বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

চিমামান্দা নগুজি আদিচি’র গল্প: একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

ভাষান্তর: নাহার তৃণা

জানালা বেয়ে নিজে প্রথমে দোকানের ভেতর ঢুকে শাটারটা ধরে থাকলো চিকা, তার পেছনে থাকা মহিলাটির ঢুকতে যেন সমস্যা না হয়। দোকানটা দেখে মনে হচ্ছে দাঙ্গা শুরুর অনেক আগে থেকেই খালি পড়ে ছিল।
কাঠের খালি তাকগুলো হলদে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। এককোণে জড়ো করা ধাতুর পাত্রগুলোতেও ধুলোর স্তর। দোকানটা বেশ ছোটো, চিকার বাড়ির কাপড় রাখার ঘরের চেয়েও ছোটো। মহিলাটি ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে চিকা শাটার ছেড়ে দেয় এবং সেটা কর্কশ একটা শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে যায়। চিকার হাত রীতিমত কাঁপছিল, হিল তোলা জুতো পায়ে কোনোরকমে দৌড়ে বাজার থেকে এতটা পথ আসার কারণে পায়ের গোড়ালি জ্বালা করছে ভীষণ।

আত্মরক্ষার জন্য চিকা মরিয়া হয়ে যেদিকে ছুটছিল, এই মহিলা তখন যদি 'ওইদিকে যাইও না' বলে তাকে না থামাতো এবং নিরাপত্তার জন্য এই দোকানটায় না নিয়ে আসতো, তাহলে হয়ত এতক্ষণে সে মৃতদের সারিতে পৌঁছে যেত; চিকা সেজন্য মহিলাটিকে ধন্যবাদ জানাতে চায়। কিন্তু যে মুহূর্তে সে ধন্যবাদ বলতে যাবে, মহিলাটি তার গলায় হাত রেখে বলে উঠলো, "আয়হায়! দৌড়াইয়া আসবার কালে আমার গলার হারটা হারাইছে।”

"আমি সবকিছু ফেলেই পালিয়ে এসেছি।" চিকা বললো। "কিছু কমলা কিনেছিলাম, ওগুলোর সাথে নিজের হাতব্যাগটিও ফেলে এসেছি।" কমলা আর ব্যাগের উল্লেখ করলেও চিকা সযত্নে চেপে যায় তার হ্যাণ্ডব্যাগটি বারবেরির ছিল, আসল বারবেরি ব্র্যান্ডের, যা সম্প্রতি লণ্ডন ভ্রমণে গিয়ে তার জন্য মা নিয়ে এসেছিলেন।

মহিলাটি গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চিকা আন্দাজ করে সে তার গলার হার নিয়ে চিন্তামগ্ন, যেটি হয়তো প্লাস্টিকের পুঁথি আর একটুকরো সুতোয় গাঁথা নিতান্তই সস্তার মালা। মহিলার প্রকট হাউসা উচ্চারণ না শুনেও চিকা বলে দিতে পারে সে উত্তরদিক থেকে আগত, তার মুখের অপ্রশস্ততা, গালে জেগে থাকা হাড়, যা সচরাচর এদিকটায় দেখা যায় না। তার ওড়না দেখে বুঝে নিতে কষ্ট হয় না সে একজন মুসলাম। ওড়নাটা এখন তার গলায় আলগাভাবে ঝুলে আছে, কিন্তু সেটি দৌড়াবার পূর্বে সম্ভবত তার মাথা এবং কান ঢেকে রেখেছিল। 

মহিলার ওড়নাটা কালো আর কটকটে গোলাপী রঙের দীর্ঘ ফিনফিনে সস্তা কাপড়ের। চিকা ভাবে মহিলাও হয়তো তার দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে, তার গায়ের ফর্সা রঙ এবং হাতে থাকা রূপালি জপ মালা, যা তার মায়ের পীড়াপিড়িতে নিতে হয়েছে, ইত্যাদি দেখে মনে করছে সে ইগবো এবং খ্রিস্টান। পরে চিকা মহিলার সাথে কথা বলে জানবে হাউসা মুসলমানেরা ইগবো খ্রিস্টানদেরকে ম্যাচেট(লম্বা ছুরি) দিয়ে হত্যা করে তাদের আঙুল থেতলে দেয় পাথর দিয়ে। কিন্তু সে এখন বললো, "আমাকে এখানে ডেকে আনার জন্য ধন্যবাদ। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল, আর লোকজনও সব পাগলের মতো ছুটোছুটি শুরু করলো, হঠাৎ করে ওরকম পরিস্হিতিতে কী করা উচিত সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না। ধন্যবাদ আপনাকে।" 

"এই খানটা নিরাপদ।" মহিলাটি এমন আস্তে কথা বলছিল যে ফিসফিসানির মতো শোনালো। "শুধুমাত্র বড় বড় দোকান আর বাজার ছাড়া হেরা এইসব ছোডোমোডো দোকানে হামলা চালায় না।"

‘আচ্ছা",ছোট্ট করে বললো চিকা। এ বিষয়ে তার সহমত কিংবা দ্বিমতের কোনো কারণ নেই, কারণ দাঙ্গা সম্পর্কে তার কিছুই জানা ছিল না। 

কয়েক সপ্তাহ আগে স্হানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্রের স্বপক্ষে যে সমাবেশ হয়েছিল সেখানে সে উপস্হিত ছিল এবং হাতে তরতাজা সবুজ একটা গাছের ডাল নিয়ে "মিলিটারি নিপাত যাক! আবাচা নিপাত যাক! গণতন্ত্র মুক্তি পাক!” এসব স্লোগানে অন্যদের সাথে গলা মিলিয়েছিল। বোনের কারণেই তার সেখানে যাওয়া। চিকার বোন এন্নেদি সমাবেশ আয়োজকদের একজন, যে কিনা হোস্টেলে হোস্টেলে গিয়ে আয়োজনের প্রচারপত্র বিলি করার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের "সবার সম্মিলিত প্রতিবাদ স্বৈরশাসকের কান পর্যন্ত পৌঁছানোর" গুরুত্ব বুঝিয়েছে।

চিকার হাতের কাঁপুনি এখনও থামেনি। ঠিক আধঘন্টা আগে সে এন্নেদির সাথে বাজারে ছিল। সে যখন কমলা কিনছিল এন্নেদি চিনাবাদাম কেনার জন্য বাজারের ঢালু দিকটায় যায় এবং তখনই হঠাৎ ইংরেজিতে, পিডগিনে, হাউসায়, ইগবোতে চিৎকার শোনা যায়। "দাঙ্গা লাগছে ! ভয়ানক বিপদ আসছে!! ওরা একজনকে মেরে ফেলেছে!!" 

চিকার চারপাশে লোকজন ছুটোছুটি শুরু করে, একে অন্যকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগোতে চায়, হুড়োহুড়িতে মিষ্টিআলু ভর্তি ঠেলাগাড়ি উল্টে যায়, একটু আগে যে মহার্ঘ সব্জির দরদামে ব্যস্ত ছিল মানুষ অনায়াসে তা পায়ে দলে পালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চিকা যেন বাতাসে ঘাম আর ভয়ের গন্ধ পায়, সেও ছুটতে শুরু করে,বড় রাস্তা পেরিয়ে ভয় আর ত্রাসে দিকবিদিক ছুটতে, ছুটতে, এই গলি পথে এসে পৌঁছায়, তার তখন মনে হয়েছিল এই গলিটা তেমন নিরাপদ নয়, তার জন্য ভয়ানক বিপদ ওৎ পেতে আছে কোথাও, ভয়টা মন আঁকড়ে ছিল যতক্ষণ না অপরিচিত এই মহিলা তাকে দেখে থামায়।

সে আর সঙ্গের মহিলা কিছুক্ষণ চুপচাপ দোকানটার ভেতর দাঁড়িয়ে থেকে, যে জানালা পথে তারা এখানে ঢোকে সেটা তুলে বাইরের পরিস্হিতি আঁচ করার চেষ্টা করে, জানালার কাঠের পাল্লা বাতাসে কর্কশ শব্দ তোলে। রাস্তাটা প্রথমদিকে একেবারে শুনশান ছিল, কিছু পরে দৌঁড়ে আসা পদধ্বনি শোনা যায়। অবচেতনেই তারা দুজনই ঝট্ করে জানালার পাশ থেকে সরে আসে, তা সত্ত্বে চিকা একজন পুরুষ এবং একজন মহিলাকে চলে যেতে দেখলো, মহিলা তার চাদরটা হাঁটুর উপর ধরেছিল, তার পিঠে একটা বাচ্চা বাধা ছিল। চিকা শোনে পুরুষটা ইগবো ভাষায় খুব নরম স্বরে বলছে, " সে হয়ত দৌড়ে চাচার বাড়ির দিকে গেছে।"

"জানালাটা বন্ধ কইরা দাও," চিকার সঙ্গের মহিলাটা বললো।

চিকা জানালা বন্ধ করে দেয়, এবং তাতে জানালা দিয়ে ভেতরে আসা বাতাস হুট করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরের ভেতর ধুলোর পুরু স্তর যা তার চারপাশে ঘুর্ণায়মান ছিল সেটা তার দৃষ্টিগোচর হয়। দোকানের ভেতরটা এমন গুমোট এবং দুর্গন্ধময় যে বাইরের সাথে তার কোন মিল নেই। মনে হচ্ছে খ্রিস্টমাসের সময় লোকেরা ছাগলের চামড়া ছাড়িয়ে আগুনে ছুঁড়ে দেবার পর পুড়ে যাওয়া লোম থেকে যে গন্ধ বের হয় সেরকম বিটকেলে গন্ধে চারপাশটা ভরপুর। যে রাস্তা থেকে সে অন্ধের মতো দৌড়ে এসেছিল, নিশ্চিত ভাবে জানাও নেই এন্নেদি কোন দিকে দৌড়ে গেছে, এটাও নিশ্চিত করে জানা নেই তার পাশে ছুটন্ত মানুষটা বন্ধু ছিল না শত্রু, চিকা এটাও নিশ্চিত করে জানেনা এন্নেদি ছুটতে ছুটতে পথে থেমে গিয়ে হুড়োহুড়িতে মায়ের হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হতভম্ব চেহারার কোনো শিশুকে কোলে তুলে নিলো কিনা, এমন কি কে যে কে, আর কে কাকে খুন করছিল সেটাও তার জানা নেই।
পরবর্তীতে সে দেখবে আগুনে দগ্ধ হওয়া সারিবদ্ধ গাড়ি এবং সেগুলোর দরজা জানালায় অসংখ্য ছিদ্র। তখন তার চোখে ভেসে উঠবে ঘটনার সময় জ্বলন্ত গাড়িগুলো পিকনিকের তন্দুরী চুলার মতো শহরের মাঝে নিঃশব্দ স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে জানতে পারে যে ঘটনাটির সুত্রপাত হয়েছিল যখন গাড়ি পার্কিং এর কাছে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা কোরানের উপর গাড়ি চালিয়ে দিয়েছিল একজন। যে লোকটা ইগবো এবং খ্রিস্টান। রাস্তার পাশে বসে তখন একদল লোক বসে ছিল। বসে বসে দিনভর তাস খেলায় মগ্ন থাকা সেই লোকদের চোখে ধরা পড়ে যায় দৃশ্যটা, যারা ঘটনাচক্রে মুসলমান। তারা দৌড়ে গিয়ে ওই গাড়ির ড্রাইভারকে টেনে নামিয়ে আনলো। তারপর হাতের ম্যাচেট দিয়ে এক কোপে মাথাটা কেটে নিল। কাটামুণ্ডুটা পাশের মার্কেটে নিয়ে গিয়ে এবং অন্যদেরও ডাক দিয়ে বলে এই ব্যাটা পবিত্র কোরাণকে অপমান করেছিল। লোকটার বিচ্ছিন্ন মুণ্ডু আর তার মৃত্যুর দৃশ্যটা কল্পনা করে চিকার শরীর গুলিয়ে উঠেছিল এবং সে গলগল করে বমি করতে শুরু করেছিলো। তার পেট থেকে সবকিছু খালি না হওয়া পর্যন্ত থামতে পারেনি। কিন্তু এখন সে খুব স্বাভাবিক স্বরে মহিলাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘আপনি কি এখনো ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছেন?"

"হ” মহিলাটি বলে। সে তার গায়ের চাদরটা খুলে ধুলোময় মেঝেতে বিছিয়ে দেয়। তার গায়ে শুধুমাত্র ব্লাউজ যা বেশ চকমকে আর প্রান্তটা ছেঁড়া। সে চিকাকে উদ্দেশ্যে করে বললো, "আসো, এইদিকে আইস্যা বসো।"

চিকা মেঝের উপর বিছানো মামুলি চাদরটা তাকিয়ে দেখে, এটা সম্ভবত মহিলার দুটো সম্বলের একটা। 

আড়চোখে নিজের পরনের দামী ডেনিম স্কার্ট আর স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবিওয়ালা লাল রঙের টি-শার্টটা একবার দেখে নেয়; সে আর এন্নেদি এক আত্নীয়ের সাথে গরমের কয়েক সপ্তাহ নিউইর্য়কে কাটিয়েছিল সে সময় এ দুটো কিনেছিল। "না থাক আপনার চাদরটা খামোখাই নোংরা হবে’, চিকা বলে।

"আরে কোন অসুবিধা নাই, তুমি বসো তো। কতক্ষণ খাড়ায়া থাকবা? এইখানে আমাগো অনেকক্ষণ আটকাইয়া থাকতে হইবো” মহিলাটি যেন চিকাকে চিন্তামুক্ত করতে চায়। অল্প সময়ে কেমন আপন স্বরে কথাগুলো বলে। 

" আপনার কি ধারণা আছে কতক্ষণ?"

"আইজ পুরা রাতটা হইতে পারে আবার আগামিকাল সকালও গড়াইতে পারে"

চিকা তার হাতটি তুলে এমন ভাবে কপালে রাখলো যেন ম্যালেরিয়া জ্বর পরীক্ষা করছে। সচরাচর তার হাতের শীতল তালুটা তাকে এক ধরনের প্রশান্তি দেয়, কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাতের তালু চেটচেটে, ঘামে ভেজা। 

"আমার বোনটা চিনাবাদাম কিনতে গিয়েছিল, তাকে রেখেই পালিয়ে এসেছি। সে এখন কোথায় আমি জানিনা।"

" চিন্তাইও না, বোইনে নিরাপদে আছে।"

"এন্নেদি"।

"অ্যাঁ?"

"আমার বোনের নাম এন্নেদি।"

"এ-ন্ন-দি", মহিলা নামটা পুনরাবৃত্তি করে। তার হাউসা উচ্চারণে ইগবো নামের উচ্চারণটা কেমন মোলায়েম শোনালো।

এখান থেকে চলে যাবার পর চিকাকে দেখা যাবে হাসপাতালের মর্গগুলোতের তন্ন তন্ন করে এন্নেদির খোঁজ করছে। মাত্র গত সপ্তাহেই এক বিয়েতে তোলা তার এবং এন্নেদির একটা ছবি নিয়ে সে পত্রিকা অফিসগুলোতে যাবে; যে ছবিতে তার মুখে একটা বোকাটে হাসি লেপ্টে আছে কারণ ছবিটা তোলার ঠিক আগের মুহূর্তে এন্নেদি দুম করে তাকে চিমটি কেটে বসেছিল, তারা দুবোন একই ধরনের কাঁধখোলা আঙ্কারা গাউন পরেছিল। চিকা বাজারের দেয়ালগুলো সহ আশেপাশের দোকানে তাদের ছবিটার ফটোকপি টেপ দিয়ে সেঁটে দেবে। কিন্তু এন্নেদিকে কোথাও খুঁজে পাবে না চিকা। আর কখনও সে এন্নেদির খোঁজ পাবে না। কিন্তু এখন সে মহিলারটিকে জানায়, "এন্নেদি এবং আমি খালাকে দেখতে গত সপ্তাহে এখানে এসেছি। এখন আমাদের স্কুল ছুটি।"

"তোমরা কোন স্কুলে পড়ো?"

"আমরা লাগোস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমি মেডিসিন নিয়ে পড়ছি। এন্নেদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে’। 

কথাটা বলে চিকা ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কী জিনিস সে সম্পর্কে মহিলার আদৌ কোন ধারণা আছে কিনা। সে আরো ভাবে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারটা তোলার উদ্দেশ্য কী নিজেকে ভোলানোর চেষ্টা কিনা। নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করা যে এন্নেদি দাঙ্গায় নিখোঁজ হয়নি, সে কোথাও নিরাপদে আছে, হয়ত কোনো রাজনৈতিক বির্তকের সূত্র ধরে তার সহজাত প্রাণখোলা ভঙ্গিতে হেসে উঠছে। যেমন কীভাবে জেনারেল আবাচা তার পররাষ্ট্র নীতিকে ব্যবহার করে আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে নিজের বৈধতাকে জাহির করছে কিংবা সোনালি চুলের এত জনপ্রিয়তার পেছনে প্রত্যক্ষ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব আছে কিনা ইত্যাদি।

"এখানে খালার সাথে আমরা মাত্র একটা সপ্তাহ কাটিয়েছি; এর আগে কখনও কানোতে আসা হয়নি আমাদের," কথাটা বলে পরিস্থিতি নিয়ে তার অনুভূতিটা উপলব্ধি করলো চিকা। সে আর তার বোনের তো এসব দাঙ্গায় আক্রান্ত হবার কথা না। এসব দাঙ্গা হলো সংবাদপত্রের বিষয় যা তারা দূর থেকে পড়েই অভ্যস্ত। এরকম দাঙ্গা নিজেদের উপর কখনো আসেনি, এসব কেবল অন্য লোকদের মধ্যেই ঘটে থাকে।

"তোমার খালাও কি বাজারে আসছিল?" মহিলাটি জানতে চায়।

"না, তিনি কাজে ছিলেন। তিনি সচিবালয়ের পরিচালকের পদে আছেন।" চিকা আবারও তার হাতটা কপালে রাখে। সে নীচু হয়ে মাটিতে বসে পড়ে, স্বাভাবিক অবস্হায় হয়ত ওভাবে বসতো না, এখন মহিলার বেশ কাছ ঘেষে চাদরের উপর বসে, যেন নিজের শরীরটাকে চাদরের উপর রেখে বিশ্রাম নিতে পারে। মহিলার গায়ে সে কেমন একটা গন্ধ পায়, যা বেশ ঝাঁজালো এবং পরিস্কারক বার সাবানের মতো তাদের গৃহপরিচারিকা যা বিছানার চাদর ধোয়ার কাজে ব্যবহার করে।

"তোমার খালাও নিচ্চয়ই নিরাপদে আছে, চিন্তাইও না।"

"হ্যাঁ" চিকা মৃদু গলায় উত্তর দেয়। তাদের এ সমস্ত কথোপকথন তার কাছে কেমন পরাবাস্তব মনে হয়, তার মনে হয় এই দৃশ্যকল্পে যেন সে নিজেকেও দেখতে পাচ্ছে। " আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না এমনটা বাস্তবে ঘটছে, এমন দাঙ্গা হচ্ছে।"

মহিলাটি পলকহীন ভাবে সোজাসুজি সামনে তাকিয়ে আছে। তার দেহকাঠামোর সমস্তটাই লম্বাটে আর লিকলিকে, তার মেলে রাখা লম্বা পা জোড়া বেরিয়ে আছে চিকার চোখের সামনে, পায়ের আঙ্গুলের নখে মেহেদির ছোপ।

"এইগুলান সব শয়তানের কাজ।" অবশেষে মহিলা তার অভিমত ব্যক্ত করলো।

চিকা ভাবলো দাঙ্গা সম্পর্কে এই যদি হয় মহিলাটির চিন্তাধারা, তবে তো সে তাদেরও শয়তানের দলভূক্ত ভাবছে। তার মনে হলো আহা এন্নেদি যদি এখানে উপস্হিত থাকতো; সে কল্পনা করলো, মহিলার এই কথা শুনে এন্নেদির পিঙ্গল চোখ জোড়া কি এক কৌতূকে জ্বলে উঠতো, ঠোঁট জোড়া দ্রুত নড়ে উঠতো, সে ব্যাখ্যা দিতো যে দাঙ্গা শূন্যে জন্ম নেয় না, ধর্ম, জাতিসত্তা ইত্যাদি নিয়ে প্রায়শই রাজনীতি করা হয়, কেননা তখন ক্ষুর্ধাতরা একে অন্যকে হত্যা করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে এবং শাসক নিজে নিরাপদে থাকে। চিকার মনটা একটু খচখচ করতে থাকে মহিলা এমন ভাবনাগুলো তার মগজে ধারণ করতে পারবে কিনা ভেবে।

"তুমি কি ইশকুলে অসুখ্যা রুগিগো চিকিৎসা করো?" মহিলাটি জিজ্ঞেস করে। শোনামাত্র চিকা তার বিস্মিত দৃষ্টিটা এত দ্রুত সামলে নিল যে মহিলা টেরই পেলো না। 

"চিকিৎসা মানে রোগী দেখার কথা বলছেন? হ্যাঁ, গত বছর থেকে আমরা এটা শুরু করেছি। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমরা রোগী দেখি।” কিন্তু চিকা এটা বললো না যে তারা ছয়-সাতজন মিলে রোগীর কাছে যায় বটে, কিন্তু সেটা সিনিয়র রেজিস্ট্রারের চোখ এড়িয়ে। যাতে তিনি তাকে কোন রোগীকে পরীক্ষা করে তার রোগ নির্ণয়ের কাজ না দেয়। 

"আমি বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করি," মহিলাটি বলে। চিকা মহিলার গলায় বিদ্রুপ বা অপমানের রেশ আছে কিনা বুঝতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। মহিলার কন্ঠ ছিল যথেষ্ট শান্ত এবং ঋজু , একজন মহিলা কি করে সেটা সে কেবল সপাটে জানাচ্ছে। 

"আশা করি দাঙ্গাকারীরা বাজারের ঝুপরিগুলোর কোনো ক্ষতি করবে না।" চিকা উত্তর দিলো। সে আসলে বুঝে উঠতে পারেনি এছাড়া আর কি বলা যেত।

"প্রত্যেকবার দাঙ্গায় হারামিরা বাজার ভাঙচুর করে।" মহিলাটি বললো।

চিকার খুব জানতে ইচ্ছে করে মহিলা এ পর্যন্ত কতগুলো দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছে, কিন্তু সে তা করলো না। চিকা এর আগের দাঙ্গা সম্পর্কে কিছু পড়েছিল কোথাও: হাউসা মুসলিম উগ্রপন্থীরা ইগবো খ্রিস্টানদের আক্রমণ করে, এবং অন্যদিকে ইগবো খ্রিস্টানেরা বদলা নিতে হাউসাদের উপর সহিংস আক্রমণ চালায়। নাম ধরে দোষারূপপূর্ণ কথাবার্তায় সে যেতে চায় না। 

" মা গো! আমার বুক দুইটা মরিচের মতো জ্বলতাছে।" মহিলাটি হঠাৎ বলে ওঠে। 
"কি?"
"বোঁটা দুইটা এমন জ্বালা করতাছে মরিচ ঘষা দিছে কেউ এমন লাগে। " 

বিস্ময়ে গলা দিয়ে ওঠে আসা বুদবুদ গিলে নিয়ে চিকা কিছু বলার আগেই মহিলা তার ব্লাউজ টেনে ধরে এবং মামুলি কাপড়ের কালো অন্তর্বাসটার সামনে হুক খুলে ফেলে; এবং স্তনজোড়া পুরোপুরি মুক্ত করার আগে ব্রার ভাঁজে রাখা দশ এবং বিশ টাকার নায়রা(নাইজেরিয়ান টাকা) নোটগুলো বের করে আনে।

"জ্বলে রে, চিড়বিড়াইয়া জ্বলতেছে," মহিলা বলে, এরপর নিজের স্তনজোড়া চিকার সামনে এমন ভঙ্গিতে ঝুকে ধরে যেন নৈবেদ্য পেশ করছে। 

চিকা একটু সরে বসে। তার মনে পড়ে গেল এক সপ্তাহ আগের শিশু বিভাগে ডিউটি দেবার কথা। সিনিয়র রেজিস্ট্রার ডাক্তার অলুনলোয়ো সব ছাত্রকে একটা বাচ্চার চতুর্থ ধাপের হৃদস্পন্দন শোনার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে বাচ্চাটা তাদের দিকে কৌতুহলী হয়ে তাকিয়েছিল। ডাক্তার তাকেই প্রথমে পাঠালেন কাজটা করতে সে রীতিমত ঘামছিল তখন, তার আত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল, সে নিশ্চিত হতে পারছিল না হৃদযন্ত্রটা ঠিক কোথায়। সে অনেক খুঁজে কাঁপা কাঁপা হাতটা বাচ্চাটার নিপলের বামদিকে রাখার পর ব্ররররর..ব্ররররর….শব্দে রক্তের ছোটাছুটি টের পেল, তার আঙুলে পালসটা টের পাওয়া যাচ্ছিল, সে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে সরি সরি বলে উঠেছিল যদিও বাচ্চাটা তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। 

যদিও এই মহিলার স্তনবৃন্তের সাথে ওই ছেলেটির কোন মিলই নাই। এটা হলো চিড়খাওয়া, আঁটো এবং গাঢ়বাদামী, বৃন্তের নীচের অংশ খানিকটা হালকা রঙের। চিকা গভীর মনোযোগী চোখে সেগুলো দেখে, ধরে দেখে এবং কিছু বোঝার চেষ্টা করে। 

"আপনার কি কোনো ছোটো বাচ্চা আছে?" সে জানতে চায়।

"হ। এক বছর বয়স।”

"আপনার স্তনবৃন্ত বেশ শুকনো তবে তাতে কোনো সংক্রমণ নেই। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর পর নিয়মিত লোশন ব্যবহার করবেন। এবং যখন খাওয়াবেন তখন খেয়াল রাখবেন যেন স্তনবৃন্ত এবং চারপাশের বাদামী অংশটুকু শিশুর মুখের ভেতর ভালোভাবে প্রবেশ করে।"

মহিলা চিকার দিকে বেশ সময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো। "এই প্রত্থম এরাম হইছে। আমার পাঁচজন পুলামাইয়া।"

"আমার মায়েরও ঠিক এমন হয়েছিল। ছয় নম্বর সন্তান জন্মদানের পর তাঁর স্তনবৃন্তও এমন কর্কশ হয়ে যায়, কেন হয়েছিল, তিনিও তার কারণটা জানতেন না, যতক্ষণ না কোনো বন্ধু তাঁকে জানান যে তাঁর কর্কশভাব কাটাতে লোশন ব্যবহার করতে হবে।" চিকা গড়গড় করে বানানো কথাগুলো বলে যায়। সে সহজে মিথ্যা বলে না, তবে মাঝেমধ্যে একটা দুটো বলে থাকে, মিথ্যার পেছনে সব সময়ই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থাকে।

সে ভাবে এই মিথ্যার পেছনে উদ্দেশ্যটা কি? মহিলাকে তার কথা বিশ্বাস করানোর জন্য এমন একটি অতীত কাহিনি ফাঁদতে হবে যাতে সে নিজের সাথে মিল খুঁজে পায়। অথচ সে এবং এন্নেদি ছাড়া তার মায়ের আর কোনো সন্তান নেই। তাছাড়া মা বৃটেন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা ঠাঁটবাট প্রিয় ডাক্তার ইগবোগওয়ের চিকিৎসা নিতেন যাকে একটা ফোন করলেই পাওয়া যেতো।

"তোমার মা বোঁটায় কি ঘষতো?" মহিলাটি জানতে চায়।

"কোকা বাটার। ওতে চিড় খাওয়া ভাব খুব দ্রুর সেরে ওঠে।"

"অ্যা?"

মহিলাটি কিছুক্ষণ চিকাকে লক্ষ্য করে, এই গোপন উন্মোচন তাদের মধ্যে যেন অদৃশ্য একটা বন্ধন তৈরি করেছে। "ঠিক আছে আমিও ওইটা লাগামু।" কিছুক্ষণ সে তার ওড়নাটি নাড়াচাড়া করে তারপর বলে, "আমি আমার মাইয়াটারে খুঁজতেছিলাম। আইজ সকালে আমরা একলগেই বাজারে গেছিলাম। বাসস্টপের ধারেই সে চিনাবাদাম বেচাবিক্রি করে, কারণ ওদিকটায় মেলা খদ্দের আসে। তখনই মরার দাঙ্গা শুরু হইল, বাজারের উপর নীচ সবখানে খুঁইজ্যা কোথাও তারে পাইনাই।"

"বাচ্চাটা নাকি?" চিকা জিজ্ঞেস করে, মহিলা তার মেয়ে সম্পর্কে বলার পরও সে বেকুবের মতো প্রশ্ন করে বসে।

মহিলা মাথা ঝাঁকায়, তার দুচোখে অসহিষ্ণুতা এমনকি খানিক ক্ষোভের ঝলক দেখা গেল। 

"তোমার কানে কী সমস্যা আছে? শোনোনাই আমি কি বলছি?"

"দুঃখিত" অপরাধী গলায় চিকা বলে।

"বাচ্চা ঘরে আছে। এই জন আমার বড় মাইয়া। হালিমা।" মহিলা কাঁদতে শুরু করে। সে প্রায় নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে, কান্নার দমকে তার কাঁধ ওঠা নামা করে, যে কান্নায় মানুষ সান্ত্বনা খোঁজে, আমাকে ধরো, আমাকে সান্ত্বনা দাও, আমার একার পক্ষে এ শোক সামলানো কঠিন; তার কান্নাটা সেরকম উচ্চস্বরের কান্না নয়। মহিলার কান্নাটা একান্ত ব্যক্তিগত শোকের মতো, যেন সে একটা প্রয়োজনীয় আচার পালন করছে যাতে অন্য কারো ভূমিকা নেই।

পরবর্তী সময়ে চিকার মনে হবে এন্নেদি আর তার উচিত হয়নি ট্যাক্সি নিয়ে বাজারের দিকে যাওয়া, উচিত হয়নি খালার বাড়ির এলাকা ছেড়ে প্রাচীন নগরী দেখতে বের হওয়া। তার আরো মনে হবে মহিলার মেয়ে হালিমা যদি অসুস্থ হয়ে কিংবা আলস্য করে বাড়িতে বসে থাকতো, তাহলে তাকে বাদাম বিক্রি করার জন্য বাজারে আসতে হতো না।

মহিলাটি তার ব্লাউজের প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে নেয়। তারপর বলে "আল্লাহ তোমার বোইন আর আমার হালিমারে নিরাপদে রাখে য্যান”। 

যেহেতু চিকা পুরোপুরি নিশ্চিত নয় যে মুসলমানদের এমন কথার পর 'আমেন' বলার রীতি আছে কিনা, তাই সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

মহিলাটি দোকানের এক কোণায় ধাতবপাত্রগুলোর কাছে মরচে ধরা একটা কল আবিস্কার করে। হয়ত দোকানি এখানে তার হাত ধুতো, মহিলা বললো চিকাকে। সেই সাথে আরো জানায় যে সরকার অবৈধ কাঠামো ভেঙে ফেলার ঘোষণা দেবার পর এই রাস্তার দোকানগুলো কয়েক মাস আগে পরিত্যক্ত হয়েছিল। মহিলাটি কলটা খোলার পর তারা দুজনই অবাক হয়ে দেখলো সেখান থেকে সরু ধারায় জল বেরিয়ে আসছে। বাদামি রঙের তীব্র ভাবে ধাতুগন্ধী, ইতিমধ্যে গন্ধটা চিকার নাকে লাগে। জলের ধারা বয়েই চলেছে
"আমি হাত পাও ধুইয়া নামাজ পড়বো।" মহিলাটি বললো। এখন তার গলারস্বর বেশ উঁচু, এবং এই প্রথমবারের মতো সে হাসে, তার সমান আকারের দাঁতের সারি দেখা যায়, সামনের দাঁতটায় বাদামি ছোপ ধরা। টোল পড়ায় তার গাল দুটো খানিকটা ভেতরে ঢুকে গেছে, টোলের গর্তে দিব্যি অর্ধেক আঙুল ঢুকে যেতে পারে, ওরকম চিমড়ে মুখে যেটা বেশ বেমানান ঠেকে। মহিলা যেন তেন ভাবে কলের পানিতে তার হাত মুখ ধুয়ে ফেলে, এবং ঘাড় থেকে ওড়নাটা খুলে মেঝেতে রাখে। চিকা অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।

সে জানে মহিলা এখন তার হাঁটুর উপর বসে মক্কার দিকে ফিরে নামাজ পড়ছে, কিন্তু সে তাকালো না ওদিকে। এটা হলো মহিলার গোপন অশ্রুপাতের মতো, একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়, তার ইচ্ছে করছিল দোকানটা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। অথবা সেও প্রার্থনায় যোগ দিতে পারতো, ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারতো, একটি সর্বশক্তিমান সত্ত্বার অস্তিত্বকে অনুভব করত পারতো দোকানের ভেতর। তার মনে পড়ে না ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাসটা কখনও পরিষ্কার ছিল, এ যেন বাথরুমের আয়নায় জমা বাষ্পের মতো অস্বচ্ছ একটা বিষয়, সে মনে করতে পারে না সে কখনও সেই ধোঁয়াশা পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছিল কিনা।

চিকা তার হাতের জপ মালাটা স্পর্শ করে। মাকে খুশি করার জন্য চিকা কখনও এটা তর্জনীতে কখনও বা কড়ে আঙ্গুলে জড়িয়ে রাখে। এন্নেদি তারটা পরে না, একবার চাপা হেসে সে বলেছিল, "জপমালা আসলেই জাদুকরী, হরেক রঙের মিশেল, তবে আমার এটির কোনো প্রয়োজন নেই, ধন্যবাদ।"

পরে দেখা যাবে চিকার পরিবার এন্নেদি কোন নিরাপদ আশ্রয়ে আছে সে খোঁজ পাওয়ার জন্য একের পর এক প্রার্থনা সভার আয়োজন করবে, তবে সেটা কখনই এন্নেদির আত্মার শান্তি কামনা জাতীয় ব্যাপার হবে না। অন্যদিকে চিকা ধুলো জমা মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে প্রার্থনায় মগ্ন এই মহিলাটির কথা ভাববে এবং সে তার মনোভাব বদলে মাকে বলবে এভাবে প্রার্থনা সভা করা অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়, এতে কেবল চার্চের পকেট ভারী হয়।

মহিলাটি নামাজ শেষ করে উঠলে চিকা নিজের ভেতর অদ্ভুত রকমের উদ্যম অনুভব করে, তিনঘন্টারও বেশি সময় কেটে গেছে এবং সে কল্পনা করে দাঙ্গা পরিস্হিতি এখন শান্ত, দাঙ্গাকারীরা দূরে সরে গেছে। তাকে চলে যেতে হবে, তার বাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার এবং ‌এন্নেদি আর খালা- তারা যে ভালো আছে সে খবরটাও জানা জরুরি।

"আমার যাওয়া দরকার।" চিকা বলে।

মহিলার মুখে আবারও অসহিষ্ণু গাঢ় ছায়া দেখা দেয়, "বাইরের বিপদ কাটেনাই এখনতরি"।

" আমার মনে হয় তারা চলে গেছে। ধোঁয়ার গন্ধও এখন আর পাচ্ছি না"

মহিলা কিছু বলে না, মেঝের চাদরের উপর চুপচাপ গিয়ে বসে, চিকা কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করে,
হতাশাবোধে আক্রান্ত হয় কেন জানা নেই, হয়ত সে মহিলার কাছ থেকে ইতিবাচক কিছু শোনার আশা করেছিল, কিছু একটা।

"আপনার বাড়ি কতদূরে?" চিকা জানতে চায়।

"মেলা দূর। আমারে দুইটা বাস নিতে হয়।"

"খালার ড্রাইভারটিকে নিয়ে ফিরে এসে আমি আপনাকে বাড়ি পৌছে দেবো।" চিকা বলে।

মহিলা দৃষ্টি দূরে ছড়িয়ে নিরুত্তর থাকে। চিকা ধীর পায়ে হেঁটে জানলার কাছে যায় এবং সেটা খুলে দেয়। চিকা আশা করেছিল মহিলা তাকে থামাতে চাইবে, অত হুটাপাটি করে জানলা না খুলে ফিরে আসতে বলবে। কিন্তু মহিলা কিছুই বললো না, চিকা জানালা বেয়ে বেরিয়ে আসার সময় সে কেবল একজোড়া দৃষ্টির শীতলতা তার পিঠে অনুভব করলো।

বাইরে এসে চিকা নীরবতায় মোড়া পথের দিকে তাকালো। ঢলে পড়া সূর্যের ম্লান আলো চারপাশটায় কেমন একটা অবসন্নতা লেপ্টে দিয়েছে। চিকা চোখ ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখলো, সে ঠিক কোন দিকে যাবে সেটা ঠাহর করে উঠতে পারলো না। মনে মনে সে প্রার্থনা করে জাদুবলে, ভাগ্যগুণে, কিংবা সৃষ্টিকর্তার দয়ায় যেন একটা ট্যাক্সি এসে উপস্হিত হয়। প্রার্থনায় সে আরো চাইলো যে, ওই ট্যাক্সির ভেতর যেন এন্নেদিও থাকে, দেখামাত্রই তাকে খুব বকুনি দিয়ে জানতে চাইবে কোন চুলোয়ও ছিল সে এতক্ষণ, তাকে নিয়ে তারা সবাই চিন্তায় অস্হির। বাজারের দিকে যাওয়ার দ্বিতীয় পথটির শেষ পর্যন্তও যাওয়া হয়না চিকার, একটা মৃতদেহ চোখে পড়ে তার। লাশটির অস্তিত্ব সে প্রথমে প্রায় বুঝতেই পারেনি, হেঁটে খুব কাছাকাছি যাওয়ার পর উত্তাপ অনুভব করে বুঝতে পারে ওটা কারো মৃতদেহ, যেটা খুব বেশিক্ষণ হয়নি পোড়ানো হয়েছে। গন্ধটা উৎকট, মাংস পোড়ার এমন গন্ধ সে ইতিপূর্বে কখনও পাইনি।

পরবর্তীতে যখন চিকা তার খালার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির সামনে একজন পুলিশকে নিয়ে সমগ্র কানো এলাকা চষে ফেলবে, তখন সে দেখবে পথে পথে পড়ে থাকা লাশগুলো, অনেকের শরীর পুরোপুরি দগ্ধ হয়েছে, পড়ে আছে রাস্তার ধারে, যেন কেউ তাদের সেখানে ঠেলে দিয়েছে, সোজা করে সারিবদ্ধ করে সাজিয়ে রেখেছে। তার চোখ পড়বে উপুড় হওয়া ফুলেফেঁপে ওঠা একটি নগ্ন লাশের দিকে, লাশটি দেখে বুকে একটা ঘা লাগবে এটা ভেবে যে সে কি ইগবো নাকি হাউসা, খ্রিস্টান নাকি মুসলমান, ওই ঝলসে যাওয়া মাংসপিণ্ড থেকে তা বোঝা কিছুতে সম্ভব নয়। সে বিবিসি রেডিওতে শুনবে কত মানুষ নিহত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দাঙ্গাটি-”ধর্মীয় উত্তেজনার আড়ালে জাতিগত উন্মাদনা চাপা পড়ে যায়।” নির্মোহ কণ্ঠে সংবাদ পাঠকটি সেটি পড়ে যাবে। ক্রোধে লাল হয়ে রেডিওটা ছুড়ে বাইরে ফেলে দেবে চিকা। কীভাবে এতগুলো লাশ, এতগুলো মানুষের মৃত্যুকে মাত্র কয়েকটি গৎবাঁধা শব্দ দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো! অথচ এই মুহুর্তে তার চোখের সামনে পোড়া লাশগুলোর উত্তাপ এতই কাছাকাছি, এতই স্পষ্ট, এতটাই বাস্তব যে সে আর স্থির থাকতে পারলো না। সে তৎক্ষণাত ঘুরে সবেগে দোকানের দিকে ছুটতে বাধ্য হলো। দৌড়ানোর সাথে সাথে সে পায়ের নীচের অংশে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। সে দোকানে পৌঁছে জানলায় ধাক্কা দেয়, যতক্ষণ না মহিলা জানালা খুললো ততক্ষণ পর্যন্ত সে জানালা ধাক্কাতেই থাকলো। 

নালা বেয়ে ভেতরে ঢুকে চিকা মেঝেতে বসে এবং স্বল্প আলোয় তীক্ষ্ণ চোখে তার পা থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত দেখে। তার দৃষ্টিটা স্মৃতি প্রকোষ্ঠে ঘুরপাক খায়। রক্তটা দেখতে কেমন বেমানান, যেন কেউ পিচকারি দিয়ে তার উপর টমেটো পেস্ট ছিটিয়ে দিয়েছে। 

"তোমার পায়ে রক্ত", মহিলাটি নিস্তেজ গলায় বলে। সে তার ওড়নার শেষ প্রান্তটা ট্যাপের পানিতে ভিজিয়ে চিকার পায়ের ক্ষত মুছে দেয়, তারপর সেটা চিকার পায়ের চারপাশে পেচিয়ে গোড়ালির কাছে গিঁট বেঁধে দেয়।

"আপনাকে ধন্যবাদ," চিকা বলে।

"তুমি কি টয়লেটে যাইতে চাও?"

"টয়লেট? না।"ওইখানে অনেকগুলান পাত্র আছে, ওইগুলা আমরা টয়লেটের কাজে ব্যবহার করতে পারি," সে বললো চিকাকে। সে একটি পাত্র নিয়ে দোকানের পেছনটায় চলে যায়, এবং খানিক পরে বিজাতীয় একটা গন্ধ চিকার নাকে এসে ঝাপটা দেয়, গা গুলানো গন্ধটার সাথে ধুলো আর ধাতব জলের গন্ধ মিশে চিকাকে অসুস্হ করে তোলে, তার বমি পায়। দমচাপা একটা অস্বস্তি নিয়ে সে চোখ বন্ধ করে। 

"লজ্জার কথা আর কি বলি, পেটটা খারাপ হওয়ার আর সময় পাইলো না, আইজই সব হইতে হবে," চিকার পেছন থেকে মহিলা কথাগুলো বললো। জানালা খুলে সে পাত্রটা বাইরে রাখলো। তারপর ট্যাপ খুলে হাত ধুয়ে ফিরে এসে সে আর চিকা পাশাপাশি নিঃশব্দে বসে থাকে।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ভেসে আসা একটা কর্কশ কন্ঠের জপ শুনতে পায় তারা, চিকার মুখে কোনো শব্দ যোগায় না। মহিলাটি যখন মেঝেতে শরীরটা ছেড়ে শুয়ে পড়ে দোকানটা তখন পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে গেছে, তার শরীরের উপরের অংশ চাদরের উপর বাকিটুকু ময়লা মেঝেতে পড়ে থাকে।

পরবর্তীতে, চিকা গার্ডিয়ানে পড়বে যে " উত্তরের প্রতিক্রিয়াশীল হাউসা-ভাষী মুসলমান কর্তৃক অমুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে।" দুঃখের মাঝেও চিকা ভাববে যে সে এক মহিলার স্তনবৃন্ত পরিক্ষা নিরীক্ষা করেছিল, এবং তার নমনীয় আচরণ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল, যে একজন হিউসা এবং মুসলমান।

রাতে তেমন ঘুম হয়না চিকার। জানালা শক্তভাবে বন্ধ থাকায় ঘরের বাতাস কেমন গুমোট, পুরো, দানাদার ধুলো যেন হামা দিয়ে তার নাকে এসে লাগে। সে লাগাতার পুড়ে কয়লা হওয়া মৃতদেহটা জানালার ওধারে আলোর বলয়ের মধ্যে ভাসতে দেখে, যেটা তার দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলে দেখায়। অবশেষে সে দেখলো মহিলাটি ঘুম থেকে উঠে জানালাটা খুলে ঘরের ভেতর ভোরের নিষ্প্রভ নীলচে আভা ঢোকার পথ করে দিচ্ছে। জানালা বেয়ে বাইরের যাওয়া আগে সে কিছুক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। চিকা পায়ের শব্দ শুনতে পায়, কিছু মানুষ হেঁটে চলে যায়। সে শুনতে পায় মহিলা কাউকে ডাকছে, চেনা কারো মনোযোগ আকর্ষণের জন্য গলার স্বর আরো উঁচুতে তুলে হাউসা ভাষায় দ্রুতলয়ে মহিলা কি বললো, সেটা চিকার বোধগম্য হলো না।

জানালা বেয়ে মহিলাটি দোকানে ফিরে এলো। "বিপদ কাটছে। ওইটা আবু। অয় খাবার বিক্রি করে। দোকানের কি হাল হইছে দেখতে গেল। সবখানে অহন পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস নিয়া খাড়ায়া আছে। সেনাবাহিনীও নাকি আসতেছে। সেনাবাহিনীর ব্যাডারা কাউরে হয়রানি করার আগেই আমি এইখানথে যাইগা।"

চিকা ধীরেসুস্হ উঠে দাঁড়িয়ে হাত পায়ের আঁড় ভাঙলো; তার গাঁটে ব্যথা হচ্ছে। খালার বাড়ি গেটেড স্টেটে যেতে হলে চিকাকে পুরোটা রাস্তাই হেঁটে যেতে হবে, কেননা পথে এখন কোনো ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না, সেখানে শুধুমাত্র আর্মির জিপ আর যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের স্টেশন ওয়াগান। ফিরে গিয়ে হয়ত সে দেখবে তার খালা হাতে পানির গ্লাস নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে পায়চারি করছেন আর ইগবো ভাষায় অনবরত বিড়বিড় করছেন, " কেন আমি তোমাকে আর এন্নেদিকে বেড়াতে আসতে বলেছিলাম। কোন দুর্বুদ্ধিতে আমি এমন কাজ করলাম।” চিকা গিয়ে খালার কাঁধ জাপটে ধরে সোফায় নিয়ে বসাবে।

চিকা পায়ে বাঁধা ওড়নাটা খুলে পা টা বেশ জোরে ঝেড়ে নেয় যেন শুকনো রক্তরেখা ঝরে পরে, ওড়নাটা সে মহিলাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলে "ধন্যবাদ।"

" খুব ভালো কইরা পাও ধুইয়া নাও। তোমার বোইনরে আমার দোয়া দিও, পরিবাররে সালাম।" কোমরে চাদরটা জড়াতে জড়াতে মহিলাটি বললো।

"আপনার পরিবার-পরিজনকেও আমার শুভেচ্ছা জানাবেন। ছোট বেবি আর হালিমাকে আদর বলবেন।" চিকা বলে। 

পরে, বাড়ি ফেরার পথে একটা পাথর খণ্ড যাতে রক্তের দাগ শুকিয়ে তামাটে হয়ে গেছে, সেটি ভয়াবহতার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বুকে তুলে নেবে। পাথরখণ্ডটা আঁকড়ে ধরার পর অদ্ভূত এক ঝলক অনুভূত হবে এবং তৎক্ষণাত চিকা বুঝে যাবে এন্নেদিকে সে আর খুঁজে পাবে না, তার বোন চিরদিনের জন্যই হারিয়ে গেছে। কিন্তু এখন, সে মহিলার দিকে ফিরলো এবং বললো, "এই ওড়নাটা কি আমি নিজের কাছে রাখতে পারি? আবার হয়ত রক্ত পড়তে পারে।" 

মহিলাটি তার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে, যেন চিকা কি বলেছে সে বুঝেনি; তারপর মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। হয়ত তার মুখে অনাগত শোকের ছায়া খেলে যায়, কিন্তু সে মৃদু হাসে, চিকার হাতে ওড়নাটা ফিরিয়ে দেবার আগে মুখে বিভ্রান্ত এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে ঘুরে জানালা বেয়ে বেড়িয়ে যায়।




মূল গল্প: A Private Experience by Chimamanda Ngozi Adichie

***

লেখক পরিচিতি: চিমামান্দা নগুজি আদিচি (Chimamanda Ngozi Adichie) একজন নাইজেরিয়ান লেখক। জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭। উপন্যাস থেকে শুরু করে ছোটো গল্প এবং প্রবন্ধ সাহিত্যে তাঁর অবাধ বিচরণ। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের আফ্রিকান সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট করতে তাঁর শক্তিশালী লেখনী বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। পাঠক মহলের মনোযোগ আকর্ষণের পাশাপাশি বিবিধ পুরস্কার এবং সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য তিনটি উপন্যাস হলো, “পার্পল হেবিস্কাস(Purple Hibiscus (2003)”, “হাফ অফ দ্য ইয়েলো সান(Half of a Yellow Sun (2006),” এবং “আমেরিকান(Americanah (2013)”।

উল্লেখযোগ্য ছোটো গল্প সংকলন, “ দ্য থিঙ অ্যারাউণ্ড ইউর নেক(The Thing around Your Neck (2009)”। ২০১৭ সালে তাঁর গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ গ্রন্থ “ অ্যা ফেমিনিস্ট মেনিফেস্টো ইন ফিফটিন সাজেশন্স” প্রকাশিত হয়। ২০০৮ সালে তিনি ম্যাক আর্থার জিনিয়াস ফেলোশীপের জন্য মনোনীত হন। প্রায় ত্রিশটি ভাষায় পৃথিবীব্যাপী তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি অনূদিত হয়েছে।





অনুবাদক পরিচিতি
নাহার তৃণা
গল্পকার। অনুবাদক।
মার্কিন যুক্তরাষ্টের শিকাগোতে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন