বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

পাওলো কোয়েলহোর সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : সামি আল মেহেদী


[পাওলো কোয়েলহোর জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে, ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট। পুরো নাম পাওলো কোয়েলহো ডি সুজা। তাঁকে এ সময়ের চিন্তাশীল লেখকদের মধ্যে অন্যতম বললে অত্যুক্তি হয় না। উইলিয়াম ব্লেক, হেনরি মিলার, হোর্হে লুইস বোর্হেসের প্রভাব রয়েছে তাঁর লেখনীতে। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘দি অ্যালকেমিস্ট’ ৮০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর প্রশংসিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য পিলগ্রিমেজ’, ‘ব্রিদা’, ‘ইলেভেন মিনিটস’, ‘অ্যাডাল্টারি’। তাঁর উপন্যাস ও গল্প থেকে নির্মিত হয়েছে গোটা দশেক চলচ্চিত্র, যার মধ্যে ‘ভেরোনিকা ডিসাইডস টু ডাই’, ‘দি এক্সপেরিমেন্টাল উইচ’ উল্লেখযোগ্য।
‘দ্য টকজ’-এর এই সাক্ষাৎকারটি ২০১৪ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত।]



প্রশ্ন : 
মিস্টার কোয়েলহো, আপনি কি বহু সংস্কৃতির মাঝে সংযোগ স্থাপনে আগ্রহী?

কোয়েলহো : 

দেখুন, একজন লেখক হিসেবে আপনার অবশ্যই বিভিন্ন সংস্কৃতি আর ঘরানার প্রতি আকর্ষণ থাকতে হবে। আপনি স্রেফ আপনার গ্রাম নিয়ে লেখার জন্য তো আর লেখক হননি। হ্যাঁ, নিজের গ্রামের খানিকটা নিয়ে কথা বলবেন বটে, তবে অন্য গ্রামগুলো নিয়েও কিন্তু আপনার সাফ সাফ ধারণা থাকা চাই। যেমনটা ধরুন তলস্তয় বলেছিলেন—একটা গ্রামে যা হয় তা সবখানেই হয়।


প্রশ্ন : 
এ ধরনের মনোভাব নিয়েই কি আপনি বেড়ে উঠেছেন?

কোয়েলহো : 
আমি তো ছোটবেলা থেকেই বিবিধ প্রভাব আর সংস্কৃতির মিশেলে বেড়ে উঠেছি—আরব, ইহুদি, মার্কিনি, আর এভাবেই আমি এই রকমের একটা আগ্রহী লোক হয়ে উঠেছি। রাজনৈতিক সংস্কারের নিরিখে কোনো গানবাজনা শোনার ধার ধারিনি আমরা। আমরা এমন কিছু পছন্দ করেছি যা হয় আপনার পছন্দ হবে, নয়তো হবে না—ব্যস! আমি যখন লেখা শুরু করেছি তখন টের পেলাম যে এই প্রভাবগুলো আমার মাঝে আপনাআপনিই তরতাজা হয়ে বেড়ে উঠেছে। আর এভাবেই আমি ব্যাপারগুলো নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি।


প্রশ্ন : 
আপনার কি মনে হয় যে আগের জমানার চেয়ে আজকালকার দিনে সংস্কৃতির মাঝে সংযোগগুলো ঢের বেশি?

কোয়েলহো : 
সে কি, আমি তো দেখছি সাঁকোগুলো আরো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! মনে হচ্ছে একে অন্যকে বোঝার সাধ বা সাধ্য আর কারোর মাঝেই নেই। আমি মনে করি মানুষ হিসেবে দুনিয়ার এহেন দশা নিয়ে আর সবার মতোই আমারও মাথা ঘামানো উচিত—এই বহুসাংস্কৃতিক সংযোগের বিষয়টায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার একখানা হলেও সেতু টিকে থাকবে, ততক্ষণ আপনি আর যাই হোক একেবারে হেরে বসবেন না। কিন্তু যখন থেকেই দেখবেন যে আপনি অন্য কোনো মুলুকেরই সংস্কৃতি বা কোনো গান বা গল্প একেবারেই ধরতে পারছেন না, তখনই বুঝতে হবে দশা সঙ্গীণ; কারণ আমরা তখন একে অন্যের কাছে একেবারেই অপরিচিত হয়ে উঠছি। আর এমন পরিস্থিতি খুবই জটিল।

প্রশ্ন : 
আপনি তো অনলাইনের মাধ্যমের সংস্কৃতির সংযোগটা ঘটাচ্ছেন। আপনার ফেসবুকে ২২ মিলিয়ন লাইক, টুইটারে ফলোয়ার নয় মিলিয়ন, আর সেই ২০০৬ সাল থেকে ব্লগিং করছেন। আপনি ইন্টারনেটে এত অ্যাকটিভ কেন?

কোয়েলহো : 
এই প্ল্যাটফর্ম তো নতুন। লেখক হিসেবে আমার এমন প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বের করা উচিত যেটা লেখালেখির বিষয়টাকে ব্যবহার করতে পারে। মানুষজন এখন ইন্টারনেটের বদৌলতে পড়ছেও বেশি, লিখছেও বেশি। কাজেই ভার্চুয়াল দুনিয়াটা আমার কাছে পাঠকদের কথা শোনার এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মোক্ষম একটা রাস্তা। তাঁরা নিজেদের মতামতটা এই রাস্তায় চাইলেই দিতে পারছে। ভাষা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে আমি ভালোবাসি। ব্লগের জন্য আমি যে টেক্সট লিখি, তা লোকে চাইলেই ডাউনলোড করে নিতে পারে, ছড়িয়ে দিতে পারে। এর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক ফন্দি নেই। পুরো ব্যাপারটাই স্রেফ মজার খাতিরে, পছন্দসই একটা কাজ করা করার মতো আর কি! ইন্টারনেটের আমার লেখা হয় আলাদা, আর এগুলোর প্রতি পাঠকের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা পর্যবেক্ষণ করতেও আমার বেশ আগ্রহ কাজ করে।


প্রশ্ন : 
ইনফরমেশন বেশি হয়ে গেলে তো বিশ্বাসযোগ্যতার পাল্লাটাও একটু হাল্কা হয়ে যায়। এমন কোনো সমস্যা কি বোধ করেন?

কোয়েলহো : 
ঠিক বলতে পারব না। আমার মনে হয় আপনি যত বেশি বেশি ইনফরমেশন পাবেন, ততই নিজের দরকারি তথ্যগুলো ঝটপট খুঁজে পাবেন।

প্রশ্ন : 
আপনি নাকি লেখা শুরুর আগে সব সময় একটা সাদা পালক খুঁজে থাকেন?

কোয়েলহো : 
ঘটনা সত্য, কোনো একটা বইয়ের লেখা শুরু করার আগে আমি এমনটা করি। এটা হচ্ছে একধরনের ট্র্যাডিশন অনুসরণ করাও, এক্কেবারে ১৯৮৭ সালে আমার প্রথম বইয়ের থেকে। তখন আমি ঠিক শিওর ছিলাম না যে বইটা লিখব কি লিখব না, ধন্দে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি ছিলাম মাদ্রিদে। তো একসময় আমি নিজেই নিজেকে বললাম, ‘বটে, আজ যদি আমি একটা সাদা পালক দেখতে পাই, তাহলে সেটাই হবে এমন একটা সংকেত যে আমার অবশ্যই লেখা উচিত।’

প্রশ্ন : 
এমন যদি হয় যে আপনার মাথায় জবরদস্ত একটা আইডিয়া এসেছে আর আপনি লেখাও শুরু করতে চাচ্ছেন, কিন্তু কোনো সাদা পালকের দেখা পাচ্ছেন না। তখন?

কোয়েলহো : 
এমনটা হবে না, কারণ এমনিতে সাদা পালকের দেখা পাওয়া অতটা কঠিন না। জানুয়ারির দিকটায় হলে একটু গোলমেলে ব্যাপার, কারণ তখন সাদা পালকের দেখা পাওয়া একটু মুশকিল। তবে অসম্ভব কিন্তু নয়। আর আমি যখনই সাদা পালক দেখে ফেলব তখনই কিন্তু লেখা শুরু করে দেব। তবে এর সঙ্গে বইয়ের কনটেন্টের কোনো সংযোগ নেই। সেটা একান্ত বইয়েরই ব্যাপার।

প্রশ্ন : 
আপনার বইটা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও কি এমন কোনো সংকেত রয়েছে নাকি সেটাও আপনি সাদা পালক দিয়েই সেরে ফেলেন?

কোয়েলহো : 
আমি তো খুবই কৌতূহলী মানুষ। পুরো দুনিয়ায় কখন কী হচ্ছে তা নিয়ে আমার এন্তার আগ্রহ কাজ করে সব সময়। কাজেই লেখার জন্যও অগণিত সাবজেক্ট রয়েছে, প্রতিনিয়তই হরেক রকমের, বিচিত্র ঘরানার মানুষের সঙ্গে আপনার পরিচয় হবে। তবে এরই মাঝে আপনার মাথায় একটা আইডিয়া চট করে উদয় হবে এবং কোনো রকম লজিক ছাড়াই সেটা আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। কারণ কোনো একটা বই লিখে ফেলার আগে তো সেটা আমার হৃদয়ের মাঝে বাক্য আকারে লেখারও আগে লেখা হয়ে যায়। কাজেই আমি বই বা বইয়ের গল্প বাছাই করি না। বইয়েরাই আমাকে বেছে নেয়।


প্রশ্ন : 
তার মানে বলতে চাচ্ছেন আপনি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে লেখেন না?

কোয়েলহো : 
আমি লিখি কারণ আমি অডিয়েন্সের সঙ্গে আমার চিন্তাগুলো ভাগাভাগি করতে চাই। আমি জানি না এই বইগুলো দুনিয়াকে আরো উন্নত একটা জায়গা করে তুলবে কি না। আমি এ রকম কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে লিখি না। আমি জানি যে আমার লেখাগুলো পাঠকদের মধ্যে একধরনের চিন্তাশীল পরিসর তৈরি করে যাতে করে আমরা দুনিয়াটাকে অন্য রকম কোনো একটা অর্থ বা পথ দিয়ে সন্ধান করতে পারি। আপনার তো নিজেকে বদলাতে হবে। যে সময়টায় আপনি নিজেকে বদলে ফেলেন, সেটা একটা দানবীয় পদক্ষেপ! আর আমি এটাই করি। লেখকের চেয়ে বই অনেক বড় ব্যাপার।


প্রশ্ন : 
কিন্তু আপনার পার্সোনালিটি কিন্তু এখনো আপনার বইয়ে বেশ ফুটে থাকে!

কোয়েলহো : 
এটা ঠিক, আমি আমার কাজে ফটফটে দৃশ্যমান আর আমার কাজও আমার সত্তার একটা বহিঃপ্রকাশ বটে; তবে একই সময় আমি এটাও বিশ্বাস করি যে ফাঁকার ওপর দিয়ে একজন লেখক কিছুই লিখে উঠতে পারে না। দুই ঘরানার লেখক রয়েছে—এক হলো মার্শেল প্রুস্তের মতো কেউ যে কিনা নিজের ঘরে তালাবদ্ধ থেকে একটা ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইমে’র মতো মাস্টারপিস লিখে ফেলবে, আরেক হলো হেমিংওয়ের মতো কেউ, যে জীবনকে উদযাপন করতে করতে ঠিকই একটা মাস্টারপিস লিখে ফেলবে।

প্রশ্ন : 
দি অ্যালকেমিস্ট, আপনার সবচেয়ে জনপ্রিয় বইটি—এর আইডিয়া হচ্ছে এ রকম যে একজন মানুষ অবশ্যই তার স্বপ্নের সাপেক্ষতার মাঝে বসবাস করবে। এই থিওরির সাপেক্ষে কি আপনার জীবনটা খাটে, নাকি আপনি এখনো কিছুর সন্ধানে রয়েছেন?

কোয়েলহো : 
আমার জীবনের মানে দিব্যি ঠিকঠাক রয়েছে, তবে তার মানে এই নয় যে এর পুরো সেন্সটা আমি অবলীলায় ঠাহর করতে পারি। কাজেই আসল কথা কিন্তু সওয়ালের জবাব দেওয়া নয়, বরং বাতচিতের জায়গাটা উন্মুক্ত রাখা। এখানে এটা খুব মুখ্য নয় যে কোনো একদিন আপনার যুতসই জবাব মিলবে কি কোনো একদিন আর মিলবেই না! জীবনটাকে স্রেফ উদযাপন করুন, বাঁচুন, যা করার করুন, যেটা করতে আসলেই মন চায় সেটাই করুন।



সূত্র : এনটিভিঅনলাইন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন