বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প : নীল কুকুরের চোখ


অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ 

তারপর মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। ভাবলাম এই প্রথম সে আমার দিকে তাকিয়েছে। কিন্তু যখন সে বাতিটার পেছনে ঘুরে দাঁড়াল এবং তার পিচ্ছিল তৈলাক্ত দৃষ্টিকে আমার পেছনে কাঁধের উপরে অনুভব করলাম, তখন বুঝলাম সে নয়, আমিই প্রথমবার তার দিকে তাকিয়েছি। সিগারেট জ্বালিয়ে শক্ত সুখটান দিয়ে ঘুরে চেয়ারের পেছনের পা দুটোর একটাকে মেঝের উপরে বিন্যস্ত করতেই সেখানে আমি তাকে তাকে দেখতে পেলাম। মনে হল বাতির পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরাতেই এই মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। সংক্ষিপ্ত কয়েক মূহুর্ত আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। দেখলাম যে, তার চোখের পাতা আলোকিত হল। প্রতিরাতের মত। তখন প্রাত্যহিকের ঘটনাগুলো আমার মনে পড়ে গেল। আমি তাকে বললামঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।’ বাতি থেকে হাত না সরিয়েই সে বলল আমাকে, ’আমরা এটিকে কখনই ভুলতে পারব না।‘ অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললঃ ‘নীল কুকুরের চোখ। আমি সব জায়গায় লিখে রেখেছি।‘

আমি তাকে ড্রেসিং টেবিলের দিকে যেতে দেখলাম। দেখলাম আয়নার গোলাকৃতি কাঁচের মধ্য দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। গাণিতিক আলোর শেষপ্রান্ত থেকে। দেখলাম সে তার অগ্নিময়-কয়লা চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই সে ছোট্ট একটা বাক্স খুলল। গোলাপী মুক্তা দিয়ে ভর্তি। দেখলাম সে নাকের উপরে পাউডার মাখছে। তারপর সে বাক্সটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল এবং পুনরায় বাতিটার কাছে ফিরে গেল। বলল,’ আমি ভয় পাচ্ছি। হয়ত বা কেউ একজন এই কক্ষের স্বপ্ন দেখছে এবং আমার গোপনীয়তাগুলোকে ফাঁস করে দিচ্ছে।‘ আগুণের শিখার উপরে সে তার লম্বা কম্পমান হাতকে ধরল। আয়নার সামনে পূনর্বার বসার পুর্বে নিজেকে উত্তপ্ত করে নেয়ার জন্যে। এবং বলল, ‘তুমি তো ঠাণ্ডা অনুভব কর না।‘ আমি বললাম, ’কখনও কখনও করি।‘ সে আমাকে বললঃ ‘এখন তুমি অবশ্যই অনুভব করবে।‘ তখন আমি বুঝতে পারলাম কেন আমার পক্ষে আসনটিতে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। কারণ, সেটা ছিল ভীষণ রকমের শীতল। ‘আমি অনুভব করছি,‘ বললাম। ‘রাতের এই সময়টি আসলেই অদ্ভুত ও শান্ত। মনে হয় গাছের পাতাগুলোও ঝরে গেছে।‘ সে কোন উত্তর করল না। আবার আয়নার দিকে যাত্রা শুরু করল। আমি চেয়ারে বসে থেকেই সেটিকে ঘুরালাম। আমার পশ্চাৎদেশকে তার সামনের দিকে রেখে। তার দিকে না তাকিয়েই আমি বুঝতে পারছিলাম সে কি করছিল। সে আয়নার সামনে বসে আয়নার ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান আমার পৃষ্ঠদেশ দেখছিল। কিন্তু আমার সামনে একটা মসৃণ দেয়াল ছিল। অন্ধ আয়নার মত। ওটার ভেতরে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। তারপরেও আমি তাকে দেখতে পেলাম। আয়নার সামনে বসে আছে। কারণ, আমার কল্পনায় আয়নাটি তখন টাঙানো ছিল সেই দেয়ালটির জায়গায়। ‘আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি,’ আমি তাকে বললাম। দেয়ালের উপরে দেখলাম তাকে চোখ তুলে তাকাতে। সেও আমার পিছন দিকটা দেখেছে, আয়নার ভেতরে, যেখানে আমার মুখ দেয়ালের দিকে ফিরে আছে। এরপর আমি তাকে দেখলাম চোখ নীচু করে নিঃশব্দে নিজের ব্রাসিয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকতে। আমি পুনরায় তাকে বললামঃ ‘আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।‘ সে ব্রাসিয়ার থেকে চোখ তুলে বলল, ‘অসম্ভব।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম অসম্ভব কেন। সে, শান্তচোখে ব্রাসিয়ারের দিকে তাকিয়ে বললঃ ‘কারণ তোমার মুখ দেয়ালের দিকে ফেরানো অবস্থায় রয়েছে।‘ তখন আমি চেয়ারটিকে উল্টোদিকে ঘুরালাম। আমার মুখে তখনও সিগারেট ধরানো ছিল। সেই মূহুর্তে সে বাতির কাছে ফিরে এসে তার হাতদুটোকে আগুনের শিখার উপরে মেলে ধরে মুরগীর পাখার মত, সেগুলোকে সেঁকছিল। তার নিজের আঙুল দিয়ে তার মুখটা ঢেকেছিল। ‘আমার ধারনা, আমার খুব ঠাণ্ডা লাগবে,’ সে বলল। ‘এটা নিশ্চয়ই বরফের শহর।‘ তারপর সে তার মুখ আমার দিকে ফিরাল। আমি দেখতে পেলাম তার চামড়া তামাটে হতে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আকস্মিকভাবে বিষণ্ণ হয়ে গেছে। ‘কিছু একটা কর তুমি,’ সে বলল আমাকে। তারপর সে তার পোষাক খুলতে শুরু করল। একটা পর আরেকটা। প্রথমেই খুলল তার ব্রাসিয়ার। আমি তাকে বললামঃ ‘ আমি দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি।‘ সে বললঃ ‘না, সেটার দরকার নেই। কারণ তারপরেও তুমি আমাকে দেখতে পাবে, যেমনটা তুমি দেখতে পাচ্ছিলে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার পর।‘ সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতেই আগুণের শিখা তার তামাটে শরীরকে প্রহার করতে লাগল। ‘আমি সব সময়ে তোমাকে এভাবেই দেখতে চেয়েছি। তোমার পেট গভীর গর্ত দিয়ে পূর্ণ, যেন তোমাকে প্রহার করা হয়েছে। এবং আমার কথাগুলো তার নগ্নতার সামনে অস্পষ্ট হয়ে যাবার পূর্বেই সে স্থির হয়ে গেল। বাতির গোলকের উপরে নিজেকে উত্তপ্ত করতে করতে। এবং বললঃ ‘কোন কোন সময়ে মনে হয় আমি ধাতুর তৈরী।‘ তারপর মূহুর্তের জন্যে সে নীরব হল। শিখার উপরে তার হাত দুটো সামান্য অবস্থান পরিবর্তন করল। আমি বললামঃ ‘কোন কোন সময়ে স্বপ্নের ভেতরে আমি তোমাকে ভেবেছি যাদুঘরের কোণায় রাখা ব্রোঞ্জের কোন মূর্তি হিসেবে। মনে হয় সেকারণেই তুমি শীতল। সে বললঃ ‘কখনও কখনও যখন আমি আমার হৃদয়ের উপরে ঘুমাই, আমি অনুভব করি যে, আমার শরীর ফাঁপা এবং আমার চামড়া ফলকে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তখন, যখন আমার ভেতরে রক্ত স্পন্দিত হয়, আমার মনে হয় কেউ একজন আমার পাকস্থলীতে টোকা দিয়ে আমাকে ডাকছে এবং আমি বিছানায় তামার শব্দের অনুরণন শুনছি। ফলকে রূপান্তরিত হওয়া ধাতুর মত।‘ ‘আমি তোমার গল্প শুনতে চাই,’ আমি বললাম। সে বলল,’আমরা যদি পরস্পরকে কোনদিন পাই, তুমি তোমার কান আমার পাঁজরের উপরে স্থাপন করবে। আমি বামদিকে কাঁত হয়ে শুয়ে থাকব। এবং তুমি আমার প্রতিধ্বনি শুনতে পাবে। আমি সব সময়েই চেয়েছি যে, তুমি এটা কর।‘ তার কথাবলার সময়ে আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। সে বলল যে, অনেক বছর যাবত সে অসাধারণ কিছুই করেনি। শুধু তার জীবনকে উৎসর্গ করেছে বাস্তবে আমাকে খুঁজে পেতে। সেই বিশেষ বাক্যাংশের মধ্য দিয়েঃ ‘ নীল কুকুরের চোখ’। তারপর নীচের কথাগুলো চিৎকার করতে করতে রাস্তার উপরে চলে গেলঃ 

‘আমি হলাম সেই, যে তোমার স্বপ্নের ভেতরে আসে প্রতিরাতে এবং তোমাকে বলেঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।‘ সে রেস্টুরেন্টগুলোতে গিয়ে খাবারের অর্ডার দিতে গিয়ে বললঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।‘ কিন্তু রেস্টুরেন্টের ওয়েটাররা মনে করতে পারল না কেউ স্বপ্নের ভেতরে বাক্যাংশটি কখনও তাদেরকে বলেছিল কিনা। তারপর সে ন্যাপকিনের উপরে রঙ দিয়ে এবং ছুরি দিয়ে টেবিলের উপরে লিখলঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।‘ এমনকি সে সব হোটেল, স্টেশন ও সরকারী ইমারতগুলোর জানালা সমূহে তর্জনী দিয়ে লিখলঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।‘ আমাকে জানাল যে, একবার সে একটা ড্রাগের দোকানে একই গন্ধ পেয়েছিল, যা সে আমার কক্ষেও পেয়েছিল একরাতে আমাকে স্বপ্নে দেখার সময়ে। ‘অবশ্যই সে কাছে কোথাও আছে,’ সে ভেবেছিল ড্রাগ স্টোরের পরিষ্কার ও নতুন টাইলস দেখে। স্টোরের মালিকের কাছে গিয়ে বলেছিলঃ ‘আমি সকল সময়েই একজন মানুষকে স্বপ্নে দেখে থাকি, যে আমাকে বলেঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।‘ লোকটি তাকে বলেছিলঃ ‘আসলে মিস, তোমার চোখ দেখতে সেরকম।‘ সে তাকে বলেছিলঃ ‘আমাকে যে স্বপ্নের ভেতরে কথাগুলো বলেছিল, তাকেই আমি খুঁজছি।‘ লোকটি হাসতে হাসতে কাউন্টারের অন্যপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। তখন সে পরিষ্কার টাইলস দেখতে দেখতে এবং সেটার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে এক সময়ে তার পার্স খুলে রক্তিম বর্ণের লিপস্টিক বের করেছিল এবং সেটি দিয়ে টাইলসের উপরে লাল অক্ষরে লিখেছিলঃ ‘নীল কুকুরের চোখ।‘ দোকানের লোকটি কিছুক্ষণ পর ফিরে এসেছিল এবং তাকে বলেছিলঃ ‘তুমি আমার দোকানের টাইলস ময়লা করে ফেলেছ‘। এবং তাকে একটা ভেজা কাপড় দিয়ে বলেছিলঃ ‘পরিষ্কার করে দিয়ে যাও।‘ বাতির পাশে দাঁড়িয়ে সে আমাকে জানালো যে, সেদিন সারাবিকেল ধরে সে টাইলসগুলো পরিষ্কার করেছিল এবং চিৎকার করতে করতে বলছিলঃ ‘নীল কুকুরের চোখ‘। যতক্ষণ পর্যন্ত না তার চারপাশে লোকের ভিড় জমে গিয়েছিল এবং সবাই তাকে পাগল বলে অভিহিত করেছিল। 

তার কথা শেষ হবার পর আমি চেয়ারে বসেই বললামঃ ‘প্রতিদিন আমি চেষ্টা করি সেই বাক্যাংশটা মনে করতে, যা দিয়ে আমি তোমাকে খুঁজে পেতে পারি। সেই সময়ে আমার কখনই মনে হয় না যে, পরেদিন আমি সেটা ভুলে যেতে পারি। কিন্তু প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতে পাই যে, আমি সেই শব্দগুলো ভুলে গেছি।‘ সে বললঃ তুমিই শব্দগুলো আবিষ্কার করেছিলে প্রথমদিনে। আমি তাকে বলিঃ ‘আমি সেগুলো আবিষ্কার করেছিলাম, কারণ আমি তোমার চোখে তা দেখেছিলাম। কিন্তু এটা আসলেই হতাশাব্যঞ্জক যে, পরেরদিন সকালে আমি তা মনে করতে সক্ষম হই না। সে বাতির পাশে মুষ্টিবদ্ধ হাতে গভীর শ্বাস নিতে নিতে বললঃ ‘তুমি যদি শুধু মনে করতে সক্ষম হতে যে, কোন শহরে বসে আমি সেগুলো লিখছিলাম।‘ 

তার দৃঢ় হয়ে থাকা দাঁতগুলো শিখার উপরে জ্বলজ্বল করতে লাগল। ‘আমার ইচ্ছে করছে তোমাকে স্পর্শ করতে,’ আমি বললাম। সে মুখ উঁচু করল। তার হাতগুলোর মত তার দৃষ্টিও পুড়ে যাচ্ছিল। আমার মনে হল যে, সে আমাকে দেখেছে। ‘তুমি তো আমাকে কখনই তা বলনি,’ সে বলল। ‘আমি এখন তোমাকে বলছি এবং এটাই সত্য,’ আমি বললাম। বাতির অন্যপাশ থেকে সে একটা সিগারেট চাইল। আমার হাতের সিগারেটের শেষ অংশটি আঙুলের ভেতরে হারিয়ে গেছে। কারণ আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি সিগারেট পান করছিলাম। সে বললঃ ‘আমি জানি না কেন আমি মনে করতে পারি না, কোথায় আমি শব্দগুলো লিখেছিলাম। আমি তাকে বললামঃ ‘একই কারণে আগামীকাল সকালে আমি শব্দগুলো মনে করতে সক্ষম হব না।‘ সে দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে বললঃ ‘ না, আমার কাছেও কখনও কখনও মনে হয় যে, বিষয়টা আমি স্বপ্নে দেখেছি।‘ আমি দাঁড়ালাম এবং বাতির দিকে গেলাম। সে একটু দূরে ছিল। আমি সিগারেট ও ম্যাচ হাতে নিয়ে এগোতে থাকলাম। তার দিকে। কিন্তু বাতিটিকে অতিক্রম করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং আমি সিগারেটটি তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। সে সেটিকে নিয়ে তার ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে সামনের শিখার দিকে ঝুঁকল। আমি ম্যাচ জ্বালানোর পূর্বেই। ‘পৃথিবীর অন্তত কয়েকটি শহরের সবগুলো দেয়ালে ‘নীল কুকুরের চোখ’ এই লেখাগুলো দেখা যেতে হবে,‘ আমি বললাম। তাহলেই সম্ভবত আমি সকালে শব্দগুলোকে মনে করতে সক্ষম হব এবং তোমাকে খুঁজে পাব।‘ সে পুনরায় মাথা তুলল। আলোকিত কয়লাটি তার ঠোঁটের মাঝখানে ছিল। ‘নীল কুকুরের চোখ’ বাক্যাংশটি সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে করল। সিগারেটটি তখনও তার চিবুকের উপরে ঝুলছিল এবং চোখদুটো ছিল অর্ধনিমীলিত। সিগারেটের ধুঁয়া টেনে নিতে নিতে সে বললঃ ‘এখন এটা অন্যকিছু। আমি নিজেকে গরম করছি।‘ কথাগুলো সে বলল ঈষদুষ্ণভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে, ঠিক যেন কথাগুলো আসলে সে বলেনি, কিন্তু একটা কাগজের টুকরার উপরে লিখে আগুণের শিখার নিকটে ধরেছে এবং যা থেকে আমি পড়লামঃ ‘আমি গরম হচ্ছি।’ কাগজটিকে সে হাতের তালু ও তর্জনী দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দিল, যেন আমার পড়া শেষ হয়ে গেছে। তারপর সেটিকে সে কুঁচকিয়ে মেঝের উপরে নিক্ষেপ করতেই তা হালকা ছাই’তে রূপান্তরিত হয়ে গেল। ‘এটাই ভাল,’ আমি বললাম। ‘কোন কোন সময়ে তোমাকে দেখতে আমার ভয় লাগে, যখন তুমি বাতির পাশে কাঁপতে থাক।‘ 

বিগত কয়েক বছর যাবত আমরা পরস্পরকে দেখছিলাম। প্রায় সময়েই আমরা যখন পরস্পরের সাথে মিলিত হতাম, তখন কেউ একজন আমাদের কক্ষের বাইরে চামচ ফেলত এবং আমাদের ঘুম ভেঙে যেত। এভাবে একটু একটু করে আমরা বুঝতে পারছিলাম যে, আমাদের বন্ধুত্ব অন্যকিছু, এমনকি খুব সাধারণ ঘটনাবলীর উপরে নির্ভরশীল। কারণ, আমাদের সাক্ষাৎকারগুলো সব সময়ে এভাবেই শেষ হত। খুব ভোরে চামচ পতনের শব্দের মধ্য দিয়ে। 

এখন, বাতির পাশে সে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি মনে করতে সক্ষম হলাম যে, অতীতেও সে এভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে থাকত কোন দুরবর্তী স্বপ্নের ভেতরে। আমি তখন আমার চেয়ারের পেছনের পা সমন্বয় করে চেয়ারটিকে ঘুরিয়ে দিয়ে পাংশুটে বর্ণের চোখের অদ্ভুত মেয়েটির মুখোমুখি হতাম। সেই স্বপ্নের ভেতরেই আমি তাকে প্রথমবার জিজ্ঞেস করেছিলামঃ ‘তুমি কে?’ সে আমাকে বলেছিলঃ ‘আমার মনে নেই।‘ আমি তাকে বলেছিলামঃ ‘কিন্তু আমার মনে হয় পুর্বেও আমরা পরস্পরকে দেখেছি।‘ সে নির্বিকারভাবে বলেছিলঃ ‘মনে হয় আমি পুর্বে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, এই কক্ষেই।‘ তখন আমি তাকে বলেছিলামঃ ‘ঠিক বলেছ। আমি একটু একটু করে মনে করতে পারছি।‘ সে বলেছিলঃ ‘কি অবাক করা ব্যাপার! আমি নিশ্চিত যে, আমাদের দেখা হয়েছে অন্য কোন স্বপ্নের ভেতরে।‘ 

সে সিগারেটে দুই টান দিল। আমি তখনও বাতির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ করে আমি একদৃষ্টে তার দিকে তাকালাম। শরীরের উপর হতে নীচ পর্যন্ত। তখনও সে তামাই ছিল। তবে কঠিন ও শীতল ধাতু নয়, বরং হলুদাভ, নরম ও নমনীয় তামা। ‘আমি তোমাকে স্পর্শ করতে চাই,’ আমি পুনরায় বললাম। সে বললঃ ‘তোমার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।‘ আমি বললামঃ ‘সেটা আমার জন্যে এখন কোন বিষয় নয়। পরেরবার দেখা হবার জন্যে আমাদের যা করতে হবে তা হল বালিশকে উল্টিয়ে দেয়া।‘ এই বলে আমি বাতির উপর দিয়ে হাত বাড়ালাম। সে কোন নড়াচড়া করল না। ‘তোমার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে,‘ সে আমাকে পুনরায় বলল, আমি তাকে স্পর্শ করতে পারার পূর্বেই। ‘হতে পারে যে, তুমি যদি বাতির পেছনে আস, তাহলে আমরা পৃথিবীর অজ্ঞাত কোন অংশে জেগে উঠব, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে।‘ কিন্তু আমি জিদ করে বললামঃ ‘এতে কিছুই যায় আসবে না।‘ তখন সে বললঃ ‘আমরা যদি বালিশটাকে উল্টিয়ে দেই, তবে আমরা আবার সাক্ষাৎ করতে পারব। কিন্তু সেক্ষেত্রে ঘুম থেকে জাগার পর তুমি ভুলে যাবে।‘ আমি তখন ঘরের কোণার দিকে ফিরে আসতে লাগলাম। আমার নিজের অংশে। সে সেখানেই রয়ে গেল। আগুনের শিখায় হাত গরম করতে থাকল। চেয়ারের কাছে পৌঁছানোর পূর্বেই পেছন থেকে আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলামঃ ‘আমি যখন মাঝরাতে ঘুম থেকে জাগি, বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে থাকি, বালিশের ঝালরগুলোর স্পর্শে আমার হাঁটু জ্বলতে থাকে, এবং সকাল পর্যন্ত আমি পুনরাবৃত্তি করতে থাকিঃ ‘নীল চোখের কুকুর।‘ 

আমি তার দিকে না ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করেই রইলাম। ‘ভোর হচ্ছে,’ আমি বললাম। ‘রাত দুটোর সময়ে আমি ঘুম থেকে উঠেছি, এখন থেকে অনেকটুকু সময় পূর্বে।‘ বলে দরজার দিকে গেলাম। দরজার খিলের উপরে হাত রাখতেই পুনরায় তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। পূর্বের মত অপরিবর্তনীয়। ‘দরজা খুলো না,’ সে বলল। ‘সিড়িঘরের বারান্দাটি (হলওয়ে) এখন কঠিন স্বপ্নে পূর্ণ হয়ে আছে।‘ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ ‘ তুমি কিভাবে জান?’ সে আমাকে বললঃ ‘আমি একটু আগেই সেখানে গিয়েছিলাম এবং আমাকে ফিরে আসতে হয়েছে আবিষ্কার করে যে, সেখানে দেখলাম আমি আমার হৃদয়ের উপরে ঘুমাচ্ছি।‘ আমি দরজাটিকে অর্ধেক খুললাম। সেটিকে একটু নড়াতেই সামান্য শীতল ও হালকা বাতাস আমার কাছে বয়ে আনল তাজা সবজী ও ভেজা পৃথিবীর সুঘ্রাণ। আমি দরজাটিকে খুলতে খুলতে তাকে বললামঃ আমার মনে হয় না বাইরে কোন হলওয়ে রয়েছে। বরং আমি সেখান থেকে গ্রামের গন্ধ পাচ্ছি। এবারে সে একটু দূরাগত স্বরে বললঃ ‘আমি সেটা তোমার চেয়ে বেশী জানি। বাইরে যা ঘটছে, তা হল একটি মেয়ে গ্রাম নিয়ে স্বপ্ন দেখছে।‘ সে তার বাহুকে শিখার উপরে আড়াআড়িভাবে স্থাপন করে তার কথা চালিয়ে যেতে লাগলঃ ‘এই মেয়েটি সব সময়েই গ্রামে নিজের জন্যে একটা বাড়ি চেয়েছে, কিন্তু কখনই শহর ত্যাগ করতে পারেনি।‘ আমি মনে করতে পারলাম যে, আমার অতীতের কোন স্বপ্নে আমি মেয়েটিকে দেখেছি। কিন্তু আমি জানি যে, দরজাটি আধখোলা এবং আধা ঘন্টার ভেতরে সকালের নাস্তা করার জন্যে আমাকে নীচে নামতে হবে। আমি বললামঃ ‘যাই হোক না কেন, জেগে উঠার জন্যে আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।‘ 

বাইরে মূহুর্তের জন্যে বাতাসের ঢেউ খেলে গেল। তারপর কিছুক্ষণের শান্ততা। ঘুমের ভেতরে পাশ ফিরে শোয়া কারও শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। প্রান্তর থেকে কোন বাতাসের প্রবাহ নেই। আর কোন গন্ধও নেই। ‘আমি আগামীকাল সকালে তোমাকে চিনতে পারব, যখন রাস্তায় দেখতে পাব যে, দেয়ালে একটা মেয়ে লিখছেঃ ‘নীল চোখের কুকুর।‘ মেয়েটি একটা ব্যথিত হাসি দিয়ে অসম্ভবের কাছে আত্নসমর্পনের ভঙ্গিতে বললঃ ‘কিন্তু দিনের আলোতে তুমি কিছুই মনে করতে পারবে না।‘ বলে সে তার হাতকে বাতির উপরে রাখল, তার অবয়ব একটা কাল মেঘ দিয়ে ঢেকে গেল। ‘তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে স্বপ্ন থেকে জেগে উঠার পর কি সে স্বপ্ন দেখেছে, তা মনে রাখে না।‘



অনুবাদক : 
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

1 টি মন্তব্য:

  1. স্যার,অনেক সুন্দর গল্প,,গল্পের অনুধাবনের চাইতে কথার শিল্পে ডুবে ছিলাম.

    উত্তর দিনমুছুন