাথে সম্পর্কিত কাজকে ভালবাসলেই চিরকাল টিকে থাকা যায়।

এখন, সময়ের সাথে সম্পর্কিত কাজটি আসলে কী। এতক্ষণ পর্যন্ত যেসব সাহিত্যিকের কথা বলেছি তাদের প্রত্যেকের কথা আলাদা করে ভাবলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। তারা যে-সময়ে যে-সাহিত্য রচনা করছেন তাতে সেই সময়টাকে ধরে রেখেছেন। এটা আসলেই বিস্ময়কর আর অবাক না হয়ে উপায়ও নেই। এক একটা সময় এক একটা উপন্যাস কথা বলে ওঠে, বলে সে-সময়টা কী করে লেখককে উপন্যাসটি লিখতে বাধ্য করেছিল; বলে সে-সময়ের সংস্কৃতির প্রতি লেখকদের সচেতনতার কথা। যেমন, মিলান কুন্দেরা তার সাম্প্রতিক রচনা ‘দ্য কার্টেন’-এ দেখিয়েছেন, কী করে একটা ঘটনার মধ্যে একজন ঔপন্যাসিক বসবাস করেন, এটা যেন নিজের দেশ বা মাতৃভাষার ভেতরে বেড়ে ওঠার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংস্কৃতি যেখানে র‌্যাবেলে, সার্ভান্তেস, স্টার্ন আর দিদেরোর মতো লেখকরা একই পরিবারের সদস্য। আর গ্যোটের স্বপ্নে তো সেই পরিবার একটিই বাড়িতে বাস করে যার নাম বিশ্বসাহিত্য। গ্যোটের মতে বিশ্বসাহিত্য এমন এক জিনিস যা একজন সাহিত্যিককে অন্য যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলিয়ে কেবল স্বাধীনভাবে নিজের দেশের অভ্যন্তরের বিষয়ে রচনায় মগ্ন রাখবে। আর এভাবেই সে বেড়ে উঠবে।

এটা যদি সত্যি হয়, তবে সাহিত্যে যে বড় বড় অবদানগুলোর মধ্যে সাহিত্যিকরা বেড়ে উঠেছেন, যে-সংস্কৃতি তাদের সিক্ত করেছে, লেখায় তার ছাপ থাকবেই। আর নতুন লেখায় আগের লেখার ছায়া থাকবে, যেমন পুরোনো সংস্কৃতির হাত ধরে নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়। নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে পুষ্টি প্রদানের উপর সাহিত্যের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে। যেহেতু এ বছর ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসের চারশো বছর পূর্ণ হলো আর আমি মনে করি—সার্ভান্তেসের এই বইটি উপন্যাস নামক শিল্পাঙ্গিকের ভিত্তিপ্রস্তর, যেটি নিয়ে সেই সতেরো শতক থেকে জল্পনাকল্পনা হয়ে আসছে, আজ সেই বইটির গোড়ার দিককার কিছু কথা বলে আমি দায়মুক্ত হতে চাই।

সার্ভান্তেস এমন এক সংস্কৃতিতে বাস করতেন যেটা আসলে ছিল একটা অচলায়তন। স্প্যানিশ বিপ্লবের পথিকৃত ইরাসমুস আর রটর্ডামও জন্মেছিলেন সেই একই সংস্কৃতির মধ্যে। তরুণ শাসক চার্লসের শাসনামলে কেউ সামান্য জ্ঞানের আলো জ্বালালেও যেন স্বৈরাচারী হাওয়ার দাপটে তা নিভে যেত।

নতুন আইন করে জ্ঞানচর্চা থামিয়ে দেয়া হতো। ট্রেন্টের কাউন্সিল গঠনের পর রোমান ক্যাথলিক চার্চের মাধ্যমে আইন করে ইরাসমুসের সমস্ত সাহিত্যকর্ম বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হলো। তাই পৃথিবীকে ইরাসমুস যা দিতে পারত তা আড়ালেই রয়ে গেল।

সার্ভান্তেস অল্প সময়ের ভেতরেই সেই নিষিদ্ধ-আদর্শের ভক্ত হয়ে গেলেন। ইরাসমুস বিশ্বাস আর বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শুধু অন্ধবিশ্বাসের নয়, বাস্তবতার উপরে চাপিয়ে দেয়া ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধেও কথা বলেছিলেন। এ কারণে সার্ভান্তেস, যিনি কিনা স্প্যানিশ ইরাসমুসের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু ইরাসমুসের প্রতি তার এই আনুগত্য বরাবরই লুকিয়ে রাখতেন।

‘প্রেইজ অফ ফলি’ আসলে ‘দন কিহোতে’রই বন্দনা কারণ নিজের অজান্তেই তিনি ইরাসমুসের নির্মিত জগতে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন—যেখানে সব সত্যই শুধু সম্ভাবনা মাত্র—হতেও পারে আবার না-ও হতে পারে, এমন। সবকিছুই যেন অনিশ্চয়তার ঘোরে ¯œাত আর সেখানেই জন্মের অধিকার পেয়েছিল আধুনিক উপন্যাস।

যেহেতু সার্ভান্তেস নিজের মধ্যে ইরাসমুসের আদর্শের প্রভাবের কথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করতে পারেননি, তাই আরও দৃঢ়ভাবে আত্মায় লালন করেছেন। তার লেখায় ‘লা মাঞ্চা’-র ফলি যেন রটর্ডেমের প্রতিফলন আর ‘লা সাগিসি’র বিবাহ, ‘লা ইনসারভিটিউড’ এসব আমাদের শেখায় উপন্যাস কাকে বলে। অনেক বোঝা না-বোঝার মধ্যেও সত্যি আমাদের একেবারে কাছে টেনে নেয়। স্পেনের কোনো দূরবর্তী অঞ্চলের এক অখ্যাত গ্রাম সবাই যার কথা ভুলেই গেছে। অথবা জায়গাটির বলার মতো কোনো নামই ছিল না: ("En un lugar de la Mancha de cuyo nombre no quiero acordarme") ‘এন উন লুগার দে লা মাঞ্চা দে কুইও নম্রে নে কিয়েরো একর্দার্ম’। একজন অজানা লেখকের লেখা। কে সেই লেখক? সার্ভান্তেস? দে সাভেদ্রা? সাঈদ আহমেত বেনেনগেলি? নাম না জানা স্পেনের মুসলিম কোনো লেখক, যে-নিজের হাতেই বই লিখে ফেলত কারণ ছাপানো তখনও শুরু হয়নি? নাকি শক্ত দড়ির উপর দিয়ে চোখ বেঁধে হাঁটায় পারদর্শী ‘জিনেস দে প্যাসামুন্তে’ পুতুলনাচ দেখানোর ওস্তাদ-নির্দেশক পেদ্রোর মতো ছদ্মবেশে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছিল? বইয়ের উপর

লেখকের নাম না থাকলেও তার ধ্যান-ধারণা কিন্তু চাপা থাকেনি। তবে সত্যি, নামটা নিয়ে অনেক বিতর্ক চলেছিল, ‘দন কিহোতে’ কি তবে বখে যাওয়া কোনো সাধারণ স্প্যানিশ মানুষ যার নাম আলোন্সো কিহানো অথবা কিহাদা? কিংবা কেজাডা? নাকি ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উলটো যে, সে একজন গোল্লায় যাওয়া উচ্চবংশীয় ভদ্রলোক বা সাহসী সৈন্য, যে এখন সৈন্য হিসেবে অন্যায় কিছু করছে? অথবা স্প্যানিশ কোনো হিরো যে নিজেকে সবার চোখে নীচে নামিয়ে ফেলছে?

নামে কী আসে যায়? যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো ‘দন কিহোতে’-র মধ্যে তুলনামূলক দৃশ্যাবলি একটি উপন্যাসের স্বাভাবিক পরিণতির দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়। ডালসিনিয়া হয়ে যায় অ্যালডনজা, বিপন্ন অবিবাহিত তরুণী পরবর্তী কালে হয় রাণী, ঘটনাপ্রবাহে কখনও কান্নায় ভেঙে পড়ে আবার কখনও তুমুল সাহসিকতার সাথে যুক্তিতে অবিচল থাকে। উচ্চবংশীয় অশিক্ষিত লোক গভর্নর হয়ে বসে। ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসে অদেখা শত্রুদেরও ছিল গালভরা সব নাম, যেমন হাতা গুটানো বৃহদাকার পেন্টাপলপিন, এত জীবন্ত যেন লেখকের নিজের শত্রæও সেই চরিত্রের মধ্যেই নিহিত ছিল। আবার অবিবাহিত স্যানসন কারাসকো যাকে দন কিহোতের জটিল পটভূমিতে আনার জন্য আয়নায় দেখা যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আর দেশটি হলো কিহাদা বা কিহানো অথবা কেজাডা, তবে এটা ঠিক যে যুদ্ধক্ষেত্রে তার নাম কিহোতে যা একেবারে যোদ্ধার সাজে সোজা চলে আসে এই সেরা উপন্যাস নির্বাচনের আয়োজনে। রাতারাতি মানুষের সমস্ত দুঃখের সাথী হয়, অথবা হয় সাহসিকতার প্রতীক, সিংহের মতো বলবান। আবেগঘন দৃশ্যে কুইজাডা আবার বিরক্তি তৈরি করতে দন অ্যাজোট, যে কিনা মিস্টার হুইপ চরিত্রে চলে আসে রাস্তার ধারের দোকানে, রাজবাড়িতে। কখনও আবার কৌতুক করতে দন জিগটে হয়ে আসে যাকে বলা হয় মিস্টার হ্যামবার্গার।

‘দন কিহোতে’ উপন্যাসে চরিত্রের নাম, জায়গার নাম এমনকি লেখকের নাম সম্পর্কেও সঠিক কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। সার্ভান্তেসের বিস্ময়কর সৃষ্টিতে অচিন্ত্যনীয় পরিণতি ছাড়াও এক ভয়াবহ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কাহিনি মিশে আছে। এটা যে কোনো একটি জায়গার কাহিনি হতে পারে। যেমন, শহরের মাঝখানে একটি জায়গার কথা বলা হয়েছে যেখানে সবাই এসে জড়ো হয়ে কথা শুনতে পারে কিন্তু কারও কথা বলার কোনো অধিকার নেই। এরকম জমায়েতের জায়গা তো যে কোনো শহরেই থাকতে পারে; আমরা তাকে ডাকতে পারি লিউ কোমান, লুগা কমন, সেন্ট্রাল প্লাজা, পলিফোরাম, পাবলিক স্কয়ার, যার যেমন খুশি।

ক্লডিও গুইয়েনের ভাষায়, সার্ভান্তেসের হাতে উপন্যাসের স্বাভাবিক ধারাটি আরম্ভ হয়েছিল। ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসে সবাই একটি খোলা জায়গায় মিলিত হয়। এই ব্যাপারে সমধর্মী না হলেও সাঙ্কো পাঞ্জা আর দন কিহোতে যেন এক কাতারে দাঁড়ায়। লাজারিও দ্য তর্মেজকে অ্যামাদিস অফ গাউল-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এখানে বর্ণনার স্বাভাবিক গতিকে ভেঙে ফেলা হয়। কাহিনি একই জায়গায় যেন ঘুরতে থাকে, কখনও লাফিয়ে সামনে আগায়, কখনও আবার পেছনের ঘটনায় ফিরে যায়। পড়লে মনে হয় একটি ঘটনাকে থামিয়ে দিয়ে মাঝে আরও কয়েকটি ঘটনা আবেগবাহিত হয়ে ঢুকে যাচ্ছে। ঘটনাবহুল মুর-জাতীয় আর বাজেন্টাইন গল্পের সাথে সাধারণ তীব্র ভালোবাসার গল্প যেন এই উপন্যাসে এক ছন্দে বোনা হয়ে যায় আর চূড়ান্তভাবে উভয়ের সমন্বয়ে আত্মপরিচয় ঘটে এবং এর সঙ্গে লিখিত বাস্তবতার তফাত বিষয়ক একটা প্রস্তাবনা উপন্যাসে হাজির করা হয়।

সার্ভান্তেসের আগে কাব্যগ্রন্থে ঘটনার বিবরণ যেন শুধু অতীতের একটি ঘটনা অথবা বর্তমানের কোনো রোমাঞ্চকর কাহিনিকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যেত। সার্ভান্তেসই প্রথম অতীত আর ভবিষ্যতকে একসাথে মিলিয়ে লেখা শুরু করলেন যা কিনা উপন্যাসকে একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল। যেমন, এখানে দেখা যায়, সবাই এমন একজন মানুষের সম্পর্কে জানে যিনি বই পড়ে আর তারপর সেটিই একটি বইয়ের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় যেখানে মানুষটি জানে তার ব্যাপারে সবাই পড়ছে।

দন কিহোতে বার্সেলোনার একটি ছাপাখানায় গিয়ে দেখতে পান যে তারই বই ছাপানো হচ্ছে, ‘এল ইনজিনিওসো হিদালগো দন কিহোতে দে লা মাঞ্চা’ তখনই আমরা বুঝে যাই যে, পাঠকদের জন্য নতুন পৃথিবী উন্মোচিত হচ্ছে। পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারে বলে তখন থেকে ক্ষমতাধর গোষ্ঠী, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দল অথবা সামাজিক জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বই পড়ার ব্যাপারটি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।

সার্ভান্তেসের সময় থেকে শুরু করে আমাদের সময় পর্যন্ত এভাবে সাহিত্য সৃষ্টি আর পড়ার অভ্যাস বাড়তে বাড়তে আজ উপন্যাস যেন এক গণতান্ত্রিক পথে পরিণত হয়েছে যেখানে সবাই নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী মানস-ভ্রমণ করতে পারে। নিজেকে আর চারপাশের পৃথিবীকে কতভাবেই না ব্যাখ্যা করতে পারে। নিজের সাথে বাকি সবার সম্পর্কের উপর আলোকপাত করে দেখাতে পারে আমার সাথে তোমার সম্পর্ক কী, অথবা কারও সাথে আমাদের।

ধর্ম তো মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া নিয়ম আর রাজনীতি হল আদর্শের জালে বাঁধা পড়া অবস্থা। কিন্তু সাহিত্য এমন এক জায়গা যেখানে সবাই সমানভাবে মতামত পেশ করতে পারে। লেখক পরিচয় গোপন করলেও উপন্যসের বিষয় যদি এমন হয় যে তা সকলকে প্রভাবিত করে, তবে সারা বিশ্বের সাথে তার একাত্মতা গড়ে ওঠে।

বাস্তবতার কোনো নির্দিষ্ট ছক নেই, আবার তা বদলেও যায়। আমরা যদি বাস্তব অবস্থাটা কখনও সংজ্ঞায়িত করতে না পারি তো অন্তত তার কাছাকাছি নিশ্চয়ই একটা কিছু দাঁড় করাতে পারি। একটা উপন্যাস যদি সামান্য কিছু ব্যাতিক্রম আনতে পারে তাহলেই প্রমাণিত হয় যে, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লেখক সোচ্চার। রাজনৈতিকভাবে লেখকরা যদি এত নগণ্য আর গুরুত্বহীন হয়ে থাকে তবে কেন তাদের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন নিয়মকানুনের কারণে হেয়প্রতিপন্ন হতে হয়, যেন মনে হয় তারা সত্যি সত্যি গুরুত্বপূর্ণ? এই অসামঞ্জস্যতার কারণে সাহিত্যে রাজনীতির নিগূঢ় বৈশিষ্ট্যটি ফুটে ওঠে।

লেখক একটি শহর, শহরের পুলিশ, ক্রমবর্ধমান অথচ স্থায়ী জনগোষ্ঠী সকলের বিষয়ে লেখেন। ক্ষমতায় বহাল দলটি, যদিও তারা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সবসময় মনে করে তারা আজীবন সেখানেই থাকবে; এই ক্ষমতায় থাকা দল আর তাদের ক্ষমতার অপব্যাবহারের কাহিনিও লেখকরা লেখেন।

কাফকার কাহিনি এমন এক ক্ষমতার কথা বর্ণনা করে যা নিজেই কল্পিত ঘটনাকে শক্তিশালী করে তোলে। ‘দ্য কাসল’ উপন্যাসে ক্ষমতার কথা এমনভাবে এসেছে যে, মনে হয় অধিষ্ঠিত দুর্বল মানুষেরা রাজপুরীর বাইরের মানুষগুলোর কল্পনার দৃঢ়তা থেকেই শক্তি পেয়ে যায়। মানুষের স্বপ্ন ক্ষমতার দখলদারিত্বে বাধা দেয়, স¤্রাটকে উলঙ্গ করে ছেড়ে দেয়া হয়। আর আধিপত্যহীন লেখককে, যে কিনা বিষয়টা সর্বসমক্ষে নিয়ে আসে তাকে, তখন তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশান্তরী হতে বাধ্য করা হয়। সবাই যখন একসাথে আগুন জ্বালিয়ে উৎসবে মগ্ন, সম্রাটের দর্জি তখন তার জন্য নতুন পোষাক তৈরিতে ব্যস্ত।

সুতরাং লেখায় যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার কুপ্রভাব দেখানো যায় তবে সেটা সত্যি অসাধারণ। তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় একজন লেখকের তেমন কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই। অবশ্য একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে রাজনৈতিকভাবে সে দেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকে। কিন্তু তার ভেতরে থাকে নিজের শহরকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার প্রান্তিক সম্ভাবনা; নিঃশব্দে সে যা করার করে যায়, হয়ত থেমে থেমে কাজ করে আবার যদিও সরাসরি কোথাও অংশগ্রহণ করে না। এভাবেই ব্যাক্তিগত থেকে সমষ্টিগতভাবে লেখকরা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

সুতরাং সেই র‌্যাবেলে আর সার্ভান্তেসের যুগ থেকে শুরু করে গ্রাস, গয়তিসোলো আর গোর্ডিমার পর্যন্ত, গল্পের ধাঁতই হলো বানানো দৃশ্যপট যা আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী হলেও সত্যবর্জিত নয় (paradox of a lie) এমন একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে সত্যকে পশ্নবিদ্ধ করে তার সন্ধান করা। এই ‘বানানো দৃশ্যপট’কে লেখকের কল্পনা বলা যেতে পারে। আবার এই কল্পিত কাহিনিকে বাস্তবের সমান্তরাল একটি ঘটনা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বাস্তব জগতে প্রতিনিয়ত যা ঘটছে গল্প যেন তারই আয়নায় দেখা পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র। গল্প যেন চেনা জিনিসগুলো নিয়েই নতুন জগত রচনা করে। যেমন ডন কিহোতে, হিথক্লিফ আর এমা বোভারি যে-সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল তা বাস্তবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বরং তার চেয়েও ভয়াবহ, এমনকি চরিত্রগুলো দ্রæত কাছাকাছি আসে, তারপর আর সবাই তুচ্ছ হয়ে যায়, তাদেরকে বাস্তবের চেয়েও যেন বাস্তব লাগে। ডন কিহোতে আর এমা বোভারি মানুষের জীবনে মানুষের প্রয়োজনীয়তা, তাদের দোষ-গুণ, ব্যাক্তিত্বের সংকট পাঠকের সামনে তুলে ধরে আর তা আমাদের সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিশে যায়।

এহাব, পেদ্রো পারামো আর এফি ব্রিস্ট, তাদের মধ্যে যা আছে তা বড় আর উজ্জ্বল ব্যাক্তিত্বের গল্প, মানুষের মরণশীলতার কথা, যা আমরা সবসময় ভুলে যাই। আমরা কখনও বুঝতে চাই না যে আমাদের বাবা কী জানত, আমাদের পূর্বপুরুষরা কী স্বপ্ন দেখেছিল। দস্তয়ইয়েভস্কি ‘ডন কিহোতে’ সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘এই উপন্যাসে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে বাঁচানো হয়েছে’। সার্ভান্তেসের হাত ধরে উপন্যাসের মধ্যে মিথ্যায় সাজানো আবহে সত্যের ভিত্তি খোঁজা শুরু হয়েছিল। এজন্য বানানো কাহিনির মাধ্যমে একজন ঔপন্যাসিক সত্যের পেছনের কারণ বর্ণনা করে যান। পৃথিবীতে যা নেই, যা সবাই ভুলে গেছে, যার জন্য সবাই আশা করে অথচ যেখানে কখনও পৌঁছানো যায় না—গল্প সেসব এনে দেয়। তাই কাহিনি এভাবে সাদামাটা জগতকে শুধরে তাতে রঙ-রূপ-গন্ধ দেয়, তাকে স্বপ্ন দেখায়, প্রতিবাদ করতে শেখায়। এমনকি অসীম ধৈর্য্য নিয়ে আশেপাশের সবকিছু মেনে নিতেও শেখায়।

ঔপন্যাসিকরা আমাদের বলে, নিজেকে জানার মাধ্যমে জগতকে জানো। আবার উলটো করে জগতের পথে বেরিয়ে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করতে বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে, সংকটের সময়ে যখন টমাস মান আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছিলেন তখন তার হাতে ছিল ‘দন কিহোতে’। নিশ্চিতভাবে এটা ইউরোপে মৃত্যুযন্ত্রণার মাঝে বেঁচে থাকার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। এমনকি তারও আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটার মধ্যে ফ্রানৎস কাফকা ‘দন কিহোতে’র সাঙ্কো পাঞ্জার মধ্যে অসামান্য এক চরিত্রের সন্ধান পান। যে চরিত্রটি কাউকে আঘাত না করে, নিষ্ঠুর যোদ্ধার আবর্ত থেকে বেরিয়ে এসে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে। আর পরিশেষে হোর্হে লুইস বোর্হেস তার ‘পিয়েরে মিনার্ড অথার অফ ডন কিহোতে’ লেখায় আমাদের বলেন যে, সার্ভান্তেসের উপন্যাসটি আবার নতুন করে সৃষ্টির যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা আছে, প্রতিটি শব্দ আবার ব্যাবহারের প্রয়োজন আছে, কিন্তু অন্য সময় আর অন্য পটভূমিতে।

সার্ভান্তেসের জীবন কেটেছে স্পেনের রাজা ফিলিপ-৩-এর এবং তার সময়ে ঘটা মুদ্রাস্ফীতির সময় জুড়ে। তখন স্পেনে ইহুদী আর আরবের লোকদের বাণিজ্যিক আগ্রাসনের ফলে টাকার মূল্যহ্রাস আর অর্থনৈতিক ধসের সৃষ্টি হয়েছিল। এই আগ্রাসন যেন হিব্রæ আর মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শক্ত অথচ ভঙ্গুর একটা মুখোশের আড়ালে ঢেকে দিল। রাজ্য অনেক দূরবর্তী হওয়াতে কাজকর্ম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ভারতীয় মহাসাগর থেকে সোনা-রূপা সংগ্রহ করে বাণিজ্যের কেন্দ্র দক্ষিণ ইউরোপে নিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। স্পেনের মানুষ হয়ে পড়েছিল গৃহহীন আর দরিদ্র, তাদের ভিতরটা ফাঁপা অথচ বাইরে সাজানো ছিল আভিজাত্য। ঘুণে ধরা বাড়িঘর আর ভেঙে পড়া মানুষেরা শুধু টিকে ছিল। বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে তারা একদিন টগবগে তরুণ ছিল, মেক্সিকো শাসন করেছিল, ক্যারিবিয়ান সাগরে জাহাজ নিয়ে চষে বেড়িয়েছিল, নতুন পৃথিবীতে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিল, ছাপাখানা বসিয়ে ছিল। শুধুমাত্র আমেরিকা আবিষ্কারেই তো স্পেনের ভয়ঙ্কর শক্তির প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়।

সার্ভান্তেস আর স্পেনের স্বর্ণযুগের বিখ্যাত সাহিত্যিকরা দেখিয়েছিলেন যে, ইতিহাস সমাজ থেকে যা কেড়ে নিয়েছে সাহিত্য সমাজকে আবার তা ফিরিয়ে দিতে পারে। দন কিহোতে মৃত্যুশয্যায় দীর্ঘশ্বাসের ভেতর দিয়ে আর্ত-আকুল হয়ে নিজের মনে জানতে চায়, ‘হারানো দিনের সব পাখিরা কোথায়?’ তখন তারা সব ছিল নকল আর মৃত পাখি। তাই বিশাল ঈগল আর অ্যালবাট্রসের বিস্তৃত পাখায় ভর করে উপন্যাসটি আবার যাত্রা শুরু করে। উপেক্ষিত সমাজের প্রতি সার্ভান্তেসের এই সূ²দৃষ্টি যেমন, চূড়ান্তভাবে সফল হয়েছিল, তেমনি আমাদেরকেও চারপাশের অবহেলিত সমাজ নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের লেখায় যেন তাদের আকুতি ফুটে ওঠে। কাহিনিগুলো যেন বহুদিন ধরে আমাদের সচেতন করতে থাকে। সাহিত্যের প্রতি লেখকদের তীব্র ভালবাসার মধ্যে ইউরোপের ইতিহাসের এক একটি অধ্যায় ফুটে ওঠে।

একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের প্রয়োজনকে দমিয়ে রাখার ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা সচেতন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর দেশের উন্নতির তুলনায় সেনাবাহিনীর খরচ অনেক গুণে বেড়ে গেছে। নারী, শিশু আর বয়ষ্কদের জরুরি প্রয়োজনগুলো কবে মেটানো হবে তা কারও জানা নেই। প্রকৃতিকে ধ্বংস করার মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে। বোর্হেসের ভাষায়, ‘স্বর্গপুরীতে সৃষ্টি আর সঞ্চয় একই অর্থ বহন করে। অথচ পৃথিবীতে এই দুটি শব্দই যেন পরষ্পরের শত্রু’। সন্ত্রাসের শিকড় নিয়ে কেউ কথা বলছে না। সন্ত্রাসের প্রত্যুত্তরে কখনও সন্ত্রাস সৃষ্টি করা যেতে পারে না, বরং বুদ্ধি খাটানো যেতে পারে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক আর আর্থসামাজিক মুক্তি ঘটতে পারে। কোনো দেশ দখল করে, কাউকে জোর করে নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে ফেললে মুক্তি আসবে না।

মানুষের অধিকার আদায়, বিভিন্ন দেশের আন্তঃসম্পর্ক, বিভিন্ন জাতির মধ্যে সুসম্পর্ক, আইনের গুরুত্ব তখনই উন্নত হতে পারে যখন সামগ্রিকভাবে সকলের মূল্যবোধকে গুরুত্ব আর উদারতা দিয়ে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু মানুষের মূল্যবোধ একটি মাত্র জাতিকে এগিয়ে নিতে চাওয়ার হঠকারিতা, প্রতিরক্ষার যুদ্ধ আর অন্ধ অহঙ্কারের ক্রুদ্ধ শিকার হয়।(প্রবচন,১৬:১৮) পরিণতিতে সমাজে আসে শুধু ভাঙন। কখনও আমরা এই বাস্তবতার ব্যাপারে নীরব থাকি; কারণ কেউ আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে আমরা সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো পৃথিবীতে বাস করছি আর আমাদের একত্রিত হয়ে থাকা অপরিহার্য নয়। কিন্তু অন্যদিকে পৃথিবী ধ্বংসের আতঙ্ক আমাদের ভোগায়। যেমন গ্যেটে বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা তার সব সৃষ্টির মায়া ত্যাগ করে তাদের ধ্বংস করবে তারপর আবার নতুন করে সৃষ্টি করবে।’

সময়কে জয় করার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। ছবি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতে শেখার বদৌলতে আমরা যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি। কিন্তু এই যে সময় টুকরো টুকরো হয়ে মিলেমিশে যাচ্ছে এটা একরকম আতঙ্কজনক। এটা আমাদেরকে অতীত আর ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখতে আর কল্পনা করতে বাধা দেয়। আমাদের মতামত এখানে মূল্যহীন, আমরা কেবল সাজিয়ে রাখা ছবিগুলোর দাস হয়ে যাচ্ছি। আমরা কেবল যেন হাসিখুশি একটা রোবোটের মতো মৃত্যু পর্যন্ত নিজেদের আনন্দে ডুবিয়ে রাখতে ব্যস্ত। আমি বিশ্বাস করি, আমরা তারপরেও দৃঢ়ভাবে বলব যে, ভাষাই একটি সংস্কৃতির ভিত্তি। ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতার দরজা, কল্পনার ছাদ, স্মৃতির মেঝে, ভালবাসার শোবার ঘর আর সবার উপরে আছে খোলা জানালা—যার ওপাশে বয়ে যায় জানা-অজানা আর অসংখ্য প্রশ্নের বাতাস।

আমি মনে করি সমস্ত বিখ্যাত উপন্যাসই মানুষের এক একটি অনবদ্য সৃষ্টি। এই সৃষ্টিকে আমরা ভালবাসা, মুক্তি, সময়োচিত কথা, যা-ই বলি না কেন, তা যেন আমাদের আমন্ত্রণ জানায় তাকে বাস্তবের মতো করে উপলব্ধি করতে, যদিও কখনও আমরা তা করতে ব্যর্থ হই। কিহোতে জানে, পিয়েরে গোরিও, আনা কারেনিনা অথবা প্রিন্স মিশকিনের মতো সেও কখনও কখনও ব্যর্থ হয়। কিন্তু হোক না সে সহজ অথবা দুর্বোধ্য, এই সচেতন ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমাদের বাঁচতে ও বাঁচাতে সাহায্য করে, জীবনের মূল্য বোঝায়। সারা পৃথিবীতে সব যুগে সবাই তাকে মনে রাখে। অসমাপ্ত কল্পনা ভেবে দূরে সরিয়ে রাখে না, বরং তার অন্তর্নিহিত আনন্দটুকু খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

গত শতাব্দীর অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা জানি যে, মানুষের সুখ আর উন্নতির পথে ক্রমাগত কত বাধা এসেছে। উইলিয়াম ফকনার তার ‘লাইট ইন অগাস্ট’ উপন্যাসে বিপরীতধর্মী দুটি চরিত্র, কামাসক্ত জোয়ানা বার্ডেন আর তার তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধু জয়ি খ্রিস্টমাসের কাছাকাছি আসার গল্প বলেছেন। খ্রিস্টমাস সেখানে মুক্তির প্রতীক। কিন্ত সে জানে যে তার স্বাধীনতা সীমিত। সে নিজেকে ঈগলের মতো মনে করে; কঠিন, শক্তিশালী, বন্ধনহীন আর পরিপূর্ণ। কিন্তু তার অনুভূতির তীব্রতা যখন জোয়ানের দিকে প্রবাহিত হয়, খ্রিস্টমাসের শরীরই তার নিজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। জোয়ানা বার্ডেন খ্রিস্টমাসের শরীরকে শুধু নিজের করে পেতে চায়। নিজেকে চিরদিনের জন্য নয় তবে ক্ষণিকের জন্য শাস্তি দিতে চায়, বারবার অনুরোধ করে, ‘বিধাতা, আমাকে প্রার্থনা করতে বলো না, আমাকে আরও একটু শাস্তি পেতে দাও।’

ফকনারের অসংখ্য সৃষ্টির মতো এই দুটি চরিত্রকেও মুক্তি অথবা পরিণতির জায়গায় দাঁড়িয়ে ভালবাসতে আর আশাহত হতে দেখা যায়। ফকনারের লেখায় আমরা জানি যে মানুষ নিজেকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমনকি জয়ী হলেও আত্মহারা হয়ে যায় না। এই সময় থমকে দেয়া হতাশার কথা উল্লেখ করছি, কারণ আমি মনে করি, এই উপন্যাসের হৃদস্পন্দন লুকিয়ে আছে এখানেই। স্বাধীনতা অনেক সময়ই কষ্টের যদি তার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা আর সীমা আমাদের জানা থাকে।

‘আমি মুক্তি চাই না’ কাফকা লিখেছেন, ‘একমাত্র অন্য কোনো উপায় না থাকলে, নিজের ভেতরে এভাবে ধুকে ধুকে মরা যায়... হয়ত আমি শেষপর্যন্ত নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারি, লড়াইয়ের কাছে নয় বরং লড়ে যাওয়ার আনন্দের কাছে।’

যে-ভাষণ ফকনারকে স্মরণীয় করেছে তা হলো, ‘কিছুই না পাওয়ার চেয়ে ব্যথা পাওয়াকে আমি শ্রেয় মনে করি’। তিনি মনে করেন ‘মানুষ সব সহ্য করতে পারে’। আর এটাই কি উপন্যাসটির গূঢ় সত্য নয়? মানব জাতি সহনশীল, আর ইতিহাসে যত দুর্ঘটনাই ঘটুক, সব সত্তে¡ও সে সহ্য করে যায়। ইতিহাসের দ্রæতগামিতাকে অগ্রাহ্য করে উপন্যাস আমাদের জীবনে শিল্পের বিন্যাস ঘটায়। ইতিহাস যা ভুলে যায় সাহিত্য তাই আড়াল থেকে সামনে আনে। কারণ ইতিহাস তা-ই যা দেখা যায়, আর সাহিত্য আমাদের সেখানে নিয়ে যায় যা সবসময় দেখা যায় না। এজন্যই শেষ পর্যন্ত আমরা শুধু ইতিহাসের সাক্ষীই হয়ে থাকি না, মহাবিশ্বকে চরম ধ্বংস থেকেও বাঁচাই।

সভ্যতার হানাহানি আর ইতিহাসের পতনের দিকে যাত্রার কথা ফ্রানৎস কাফকা আর উইলিয়াম ফকনার বলে যাচ্ছেন। আমি আমার কথা বলি স্প্যানিশে, এমন এক মহাদেশে যেখানে আইবেরিয়ান, ভারতীয় অথবা ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত স্প্যানিশরা আছে, কৃষ্ণাঙ্গ আর মিশ্রবর্ণের মানুষরা আছে, আটলান্টিক, মেডিটেরিয়ান, ক্যারিবীয় আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় মানুষেরা আছে, আছে খ্রিস্টান, মুসলমান আর ইহুদি, গ্রীক আর লাতিনরা।

আমি যদি আমার অর্জনে বিশ্বাসী থাকি তবে আমাকে যুক্তিতে, লক্ষ্যে আর আমার নিজের সংস্কৃতির সম্ভাবনায় বিশ্বাসী হতে হবে। আমি কিছুতেই মেনে নিতে রাজি নই যে আমরা বিভিন্ন জাতির হানাহানির মধ্যে বাস করব। কারণ আমি যা লিখি তার জন্য আমি দায়ী, কাউকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়, শুধু বলে যাওয়া, আরেকজনের কাছে পৌঁছে দেয়া। হয়ত তর্ক করছি কিন্তু তা-ও একটা কিছু আরও ভালো করে জানার জন্য, অন্তর দিয়ে কারও সাথে যোগাযোগ করছি, হয়ত কখনও কারও ভালো লাগতে পারে, আবার খারাপও লাগতে পারে। যা কিছু নষ্ট হবার নয় কিন্তু অনেক পেছনে ফেলে এসেছি তা আমি খুঁজে বেড়াই, আমার প্রাচীন ভারতীয় কিংবা ইসলামিক সংস্কৃতি, আমার পাশ্চাত্য, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পাওয়া আমার খ্রিস্টান সংস্কৃতি, সবই আমি চিরন্তন হিসেবে ভাবতে শেখার সামর্থ অর্জন করেছি। এদের সবার জন্য আমি একটি মিলনায়তন কল্পনা করি যেখানে সবাই বলবে, চিন্তা করবে, স্মৃতিচারণ করবে আর কল্পনা করবে। প্রত্যেকের কল্পনায় ভর করে আমরা ঘুরে বেড়াব, স্বপ্নগুলো সাথে নিয়ে আমরা সভ্যতার পথে অংশগ্রহণ করব আর এভাবেই ইতিহাসের সমাপ্তিকে থামিয়ে দেব।

ইতিহাস কী করে নিজের ইতি টানতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের শেষ কথাটি না বলছি?

সূত্র : বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন