মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মিখাইল বুলগাকভের গল্প : লাল মুকুট

ভাষান্তর : তৃপ্তি সান্ত্রা

মোটের ওপর রোদ, লোকজনের চিৎকার আর এক নাগাড়ে খট খট দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ অসহ্য লাগে।লোকজনকে এমন ভয় পাই যে, সন্ধেবেলায় বারান্দায় কারো পায়ের আওয়াজ বা গলার স্বর শুনলেই কাঁদতে বসি। এই জন্য আমার ঘরটি একটু বিশেষ। গোলমাল নেই। নিরালা। বারান্দার শেষ প্রান্তে ২৭ নং এই ঘরটিই সবচেয়ে ভালো।

কেউ এলে আমাকে দেখতে পাবে না। তবু আমার নিরাপত্তা আরো নিশ্চিন্ত করার জন্য, একটা টাইপ করা সাটিফিকেটের দাবিতে ইভান ভ্যাসিলিয়েভিচ এর হাতে পায়ে ধরেছি, এমনকী কেঁদেও ফেলেছি সামনে। তিনি রাজি হয়েছেন লিখে দিয়েছেন, আমি তাই সুরক্ষায় আছি। অন্য কারো আমাকে নেবার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী তাঁর দস্তখতে আমার তেমন আস্থা নেই। তিনি তাই এমনকী প্রফেসরকে জোর করে সই করিয়ে প্রমাণ পত্রে নীল রঙের ছাপ্পা লাগিয়েছেন। এই ব্যাপারটা একটু আলাদা। আমি অনেকগুলো ঘটনা জানি, যেখানে লোকজন, কেবলমাত্র পকেটে রাখা সীলছাপা মারা কাগজের টুকরাটির কাজেই ঋণী। একথা সত্যি বানরডিনসকের শ্রমিকটির মূখ ছিল ঝুলে ঢাকা। একটা দোমড়ানো সিল মারা কাগজ জুতোর মধ্যে পেয়ে রাস্তার ল্যাম্প পোস্টে ঝোলানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু ওটা এটা একদম ভিন্ন বিষয়। সে ছিল বলাশভিক অপরাধী আয় নীল সীল হচ্ছে অপরাধীর ছাপ্পা। এটা তাকে রাস্তার আলোর কাছে নিয়ে আসে আর এই রাস্তার বাতি-ই আমার অসুস্থতার কারণ। (চাপ রেখো না। আমি নিজে খুব ভালোভাবে জানি, আমি অসুস্থ।)

মোদ্দা কথা কলিয়া-র আগে আমার একটা কিছু হয়েছিল। ফাঁসিটাসি দেখা চাপের। আমি পালিয়েছিলাম। কিন্তু পাটো কাঁপতেই থাকতো ভয়ে। তারপর, সত্যি সত্যিই কিছু করতে পারতাম না। এখন অবশ্য বেশ জোর গলায়, সাহসের সঙ্গেই বলতে পারি, ‘জেনারেল স্যার, তুই একটা জানোয়ার। মানুষকে ঝোলানোর ক্ষমতা নেই তোর’ এই ডায়ালগ শুনেই বুঝতে পারো আমি মোটেও ভী্তু নই। আর ছাপ্পাটা যে আনিয়েছি সেটা মোটেও ভয়ে নয়। না, আমি মরতে ভয় পাই না। নিজেকে গুলি করে মারবো। খুব শিগগিরি। নইলে কলিয়া হেঁচড়ে নিয়ে যাব হতাশার কিনারে। তবে কলিয়াকে না দেখার জন্য বা না শোনার জন্য নয়। অন্য লোকেরা আসবে...এই ভাবনাটা জঘন্য। কদাকার।
....

সারাদিন শেষ পর্যন্ত সোফায় শুয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমাদের সবুজ বাগানের ওপরে একটা খোলা জায়গা; পাশে একটা জানালাহীন কানা সাততলা বাড়ি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এর গায়ে ছাদের ঠিক নীচে জংধরা একটা সাইন বোর্ড। সাদা বড় হরফে লেখা ‘দাঁতের পরীক্ষাগার’। প্রথম প্রথম দেখতেই ঘেন্না করত। তারপর এর সঙ্গে এমন অভ্যস্ত হয়ে গেলাম যে ওটা সরে গেলে, বোর হায়ে যাব। সারাদিন ওটা ওখানে রাজ করে; আমি আমার সমস্ত মনোযোগ দিয়ে দেখি, আর নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাবি। কিন্তু সন্ধে নামে। আকাশ কালো হয়ে আসে। সাদা অক্ষরগুলো মিলিয়ে যায়। দেখা যায় না। আমা্র চিন্তাও লোপ পায়। আমি বিবর্ণ হতে হাতে ঘন কালো অন্ধকারে ডুবি। সবটাই ধরাছোঁয়ার বাইরে লাগামহীন। একটা বা্দামী রঙের বেড়াল নরম পা ফেলে করিডোরে পায়চারি দেয়। আর আমি মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠি। কিন্তু আমি আলো নেভাতে দিই না। আলো দপ করে জ্বলে উঠলে আমি নিজের হাত মুচড়ে মুচড়ে সা্রা সন্ধে ফোঁপাবো।। এর চেয়ে ঘন অন্ধকারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দৃশ্য শুরু হবে তার জন্য বিনম্র অপেক্ষা ভালো।

..................

আমার বৃদ্ধা মা বললেন, 'এই ভাবে বেশিদিন বাঁচবো না। পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি বড়ো। আমি জানি তুমি ওকে ভালোবাসে। কলিয়াকে ফিরিয়ে আনো। ফিরিয়ে আনো। তুমি বড়ো, তোমাকেই আনতে হবে।’

আমি নিশ্চুপ।

তিনি তখন আকুলভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন।

“ওকে খুঁজে বার করো। তুমি এমন ভাব করছো যে এভাবেই হবে। কিন্তু আমি তোমাকে জানি। তুমি বুদ্ধিমান এবং আনেকদিন থেকে এটা বুঝেছো যে এটা পাগলামি। একদিনের জন্য ওকে নিয়ে এসো। একদিনের জন্য। তারপর ওকে আবার যেতে দেবো।'

মিথ্যে বলছে। তিনি কি আবার তাকে যেতে দেবেন। আমি চুপ করে রইলাম।

‘আমি শুধু ওর চোখ দুটোতে চুমু খাব। তুমি জানো ওকে যেভাবেই হোক মেরে ফেলবে। তোমার মায়া হচ্ছে, হচ্ছে না? সে আমার ছোট ছেলে। আর কাকে বলবো? তুমি বড় ভাই। ওকে নিয়ে এসো। ’

আমি আর এটা নিতে পারছিলাম না। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললাম,"বেশ"।

কিন্তু আমার জামা টেনে ধরে মা আমাকে তাঁর মুখোমুখি করালেন। ‘না। আমার কাছে, প্রতিজ্ঞা করো। ওকে জীবিত নিয়ে আসবে।

কিভাবে এরকম কথা দেওয়া যায়। আমি উন্মাদ, ‘কথা দিলাম নিয়ে আসবো।’

....

মার বুক ভেঙে গেছে, এই ভাবনায় রওনা হলাম।

বার্ডিয়ানক্স-এর ঝুঁকে আসা রাস্তার আলো দেখতে পাচ্ছিলাম। জেনারেল, আমি স্বীকার করি, আমি আপনার চেয়ে কোনও অংশে কম দোষী নই। ঝুলমাখা লোকটির জন্য জঘন্যতম দায়িত্ব পালন করেছিলাম। কিন্তু এ নিয়ে আমার ভাইয়ের কিছু করার নেই। সে মাত্র উনিশ বছরের।

বার্ডিয়ানক্স-এর ঘটনার পর আমি ওকে পেতে মরীয়া। কুড়ি ভার্স্ট দূরে একটা ছোটো ঝোরার পাশে ওকে পেলাম। দিনটা অস্বাভাবিক রকমের উজ্বল । সাদা ধুলোর ঘোলা মেঘের মধ্যে ঘোড় সওয়ারীরা ধীরে ধীরে সারি বেঁধে গ্রামের রাস্তার দিকে এগোচ্ছে। গ্রাম থেকে একটা পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে। বাইরের দিকে প্রথম ধাপে ও উঠছিল। টুপির কিনারা ওর চোখ ঢেকে ফেলেছে। সব কিছু মনে আছে আমার : ওর ডান দিকের জুতোর কাঁটা সারা পথ গোড়ালিতে লুটিয়ে রইল। পোশাকী মাথার টুপির ফিতে ঢিলে হয়ে গলা ছাড়িয়ে ঝুলে রইলো চিবুকে। 

‘কলিয়া--কলিয়া’ চেঁচিয়া ডাকতে ডাকতে রাস্তার ধারের গর্ত অব্দি গেলাম ও হাঁটতে শুরু করল। ফাইলে দাঁড়ানো ঘামে ভেজা বিষণ্ন সৈন্যরা মাথা ঘোরালো। 

‘ওঃ দাদা’ সে সে চিৎকার করে সাড়া দিল। কী কারণে সে কখনও আমার নাম ধরে ডাকত না, সব সময় 'দাদা' বলতো। আমি ওর চেয়ে দশ বছরের বড়। ও সব সময় আমার কথার গুরুত্ব দিত। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকে সে বলে চলছিল ‘বনের পাশে থাকো। আমরা ঠিক ফিরে আসবো। দলকে ছেড়ে আমি একা যেতে পারবো না।'

বনের প্রান্তে, অবতরণকারী সেনাদলের পাশে, আমরা লোভীর মতো সিগারেট ফুঁকতেই থাকি। আমি শান্ত, দৃঢ়। সবটাই পাগলামি। মা একদম ঠিক।

আমি ফিস ফিস করে ওকে বলি, 'গ্রাম থেকে ফিরলেই, আমার সাথে শহরে যাবে। এক্ষুণি এখান থেকে পালাও, চিরদিনের জন্য।’

“কি বলছো দাদা?’

'চুপ কর', আমি বলি, "চুপ কর। আমি জানি, সব বলবো।”

সৈন্য দল ওপরে উঠতে থাকে। ঢেউ এর মতো এগোয়, ঘন কালো মেঘের মোকাবিলায় টগবগে ঘোড়া ছোটায়। দূরে শুরু হয়েছে গুলি যুদ্ধ-- ট্যারা রা..ট্যারা রা..

এক ঘণ্টার মধ্যেই কী ঘটবে? ওরা ফিরে আসবে। আমি লাল ক্রুশ্চিহ্ন নিয়ে তাঁবুর পাশে অপেক্ষায় রইলাম। 

…..

এক ঘণ্টা পরে ওকে দেখলাম। একইভাবে সে ফিরে এলো, টগবগ করে। কিন্তু কোনও সৈন্যদল নেই। মাত্র দু'জন ঘোড়সওয়ারী বল্লম নিয়ে ওর পাশে পাশে টগবগিয়ে আসছে। তাদের একজন-- ডান দিকের জন--বারবার ভাইয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে যেন সে ফিস ফিস, করে কোন কথা না ভাইকে। সূর্যের দিক থেকে চোখ কুঁচকে সরিয়ে আমি অদ্ভুত ভেকধারীদের দেখতে থাকি। ভাই ধূসর রঙের টুপি পরে গিয়েছিল। ফিরে এলো লাল টুপি পরে। দিন শেষ হয়ে এসেছে। সে এখন ১টা কলো ডিসপ্লে বোর্ড মাত্র। মাথায় চুল নেই। কপালও নেই। তার বদলে আছে হলুদ দাঁতের মালা গাঁথা একটা লাল গোড়ের মালা।

ঘোড়ায় সওয়ারী আমার ভাই, আলুথালু বক্তাক্ত মাথা আর মুখে ফেনা নিয়ে ঘোড়ার ওপর নিশ্চল বসে আছে, ডান দিকের লোকটা যদি তাকে যত্ন করে ঠকা দিয়ে না রাখে, মনে হবে সে কুচকাওয়াজে যাচ্ছে।

ঘোড়ার পিঠে গর্বিত কোচোয়ান। কিন্তু লোকটা অন্ধ এবং বোবা। দুটো রক্তাক্ত কোটর থেকে রক্ত বইছে, এক ঘণ্টা আগেও সে দুটো ছিল স্বপ্নময় চোখ…

বাঁ দিকের সওয়ার, ঘোড়া থেকে নেমে হাতে লাগাম ধরে ডান হাতে খুব আলতো করে ধরে কলিয়াকে নামায়। বোমায় ধাতব টুকরোয় কলিয়া ছিন্নবিচ্ছিন্ন।

একটি গলা শোনা যায়-- ‘কোথায় স্বেছাসেবীরা--বোমার ধাতব টুকরায় ধ্বস্তু ও-- ডাক্তার ডাকো।' 

তখন কালো স্তর আরো ঘন হয়ে আসে। ঢেকে ফেলে সব কিছু, এমন কী মাথার ঢাকনা পর্যন্ত...

…...

সব কিছু আমি দিতে পারি। আমাকে সাদা বাড়ি, গোধূলি, দরজায় ঝোলানো বাদামী বেড়াল, কিন্তু ও আসছে...এটা সহ্য করতে পারি না। প্রথম বার। তখনও আমি নিচে ৬৩ নম্বরে থাকি--ও দেয়াল বেয়ে এলো। লাল মুকুট পরে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঘুমের মধ্যে ওকে ওই ভাবেই দেখি। কিন্তু আমি খুব ভালো ভাবে জানি যে মাথায় মুকুট মানেই, সে মৃত। আর সে কথা বলে।ঠোঁট নাড়িয়ে। শুকনো ঠোঁট, রক্তে জবজবে। সে মুকুট খোলে। প্রস্তুত হয়। মাথায় হাত ঠেকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলে “দাদা, আমি এই বাহিনী ছেড়ে যেতে পারব না।”

আর সেই থেকে, সেই একই, একই ঘটনা ঘটে। সে সৈনিকের পোশাকে আসে। কাঁধে ফিতে, বাঁকানো আর বোবা জুতোয় কাঁটা আর সেই একই কথা বলে। সেলাম দেয়। আর তারপর, ‘দাদা, আমি এই বাহিনী ছেড়ে যেতে পারব না.. ’ 

সেই প্রথম বার যা বলেছিল। সমস্ত সেবা সদনকে ভয় দেখায় ও। আমাকে গ্রাস করে। সাধারণ জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে আমি যুক্তি সাজাই; মুকুট পরে আছে মানে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। মারা যাবার পরও সে আসে, কথা বলে, তার মানে আমি পাগল হয়ে গেছি।

….

হ্যাঁ। এখানে গোধূলি। শাস্তি পাওয়ার চরম মুহূর্ত। কিন্তু একদিন এমনও ছিল, ঘুমিয়ে পড়েছি আর দেখছি লাল কাপড়ে ঢাকা পুরনো আসবাব নিয়ে এক অথিতিশালা। আরারদায়ক চেয়ারটির পায়া ভাণ্ডা। দেওয়ালের ছবি কালো ফ্রেমে বাঁধানো ধুলায় ঢাকা। গাছপালা বালুময়। পিয়ানোর ঢাকনা খোলা, তার ওপর 'ফাউস্ট'-এর স্বরলিপি। সে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার হৃদয় বন্য আনন্দে লাফিয়ে উঠেছে। সে ঘোড়সওয়ার নয়। সেই সোনালি দিনগুলিতে যেমন ছিল তেমন—কালো রঙেরর দু-পিস জ্যাকেট, কনুইয়ের কাছে চক সাদা। তার উজ্জ্বল চোখে দুষ্টুমি ভরা হাসি, কপালে এসে পড়েছে এক গুচ্ছ চুল। সে মাথা নাড়ছে। 

“দাদা, এসো আমার ঘরে। একটু অপেক্ষা করো, দেখো, আমি তোমায় কী দেখাই।' 

ওর চোখের আলোর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বসার ঘর আর একটা অপরাধের বোঝা গলে যাচ্ছে আমার বুকে। 

কোথাও সেই অভিশপ্ত দিনটি নেই, যেদিন ওকে আমি বলেছিলাম-- ‘যাও’, কোথায় ত্রাসের সড়সড় আওয়াজ নেই, ধোঁওয়া নেই, পোড়া গন্ধ নেই। সে আমাদের ছাড়েনি, ঘোড়সওয়ারও হয়নি। সে পিয়ানো বাজায়। সাদা চাবিগুলো আবার সুর ফিরে পেয়েছে, এর আলো থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে গুচ্ছ গুচ্ছ সোনালি কাগজের তোড়া। কী প্রাণবন্ত ওর গলার স্বর। ও হাসছে।

…...

তারপর আমার ঘুম ভাঙলো। কোথাও কিছু নেই। চোখ নেই। আলো নেই। আমি কখনও এরকম স্বপ্ন দেখিনি। কিন্তু ওই একই রাত্রে আমার ওপর ঐ নারকীয় অত্যাচার আরো তীব্র করার জন্য, মিলিটারি পোশাকে ধীর গতিতে এক ঘোড়সওয়ার এলো। আমাকে চিরন্তন কিছু বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। 

আমি ব্যাপারটা শেষ করতে চাইছিলাম। আমি বেশ জোরের সঙ্গে বললাম, 'কে তুমি, সারা জীবন জ্বালিয়ে মারছো ? কেন আসো? আমি সব স্বীকার করছি। তোমার দিক থেকে আমি দোষ আমার দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছি। কারণ আমি যে তোমায় যুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম তা অভ্রান্ত, চুড়ান্ত। ফাঁসি দেওয়ার অপরাধও আমি স্বীকার করছি। এসব যখন বলছি। দয়া করে। শান্তিতে থাকতে দাও আমায়।"

জেনারেল, স্যার, সে কিছু না বলে চলে গেল। 

এতদিনে অত্যাচারে শক্ত হয়ে গেছি। মানে প্রাণে চাইছি একবার সে অন্তত তোমাকে দেখাতে আসবে, মাথায় হাত তুলে স্যালুট জানাবে। আমি নিশ্চিত জানি, আমার ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে, তোমার ক্ষেত্রেও তেমন হবে। মুহূর্তের মধ্যেই হবে। কিন্তু তুমি সম্ভবত রাত্রে একা থাকে না, না? কে জানে ঝুলমাখা সেই লোকটা বার্ডিয়ানক্স-এর রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকে তোমায় দেখা দেয় কীনা! যদি তাই হয়, আমরা উৎফুল্ল। ফাঁসিতে লটকাতে সাহায্য করার জন্য, আমি কলিয়াকে পাঠিয়েছিলাম। তুমি বেআইনি মৌখিক আদেশ দিয়েছিলে।

আর সেই জন্যই ও চলে যায়নি। আমি কেঁদে কেটে ওকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে চেয়েছিলাম। সবাই জেগে উঠলো। একজন মহিলা স্বাস্থ্যকর্মী দৌঁড়ে এলেন। ইভান উঠে পড়লেন। আর একটা দিন দেখার আমার কোনও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওরা মড়তে দিল না আমায়। এক খণ্ড কাপড়ে বেঁধে, আমার হাত থেকে গ্লাস কেড়ে নিয়ে, বেঁধে রাখালো আমায়। সেই থেকে আমার ঠিকানা রুম নং ২৭.. খানিকটা ওষুধ খাওয়ার পর, ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে শুনছি, মেডিক্যাল অ্যাটেন্ডান্ট বলছে, বেকার। ফালতু একটা…

…...

এটা সত্যি। আমার কোনও আশা নেই। সন্ধেবেলায়, তীব্র মানসিক যন্ত্রণায়, শুধু শুধু ঘুমের জন্য প্রতীক্ষা করি-- সেই পুরোনো চেনা ঘরের প্রতীক্ষা । তার উজ্জ্বল চোখের নরম আলোর প্রতীক্ষা। কোনোটাই নেই, আর থাকবে না কোনোদিন।

এতে বোঝা হালকা হয় না ... কমে না। রাত্রে আমার সেই অতি পরিচিত চক্ষুহীন ঘোড়সওয়ারের জন্য দীন প্রতীক্ষা, যে কর্কশ কণ্ঠে আমায় বলবে, ‘আমি সেনাদল ছাড়তে পারব না।'

হ্যাঁ। আমার কোনও আশা নেই। আমৃত্যু দগ্ধহব অত্যাচারে।


পরিচিতি
মিখাউল বুলগাকভ
জন্ম ১৮৯১, কিয়েব। মৃত্যু ১৯৪০. মস্কো।
তিনি প্রখ্যাত রুশ লেখক, ডাক্তার ও নাট্যকার।
তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস--দি মাস্টার এন্ড মারগারিতা। এই উপন্যাসটিকে বিশ শতকের মাস্টারপিস বলা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রেডক্রসের ডাক্তার হিসেবে যুদ্ধের ফ্রন্টে কাজ করেন। এবং দুবার আহত হন। স্ট্যালিন বুলগাকভের নাটক পছন্দ করলেও ১৯২৯ সালে তার লেখা সেন্সর করা শুরু হয়েছিল। স্ট্যালিনের অনুগ্রহেই তাঁকে পুলিশ আটক করেনি। তবে তার বই প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছিল।





অনুবাদক পরিচিতি
তৃপ্তি সান্ত্রা
গল্পকার। অনুবাদক।
পষচিম বঙ্গে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন