বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১

তাতিয়ানা তলস্তয়'এর গল্প : অদরকারি বিষয়াদি



অনুবাদ- ফারহানা আনন্দময়ী।


একটা সময়ে কাচের তৈরি খয়েরিরঙা দুটো চোখ ছিল এই ভাল্লুকছানাটার; চোখের মধ্যে মণিও ছিল, মণির মধ্যে তারা জ্বলজ্বল করতো। ওর গা ছিল ছাইরঙা আর গা-ভরা খাড়াখাড়া হয়ে থাকা পশম। আমার খুব আদরের ছিল এই ভাল্লুকছানাটা।

জীবন তো স্রোতস্বিনী। বড়ো হয়ে-ওঠার জীবনটা পেরিয়ে এলাম একসময়ে। সেইন্ট পিটার্সবার্গে নতুন একটা ঘর কিনলাম আমি। বাবা-মায়ের বাড়িটা ছেড়ে যাবার সময়ে আমার এতদিনের যেখানে যা কিছু পুরনো জিনিস, সব গুছিয়ে নিয়ে নিলাম। পুরনো পোশাক, বই, এটা-সেটা, এমনকি পুরনো সুটকেসে জমিয়ে রাখা বাতিল কাপড়, কিছুই বাদ গেল না। এই সমস্ত জিনিসের আদতে কোনোই প্রয়োজন ছিল না, না মায়ের, না আমার নিজের। কিন্তু কেন জানি এইসব অকেজো জিনিসপত্তরের প্রতি কেমন একটা আকর্ষণ কাজ করছিল। জানি, সকল যোক্তিক, ব্যবসায়িক মূল্যই হারিয়েছে এসব, এরা আমার কোনো প্রয়োজনই মেটাবার ক্ষমতা রাখে না আর। অদরকারি। তবু, তবু এসবই আমি কুড়িয়ে নিলাম। শুধু ছিল ওদের ভাঙাচোরা কাঠামো, অকেজো আত্মা... যা এতদিনের কাজের দিনগুলোতে চোখে পড়েনি। বাইরের প্রয়োজন নিয়েই মেতে ছিলাম।

সিঁড়ির নিচের আলমারিটা খুলে জিনিসগুলো বের করছিলাম হাতড়ে হাতড়ে। ভেতরে অতিপুরনো কাপড়চোপড়, স্কি’র লাঠি, আরো কী কী সব! অন্ধকারে ঠিকঠাক বুঝতেও পারছিলাম না, কী স্তুপ করা ওর ভেতরে। হাতে বাধলো এই ভাল্লুকছানাটা! ঠিক ভাল্লুকছানা বলবো না। সেটা ছিল ওর ভেতরের কাঠের কাঠামো, সামনের পায়ের থাবাটাই ছিল শুধু, আর গায়ের সাথে লেগে থাকা দলাপাকানো পশম। আর এক চোখের গর্তের মধ্যে ছোট্ট বোতামের মতো কী একটা। অন্য চোখ থেকে ঝুলে আছে মলিন হয়ে যাওয়া কালো সুতো।

সেই ধুলোজমা, দলাপাকানো পশমের ভাল্লুকছানাটাকে আমি কোলের মধ্যে নিলাম, দু’হাতে জোরে জড়িয়ে ধরলাম বুকের সাথে। কতকিছু মনে পড়তে থাকলো আমার। হঠাৎ ডুকরে ওঠা কান্নাগুলো চোখ বন্ধ করে সামলে নিতে চাইলাম, যেন চোখের জল ওর গায়ে গড়িয়ে না পড়ে। আধো-অন্ধকারে সিঁড়ির নিচের ওই কোণটাতে দাঁড়িয়ে নিজের হৃদস্পন্দনে নিজেই কেঁপেকেঁপে উঠছিলাম যেন! হঠাৎ বিভ্রম জাগলো, এ কি আমার স্পন্দন নাকি ওরটা শুনছি আমার হৃতপিণ্ডে! কে জানে!

অনুভবটা কিসের সাথে মিলে যাচ্ছিলো, বলবো! অনেকটা এরকম, ধরো তোমার সন্তান বড়ো হয়ে গেছে, চল্লিশের কোঠায় ওর বয়স এখন। দূর শহরে তার বাস। তোমাদের দুজনের স্বতন্ত্র জীবনধারার সাথে অভ্যস্তও হয়ে গেছ এতদিনে। এমনি একটা সময়ে হঠাৎ একদিন পুরনো আলমারিটা খুলে তুমি ওর গায়ের গন্ধ পেলে! তোমার প্রথম সন্তান! আঠেরো মাস বয়সী বাচ্চা, ঠিক মতো কথাও বলতে শেখেনি, একা হাঁটতে গেলেই পড়ে যায় বারবার, কান্না করে ফুলিয়ে রাখা মুখ, ঠোঁটের চারপাশে নাক ঘষলে এখনো ওটমিল আর আপেল-সসের ঘন্ধ পাওয়া যায়; হারিয়ে গিয়েছিল, কতদিন ধরে খুঁজছো! দশকের পর দশক ধরে সে-ও তোমার অপেক্ষায়, আলমারির তাকের এই পুরনো অন্ধকারে! আওয়াজ করে ডাকতে পারছিল না এতদিন। তার সাথেই যেন তোমার দেখা হলো, এতযুগ পরে। এবং অবশেষে প্রাণের সম্মিলনী!

তাকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে গেলাম আমার নতুন আবাসে। ঘরভর্তি আসবাবপত্র, জিনিসপত্তর ছড়ানো-ছিটানো। বেশিরভাগই পুরনো জিনিসের দোকান থেকে কেনা অ্যান্টিক, নিত্য ব্যবহারের জিনিসও ছিল। সবই কেমন অপরিচিত, এসব জিনিসের সাথে একাত্ম হতে সময় লাগবে আমার। আর বাড়ি থেকে আনা ফেলে-আসা দিনের ওসব-ও তো ছিল। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম, এইসব অচেনা গন্ধ বের-হওয়া আসবাব, আলমারি এদের সাথে দ্রুততম সময়ে পরিচিত হয়ে যেতে। মায়ের পুরনো কাপড়চোপড় জিনিসপত্তরে আলমারি, চেস্ট-অফ-ড্রয়ার সব ভরে ফেলতে শুরু করলাম। আর ওই যে আমার ভাল্লুকছানাটা, গায়ের পশম-ওঠা, কাঠ-কাঠ, শক্ত-শক্ত, ওকে রাখলাম আমার বিছানায়। এখানে ছাড়া আর কোথায়ই বা রাখবো ওকে!

সেই রাতে ওকে জড়িয়ে ধরে শুলাম। আর ওর যে নিঃসঙ্গ একটামাত্র পায়ের থাবা, সেটা কোনোভাবে আমার গায়ের উপর এসে পড়লো। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকালের একটা রাত, বাইরে ধুসর আলোয় রাত নামছে। আমার চোখে ঘুম ছিল না, অথচ ঘুমের জন্য কাতর ছিলাম। চোখবন্ধ করে ভাল্লুকটার গায়ের গন্ধ পাচ্ছিলাম। কত পুরনো গন্ধ, ধুলোজমা গন্ধ, দশক, শতক আগের ফেলে-আসা দিনের গন্ধ, যেন অনন্তকাল পেরিয়ে এল সেই গন্ধ। জলের নিচে চোখ খুললে যেমন সব ঘোলাটে দেখা যায়, সেই মধ্যরাতের ধুসর আলোতে দেখতে পেলাম ওর চোখের কোটর থেকে বের হয়ে আসা কালো মলিন সেই সুতো। ওর কাঠের শক্ত মাথাটায় হাত বুলোলাম আমি, খুলির মতো হাতে বাধলো আমার! ধীরে ধীরে ওর কানের কাছটায় স্পর্শ করলাম আমি।

হঠাৎই আমার মনে হলো, না, না, এভাবে তো চলতে পারে না। মনে পড়লো, উইলিয়াম ফকনারের সেই গল্পটা, “আ রোজ ফর এমিলি”। একজন নারী তার প্রেমিককে আজীবন নিজের ক’রে রাখবার জন্য বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে তাকে। এরপর বাকি চল্লিশ বছর, যতদিন সে বেঁচে ছিল, বাড়ি থেকে বেরতো না, একাই কাটিয়ে দিল সারাজীবন ওই বাড়ির মধ্যেই। সেই নারীটির মৃত্যুর পরে, দেহ সৎকারের পরে তার ঘরে গিয়ে দেখা গেল, রাত্রিকালীন পোশাক পরনে একটা পুরুষের শুকিয়ে যাওয়া-গুটিয়ে যাওয়া মৃতদেহ বিছানার একপাশে শোয়ানো। কঙ্কালটি পাশ ফিরে যেন পাশের কাউকে জড়িয়ে ধরে আছে। আর তার মাথার পাশের বালিশটায় কেউ মাথা রেখেছিল, এমনভাবে ডেবে আছে, সেখানে রূপালি রঙের লম্বা একটা চুল পড়ে আছে!

পরদিন সকালে আমি মস্কো গেলাম একটা কাজে। মাসখানেক পরে ফিরে এলাম। দেখলাম, কই, নেই তো! ভাল্লুকছানাটা চলে গেছে! ওকে আমার বিছানায় রেখে গিয়েছিলাম। ওখানে নেই ও। বিছানার ওপরেও নেই, নিচেও নেই। ঘরের কোথাও নেই। আলমারি, চেস্ট-অব-ড্রয়ার সবখানে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। না, কোথাও নেই। করিডোরে নেই। কোথাও আর খুঁজে পেলাম না ওকে। একটা সময়ে চলে যায়, যেতে দিতে হয় বোধহয়।



লেখক পরিচিতি
তাতিয়ানা তলস্তয়
জন্ম : ১৯৫১। সেন্ট পিটার্সবার্গ। রাশিয়া।
তিনি লেখক, টিভি ব্যক্তিত্ব, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, গল্পকার ও প্রকাশক। তিনি বিখ্যাত তলস্তয় পরিবারের উত্তরসূরী। 




অনুবাদক পরিচিতি
ফারহানা আনন্দময়ী
চট্টগ্রামে থাকেন। কবি। অনুবাদক। 

1 টি মন্তব্য: