মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

রে ব্রাডবেরী'র গল্প : বিপন্ন বিস্ময়



অনুবাদ : বিপ্লব বিশ্বাস

ডাঙা থেকে অনেক দূরে, ঠান্ডা জলের মাঝে রোজ রাতে আমরা কুয়াশার অপেক্ষায় থাকতাম ; এবং সে এল আর আমরা পেতলের সব যন্ত্রপাতি তেলচুকচুকে করে পাথরের টাওয়ারের ওপর ফগ - আলো জ্বাললাম। ধূসর আকাশে আমরা দুটি পাখি, ম্যাকডান আর আমি, সেই আলো ছুঁড়ে দিলাম, লাল, শাদা আবার লাল, নিঃসঙ্গ জাহাজগুলোর ওপর নজর রাখার জন্য। আর তারা দেখতে না পেলে আমরা আমাদের সব সময়ের কণ্ঠ ছাড়লাম, ফগ হর্নের জোর চিৎকার, কুয়াশা চাদর কাঁপিয়ে, শঙ্খচিলেদের চমকে দিয়ে, যারা সাজানো তাস ছড়ানোর মতো ছড়িয়ে পড়ল আর ঢেউসব যেন ফেনা ছড়িয়ে উঁচুতে উঠে গেল।

" এ এক নিঃসঙ্গ জীবন কিন্তু তুমি এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছ, তাই না? ", ম্যাকডান জানতে চাইল।

"হ্যাঁ ", আমি বললাম, " ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তুমি ভালোই বকতে পারো। "

" ঠিক আছে, আগামীকাল ডাঙায় নেমে তোমার পালা, " সে হেসে বলল, " জিন পান করে মেয়েদের নাচাতে হবে। "

" তোমাকে যখন এখানে একা রেখে যাই তোমার কেমন লাগে ম্যাকডান? "

" সমুদ্রের রহস্যময়তা নিয়ে "। ম্যাকডান তামাক খাওয়ার পাইপ ধরাল। নভেম্বরের শীত- সন্ধ্যার ঘড়িতে সোওয়া সাতটা, বেশ চাপে আছি, দুশো মাইল অব্দি ফগ - আলো তার লেজ মুচড়ে চলেছে, টাওয়ার থেকে ফগ হর্ন গলা ছেড়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ ছাড়ছে। তীর থেকে শ'মাইলের মধ্যে কোনও শহর নেই, শুধু একটা রাস্তা যা সেই শুনশান মৃত দেশটার মাঝ দিয়ে এসে সমুদ্রের মুখে থেমেছে, সেই রাস্তায় কিছু গাড়ি, আমাদের পাথর - ঢিবি অব্দি মাইলদুয়েকের ঠান্ডা জলের বিস্তার আর জাহাজ ওই এক দুটো।

সব সমুদ্রের রহস্য ", চিন্তিত ম্যাকডান বলল। " তুমি কি জানো, এই মহাসাগর সর্ববৃহৎ, সর্বকালের তুষারকণা দিয়ে তৈরি আশ্চর্য নরম ফলক? হাজারো রং আর আকারে তা ফুলে উঠছে আর গড়াচ্ছে, এর কোনও দুটি ঢেই এক রকম নয়। অদ্ভুত! বেশ ক'বছর আগে এক রাতে এখানে আমি একা যখন সমুদ্রের যাবতীয় মাছ উপরিভাগে উঠে এসেছে।একটা কিছু তাদের সাঁতরে উপসাগরে এসে পড়তে বাধ্য করেছে, তারা যেন কাঁপছে, টাওয়ারের আলোর দিকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাচ্ছে আর সেই লাল-শাদা-লাল আলোর পরতে পরতে তাদের মজার চোখসব দেখতে পাচ্ছি। আমার তো হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। ওরা দেখতে ময়ূরের লম্বা লেজের মতো, মাঝরাত অব্দি সেখানেই তারা ঘোরাফেরা করতে লাগল। তারপর প্রায় নিঃশব্দেই তারা পিছলে চলে গেল, লক্ষ লক্ষ মাছসব কোথায় চলে গেল। আমার মাথায় এল, কোনওভাবে তারা এই এত এত মাইল পেরিয়ে এসেছে, পুজো করার জন্য, অদ্ভুত, কিন্তু ভাবো কীভাবে ওই টাওয়ারটা জলের ওপর সত্তর ফুট খাড়া দাঁড়িয়ে ওদের দেখছিল আর তার দেহটা থেকে ঈশ্বর - আলো ঝলসে বেরুচ্ছিল আর দানবীয় গলায় সে নিজেকে জাহির করছিল। তারা আর ফিরে আসেনি, ওই মাছগুলো, কিন্তু তোমার কি এক মুহূর্তের জন্যও মনে হচ্ছে না যে তারা ভেবেছিল, তারা তাঁর সম্মুখে ছিল? "

আমি কেঁপে উঠলাম। বাইরে চোখ ফেলে সমুদ্রের লম্বা ধূসর উন্মুক্ত জায়গাটা দেখতে লাগলাম, কেমন চলে গেছে, হয়তো কোনও কিছুর দিকে নয়, নয় কোথাও। " ও, সমুদ্র পরিপূর্ণ ", ম্যাকডান পিটপিট করে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা ভঙ্গিতে পাইপ টানতে লাগল। সারাটা দিন সে নার্ভাস ছিল কিন্তু কেন তা বলেনি। "

আমাদের যাবতীয় সামুদ্রিক এঞ্জিন আর তথাকথিত সাবমেরিনের ক্ষেত্রে শীর্ণ মাটির মূল তলদেশে পা রাখার দশ হাজার শতাব্দী আগে সেখানকার রূপকথার রাজ্যে প্রকৃত সন্ত্রাস জানা গিয়েছিল। একবার ভাবো, খ্রীস্টের জন্মের তিন লক্ষ বছর আগে সেখানে থাকা বস্তুটি এখনও সেখানে আছে। আমরা যখন তুরী- ভেরী বাজিয়ে সদর্পে প্যারেড করে একে অপরের দেশ ও মাথা ছেঁটে - কেটে ফেলছি, ওরা তখন সমুদ্রের বারো মাইল গভীরে বাস করছিল, দারুণ ঠান্ডার সেই সময়ে ধূমকেতুর দাড়ির মতোই প্রাচীন, সময়ের হিসাবহীন।

" হ্যাঁ, এ এক প্রাচীন জগৎ। "

" এস। তোমাকে শোনানোর জন্য বিশেষ কিছু জমিয়ে রেখেছি। "

সময় নিয়ে কথা চালাতে চালাতে আমরা আশিটা ধাপ মাড়িয়ে উঠলাম। একদম মাথায় উঠে ম্যাকডান ঘরের আলো নিভিয়ে দিল যাতে চারদিকের পুরু কাচে তার কোনও প্রতিবিম্ব না পড়ে। আলো নিঃসরণের বড় চোখটা যা গুনগুন করছিল তা সহজেই তৈলাক্ত কোটরে ঢুকে গেল। ফগ - হর্নটা জোর বাজছিল, পনেরো সেকেন্ড অন্তর অন্তর।

" জন্তুর মতো শব্দ করছে, তাই না? " ম্যাকডান ঘাড় নেড়ে নিজেকেই শোনাল। " এক বিশাল নিঃসঙ্গ জন্তু রাতের অন্ধকারে কেঁঁদে চলেছে। দশ মিলিয়ন বছরের কিনারে বসে গভীর সমুদ্রের দিকে ডাক ছেড়ে চলেছে। আমি এখানে, এখানে, এখানে। আর গভীর জলরাশি উত্তর দিয়ে চলেছে, হ্যাঁ, তারা উত্তর দিচ্ছে। জনি, এখানে তুমি মাসতিনেক আছ, তোমার তৈরি থাকাই ভালো। বছরের এই সময়টায়", ঝাপসা কুয়াশা পরখ করে সে বলল, " কিছু একটা এই বাতিঘর দেখতে আসে। "

" তুমি যে মাছের ঝাঁকের কথা বলছিলে, তারা? "

" না, এটা অন্য কেউ। তোমাকে তা বলিনি কেননা তাহলে আমাকে খেপাটে ভাবতে পারো। কিন্তু আজকের রাতটাই সাম্প্রতিকতম যার কথা মুলতুবি রেখেছিলাম কেননা গত বছরের ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখা যদি ঠিক হয়, এই সেই রাত যে রাতে সে আসে। আমি বিস্তারে যাব না, তুমি নিজের চোখেই তা দেখবে। ওইখানে বসো। যদি মনে করো, আগামীকাল তোমার পুরু পশমের ঘন্টিলাগানো কোটটা আর মোটরবোট নিয়ে ডাঙায় যেতে পারো ; সেখানে অন্তরীপে ডিঙি রাখার স্তম্ভে তোমার যে গাড়ি রাখা আছে সেটা নিয়ে ভিতরে কোনও শহরে গিয়ে রাত পুড়িয়ে আলো জ্বেলে রাখতে পারো। আমি কোনও প্রশ্ন করব না, তোমাকে দোষও দেব না। আজ থেকে তিন বছর আগে এই ঘটনা প্রথম ঘটে আর এবারেই প্রথম তা পরীক্ষা করার জন্য আমার সঙ্গে কেউ আছে। অপেক্ষা করো আর দেখে যাও। "

নিজেদের মধ্যে এক দুটি ফিসফাস কথায় আধ ঘন্টা কেটে গেল। অপেক্ষা করতে করতে যখন হাঁফিয়ে উঠেছি ম্যাকডান তার কিছু ধ্যানধারণার কথা আমাকে বলতে লাগল। ফগ- হর্ন বিষয়ে তার নিজস্ব কিছু তত্ত্বকথা ছিল।

" বহু বছর আগের কথা, একদিন একটা লোক সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে জলের গর্জন শুনে থেমে গেল, ঠান্ডা রোদহীন সমুদ্রতীর, আর বলল,"' সমুদ্রের জলরাশি বরাবর এক ডাকছাড়া কণ্ঠস্বর দরকার, জাহাজগুলোকে সতর্ক করার জন্য ; আমি তেমনই এক যন্ত্র বানাব। এক স্বর তৈরি করব যা সারা রাত কারও পাশের খালি বিছানার মতো, আবার খালি বাড়ির মতো যখন কেউ তার দরজা খোলে, আবার শরৎকালের পাতাঝরা গাছের মতো। দক্ষিণমুখী উড়ে যাওয়া পাখির পাখা ঝাপটানো শব্দের মতো যেন কাঁদছে আর নভেম্বর বাতাসের শব্দের মতো এবং কঠিন শীতল তটে আছড়ে পড়া সমুদ্রের মতো। আমি এমন এক শব্দের সৃষ্টি করব যা এতটাই নিঃসঙ্গ যে কেউ তার আওয়াজ এড়াতে পারবে না, যাদের কানে যাবে তাদের আত্মায় তা কেঁদে উঠবে আবার তাদেরও যারা দূরের শহর থেকে তা শুনতে পাবে। আমি নিজেই এই শব্দযন্ত্র বানাব এবং তাকে সবাই ফগ - হর্ন বলে ডাকবে ও যারা তার ডাক শুনবে তারা চিরন্তনের বেদনা আর জীবনের সংক্ষিপ্ততা সম্পর্কে জানবে। ""

ফগ-হর্ন বেজে উঠল।

" এই গল্প আমি ফেঁদেছি ", শান্তভাবে বলল ম্যাকডান, " এটা বোঝাতে কেন সে প্রত্যেক বছর বাতিঘরের কাছে ফিরে আসে। ফগ-হর্ন ডাকছে, মনে হয় সে আসছে... "

" কিন্তু -", আমি বলতে গেলাম।

" স্ স্ স্ স্! ম্যাকডান থামতে ইশারা করল, " ওই! " গভীর সমুদ্রের দিকে খেয়াল করতে বলল সে।
কিছু একটা বাতিঘর টাওয়ারের দিকে সাঁতরে আসছিল।

রাতের কনকনে ঠান্ডা, যেমনটা বলেছিলাম ; উঁচু টাওয়ারটাও খুব ঠান্ডা, আলো জ্বলছে, নিভছে আর ফগ - হর্ন পাক খাওয়া কুয়াশার মাঝ দিয়ে একটানা ডেকেই চলেছে। দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে না, সমতলে দৃষ্টি যাচ্ছে না কিন্তু গভীর সমুদ্র নিজস্ব ঢঙে সমতলীয়, শান্ত রাতের পৃথিবী কাঁপিয়ে তোলপাড় করে চলেছে, ধূসর কাদার রং ছড়াচ্ছে আর এখানে আমরা দুজন শুনশান উঁচু স্তম্ভে বসে আছি, আর ওই দূরে প্রথমে একটা ছোট্ট ঢেউ, তারপর বড় ঢেউ উঠছে, একটা ভুড়ভুড়ি, কিছুটা ফেনা / আর তারপর শীতল সমুদ্রের উপরিভাগে দেখা দিল একটা মাথা, এক বিশাল মাথা, কালো কুচকুচে, বিশাল দুটো চোখ, আর তারপর গলা আর তারপর শরীর নয়, অনেক গলা আর অনেক! জলের ওপর গজানো মাথাটা চল্লিশ ফুট মতো, সরু সুন্দর গলার ওপর বসে আছে। একমাত্র তখনই কালো প্রবাল, খোল আর বাগদা চিংড়ি অধ্যুষিত ছোট্ট দ্বীপের মতো পুরো দেহটা ভূগর্ভ থেকে গা- ময় জল ঝাড়া দিয়ে উঠল। লেজের ঝাপটানিও দেখা গেল। সব মিলিয়ে মাথা থেকে লেজের প্রান্তভাগ অব্দি হিসেব কষে দেখলাম সেই দানোটা নব্বই থেকে একশো ফুটের মতো।

জানি না কী বলেছিলাম। কিছু একটা তো বলেইছিলাম।

" শক্ত হও, হে বালক, শক্ত হও ", ফিসফিস করে ম্যাকডান বলল।

" অসম্ভব! এ অস্বাভাবিক! ", আমি বললাম।

" না, জনি, আমরাই অসম্ভব। দশ মিলিয়ন বছর আগে এ যেমন ছিল, তেমনই আছে। এতটুকু বদলায়নি। শুধু আমরাই পালটে গেছি, আর আমাদের এই পৃথিবীটা, অসম্ভব হয়ে পড়েছি, এই আমরা। "

দূর থেকে বরফাকীর্ণ জল মাড়িয়ে রাজোচিত ঢঙে ধীরলয়ে সাঁতরে আসছিল সে। কুয়াশা দেখা দিচ্ছিল আবার মিলিয়েও যাচ্ছিল, ক্ষণিকের জন্য তার আকারটিকে মুছে দিয়ে। তার দৈত্যাকার চোখের একটি আমাদের উঁচুতে থাকা চাকতির মতো লাল - শাদা - লাল - শাদায় জ্বলতে আর আদিম ভাষায় নির্দেশ পাঠাতে থাকা বিশাল আলোর পথে আটকে গেল আর উলটে আলো ফেরাল যেন। নিশ্চুপ কুয়াশা ফুঁড়ে সাঁতরে আসা সেও সেই কুয়াশার মতোই নীরব।

" এটা তো এক জাতীয় ডাইনোসর মনে হয়! " সিঁড়ির পাতি ধরে ভয়ে জবুথবু মেরে বসে গেলাম আমি।
" হ্যাঁ, সেই প্রজাতিরই কেউ। "

" কিন্তু তারা তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে! "

" না, শুধু গভীর থেকে গভীরে, তল থেকে অতলে গিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে। এখন এটাই তো বিশেষ শব্দ, নয় কি জনি, প্রকৃত শব্দ, কতবার তা উচ্চারিত হচ্ছে : গভীর থেকে গভীরতর। সেখানে যেন সকল শীতলতা, অন্ধকার আর গভীরতা... এ সব যা কিছু এ জগতে তা ওই একটি শব্দেই নিহিত। "

" আমরা কী করব? "

" করব? আমরা কাজ পেয়েছি, আমরা তা ছেড়ে যেতে পারি না। তা ছাড়া পাড়ে যেতে চেষ্টা করে যাওয়া যে কোনও নৌকার চাইতে এখানে আমরা অনেক নিরাপদ। ওই বস্তুটা ডেস্ট্রয়ার নামক রণপোতের মতোই বিশাল আর দ্রুতগতিসম্পন্ন। "

" কিন্তু এখানে, সে এখানে আসছে কেন? "

পরক্ষণেই উত্তর মিলে গেল।

ফগ - হর্ন বেজে উঠল।

আর ওই দানোটা প্রত্যুত্তর দিল।

লক্ষ লক্ষ বছরের জল ও কুয়াশা পেরিয়ে একটা চিৎকার ভেসে এল। এক নিঃসঙ্গ, নিদারুণ, যন্ত্রণাদীর্ণ চিৎকার এবং তা আমার সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে দিল। ওই টাওয়ারের উদ্দেশে সে চিৎকার ছুঁড়ে দিল। ফগ - হর্ন বেজে উঠল। দানোটা আবার গর্জে উঠল। আবার ফগ - হর্ন বাজল। দৈত্যটা তার দাঁতালো চোয়াল ফাঁক করল। সেখান থেকে যে শব্দ বেরোচ্ছিল তা যেন ফগ - হর্নেরই আওয়াজ। নিঃসঙ্গ, বিশাল আর বহু দূরে। বিচ্ছিন্নতার আওয়াজ, এক অদৃশ্য সমুদ্র, এক শীতল রাত্রি আর বিচ্ছেদ। ওটাই সেই আওয়াজ।

" এখন", ম্যাকডান ফিসফিস করে বলল, " ও কেন এখানে আসছে, জানো কি? "

আমি না-বাচক মাথা নাড়লাম।

" দীর্ঘকাল যাবৎ, জনি,বেচারা দানো হাজার হাজার মাইল দূরে সম্ভবত সমুদ্রের কুড়ি মাইল গভীরে শুয়ে আছে, সুযোগের অপেক্ষায় আছে হয়তো কয়েক লক্ষ বছরের প্রাচীন এই নিঃসঙ্গ প্রাণীটি। ওর কথা ভাবো, লক্ষ লক্ষ বছর অপেক্ষারত ; তুমি পারবে অতকাল অপেক্ষা করতে? হয়তো এই প্রজাতির এটাই শেষ প্রতিভূ। মনে হয় এটাই ঠিক। যাই হোক, এখানে স্থলভাগ থেকে মানুষ এসে এই টাওয়ার বানালো, বছর পাঁচেক আগে। ফগ - হর্ন তৈরি করল আর তা থেকে বারংবার আওয়াজ ছাড়তে লাগল সেই জায়গায় যেখানে তুমি নিজেকে ঘুমের জগতে পুঁতে রেখেছ, সেই জগতের সমুদ্র - স্মৃতিতে গুঁজে রেখেছ যেখানে তোমার মতো হাজার হাজার আরও ছিল, কিন্তু এখন তুমি একা, সম্পূর্ণ একা সেই পৃথিবীতে যা তোমার জন্য গড়ে ওঠেনি, যেখানে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হও তুমি।

" কিন্তু ফগ-হর্নের আওয়াজ আসছে যাচ্ছে, আসছে যাচ্ছে আর তুমি তলদেশের কাদাটে গভীরতা ফুঁড়ে মুচড়ে উঠছ, তোমার খোলা চোখদুটি ক্যামেরার দু ফুট লেন্সের মতো, তুমি নড়ছ - চড়ছ আস্তে আস্তে কেননা তোমার কাঁধের ওপর মহাসাগরের ভার। কিন্তু হাজার হাজার মাইলের জলস্তর দীর্ণ করে ফগ- হর্নের আওয়াজ আসছে, মৃদু এবং পরিচিত আর তোমার পেটের অগ্নিকুণ্ড ইন্ধন যোগাচ্ছে আর তুমি আস্তে আস্তে উঠতে চেষ্টা করছ। জেলিমাছ - ভরা নদীর মিষ্টি জলে তুমি ছোটো ছোটো মাছ খাও আর শরতের মাসগুলিতে আস্তে আস্তে উঠে আস, কুয়াশা শুরুর সেপ্টেম্বর জুড়ে, অক্টোবরের অধিক কুয়াশার মাঝ দিয়ে, আর ফগ -হর্ন তোমাকে ডেকেই চলে আর তারপর নভেম্বরে দিনের পর দিন নিজে চাপ সহ্য করে প্রতি ঘন্টায় কয়েক ফুট ওপরে উঠে তুমি উপরিভাগের কাছাকাছি এসে যাও এবং তখনও বেঁচে থাকো। তোমাকে ধীরগতিতেই চলতে হয় ; দুম করে উপরিভাগে উঠে এলে তোমার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই তিনমাস ধরে তুমি এই ওঠার কাজটি করো আর তারপর বেশ কিছুদিন ধরে ঠান্ডা জলে সাঁতরে এই বাতিঘরের কাছে আস। আর ওইখানে তুমি দেখা দিয়েছ, এই রাতে, জনি... তুমি সৃষ্টির সেই বৃহত্তম ভয়ানক দৈত্য। আর এখানে বাতিঘর তোমাকে ডাকছে, লম্বা গলা বাড়িয়ে ঠিক তোমার গলারই মতো যা জলস্তরের বাইরে উঁচুতে লম্বা ছড়িয়ে আছে আর তার দেহটাও তোমারই দেহের মতো আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কণ্ঠস্বরটিও তোমাদের এক। এখন বুঝতে পারছ, জনি, বুঝতে পারছ? "

ফগ- হর্ন আবার বেজে উঠল।
ওই দানোটা প্রত্যুত্তর দিল।

আমি সব দেখলাম, সব জানলাম, লক্ষ লক্ষ বছর নিঃসঙ্গ অপেক্ষার পর, কেউ ফিরে আসবে বলে তার জন্য, যে কখনওই ফিরে আসে না। সমুদ্রের তলদেশে লক্ষ লক্ষ বছরের বিচ্ছেদ, সেখানে সময়ের পাগলামি, যখন আকাশে আর সরীসৃপ - পাখির দেখা মেলে না, মহাদেশীয় ভূমিতে জলা জায়গা সব শুকিয়ে গেছে, অলস খড়্গ- দন্তীদের দিন ফুরিয়েছে, তারা আলকাতরার গর্তে তলিয়ে গেছে আর বেবাক মানুষের দল পাহাড়ের ওপর শাদা পিঁপড়েদের ঢঙে ছুটছে।

ফগ - হর্ন বেজে উঠল।

" গত বছর", ম্যাকডান বলল, " এই বিশাল প্রাণীটি সারারাত ঘুরে ঘুরে ঘুরে সাঁতরেছিল। যদি বলি, হতবুদ্ধি হয়ে কাছে আসছিল না। হয়তো ভয়ও পেয়েছিল। আবার সারাটা পথ আসার পর খানিক রেগেও ছিল। পরদিন অকস্মাৎ, কুয়াশা - চাদর সরে গেল, ঝরঝরে সূর্য উঠল, আকাশ আঁকা ছবির মতো নীল। আর দানোটি এই উত্তাপ, এই নীরবতা থেকে সাঁতরে দূরে গেল, আর ফিরে এল না। মনে হয়, সে এই এক বছর ধরে গভীরভাবে ভেবেছে, নানাভাবে। "

ওই দানো এখন মাত্র একশো গজ দূরে। ফগ-হর্ন আর সে উভয়ে উভয়কে জোর আওয়াজ দিচ্ছে। আলোর আঘাত পেলে দানোর চোখ দুটি কখনও আগুন, কখনও বরফ, আগুন আর বরফ।

" সেটাই তোমার জন্য জীবন ", ম্যাকডান বলল, " কোনও একজন কারও জন্য সব সময় অপেক্ষায় যে কখনও ঘরে ফিরে আসে না। সর্বদা কেউ কিছু ভালোবাসছে, ওই বস্তুর চাইতেও বেশি। আর কিছুক্ষণ পর তুমি ওই বস্তু যাই হোক না কেন, তাকে ধ্বংস করতে চাও যাতে করে সে তোমাকে আর আঘাত করতে না পারে। "

দৈত্যটা বাতিঘরের দিকে ছুটে আসছিল।
ফগ-হর্ন বেজে উঠল।

" দেখা যাক, কী হচ্ছে ", ম্যাকডান বলল।

সে ফগ -হর্ন বন্ধ করে দিল।

পরবর্তী নীরবতার ক্ষণটি এতটাই গভীর যে আমরা আমাদের হার্ট- বিট শুনতে পাচ্ছিলাম, তা যেন এই স্তম্ভের কাচঘেরা এলাকায় পেটাচ্ছিল, আর শুনতে পাচ্ছিলাম ধীরে চলা আলোর তৈলাক্ত ঘূর্ণন - শব্দ। দৈত্যটা থামল আর বরফের মতো জমে গেল যেন। তার বিশাল লন্ঠনের মতো চোখদুটো পিটপিট করছিল। মুখজুড়ে বিশাল হাঁ। আগ্নেয়গিরির মতো গুড়গুড় শব্দ ছাড়ছিল। মাথাটা এদিক ওদিক মোচড়াচ্ছিল যেন কুয়াশার মাঝে মিইয়ে আসা শব্দটা খুঁজে পেতে চাইছিল। বাতিঘরের দিকে উঁকিও মারছিল। আবার গুড়গুড় শব্দ তুলল। তার চোখ ফুঁড়ে আগুন ঝরতে লাগল। তারপর সে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল, জলে জোর ঝাপটা মারল আর টাওয়ারের দিকে তেড়ে এল। চোখদুটো রাগ - যন্ত্রণায় ভরা।

" ম্যাকডান! ", আমি চিৎকার করে বললাম, " হর্ন চালিয়ে দাও।"

ম্যাকডান সুইচে হাত দিয়ে ইতস্তত করতে লাগল। এমনকি তা চালিয়ে দেবার পরেও দৈত্যটা আরও খাড়িয়ে উঠছিল। আমি একঝলক ওর বিশাল থাবা দেখতে পেলাম, আঙুল আকারের চেহারার মাঝে মাছের আঁশের মতো খণ্ড খণ্ড অংশে তা চকচক করছিল, যখন স্তম্ভের গায়ে তা আঁচড়াচ্ছিল। তার যন্ত্রণাকাতর মাথার ডানদিকের বিরাট চোখটা আমার সামনে একটা চকচকে কড়াইয়ের মতো যার মধ্যে আমি চিৎকার দিয়ে পড়ে যাব, মনে হল। টাওয়ার কেঁপে উঠল। ফগ - হর্ন চিৎকার করে উঠল। দৈত্যটাও। টাওয়ারকে আঁকড়ে ধরে কাচের আস্তরণে কড়মড়িয়ে দাঁত ফোটাতে লাগল যা আমাদের ওপর হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল।

ম্যাকডান আমার হাত চেপে ধরল। " নিচে! "

বিশাল টাওয়ারটি দুলতে লাগল, কাঁপতে লাগল, হার মানতে শুরু করল। ফগ- হর্ন আর দানোটা উভয়েই ডাক ছাড়তে লাগল জোর। আমরা হোঁচট খেয়ে সিঁড়িতে অর্ধেক ঝুলতে লাগলাম। " তাড়াতাড়ি! "

টাওয়ার কুঁকড়ে গিয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসতেই আমরা একদম নিচে পৌঁছুলাম। সিঁড়ির নিচে পাথরের ছোট্ট ভাঁড়ার ঘরটায় কোনওমতে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। পাথরের টুকরোগুলো গড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার আঘাতের শব্দ ভেসে আসতে লাগল ; ঝটিতি ফগ-হর্ন থেমে গেল। দানোটা টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ল। টাওয়ার ভেঙে পড়ল, আমরা হাঁটু গেড়ে বসলাম, দুজনে দুজনকে চেপে ধরে, যখন আমাদের জগৎটা বিস্ফোরিত হল।

এক সময় সব শেষ হল, চারদিকে তখন ঘনঘোর অন্ধকার আর পাড়ের পাথর ধুয়ে চলা সাগর - জলের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
ওটা আর অন্য এক শব্দ।
" শোনো ", শান্তস্বরে ম্যাকডান বলল, " শোনো। "

আমরা এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর আমি শুনতে লাগলাম। প্রথমে বায়ুশূন্য স্থানে হাওয়া টানার জোর শব্দ, তারপর বিলাপ, হতবাক বিলাপ, বিশাল দানোটার চরম নিঃসঙ্গতা, আমাদের ওপর পড়ে আমাদের ঢেকে দিল যাতে তার দেহের এক অসুস্থ বোটকা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে গেল, আমাদের এই ছোট্ট ভাঁড়ার ঘরের এক পাথরাকৃতি স্তরের ব্যবধানে। দানোটা খুব হাঁফাচ্ছিল আর চিৎকার দিচ্ছিল। টাওয়ার ভেঙে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ বছর পেরিয়ে যে একে ডেকে চলেছিল তা শেষ হয়ে গেছে। আর ওই দৈত্য হাঁ করে জোর আওয়াজ ছাড়ছে। ফগ- হর্নের আওয়াজ, বারবার। আর দূরে জাহাজগুলো, আলো দেখতে না পেয়ে, কিছুই দেখতে না পেয়ে ওই গভীর রাতে চলাচলের সময় অবশ্যই ভেবেছে : ওইতো, ওই নিঃসঙ্গ শব্দ, একাকী নির্জন অন্তরীপের হর্ন। সব ঠিক আছে। আমরা অন্তরীপ চক্কর মেরেছি।

আর এভাবেই বাকি রাতটা চলল।

পরদিন বিকেলে উদ্ধারকারী দল যখন সিঁড়ির নিচের পাথরের গর্ভ- গৃহ থেকে আমাদের খুঁড়ে বের করতে এল, তখন সূর্যটা হলদেটে উত্তাপ ছাড়ছিল। 
 " এটা দুভাগে ভেঙে পড়েছে, ব্যস এটাই ", গম্ভীরমুখে ম্যাকডান বলল। আমার হাতে চিমটি কেটে বলল, " সমুদ্রের কিছু ভয়ংকর ঢেউ এল আর এই বাতিঘর ভেঙে পড়ল। "

দেখার মতো আর কিছুই ছিল না সেখানে। মহাসমুদ্র শান্ত, আকাশ নীল। শুধু ভেঙে পড়া টাওয়ারের পাথরে আর সমুদ্রতীরের পাথরের ঢিবিতে যে সবুজ আস্তরণ তা থেকে শ্যাওলার উৎকট গন্ধ ভেসে আসছিল। মাছিরা ভনভন করছিল। তটে ফাঁকা ধুয়ে চলা সাগরের ঢেউ।

পরের বছর একটা নতুন বাতিঘর তৈরি হল কিন্তু ততদিনে ছোট্ট শহরে আমি একটা কাজ পেয়েছি আর একটি বউ আর একটি ছোট্ট সুন্দর উষ্ণ ঘর যা শরতের রাতে হলদে আলোয় ভরে ওঠে, দরজা বন্ধ, চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরোয়।

নতুন বাতিঘরের দায়িত্ব নিয়েছে ম্যাকডান তার নিজের হিসাব অনুযায়ী বিশেষ মানসম্পন্ন ইস্পাতের শক্ত আবরণ দিয়ে যা বানানো। " যদি আবার ", সে বলল।

নতুন বাতিঘর নভেম্বরেই তৈরি হয়ে গেল। একদিন সন্ধ্যা খানিক গড়ালে একা গাড়ি নিয়ে গেলাম ; গাড়ি পার্ক করে ধূসর জলের শরীর বেয়ে তাকালাম, নতুন হর্নের আওয়াজ শুনলাম, একবার, দুবার, তিনবার, মিনিটে চারবার... দূরে নিজে নিজেই বেজে চলেছে।

দানোটা?
সে আর ফিরে আসেনি।

" ও চলে গেছে ", ম্যাকডান বলল। " আবার সেই অতল গহ্বরে ফিরে গেছে। ও শিখিয়ে দিয়ে গেছে কোনও বস্তুকেই এই পৃথিবীতে আমরা খুব বেশি ভালোবাসতে পারি না। তল থেকে অতলে পৌঁছে আবার সে লক্ষ লক্ষ বছর প্রতীক্ষায় থাকবে। আঃ, বেচারা! সেখানেই তার অপেক্ষা, সেখানেই যখন মানুষ আসবে যাবে, এই ছোট্ট ঘৃণ্য গ্রহে। অপেক্ষা আর অপেক্ষা।

আমার গাড়িতে বসে শুনছিলাম। ওই নিঃসঙ্গ উপসাগরে কোনও বাতিঘর বা আলোর নিশানা দেখতে পেলাম না। শুধুই শুনতে পেলাম সেই হর্নের আওয়াজ, হর্ন, হর্ন আর হর্ন। মনে হল ওই দানোটিই যেন ডেকে চলেছে।

এই মনোবাঞ্ছা নিয়ে বসে থাকলাম যে সেখানে কিছু আছে যার সম্পর্কে আমি বলতে পারি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন