বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

অ্যালিস ওয়াকারের গল্প: নিত্য ব্যবহার

অনুবাদ: মোস্তাক শরীফ

উঠোনে অপেক্ষা করব তার জন্য, কাল বিকেলে আমি আর ম্যাগি একদম ঝকঝকে আর ঢেউ খেলানো বানিয়েছি ওটাকে। লোকে যা ভাবে তার চেয়ে অনেক আরামের কিন্তু উঠোনটা।
কেবল উঠোন তো নয় যেন বসার ঘরেরই একটি অংশ। শক্ত মাটিকে ঝেড়েপুছে মেঝের মতো পরিষ্কার করে ফেলা হলে কিনারার মিহি বালির রেখাকে ঘিরে থাকে ছোট ছোট, নানা আকৃতির খাঁজ। যে কেউ তখন এসে বসতে পারে, আর এল্ম গাছের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে পারে বাতাসের জন্য, যে বাতাস বাড়ির ভেতর কখনোই ঢোকে না।

বোন চলে যাবার আগ পর্যন্ত স্নায়ুচাপে ভুগবে ম্যাগি। গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে এক কোনায়। সাদামাটা চেহারা, পা আর বাহুতে পোড়া দাগের জন্য লজ্জায় একশেষ, বোনের দিকে তাকিয়ে থাকবে ঈর্ষা আর সমীহমাখানো চোখে। তার ধারণা জীবনটাকে পুরোপুরি নিজের কব্জায় রেখেছে তার বোন; ‘না’ শব্দটা তাকে বলতে শেখায়নি কেউ।

টিভিতে ঐ শো-গুলো নিশ্চয়ই দেখেছেন যেখানে জীবনে বিরাট কিছু একটা হয়ে যাওয়া বাচ্চাদের চমকে দেয়ার জন্য তাদের মা-বাবার মুখোমুখি করা হয়, বুড়ো বাবা-মা মঞ্চের পেছন থেকে দুর্বল পায়ে টলতে টলতে বের হয়ে আসেন? এসব শো-তে বেশ সুখী-সুখী একটা ভাব থাকে, কিন্তু এমন যদি হতো যে বাবা-মা আর বাচ্চা সামনাসামনি হয়েই গালির তুবড়ি ছুটিয়ে দিত একে অন্যের দিকে? টিভিতে অবশ্য সেটা হয় না। মা আর বাচ্চা একজন আরেকজনকে জাপটে ধরে হাসে। কখনও বাবা আর মা চোখের পানি ফেলে, বাচ্চা তাদের জড়িয়ে ধরে এবং টেবিলে হেলান দিয়ে দুনিয়াকে জানায় যে তাদের সাহায্য ছাড়া মোটেই বিখ্যাত হতে পারত না সে। এসব শো আমি দেখেছি।

মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি আমাকে আর ডি-কেও এমন একটা অনুষ্ঠানে একসঙ্গে আনা হয়েছে। নরম গদিমোড়া জমকালো এক লিমুজিন থেকে বের হতেই ভিড়ে ঠাসা আলো ঝলমল একটি কক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে আমাকে। সেখানে জনি কারসনের মতো দেখতে বয়স্ক তবে তরতাজা আর হাসিখুশি একটা মানুষের সঙ্গে দেখা হবে। হাত মিলিয়ে তিনি জানাবেন কী চমৎকার একজন মহিলা আমি। তারপরই মঞ্চে চলে যাব আমরা, সেখানে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরবে ডি। পিন দিয়ে সযত্নে ইয়াবড় একটা অর্কিড আমার পোশাকে আটকে দেবে সে, যদিও একবার ‘বিচ্ছিরি ফুল’ বলেছিল সে অর্কিডকে।

বাস্তবে আমি বড়োসড়ো, রীতিমতো দেহাতি এক মহিলা। হাত দুটো শক্ত, কেজো পুরুষদের মতো। শীতকালে আমার রাতপোশাক হচ্ছে ফ্লানেলের নাইটগাউন, সারাদিন ওভারঅল পরেই কাটিয়ে দেই। ঠিক একজন পুরুষের মতোই শুয়োর মারতে পারি, ওটাকে ধুয়ে-টুয়ে পরিষ্কার করতেও বুক কাঁপে না। শরীরভর্তি চর্বির কারণে হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রাতেও শরীর থাকে গরম। বাড়ির বাইরে দিনমান কাজ করতে পারি; হোক সেটা কাপড় ধোয়ার জন্য বরফ ভেঙে পানি বের করা। মাত্রই আগুনে ঝলসানো, ধোঁয়া ওঠা শুয়োরের কলিজা সাবাড় করতে পারি নির্বিকারে। একবার এক শীতে একটা ষাঁড়ের বাচ্চাকে মাথার ঠিক মাঝখানে স্লেজ হ্যামারের এক বাড়িতেই পেড়ে ফেলেছিলাম, তারপর ওটার মাংস ঠান্ডা হবার জন্য ঝুলিয়ে রেখেছিলাম রাত নামার আগেই। এগুলো টেলিভিশনে দেখানো হয় না, বলাই বাহুল্য। পর্দায় আমাকে দেখাবে আমার মেয়ে যেমন দেখতে চায় তেমনই - ওজন আরো শ-খানেক পাউন্ড কম, আর আমার গায়ের চামড়া রান্নার আগে বার্লি দিয়ে বানানো প্যানকেক দেখতে যেমন তেমন। উজ্জ্বল, উষ্ণ আলোয় চিকচিক করবে চুল। আমার আলটপকা, চালাক চালাক কথার সঙ্গে পাল্লা দিতে রীতিমতো যুঝতে হবে জনি কারসনকে।
কিন্তু এসবই ভুল, ঘুম ভাঙার আগেই জানা হয়ে যায় আমার। চালাক চালাক কথা জনসনদের আসে না, সবাই জানে। আমার চেনা মানুষদের কল্পনাতেও আসবে না অচেনা কোনো সাদা মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলছি আমি। সাদা মানুষদের সঙ্গে, আমার মনে হয়, সবসময়ই কথা বলেছি দৌড়ে পালানোর ভঙ্গিতে একটা পা তুলে রেখে, ওদের কাছ থেকে যে দিকটা সবচেয়ে বেশি দূরে সেদিকে মাথাটাকে ঘুরিয়ে। ডি-র ব্যাপারটা অন্যরকম। মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলে সে, দ্বিধায় ভোগার ব্যাপারটাই নেই তার মধ্যে।

‘কেমন দেখাচ্ছে আমাকে, মা?’ ম্যাগির গলা। দরজার আড়ালে শরীরটা লুকিয়ে রেখেছে, গোলাপি স্কার্ট আর লাল জামায় পাতলা শরীরের প্রায় পুরোটাই ঢাকা।

‘উঠোনে এসো,’ বললাম আমি।

খোঁড়া একটা কুকুরের কথা ভাবুন। নতুন পয়সা হয়েছে কিন্তু হুঁশজ্ঞান কম এমন লোকের গাড়ির নিচে যদি চাপা পড়ে সেটা? আর যদি চাপা পড়ার পর ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এমন একটা লোকের দিকে যায় যে কিনা বেকুব কিন্তু মনটা নরম। কেমন করে হাঁটবে তখন কুকুরটা?

আমার ম্যাগির হাঁটাটা ঠিক সেরকম। সবসময়ই এমন সে। থুতনিটা বুকের ওপর ঝোলানো, চোখ মাটিতে, পা ঘষটে ঘষটে হাঁটে। আমাদের অন্য বাড়িটা যেদিন আগুনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সেদিন থেকেই এরকম সে।

ডি-র ওজন ম্যাগির চেয়ে কম, চুল আরো সুন্দর, শরীরে মাংসও বেশি। পুরোদস্তুর নারী সে এখন, যদিও মাঝেমধ্যেই সেটা ভুলে যাই আমি। ক’দিন হলো বাড়িটা পুড়েছে? দশ, নাকি বারো বছর? এমনকি এখনও, হঠাৎ হঠাৎ সেই আগুনের পুটপাট শব্দ কানে আসে আমার, টের পাই ম্যাগির হাতটা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। চুল থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, গা থেকে কালো কাগজের টুকরোর মতো খসে পড়ছে পোড়া কাপড়। দু-চোখ খোলা, দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের ছায়া পড়েছে চোখের মণিতে, সে আগুনই যেন জোর করে খুলে রেখেছে চোখদুটো। এবং ডি। দূরে, মিষ্টি গাম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি তাকে, যেখানে দাঁড়িয়ে গাছ থেকে আঠা বের করত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। দু’চোখে গভীর মনোযোগ তার, দেয়ালের শেষ ময়লা তক্তাটা কীভাবে আগুনে পুড়ে লাল হয়ে যাওয়া ইটের চিমনির ওপর খসে পড়ছে সেটাই দেখছে। তার চেয়ে বরং ছাইগুলো ঘিরে নাচো, ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে বলি। এতটাই চোখের বিষ ছিল বাড়িটা তার কাছে।

আমার মনে হয় ম্যাগিকেও ঘৃণা করত সে। তবে এ সবই আমরা - আমি আর গির্জার পাদ্রিরা টাকা জমিয়ে তাকে অগাস্টায় স্কুলে পড়তে পাঠানোর আগের কথা। আমাদেরকে যখন পড়ে শোনাত কিছু, মনে হতো না কোনো মায়াদয়া আছে মনের মধ্যে, শব্দের পর শব্দ, মিথ্যার পর মিথ্যা, অন্য মানুষের অভ্যাস, তাদের জীবন, এ সবই জোর করে ঢোকাত আমাদের কানের মধ্যে। তার ঘ্যানঘেনে গলার ফাঁদে আটকা পড়ে থাকতাম আমরা, আর থেকে যেতাম আগের মতোই মূর্খ। ছলনার একটা নদীতে আমাদের ধুতো সে, প্রয়োজন নেই এমন জ্ঞানের আগুনে পোড়াত। গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে পড়ত সে, আমরাও তার সঙ্গে ঝুলে রইতাম, আর যখনই মনে হতো আমাদের আকাট-মূর্খ মাথার মধ্যে কিছু ঢুকতে শুরু করেছে তখনই আবার ঠেলে সরিয়ে দিত।

পছন্দের ব্যাপারে নজর ছিল উঁচু। হাই স্কুলের পাট চুকানোর অনুষ্ঠানে পরার জন্য অর্গান্ডি কাপড়ের হলুদ একটা জামা চেয়েছিল। কেউ একজন সবুজ একটা স্যুট দিয়েছিল আমাকে, সেটা থেকে স্যুট বানিয়ে নিয়েছিল একটা। বায়না ধরল ওটার সঙ্গে মেলানো কালো জুতোর জন্য। কোনো বিপদই বিপদ ছিল না তার কাছে। কখনো কখনো চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকত একটানা। ঝাঁকি দিয়ে ওকে হুঁশে ফেরানোর ইচ্ছেটাকে জোর করে দমাতে হতো আমার। ষোল বছর বয়সেই নিজের একটা কায়দা-কেতা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তার এবং সে ভাল করেই জানত কায়দা জিনিসটা কী।

আমার নিজের কখনো পড়ালেখা করা হয়নি। ক্লাস টুতে ওঠার পর স্কুলটাই বন্ধ হয়ে গেল। কেন জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। উনিশশো সাতাশ সালে কালোমানুষেরা আজকের মতো এত প্রশ্ন করত না। ম্যাগি কখনো কখনো আমাকে পড়ে শোনায়। উৎসাহের কমতি নেই বেচারার, ঠেলাধাক্কা দিয়ে এগোয় কিছু দূর, তবে চোখে ভাল দেখে না। নিজেই জানে মাথাটা অত ভালো নয় তার। সুন্দর চেহারা আর টাকার মতোই, তাড়াহুড়ো করে কিছু করার ক্ষমতাও নাগালের বাইরেই রয়ে গেল তার। কোনো একদিন জন টমাসকে বিয়ে করবে, চেহারাটা চলনসই হলেও দাঁতগুলো যার শ্যাওলাধরা। ব্যস, তারপরই ঝাড়া হাত পা আমার। হয়ত বসে বসে ধর্মীয় গান গেয়ে দিন কাটাব। গানের গলা অবশ্য কোনোকালেই ছিল না আমার, গলায় সুর ফোটাতে জেরবার হয়ে যাই। বরং ছেলেদের কাজগুলোই ভালো আসে আমার। গরুর দুধ দুইয়ে মজা পেতাম, ঊনপঞ্চাশ সালে বেমক্কা লাথি খেয়ে থামিয়ে দিয়েছি। গরু জন্তুটা ভালোই - আলাভোলা আর মায়া মায়া, ঘাঁটাবে না আপনাকে, কেবল ভুলভাবে দুধ দোয়াতে না গেলেই হলো।

বাড়ির দিকে ইচ্ছে করেই পেছন ফিরে বসেছি। তিনটে ঘর আছে এতে, পুড়ে যাওয়া বাড়িটির মতোই। তবে এটার চালটা টিনের - একচালা বাড়ি বানানোর চল নেই এখন। জানালা যাকে বলে সেরকম কিছু নেই, পাশদেয়ালে কয়েকটা গর্ত করা আছে। জাহাজের গর্তের মতো, তবে গোল নয়, চারকোনা। পাল্লাগুলো বাইরে থেকে কাঁচা চামড়া দিয়ে বাঁধা। আগেরটার মত এটাও একটা ঘেসোজমিতে। সন্দেহ নেই, দেখলে এটাকেও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চাইবে ডি। একবার আমাকে লিখেছিল, থাকার জন্য আমরা যে জায়গাটাকেই ‘বেছে’নিই না কেন, দেখতে আসবে সে। তবে বন্ধুদের কখনো আনবে না। ব্যাপারটা আমাকে আর ম্যাগিকে ভাবিয়েছিল। ম্যাগি প্রশ্ন করেছিল, ‘মা, ডি’র কি বন্ধু ছিল কোনো কালে?’

ছিল কয়েকজন। গোলাপী শার্ট পরা কয়েকটি ছেলে, তাদের বাড়িতে যেদিন কাপড়চোপড় ধোয়া হতো সেদিন স্কুল শেষে চোরা চোরা চেহারায় বাড়ির পাশে ঘুরঘুর করত। অল্পতেই ঘাবড়ে যায় এমন চেহারার কয়েকটি মেয়ে, যারা কখনোই হাসত না। ওদেরকে মুগ্ধ করে রেখেছিল সে। তার চটকদার কথা, দেখন-সৌন্দর্য আর ক্ষারের মধ্যে টগবগিয়ে ফুটতে থাকা বুদ্বুদের মতো ভয়ংকর রসিকতার ভক্ত ছিল ওরা। পড়েও শোনাত সে ওদেরকে।

জিমি টির সঙ্গে যখন প্রেম করছিল তখন আমাদের দেয়ার মতো সময় পেত না। মানুষের খুঁত ধরার সমস্ত ক্ষমতা ঐ বেচারার ওপর প্রয়োগ করেছিল। শেষে পড়ালেখায় যা-তা তবে পয়সাঅলা এমন এক পরিবার থেকে আসা দু-পয়সার এক শহুরে মেয়েকে বিয়ে করে ভেগে গেল ছেলেটা। নিজেকে যে বদলাবে সেজন্য খুব একটা সময় পায়নি ডি।

এলে দেখা হবে ওর সঙ্গে - ঐ যে!

নড়বড়ে পায়ে বাড়ির দিকে দৌড়ানোর চেষ্টা করল ম্যাগি, হাত ধরে থামালাম তাকে, ‘এসো এদিকে।’ থমকে দাঁড়াল সে, তারপর পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে গর্ত খোঁড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

সূর্যের চোখ ধাঁধাঁনো আলোয় ঠিকমত দেখা যাচ্ছিল না তাদের। কিন্তু গাড়ি থেকে প্রথম যে পা-টি নামল তা থেকেই বুঝে ফেললাম ওটা ডি। পা-দুটো সবসময়ই ফিটফাট তার, যেন বিশেষ এক ধরনে সেগুলো বানিয়েছেন খোদা। গাড়ির অন্য পাশ থেকে খাটো, গাট্টাগোট্টা একটা লোক বের হল। গোটা মাথা কমপক্ষে এক ফুট লম্বা চুলে ভর্তি, থুতনি থেকেও ঝুলছে চুল, দেখে খচ্চরের কোঁকড়ানো লেজের কথা মনে আসে। ‘আঁ’! ম্যাগির জোরে শ্বাস টানার শব্দ কানে এল। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে পায়ের সামনে আচমকা একটা সাপের লেজকে মোচড় খেতে দেখলে যেমন শব্দ বেরিয়ে আসে কারো মুখ দিয়ে সেরকম ‘আঁ’।

এরপর বেরুল ডি। এই গরমেও মাটি পর্যন্ত লম্বা পোশাক পরা। সে পোশাকও এমন, চোখে জ্বালা ধরায়। এত বেশি হলুদ আর কমলার ছড়াছড়ি যে সূর্যের আলোও পিছলে যাচ্ছে তাতে পড়ে। মনে হলো ডি-র পোশাক থেকে ঠিকরে পড়া তাপতরঙ্গের আঁচে আমার মুখটাও গরম হয়ে গেছে। কানের দুল দুটো সোনার, ঝুলে আছে কাঁধ পর্যন্ত। বগলের নিচে আটকে যাওয়া পোশাকের ভাঁজ ছাড়াতে যখন হাত তুলছে, হাতের বালাগুলো টুংটাং শব্দ করছে। পোশাকটা ঢিলেঢালা আর ঝোলানো। অবশ্য সে যখন হেঁটে আমার দিকে এগিয়ে এল, পোশাকটা পছন্দ করতে শুরু করলাম।

আবারও ‘আঁ’ করতে শুনলাম ম্যাগিকে। এবারের কারণ তার বোনের চুল।

ভেড়ার লোমের মতো খাড়া হয়ে আছে ওগুলো। রঙ নিকশ কালো আর তার প্রান্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে দুটো লম্বা বেনি যেগুলো ছোট গিরগিটির মতো পাক খেয়ে হারিয়ে গেছে কানের পেছনে।

‘ওয়া-সু-জো-টিন-ও!’ পোশাকের কারণে ঘষটে ঘষটে এগিয়ে আসতে আসতে বলল ডি। নাভি পর্যন্ত লম্বা চুলঅলা খাটো আর গাট্টাগোট্টা লোকটা দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল, ‘ আসালামালাকিম, আমার মা ও বোন!’ ম্যাগিকে জড়িয়ে ধরতে গেল সে, কিন্তু সে পিছলে বেরিয়ে গেল, গিয়ে লুকালো আমার চেয়ারের পেছনে। কাঁপতে শুরু করল সেখানে, ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম টপ টপ করে ঘাম ঝরছে চিবুক থেকে।

‘ওঠার দরকার নেই,’ ডি বলল। যেহেতু শরীরটা আমার মোটাসোটা, ঠেলাধাক্কা দেয়া ছাড়া উঠতে পারি না। দাঁড়ানোর কয়েক সেকেন্ড আগেই আমার নড়াচড়া দেখা যায়। ঘুরল সে, ফের গাড়ির দিকে এগোতে চটিজুতোর সাদা গোড়ালি দেখা গেল। গাড়ি থেকে পোলারয়েড ক্যামেরা বের করল একটা। ঝুঁকে পড়ে বাড়ির সামনে বসা আমার ছবি তুলতে লাগল একটার পর একটা, পেছনে ঘাপটি মেরে থাকা ম্যাগিকেসহ। ছবিতে বাড়িটা আসছে নিশ্চিত হয়ে তারপরই শাটার টিপল সে। মাটিতে মুখ ঘষতে ঘষতে উঠোনের কোনা থেকে একটা গরু বেরিয়ে এলে আমি, ম্যাগি আর বাড়িসহ সেটার ছবিও তুলল। তারপর পোলারয়েডটি গাড়ির পেছনের আসনে রেখে এগিয়ে এল, চুমু খেল আমার কপালে।

ওদিকে আসালামালাকিম ম্যাগির হাত নিয়ে কসরৎ করছে। ম্যাগির হাতটা মাছের মতো অবশ, হয়ত সেরকম ঠান্ডাও, যদিও সমানে ঘাম ঝরছে শরীর থেকে। হাতটাকে টেনে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে গেল সে ক্রমাগত। দেখে মনে হচ্ছে আসালামালাকিম হাত মেলাতে চাচ্ছে বটে, তবে খুব কায়দা করে। নয়তো সে জানে না মানুষ কীভাবে হাত মেলায়। ঘটনা যাই হোক, একটু পরই ম্যাগির ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিল সে।

‘বেশ,’ আমি বললাম। ‘ডি।’

‘না মা,’ সে বলল। ‘ডি নয়। ওয়াঙ্গেরো লিওয়ানিকা কেমাঞ্জো!’

‘কেন ডি-র কী হয়েছে?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘মরে গেছে,’ ওয়াঙ্গেরো বলল। ‘আমাকে অত্যাচার করত এমন লোকেদের নাম বয়ে নিয়ে বেড়াতে পারছিলাম না আর।’

‘আমি যেমন জানি তেমনি তুমিও জানো যে তোমার ডিসি খালার নামে নাম রাখা হয়েছিল তোমার,’ আমি বললাম। ‘ডিসি আমার বোন। তার আরেকটা নাম ছিল ডি। ডি জন্মাবার পর ওকে ডিসিকে আমরা ‘বড় ডি’ ডাকতাম।’

‘কিন্তু তার নাম কার নামে রাখা হয়েছিল?’ ওয়াঙ্গেরো বলল।

‘হয়ত আমাদের ডি দাদির নামে,’ জবাব দিলাম।

‘তাহলে ডি দাদির নাম কার নামে রাখা হয়েছিল?’ ওয়াঙ্গেরোর প্রশ্ন।

‘তার মায়ের নামে নাম,’ আমার উত্তর। দেখলাম ওয়াঙ্গেরো ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।

‘এর পেছনের কথা আমার জানা নেই,’ আমি বললাম। যদিও ঠিকই জানি, সম্ভবত গৃহযুদ্ধের আগে পর্যন্ত ব্যাপারটাকে টেনে নিতে পারতাম আমি, পরিবারের নানা শাখা-প্রশাখাসহ।

‘তাহলে,’ আসালামালাকিম বলল, ‘দেখলেন তো?’

‘আঁ,’ ম্যাগির গলা শুনলাম।

‘দেখার কিছু নেই,’ আমি বললাম, ‘ডিসি জন্মাবার আগের কথা যদি ওঠে, এতদূর পেছনে যাবার কী ঠেকা পড়েছে আমার?’

মুখে হাসি ঝুলিয়ে --স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকল আসালামালাকিম, এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন ‘এ’ মডেলের একটা গাড়িকে নিরীক্ষণ করছে।

ওকে আর ওয়াঙ্গেরোকে দেখলাম কিছুক্ষণ পরপরই আমার মাথার ওপর দিয়ে দৃষ্টি বিনিময় করতে। ‘এ নামটা কীভাবে উচ্চারণ করো তুমি?’ ওয়াঙ্গেরোকে শুধালাম।

‘উচ্চারণ করতে না পারলে দরকার নেই।’ ওয়াঙ্গেরো বলল।

‘সমস্যা কী!’ আমি বললাম। ‘তুমি যদি চাও এ নামে ডাকি, ডাকব।’

‘শুরুতে কেমন কেমন লাগতে পারে একটু,’ ওয়াঙ্গেরো বলল।

‘মানিয়ে নেব,’ আমি বললাম। ‘বলো।’

খানিকক্ষণের কসরতে নামটাকে বাগ মানালাম। আসালামালাকিমের নাম ওয়াঙ্গেরোর তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা, তিন গুণ কঠিন। দুই থেকে তিনবার ওটাতে হোঁচট খাওয়ার পর সে বলল তাকে স্রেফ হাকিম নাপিত ডাকতে। ভাবলাম জিজ্ঞাসা করি আসলেও সে মানুষের চুল কাটে কিনা। মনে হলো না কাটে, সেজন্য জিজ্ঞাসা না করাই মনস্থ করলাম।

‘এ পাড়ায় কিছু লোক আছে, গরু পালে মাংস বিক্রির জন্য। হয়তো তোমার আত্মীয়,’ আমি বললাম। ওরাও দেখা হলেই আসালামালাকিম বলে, তবে হাত মেলায় না। সবসময় ব্যস্ত লোকগুলো: গরুকে খাওয়াচ্ছে, বেড়া সারাই করছে, গরুর লবণ চাটার ঘর বানাচ্ছে, খড় বিছাচ্ছে। সাদারা কয়েকটা গরুকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার পর সারারাত বন্দুক হাতে পাহারা দিয়েছিল লোকগুলো। স্রেফ সে দৃশ্যটা দেখার জন্য দেড় মাইল হেঁটে গিয়েছিলাম আমি।

হাকিম নাপিত বলল, ‘তাদের কিছু কিছু মতবাদে বিশ্বাসী আমি, তবে গরু পালা আমার ঠিক আসে না।’ (ওরা বলেনি, আমিও জিজ্ঞাসা করিনি ওয়াঙ্গেরো (ডি) আসলেই ওকে বিয়ে করেছে কিনা।)

খেতে বসলাম আমরা এবং বসেই হাকিম বলল যে সে বাঁধাকপি খায় না আর শুয়োরের মাংস নোংরা। ওয়াঙ্গেরো অবশ্য শুয়োরের নাড়িভুড়ির তরকারি, রুটি, সব্জিসহ সবকিছু মজা করেই খেল। মিষ্টি আলু খেতে খেতে অনর্গল বকবক করে গেল। মনে হলো সবকিছুতেই ভারি মজা পাচ্ছে। যখন চেয়ার কেনার পয়সা ছিল না ডি’র (ওয়াঙ্গেরো) বাবা তখন টেবিলের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য যে বেঞ্চিগুলো বানিয়েছিল সেগুলো আমরা এখনও ব্যবহার করছি - এটাও দারুণ মজা দিল তাকে।

‘আহা মা!’ চেঁচিয়ে উঠল সে। তারপর হাকিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বেঞ্চিগুলো যে এত সুন্দর কখনো বুঝিনি। পাছার দাগ এখনও আছে বেঞ্চিতে,’ একথা বলে একবার নিজের নিতম্বে আরেকবার বেঞ্চিতে হাত বোলাল। তারপর বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে ডি দাদির মাখনের বাটিটা হাতে নিল। ‘এই যে!’ বলল সে। ‘ঠিক জানতাম এমন একটা কিছু পেয়ে যাব যেটা চাওয়া যাবে তোমার কাছে।’ এক লাফে টেবিল থেকে উঠে ঘরের কোনায় রাখা মাখন তোলার ভাণ্ডের কাছে গেল, ওটাতে রাখা দুধ টক হয়ে জমে গেছে। ভাণ্ডটির দিকে তাকিয়ে থাকল সে।

মাখনের ভাণ্ডের ঢাকনিটাও আমার দরকার,’ সে বলল। ‘বাডি চাচা তোমাদের একটা গাছকে চেঁছে এটা বানিয়েছিল না?’

‘হ্যাঁ,’ আমি বললাম।

‘আহ্ হা,’ খোশমেজাজে বলল সে। ‘দুধ নাড়ানোর খুন্তিটাও দরকার আমার।’

‘ওটাও গাছ চেঁছে বানিয়েছিলেন তোমার বাডি চাচা?’

ডি (ওয়াঙ্গেরো) আমার দিকে তাকাল।

‘ডি খালার প্রথম স্বামী খুন্তিটা বানিয়েছিল,’ শোনা যায় কি যায় না এমন নিচুগলায় বলল ম্যাগি। ‘ওর নাম ছিল হেনরি তবে সবাই স্ট্যাশ ডাকত।’

‘ম্যাগির মগজ একদম হাতির মতো,’ ওয়াঙ্গেরো বলল হাসতে হাসতে।

‘বাসন-কোসন ধোয়ার চোঙ্গার ঢাকনাটাকে আমার ঝুল-টেবিলের মাঝখানের শো পিস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে,’ চোঙ্গার মধ্যে একটা প্লেট গড়িয়ে দিয়ে বলল সে। ‘খুন্তিটা দিয়ে শৈল্পিক কিছু করা যায় কিনা সেটাও ভাবতে হবে।’

খুন্তিটাকে কাগজে মোড়ানোর পর হাতলটা বেরিয়ে রইল ওটার। কিছুক্ষণ হাতে ধরে রাখলাম ওটাকে। ভালোমতো না তাকালেও বোঝা যায়, মাখন তৈরির জন্য খুন্তির যেখানটায় ধরে উপর-নিচ করতে হয় সেখানে খানিকটা দেবে আছে। দাগ একটা-দুটো নয়, বেশ কয়েকটা। কাঠের মধ্যে বুড়ো আঙ্গুলসহ অন্য আঙ্গুলের চাপে দেবে যাওয়া জায়গাটা তাকালেই চোখে পড়ে। হাতলের কাঠটা সুন্দর, হালকা হলদেটে রঙের। বড় ডি আর স্ট্যাশের বাড়ির উঠোনে গজিয়েছিল গাছটা।

রাতের খাবারের পর আমার বিছানার পায়ের দিকে রাখা বড় তোরঙ্গটা খুলে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করল ডি। বাসন ধোয়ার জন্য রান্নাঘরে রয়ে গেল ম্যাগি। খানিক পর দুটো কাঁথা হাতে নিয়ে আমার কাছে এল ওয়াঙ্গেরো। প্রথমে ডি দাদি, তারপর বড় ডি ওটার টুকরোগুলোকে জুড়েছিল, আর সামনের বারান্দায় বসে কাঁথা বানানোর ফ্রেমে বোনার কাজটা শেষ করেছিলাম আমি। দুটো কাঁথার একটা বড় একটা তারার নকশায় বোনা। আরেকটার নকশার নাম ‘পর্বতের চারপাশে ঘোরা’। পঞ্চাশ বা তারও বেশি বছর আগে এ দুটো গায়ে দিতেন ডি দাদিমা। জ্যাটেল দাদার চক্রাবক্রা শার্টের টুকরো ছাড়াও ওতে আছে দেশলাই বাক্সের সমান নীল রঙের ছোট্ট এক টুকরো কাপড়, বড়দাদা এজরার গৃহযুদ্ধের সময়কার রংচটা ইউনিফর্ম থেকে এসেছে এটা।

‘মা’, পাখির মতো কুঁই কুঁই করে বলল ওয়াঙ্গেরো, ‘পুরনো এই কাঁথাগুলো পেতে পারি আমি?’

রান্নাঘর থেকে কিছু একটা পড়ার শব্দ এল, খানিক পর দড়াম করে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

‘অন্যগুলো থেকে নাও না,’ আমি বললাম, ‘এগুলো সব পুরনো জিনিস। তোমার দাদি মারা যাওয়ার আগে কয়েকটা কাপড় জোড়াতালি দিয়েছিল, আমি আর বড় ডি ওগুলো থেকে বানিয়েছি কাঁথাগুলো।’

‘উঁহু,’ ডি বলল। ‘অন্যগুলো চাই না আমি। ওগুলোর পাড় মেশিনে জোড়া লাগানো।’

‘তাহলে তো ওগুলো বেশিদিন টিকে থাকবে,’ আমি বললাম।

‘টিকে থাকার ব্যাপার না,’ ওয়াঙ্গেরো বলল। ‘দাদিমার পরনের কাপড় থেকে বানানো এগুলো। আর সেলাইয়ের পুরো কাজটা তাঁর নিজের হাতে করা। চিন্তা করো ব্যাপারটা!’ কাঁথাদুটো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে আলতো করে ওগুলোতে হাত বোলাল ওয়াঙ্গেরো।

‘ঐ যে বেগুনি রঙের টুকরোগুলো দেখছ, ওগুলো তার মা’র কাছ থেকে পেয়েছিল তোমার দাদি,’ বলে কাঁথাদুটো স্পর্শ করার চেষ্টা করলাম। এক পা পিছিয়ে গেল ডি (ওয়াঙ্গেরো) যাতে ওগুলো ছুঁতে না পারি আমি। এরই মধ্যে ওগুলো তার হয়ে গেছে।

‘ভাবো ব্যাপারটা!’ লম্বা শ্বাস টেনে বলল সে, বুকের আরো কাছে জড়িয়ে ধরেছে ওগুলোকে।

‘সত্যিটা হলো,’ আমি বললাম। ‘ওগুলো ম্যাগিকে দেব বলে কথা দিয়েছি। ও যখন জন টমাসকে বিয়ে করবে।’

এমনভাবে ফুঁপিয়ে উঠল সে যেন মৌমাছি হুল ফুটিয়েছে।

‘এগুলোর মর্ম ম্যাগি বুঝবে না,’ বলল সে। ‘হয়তো সেকেলে মানুষদের মতো প্রতিদিন ব্যবহার করতে শুরু করবে।’

‘করতে পারে,’ আমি বললাম। ‘ব্যবহার না করে কতদিন ওগুলোকে ফেলে রেখেছি খোদাই জানেন। ও ব্যবহার করলে ভালোই হবে।’ ডি-কে আর মনে করিয়ে দিলাম না যে সে যখন কলেজে যাচ্ছিল একটা কাঁথা ওকে সেধেছিলাম। নেয়নি। বলেছিল এসব জিনিস এখন আর চলে না।

‘পয়সা দিয়ে দাম মাপা যায় না এগুলোর!’ মেজাজ গরম করে বলল সে। ‘ম্যাগি ওগুলো বিছানায় পাতবে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ন্যাকড়া হয়ে যাবে। ন্যাকড়া না, তার চেয়েও খারাপ কিছু।’

‘সেক্ষেত্রে নতুন কয়েকটা বানিয়ে নেবে সে,’ আমি বললাম। ‘সে কাঁথা বানাতে জানে।’

রীতিমতো ঘৃণার চোখে আমার দিকে তাকাল ডি (ওয়াঙ্গেরো)। ‘তোমাকে বোঝানোর সাধ্য নেই আমার। আসল ব্যাপার হচ্ছে, এই কাঁথাগুলো, এই কাঁথাগুলো!’

‘আচ্ছা’, বোকা বোকা গলায় বললাম আমি। ‘তুমি কী করতে চাইছ ওগুলো দিয়ে?’

‘ঝুলিয়ে রাখব,’ সে বলল। যেন কাঁথা দিয়ে এই একটা কাজই করা যায়।

ততক্ষণে ম্যাগি এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। তার এক পা আরেক পায়ের সঙ্গে ঘষার আওয়াজটাও যেন স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমি।

‘ও নিয়ে যাক মা,’ সে বলল। গলাটা এমন কারো যে জীবনে কোনোকিছুতে জেতেনি বা কেউ তার জন্য কিছু জমিয়ে রাখেনি। ‘কাঁথাগুলো ছাড়াই ডি দাদিকে মনে থাকবে আমার।’

গাঢ় চোখে তাকালাম ওর দিকে। মুখের ভেতর নস্যি গুঁজেছে সে, ওগুলো নিচের ঠোঁটের পেছনে জমা হয়ে একধরনের বোকাটে আর চোরা চোরা চেহারা হয়েছে। ডি দাদি আর বড় ডির কাছে কাঁথা বানানো শিখেছে সে। জামার ভাঁজে ক্ষতচিহ্নে ভরা হাতদুটোকে লুকিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে রইল ম্যাগি। এমন এক দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে যাতে ভয় আছে, তবে রাগ নেই। ম্যাগির নিয়তি ওটা। সে জানে খোদা এভাবেই কাজ করেন।

ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছু একটা যেন মাথায় আঘাত করল আমার, তারপর মাথা থেকে সটান পৌঁছে গেল পায়ের তলায়। ঠিক যেমন গির্জায় থাকার সময় খোদার তেজ আমাকে স্পর্শ করে, মনটা আনন্দে ভরে যায় এবং আমি চিৎকার করে উঠি। এমন একটা কাজ করলাম যেটা আগে কখনো করিনি। জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরে টেনে আনলাম ম্যাগিকে। তারপর মিস ওয়াঙ্গেরোর হাত থেকে কাঁথাদুটো নিয়ে ম্যাগির কোলে গুঁজে দিলাম। মুখটা হা করে বিছানায় বসে রইল ম্যাগি।

‘বাকিগুলো থেকে দু-একটা নাও,’ ডি-কে বললাম আমি।

কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটে ঘুরে দাঁড়াল সে, পা বাড়াল হাকিম নাপিতের দিকে।

‘স্রেফ বুঝতে পারছ না তুমি,’ আমি আর ম্যাগি গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াতে বলল সে।

‘কী বুঝতে পারছি না?’ জানতে চাইলাম আমি।

‘তোমার ঐতিহ্য’, সে বলল। ম্যাগির দিকে ফিরে চুমু খেল তাকে। বলল, ‘ম্যাগি তোমারও উচিত কিছু একটা হওয়ার চেষ্টা করা। নতুন দিন এসে গেছে আমাদের জন্য। কিন্তু তুমি আর মা যেভাবে আছ তাতে কোনোদিন সেটা জানা হবে না তোমাদের।’

চোখে রোদচশমা ঝোলাল একটা, ফলে নাকের ডগা থেকে চিবুক পর্যন্ত গোটা জায়গাটা ঢেকে গেল।

হাসল ম্যাগি। হয়তো রোদচশমাটা দেখে। তবে এ হাসি ভয়ের নয়, খাঁটি।

গাড়ির ধুলো বাতাসে মিশে যাবার পর ম্যাগিকে বললাম আমার জন্যও খানিকটা নস্যি আনতে। তারপর মা-মেয়ে বসে বসে উপভোগ করতে লাগলাম সময়টাকে, বাড়িতে ফেরা এবং ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।





      
            লেখক পরিচিতি:
             মোস্তাক শরীফ
            গল্পকার। অনুবাদক।
            বাংলাদেশে থাকেন।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন