রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

শমীক ঘোষ : জানি ছাই লিখি। তবু লিখি। বেশ করি লিখি।


২০১২ সাল। আমি তখন আমদাবাদে। সরকারী এক ব্যাঙ্কে চাকরি করি। পদ অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের। কিন্তু কাজটা পছন্দ হয় না। ব্র্যাঞ্চে পোস্টিং। নামে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হলেও আসলে কাজটা হল বড় বড় অ্যাকাউন্ট তোলা। বড় মানে কয়েক লাখ কয়েক কোটির অ্যাকাউন্ট। আরো কাজ আছে। লোনের। সেটাও সেলস। আমার কাজের মধ্যে পড়ে লাইফ ইন্সিউরেন্স জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের বড় লিড তোলাও। এছাড়াও আছে বারো জন সেলস এক্সিকিউটিভ। যাদের মাইনে আমার এক চতুর্থাংশও নয়।
তাদের তোলা অ্যাকাউন্ট আমার নামে যায় না। কিন্তু তারা কাজ করছে কিনা, এমনকি তাদের চাকরি থাকবে কিনা সেটাও নির্ধারণের কাজ আমার।

এই কাজ আমার নয়। এই ধরণের কাজ করতে আমার সম্মানে লাগত। শহরটাও ভালো লাগত না মোটেই। বাড়ি ভাড়া নিতে গেলেই পদে পদে বাঙালি বলে আমিষ খাওয়ার খোঁটা। প্রচণ্ড রোদ। সেই রোদে সিগারেট খেতেও দাঁড়ানো যায় না। দাঁড়ালে মনে হয় যেন শরীরের সব জল কেউ শুষে নিয়েছে। অথচ সেই রোদেই কারো বাইকের পেছনে বসে ঘুরতে হত গোটা শহরে। নাকে রোজেশিয়া। ওই গরমে নাকটা ফুলে থাকত লাল হয়ে। প্রবল ব্যথা হত। আয়নায় নিজেকে দেখতাম আর মনে হত পিনাশিও।

এই শহরটাকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। খালি ভাবতাম পালাব। কী করে পালানো যায়। কলকাতা। নাহলে নিদেনপক্ষে মুম্বাই। চেষ্টা তো কম করিনি। বিরাট মোটা একটা ট্রান্সফার রিকোয়েস্ট দিয়েছিলাম ছ’মাস পরেই। মিথ্যেও নয়। বাবার গ্লুকোমা, পেসমেকার, স্পন্ডেলাইটিস। মার আর্থারাইটিস। আমি একমাত্র সন্তান। কিন্তু গুজরাত থেকে পালানো সহজ নয়। কেউ ছাড়ে না। ছাড়বে কেন? লোকালাইট অফিসার কোথায়? গুজরাতিরা তো ব্যবসা করেন। ব্যাংকের কাজ করতে ক’জনই বা আসবেন? ফলে বেশীরভাগই বাইরের স্টেটের অফিসার। তাঁদের ট্রান্সফার সহজ নয়। তাছাড়া ব্যবসা দিতাম। খুব ভালো না হলেও মোটামুটি। গোটা রিজিয়ানের মধ্যে প্রথম দশজনে থাকি। মাঝে সাঝে রিজিওনাল হেডের প্রশংসার মেল আসে।

কিন্তু পালাতে আমাকে হতই। আমি তাই মুম্বাইয়ে ট্রেনিং-এ গিয়ে বাঙালি উচ্চপদস্থ অফিসার দেখলেই আলাপ করি। ট্রেনিং থেকে ফিরেই ফোন করি। স্যার যদি আপনার সঙ্গে কাজ করতে পারতাম। চেষ্টাতো করি। কিন্তু হয় না। এমন সময়েই আলাপ হল একজন মালয়ালি ভদ্রলোকের সঙ্গে। একটি নামী অক্সিজেন কম্পানির ন্যাশানাল হেড। আহমেদাবাদের পশ এরিয়া স্যাটেলাইটে বিরাট ফ্ল্যাট। বাড়িতেও নিমন্ত্রণ করলেন একদিন। গেলাম। বলেই ফেললাম। আমার ট্রান্সফারের কোনো উপায় হতে পারে। নিদেনপক্ষে একটা ভালো ডিপার্টমেন্ট?

উপায় বাতলে দিলেন তিনিই। তাঁর কম্পানির একজন ভেন্ডার আছে রাজকোটে। তাঁর নাম শুনে চমকে উঠেছিলাম আমি। এক সর্বভারতীয় দলের গুজরাতের বর্ষীয়ান নেতা। তাঁকে হারিয়েই একসময় এম এল এ হয়েছিলেন ভারতবর্ষের এক জাতীয় নেতা। ফোনে বলে দিলেন। ফোন নাম্বারও দিলেন। তিনিই ডেকে পাঠালেন একদিন। আহমেদাবাদে নয়। রাজকোটে। পেট খারাপ বলে ছুটি নিয়ে আহমেদাবাদ থেকে চলে গেলাম রাজকোট। তাঁর অফিসের দারোয়ান জানাল তাঁর আসতে আরো আধঘন্টা দেরি হবে। সিগারেটের পর সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে আধ ঘন্টা কখন যেন কেটে গেল। তিনি এলেন। বৃদ্ধ, প্রায় আশি বছর বয়স। নিজে ড্রাইভ করেন। গাড়িটা পার্ক করলেন অফিসের পাশে ছোট্ট পার্কিং লটে। তারপর নেমে চাবিটা ছুঁড়ে দিলেন দারোয়ানের দিকে। ঋজু স্মার্ট। গট গট করে হেঁটে উঠে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে। আমি অপেক্ষা করলাম আরো দশ মিনিট। তারপর গেলাম তাঁর চেম্বারে।

ভদ্রলোক আমাকে আশ্বাস দিলেন আমার ট্রান্সফার হয়ে যাবে। লিখে নিলেন নাম, এমপ্লয়ি নাম্বার। সেইদিন দুপুরে রাজকোটের একমাত্র আমিষ রেস্তোরাঁয় ভরপেট খেয়েছিলাম আমি। ফিরে আসছি। ঝাঁ চকচকে চওড়া রানওয়ের মতো রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে এসি বাস। দু’দিকে রুক্ষ গুজরাতের গ্রাম। বাসে চলা হিন্দি সিনেমা থেকে চোখ সরিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরে। আর ঠিক তখনই মনের মধ্যে কে যেন বলে উঠেছিল কথাটা। ‘আমি লেখক হব। হবই। লেখক ছাড়া এক জীবনে এত অভিজ্ঞতা থাকে না।’

লিখেছিলাম প্রায় ৯ বছর আগে। একটা গল্প। তখন কলেজে পড়ি। জীবনে কোনওদিন একটা লেখাও স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়নি। অথচ আমি মন দিয়ে কবিতা লিখি। শক্তি চাটুজ্যে পড়ি। আর কবিতা লিখি। বাবার পুরোনো ডায়রির পাতায়। লিখতে লিখতে ঘোর আসে। হায়ার সেকন্ডারির রেজাল্ট খারাপ হল। জয়েন্টের র‍্যাঙ্কও। ভর্তি হলা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশান। পছন্দ হল না একদম। কলেজে গেলেই পালাতে ইচ্ছা করত। পালাতামও। কলেজের সামনে একটা ছেলে পেটাই পরোটা বিক্রি করত। আমি বসে থাকতাম ওর দোকানে। গল্প করতাম। মাঝে মাঝে আশেপাশের নির্মীয়মাণ বাড়িগুলো থেকে মিস্ত্রিরা আসত সেইখানে। শিক্ষিত, মিস্ত্রি না হতে চাওয়া আমি অবাক চোখে দেখতাম লোকগুলোকে। দেখতাম তাদের কানে গোঁজা বিড়ি। দেখতাম তাদের কালো কনুইয়ের একটু নীচ অবধি লেগে থাকা সাদাটে সিমেন্টের গুঁড়ো। আর এই সব দেখতে দেখতেই কখন যেন সামনের খালটার জল দিয়ে বয়ে যেত ক্ষতবিক্ষত সূর্যের রক্ত।

এক সেমিস্টার পরে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে দিলাম। ভর্তি হলাম ফিজিক্স অনার্স পড়তে। আর প্রায় সেই সময়েই গুজরাত জুড়ে ধর্মীয় নিধন। কারা যেন ট্রেণ ভর্তি করসেবকদের পুড়িয়ে মেরেছে। শুরু হল দাঙ্গা। প্রতিদিন খবরের কাগজ জুড়ে মানুষের মানুষকে মারার খতিয়ান। ধর্ষণ। গর্ভবতী মহিলার গর্ভ খুঁচিয়ে বার করে আনা হয়েছে ভ্রুণ। ওই ভ্রুণটাকে যেন দেখতে পেতাম আমি। সারাদিন আমার পেছন হাঁটত। কলেজে যেত, বসে থাকত আমার খাতার পাশে। শুয়ে থাকত আমার খাটের ওপর। কাঁদত। খাতায় লিখেছিলাম, ‘জরায়ু থেকে খসে পড়া রক্তাপ্লুত ভ্রুণ। তুই আমাকে খুঁজে দিলি আমার আগুন।’ ওই আগুন বাড়তে লাগল। প্রায় একই সময় নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন বড় আকার ধারণ করল। বড় বাঁধ খেয়ে নেবে নদীকে। আর নদীর সঙ্গে ডুবে যাবে জঙ্গল, গ্রাম, মানুষের ভিটে। গ্রেটার কমন গুডের নামে সরকার দখল করে নেবে মানুষের আবাসভূমি। আমার আগুন খুঁজতে খুঁজতেই আমি জড়িয়ে পড়লাম রাজনীতিতে। এক জটিল রাজনীতি। সেই রাজনীতি করতে করতে বারংবার মনে হত ভারতবর্ষে বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে। এই তো একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসবে গণফৌজ। তাদের মাথায় লাল ফেট্টি। হাতে কাস্তে, দা, কুঠার, টাঙ্গি, বল্লম, অ্যাসল্ট রাইফেল। ২০০৩ সালে শুরু হল ইরাক যুদ্ধ। প্রতিদিন টেলিভিশান জুড়ে সেই যুদ্ধের ক্ষত। সেই ক্ষত চিহ্নকে পর্দার ওপারে রেখে রাতের খাবার খেতাম আমরা। দেখতাম মানুষ মানুষকে মারার জন্য কী মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করেছে। শুধু একটুকরো আগুনের হলকায় জ্বলে যায় সব। মানুষের চিৎকার ঢেকে যায় কামানের প্রচণ্ড আওয়াজে।

আমার সেই রাজনৈতিক দাদারা মিছিল করলেন কলকাতায়। সেই মিছিলেই কারা যেন এল দূর থেকে। অনেক অনেক লোক। এদের মত মানুষ আগে দেখিনি আমি। অসম্ভব দরিদ্র মানুষ। খাওয়া জোটে না। শরীরে ছেঁড়া পোষাক। হাতে লাঠি। সেই সব মানুষের সঙ্গে বিরাট মিছিল হেঁটে গেল কলকাতার ধমনী বন্ধ করে। চল জওয়ান, চল কিষাণ, চল মজদুর, লাঠি লেকে টাঙ্গি লেকে বল্লম লেকে হামলা বোল। হামলা বোল। আমাদের সেই মিছিল আটকে দিয়েছিল শহরের যানবাহন। আর সেই সময় মাও পড়া আমার শুধু মনে হচ্ছিল, ‘a single spark can start a prairie fire.’ ওই মিছিলেই দেখেছিলাম মেয়েটিকে। লম্বাটে। রোদে পোড়া তামাটে রঙ। টানা টানা দুটো চোখ। পরনে মলিন সালোয়ার। স্লোগান দিচ্ছে নাতো যেন হুংকার দিচ্ছে। মিছিল শেষে মেয়েটা চোখ মেলে তাকিয়েছিল আমার দিকে। আর আমি, আমার দামি শার্ট, দামি জিন্সে কেমন যেন গুটিয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন ধরা পড়ে গেলাম। সেই তীব্র দৃষ্টির সামনে না থাকতে পেরে আমি ছুটে ঢুকে গিয়েছিলাম মেট্রো স্টেশনের ভেতরে।

‘Some comrades in our Party still do not know how to appraise the current situation correctly and how to settle the attendant question of what action to take. Though they believe that a revolutionary high tide is inevitable, they do not believe it to be imminent.

... Comrades who suffer from revolutionary impetuosity overestimate the subjective forces of the revolution and underestimate the forces of the counter-revolution. Such an appraisal stems mainly from subjectivism. In the end, it undoubtedly leads to putschism. On the other hand, underestimating the subjective forces of the revolution and overestimating the forces of the counter-revolution would also constitute an improper appraisal and be certain to produce bad results of another kind. ’

আর ওই ২০০৩ সালেই আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম কলকাতার কাছে মাইথনে। আমাদের সঙ্গে আমার মামাতো ভাই। সে তখন পড়ে আর্ট কলেজে। জল। শুধু জল। জলের গায়ের মধ্যে ভেসে থাকা পাহাড় চূড়ো। তার গায়ে হেলে পড়ত মেঘ। অথচ ওই জল, ঘোলা, রঙ ওঠা জলের নীচেই ঘুমিয়ে পড়েছে কাদের ঘর, তুলসীতলা, গোয়াল, ধানক্ষেত।

ফিরে এসে একটা গল্প লিখেছিলাম। আমার জীবনের প্রথম গল্প। ঘোলা। ‘যদি দেখতে শুরু কর তোমার পায়ের দিক থেকে তাহলে প্রথমে দেখবে বালি। তারপর জল। ঘোলা রঙ ওঠা জল। দেখতে দেখতে মনে হবে তোমার যেন দিগন্ত অবধি বিস্তৃত ওই ঘোলা জল। কিন্তু সে দিকে তাকালে বুঝতে পারবে সেই অবধি পৌঁছতে পারেনি। বরং তার আগেই থমকে গিয়েছে পাহাড়ের পায়ে। ধূসর রঙহীন পাহাড়গুলো। আকাশ খসে পড়া স্তুপাকৃত ছাই যেন। পড়েছে জলে ধারে। আকাশের মৃত ভস্ম। আকাশ পোড়া ছাই।’

আসলে তখন লিখতে পারি না। গদ্যভাষা জানি না। ভাষার নিয়ন্ত্রণ জানি না। জানি না গল্পকে কীভাবে লিখতে হয়। কীভাবে গল্পকে বাঁধতে হয়। আমি যেন কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতল ধরে ঝাঁকিয়েছি অনেকক্ষণ ধরে। আর সেই বোতলের ছিপি হঠাৎ খুলে দিয়েছি ভস করে। ঝাঁঝালো জলের মত উপচে পড়ছে কাঁচা আবেগ। সেই গল্পটাই ছাপা হয়ে গেল। দেশ পত্রিকায়। অথচ সেই গল্পের পরে লিখতে চেষ্টা করা গল্পগুলো আমাকে বলে দিল আমি লিখতে পারিনা। লিখতে শিখিই নি।

আসলে লিখতে কেউ শেখেনা। যেমন কেউ বাঁচতে শেখে না। জীবনই তাকে শেখায় কীভাবে বাঁচতে হবে। জীবনই তাকে শেখায় কীভাবে লিখতে হবে।

রাজনীতির সংস্পর্শ ছেড়ে দিয়েছিলাম। পাশ করেছিলাম ফিজিক্স অনার্সটাও। তারপর চাকরি নিয়ে ফেলল আমেদাবাদে। তারপর মুম্বাইতে। না সেই রাজনৈতিক ভদ্রলোক নয়। আমাকে আসলে মুম্বাইতে নিয়ে গিয়েছিল আমার লেখাই। অ্যাপ্লাই করে আমি হয়ে গিয়েছিলাম ইন্টার্নাল ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় সহায়ক। সেইখান থেকেই চলে গেলাম কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজিতে। আমার আশেপাশে যারা সবাই ইকোনমিস্ট। কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজি থেকে সরে গেলাম ব্র্যান্ডিং-এ। দেওয়া হয়েছিল আমাকে। তার কারণও আমার লেখা। লিখতে পারা।

কিন্তু ওই মুম্বাই শহরই আবার আমাকে গল্প লেখাবে। আমার অফিস ছিল মুম্বাইয়ের, শুধু মুম্বাইয়ের নয় এশিয়ারও প্রায় সব থেকে ধনী এলাকায়। মার্সেডিজ বেঞ্জ, ডিজাইনার পোশাক, উঁচু বাড়িদের দেশ। আর আমার বাড়ি ফেরার পথে, ট্রেন রাস্তায় পড়ত এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র অঞ্চল। মুম্বাইয়ের এম ওয়ার্ড। ঘিঞ্জি বস্তি। পচা নালা। ঘুপচি ঘুপচি ঘর। গন্ধ আসত। মুম্বাই শহরই আমায় ফিরিয়ে দিল লেখায়। না লিখে উপায় ছিল না। ফাইভ স্টার হোটেলে প্রেস কনফারেন্স করে ফিরতাম গভীর রাতে। আর তখনই সামনে এসে দাঁড়াত এক পাল কুকুর। গেরিলা যোদ্ধার মত তারা রাস্তা আটকে দাঁড়াত। আর আমি ‘নড়াইল ইনসান’, ভিতু মানুষ ক্রমশ সরে যেতাম পেছনে। ছাতাটা নিয়ে আত্মরক্ষার মতো কৌশল করতাম। কিন্তু কুকুরগুলো চেঁচিয়েই যেত। আমি স্পষ্ট শুনতে পেতাম ওরা আমাকে শ্রেণী শত্রু বলছে। শ্রেণী শত্রু। শ্রেণী শত্রুই তো। আমার কাছে এখন উচ্ছেদ হওয়া মানুষ শুধুই প্রজেক্ট অ্যাফেক্টেড পারসনস। আমার কাছে দেশের স্বাস্থ্য খাতে খরচ কমিয়ে রাস্তা বানানো – ইনফ্রাস্ট্রাকচর ডেভেলপমেন্ট।

ট্রেনের অনন্ত সফরগুলো, বর্ষাকালে আরো অনন্তকাল আটকে থাকা, অফিসের চাপ, কর্পোরেট পলিটিক্স, আমাকে আবার লেখায় ফিরিয়ে দিল।

কী লিখি কেন লিখি? কথা বলতে চাই তাই লিখি। কেন কথা বলতে চাই? কী কথা বলতে চাই? শুধু অভিজ্ঞতাই কি একজন মানুষকে লেখক করে? তাহলে তো পৃথিবীর সব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষই লেখক হতেন।

আসলে লিখতে চাওয়া একটা দায়। নিজেকে বুঝতে চাওয়ার দায়। নিজেকে বোঝাতে চাওয়ার দায়। জীবনের অসংখ্য ঠোক্কর খেতে খেতে ছাল উঠে যাওয়ার জ্বালাগুলোকে ভুলতে শেখার দায়। প্রবল অপমানগুলোকে মেনে নিয়ে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসার দায়।

আসলে কোনও স্বাভাবিক মানুষ জীবনেও লেখক হতে চাইবেন না। কেনই বা চাইবেন? তিনি কাজ করতে পারেন, অর্থ রোজগার করতে পারেন, প্রেম করতে পারেন, রমণ করতে পারেন, ঘুমোতে পারেন। এইসব ছেড়ে তিনিই কেনই বা লিখতে আসবেন? আসবেন শুধু এই কারণেই যে তিনি আসলে এই গোটা নিয়মতন্ত্রে কোথাও নিজেকে মানাতে পারেন না। কিছুতেই বলে উঠতে পারেন না নিজের কথাটা। আর এই না বলতে পারার, নিজেকে না বোঝাতে পারার, জীবনের জটিল আবর্তে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আটকে যাওয়ার প্রান্তিকতাই তাকে লেখক করবে। আমাকেও করেছিল।

আমি তাই খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম আমার মতো মানুষদের। যারা আমার মতই একা। আমার মতই জীবনের অলীক বাস্তবতায় নিয়ন্ত্রণহীন ভেসে যেতে যেতে খড়কুটোটুকুই আঁকড়ে ধরতে চায় বার বার। আমি তাদের সঙ্গেই কথা বলতে চেয়েছিলাম। জানাতে চেয়েছিলাম দেখও আমিও আছি। আমিও তোমারই মতন।

‘In the depth of winter, I finally learned that within me there lay an invincible summer.’ আমি বুঝেছিলাম ‘Man is the only creature that refuses to be what he is.’ আর তাই আমার লেখালেখি আসলে একটা প্রচেষ্টাই মাত্র, যে প্রচেষ্টা মানুষকে বুঝতে শেখার। মানুষের কথা বলার প্রচেষ্টার। আমার অনন্ত পাপবোধকে ধুয়ে দিতে চাওয়ার।

আমার লেখায় তাই বাস্তবকে আমি দুমড়ে দিতে চেয়েছি। চেয়েছি বাস্তবকে মুচড়ে আসলে আরো সহনীয় করে তুলতে। কিংবা পালটা আক্রমণ করে আরো দুঃসহ করে দিতে। আসলে বাস্তব একঘেয়ে। অর্থহীন। বাস্তব মানে হল রোজ সকালবেলা উঠে অফিসে গিয়ে বসের কাছে নিজের অকর্মণ্যতার কথা শোনা। বাস্তব মানে বস্তারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রাষ্ট্রের তাণ্ডব দেখতে পাওয়া। বাস্তব মানে হল কালো মেয়েটার দিকে কোনও দিন তাকাবে না তার ব্যক্তিগত শাহরুখ খান। ক্লান্তিকর সত্য। বরং অফিসের বদ্ধ কামরায় হঠাৎ যদি একটা বিরাট কালো পাখি জানলা ভেঙে এসে আমার বসকে ধরে হঠাৎ উড়ে যায় বাইরের আকাশে। কিংবা অফিস থেকে বার হওয়ার মাত্রই আশপাশের বাড়িগুলো ভেঙে যদি একটা বিরাট লুডোর বোর্ড হয়ে যায়, তাহলে সেটা আকর্ষণীয়। যদি রাষ্ট্রের সাঁজোয়া গাড়িগুলো খনিজ পদার্থের জন্য আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদের ঠিক আগে মুহূর্তে এক সঙ্গে ইচ্ছে করেই অকেজো হয়ে যেতে শুরু করে, তাহলে সেটা আকর্ষণীয়। যদি কালো মেয়েটার বাসন মাজার মুহূর্তে হঠাৎ সত্যি শাহরুখ খান বিরাট কালো গাড়ি থেকে নেমে এসে তাকে হিরোইন হওয়ার প্রস্তাব দেন তাহলে সেটা আকর্ষণীয়। আমার সামনে দাঁড়ানো গেরিলা যোদ্ধার মত কুকুরগুলোর যদি হঠাৎ করে ডানা গজাত। অন্ধকারেই তারা হয়ে উঠত এক একজন মূর্তিমান দেবদূত। যারা আমাকে শেখাবে বাঁচার মন্ত্র। তাহলে ভয়ের বদলে সম্মোহিত হতাম আমি।

কেউ ভাবতে পারেন, এর মধ্যে ভালো কী হল? এতো বলিউডের ছেলে ভোলানো সিনেমা। আমি তাঁর সঙ্গে একমত হব না। না আসলে বাস্তবকে দুমড়ে যেমন সহনীয় করা যায় তেমনি অসহনীয়ও করা যায়। ভাবুন আপনার বাড়িতে যিনি সহায়তা করেন, তিনি একদিন ছুটি নিয়েছেন বলে যখন আপনি চিৎকার করছেন, ঠিক তখনই যদি সেই কাজের মেয়েটার চোখের দু তারায় আপনি হঠাৎ আপনার অফিসের বসের মুখ দেখতে পান তাহলে কেমন হয়? কিংবা গরুর ছাল ছাড়ানোর অপরাধে যখন মানুষ হত্যার খবর পড়তে পড়তে, ভোগবাদী সংস্কৃতির দাপটকেই ভালোবাসতে গিয়ে আপনি যদি হঠাৎ দেখতে পান একটুকরো নাৎসি জার্মানি?

এইগুলো ঘটেনা সাধারণ জীবনে। কিন্তু ঘটেতো যেতেই পারে যে কোন মুহূর্তে। আর তারপর বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে আপনার মনের কোনও অন্ধকার কোণে। এইটুকুই আসলে আমার চাহিদা। এই জন্যই আমি গল্প বলতে চাই। যে গল্প মানুষকে বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে পারব।

আমি আসলে আমার কথাই বলব। কিন্তু বলব গল্প বলার ছলে। আপনার সামনে অসংখ্য মায়াজাল তৈরি করে আপনাকে বাধ্য করব আমার কথা শুনতে। আর আপনি যখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঢুকে যাবেন আমার গল্পে, তখন আমি আপনার মাথায় হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে ঢুকিয়ে দেব আমার কথা।

কেন লেখে একজন লেখক? কথা বলতে চায় বলে। অনর্গল বক বক করতে চায় বলে। এবং সে জানে যে তার এই একঘেয়ে ক্লান্তিকর বকবকানি শুনবে না কেউই। তাই সে ছুতো খোঁজে। নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, ট্র্যান্সপোজ করে তার মতোই অন্য মানুষের মধ্যে। সে সব মানুষ যাদের কথা বলার ভাষা নেই। লেখক নিজেই তার স্বঘোষিত মুখপত্র হয়ে ওঠে।

লিখতে লিখতে একসময় বুঝতে পারি কিচ্ছু হচ্ছে না। পারছি না। তবু লেখার কাছেই ফিরে আসি। আমার ঘরের দরজা জানলাগুলো বন্ধ করে সোজা তাকাই কম্পিউটারের স্ক্রিনে। তারপর কখন একসময় আমার দেওয়ালগুলো পালটে যায়। আয়না হয়ে যায়। সেই আয়নায় অসংখ্য আমার মুখ দেখতে পাই। তারপর তারা অবয়ব বদলে ফেলে হয়ে যায় অন্য মানুষ। আর আয়নাগুলোও মিলিয়ে গিয়ে দেখা যায় সুদূর অবধি। আমার চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যবিহীন অজস্র আমি তারপর ছুট লাগায়। দৌড়তে থাকে আমার পাড়া ছাড়িয়ে, অঞ্চল ছাড়িয়ে, কলকাতা শহর ছাড়িয়ে, ভারতবর্ষের মানচিত্র ধরে তারা ছুটতে থাকে। ছুটতে থাকে মুম্বাইয়ের ঘিঞ্জি বস্তিতে, আহমেদাবাদের পুরোনো শহরের মুসলিম মহল্লায়, ঠেট হিন্দি বলয়ের অচ্ছুত গ্রামে, কিংবা আরো দূরে পোল্যান্ড কিংবা অ্যামেরিকায়। প্যালেস্টাইনে কিংবা সিরিয়ায়। আর আমার ঘরের ভেতর ভাসতে থাকে সমস্ত বর্ণমালা। বাংলা ভাষার অযুত শব্দ। আমি শুধু তাদের জুড়ে নিই লেখার শরীরে। তারাই হয়ে ওঠে আমার লেখা।

জানি সে লেখা উৎরায় না। জানি সে লেখা আসলে ভস্মের মত ক্ষণভঙ্গুর। জানি ছাই লিখি। তবু লিখি। বেশ করি লিখি। আমার যে বলার আর কোনও উপায় নেই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন