রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

ইশিগুরো'র গুঢ় কথা


গ্রন্থনা ও অনুবাদ : এমদাদ রহমান

লন্ডনের পিকাড্যেলিতে এক ক্যাফেয় চা খেতে খেতে ইশগুরো'র সঙ্গে কথা হয় লেখক ও সম্পাদক জন ফ্রিম্যানের; ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি'র সন্ধ্যায়; কথা হয় তার উপন্যাস নিয়ে। কীভাবে লিখতে শুরু করেন তিনি; লেখালেখিকে কীভাবে দেখেন, লেখায় কী করতে চান- এই ছিল ফ্রিম্যানের আলাপের উদ্দেশ্য।

ইশিগুরো সম্পর্কে তিনি বলেন- লেখক-সমালোচক জেমস উড-কথিত 'বিশ্বাসযোগ্য অবিশ্বাস্যতা'র বর্ণনাকারী তিনি। লেখালেখি প্রসঙ্গে ইশিগুরো বলে চলেন- গল্প বলবার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি আছে তেমনি আপনার দেখার, আপনার দৃশ্য-কল্পনার আলাদা একটা গড়নও আছে। আপনি বারবার তাড়িত হবেন যেন স্মৃতির বর্ণনায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। আমাকে তো খুবই সতর্ক থাকতে হয় স্মৃতির বর্ণনায়- যা আগেই লিখে ফেলেছি তা যেন আর না লিখি। লেখকরা যখন একটা লেখা লিখতে থাকেন তখন কিন্তু খসড়াগুলিতে ঘটনা পরম্পরা একাকার হয়ে যায় যেন গলে যাওয়া কিছু লিখছেন তিনি। এক্ষেত্রে আমাকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হয়। কখনও একটি দৃশ্য যেন আরেকটি দৃশ্যের ওপর পড়ে একাকার না হয়।

'স্মৃতি সব সময়ই আমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। স্মৃতির ভেতর দিয়েই তো আমি লেখালেখির প্রকৃত গড়ন-কাঠামোটি সম্পাদন করতে পছন্দ করি। আমি তো লেখার পাতাগুলিতে সেই আবহটিকেই তৈরি করতে চাই, যা কুয়াশাময় স্মৃতির আচ্ছন্নতার ভেতর দিয়ে বর্ণিত হবে'।

ফ্রিম্যান বলছেন- ইশিগুরোর প্রথম উপন্যাস- ‘আ পেল ভিউ অব হিল্স’ বর্ণিত হয় এক জাপানি বিধবা'র জবানীতে, যে তার অতীত হয়ে যাওয়া জীবন নিয়ে ভাবছে আর ধীরে ধীরে তার মেয়ের আত্মহত্যাকে অনুধাবন করছে। ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’-উপন্যাসে জাপানি লোকটি তার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক একই সময়ে সে তার অতীত জীবনের ঘটনাগুলিকেও পরপর মনে করতে থাকে; কেমন জীবন সে পার করে এসেছে; এখন কেমন চলছে; কী কী ঘটবে সামনের দিনগুলিতে! যুদ্ধোত্তর দেশে সেও যেন এক বিধ্বস্ত মানুষ- যার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই! বই দুটির পটভূমি জাপান। সমালোচকরাও বই দুটিকে লেখকের আত্মজীবনী হিসেবে দেখেন, লেখক যেখানে কাহিনীর ভেতর নিহিত থাকেন! ইশিগুরো তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে মেনে নিয়ে বলেন- দুটি উপন্যাসেই আসলে স্মৃতির সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। না লিখলে হয়ত একদিন স্মৃতিগুলি ঝাপসা হতে হতে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। লোকে আমাকে জিজ্ঞেস করতে ছাড়ে না যে- আমি জাপানে পূর্ব-পশ্চিমের মিলন-সেতু নির্মাণের চেষ্টা করছি কি না? এই ব্যাপারে ভাবতে গেলেই আমি সত্যি সত্যিই বিপদে পড়ে যাই। নিজেকে এক আনাড়ি নির্মাণ-শ্রমিক মনে হয়; স্থাপত্যকলায় পারদর্শী যে কোনও দিনও হতে পারবে না!

সেদিনের আলাপচারীতায় 'সাইন্স ফিকশন' নিয়ে কথা ওঠে, 'নেভার লেট মি গো' উপন্যাসের সূত্র ধরেই; ইশিগুরো তার ভাবনা প্রকাশ করেন এভাবে- আমি যখন উপন্যাস লিখতে বসি তখন কিন্তু লেখার রীতি, ধারা কিংবা ধরণ নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপায়ে লেখাটা লিখতে থাকি যা শুরু হয় গুচ্ছের আইডিয়া থেকে। আপনি তো সেই কথাই লিখবেন যে-অভিজ্ঞতা আপনি অর্জন করেছেন!

জন ফ্রিম্যান পরে একটি বই বের করেন, 'কীভাবে একজন উপন্যাসিককে পড়তে হয়'-এই নামে; বইটি মূলত লেখকদের সাক্ষাৎকার; সেখানে গ্যুন্টার গ্রাস থেকে শুরু করে হারুকি মুরাকামিসহ অনেক লেখকের সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছিল; আর ছিলেন ইশিগুরো।

লেখার শৈলী নিয়ে তিনি বলেন-

যখন উপন্যাস লেখায় হাত দিই, তখন চাই উপন্যাসটি যেন চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী হয়। ভিন্নতার ব্যাপারে আমি খুব সচেতন; আমার কাছে এটা সত্য- উপন্যাস সব অর্থেই উপন্যাস হবে; তা না হলে আমরা বুঝতেই পারব না উপন্যাসগুলো কীভাবে টিকে আছে। লোকে কি সিনেমা কিংবা টেলিভিশনের সামনে বসেই গল্পের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিচ্ছে?

আমি এমন কিছু একটা লিখতে চেষ্টা করি সিনেমায় যা কখনওই সম্ভব নয়। সিনেমা বা টিভিতে তো কত কিছুই দেখছি আমরা, সেখানে কিছু মানুষ কেন শুধু উপন্যাস পড়বে?

এ-কথাটিকে আমি বিশ্বাস করি- ফিকশন এমন একটা কিছু করে ফেলে সিনেমা যা করতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়; তাই সে কখনওই একটি উপন্যাসের মত পূর্ণগর্ভ হতে পারে না। উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়েই মানুষ ভাবনার সঠিক জায়গাটিতে পৌঁছে যেতে পারে।

সিনেমা যখন কোনও একটি উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়, আমি তখন মনে প্রাণে চাই মূল বইটিকে ভুলে যেতে। সিনেমাকে সিনেমা হিসেবেই দেখা উচিৎ।

ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে আসলেই কিছু অদ্ভুত ব্যাপার ক্রিয়াশীল থাকে। শিশু যেভাবে অপার বিস্ময়ে এই বিশ্বটিকে, তার সঙ্গে যুক্ত করতে হয় মধ্যবয়স্ক লোকদের অভিজ্ঞতাজনিত প্রজ্ঞাকে। লেখার ক্ষেত্রে এই দুইয়ের আগ্রহোদ্দীপক ভারসাম্য তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

আমি সেইসব উপন্যাসিকদেরকেই পছন্দ করি যারা আমার জন্য ভিন্নরকমের কৌতূহলোদ্দীপক জগত সৃষ্টি করেন।

আমার প্রতিটি গল্পই আসলে এক একটি প্রলম্বিত গান।

লেখকদের মনের ভেতর যে বিষয়টি ঘুরপাক খেতে থাকে তা হচ্ছে- 'কেন তারা লিখছেন'-এ সম্পর্কে এক অবিরাম বিশ্লেষণ...

আমার দুটি ডেস্ক আছে। লেখালেখির সুবিধার্থে একটি ডেস্ক ঢালবিশিষ্ট, অন্য ডেস্কে থাকে কম্পিউটার। আমার কম্পিউটারটি ১৯৯৬ সালের। ইন্টারনেট সংযোগ নেই। ঢালবিশিষ্ট ডেস্কে প্রাথমিক খসড়াটিকে আমি কলম দিয়ে লিখতে পছন্দ করি। আমি চাই এই খসড়াটি কম-বেশি দুষ্পাঠ্য হয়ে উঠুক, শুধু যেন আমিই বুঝতে পারি। খসড়াটি দিনে দিনে তালগোল পাকানো কাগজের বড় এক তোড়া হয়ে ওঠে, তখন আমি কোনও লিখন-শৈলীর দিকে মনোযোগ দিই না। খসড়াটি খুব যে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে- তা কিন্তু নয়। আমি শুধু মাথায় আসতে থাকা কথাগুলিকে যেকোনো উপায়ে কাগজে টুকে ফেলি। যদি লিখতে লিখতে হঠাৎ নতুন কোনও আইডিয়া পেয়ে যাই, লিখিত অংশের সঙ্গে যা হয়তো খাপ খাচ্ছে না বা যাচ্ছে না- তাকেও টুকে ফেলি। কিছুটা পেছনে গিয়ে নোট নিয়ে নিই। পরে সেই নোট অনুসারে আইডিয়াটিকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। তারপর পুরো লেখাটির একটা ছক বা বিন্যাস করতে শুরু করি। অধ্যায়গুলিকে নাম্বার দিয়ে চিহ্নিত করার পর আবার শুরু হয় পুনর্বিন্যাস। তখন দ্বিতীয় খসড়াটি লিখবার সময় এসে পড়ে। তখন আমি আসলে কী লিখতে চাচ্ছি তার একটা স্পষ্ট আইডিয়া পেয়ে যাই। এই পর্যায়ে আমি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লিখতে থাকি।

দস্তয়েভ্‌স্কি'র প্রতি অনুরাগ! হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই, এছাড়াও আছে ডিকেন্স, অস্টিন, জর্জ এলিয়ট, শার্লট ব্রন্টি, উইলকি কলিন্স- যাদের রচিত উনিশ শতকের পূর্ণগর্ভ উপন্যাসগুলিকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।

তাদের সৃষ্টিগুলি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবধর্মী- ফিকশনগুলি পাঠের মধ্য দিয়ে আমাদের ভেতর যে-জগতের সৃষ্টি হয়, তা কমবেশি আমরা বাস্তবে যে-জগতে বাস করছি তার অনুরূপ। আবার এই রচনাগুলির গভীরে পৌঁছে নিজেকে আপনি হারিয়েও ফেলতে পারবেন। এদের ন্যারেটিভে আছে এক ধরনের বিশেষ দৃঢ়তা। প্লট, বিন্যাস আর চরিত্রে চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলিকে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে, আমি কিন্তু অবুঝ বালকের মত যা পেয়েছি তাই পড়িনি, নিজেকে তৈরি করার জন্য আমার একটা মজবুত ভিত্তি দরকার ছিল। শার্লট ব্রন্টি'র 'ভিলেতে' এবং 'জেন আয়ার', দস্তয়েভ্‌স্কি'র চারটি বড় উপন্যাস, চেখভের ছোটোগল্প, টলস্টয়ের 'যুদ্ধ ও শান্তি', ব্ল্যাক হাউজ; আর জেন অস্টিনের কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়টি উপন্যাস- আপনি যদি পড়ে ফেলেন তাহলে মনে করবেন আপনার একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। আর আমি প্লাতো'র বিশেষ অনুরাগী।

প্লাতো'র মুখে বর্ণিত সক্রেতেসিও সংলাপগুলির বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয় কী, কিছু লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ভাবে যে তারা সবকিছু জানে, তখন সক্রেতিস তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ান, এবং যুক্তি দিয়ে তাদের নস্যাৎ করেন। ব্যাপারটিকে অবশ্যই বৈনাশিক মনে হয়, কিন্তু এভাবে উত্তম-প্রকৃতির যে ধারণার জন্ম হয়, যা কিছুকে আমরা উত্তম বলে মনে করি- সেই ধারণা কিন্তু যুক্তির পর যুক্তিতে বদলে যেতে থাকে। মাঝেমাঝে আমাদের সমগ্র জীবন পরম নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরা একটি বিশ্বাসের ওপর ভর করে চলতে থাকে যা হয়তো ভুলও হতে পারে। একারণেই আমার প্রথম দিকের বইগুলি ছিল সেইসব লোকদের নিয়ে যারা ভাবে যে তারা সব জানে, কিন্তু তাদের মাঝে কোনও সক্রেতিস নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের সক্রেতিস।

প্লাতো'র সংলাপের এক জায়গায় সক্রেতিস বলছেন আদর্শবাদী লোকেরা প্রায় সময়ই মানবজাতির প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে, যখন তারা দুই থেকে তিনবারের বেশি হতাশায় নিমজ্জিত হয়। এই অবস্থায় প্লাতো'র পরামর্শ- উত্তমের মানে সম্পর্কে অনুসন্ধান করো। আপনি কখনওই মোহমুক্ত হতে পারবেন না যদি অনুসন্ধানে ব্যর্থ হন। শেষ ধাপে আপনি যা খুঁজে পাবেন, তা হল- এই অনুসন্ধান কঠিন। দুঃসাধ্য এক কাজ। তবে- আপনার সবসময়ের দায়িত্ব হবে অনুসন্ধানে ডুবে থাকা।

নিজেকে আপনি যখন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে পান, আপনি সবচেয়ে অস্বচ্ছন্দ বোধ করেন এই ভেবে যে- সাংস্কৃতিক ভিন্নতার জন্য আপনি অনেক কিছুই অনুবাদ করতে পারছেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে কালচারাল রেফারেন্স-পয়েন্টগুলি অনুবাদ করতে পছন্দও করিনা। ধরা যাক- ড্যানিশ'দের শুধুমাত্র একটি বই সম্পর্কে ধারণা দিতে আপনি টানা চারদিন ব্যয় করলেন। সমস্যা হল- সাংস্কৃতিক এই উপাদানগুলি শুধু যে ভৌগোলিকভাবে অনুদিত হতে চায় না তা নয়, তারা সময়ের নিরিখেও ভালোভাবে অনুদিত হয় না। আজ থেকে তিরিশ বছর বাদে এই জাতীয় রেফারেন্স-এর কোনও মানে থাকবে না।

মনে রাখতে হবে, আপনি শুধু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোকদের জন্য লিখছেন না। আপনি লিখছেন বিভিন্ন যুগের অভিজ্ঞতা নিয়ে...

- এভাবেই ইশিগুরো তার পাঠককে চমকে দেন; সেই পাঠক তার কোনও লেখা আগে পড়েনি। নোবেল পাওয়ার পর হাতে তুলে নিয়েছে। তারপর আশ্চর্য হয়ে গেছে- এ জগত অন্যরকম আনন্দের এক জগত। এভাবে- ঠিক এভাবে- খুঁজতে খুজতে আমাদের অন্যরকম এক যাপনও হয়ে ওঠে।


'কোনও একটি ঘটনা আসলে কী ঘটেছিল তাতে আমার তেমন আগ্রহ নেই, আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল লোকেরা ঘটনাটি সম্পর্কে কী কী বলছে'-

এই কথাটি যে-লেখক বলতে পারেন - তিনি খাঁটি লেখক।



অনুবাদক
এমদাদ রহমান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন