মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

ডোরিস লেসিং-এর গল্প : ছাদের নারীটি




অনুবাদক : বেগম জাহান আরা


সেটা ছিলো জুনের এক রৌদ্রদগ্ধ সপ্তাহ ।

ছাদের ওপর তিনজন মানুষ কাজ করছিলো। সেখানে শীশা এতো গরম হয়ে উঠেছিলো যে তাপ ঠাণ্ডা করার জন্য পানি ছিটিয়েছিলো তারা। কিন্তু হিস হিস শব্দ তুলে পানি উড়ে গেলো বাস্প হয়ে। এটা দেখে তারা তামাশা করে বললো, ছাদের নিচের ফ্ল্যাটের মহিলা বাসিন্দাদের কাছ থেকে তারা ডিম পাবে, রাতে ডিনারে পোচ খাওয়ার জন্য। দুপুর দুটোর মধ্যে পয়োনালীর পাইপগুলো , যেগুলো তারা মেরামত করছিলো, এতোই তপ্ত হয়ে গেলো যে স্পর্শ করা অসম্ভব হলো। তারা কল্পনা করলো, গরম দেশে কাজের লোকেরা তো নিয়মিত এইসব কাজ করে। আহা, কতই না কষ্ট হয়। ডিমের সাথে রান্না ঘরের মোটা দস্তানাও ধার করে নিয়ে আসা উচিত তাদের।

তাদের সবারই মাথা ঝিমঝিম করছিলো একটু। কারণ এমন গরম সয়ে তারা অভ্যস্ত নয়। চিমনির সামান্য ছায়ায় তারা নিজেদের কোট ঢাকার চেষ্টা করলো। অল্প একটু জায়গাতে পাশাপাশি কুচিমুচি হয়ে দাঁড়িয়েছিলো পায়ে পায়ে প্যাঁচ দিয়ে। খুব সাবধানে মোটা মোজা জুতোয় আবৃত পা গুলো রোদের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টাও করছিলো।

বিশাল ছাদের অদূরে একটা চমৎকার দৃশ্য দেখা গেলো। কাছেই একজন মানুষ ডেক চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। আর চিমনি থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে দেখা গেলো এক মহিলাকে। বাদামি কম্বলে মুখ ঢেকে তিনি শুয়ে ছিলেন। তারা ঐ মহিলার ঘন কালো চুলের ওপরের কিছু অংশ এবং খোলা লালচে পিঠ দেখতে পেলো। তাঁর হাত দুটো ছিলো ছড়ানো।


স্ট্যানলি বেশ জোরে জোরেই বললো, "তিনি সম্পূর্ণ উলঙ্গ।"
ওদের মধ্যে বয়সি মানুষ, পঁয়তাল্লিশ বছরের হ্যারি, বললো, “মনে হচ্ছে ঠিক।"
সতরো বছরের যুবক টম, কিছুই বললো না। কিন্তু খুব মজা পেলো এবং দাঁত বের করে হাসতে লাগলো।
স্ট্যানলি বললো, তিনি না খেয়াল করলেও কেউ না কেউ তাঁকে বলে দেবে।
সব সময় সবার চেয়ে বেশি দেখার জন্য মাথা উঁচু করে থাকে টম। সে আবার বললো, “তিনি ভাবছেন, কেউ তাঁকে দেখছে না।"

এমন সময় টান টান হয়ে হাত ঝুলিয়ে শুয়ে থাকা মহিলা হাত দুটো ওপরে তুললেন। তারপর স্কার্ফের প্রান্ত কাঁধের পেছনে নিয়ে পিঠের দিকে বাঁধলেন। উঠে বসলেন তারপর। তাঁর বুকে বাঁধা ছিলো লাল স্কার্ফ এবং পরনে ছিলো সংক্ষিপ্ত লাল বিকিনি প্যান্টি। যেহেতু সেটা ছিলো তাঁর সূর্যস্নানের প্রথম দিন, তাই তাঁকে মনে হচ্ছিলো লাল পোশাক পরা একটা সাদা পরি। তিনি বসে ধুমপান করছিলেন। স্ট্যানলি যে সিটি বাজাচ্ছিলো তাতে কোনও ভ্রুক্ষেপই করলেন না।

হ্যারি বললো, “ নগণ্য বিষয় নগণ্যকেই আনন্দ দেয়।"

রোদের তাপে পীড়িত হয়ে ছাদে তাদের কাজের জায়গায় ফিরে যেতে যেতে হ্যারি বললো, “অপেক্ষা করো, আমি একটু ছায়ার ব্যবস্থা করি।" কথা শেষ করেই স্কাইলাইটের নিচ দিয়ে ভবনের ভেতরে হাওয়া হয়ে গেলো সে।

সে চলে যাওয়ার পর স্ট্যানলি এবং টম মহিলাকে উঁকি দিয়ে দেখার জন্য যতদূর সম্ভব দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। মহিলা নড়ে উঠলেন। কম্বলের ওপর টান টান করে রাখা দুটো পা-ই শুধু তারা দেখতে পেলো । তারা শিস বাজালো, চেঁচামেচি করলো, কিন্তু পা দুটো নড়লো না একটুও।

হ্যারি কম্বল নিয়ে ফিরে এসেই হই চই করে ডাকলো, "এই যে, তোমরা এবার এদিকে এসো।" তার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি ছিলো। আঁচড় পাঁচড় করে ফিরে এলো তারা।

স্ট্যানলিকে বললো হ্যারি, “তোমার বৌয়ের খবর কি?”

মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করেছে স্ট্যানলি। ব্যঙ্গ করে সে বললো, “আমার বৌয়ের আবার খবর কি? আছে। ভালোই আছে।"

টম কিছুই বললো না। সারাক্ষণ উলঙ্গ প্রায় ঐ মহিলার বিষয়টাতে ডুবে আছে তার মন।

টেলিভিশনের এরিয়েলের গোড়ার কাছ থেকে চিমনির সারি সারি পাত্রগুলোর এলাকা পর্যন্ত হ্যারি কম্বলটা ঝুলিয়ে দিলো। এটা সে নিচতলার এক বন্ধুভাবাপন্ন মহিলার কাছ থেকে ধার করে এনেছে। ছায়াটা তাদের কাজের জায়গার কিছু অংশ ঢাকতে পেরেছিলো। তবে বার বার সরে সরে যাচ্ছিলো ছায়া। তারাও সরিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিলো কম্বলটা। এই প্রক্রিয়ায় খুব বেশি একটা লাভ হলো না তাদের। অবশেষে রোদ কমে কিছু গরম কমে গেলো ছাদের ওপর থেকে। তখন তাড়াতাড়ি কাজ করতে লাগলো সবাই, যাতে হারানো সময় কিছুটা হলেও উদ্ধার করতে পারে।

মেয়েটিকে দেখার জন্য প্রথমে স্ট্যানলি, পরে টম ছাদের শেষ প্রান্তে ঘুরতে গেলো। টমকে হাসানোর জন্য স্ট্যানলি মজা করে বললো, "দেখো, চিত হয়ে শুয়েছেন তিনি।" বয়সি মানুষটাও হাসলো একটু। টম বলেছিলো, মেয়েটি একটুও নড়েনি। কিন্তু কথাটা মিথ্যে ছিলো। আসলে সে যা দেখেছিলো, তা গোপন রাখতে চেয়েছিলো নিজের মধ্যে।

নিতম্বের ওপর দিয়ে ছোটো লাল প্যান্টিটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সম্পূর্ন খুলে ফেলার দৃশ্য দেখেছিলো সে। চিত হয়ে শুয়ে ছিলেন তিনি। তেলচকচকে দেহের সবটুকুই দেখা যাচ্ছিলো।

পরদিন কাজে এসেই তারা গেলো মহিলার খোঁজে। এরই মধ্যে জায়গা মতো এসে গেছেন তিনি। নিচের দিকে মুখ রেখে শুয়ে আছেন। দুই বাহু প্রসারিত এবং পরনে লাল প্যান্টি ছাড়া আর কিছু নেই। রাতারাতি তাঁর শরীরের রঙ বাদামি হয়ে গেছে। গতকালই তাঁর দেহের বরন ছিলো লাল-সাদা, মানে দুধে-আলতা রঙ। আজই সেই মহিলার রঙ হয়ে গেছে বাদামি।

স্ট্যানলি শিস বাজালো। ঘুম থেকে হঠাত জেগে ওঠার মতো চমকে মাথা তুলে সরাসরি তিনি তাকালেন তাদের দিকে। চোখে রোদ পড়ার জন্য চোখ পিট পিট করছিলেন এবং তা সত্বেও বড় বড় চোখে তাকিয়েছিলেন। তারপরই মাথা নামিয়ে নিলেন আবার। মহিলার এমন নিরাসক্ত ভাব ভঙ্গি দেখে স্ট্যানলি, টম, এবং বুড়ো হ্যারি তিনজনেই শিস বাজাতে এবং চিৎকার করতে থাকলো। ছোটোদের আচরণ প্যারোডির মতো করে অনুকরণ করছিলো বুড়ো হ্যারি। তবে মনে মনে সে রেগে গিয়েছিলো। আসলে তাদের তিনজনেরই ভারি গোস্বা হয়েছিলো মহিলার ওপর। কারণ তিন তিনটা মানুষ তাঁকে দেখছে, জানান দিচ্ছে, আর তিনি গায়েই মাখছেন না। চুড়ান্ত নিরাসক্ত হয়ে থাকছেন তাদের প্রতি।

স্ট্যানলি বলে, “মাদি কুকুর একটা।"
দুষ্টু হাসি দিয়ে টম বললো, “ আমাদের সাথে তার কথা বলা উচিত।"
স্ট্যানলিকে উদ্দেশ করে হ্যারি বললো , তিনি যদি বিবাহিত হন, তাহলে এই সব পছন্দ করতেন না তাঁর বুড়ো মানুষটা।
ধার্মিক মানুষের মতো স্ট্যানলি বললো, “ ও গড, সবাইকে শরীর দেখানোর জন্য আমার স্ত্রী যদি এমন ভাবে শুয়ে থাকতো, তাহলে তখনই বন্ধ করে দিতাম তার রোদ পোহানো।"
হ্যারি হেসে বললো, "তুমি কি ভাবে জানবে ঘটনা? সম্ভবত তোমার স্ত্রী এই মুহূর্তে, ঠিক এই ভাবেই , রোদ পোহাচ্ছে কোথাও।"

"কোনো সম্ভাবনা নেই। আমাদের ছাদে তো নয়ই।" নিজের স্ত্রী সম্পর্কে সুন্দর মন্তব্যটা করলো স্ট্যানলি। তারপর সবাই তারা কাজে লেগে পড়লো।

দিনটা গতোকালের চেয়ে গরম ছিলো। বেশ কয়েকবার কেউ না কেউ প্রস্তাব দিচ্ছিলো, ফোরম্যান ম্যাথিউকে গিয়ে বলা উচিত যে, গরমের তীব্র প্রকোপ না কমা পর্যন্ত ছাদের কাজ করতে পারবে না তারা। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধেনি কেউ। ফ্ল্যাটের বিশাল এলাকায় বেইজমেন্টে অনেক কাজ করতে হবে। তবে ছাদের ওপর তারা অনেক মুক্ত আছে। অন্তত রাস্তায় বা অন্য দালানে কাজের চেয়ে অনেক বেশি মানবিক অবস্থায় আছে।

দুপুর বেলা বেশ কিছু মানুষ সেদিন ঘন্টা খানেকের জন্য ছাদে এসেছিলেন। কিছু দম্পতি ডেক চেয়ারে বসেছিলেন পাশাপাশি। মহিলাদের লালচে পায়ে মোজা ছিলো না। এবং লালচে কাঁধের পুরুষদের গায়ে ফতুয়া ছিলো না। কিন্তু সেই মহিলা কম্বলের ওপর শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলেন বার বার। অন্যেরা কি করছেন, তা একেবারেই গণ্য করছিলেন না।

হ্যারি কিছু স্ক্রু ( screw) আনতে গেলে স্ট্যানলি তাকে ডেকে বললো, “এদিকে এসো।"
মহিলার ছাদের সিস্টেম আলাদা রকমের। অন্যদের ছাদ থেকে এক জায়গায় প্রায় বিশ ফুট বিচ্ছিন্ন। তার মানে, এক স্তর থেকে অন্য স্তরে ওঠা দুরূহ। দেয়ালের প্রান্ত ধরে হাতে পায়ে আঁচড়ে খামচে উঠতে হবে সেখানে। বাড়তি প্রতিরক্ষা দেয়াল আবার চিমনির সাথে আটকানো। যেখানে তাদের বড় বুটজুতা পিছলে টল টলায়মান হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিলো। অবশেষে তারা ছাদের এক ছোট্ট কোণায় দাঁড়াতে পেরেছিলো।

সেখান থেকে ছাদের যে অংশ দেখা যাচ্ছিলো , সেটা মহিলার অবস্থান থেকে সরাসরি নিচে এবং কাছাকাছি। তারা দেখলো, তিনি বসে ধুমপান করতে করতে বই পড়ছেন।

টমের মনে হলো মহিলাটি একটা পোস্টার অথবা ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। পেছনে নীল আকাশ, পা দুটো লম্বা করে ছড়ানো। তার পেছনে বিশাল এক ক্রেইন অক্সফোর্ড স্ট্রিটে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ করছে। ক্রেইনের কালো হাত অন্য ভবনের ওপর বাঁকা হয়ে ঝুলছে, ঘুরছে। টম মনে মনে কল্পনা করলো, ক্রেইনে সে নিজে বসে কাজ করছে। ক্রেইনের ঝুলন্ত ঘুর্ণায়মান হাত সে এমন ভাবে ঠিক করছে, যেনো হাতটা মহিলার মাথার ওপর গিয়ে ওঁকে তুলে উড়িয়ে এনে তার কাছে নামিয়ে দিতে পারে।

তারা শিস দিলো। মহিলা তাদের দিকে খুব ঠাণ্ডা এবং অচেনা দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর আবার পাঠে ডুবে গেলেন। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো তারা, বিশেষ করে স্ট্যানলি। তার রৌদ্রেতপ্ত মুখমন্ডলে রাগের চিহ্ন ফুটে উঠলো। বইয়ের পাতা থেকে মহিলার দৃষ্টি ওঠানোর জন্য বারবার শিস বাজাতে থাকলো। যুবক টম বন্ধ করেছিলো শিস বাজানো। সে স্ট্যানলির পাশেই দাঁড়িয়েছিলো। স্ট্যানলির কাণ্ড দেখে সে মজা পাচ্ছিলো এবং হাসছিলো দাঁত বের করে। হাসিটা ছিলো ক্ষমা চাওয়ার প্রতীক। সে যেনো বলতে চাইছিলো মহিলাকে, ওগো মেয়ে শুনছো, ওর সাথে এক করে দেখো না আমাকে।

গতরাতে ঘুমানোর আগে এই অপরিচিত মহিলাটির কথা ভেবেছিলো সে। কল্পনায় ভারী নমনীয় মনে হয়েছিলো তাঁকে। সেই নমনীয়তার কথা মনে করে সে স্ট্যানলির অসভ্যতা, এবং শিস বাজানো থেকে দুরে ছিলো। চেয়ে দেখছিলো কয়েক গজ দূরে থাকা নিরাসক্ত সুন্দর বাদামি মহিলাকে। এক লাফে এই সামান্য ফারাক অতিক্রম করে চলে যাওয়া যায় তাঁর কাছে। কথাটা ভাবতেই রোমাঞ্চ অনুভব করলো সে। মনে হলো, তারা যেনো পাহাড়ের দুই উঁচু চূড়োয় অবস্থান করছে। হঠাৎ হ্যারির উচ্চকন্ঠ শোনা গেলো। তারা কষ্ট করে চার হাতে পায়ে আঁচড়ে জাপটে ধরে ফিরে গেলো। স্ট্যানলির মুখ শক্ত হয়ে আছে রাগের চোটে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে টম ভাবলো, মহিলার প্রতি এতো বেশি কেনো বিতৃষ্ণা? এতো কেনো ঘৃণা? অথচ এর মধ্যেই টম তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছে।

ছায়ার নিচে কাজ করার জন্য কম্বল নিয়ে আবার তাদের "ছায়া-ধরার" খেলা শুরু হয়েছিলো। প্রায় চারটা পর্যন্ত তারা কাজ করতে পেরেছিলো। এমন গরমে কাজ করার জন্য খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো তারা তিন জনেই। এরই মধ্যে আবহাওয়ার রকম সকম নিয়ে তারা রীতিমতো অসন্তোষ প্রকাশ করছিলো। স্ট্যানলি তো গালাগালি করে ধুয়ে নামাচ্ছিলো এমন বিশ্রী আবহাওয়াকে।

দিনের কাজ শেষে জিনিস পত্র গুছিয়ে তোলার সময় তারা দেখতে গেলো মহিলাকে। মাথা নিচে রেখে প্রায় ঘুমিয়ে গেছেন মনে হলো। পশ্চাতদেশে লাল ত্রিভুজাকৃতির এক টুকরো কাপড় ছাড়া পেছনটা একেবারেই বস্ত্রহীন।

স্ট্যানলি বললো, “আমার তো ইচ্ছে করছে তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে।"
হ্যারি বললো, "তোমার গা কামড়াচ্ছে কেনো? তিনি কি ক্ষতি করেছেন তোমার?”
- “সত্যি বলছি তোমাকে, তিনি যদি আমার স্ত্রী হতেন !"
- “ কিন্তু তিনি তো তোমার স্ত্রী নন, ঠিক কি না?” হ্যারি বলে।

টম জানে, হ্যারিও তার মতো মহিলার ব্যাপারে স্ট্যানলির প্রতিক্রিয়ায় অস্বস্তি বোধ করে। আসলে টম চালাক চতুর যুবক। কাজ করে দ্রুত। অনেক মজার মজার কথা বলে। সঙ্গী হিসেবে ও খুব ভালো।

হ্যারি বলে, মনে হয় আগামি কালের দিনটা একটু কম গরমের হবে। কিন্তু হায়, সেটা হয়নি। যদি কিছু হয়েই থাকে তা হলো, আরও বেশি গরমই হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এমন আবহাওয়া বজায় থাকবে। ছাদে পৌঁছেই হ্যারি সেই মহিলার খোঁজে গেলো। টম জানে ,স্ট্যানলি যাতে না যায় এবং বাজে মন্তব্য করার সুযোগ না পায়, সে জন্যই হ্যারি আগে আগে গেলো। হ্যারির ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। টমের বয়সি তার এক ছেলেও আছে। যুবা বয়সের ছেলেমেয়েরা তাকে বিশ্বাস করে এবং সম্মান করে।

হ্যারি ফিরে এসে বললো, "মহিলাটি নেই সেখানে।"
স্ট্যানলি বললো, "বাজি রেখে বলতে পারি, স্বামী আসতে দেয়নি তাঁকে।"
হ্যারি এবং টম পরস্পরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে সদ্য বিবাহিত স্ট্যানলির পেছেনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসলো। হ্যারি প্রস্তাব দিলো, বেইজমেন্টে কাজ করার অনুমতি পাওয়া দরকার। যেমন বলা তেমনি কাজ। সেই দিনই তারা অনুমতি পেয়ে গেলো। কাজ কর্মের জিনিস পত্র গুছিয়ে তোলার আগে স্ট্যানলি বললো, “ টাটকা বাতাসে একবার বুকভরে নিশ্বাস নেয়া যাক।"স্ট্যানলির পিছে পিছে ছাদ পর্যন্ত গেলো তারা। হ্যারি এবং টম আবার পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসলো। টমের দৃঢ় ধারণা হলো, স্ট্যানলির উৎপাত থেকে মহিলাকে দূরে রাখার জন্যই সে স্ট্যানলির পিছু নিয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচটার সময় শান্ত সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়লো ছাদে। সেই বিশাল বড় ক্রেইনের কালো হাত অক্সফোর্ড স্ট্রিট থেকে তাদের মাথার ওপর এসে দুলছিলো।

কিন্তু মহিলাটি নেই সেখানে। মনে হলো, ছাদের বাড়তি নিচু দেয়ালের পেছন থেকে হালকা হাওয়ায় অতি দ্রুত সাদা কিছু একটা উড়ে এলো এবং দেখা গেলো সাদা ড্রেসিং গাউনের ওপর বেল্ট এঁটে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। বোধ হয় সারাদিনই সেখানে ছিলেন তিনি। এটা ছাদের অন্য একটা অংশ। সম্ভবত তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকার জন্যই তিনি ওখানে ছিলেন।

স্ট্যানলি শিস বাজালো না। কিছু বললোও না। শুধু লক্ষ করে দেখলো, মহিলা উবু হয়ে কাগজ, বইপত্র এবং সিগারেট গুছিয়ে তুলছেন। তারপর কম্বলটা ভাঁজ করে হাতের ওপর রাখলেন। টম ভাবছিলো, ওরা যদি না থাকতো, তাহলে আমি ওখানে দৌড়ে যেতাম এবং গিয়ে বলতাম… কিন্তু কি বলতাম? কিন্তু রাতের অলীক স্বপ্নটা থেকে টম জেনেছে, তিনি নম্র এবং বন্ধুভাবাপন্ন। সম্ভবত তিনি আমাকে তাঁর ফ্ল্যাটে যেতে বলতেন। সম্ভবত … সম্ভবত… সে দেখলো মহিলা স্কাইলাইটের নিচ দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

মহিলা চলে যাচ্ছেন দেখে স্ট্যানলি ব্যঙ্গ করে খুব জোরে বিশ্রী চিৎকার করলো। মনে হলো, মহিলা প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন। কিছু একটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে রক্ষা করলেন। জিনিস পত্র পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনলো তারা। রেগে সরাসরি তাদের দিকে তাকালেন তিনি। হ্যারি কৃত্রিম দরদ দেখিয়ে বললো, "দেখে শুনে পিছল মই দিয়ে সাবধানে নামো সোনা।" টম জানতো, স্ট্যানলির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হ্যারি কথাগুলো বলেছে। মহিলা এতো সব জানতেন না। ভ্রু কুঁচকে চলে গেলেন তিনি। টম মনে মনে খুব খুশিতে আপ্লুত হয়ে গেলো। কারণ তার একান্ত ধারণা, মহিলার রাগ সব ওদের ওপর। তার ওপর না।
 
তিক্ত বিরক্ত হয়ে সান্ধ্য নীল আকাশের দিকে চেয়ে স্ট্যানলি বললো, "একটু বৃষ্টি, একটু বৃষ্টি ঝরাও হে আকাশ।"

পরের দিনটাও ছিলো মেঘ শূন্য। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, বেইজমেন্টের কাজ করবে। ধুসর সিমেন্টের বেইজমেন্টে পাইপ ফিট করার সময় তারা নিজেদেরকে খুব নগণ্য হতভাগ্য মনে করছিলো। কারণ এই তীব্র গরমে লন্ডনের মানুষ যখন ছুটির আমেজে আয়াস করছে , তখন এই প্রাণান্ত কষ্টকর কাজগুলো করতে হচ্ছে তাদেরকে।

দুপুরের খাওয়ার সময় খোলা বাতাসের জন্য তারা ওপরে এলো। কিছু বিবাহিত দম্পতি এবং কিছু পুরুষ হাতওয়ালা শার্ট বা ফতুয়া পরে এসেছিলো সেখানে। মহিলাটিকে কোথাও দেখা গেলো না। ছাদের সেই বিশেষ জায়গাতেও না, যেখানে তিনি থাকতেন; কিংবা কালকে যেখানে ছিলেন, সেখানেও না। হ্যারিসহ তারা সবাই কষ্ট করে এদিক ওদিক গিয়ে চিমনির ফাঁকে ফাঁকে, বাড়তি দেয়ালের ওপর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলো। লাভ হলো এই যে, তপ্ত সীসার গন্ধে মেখে গেলো তাদের আঙুল। কিন্তু কোনও চিহ্নই দেখতে পাওয়া গেলো না মহিলার।

গায়ের শার্ট এবং ফতুয়া খুলে ফেলে খালি গা হয়ে গেলো তারা। অনুভব করলো তাদের পা ঘামে ভেজা এবং বেশ গরম। মহিলার কথা তারা কেউ উল্লেখ করলো না। টম একা একা কল্পনার রাজ্যে চলে গেলো। সে ভাবতে লাগলো, গতরাতে সে মহিলার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলো। বেশ বড়ো বাসা। সাদা কার্পেট দিয়ে সবটুকু মোড়ানো। বিছানায় মাথার পেছন দিকে গদিওয়ালা নরম সাদা চামড়ার উঁচু প্যানেল। সিনেমার নায়িকাদের মতো ছোটো পাতলা কালো ড্রেসিং গাউন পরেছিলেন তিনি। আহা, আর কি নমনীয় ব্যবহার! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আবেগে টমের গলা ভারি হয়ে গেলো। মনে হলো, এখানে না এসে তিনি বিশ্বাস ঘাতকতা করেছেন তার সাথে।

কাজ শেষ করে তারা আবার উঠে এলো ওপরে। তখনও তাঁর কোনও চিহ্ন নেই। স্ট্যানলি বারবার বলতে লাগলো, গরম যদি এরকমই থাকে তাহলে কিছুতেই কাজ করবে না সে। এটাই তার শেষ কথা। কিন্তু পরদিন দেখা গেলো, বেচারারা সবাই এলো কাজে। বেলা দশটার মধ্যে তাপমাত্রা উঠে গেলো ৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি।

দুপুর আসার অনেক আগেই তাপ মাত্রা হলো ৮০ ডিগ্রি। হ্যারি ফোরম্যানের কাছে গিয়ে বললো, এই গরমের মধ্যে তপ্ত শীসার ওপরে কাজ করা অসম্ভব। ফোরম্যান বললো, সে কিছুই করতে পারবে না। কাজ করতেই হবে তাদের। বিকল্প নেই।

দুপুরের দিকে তারা মহিলার খোলা ছাদের ওপর স্কাইলাইটের দিকে নিরবে তাকিয়ে দেখছিলো। ধিরে ধিরে সাদা গাউন পরে এবং হাতে অনেকগুলো কম্বল নিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন। গম্ভীরভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি চলে গেলেন ছাদের সেই অংশে, যেখানে তিনি নিজেকে আড়াল করেছিলেন ওদের থেকে। খুশি হয়ে গেলো টম। সে ভাবলো, কেউ যখন তাকে দেখতে পাবে না, তখন মহিলা শুধু তার হয়েই থাকবেন।

তারা শার্ট এবং ফতুয়া খুলে ফেলেছিলো, সেগুলো আবার পরলো। কারণ, মনে হলো, খালি গায়ে থাকার জন্য রোদের তাপে তাদের মাংস পুড়ে যাচ্ছে।

স্ট্যানলি কষে টেনে পাইপ মেরামতির কাজ করতে করতে বকবক করছিলো। সে বললো, “ মহিলার নিশ্চয় গন্ডারের চামড়া গায়ে।"

তারা কাজ বন্ধ করে চিমনির পেছনে ঘূর্ণায়মান ছায়ায় বসলো। এমন সময় গরম কালের পোশাক হিসেবে ফুলফুল ছিটের জামা পরে এক মহিলা এলো তাদের উল্টো দিকে হলুদ জানালা সংলগ্ন ফুলের টবে পানি দিতে। এটা দেখে স্ট্যানলি বললো, "ইস, ওদের চেয়ে আমাদের বেশি পানি দরকার।"

মহিলা বললো, “ভালো হয়, তাড়াতাড়ি নিচে নেমে পাবে গেলে। মিনিট খানেকের মধ্যেই কিন্তু সেটা বন্ধ হয়ে যাবে।"

সবাই খুশি হয়ে দৃষ্টি বিনিময় করলো। হাত নেড়ে , একটু হেসে মহিলা চলে গেলো। স্ট্যানলি বললো, “লেডি গডিভার মতো নয় মহিলা। আমাদের সাথে একটু হেসে গল্প করে গেলে কি আর এমন হতো?"
টম আগের ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে বললো, “তুমি তো আর তাকে দেখে শিস বাজাওনি।"
- "তখন তুমিও কি শিস বাজাওনি বাছাধন?” স্ট্যানলি উত্তর দিলো।

টম ভাবলো, সে তো শিস বাজায়নি। শুধু হ্যারি এবং স্ট্যানলি শিস দিয়েছিলো। সে পরিকল্পনা করছিলো, কাজ শেষে কিভাবে কখন মহিলাটির সান্নিধ্যে যাবে। আবহাওয়া রিপোর্ট বলেছে, গরম কমাটা প্রত্যাশিত। সুতরাং তাড়াতাড়ি যেতে হবে তাকে। কিন্তু যাওয়ার কোনও সুযোগ হচ্ছে না। তার অন্য দুজন সঙ্গী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেলা চারটার সময় বন্ধ করবে কাজ। কারণ তারা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। নিচে চলে গেলো তারা। তখন টম তাড়াতাড়ি ছাদের বাড়তি অংশের দেয়ালে উঁচু লাফ দিয়ে উঠে চিমনির ওপরে গেলো। সেই মেয়েটিকে এক ঝলক দেখলো। তিনি চিত হয়ে শুয়ে আছেন। হাঁটু দুটো উঁচু করে তোলা। চোখ বন্ধ। বাদামি শরীরের মেয়েটি কি অলস ভঙ্গিমায় শুয়ে রোদ পোহাচ্ছেন। পা পিছলে হড়মড় করে পড়ে গেলো টম। শব্দ শুনে স্ট্যানলি ফিরে তাকালো ঘটনাটা বোঝার জন্য। সে বললো, “মহিলা নিচে নেমে গেছেন।" টম ভাবলো, স্ট্যানলির কাছ থেকে সে তাঁকে আগলে রাখছে। এই জন্য মহিলা নিশ্চয় তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন। কল্পনায় মহিলার সাথে তার একটা আত্মিক বন্ধন অনুভব করলো সে।

পরদিন তারা ছাদের নিচে মাটিতে দাঁড়িয়েছিলো। গরমে ছাদে ওঠার ব্যাপারে সবাই বেশ নিরাসক্ত। হ্যারি যে মহিলার কাছ থেকে কম্বল ধার করে এনেছিলো, তিনি বেরিয়ে এসে তাদেরকে চা খাওয়াতে চাইলেন। তারা আনন্দের সাথে রাজি হলো। তারপর মিসেস প্রিচেট-এর রান্নাঘরের পাশে বসে ঘন্টা খানেক খোশ গল্পগুজব করলো সকলে।

মিসেস প্রিচেট-এর স্বামী একজন পাইলট। প্রায় তিরিশ বছর বয়সের ব্লন্ড চুলের মহিলাটা সুন্দর সুপুরুষ স্ট্যানলির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। তা দেখে তারা দুজন নিজের মধ্যে টিপ্পনি কাটছিলো আর হ্যারি বসেছিলো এক কোণায়। তাদের কাণ্ডকারখানা দেখছিলো, প্রশ্রয় দিচ্ছিলো আর মনে মনে ভাবছিলো, স্ট্যানলি তো বিবাহিত। মিসেস প্রিচেটের সাথে স্বাভাবিক সহজ সুন্দর ভাবে স্ট্যানলির কথাবার্তা বলা দেখে যুবক টম ভেতরে ভেতরে হিংসা অনুভব করছিলো। সে আরও ভাবছিলো, মিসেস প্রিচেটের সাথে স্ট্যানলির সাময়িক রোমান্স ভেঙে গেলেও ছাদের ওপরের মেয়েটির সাথে তার রোমান্সের সম্পর্ক নিরাপদ এবং অটুট থাকবে।

রোদের মধ্যে ছাদে উঠে কাজ করার সময় হয়ে এলে রাগে গজ গজ করে গোমরা মুখে স্ট্যানলি বললো, “আমার মনে হয় তারা বলেছে, তাপ প্রবাহ কমবে।"
মিসেস প্রিচেট প্রশ্ন করলেন, "আপনি বুঝি গরম পছন্দ করেন না?”
- “অনেকের জন্য ঠিক আছে। "স্ট্যানলি বলে," আমাদের তো কিছু করার নেই। তব একটা মিথ্যে কল্পনা করে নিতে হবে যে, ওপরে সমুদ্রতট আছে। তা আপনি কখনও ওপরে গেছেন?”
মিসেস প্রিচেট বলেন, “ মাত্র একবার গিয়েছি। ওটা খুব নোংরা জায়গা এবং খুব গরম।"
- "একদম ঠিক বলেছেন,” স্ট্যানলি বলে।

এরপর তারা বন্ধুভাবাপন্ন মিসেস প্রিচেটের ঠান্ডা পরিচ্ছন্ন ছোট ফ্ল্যাট ছেড়ে ছাদের ওপরে গেলো এবং সেই মেয়েটিকে দেখলো। কঠিন সূর্যের তাপে মেয়েটির স্বাচ্ছন্দ্য দেখে ভারি অস্বস্তি বোধ করলো তারা তিনজন। স্ট্যানলির মুখের ভাব ভঙ্গি দেখে হ্যারি বললো, “এসো, অন্তত কাজ করার ভান করি।" তাদেরকে প্রাচীরের পাশে আর একটা লম্বা গর্ত খুঁড়তে হবে যাতে বিকল্প প্রাচীর নির্মাণ করা যায়। সে দুই হাতে গর্ত খোঁড়ার জিনিস পত্র শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়ালো।

"আরে ধুর, গুল্লি মারি" বলে স্ট্যানলি একটা চিমনির নিচে বসে সিগারেট ধরালো। তারপর বললো, "জাহান্নামে যাক কাজ। আমরা কি গিরগিটি? সারা হাতে ফোসকা পড়ে গেছে আমার।" তারপর সে লাফিয়ে ছাদের ওপর উঠে তাদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালো।

মুখের দুপাশে আঙুল দিয়ে শিস বাজালো খুব তীক্ষ্ণভাবে। টম এবং হ্যারি উবু হয়ে বসে ছিলো। তারা পরস্পরের দিকে না তাকিয়ে স্ট্যানলিকেই দেখছিলো। মহিলার বাদামি কাঁধের ওপর মাথাটাই শুধু তারা দেখতে পাচ্ছিলো। স্ট্যানলি শিস বাজালো আবার। তারপর মহিলাকে উদ্দেশ্য করে মাটিতে পা ঠুকতে আরম্ভ করলো, শিস বাজালো, জোরে শব্দ করলো, এবং চিৎকার করলো। লাল হয়ে গেলো তার মুখ। মনে হলো প্রায় পাগল হয়ে গেছে সে। এতো জোরে পা ঠোকা, শিস বাজানো, এবং চিৎকারের পরেও মহিলার শরীরের কোথাও একটুও নড়লো না।

টম বললো, “গাধি।"
হ্যারি অপছন্দের সুরে বললো, “হুম, ঠিক।"
হঠাৎ বয়সি মানুষটা একটা সিদ্ধান্তে এলো। সেটা হলো, টম জানে, কিভাবে বাজে কথা ঢেকে রাখা যায়, অথবা মহিলাকে যথার্থ অর্থে উত্যক্ত না করা যায়। হ্যারি উঠে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা তেলতেলে কাপড়ের ওপর হাতিয়ার পত্র গোছাতে শুরু করলো।

আদেশের ভঙ্গিতে ডাকলো, “স্ট্যানলি" প্রথমে স্ট্যানলি কানে নেয়নি তার ডাক। হ্যারি আবার ডেকে বললো, "স্ট্যানলি, এর মধ্যেই আমরা জিনিস পত্র গুছিয়ে তুলছি। ম্যাথিউকে বলবো, আমরা কাজ বন্ধ করলাম।

স্ট্যানলি ফিরে এলো। তার মুখে বিরক্তির ছাপ। চোখ জ্বল জ্বল করছে। হ্যারি বললো, “ এভাবে চলতে পারে না। দু একদিনের মধ্যেই এই ব্যবস্থা অচল হয়ে যাবে। ম্যাথিউকে বলবো, সূর্যতাপে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়েছি। সর্দি গর্মি হয়ে গেছে আমাদের।"টম লক্ষ করলো, হ্যারি ভীষণ ক্ষুব্ধ। ধুসর চুলের ছোটো খাটো শক্ত সমর্থ পারিবারিক মানুষটা সাধারণত মেজাজ খারাপ করে না। তারও মনে হয় মাথা গরম হয়েছে। রাগান্বিত স্বরে সে বললো, “ এদিকে এসো।” ছাদের খোলা চারকোণা চত্বরে সে দাঁড়ালো। তারপর মই বেয়ে নেমে গেলো নিচে। নামার সময় পায়ের দিকে খেয়াল রাখলো। এরপরে মহিলার দিকে একবারও না চেয়ে স্ট্যানলিও নিচে নেমে গেলো। বাকি রইলো টম। গলা পর্যন্ত উত্তেজনা নিয়ে সে পেছনে তাকালো। নীরবে বলতে চাইলোঃ আমার জন্য অপেক্ষা করো জান। আমি আসছি।

পথের ওপর স্ট্যানলি বললো, “ আমি বাড়ি যাচ্ছি।" তাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিলো। হয়তো সত্যিই তার সর্দি গর্মি হয়েছে। হ্যারি ফোরম্যানের কাছে গেলো। পথের নিচু প্রান্তে সে অন্য ফ্ল্যাটে স্যানিটেশনের পাইপ এবং পানির লাইনের কাজ করছিলো। টম কেটে পড়লো। নিজেদের কাজের জায়গায় গেলো না। যেখানে ঐ মহিলা শুয়ে আছে সেই ছাদে গেলো সে। বাধা দেয়ার কেউ ছিলো না। সে এগিয়ে গেলো সোজা। মাথার ওপর খোলা আকাশ। ওপরে যাওয়ার জন্য একটা মই লাগানো আছে। মহিলার কাছ থেকে কয়েক গজ দুরের ছাদে উপস্থিত হলো টম। উঠে বসলেন মহিলা। দুই হাত দিয়ে কালো চুলগুলোকে পেছনে নিলেন। বুকের ওপর স্কার্ফ শক্ত করে বাঁধা। তারপরও উদ্ধত বাদামি বুকের মাংস উপচে বেরিয়ে আসতে চায়। বাদামি মসৃণ দুটি পা দেখা যায়। তিনি নীরবে বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বোকার মতো মনে মনে তার কাছ থেকে কোমল ব্যবহার আশা করে দাঁত বের করে হাসছিলো সে।

- “ কি চাও তুমি?” মহিলা প্রশ্ন করেন।
সে তোতলার মতো করতে লাগলো। দেঁতো হাসিতে তাকে সন্তুষ্ট করতে চেয়ে কোনো
মতে বললো, “আমি… আমি… আপনার সাথে পরিচিত হতে চাই।"
পরস্পরের দিকে তাকালো তারা। একজন হালকা লালচে মুখের যুবক। অন্যজন প্রায় উলঙ্গ মহিলা। তারপর কোনও কথা না বলেই তিনি বাদামি কম্বলের ওপর শুয়ে পড়লেন। পাত্তা দিলেন না যুবককে।
- “ আপনি সূর্যের তাপ পছন্দ করেন, তাই না?” টম জানতে চাইলো।

একটা শব্দও শোনা গেলো না। তার মনে আতঙ্ক হলো। কল্পনা করতে লাগলো, কাল কেমন ভাবে তিনি তাঁর হাতের মধ্যে ধরে রেখেছিলেন তাকে। চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলেন। সম্মানের সাথে তাঁর কাছে, তাঁর বিছানায় নিয়ে বসিয়েছিলেন, চমৎকার পানীয় খেতে দিয়েছিলেন, যা সে জীবনেও কখনও খায়নি। তার মনে হলো, সে যদি হাঁটু গেঁড়ে বসে তাঁর কাঁধে হাত বুলায় এবং চুলে বিলি কাটে, তাহলে তিনি ঘুরে দুহাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরবেন।

সে বললো, “সূর্যতাপ আপনার খুব ভালো লাগে, তাই না?
তিনি মাথা তুলে ছোটো দুই মুঠির মধ্যে চিবুক রাখলেন। বললেন, "চলে যাও এখান থেকে।"

টম গেলো না।

রাগ চেপে অনেক কষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বললেন, “বিকিনি পরা মহিলাদের কাছ থেকে মুখ ঝামটা খেতে চাইলে, ছয় পেনির টিকিট কেটে একটা বাসে চেপে বসো। তারপর সোজা লিডোতে চলে যাও না কেনো? সেখানে ডজন ডজন বিকিনি পরা মহিলা পেয়ে যাবে একেবারে বিনা ক্লেশে। এতো সব কষ্টের কিছুই করতে হবে না।"

মহিলা টমের মনোভাব কিছুই বুঝতে পারলো না। মহিলার খারাপ ব্যবহার দেখে টম ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। তোতলাতে তোতলাতে বললো, “কিন্তু আমি… আমি আপনাকে পছন্দ করি। আমি আপনাকেই দেখে যাচ্ছি কয়েকদিন ধরে এবং…"

-”ধন্যবাদ" শব্দটা উচ্চারণ করে তিনি মাথা নামিয়ে নিলেন আবার। তারপর তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লেন।

তিনি শুয়ে থাকলেন। টম দাঁড়িয়ে থাকলো। তিনি কিছুই বললেন না। টমের মুখেও কথা নেই, বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। কয়েক মিনিট কিছু না বলে দাঁড়িয়ে থাকলো সে। মনে মনে ভাবলো, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তাঁকে কিছু বলতেই হবে। কিন্তু বেশ কিছু সময় চলে গেলো। মহিলার পক্ষ থেকে কথা বলার কোনও লক্ষণ দেখা গেলো না। কিন্তু মহিলার টেনশন বোঝা গেলো পেছন থেকে তার উরু এবং বাহু দেখে। যুবকটা অপেক্ষা ছেড়ে দিয়ে কখন চলে যাবে , হয়তো সেটাই ছিলো তাঁর টেনশনের কারণ।

টম ওপরে আকাশের দিকে তাকালো। সূর্য দ্রুত তাপ ছড়াবে মনে হয়। সে এবং তার সহকর্মিরা ছাদের যে অংশে আগে ছিলো সেখানেও যাবে তাপ। যেখানে তারা কাজ করছিলো, সেখানে কেঁপে কেঁপে তাপ আগুন ঝরাবে। আর তারা আশা করবে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও আমরা কাজ করতে থাকবো! এই কথা চিন্তা করে ঘৃণায় ক্রোধে মন বিষিয়ে উঠলো তার।

মহিলা একটুও নড়াচড়া করেনি। এল ঝলক গরম বাতাস তাঁর কালো চুলকে ঈষৎ দুলিয়ে দিলো। দেখা গেলো উজ্জ্বল চকচকে চুলে রঙধনু রঙের ছোঁয়া। তার মনে পড়লো , আহা, গত রাতে কিভাবে এই মনকাড়া চুলের মধ্যে হাত দিয়ে সে বিলি কেটেছিলো।

তাঁর কঠিন অবজ্ঞা পেয়ে অবশেষে টম চলে গেলো। মই বেয়ে ভবনের মধ্য দিয়ে নেমে গেলো রাস্তায়। মহিলার প্রতি ঘৃণা হলো তার। অবজ্ঞার কষ্ট ভোলার জন্য তারপর সে বিস্তর মদ খেয়ে নেশায় বুঁদ হলো। মাতাল হলো।

পরদিন যখন তার ঘুম ভাঙলো তখন আকাশের রঙ ধুসর। সেই ভেজা ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবলো, কি নিষ্ঠুর আকাশটা! আচ্ছা, এটাই নির্ধারিত ছিলো আপনার জন্য, এখন হয়েছে তো? এই উপযুক্ত আবহাওয়া শুধু আপনাকে সুস্থ এবং স্বস্তিতে রাখার জন্যই।

তিনজন মানুষ সকাল সকাল ঠান্ডা সীসার ওপর কাজ করছিলো। চারপাশ স্যাঁতসাঁতে হয়ে আছে। বৃষ্টিভেজা ছাদে কেউ এলো না রোদ্রস্নান করতে। কালো ছাদ বৃষ্টিতে ভিজে আঠা আঠা হয়ে গেছে। ঠান্ডা হয়েছে পরিবেশ। তাড়াতাড়ি কাজ করলে আজকেই তারা কাজ শেষ করতে পারবে।




লেখক পরিচিতি:
ডোরিস লেসিং
আসল নাম, ডোরিস মে টেইলর।
বৃটিশ পিতামাতার সন্তান। জন্মঃ ২২ অক্টোবর, ১৯১৯, ইরানের কারমানশাহে।
মৃত্যুঃ ১৭ নভেম্বর, ২০১৩ সাল

সালসবেরির ডোমিনিকান কনভেন্ট ক্যাথলিক হাই স্কুলে ১৪ বছর পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। শৈশব সুখের ছিলো না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নার্স মেইডের চাকরি নেন। সেখানে তাঁর বস নানা রকম বই দিতেন পড়ার জন্য। তিনি ছিলেন রাক্ষস পাঠক। যা পেতেন তাই পড়ে ফেলতেন। উপন্যাস এবং ছোটগল্প তাঁর বক্তব্যের প্রধান বাহন। বিশ শতকের রাজনৈতিক, সামাজিক জীবন তাঁর লেখায় উপজীব্য। ২০০৭ সালে ডোরিস লেসিং নোবেল পুরস্কার পান। তিনি ১১তম এবং প্রবীনতম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মহিলা। তখন তাঁর বয়স ৮৮ বছর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন