বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

ডগলাস স্টুয়ার্টের গল্প: শূন্য পুরাণ

অনুবাদ: ড. বেগম জাহান আরা

চশমাটার জন্য আমার লজ্জা লাগতো। সরকারের ভর্তুকি দেয়া সস্তাতমো কারখানার উতপাদন এর ফ্রেম। অবসরভোগী মানুষেরা সাধারণত এই রকম ফ্রেমের চশমা পরেন। আর মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রিরা যখন নিজেদেরকে উদ্ভট রকম দেখাতে চায়, তখন পরে।

চশমার কাঁচ এতো মোটা ছিলো যে আমার সবুজ চোখকে দেখাতো জন্ডিস রোগির চোখের মতো হলুদ। এছাড়াও মোটা কাঁচের জন্য আমার চোখ আসল আকারের চেয়ে অর্ধেক আকারের দেখাতো। তাই প্রয়োজন থাকলেও কখনও পরতাম না এটা। উকিল সাহেবের চেহারাটা সেইজন্য বুঝতে পারিনি ভালো করে। তবে তাঁর কালো জার্মান গাড়ি দেখতে পেয়েছিলাম। কুয়াশার মতো হাল্কা গ্লাসগো-বৃষ্টির মধ্যদিয়ে দক্ষ পাখির মতো সন্তর্পনে পিল পিল করে চলছিলো গাড়িটা।

চিঠির নির্দেশ মতো সেন্ট্রাল স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম আমি। দিনটা বেশ ঠান্ডা ছিলো। পথচারিদের চলাচলের শান বাঁধানো রাস্তার ভেজা স্যাঁতসেতে বাতাসে ভেজা ভেজা হয়ে উঠছিলো আমার শক্ত মোটা সুতী কাপড়। গাড়িটা এতো নতুন যে, মনে হচ্ছিলো, বৃষ্টির পানি পড়ার সাথে সাথে মোমপালিশ গাড়িটার গা বেয়ে পড়ে যাচ্ছে। ভেজাতে পারছে না। গাড়িতে যাত্রির আসনে বসেছিলাম বলে মানুষটাকে ভালো করে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন পাতলা গড়নের সাধারন চেহারার মানুষ। মনে রাখার মতো কিছু না। সদ্যকাটা চুল। দুদিকে ছোটো রেখে মাথার ওপরে গুচ্ছ করা। চশমা ছাড়া সব কিছুই আমার কাছে আবছা। এই আবছা লাগার কারণে তাঁর গায়ের রংটাও লাগছে আবছা, ঘঁষা ঘঁষা খয়েরি মতো।

উকিল সাহেব কয়েক সপ্তা আগে থেকেই চিঠি লেখছিলেন আমাকে। অনেকের মধ্যে তিনিই প্রথম এই হতভাগ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন ত্বরিত। চিঠিপত্রের বরাতে তাঁর সম্বন্ধে বুঝতে পারছিলাম, তিনি এমন মানুষ, যিনি পথের কথা না ভেবে ঘাস কেটে যাবেন। মানে, কাজ পাগল মানুষ। প্রথম চিঠিতেই জানালেন, আমাদের দেখা হতে হবে অবশ্যই। আরও জানালেন, আমার বর্ণনা তিনি পছন্দ করেছেন এবং আমাকে দেখার জন্যে অধির হয়ে আছেন। আমি ব্যক্তিগতো বিজ্ঞাপনটা পড়লাম আবার। তিরিশটারও কম শব্দ ব্যাবহারের মাধ্যমে এক্কেবারে যেনো তেনো ভাবে লেখেছিলামঃ একহারা গড়নের ছেলে, কালো চুল, বয়স সতরো, গান পছন্দ করে, ভালো বই পড়তে পছন্দ করে। ব্যাস। তারপরও তাঁর মনে হয়েছিলো, আমিই সেই , যাকে দেখার জন্যে অপেক্ষা করে আছেন তিনি অনেকদিন থেকে!

গ্লাসগোর বৃষ্টি ঝরছে। আমি এখন তাঁর গাড়ির মধ্যে। তিনি নিজে থেকেই বললেন, তাঁর বয়স আটত্রিশ। জানতে চাইলেন, আমার খিদে পেয়েছে কিনা। তারপর জানতে চাইলেন, আমি কোথায় যাচ্ছি, তা কাউকে বলাছি কি না? নাকের ডগায় বৃষ্টির পানি নিয়ে মাথা নেড়ে বললাম, আমি কাউকে বলিনি। আমার কেউ নেই যাকে বলতে পারি।

কয়েক মাস থেকে আমি এক রুমের একটা বাসায় ভাড়া থাকি। এই বাসায় একটা ঘরেই সব। একদিকে শোয়া, একপাশে বসা, এবং এক কোনায় রান্নার ছোট্ট ব্যাবস্থা। আমার মুখচোরা ভাই বলতো, হতচ্ছাড়া বেজন্মারাই পাকি মহিলার এইরকম বাসায় থাকে। কিন্তু বাসাটা আমি ভালোবাসতাম। এখানেই আমি সর্বপ্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলাম। আমার মতো করে থাকতাম।

বেশিদিন হয়নি মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁকে কখনও কবরের শৈত্য ভোগ করতে হয়নি। কারন মাকে পোড়ানো হয়েছিলো। টাকা জোগাড় করতে পারিনি বলে কবর দেয়া হয়নি তাঁকে। ডালডোয়ি ক্রিমেটোরিয়ামের বাইরে “বেনিফিট অফিস” তথা সেবা অফিস আছে, তাদের টাকাতেই মাকে পোড়ানো হয়েছিলো। পোড়ানোর পর্বে মদ্যপ নয় এমন লোকেরা সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলো। অন্য মদ্যপেরা এলেবেলে ভাবে ঘুরছিলো আমাদের চারপাশে। সকাল দশটাতেই তাদেরকে দেখা গেলো বেহদ্দ মাতাল। হয়তো গতোরাতের নেশাই তাদের কাটেনি তখনও, এমনও হতে পারে। তবে কোনটা ঠিক, বলা মুশকিল। বয়সি ক্যাথলিক খৃষ্টানরা আমাকে বারবার বলছিলেন, তোমাদের মা এখন ঈশ্বরের হাতে নিরাপদে আছেন। কিন্তু কেনো তাঁকে ঈশ্বরের কাছে যেতেই হলো? যখন তিনি বসার ঘরে কার্পেটের ওপর মারাত্মক মৃত্যু যন্ত্রনায় কষ্ট পাচ্ছিলেন, ছটফট করছিলেন, তখন কোথায় ছিলো ঈশ্বরের হাত?

আমার মায়ের বোতল বান্ধবিদের মধ্যে অন্তরঙ্গ এক মহিলা ছিলেন। তিনি কথায় যেমন কটকটে তেমনি ত্রাস সৃষ্টিকারি ভয়ঙ্কর। যেনো লাফিয়ে এসে পড়লেন আমাদের মাঝে। কৌতুক করে বললেন, মাকে পুড়িয়ে সাহসের কাজ করেছি আমরা। কথাটা এমন ভাবে বললেন, যেনো তিনি একজন দ্রষ্টা, অনেক আগে থেকেই জানতেন এমনটা হবে। অন্তেষ্টিক্রিয়ার আচারাদির সময় ঠিক বেঠিক জানা কঠিন। অনুভব করলাম, আমার হাড্ডিসার গলার পেছনে পিঠের ওপর ভাইয়ের হাত। সে আমার মেরুদন্ডের হাড়ের ওপর চাপ দিয়ে এমন ভাবে ডলাডলি করছিলো, যেনো জপমালার দানা গুনছে। তার দস্তানা পরা হাতের লম্বা আঙুলে চিমটি দিয়ে এতো দ্রুত চাপ দিচ্ছিলো যে, প্রায় অবশ হয়ে যাচ্ছিলো আমার শরীর। মনে হচ্ছিলো, ধার করা কালো সুট পরা অবস্থাতেই হয়তো পঙ্গু হয়ে যাবো আমি।

মাকে পোড়ানো শেষ হয়ে গেলেও পিশাচের মতো লোকগুলো থেকে গেলো। খবর প্রচার হয়ে গেলো যে, ‘ওপেন বার’-এ রিসেপশন দেয়া হবেনা আমাদের। তার মানে, আমরা কোনো এলকোহল পাবো না। এই সংবাদে সবচেয়ে বেশি পানকাতর লোকদের মধ্য থেকে অসম্মানের বিলাপ শোনা গেলো। আমাদেরকে বলা হলো, এটাই ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য অনুসারে এটা গ্লাসগোবাসির লজ্জা যে, আমাদের মাকে পোড়ানো হবে অথচ এই আচার উদযাপনের জন্য কোনো ভালো এলকোহল পাওয়া যাবে না।
অল্প বয়সে আমার মা খুব শক্ত পোক্ত ছিলেন। তিনি ঝুঁকি নিতেন, সঙ্গীসাথী নিয়ে থাকতে ভালোবাসতেন, সবসময় চকমকে কিছু পেতে ভালোবাসতেন তা ছোটো খাটো যে কোনো কিছুই হোক না কেনো। অকাতরে নিজের ভুলত্রুটির কথা বলতেন। এবং সেটা বলতেন বেশ উদারতা এবং গর্বের সাথে। মানুষজনকে তিনি বিশ্বাস করতেন, যা করা উচিত হতো না। এই বিশ্বাস প্রবণতা তাঁকে নিরন্তর লজ্জার মধ্যে ফেলতো এবং সেগুলো কাজে লাগাতো লোকেরা। শেষের দিকে নির্জীব হয়ে পড়েছিলেন মা। কোনো ভাবে টিকে ছিলেন মান সম্মান নিয়ে।

আমার এই মা এককালে রুপসী ছিলেন। সবাই বলতো, টুইড কাপড়ের ( শীত প্রধান দেশের বিশেষ গরম কাপড় ) নিপাট বুননের মতো আঁটসাঁট ছিলো তাঁর শরীর কাঠামো। মাথাভরা চকচকে কালো পালিশ করা চুল, সুন্দর আবলুশ-কালো ফিতের তৈরি গোলাপের ব্যান্ড দিয়ে আটকানো থাকতো সবসময়। পূর্ণ প্রসাধন চর্চিত মুখে থাকতে পছন্দ করতেন মা। এমনকি দিনের বেলায় তিনি যখন ঘরে বসে থাকতেন, তখনও প্রসাধিত থাকতেন। পুরুষেরা তাঁকে ভালোবাসতো। অন্য মহিলাদেরকে পানসে এবং পরিশ্রান্ত দেখাতো মায়ের পাশে।

এমন কেউ ছিলো না যে জানতো এবং আমাকে বলতে পারতো মায়ের প্রস্ফুটিত হওয়ার সেই বিশেষ সময়ের কথা। যখন প্রেম এসেছিলো তাঁর জীবনে। সত্যিকার অর্থে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছিলেন তিনি। গ্লাসগোবাসিরা এমন সময়ে ভালো পানীয় খেতে, বেহদ্দ মাতাল হতে, খিস্তি খেউড় বকতে, ইঞ্জিনের নৌকায় ভ্রমণ করতে এবং পুরোপুরি উদ্দাম হয়ে যাচ্ছে তাই করতে পছন্দ করে। থ্যাচার যখন লোহা, কয়লা, জাহাজ, ইত্যাদি খাতে নিয়োজিত সব মানুষের চাকরি খেয়ে নিলো, তখন সরকারের দেয়া সামান্য বেকার ভাতার চেকটা সংগ্রহের পর তেমন কিছু করার থাকতো না তাদের। সেই সময় আকন্ঠ মদে ডুবে না থাকাটাই ছিলো কঠিন কাজ। আমি মাকে কাঁদতে দেখেছি। কেউ যদি তাঁর মদ্যপ অবস্থা নিয়ে কিছু বলতো, তাহলে কুরুক্ষেত্র হয়ে যেতো। বলা মুশকিল হয়ে যেতো, কখন সেটা থামবে। তবে সবাই স্বীকার করেছে, বাবার মৃত্যুর পরে মায়ের মদ খাওয়ার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিলো। বাবাকে আমি কখনও চিনিনি। তাঁর সম্পর্কে অন্যেরা গল্প করতো। সেই গল্প তেমন সুখকর মনে হয়নি আমার কাছে।

মিসুস বি-এর এক রুমের এপার্ট্মেন্ট পাওয়াটা ছিলও আমার জন্যে ভাগ্যের ব্যাপার। পাকিস্তানি মহিলাটাই একমাত্র বাড়িওয়ালি, যিনি স্কুলগামি নরোম শরোম ছাত্রকে বাসা ভাড়া দিতে চাইতেন। আমার বড়ো ভাই ব্যবসায়ী। বাস্তব বোধ সম্পন্ন। তার মতে, আমার লেখাপড়া ছেড়ে দেয়া উচিত। যেমন সে দিয়েছিল। আমার মাও দিয়েছিলেন। ভাইয়ের মতে, টাকা পাওয়া যায় এমন কিছু করতে হবে আমাকে। তা শিক্ষানবিশীও হতে পারে। তখন পরিষদ সদস্যদের মতো ফ্ল্যাট থাকবে। বান্ধবী থাকবে। পরামর্শগুলো ভালোই ছিলো। কিন্তু আমার মনে হতো, শিক্ষা প্রয়োজন আমার জন্য। কেনো মনে হতো, জানি না। আবার এটাও মনে হতো, যদি আমি কোনো একটা দিকে এগিয়ে না যাই, তাহলে বখে যেতে পারি। আমার ভাই ছিলো আমার রক্ষক। কিন্তু, একটা সময়ে ভাই আমাকে আর প্রতিপালন করে নি। থাকা, পরা, খাওয়া, কিছুই না দিয়ে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলো, লেখা পড়া করার দুঃসাহস কোথায় পালায় তা দেখার জন্যে।

আমার শান্ত ভাইটা সবসময়য় আমাকে আগলে রাখতো। মায়ের অবস্থা যখন খুবই খারাপ, তখন আমাকে সে আশ্রয় দিয়েছিলো। নিজের ক্ষমতার কথা না ভেবে বাবার দায়িত্ব পালন করেছিলো সে। অথচ তখন বয়সে নিজেই সে তরুণ। আমার মতো একটা নাজুক ছেলের ভার নেয়া তখন বেশ কষ্টকর ছিলো তার কাছে। পরে যখন তাকে বলেছিলাম, ‘আমি সমকামী’, শুনে আঘাতে সে একেবারে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো। যেনো মরেই গেলো। কারণ, গ্লাসগো হাউজিং স্কিমে বাস করে কেউ সমকামী হলে, সেটা তার জন্যে ফাঁসির রায়ের মতো। একবছর আগে আমার মা মারা গেছেন। তখন থেকেই ‘পি ওয়াই টি’ তথা “পলক যুব টিম” চেষ্টা করছে আমাকে হত্যা করার জন্য। একদিন বিকেলে ব্যস্ত এক সড়কের মধ্যখানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাত আটজন ছেলে লাফিয়ে এসে আমার মাথার ওপরে নিচে বেদম মারতে লাগলো। তারা বললো, আমার জন্যেই অধির হয়ে এখানে তারা অপেক্ষা করছিলো। এটাকেই মনে করেছিলো এমন কাজের জন্য ভালো জায়গা। একজন বয়সি মহিলা মধ্যস্থতা করতে এসেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, রাস্তার কোনও কুকুরকে নির্যাতন করছে ছেলেগুলো। আমার ভাই বুঝেছিলো, আমাকে স্বাভাবিক জীবন দেয়ার জন্যে যথেষ্ট চেষ্টা করেনি সে। আমার ভাবধারা থেকে আমাকে বের করে নিয়ে আসার জন্যও করেনি তেমন কিছু।

দিনের বেলায় আমি স্কুলে যেতাম এবং মগ্ন হয়ে থাকতাম “হার্ডি, দু মাউরিয়ের, ডোন”-এ। সন্ধেবেলায় এবং উইকেন্ডে কাজ করতাম ‘গৃহ উন্নয়ন সুপারস্টোর’-এর গুহার মতো একটা জায়গায়। সারি সারি স্তম্ভ দিয়ে জায়গাটা ভাগ করা। সেখানে ছলকে ছিঁটিয়ে পড়া পেইন্টগুলো পরিষ্কার করতাম, এবং গৃহসামগ্রী হিশেবে ব্যবহৃত হয় এমন কংক্রিটের স্ল্যাব বয়ে নিয়ে তুলে দিতাম মধ্যবিত্তের লম্বা লম্বা গাড়িতে। প্রতি শুক্রবারে দলামোচড়া করা অনেক টাকা এবং খুচরো মুদ্রা ভর্তি একটা খোলা খাম পৌঁছে দিয়ে আসতাম মিসুস বি-র ডাকবাক্সে। খুব কাছেই ছিলো তার ডাক বাক্স। তখন গরম মশলা দিয়ে রান্না করা মুরগির তরকারির চমতকার গন্ধ এসে নাকে লাগতো। শুনতে পেতাম, মহিলারা সুন্দর ভাষায় গল্প করছে। তাদের ভাষা আমি বুঝতাম না। তারপর চলে আসতাম নিজের এক রুমের বাসায়। বন্দি করে ফেলতাম নিজেকে ঘরের মধ্যে।

শুঁড়িখানা বন্ধের সময় হলে বুড়ো মানুষগুলো মাতাল অবস্থায় হোঁচট খেতে খেতে তাদের ঘরে ফিরে আসতো। আমার ঘরের দুই দিকেই ছিলো তাদের ভাড়া করা ঘর। ওদের চলাচলের শব্দে আমি ভয় পেয়ে জেগে বিছানায় গুটি শুটি হয়ে বসে থাকতাম। শব্দ শুনেই বুঝতে পারতাম, টয়লেটের বাইরেই তারা পি পি করছে। করিডোরের মেঝেতে পাতা সুতো ওঠা অতি মলিন কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে ধাক্কা ধাক্কি করছে হলের দরজার সাথে। আমার কেমন মজা মজা লাগতো। স্বস্তি পেতাম এই ভেবে, ওই মদ্যপগুলো আমার কেউ নয় যে, ওদের বাঁচাতে হবে।

যুব ম্যাগাজিনের পেছনের পাতায় জ্বল জ্বলে অক্ষরে অনেকগুলো ব্যক্তিগতো বিজ্ঞাপন থাকতো। ঝাঁপিয়ে পড়ে সেগুলো দেখতাম নয়, যেনো গিলতাম। রাতগুলো অতিরিক্ত শান্ত, নিস্তরঙ্গ। অভাবের কারণে টেলিভিশন কেনার সামর্থ ছিলো না যে ঘরে বসে দেখবো। অতএব বিজ্ঞাপনগুলো দেখতাম। মিশ্র বিশ্রি যৌনাচারের বিজ্ঞাপনের নিচের দিকে ছিলো যুবা বয়সী পুরুষ এবং মহিলা সমকামীদের সাময়িক বিনোদনের নোটিস। একাকীত্বে জর্জরিত এই সমস্ত নিঃসঙ্গ মানুষদের জন্য তা অসুস্থতা কিছু নয়। সেখানে স্পষ্ট কোনো প্রস্তাবও ছিলো না যার সূত্র ধরে আমি বিনামূল্যে সমকামী বিনোদন পত্রিকা পেতে পারি। সময়টা ছিলো নব্বই দশকের প্রথম ভাগ। ইন্টারনেট আসার অনেক আগের কথা। মাইলের পর মাইল জুড়ে দেখা যেতো হাত পা বিহীন জড়পদার্থের মতো অসংখ্য কবন্ধ মুর্তি, গায়ে কোথাও পশম নেই এবং সব একই রকম দেখতে, যাদের মধ্যে যৌনজীবন বা যৌনাচারের কিছুই ছিলো না। এটাই ছিলো অদৃশ্য যৌবনের সংকেত। আমি নিঃসঙ্গ ছিলাম। বহুদিন থেকেই ছিলাম একাকী। এই ছেলেরাও একাকী। তাই স্বাভাবিক মানুষদের আড়ালে আমরা সমবেত হচ্ছিলাম এখানে।

গ্লাসগো বালক
এম-১৭, ব্যতিক্রম, থাকতে পারে

কালো চুল, সবুজ চোখ, একহারা পাতলা শরীর

যেমনঃ স্মিথ, মিশেলে ফিফার, টমাস হার্ডি, এবি ফ্যাব

লাজুক

দেখতে প্রায় একই

পোস্ট বক্সঃ ৩৩৫৪১

আমার ছোটো বিছানার প্রান্তে পা বেড় দিয়ে বসে, প্রায় তিরিশ শব্দের মধ্যে ধারণ করা বিবর্ণ বিষন্ন জীবনের সংক্ষিপ্ত হিসেব করছিলাম। পোস্টাল অর্ডার দেখে মনে হতে পারে, আমার বাস ভাড়া ছিলো না। আমাকে এক সপ্তা হেঁটে স্কুলে আসা যাওয়া করতে হয়েছে। তা হোক, আমার কিছু আসে যায়নি। বিজ্ঞাপনটা লেখে আমি অপেক্ষা করছিলাম।

অনেকদিন পর এই প্রথম অনুভব করলাম একরকম আশার আমেজ।

দেশের সমস্ত প্রান্ত থেকে যুবকেরা আমার কাছে চিঠি লেখলো। তাদের মধ্যে কিছু চিঠি খুব বিদ্রুপাত্মক এবং খুব জ্বালাময়ী ছিলো। মুখোসের আড়ালে ভয়ঙ্কর আঘাতই করেছিলো তারা। কিছু চিঠি মিছরির ছুরির মতো ভাষায় লেখা, যেনো বিষয়টা তাদের কাছে শুধুই হাস্যকর। তবু তারা এখানে বিছানার ওপর পা বেড় দিয়ে বসেছিলো। বাইরের কারও সাথে দেখা করতো না। যেমন আমি। আমিও করতাম না। অন্য চিঠিগুলো ছিলো মনে দাগ কাটার মতো, হৃদয় ভেঙে যাওয়ায় মতো কোমল। তাদের মধ্যে আমার চেয়ে বয়সে ছোটো এক ছেলের চিঠি ছিলো। তার বাবা একজন ছোটো খামারের মালিক। সে থাকতো স্কটিশ হাইল্যান্ডের একেবারে প্রান্তিকতমো এলাকায়। দুরত্বের কারণেই সেখানে আসা যাওয়া ছিলো যে কারো জন্যে কঠিন। কালে ভদ্রে কেউ যেতো। কোনো উত্তর পাবে না ধরে নিয়েই ছেলেটা চিঠি লেখেছিলো বলে কোনও প্রশ্ন করেনি আমাকে। চিঠির উত্তর দেয়ার জন্য অন্যদের মতো তাগাদাও দেয়নি। তার চিঠিটা যেনো এক টুকরো বার্তা। মনে মনে আমি তার ছবি আঁকতে পারতাম। দিব্যি দেখতে পেতাম তাকে চমতকার ‘মুনরো’ পাহাড়ের গা বেয়ে সে উঠছে। পর্যটকদের জন্য যত্ন করে বানানো কেক বিস্কুটের টিনের ওপর এই ছবি আঁকা থাকতো। পাহাড়ে ওঠার সময় ছেলেটা শূন্য সংকীর্ণ উপত্যকার সবাইকে ডাকছে, যার প্রতিধ্বনি শোনা যায় নি এখনও।

সব চিঠিই নোটবুকের ছেঁড়া পাতার ওপর হাতে লেখা। আঞ্চলিক অশিষ্ট ভাষায় সমৃদ্ধ তাদের বক্তব্য। তড়ি ঘড়ি করে লেখা এলোমেলো শব্দগুলো পাতার সীমানা ছাড়িয়ে যেতো দলছুটের মতো। কিছু চিঠি দশ, বারো, বিশ পাতা লম্বা। কালির রঙ বদল হয়েছে। মনে হয়, কলমের কালি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত লেখেছে । ছেলেরা তাদের নানা রকম ছবি পাঠিয়েছিলো। কেউ পাঠিয়েছিলো দাদু নানুর সাথে ছুটি কাটাতে গিয়ে তাদের পিঠে চড়ে থাকার ছবি, কেউ পাঠিয়েছিলো শোয়ার ঘরে দাঁত বের করে হাসার ছবি। সেই শোয়ার ঘরের দেয়ালে আবার গানের শিল্পী ‘কিলি মিনোগে’, ‘ম্যাডোনা’ এবং ‘ক্যাটস’-এর পোস্টার সাঁটা।

সমস্ত চিঠি বের করে আমার সামনে রাখলাম। এই নিরানন্দ অন্ধকার শহরের মধ্যে থেকে রাতের আকাশ দেখতে পাওয়া খুব কঠিন। মা আমাকে একবার মাত্র সল্টকোটের নুড়িময় উপকূলে নিয়ে গিয়েছিলেন । মার সাথে সম্পর্ক ছিলো এমন একজন মানুষ ট্যাপ খাওয়া একটা ক্যারাভান ভাড়া করে দিয়েছিলেন, যাতে করে ঐ মানুষটার বৌয়ের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকতে পারেন তাঁরা। সপ্তাহান্তে তিনি ক্যারাভানে আসবেন। আর সপ্তার বাকি দিনগুলো থাকবে শুধু আমাদের। এই রকম একা একা থাকার একটা দিনে ক্যারাভানের বাইরে বসেছিলাম আমরা। মা ধুমপান করছিলেন এবং আকাশে ঘনো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারা তারাগুলো দেখছিলেন। চিঠিগুলোকে সেই রকম দুরবর্তী মনে হচ্ছিলো আমার। আমি কখনও এই ছেলেদের কাছে যেতে পারবো না। কখনও ছুঁতে পারবো না তাদের। কিন্তু তারা উত্তরাঞ্চলের আকাশে উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেবে। এটুকু জানাই আমার জন্যে যথেষ্ট হবে যে, ওখানে থাকে তারা।

উকিল সাহেবের সাথে দেখা করবো বলে শেভ করলাম। তবে শেভ করাটা এমন কিছু ঘটনা নয়। আমি প্রায় করি। এজমালি বাথরুমের গ্যাস মিটারটা সমস্যা দিচ্ছিলো। মুদ্রা দেয়ার সাথে সাথেই গব গব করে সব খেয়ে ফেলছিলো মেশিনটা। বিনিময়ে দিচ্ছিলো এক বেসিন ভর্তি হাল্কা গরম পানি। মুখে সাদা ঘনো শেভিং ফোম দিয়েছিলাম, সতর্ক ছিলাম যেনো কোথাও কেটে না যায়। আমি একটু ঢিলে প্রকৃতির মানুষ। সতরো বছর বয়সেও নিস্তেজ এবং রোগা হাড্ডিসার। আমার কালোচুল ঝুলে ছিলো চিবুক পর্যন্ত। আমার চোয়ালের হাড়ে বিশ্রি ব্রণগুলোর ওপর পড়ে সেগুলো খুব জ্বালাতন করছিলো। তাই তৈলাক্ত ফিতে দিয়ে বেঁধে চুলগুলোকে কানের পেছনে সরিয়ে দিলাম। পরনে ছিলো কালো পলিয়েস্টারের প্যান্ট। ভাব খানা এমন যে, এই প্যান্টই সবসময় পরে থাকি আমি। কখনই স্কুলের ইউনিফর্ম বদল করে বাড়ির কাজের পোশাক পরি না। অন্য পোশাকগুলো মা কিনে দিয়েছিলেন। তিনি যাকে বিয়ে করতে চাইতে পারতেন, তার মতো করে সাজাতেন আমাকে।

গাড়িতে করে উকিল সাহেব আমাকে সবচেয়ে সুন্দর একটা রেস্তোঁরায় নিয়ে গেলেন। এখানে আমি কখনও আসিনি আগে। বিশপের বসার আলোকিত স্থানের সাদা দেয়ালের ছায়ায় আমি বসেছিলাম। জায়গাটা কবরস্থানের মতো ঠাণ্ডা। মাড় দেয়া টেবিলক্লথটা আঁতকে ওঠার মতো দামি দেখাচ্ছিলো। ভাবতেই পারলাম না, এর দাম কতো হতে পারে। মনে হয়, উকিল সাহেব আমার অবস্থা বুঝতে পেরেই বললেন, আমার যা খুশি তাই খেতে পারি। আজকের রাত , আমাদের সময়। আমাদের ‘ডেট’। সব খরচ বহন করবেন তিনি।

চৌদ্দ বছর বয়সের আগেই আমার জীবনে একবার প্রকৃত ‘ডেট’ এসেছিলো। এক প্রটেস্ট্যান্ট বালিকাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম সেদিন। কিছু অপরিণত বালকের সঙ্গী হিশেবে বেপরোয়াভাবেই কাজটা করতে চেয়েছিলাম। করেই ফেলেছিলাম প্রায়। সিনেমার প্রিভিউ হয়ে যাওয়ার পর হঠাত মেয়েটা উঠে আমার সামনের সারিতে তার বান্ধবির পাশে গিয়ে বসলো। সেই বান্ধবীর বন্ধু তখন তার মুখ চেটে চুষে চিবিয়ে একেকার করছিলো। আর তার মা, রেগে গলিত লোহার মতো লাল দৃষ্টি রাখছিলেন ছেলের নাইলনের সুটে ঢাকা হাতের দিক। সিনেমা চলার পুরো সময় ধরে মেয়েটা তার পনিটেইল চুষছিলো। মাঝে মাঝে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো পেছনে। ভাবখানা এমন যে, তার মনে হচ্ছিলো কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু কি সেই ভুল, তা বলতে পারছিলো না।

পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিলো যে ওয়েটার আমাকে উকিল সাহেবের ছেলে মনে করেছে। ওয়েটার ছেলেটা বয়সে আমার চেয়ে বেশি বড়ো হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মতো সুন্দর উচ্চারণে কথা বলছিলো সে। গ্লাসগোতে এসেছিলো অনেক স্বপ্ন নিয়ে।

ভেবেছিলো, গ্লাসগো একটা যাদুর শহর। এই শহর গথিক স্থাপত্যের মন্দিরের মতো পেঁচানো পেঁচানো দৃষ্টিনন্দন চূড়ায় পরিপূর্ণ এবং প্রেম ভালোবাসার বেশুমার ছড়াছড়িতে মায়াময়। কিন্তু আসলে তা নয়। গ্লাসগো এমন একটা শহর, যখন ইচ্ছে তখনই এখান থেকে সে চলে যেতে পারে। ঘটনাক্রমে সেও তাই করবে। এবং এই রকম ছেলেরা সবাই তাই করে। ডিনারে আসার সময় চশমাটা পরে আসিনি। মনে হয়েছে , দুর্বল চোখের দৃষ্টি হয় বয়সি মহিলাদের, অল্প বয়সিদের নয়। টেরা চোখে মেনুর দিকে আকর্ষণবিহীন দৃষ্টিতে তাকাতে একটু চিন্তা হচ্ছিলো। মনে আছে, উকিল সাহেব এবং ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো বলে আমি পড়ার ভান করছিলাম। রোমান মূক অভিনেতাদের মতো নির্বাক থেকে, শূন্য চোখ আগে পিছে ঘোরাচ্ছিলাম। একটা সময়ে উদাসীন হওয়ার ভান করে আমি হুবহু সেই খাবারগুলোর অর্ডার দিলাম যা আমার বাবা দিতেন। আজ আমার দিন। আমার ‘ডেট’।

খাবারের পদ ছিলো মুরগি। সব কিছু মনে পড়ে না, কারণ খেতে খেতে অনেক কথা বলেছি আমরা। মনে আছে, উকিল সাহেবই কথা বলেছেন বেশি। তিনি আমার হাই স্কুল সম্বন্ধে এবং স্কুলের পর আমার পরিকল্পনা সম্ববন্ধে জানতে চাইছিলেন। কিন্তু আমার ভবিষ্যত সম্বন্ধে তো কিছু জানি না, কথাটা মনে হতেই হঠাত অসহিষ্ণু হয়ে উঠলাম। ভেবেছি, কিছু একটা হয়তো হবে অবশেষে। উকিল সাহেব আরও বললেন, “ ওয়াও, সামনে তোমার সারাজীবন পড়ে আছে।” তাঁর কন্ঠস্বরে হালকা বিষাদের ভার মনে হলো। কিন্তু সত্যিই তিনি দুঃখিত ছিলেন কিনা, মুখের অভিব্যাক্তিতে দেখতে পাইনি তা।

তিনি জানতে চাইলেন, মদ চাই কি না? তিনি খাবেন না। কারণ, গাড়ি চালাবেন। বলেছিলাম, খাবো না  ( এলকোহলে আমার ভয় আছে)। তিনি মনে করলেন, আমি লজ্জা পাচ্ছি। এক গ্লাস মদের অর্ডার দিলেন তিনি। পানীয়টা ছিলো গাঢ় এবং লাল রঙের। সমস্ত মোমের আলো এই রঙের কাছে ম্লান হয়ে গেলো। টেবিলের প্রান্ত থেকে গ্লাসটা তিনি ঠেলে দিলেন আমার দিকে। আমি খেলাম। যদিও এই ঠাণ্ডা পানীয়ের স্বাদ আমার ভালো লাগেনি। আসলে অভদ্র হতে চাইনি, তাই বলিনি কিছু। উকিল সাহেব আর এক গ্লাসের অর্ডার দিলেন। এই গ্লাস খাবার পরে মনে হলো, আমার মুখের তালুতে আচ্ছাদন পড়ে গেলো এবং দাগ পড়ে গেলো সামনের দাঁতে। মনে হলো, শরীর শিথিল হয়ে এলো আমার। উনি বললেন, আমার মুখে একটা কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেছিলো। মন্দ নয়, শুধু ফাঁক দাঁতের মিষ্টি এক টুকরো হাসি। আমার ভাই বলতো, আমি সবসময় খুব সহজে হেসে ফেলতাম। এখনও সেই রকম আছি। আমার চারপাশের সবাই যেনো সহজ থাকে, সেইজন্যে হড়বড় করে মিটিয়ে নিতাম আমার চাহিদা। ভাবতাম, ঠিকই তো করছি। এমন কি, ঠিক না করলেও, তাই ভাবতাম। হাত তুলতাম নিজের সমর্থনে।

আমরা যখন মিষ্টি খাচ্ছিলাম, তখন উকিল সাহেব আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন যে, তিনি কিছু করতে পারেন কি? কি করতে চান তিনি, তা না বুঝেই আমি ধিরে মাথা নাড়ালাম। মোমের আলোয় তিনি এগিয়ে এলেন আমার দিকে। আমি তাঁর চেহারায় নিবিড় মনোযোগ দেখতে পেলাম। তিনি আমার কানের পেছন দিকে গিয়ে, কানের লতিটায় হাত বোলালেন যেনো আমার চুলগুলোকে টেনে দিচ্ছেন কানের পেছনে। এই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা না থাকায় শক্ত হয়ে থাকলাম। আমি দেখলাম, তিনি হাত টেনে নিলেন এবং তাঁর হাতের আঙুলের ডগায় ধরা সাদা মতো কিছু, ঠিক ছোটো ঘুঘুর মতো। যেনো তিনি একজন যাদুকর। বিস্ময়ে আমার চোখ ছানা বড়া হয়ে গেলো। তিনি নিজের ন্যাপকিনে হাত মুছলেন। এমন ভাবে ন্যাপকিনটা চেপে হাত টেনে নিলেন, যেনো চাপ দিয়ে মিলিয়ে দিলেন সাদা ঘুঘুটাকে। চোখ পিট পিট করে দেখলাম, তিনি হাসছেন। গলায় এক থাবা শেভিং ক্রিম লেগেছিলো, যেটা ঝুলছিলো কানের লতির নিচে, সেটা নিয়েই আমি ডিনার খেতে বসেছিলাম! প্রচন্ড ইচ্ছে হলো, ছুটে পালিয়ে যাই। ইচ্ছে হলো,জ্বলন্ত মোমবাতির ওপর ডিগবাজি খেয়ে নিজেকে সমর্পণ করি সেই আগুনে। মানুষটার মুখে দেখলাম চাপা হাসি। তিনি বিল দিয়ে ঝট্ করে উঠে দাঁড়ালেন।

বাইরে বেরিয়ে হাতের অঞ্জলিতে একটু বৃষ্টির পানি ধরে তা দিয়ে আমার গলা মুছে নিলাম। আমার মা একে বলতে পারতেন ‘হুরের’ স্নান। হেঁটে হেঁটে আমরা গাড়ির কাছে গেলাম। মানুষটা নিশ্চয় আমাকে উদাসীন বা নেতিবাচক ভেবেছেন। বোকার মতো কথা বলা শুরু করেছিলাম। মদের প্রতিক্রিয়ায় শিথিল হয়ে গেছে জিব। ডিনারের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম, সকালে স্কুলে যেতে না পারার যুক্তি দিচ্ছিলাম। আমার আগে আগে শিষ দিয়ে দিয়ে তিনি হাঁটছিলেন এমন ভাবে, যেনো শুনতে পাননি কিছুই। গাড়ির কাছে পৌঁছে খুব বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললাম, আমি সামলে নিতে পারবো। আমি বলছি, হেঁটে বাড়ি যাবো আমি।

জার্মান গাড়ির এলার্ম অকেজো করে দেয়ার জন্য দুইবার ফ্লাস লাইট জ্বালালেন তিনি। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন, আহ, ছাড়ো তো, এখনও সন্ধেই পার হয়নি। এসো, আমার বন্ধুদের দেখবে।

 --------------

লেখক পরিচিতি:

ডগলাস স্টুয়ার্টঃ স্কটিশ-আমেরিকান লেখক। জন্ম, ৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো-তে। খুব সাধারন এবং নিরানন্দ ছিলো তাঁর শৈশব। নিজেই বলেছেন, বই বিহীন গৃহে বেড়ে উঠেছেন তিনি। কল্পনা বিলাসী ছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সেই বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতেন। চারপাশে যা দেখতেন, সব কিছুই তাঁর কাছে মনে হতো গল্প। একেবারেই ‘সেলফ মেইড’ মানুশ ডগলাস। প্রচন্ড বৈরী পরিবেশ ডিঙিয়ে সহজাত আকাংখার জোরে এবং নিজের চেষ্টায় বইয়ের আলোকিত জগত আবিষ্কার করা ছিলো তাঁর জীবনে প্রায় অলৌকিক প্রাপ্তি। গ্লাসগোর রয়াল আর্ট কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশনের পর চলে যান নিউ ইয়র্কে। সেখানেই নিজের ক্যরিয়ার গড়ে তোলেন। ২০০০ সাল থেকে নিউইয়র্কেই বাস করছেন।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘শাগি বেইন’ একযোগে প্রকাশিত হয় আমেরিকা এবং যুক্তরাজ্য থেকেষ বহু প্রশংশিত এই উপন্যাস রচনায় তিনি দশ বছর শ্রম দিয়েছেন। পেশায় শিক্ষক। বর্তমানে দ্বিতীয় উপন্যাস রচনার কাজ করছেন।

অনুবাদক পরিচিতি:
বেগম জাহান আরা
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউট,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা
জার্মানীতে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন