বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

ক্যাথরিন ডান 'এর গল্প আবাসিক কবি



অনুবাদ :- দোলা সেন

ওর অনুরোধেই এই পার্কিং লটটার অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকা। রাস্তার বাঁকে আলো দেখলেই পাশের ঝোপের আড়ালে টুক করে লুকিয়ে পড়ছি। আসলে আমাকে কেউ দেখল কিনা তাতে আমার বয়েই গেল। আমি শুধু চাই ওর গাড়িটা যখন আসবে তখন যেন সে দেখে, ওর কথামতো আমি সবার চোখের আড়াল থেকে হঠাৎ উদয় হয়েছি!


বেশ মজাই লাগছিল প্রথমটায়। কিন্তু আপদ বৃষ্টিটা শুরু হলো। আমার মাস্কারা গলে পড়ছে, আমার সুন্দর ড্রেসটায় কাদা - সব নষ্ট হয়ে গেল!এবার বিরক্ত লাগছে। এই লুকোচুরির মানেটা কি? এই বৃষ্টিভেজা রাতে কেই বা দেখতে আসবে আমাদের? আর দেখলেই বা কোন কাঁচকলা? সত্যি কথা বলতে কি আমার এখন একটা প্ল্যাকার্ড হাতে মাঝরাস্তায় দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে - “ I am here to screw Mr. Lucas, THE RESIDENT POET!” যত্তোসব!

কাদা ছিটিয়ে একটা গাড়ি চলে গেল। যদিও গাছের আড়ালে চলে গিয়েছিলাম, তবুও আমার মুখে এখন কাদার ছিটে! আরেকটা গাড়ি। সেটা পার হলে রাস্তায় উঠে এলাম আবার। আজকের বোঝার উপর শাকের আঁটি হলো, লুকাসকে জিজ্ঞাসা করে রাখতে ভুলে গেছি, ওর গাড়ির মডেলটা কি? ওর গাড়িটা যদি আমায় না দেখে পার হয়ে যায়? রাস্তায় এখন ওপারের ডর্মিটরি থেকে আসা আলোটা বাদ দিলে চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার ঘরের সোফাটার চেয়ে এই মুহূর্তে আরামদায়ক আর কিছুর কথা মনে করতে পারছি না। চাঁদটা উঠলেই অন্ধকারটা কেটে যাবে। তখনো যদি লুকাস না আসে তাহলে আমি বাড়ি ফিরে যাব। সিগারেটটাও যদি থাকতো ছাই!

আসলে আমারই ভুল। লুকাসের মতো এতো ভীতু প্রফেসরকে বেছে নেওয়া আমার উচিত হয়নি। আসলে নতুন ছাত্রীদের সঙ্গে ওর পরম ‘স্নেহময়’ ব্যবহারের জন্যই ওকে সহজ শিকার মনে হয়েছিল। ওর অখাদ্য কবিতা এবং ততোধিক অখাদ্য ভুড়ি সহ্য করা সবার কর্ম নয়। বন্ধুদের তামাশার হাত থেকে বাঁচতে ওকে আমার দরকার ছিল। সারা ক্লাসে আমিই একা অনভিজ্ঞ! যাচ্ছেতাই অবস্থা। আবার রোজকার একঘেয়েমি কাটাতে ওরও আমাকে দরকার ছিল। এখন ওই মুরগীর বাচ্চাটা যদি শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যায়, তাহলে আমার এই কাকভেজাটাই সার হবে।

রাস্তার বাঁকে আরেকটা আলো দেখা গেল। একটা বুড়ো ভক্স ওয়াগন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়িয়েছে। আহা, গাড়ির কি ছিরি! থরথর করে কাঁপছে, হেডলাইটদুটোর আলো একটা অদ্ভুত কোণে বেঁকে আছে। তার পিছন থেকে চালকের চেনা চশমার আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। আমি আড়াল থেকে বেরিয়ে গাড়ির মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। সীটটা ভিজে চুপ্পুস হলো। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এর উপরে আমার কোনো হাত ছিল না। উদ্বিগ্ন মুখে ও আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে সে ভোঁ করে গাড়ি চালিয়ে দিল।

যখন প্রথম দেখেছিলাম, তখন কোঁকড়া চুলদাড়ি, নীল চোখ, গোলাপী ঠোঁট আর চৌকো কপাল নিয়ে ওকে পুরো ইউলিসিস গ্র্যান্টের মতো দেখতে মনে হয়েছিল। মোহময় গলায় পড়ানোর কায়দাটাও দারুণ। স্ট্রীটল্যাম্পের আলো জল আর কাঁচের মধ্যে দিয়ে ভেঙে ভেঙে আসছে। তাতে দেখছি সেই কপালে এখন চিন্তার রেখা। লাল আলোতে গাড়ি দাঁড়াতে এই প্রথম আমার দিকে তাকিয়ে যেন খুব কষ্ট করে হাসলো।

-কেউ দেখে ফেলেনি তো?
-শুধু তোমার শাশুড়ি!

এতক্ষণে চুকচুক করে হাসল – যতক্ষণ না শহরের বাইরে যাচ্ছি, ততক্ষণ সীটের তলায় ঢুকে পড়ো দেখি।

তার মুখের বিব্রত হাসিটায় বরাবরের মতোই আমার দমবন্ধ হয়ে এল। আমি মেঝেতে বসে পড়ে মুখটা সীটের উপর রাখলাম। লোকটাকে কি বিশাল দেখতে!

- তোমার কি মনে হয় আমার মাথা খারাপ?
- তুমি একটি আস্ত পাগল।

মুখটা ওর দিকে ফিরিয়ে উজ্জ্বল হাসি উপহার দিলাম, যাতে সে দেখতে পায়। যদিও আমার মনে হচ্ছিল ওকে এর চেয়ে বাড়িতে এক বোতল বীয়ার আর কাদার মতো প্যাতপেতে বৌয়ের বিছানাতেই বেশি মানায়।

ও পাগল শব্দটায় খুশি হলো। হবে জানতাম। কবিরা পাগল বিশেষণটা খুব পছন্দ করে। এবার আমার সামনে একটা সিগারের প্যাকেট নামিয়ে দিল। উঃ, প্রাণ বাঁচল যেন। ধরাতে গিয়ে একবার থমকালাম – তোমার দমবন্ধ লাগবে না?

- নাঃ, সিগারের গন্ধে আমার অসুবিধা হয় না। সিগারেটের গন্ধে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।

আমার মনে পড়লো ক্লাসের জানলাগুলো শীতকালেও খোলা রাখতে হতো এনার হাঁপানির আক্রমণের ভয়ে। সারা শীতকাল ভদ্রলোক একটাই গাবদা স্যুট পরে কাটিয়ে দিতো। ছাত্রমহলে আমরা খুব হাসাহাসি করতাম এই নিয়ে।

-ডিনার করেছ? আমার ডিনার করা হয়নি।

এতক্ষণে একটা কাজের কথা শোনা গেল।

- পেটে ছুঁচো লাফাচ্ছে।
- হ্যামবার্গার খাবে?

সিটে বসে থাকলে নির্ঘাত একটা চুমুই খেয়ে ফেলতাম। তার বদলে আর একটা উজ্জ্বল হাসি উপহার দিলাম। একটা জয়েন্টে দাঁড়িয়ে ও খাবার আনতে গেল। যাবার আগে বলে গেল – প্লিজ এখন যেন উঠে বসো না। এখানে অনেক ছাত্র আসে। কেউ দেখে ফেলতে পারে। আমি এক্ষুনি ফিরে আসছি।

মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। এতোই যদি ভয়, তাহলে এ জাতীয় অ্যাডভেঞ্চারের শখ কেন বাপু? অন্ধকারেই তো পার্ক করেছে! ও চলে যেতে জানলার ওপর মাথা তুলে দিলাম। এ বাবা! নিয়নের আলোয় ওকে পিছন থেকে তো খুবই আকর্ষণীয় লাগছে! ঠিক যেন একটা পাকা থপথপে টমেটো! খোদায় মালুম, আমি যে কেন এইরকম একটা ম্যাড়মেড়ে লোকের সঙ্গে উত্তেজনাময় অভিযানে বেরিয়েছি?

জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি সে হ্যামবার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কফি নিয়ে ফিরছে। আমি মুণ্ডু নামিয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লেগেছি। কাঁচুমাচু মুখে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিলো।

- এবার সিটে উঠে বসো। খুব কষ্ট হলো, তাই না?

আমার কোমরের তলার অংশ অসাড় হয়ে গেছে। ঠান্ডাটা শিরদাঁড়া তক পৌঁছে গেছে। অতি কষ্টে উঠে বসে কফির কাপের সীল খুললাম। আঃ, গরমটা ভিতরে যেতে একটু চাঙ্গা লাগল। বার্গারের গরম কভারটা খুলে কামড় দিলাম।

-আশাকরি তুমি পেঁয়াজ পছন্দ কর।
- বউকে কি বলে এলে?- ওর হাতের বার্গারে সস মাখিয়ে দিলাম।

- প্রকাশকের সঙ্গে একটা উইকএন্ড মিটিং আছে।

সামনে অন্ধকার, আরও অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। রাস্তায় একটাও গাড়ি নেই। হেডলাইটের আলোয় চাকার তলায় রাস্তাটা কুঁকড়ে কুঁকড়ে ঢুকে পড়ছে। মাঝে মাঝে আলোয় এক আধটা আকার তৈরি হতে না হতেই মিলিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা ওর বউ কি ওকে বিশ্বাস করে? কিন্তু এটা জিজ্ঞেস করা যাবে না। এ থেকে অনেক নোংরা কথা গজিয়ে উঠতে পারে। অথবা ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলতে পারে,- তোমার কি দরকার?

পাশ দিয়ে নদীর হালকা আওয়াজ পাচ্ছি। এখানে মাছ ধরতে এসেছিলাম একবার। তখন ভোরের আলো ব্রিজের ওপর, ডকের উপর ছড়িয়ে পড়ছিল। বেগুনী জলের ওপর দিয়ে একটা বড়ো গোল্ডফিশ গেঁথে তুললাম যখন, তখন মনে হচ্ছিল, আমার হাতেও সোনালি রং লেগে গেছে। লুকাসকে কথাটা বলতে সে হাসল – তোমারই মনে হচ্ছে কবি হওয়া উচিত ছিল!

বলেই এক মুঠোভর্তি আলুভাজা তুলে চপর চপর করে চিবোতে লাগল। তেলের হাতটা প্যান্টেই মুছে নিল।

- আমি ভেবেছিলাম কবিরা একটু অন্যরকম হয়।
আমি কথা চালাতে মরিয়া।

- কিরকম? ঝমঝমে বৃষ্টিতে উদোম হয়ে বাইরে ছোটাছুটি করবে? কখন বিদ্যুত আকাশ থেকে তার মাথায় নেমে আসে সেই আকাঙ্ক্ষায়? ...
-আমি কি তোমার এ সপ্তাহের বাজ?
-নাহ্। শুধু বিদ্যুত। বজ্রাঘাতের ভয় নেই।

বলেই সে তার চোখ দিয়ে আমার সর্বাঙ্গ চেটেপুটে নিল। আমার কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠলো। বুঝলাম, আমার দ্বারা পেশাদার বেশ্যা হওয়া সম্ভব নয়। যদিও টাকার পরিমাণটা যথেষ্ট আকর্ষক, তবুও। ভেবে দেখ, একটা মানুষের হাবভাব দেখে, তার দুর্বলতা, তার চাহিদা বুঝে, তার কাছ থেকে টাকা দুইয়ে নেওয়া..

বাপরে বাপ! একবার – ঠিক আছে। কিন্তু বারবার? তাও আবার নিজের পছন্দমতো কাউকে খুঁজে নেবার সুযোগ নেই যেখানে? অবশ্য এবারেও যে বাছাই করার জন্য আমার হাতে অনেকজন ছিল এমনও নয়। আমার রোজগারে সস্তা হ্যামবার্গার আর একটা অখাদ্য মোটেলবাস পর্যন্তই হয়। তবু তো সপ্তাহান্তে বাড়ি যেতে পারতাম! কিন্তু এখন আর ফেরার উপায় নেই। সেটা নেহাত কাপুরুষের মতো কাজ হবে।

যত সামনের দিকে চলেছি, ততই সে ভয় কাটিয়ে সাহসী হয়ে উঠছে। একটা লোভী হাত ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার পায়ের উপর। আমি আমার হাতটা দিয়ে ওর চুলে বিলি কাটতে থাকলাম। ইঃ, আপহোলস্ট্রিটা কি রদ্দি!

- যতক্ষণে পৌঁছাবো, ততক্ষণে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়বে। ফ্রেশ হয়ে ওঠার জন্য একটা ঘুম তোমার খুব দরকার।

প্রাণপণে ভবিতব্যকে কিছুটা পিছিয়ে দিতে চাই। কিন্তু সে গুড়ে বালি।

- ঠিক উল্টো। আমি এখন যাকে বলে অন ফায়ার!
ওর হাসিটা আরও চওড়া হয়ে উঠছে। হাতটাও আগের চেয়ে সাহসী। আমার হাতটা টেনে নিজের থাইয়ের উপর রাখল। কি চায় লোকটা? একদলা পুডিংয়ের মতো নরম থাইয়ে হাত বোলাতে লাগলাম। একটা হ্যামবার্গারের দাম এর চেয়ে বেশি হয় না। আমার মাথাটা নিজের কোলের উপর টেনে নামানোর চেষ্টা করতেই বলে উঠলাম – রাস্তাটা পাহাড়ের বাঁকে উঠছে। ওল্টালে কি হবে?

পাকা হাতে গিয়ার বদলিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। রাস্তায় মনোযোগী হওয়াতে, আমি শেষবারের মতো পুডিংয়ে চাপড় মেরে সিটে আরাম করে বসলাম। একটা সিগার ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – চলবে?

- সিওর।

আরেকটা সিগার ধরিয়ে ওর মুখে গুঁজে দিলাম। একটু সহজ কথাবার্তার জন্য মনটা আঁকুপাকু করছিল। বললাম – এ কেমন কথা? তোমার সিগারে হাঁপানি বাড়ে না, অথচ সিগারেটে বাড়ে?

-পুরোটাই মানসিক ব্যাপার। ছাব্বিশ বছর বয়েসে এক হাসপাতালে বায়ুদূষণ নিয়ে একটা পেপার পড়ার পর থেকে এটা শুরু হয়। আমার মা গলার ক্যান্সারে ওই হাসপাতালেই মারা গিয়েছিলেন।

যাক। লোকটা এসব বকতে বকতে কিছুটা স্বাভাবিক আচরণ করছে। নয়তো এই চলন্ত গাড়ির মধ্যে...। সারাদিন কাজের পর স্নান করে বেরিয়েছে কিনা, তাই বা কে জানে?

ও বকে যাচ্ছিল। দুবার বিয়ে করেছে। একটা নিজের লেখা কবিতার বইও প্রকাশ করেছে। একটা নতুন কাগজ বের করেছে। যার বেশ কিছুটাই আমার জানা। আর আমি স্যালি, বন্ধুদের উসকানিতে একটু আরামে থাকার জন্য, একটা রোমাঞ্চকর উত্তেজনার স্বাদ পেতে, নিজেকে এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছি। এরপর হয়তো আমার প্রোজেক্টের কাজটা অনেক সহজ হবে। ইংরাজীতে একটা ভালো গ্রেড পাওয়া যাবে আর পরের দিনগুলোতে ওইরকম অসহনীয় খাবার খেতে হবে না। বলা তো যায় না, হয়তো আমাকে নিয়ে একটা কবিতাই লিখে ফেলল। আমার মনে পড়ছিল সেই পেইন্টার ছেলেটির কথা, যে আমার স্কেচ করে দিয়েছিল। কিম্বা সেই গায়ক, যে আমায় নিয়ে গান বেঁধেছিল। সেই গান, সেই ছবি আমার ঘরের ডেস্কের ড্রয়ারে সাজানো আছে। হয়তো লুকাসের কবিতাও...

ভাবতে ভাবতেই গাড়ি মোটেলের দরজায় পৌঁছে গেল। লুকাস ভিতরে গিয়ে চাবি নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এলো। পাছে ম্যানেজার ঘর অবধি এগিয়ে দিতে চায়! বৃষ্টির ভিতরেই আমরা হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলাম। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার আওয়াজ আর পাওয়া যাচ্ছে না।

ঘরে গিয়ে আমি বাথরুমে ঢুকলাম। স্নান করে চোখে কাজল দিলাম। ঠোঁটে লিপস্টিক। এরপর কি করতে হবে, সেটা আমার অভিজ্ঞতা বলে দেয় নি। বেরিয়ে এসে দেখি লুকাস সোফায় কোট খুলে হুইস্কি নিয়ে বসেছে। এই প্রথম ওকে স্যুট ছাড়া দেখলাম। থলথলে ভুঁড়িদার লোমশ প্রাণী একটা। পাশে বসে গলার মধ্যে খানিকটা তরল আগুন ঢাললাম। আশাকরি এটা আমায় কাজটা করতে সাহায্য করবে। ঠিকই ভেবেছিলাম। এরপর যখন ও আমায় কাপড় খুলতে বলল, তখন বা তার পরে আর অসুবিধে হলো না। শুধু সবশেষে আমার চোখ দিয়ে একটু জল গড়িয়ে পড়েছিল। সেটা দেখে সে রীতিমতো বিরক্ত এবং ভীত হয়ে উঠল। কোনরকমে যা মাথায় এল তাই বললাম – আসলে এটা আমার প্রথম...

থেমে গেলাম। ওর মুখে বিরক্তির ছায়া স্পষ্ট – আমি ভেবেছিলাম তুমি অভিজ্ঞ। আমায় সাহায্য করতে পারবে।

আমি তখন মরিয়া। এতদূর এসে আমি খালি হাতে ফিরতে চাই না। মোহিনী হাসিটা হাসার চেষ্টা করলাম। আরেকটু মদ চাই এখন। তারপর সব ঠিকঠাক চলল। দেখলাম, আমি বেশ ভালো শিক্ষার্থী।

সকালে ঘুম ভেঙে কোলাব্যাঙের মতো মানুষ দেখতে ভালো লাগছিল না। কিন্তু খিদে পেয়েছিল। আস্তে আস্তে ওর ঘুম ভাঙালাম – আমার খিদে পেয়েছে।

মোটেল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারে খেতে গেলাম। খেতে খেতে সমুদ্র থেকে ফেরা লোকজনের কথা শুনতে শুনতে খেয়ে নিলাম। বড্ডো খিদে পেয়েছিল। লুকাস খুব সামান্যই খেল। দোকান থেকে বেরিয়ে হজমের ওষুধও কিনল। তারপর আমাকে একটা পুরোনো দুর্গ দেখাতে নিয়ে চলল। ওর খুশিটা বুঝতে পারলাম, যখন আমাকে আর একটা নতুন সিগারের প্যাকেট কিনে দিল। কিন্তু বেলা বাড়তেই আবার ওর অসোয়াস্তি শুরু হলো। পাছে চেনা কারো মুখোমুখি পড়ে যায়!

প্রাসাদের রক্ষকটি বড়ো সন্দেহবাতিগ্রস্ত। সকালে তার বউ তখন সবকিছুর ধুলো ঝাড়ছে। সবকিছুই কেমন যেন গর্বিত, ধূসর এবং প্রাণহীন। যে কাপগুলো অত যত্ন করে মুছে রাখা হচ্ছে, তাতে একশো বছর কেউ ঠোঁট ছোঁয়ায় নি। আমরা হাসতে হাসতে কেয়ারটেকারের পাশ কাটিয়ে বেডরুমে এসে পৌঁছালাম। সেখানে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে, লুকাস একটা সিঙ্ক দেখতে পেয়ে কলটা খুলে কলের সঙ্গে নিজেও জলবিয়োগ করে ফেলল। আমরা আবার হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলাম। লুকাস গম্ভীরভাবে বলল – জীবনে সবারই একবার না একবার সিঙ্কে হিসু করা উচিত।

মনটা বেশ হালকা হয়ে এসেছিল। কিন্তু লুকাস বলল ও একটু ঘুমোতে চায়।

- ঘুম, এখন?
- আমার বয়েসটা খেয়াল রেখো। এখন একটু বিশ্রাম চাই আমার।

অগত্যা হোটেলে ফিরে এলাম। বুড়োটা ঘুমিয়ে পড়ল। আমার ঘুমন্ত মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। কিরকম যেন মরা মরা মনে হয়। আমি একটা সিগার ধরিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। নীচ দিয়ে মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে – এ ওর সাথে গল্প করতে করতে। হাতে সবজির ব্যাগ। ডর্মিটরির ঘরটার জন্য আমার খুব মন খারাপ করছিল। আমার বিছানার পাশে তাক ভর্তি বই। এখানে না এসে আমি তো এখন গ্রীক পড়তে পারতাম! আমি আর কখনো অন্ধকারে উত্তেজনার সন্ধানে বেরোবো না। জীবনকে সোজাসুজি মুখোমুখি দেখব।

কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম লুকাস উঠে পড়েছে। হাতড়ে চশমাটা চোখে দিয়ে আমার দিকে চেয়ে সে হাসল। তারপর উঠে পড়ে একটু আদর করল। কেমন যেন স্নেহ মেশানো। আমার ভালো লাগছিল।

বিকেলে বেরিয়ে মেয়ের জন্য খেলনা, আর বউয়ের জন্য একটা টুকটুকে লাল ড্রেস কিনল। আমাকে পছন্দ করতে ডাকছিল। আমি গেলাম না। বড্ডো হাসি পাচ্ছিল।

আস্তে আস্তে ড্রাইভ করছিল ও। বিকেলের আলো কমে আসছিল। সমুদ্রের তীর পেরিয়ে এসেছি। রাস্তার ধারে ঘাসের ওপারে কয়েকটা সবুজরঙা কাপড়ধোয়ার মেশিন। তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে ধোয়া তোয়ালেগুলো ভাঁজ করছিল। সাদা তোয়ালে, সাদা বাস্কেট। হঠাৎ লুকাস গাড়ি থামাল। ওর চোখটা চকচক করছে।

-মেয়েটাকে দেখছ?
-হুঁ। কাজ করছে।
-কি বিরাট চেহারা!
-মোটা ঠিকই, কিন্তু পরিশ্রমী।
-এরা সহজ সরল হয়। তুমি যাও ওর সঙ্গে কথা বলো।
-কেন?
-তুমি তো স্মার্ট মেয়ে। ওর সাথে আড্ডা জমাও। চায়ের নিমন্ত্রণ করো। সেখানে মদ খাওয়াও। তারপর হোটেলের 
বিছানায় তিনজনে একসাথে...
-ওই বস্তার মতো ভুঁড়িওয়ালা মেয়েটাকে?
-টাইটানের মতো চেহারা বলো। কি লম্বা-চওড়া দেখেছ? যাও তাড়াতাড়ি।

আমি তখনও হাসছিলাম

– দেখছ না, ওর চুলে কার্লার লাগানো আছে? সাজ শেষ না হলে মেয়েরা সেক্সের কথা ভাবে না।

লুকাস ক্রমশঃ উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল

– আমি কখনো কোঁকড়া চুলো মেয়ের সাথে শুইনি। শহরে তো সবারই স্ট্রেট চুল! বললাম না তিনজনে একসাথে?

আমি মনে মনে কুঁকড়ে গেলাম। ও কি সত্যিই চাইছে, আমি এই খেলায় অংশ নিই?

- ও আসবে কেন? একজন অপরিচিতের সঙ্গে একসাথে ড্রিংক করতে রাজিই বা হবে কোন দুঃখে?

ওর গলার স্বর এখন তীক্ষ্ণ। চোখে জ্বলজ্বল কর

-একটা মেয়ে আরেকটা মেয়েকে ভয় পায় না। একজন পুরুষকেও সে সন্দেহ করে না, যদি তার সঙ্গে একটি মেয়ে থাকে। যাও বলছি। ওকে ডেকে নিয়ে এসো।

আমার মনে পড়ল আগের দিন বিছানায় ও জানতে চাইছিল আমি কোনো মেয়ের সঙ্গে শুয়েছি কিনা। বারবার জোর করছিল, এরপর আমি যেন আমার ডর্মের পার্টনারের সঙ্গে...

তখন ভেবেছিলাম এটা ওর বোকা বোকা কৌতুক। আমিও হেসেছিলাম। বলেছিলাম – অবশ্যই।

এখন বুঝছি সেটা ঠাট্টা ছিল না। আমার অসম্ভব রাগ হচ্ছে। এ কোথায় ফাঁসিয়েছি নিজেকে? এটা স্মার্টনেস? না করতে পারাটা বোকামি? আমি এটা করতে চাই না। তাতে যা প্রমাণ হয় হোক। কিন্তু এখান থেকে ফেরাটা...

আমি মনস্থির করে মেয়েটির দিকে এগোলাম। লুকাস দেখেনি। আমি দেখেছি। আর একটি গাড়ি এসে ওপাশে দাঁড়িয়েছে। সেটার থেকে এক মহিলা নেমে মেয়েটির দিকেই যাচ্ছে। আমি গতি কমালাম। দুজনে মিলে প্যাকেটগুলো তুলে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল। ইয়েস! আই অ্যাম স্মার্ট! অচেনা লোককে ফাঁসানোর চেয়ে যাকে পছন্দ করিনা তাকে বুদ্ধু বানানোতে অনেক বেশি মজা। বোকার মতো মুখ করে ফিরলাম।

লুকাস হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ওর ঠোঁটগুলো মোটা কিন্তু মুখটা খুব ছোট। ভারি হাস্যকর দেখাচ্ছে। এরকম ঘটতে পারে, আশা করে নি। খানিকটা হতাশ গলায় বলল -

- চলো একটা বারে যাই।

রাগ, ঘেন্নারা পা থেকে মাথায় উঠছে। কোনো উত্তর না দিয়ে পিছনের সিটে হাত চালিয়ে সদ্য কেনা বোতলটা খুলে গলায় দিলাম। আমার ঠাণ্ডা লাগছিল।

- ওটা নিলে কেন? আমরা তো খেতেই যাচ্ছিলাম – লুকাস একটু যেন বিরক্ত।

- আমার খিদে নেই।

- রাতে খিদে পাবে না?

আমি আর এক ঢোঁক গলায় ঢাললাম। এতো ঘেন্না, মনে হচ্ছিল বমি হয়ে যাবে। পাটা হীটারের কাছে নিয়ে গরম করলাম। জানলার দিকে তাকিয়ে, অসম্ভব ঠাণ্ডা গলায় বললাম,

- আমার মনে হচ্ছে, আমার ফিরবার সময় হয়েছে।

লুকাসের হতভম্ব গলা দিয়ে শুধু বের হলো – এখনই স্কুলে ফিরতে চাও?

আরেক ঢোঁক গলায় ঢেলে, বোতলটার ক্যাপটা লাগাতে লাগাতে বললাম – অবশ্যই।

ওর দিকে তাকাতে আর ইচ্ছে করছে না। তবুও ওর আশাহত মুখটা অনুভব করতে পারছি। একটা বিকৃত গলায় হাসল লুকাস – দম শেষ? ভয় পেয়েছ?

একথায় উত্তেজিত হতে পারত যে কিশোরী, সে এই দুদিনে বড়ো হয়ে গেছে! আমি সিটটা পিছনে হেলিয়ে, ওর দিকে একবারও না তাকিয়ে, সিগারে একটা লম্বা টান দিলাম। আমার অতি শান্ত নিরুত্তাপ ব্যবহারে আর কথা এগোতে ভরসা পেল না বুড়ো ভামটা। পাবে না জানতাম। শুধু আর একটু আগে যদি জানতাম!

ও এবার ভয় পেয়েছে। সবটুকু ভয়, রাগ দিয়ে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিল। গাড়িটা রাস্তায় উঠেছে। আবার অন্ধকার চিরে ছুটছে। আমি এখন আমার ঘরে যাচ্ছি। আমার ছোট্ট ঘর, একলার বিছানা, আমার নিশ্চিন্ত ঘুম আমায় ডাকছে। সিগারের শেষ টুকরোটা জানলা নামিয়ে বাইরে ফেলে দিলাম।

আমার ঘুম ভাঙল লুকাসের ঝাঁকুনিতে – স্যালি, আমরা স্কুলে এসে গেছি।

আড়মোড়া ভেঙে আমার মোটা পার্সটা হাতে নিলাম। লুকাস আমার হাত ধরল – স্যালি আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারি তো? আমার মনে হয় আমরা পারি।

লুকাসের গলায় এখন রাগের জায়গায় ভয়। আমার রাগ চড়ছিল – আমরা কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নই, বুঝলে? আর কথা বলে চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়াবার মানে হয় না। এরপর আর কোনোদিন আমার সাথে কথা বলার চেষ্টাও করো না।

বৃষ্টির ভিতর দিয়েই আমি আমার চেনা বাড়িতে, চেনা ঘরে ঢুকলাম। আমার আর ঠাণ্ডা লাগছে না। জানলার কাঁচের গায়ে আমার সিলুয়েট, বইয়ের তাকের প্রতিবিম্ব, আমার পড়ার টেবিল আমাকে দুহাত বাড়িয়ে সাদরে গ্রহণ করল। আমি ফিসফিস করে বললাম – আর কখনো এই ঘর ছেড়ে বে-ঘরে যাবো না।

জানলার প্রতিবিম্বকে বললাম – স্যালি, আজ তোমার শরীরে, মনে কোনো অনাহত জায়গা নেই। তবে ভয় পেও না, কদিন বাদে এসব ঠিক সেরে যাবে। তখন, তখন তুমি আজকের বোকামিটা নিয়ে মজা করতে পারবে। কিংবা গুমোরও দেখাতে পারো।
-------------


মূল গল্প: THE RESIDENT POET by Katherine Dunn

লেখক পরিচিতি:
ক্যাথরিন ডান – জনপ্রিয় আমেরিকান কথাসাহিত্যিক। জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৪৫, মৃত্যু ১১ মে, ২০১৬। ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিতি ছাড়াও তাঁর পরিচয়ের মধ্যে বাচিক শিল্পী, কবি, সাংবাদিক, সমালোচক ইত্যাদি কথাগুলোও জুড়ে দেওয়া যায়। বক্সিংয়ের ওপর তাঁর লেখাগুলি অত্যন্ত মনোগ্রাহী। Geek Love তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। রেসিডেন্ট পোয়েট তাঁর জীবনকালে অপ্রকাশিত লেখা। দি নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনে সম্প্রতি প্রকাশিত।


অনুবাদক পরিচিতি
দোলা সেন
গল্পকার। অনুবাদক।
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।
                                                                             



২টি মন্তব্য: