সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ইনেকো সাতা'এর গল্প: রঙহীন ছবিগুলো



অনুবাদ: বেগম জাহান আরা
 
একটা আর্ট মিউজিয়ামের গ্যালারিতে দুটি তেলরঙ ছবির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, নিঃশব্দে। আমার পাশে ছিলো ওয়াই। সেও নিঃশব্দে ছবি দুটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলো আমার পাশে। ওয়াই আমার চেয়ে লম্বা। সে বাম বাহুর নিচে তার হাতব্যাগটা চেপে ধরেছিলো। আর ডান হাত চেপে ধরেছিলো তার ডান গালের ওপর। হাত দিয়ে গাল চেপে ধরার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিলো ভেতরের কোনো অশান্তি লুকিয়ে রাখছে সে। ছবিটা থেকে আমাদের দূরত্ব ছিলো খুব কম। আমরা পরস্পরের মধ্যে কোনোও কথা না বলে দেখছিলাম ছবিটা।

সেদিন উগুইসুদানি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পাথরের লণ্ঠনের পাশ দিয়ে আমরা হাঁটছিলাম। বহু বছর ধরেই এই লণ্ঠনগুলো টোকিও জাতীয় মিউজিয়ামের যাওয়ার পথের ধারে লাইন করে রাখা আছে। আকাশ মোটামুটি মেঘাচ্ছন্ন ছিলো। শরতের একটা ছায়া ছায়া দিন। মিউজিয়ামের সামনে জুনিয়র হাই স্কুলের ছেলেরা লাইন করে দাঁড়িয়ে ছিলো ভেতরে যাওয়ার জন্য। বাইরে এখানে ওখানে কিছু মানুষ মিষ্টি এবং স্যান্ডউইচ বিক্রি করছিলো। গলায় একটা বাক্স ঝুলিয়ে আইসক্রিমের গাড়ি চালাচ্ছিলো একজন মানুষ।
 
গেইটের ভেতরে পিঠে বোঝা নিয়ে দর্শকেরা মিউজিয়ামের সামনের চওড়া প্লাজা অতিক্রম করছিলো। মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে ধিরে ধিরে চলা ফেরা করছিলো তারা। সেখানে ভিড় ছিলো না, ভুলভাল হওয়ারও কোনো উপায় ছিলো না। তা সত্বেও মোটামুটি শোনা যায়, এমন উচ্চস্বরে হাঁকাহাঁকি করছিলো আইসক্রিমওয়ালা। টোকিওর সাধারণ নাগরিকের জন্য রক্ষিত ছোটো একটা শান্ত এলাকায় আমরা ছিলাম। এর পেছনেই উঁচু মিউজিয়ামের বাদামি দালানে প্রবেশ পথের বিশাল পাথরের কলাম দেখা যায়। তারপর প্রশস্ত পাথরের সিঁড়ি। ওয়াই, ওয়াই-এর বোনের স্বামী এবং আমি তাড়াতাড়ি প্রবেশ পথের দিকে গেলাম এবং বেশ দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উঠলাম যেনো কারও সাথে দেখা করার জন্য ছুটছি।
 
সেদিন ছিলো প্রদর্শনির প্রথম দিন, শুধু মাত্র শিল্পীগোষ্ঠীর জন্য। আজকে শুধু নিমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। আমরা প্রথম ঘরে প্রবেশ করলাম। তারপর দ্বিতীয় ঘরে গেলাম। সবগুলো ঘরের ছবিই রঙে পরিপূর্ণ, জীবন্ত, উজ্জ্বল। একটা ঘরে শুধু এবস্ট্রাকট ছবি।
 
সেই এবস্ট্রাক্ট ছবিতে কালো, হলুদ এবং লাল রঙের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, শক্তিশালী রঙগুলো পেইন্টিং-এর ওপর নাচছে। যেনো বিচ্ছুরণ ঘটছে শক্তির । আমি যখন হাঁটছি, তখন দর্শকদের ছাড়িয়ে ছবিগুলোর দিকে মনোনিবেশ করছিলাম। খুঁজছিলাম বিশেষ একজনের আঁকা ছবি। প্রদর্শনীর সমস্ত ছবির মধ্যে তার ছবি খুঁজছিলাম। মনে হয়েছিলো, খুব তাড়াতাড়ি সেই ছবিগুলো নিশ্চিতভাবে পেয়ে যাবো। কোনও চিন্তা ছাড়াই তেমন মনে হয়েছিলো। আমি তন্নতন্ন করে সবগুলো ঘরে খুঁজছিলাম সেই ছবিগুলো।
 
আমি খুঁজছিলাম কে-র ছবিগুলো। বেশ কয়েক বছর আগে কে-র ছবিগুলো আমি এখানে দেখেছিলাম। আসলে আমি কে-র ছবিগুলো দেখেছিলাম একবারই। সেও তো একযুগের বেশি হয়ে গেছে। উনি নিজেই ছবিগুলো দেখাচ্ছিলেন। কী যে অলস আমি, তার প্রমাণ হয়ে যায় তার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে। প্রদর্শনীতে দেখানোর সময় প্রতি বছর মিস্টার কে টোকিওতে আসতে পারতেন না। এখন আমি বুঝতে পারি, হয়তো তিনি টোকিওতে আসার কষ্ট নিতে পারতেন না। এই কারণেই কয়েক বছর আগে আমি যখন তাঁর ছবি দেখতে আসি, তখন ঠিক করেছিলাম, তাঁকে চিঠি লেখবো। তিনি যখন ব্যক্তিগতোভাবে প্রদর্শনীতে আসতে পারছেন না, তখন চিঠিতেই আমার মনোভাব জানিয়ে দেবো। সেটা আর হয়নি।
 
সেই সময় হালকা কালিতে আঁকা দুটো চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ এখানে দেখানো হয়েছিলো। ছবিতে কে'-র নমনীয় চরিত্র এবং তার শিল্পদক্ষতা প্রকাশ পেয়েছিলো। চমৎকার সংযম, পরিচ্ছন্ন এবং নির্মেদ আকর্ষণ ছিলো ছবিগুলোতে। ছবির মধ্যে কে-র ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর বিশেষ ব্যক্তি-বৈশিষ্ট প্রকাশ পেয়েছিলো নিপুণভাবে।
 
কে-র উন্নত নাক এবং ঘনো ভ্রু তাঁর চেহারায় পৌরুষের ছাপ এনে দিয়েছিলো। কিন্তু তিনি যক্ষ্মায় ভুগছিলেন। এই কারণেই তাঁর চোখ উজ্জ্বল এবং আলোকিত মনে হলেও ভেতরে কেমন যেনো ছায়া ছায়া বিষণ্নতা থাকতো। কে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির জন্য পোস্টার আঁকতেন। আমি তখন ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না, ছবিগুলো কি ধরনের পোস্টার হবে? সেই সময়ের আঁকা ছবিতে কে চমৎকার রঙ ব্যবহার করতেন।
 
আজ আমি এসেছিলাম মরণোত্তর কে-র ছবিগুলো দেখতে। কয়েকদিন আগে নাগাসাকি থেকে কে-র শেষ ছবি নিয়ে তার ছোটো ভাই এসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার বন্ধু ওয়াই এসেছিলেন ছবিটা কোথায় কেমন করে রাখা হয়েছে প্রদর্শনীর জন্য, সেটা দেখতে। ওয়াই এন-এর চেয়ে বড়ো এবং তিনি তাঁর ননদ। কিন্তু তিনি কে-র স্ত্রী নন। ওয়াই বিয়ে করেননি। তাঁর ছোটো বোন বিবাহিত, তিনি এন-কে বিয়ে করেছেন। সম্পর্কটা সেদিক থেকে। সুতরাং বৈবাহিক সম্পর্কের সুত্রে তিনি কে-র বোন। কিন্তু বিয়ের আগে থেকেই তিনি কে-র খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাঁর চিত্রকর্মের সমর্থক ছিলেন। ওয়াই একজন চীনা ব্যবসায়ী মহিলা, নাগাসাকিতে থাকতেন। কে অবশ্যই তাঁকে যথেষ্ট নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। আমি তাদের বন্ধুত্ব সম্বন্ধে কিছু জানিও। কে-র মৃত্যুর প্রায় মাস দুই পর তাঁর মরণোত্তর ছবি প্রদর্শনী নিয়ে ওয়াই এবং এন খুবই আবেগাক্রান্ত ছিলেন।
 
প্রচুর রঙ সমাহারে পরিপূর্ণ কয়েকটা ঘর পেরিয়ে অবশেষে আমরা কে-র আঁকা ছবির সামনে দাঁড়ালাম। "আহ! এতক্ষণে পেলাম।" কথাটা বলার পর আর কোনও কথা জোগালো না আমার মুখে। নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকলাম ছবির সামনে। ওয়াই এই ছবিগুলো সম্বন্ধে খুব ভাল করেই জানতো। তবু সে তার হাত এমন ভাবে চেপে ধরলো গালে, যেনো অনুভুতিগুলো মনের ভেতর ধরে রাখতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। বলতে গেলে এই ভঙ্গিতে কষ্টকেই চেপে রাখছে সে।

এত দর্শকের ভিড়ে শুধুমাত্র আমাদের কাছে ছবিগুলো শক্তিশালী এবং জীবন্ত। এগুলোতে কোনও রঙ নেই। শুধু হালকা ধুসর ছায়া ছায়া রঙে আঁকা। দুটোই ল্যান্ডস্কেপ। প্রকৃতির ছবি। স্টাইলের দিক থেকে একটা এবস্ট্রাক্ট, ছবির সামনে কিছু জায়গা রাখা। সেখানে কিছু একটা এসে থামবে। কখনও ট্রেনটা আসে নিশি-অগিকুবো-র দিক থেকে, কখনও আসে কিচিজোজির দিক থেকে। যে ট্র্যাকে আমি দাঁড়িয়ে আছি, ট্রেনটা যখন তার কাছে আসে, তখন উপলব্ধিযোগ্য লম্বালম্বি একটা কম্পন সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারপরই গর্জন করতে করতে পূর্ণ গতিতে ছুটে চলে যায় ট্রেনটা। গতিটা মনে হয় আমাকে শুদ্ধ করে দিয়ে যায়। যে সব মানুষ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের সাথে জীবন চালিত করে, সম্ভবত আমি তাদেরকে হিংসে করি। কিন্তু আমার সামনে যারা এখন দাঁড়িয়ে আছে, তারা অন্য লোকের মানুষ। যাদের গভীর হতাশ দৃষ্টি নিবদ্ধ সেই ট্র্যাকের ওপর। আমার জন্য ট্র্যাকের এই এলাকাটা উপভোগ্য নয়। পৃথিবীর অসুখী দুঃখী মানুষদের ছায়া নিয়ে এলাকাটা ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। চরম হতাশায় বিকৃত অঙ্গভঙ্গি সহ বিকট ভঙ্গিমায় নাচতে থাকে। কিন্তু আমি কেনো এই ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত অস্তিত্বগুলোর সাথে বাস করছি? এখানে কি আমার ছায়াও আছে? আমি এটা বোঝার আগেই কি তারা এই ট্র্যাকে এসে তাড়া করছে আমাকে?
 
একদিন সূর্যাস্তের আগে একটা প্রধান রাস্তা ধরে আমি হাঁটছিলাম, তখন হঠাৎ নীল আকাশ অদ্ভুতভাবে পরিস্কার হয়ে উঠলো এবং কিছুক্ষণের জন্য আকাশের একাংশে নীল আলো চলে গিয়ে ঝিনুকের মতো রঙ ধারণ করলো। আশ্চর্য হয়ে ভাবলাম, শুধু আমার চোখই কি ইচ্ছাকৃত ভাবে এই দৃশ্য দেখেছে? কিন্তু আমার চোখ অচিরেই বুঝতে পারলো যে, এই নীল আলোটা পাতাঝরা নিপাট গাছগুলোর ওপর ঝরে পড়ছে। গাছগুলো লম্বা এবং সরু। মনে হয় কিছু বয়ে যাচ্ছে ওদের ওপর দিয়ে। সবচেয়ে উঁচু এবং চমৎকার আকারের একটা গাছের উঁচুতমো ডালে আমার দৃষ্টি পড়লো। সেখানে বাদামি শুকনো কোঁচকানো একটা পাতা ডাল থেকে বিচ্যুত হয়েছে। পাতাটি ডাল থেকে বিচ্যুত হয়ে পিছলে সরাসরি নিচে গাছের গোড়ায় মাটিতে এসে অন্য মরা পাতার স্তূপে পড়লো। পাতা পড়ার এই গতিটা অন্য কোনও কিছুর গতির সাথে তুলনা করা যায় না। উঁচু থেকে পাতাটার নিচে ঝরে পড়া দেখে আমার মনে হয়েছিলো, সব কিছুই এখানে মাটির সাথে মিশে আছে। এই পৃথিবী থেকে আমার অস্তিত্বও বিলীন হবে একদিন পাতার মতো, কথাটা ভাবতে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম, জানি না।
 
একদিন আমি কান্ডায় বেড়াতে গেলাম। সেই শহরে আগে এক বছর বসবাস করেছি আমি। আমার চোখের সামনেই আলোড়ন সৃষ্টিকারি পরিচিত বইয়ের দোকানে ভরে গিয়েছিলো সেই জেলা। আমি নিশ্চিত, সে জলভারাক্রান্ত চোখে ফিস ফিস করে বলেছিলো, “দেখো, এখানে কোনও রঙই নেই।"
 
কয়েকটা মাত্র শব্দ, কিন্তু আমার কাছে অনেক অনেক কিছু বলে দিলো।
 
কে-র একটা তেল-চিত্র আমার বাড়িতে আছে। সেটাতে চিত্রিত হয়েছে নাগাসাকির পাহাড়ি এলাকা। পরিস্কার আকাশ, চমৎকার গাছের সারির মাঝে পশ্চিমা সভ্যতার স্টাইলে গোলাপি বাড়িগুলো স্পষ্ট। রঙগুলো স্বচ্ছ এবং ঝকঝকে। নাগাসাকির পাহাড়ি এলাকা বিদেশিদের খুব পছন্দ। সেখানেই থাকতে সাধারণত পছন্দ করে তারা। ছবিটার মান এতো ভালো যে মনে হয়, কোনও বিদেশের ছবি। এই ছবিতে রঙের ভিন্ন ভিন্ন কারুকাজকে মনে হয় সঙ্গীতের অনুপম সুরের মতো।
 
কে-র তিনটে সন্তান। এক সময় সে আমাকে বলেছিলো, "অধিকাংশ বাবা মায়ের চেয়ে আমি আমার সন্তানদের বেশি ভালবাসি।
 
তা স্বত্বেও মরণোত্তর এই ছবিগুলোতে তিনি একেবারেই রঙকে অস্বীকার করেছেন। ছবি আঁকার সময় কে বাববার রঙ বদলাতেন। আমার কাছে তো বটেই, ওয়াই এবং এন-এর কাছেও কে-র ছবিগুলো বেশ শক্তিশালী মনে হতো, কারণ সে গুলো রঙহীন। রঙহীন হওয়ার কারণে তাঁর ভেতরের হিংস্র নাটকের সত্যিকার ভাব বোঝা যায়, যেটা তাঁর ভেতরে বাস করে। যেটা তাঁর পবিত্রতাকেই প্রকাশ করে। এটাই কে-র বৈশিষ্ট। ঠগবাজি বা চাতুরি সে করতেই পারতো না। একটাই পথ তার সামনে খোলা থাকতো, সেটা হলো ছবি থেকে রঙ বর্জন করা।
 
গরম কালের এক সকালে ওয়াই তার শারীরিক দুর্বলতার কথা লেখেছিলো আমাকে। একটা সাধারণ উপহারের কথা উল্লেখ করে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলো সে :
 
ঐ সময়টাতে আমি অসুস্থ বোধ করতে থাকি এবং সারা শরীরে ছোটো ছোটো দাগ দেখতে পাই। আমি তখন এ-বম্ব হাসপাতালে গিয়ে উত্তম ভাবে সমস্ত কিছুর পরীক্ষা নিরীক্ষা করাই। তারা আমাকে আনবিক 'বিকিরণের শিকার' হিসেবে সার্টিফিকেট দিলো, কারণ বিকিরণের দিনে আমি ঐ এলাকায় ছিলাম। আমি চিন্তা করতে পারিনি যে, ঐ বোমার বিকিরণে আক্রান্ত হবো এবং ভুগবো। যাই হোক, আমি প্রত্যেকদিন হাসপাতালে যেতাম পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য। আমার স্বাস্থ্য নিয়ে হতাশ হয়েছিলাম ঐ সময়। ফলে, যখনই শরীরে নতুন কোনো লক্ষণ দেখতাম, ব্যস্ত হয়ে পড়তাম আমি এবং শারীরিক অবস্থার পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতাম বেশি করে। সম্প্রতি ফলাফল জানা গেলো যে, আমার চামড়ার ওপর যে দাগগুলো দেখা যায়, তা মারাত্মক নয়। মানে, ম্যালিগন্যান্ট নয়। শরীরের মধ্যে কোনও উপাদানের অভাবের জন্য, বিশেষকরে পেটের সমস্যায় দাগগুলো সৃষ্টি হয়েছে।
 
আমার কাছে চিঠিটা বিস্ময়কর মনে হয়েছিলো। যখনই আমি আমার নিজের শহর নাগাসাকিতে ফিরে আসতাম, আমি কে এবং এন-কে দেখতে যেতাম। তখন প্রায়ই থেকে যেতাম তাদের বাড়িতে। তা সত্বেও আমি যথেষ্ট স্পর্শকাতর থাকতাম এবং ভাবতাম যে, এটম বোমার বিকিরণের সাথে তাদের অসুখের কোনও সম্পর্ক নেই। মনে হয়, আমি ধরেই নিয়েছিলাম, নাগাসাকিতে যখন বোমা পড়েছিলো তখন কোনোক্রমে তারা ঐ এলাকার বাইরে অর্থাৎ বিকিরণের বাইরে ছিলো। একটা সাধারণ চিঠির মাধ্যমে তথ্যগুলো জানার আগ পর্যন্ত আমি ধারণাই করতে পারিনি যে, এমন একটা উতকন্ঠার মধ্যে দিয়ে ওয়াই তার দীর্ঘ দিনগুলো যাপন করে এসেছে। ওয়াই খুব হালকা ভাবে কথাগুলো লেখেছিলো। মনে হয়, সে তার উতকন্ঠাকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো। এখন পর্যন্ত ওয়াই খুব হালকা ভাষায় চিঠি লেখে। চিঠির টোনও খুব সংযত। কিন্তু এই চিঠিটা, যাতে সে ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা জানিয়েছে, তার টোন আলাদা। তখনও আমি ভাবিনি যে, চিঠির সুর বা টোনের সাথে গভীর কোনোও সম্পর্ক আছে এটম বোমার।
 
ওয়াই লেখেছিলো নাগাসাকিতে প্রতিদিন মিছিল হয়। তার বাড়ির পাশ দিয়ে বহুলোক যায়, সে দেখেছে। সে আরও লেখেছে, “ আমার খুব অধৈর্য লাগে, কারণ জাপানে বিদেশি হওয়ার জন্য আমি সেই মিছিলে অংশ নিতে পারি না। তাই আমার অনুভুতিগুলো প্রকাশের বস্তুগতো কোনও উপায় খুঁজে পাই না।" এই চিঠিটা আগেকার চিঠির মতো নয়। সেই সময় 'আমেরিকা-জাপান সিকিওরিটি প্যাক্ট' সংশোধনের প্রতিবাদ আন্দোলন জোরদার চলছিলো। আমার মনে হয়েছিলো, এই পরিস্থিতিতে জাপানে বিদেশি হিসেবে বসবাসের জন্য তার মনে খুব উত্তেজনা এবং অস্থিরতা ছিলো। আমি তার শব্দগুলো খুব যত্ন করে পড়ছিলাম। চিঠিতে লেখা হয়েছিলো:
 
"আজ আবার আমার বন্ধু গিয়েছে সরকারি মিটিং-এ। আমি তাকে হিংসে করি এবং হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ি। পেছনে তাকিয়ে দেখি, বিদেশি হিসেবে আমরা একদা অনেক স্বাধীন ছিলাম। আমাদের ওপর কোনও বাধা নিষেধ ছিলোনা। শৈশব থেকে অচেতনভাবেই যে বোধ আমাদের রক্তে ঢুকে গিয়েছিলো, আমরা এখন সেই অপমানবোধ থেকে মুক্ত। আমাদের চারপাশের সব কিছুর সাথে আমরা মানিয়ে নিয়েছিলাম, এবং একটা সমতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতাম। অতীতে জাপানে বাস করা চীনারা অবশ্যই এমনভাবে চলতো। কতকটা অন্ধভাবেই পরিস্থিতি মেনে নিতো। চারপাশে কি ঘটছে তার দিকে না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে আয় রোজগারের ধান্দায় কাজ করে জীবন নির্বাহ করতো। জাপানে চীনা ব্যবসায়ীদের এর বাইরে তাকাবার কোনও উপায় ছিলো না। কিন্তু যারা এই মিছিলে অংশগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের আমি হিংসে করি। উত্তেজিত বোধ করি আমি আমার পরিবেশ নিয়ে। এবং সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি। এভাবেই কি নিজের মধ্যে আমি একরকম ভাবে আমার অতৃপ্তি এবং প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করি?”
 
চিঠিতে তার মনের গভীর আবেগ এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা আগে কখনও হয়নি। সেই সময় আমি যখন তাকে নাগাসাকিতে দেখেছিলাম, তখন আমার সাথে তার গভীর অন্তরঙ্গ কথা খুব কমই হয়েছিলো। তারপরেও মনে হয়েছে, এই দুরত্ব এটম বোমার কারনে নয়। কারন সে এবং অন্যেরা ঘটনাটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছলো। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, তারা বিকিরণের শিকার। সেদিক থেকে কে-ও ব্যতিক্রম নয়।
 
এর দুই মাস পর অগাস্টের শুরুতে ওয়াই আবার আমাকে চিঠি লিখেছিলো। সেই চিঠিতে জেনেছিলাম, কে হাসপাতালে গেছেন। জুলাই মাসের চিঠিতে জানা গিয়েছিলো, হাসপাতালে যাওয়ার পর তার কষ্টের উপসর্গগুলো কিছু কমেছিলো। চিঠিটা তাড়াতাড়ি লেখা এবং মাঝে মাঝে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং অসম্পূর্ণ। এটা থেকেই আমি বুঝেছিলাম, কে-র অবস্থা গুরুতরো এবং তার জন্য ওয়াই খুব কষ্ট পাচ্ছে। অবশ্যই ওয়াইকে চিঠি লেখার সময় ছিলো আমার। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে টেলিগ্রামে কে-র মৃত্যু সংবাদ পেলাম। মৃত্যুর কারণ, লিভার ক্যান্সার।
 
পরে ওয়াই আমাকে চিঠিতে কে-র অসুখের বিস্তারিত বিবরণ, অসুস্থতা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব কিছুই জানিয়েছিলো। শেষ দিকে তার জন্য প্রস্রাব করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিলো। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও কিছুতেই তলপেটের পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি চিকিৎসকেরা। বুড়োমানুষের মতো হাড্ডি চামড়া সার হয়ে গিয়েছিলো তার দেহ।

মশার আওয়াজের মতো দুর্বল ঘসঘসে ক্ষীণ স্বরে চিঁ চিঁ করে তিনি বলেছিলেন, “আমাকে একগ্লাস পানি দাও।" যখন সে এক টুকরো বরফ তার মুখে দিয়ে সেটা ধরে রাখতে বললো, তখন সে চিবিয়ে ফেললো বরফ। চরম পিপাসা পাচ্ছিলো তার। কতোবার যে সে পানি চেয়েছিলো! এরপর ওয়াই বর্ণনা দিয়েছে, কি দ্রুততার সাথে রোগটা খারাপের দিকে গেছে এবং কেমন করে সে মারা গেছে। দশ পাতার চিঠিতে তার বিপুল বেদনা এবং মর্মস্পর্শী দুঃখের কথা লিখেছিলো সে।
 
একেবারে শেষের দিকে কে একবার আমার প্রসঙ্গ তুলেছিলো। বলেছিলো, “আগামি বছর নাগাসাকিতে 'এন্টি-নিউক্লিয়ার রালিতে' সে আসবে, তাই না?”
 
যখন তারা নাগাসাকিতে পারমানবিক এবং হাইড্রোজেন বোমা নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে বিশ্ব-সভা করতো, আমি গিয়ে সেই সভায় উপস্থিত হতাম। ওয়াই-এর ছোটো কফির দোকানের ওপর তলায় আমি বসতাম। অনেক আগে দোকানের খুব কাছেই আমি থাকতাম। বিস্মিত হই এই কথা ভেবে, মৃত্যুপথযাত্রী কে এই সব কথা মনে রেখেছিলো। আমার জন্য সেই সময়টা ছিলো অবস্মরণীয়।
 
ওয়াই-এর কফি-শপটা ছিলো শহরের ব্যস্ত এবং ঘিঞ্জি এলাকায়। চারপাশের বাড়িগুলো এতো কাছাকাছি চাপাচাপি ভাবে ছিলো যে, দুই বাড়ির মধ্যখানে কোনো জায়গাই থাকতো না বলতে গেলে। ওয়াই-এর বাড়িতে যে কোনও বাথরুম ছিলো না, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু আমি ভাবতাম, ওখানে গেলে আশপাশের এলাকায় পাবলিক বাথরুমে কাজটা সেরে নেবো।
 
যখন আমি কে-র ওখানে গিয়ে পৌঁছুলাম, দেখলাম ওপরতলার খোলা জানালার পাঁশে দাঁড়িয়ে কে কাপড় শুকোচ্ছে। সেই সাথে বাঁশের চিকে কাঁটা ঠুকছে। আমাকে বলা হয়েছিলো, আমার জন্য সে অস্থায়ী বাথরুম বানাচ্ছিলো।
 
সে বলেছিলো, "নাগাসাকিতে এখন বেশ গরম। মিটিং থেকে ফিরে এলে তুমি এখানেই স্নান করতে পারবে। শরীরের ঘাম ধুয়ে নিতে পারবে। সেটাই ভালো হবে না”?
 
কে-র বহুমুখি প্রতিভা কাজে লাগিয়ে সে ছবিও এঁকে ফেললো বাঁশের চিকে যেনো বাইরে থেকে কেউ ভেতরের কিছু দেখতে না পায়। বাঁশের সরু কাঠিগুলো (চিকের পর্দা) দাঁড়িয়ে গেলে সে তার ওপরে নীল প্লাস্টিকের চাদর সেঁটে দিলো। হয়ে গেলো স্নানের জায়গা। নীল প্লাস্টিকের চাদরে তৈরি বাথ-টাবও করা হলো সেখানে। কেউ একজন নিচতলা থেকে কিছুগরম পানি এনে দিলেই স্নানের সব আয়োজন পরিপূর্ণ।
 
আমার মনে আছে, নাগাসাকির লোকেরা প্রতিও সন্ধ্যায় বাথ-টাবে স্নান করে। 'পিএরে লোতি' (Pierre Loti) কথাটা উল্লেখ করেছেন 'মাদাম ক্রিসান্থেমে’-তে (Madame Chrysantheme)। তিনি বলেছেন, কি আশ্চর্যের কথা, একজন বিবস্ত্র মহিলা কেমন করে বাথ-টাব থেকে তাকে সম্ভাষণ জানান! এটা অবশ্যই উল্লেখ করার বিষয়। আমি এই সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছি, তাই নীল প্লাস্টিকের তৈরি বাথ-টাবে বিবস্ত্র হয়ে স্নান করা নিয়ে একটুও ভাবিনি। কফি-শপের পেছনে একটুও জায়গা ছিলোনা যেখানে টাব রাখা যায়। সেই কারনে ওপর তলার জানালা লাগালাগি কাপড় শুকোবার জায়গাতে টাব রাখা হয়েছিলো। এই যা ঘটনা। এটাই কে-র বিবেচনার কাজ। কে সেই রকম মানুষ ছিলেন না যে, ‘এন্টি-নিউক্লিয়ার' মিটিং-এ উপস্থিত থেকে একটা ভাষন দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়াবেন। কিন্তু মিটিং থেকে ফিরে আমি যেনো স্নান করতে পারি, তার জন্য কাপড় শুকোনোর অল্প জায়গায় বাথরুম তৈরি করতে পারেন। আমি জানতাম, শুধু আমার আরামের জন্যই তিনি বাথরুম বানাননি, বরং মিটিং-এ অংশগ্রহনের ইচ্ছেরই একটা বস্তুগত প্রকাশ হিসেবে করেছেন কাজটা।
 
নাগাসাকি শহরের তিনদিকে পাহাড়। শুধু একদিক সমুদ্রের দিকে খোলা। সন্ধের দিকে দমবন্ধ দমবন্ধ লাগতে পারে যখন সমুদ্রের বাতাস বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র তাপ রাস্তায় চেপে বসে। তখন সমস্ত শব্দও স্তব্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন মিটিং থেকে ফেরার পরপরই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি দৌড়ে যাই কাপড় শুকোনর জায়গায়, এবং ঝাঁপিয়ে পড়ি নীল প্লাস্টিকের বাথ-টাবে। হাতাকাটা পোশাক পরলেও ঘামে আমার শরীর ভিজে যেতো। বালতিতে করে নিচে থেকে গরম পানি এনে বাথ-টাবে ঢালার পর আমি বসে যেতাম টাবের মধ্যে। তারপর আমার পিঠ এবং কাঁধ স্পঞ্জ দিয়ে ঘষে ঘষে ধুতাম। হাত বের করলেই আমি কফিশপের পেছনে বাড়ির ওপরতলার জানালা ছুঁতে পারতাম। বাড়িটা এক গলির শেষ মাথায়। যেখানে অনেক মহিলা থাকতো। হয়তো কোনও বারবনিতা পল্লী ছিলো। লোকজন আসার সময় তখনও হয়নি। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে মানুষের ওঠা নামার পদধ্বনি শুনতে পেতাম। আমার প্লাস্টিকের টাবের ওপরে নাগাসাকির সন্ধের আকাশ। সারাটা ছাদজুড়েই আকাশ দেখা যেতো। সাদাটে বিমর্ষ আলো লেগে থাকত অনেকক্ষণ। বস্ত্রহীন অবস্থায় টাবে বসে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লোক জনের আসা যাওয়ার পায়ের শব্দ এবং নিচের রাস্তার গাড়ির হর্ন শুনতাম। কিন্তু রাস্তা থেকে কেউ ছাদের ওপর আমার একার স্নান দেখতে পেতো না।
 
স্নান শেষে টাব থেকে বেরিয়ে আমি ছাদের ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে টাবের পানি ফেলে দিতাম। একবারে পানি ফেলে দিলে পানির তোড়ে পাইপে পানি আটকে যাবে এবং উপচে উঠে পাশের বাড়ির জানালা দিয়ে গড়িয়ে পড়বে পানি। কে এবং অন্যেরা পাশের ঘরে নিজেদের মধ্যে কথা বলতেন, যতোক্ষণ আমি স্নান করতাম। আমার জন্য তাদের বিবেচনা এবং বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব বেশ অনুভব করতে পারতাম। কাপড় কাঁচা এবং শুকোনোর সামান্য জায়গাতে আমার জন্য অস্থায়ী স্নানের ব্যাবস্থা করার বিবেচনাটা তার প্রকৃষ্ট প্রমান।
 
ওয়াই আমাকে বলেছিলো, “ কে তাতামি ম্যাটের (গদি) খোল বদল করেছিলো একাই। সে নিশ্চয় ভেবেছিলো, আমাদের তাতামি ম্যাট খুব নোংরা হয়ে গিয়েছে।"

আমি তার কথা বিশ্বাস করতে পারিনি। "এই ভারি গদি সে একা একা তুলেছিলো?”

খুব স্বাভাবিকভাবে কে বললো,” এটা এমন কি কঠিন কাজ? তুমি শুধু একটা নতুন খোল গদির ওপর রেখে সেলাই করে দাও।"

বললাম, “কি বিরক্তিকর অতিথি হতে যাচ্ছি আমি, তাই না?”

কে বললো, " অন্তত এটুকু তো করতে পারি তোমার জন্য বন্ধু। কতোদুর থেকে তুমি কষ্ট করে মিটিং-এর জন্য আসো।"
 
সুতরাং তাতামি পাতা দুটো ঘরই খোলা থাকে তাদের জন্য। দুটো তাতামিতেই নতুন কভার দেয়া হলো। শেষের রাত্রিতে যখন মিটিং শেষ হয়ে গিয়েছিলো, আমি একটা ঘরে টোকিও-র প্রকাশকের কাছে চিঠি লেখতে বসেছিলাম। সতর্ক ছিলাম, ওয়াই যেনো রাতে ভালোভাবে ঘুমোতে পারে।
 
কে-কে আমি বেশ অনেকদিন থেকে চিনি। যুদ্ধের সময় স্ত্রীসহ টোকিওতে এসে কিছুদিন ছিলো তখন থেকেই আমি চিনি তাকে। ওয়াইকে আমি চিনেছি কে-র মাধ্যমে। নাগাসাকিতে তিন চারবার এসেছিলাম, তখন পরিচয় হয়েছিলো। সব সময় সে ছিলো খুব সংযত এবং গম্ভীর। চিঠিতেই জানিয়েছিলো, জাপানে বাস করা চীনারা চাপের শিকার ছিলো। কিন্তু মিটিং-এর সময় প্রথম তার সাথে কথা বলেই তার জীবন্তপনা বুঝতে পেরেছিলাম। তা আমার মনে গভীর দাগ কেটে আছে। চীনা প্রতিনিধিরা মিটিং-এ উপস্থিত থেকেছেন। সেটা ছিলো এন্টি-বোমা মিটিং-এর আয়োজনকে উৎসাহ দেয়া এবং বোমার বিকিরনে জাপানি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়ার জন্য। ওয়াই সাধারনত কথা কম বলে। কিন্তু চীনা প্রতিনিধিত্বের পালা এলে মুক্ত মনে স্বভাববিরুদ্ধভাবে অনেক কথা বলতো।
 
এই পরিবেশের মধ্যে একদিন ওয়াই প্রথম বলেছিলো সেই দিনের কথা, যেদিন এটম বোমা পড়েছিলো। কথাগুলো ওয়াই বলার পর তার বন্ধু কে-ও একই রকম কথা, মানে সেদিনের কথা বলেছিলো। যখন কে সেই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের কথা বলছিলো, মনে হচ্ছিলো সে ধ্বংসস্তুপের মধ্য দিয়ে সামনা পেছনে পাঁয়চারি করছে।
 
- “তুমি কি এ ভাবেই পাঁয়চারি করেছিলে?” আমি জানতে চেয়েছিলাম।

- হ্যঁ, প্রতিদিন আমি মৃতদেহের মধ্য দিয়ে হেঁটেছি।"
 
এর আগে কোনও দিন সে এই অভিজ্ঞতার কথা বলেনি। অংশত আমিই হয়তো তার জন্য দায়ী। আমি আগ্রহের সাথে কোনওদিন তার কাছে সেইসব দিনের কথা জানতে চাইনি। আমি শুনেওছিলাম যে, কে এবং তার বন্ধুরা বিকিরণের এলাকায় হাঁটাহাঁটি করেছিলো। তা সত্বেও কেমন করে যেনো আমার ধারণা হয়েছিলো, তারা বিকিরণ এলাকার বাইরেই ছিলো। কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কে-র ঘনিষ্ঠতা ছিলো। তাই আমরা কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম নিয়েই বেশি আলাপ আলোচনা করতাম। দুজনেরই আগ্রহের বিষয় ছিলো সেটা। কোনোও এক সময় চারুকলা বিষয়ে কে বিরক্তির সাথে সমালোচনা করেছিলেন। প্রচন্ড দারিদ্রের মধ্য দিয়ে একসময় তাকে দিন কাটাতে হয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন, টোকিও-র শিল্পিরা চমৎকার স্বাচ্ছন্দের সাথে জীবন কাটায়, এটা তাঁর ঠিক পছন্দ হয় না। এই মন্তব্য শুনে মনে হয়েছিলো, কে একটু খুঁতখুঁতেও।
 
একসময় কে বলেছিলো,” তুমি মোটা হয়ে গেছো। পাতলা থাকতেই ভালো ছিলে।" 
 
আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এরমধ্যে শুধু স্বাস্থ সম্পর্কেই বলা হচ্ছে না, কথাটার মধ্যে বেশ অসন্তুষ্টি আছে। মনে হলো, সে যা বলতে চায়, আমি তা বুঝেছি। কিন্তু এর বাইরে কে-র সূক্ষ্ম সংকীর্ণতা এবং নিজেকে পীড়া দেয়া, মানে ধর্ষকামী বিষয় একটা ছিলো। সেটা বুঝেছিলাম আমি। পরেরবার আমাদের যখন আবার দেখা হয়েছিল, কে নিজেই তাঁর এই প্রবণতার কথা বলেছিলেন। সেটা থেকেই আমি তার সংকীর্ণতাকে ভালো এবং প্রশংসনীয় মনে করেছিলাম। তার চারপাশের লোকেরা বলাবলি করতো, অতিমাত্রায় সৎ থেকে নিজের স্ত্রী সন্তানদের প্রতিপালন করার জন্যই কে-র দারিদ্র কখনও ঘোচেনি। এটাই ছিলো তার অসাধারণ পবিত্রতা এবং সততার তুলনারহিত মাপকাঠি।
 
কে বলেছিলো, “আমি জানি, আমি এই রকমই। তবু আমি অন্যদের মতো হতে পারি না।" তাকে দেখে মনে হতো, আশাহতো জীবনের জন্য সে বিব্রত। তার স্ত্রী ছিলো লাজুক ধরনের মহিলা। সম্পূর্ণ স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। তার তিনটে সন্তানও ছিলো খুব চমৎকার।
 
কে এমন ছিলো না। ভিন্নভাবে কাজকর্ম করার মনের জোর হারিয়ে গিয়েছিলো। যখন সে নাগাসাকিতে একা ছিলো, তখন আমার কাছে ছবি পাঠাতো। বেশি দিন আগের কথা নয়, আমাকে বলেছিলো টোকিওতে একটা একক প্রদর্শনীর করার পরিকল্পনা করছে সে। যুবক এবং শিশুদেরকে পেইন্টিং শেখানোতেও সে আনন্দ পেতো।
 
কোনোও সময়েই আমি কে-র রঙহিন ছবি দেখে তার মধ্যে প্রানশক্তির অভাব আছে মনে করিনি। ওয়াই-এর চিঠিতে জেনেছিলাম, তার গুরুতরো অসুখের কথা এবং অদম্য জীবন তৃষ্ণার কথা। ওয়াই বলেছিলো, তাকে বলেছে কে, যখন সে একটু ভালো বোধ করবে, তখন নিজের এলাকায় যাবে সুস্থ হওয়ার জন্য। আহা, ওয়াই জানতো, এমনদিন আর আসবে না কে-র জীবনে। কিন্তু কে সেই আগামি দিনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে বলতো ,” অবশ্যই এটা খুব ভালো হবে, নিজের দেশে ছোট্ট নদী বা ঝর্নার ধারার মধ্যে পা ডুবিয়ে বসে থাকবো।" ওয়াই বলেছিলো, এই স্বপ্নের কথা তার আরো অনেক বন্ধুর কাছে বলেছিলো কে। সে বার বার বলতো, “একটু ভালো হলেই আমি সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য দেশের বাড়ি যাবো।"
 
বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো বলেই যে কে-র পেইন্টিং-থেকে রঙ চলে গিয়েছিলো, তা নয়। আমি গিয়ে কে-র রঙহীন পেইন্টিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে কালো ফিতে দিয়ে বাঁধা ছবিটার দিকে তাকালাম। উপচে ওঠা বুকের ব্যথা চেপে রাখলাম অনেক কষ্টে। যাঁরা কে-র ছবি দেখছেন, তাঁদেরকে আমি কিছু বলতে চাই। দর্শকদেরও কিছু বলতে চাই যাঁরা বিষণ্ন নম্র দৃষ্টিতে কে-র ছবিগুলো দেখছেন এবং চলে যাচ্ছেন। একটা ল্যান্ডস্কেপ-এর ছবিতে মরা গাছগুলো আঁকা হয়েছে ধুসর-সাদা রঙে। ছবিটা বাঁধা আছে কালো ফিতে দিয়ে। তার মানে, মৃত্যু। এই মনোভাব নিয়ে যদি তারা ছবি দেখেন, তাহলে আমি কিছু বলবো তাদের। বলবোঃ "না না এটা ঠিক নয়। কে নিজেও তার আসন্ন মৃত্যু সম্বন্ধে জানতো না।"
 
যে অসুখে তার মৃত্যু হলো, সেটা দ্রুত বাড়ছিলো। ব্যথাও বেশি হচ্ছিলো। সেটা ছিলো লিভার ক্যান্সার। সে শারীরিক ভাবে কৃশ হয়ে যাচ্ছিলো, বলেই তার প্রকাশ ছিলো পেইন্টিং-এ। এটা কি ঠিক বিচার হবে? শিল্পের সাথে, শিল্পীর শারীরিক শক্তির অনিবার্য সম্পর্ককে কালো ফিতের বাঁধন দিয়ে কি বিচার করা যায়?
 
না, বিষয়টা ঠিক তা নয়। জোর দিয়েই কথাটা বলবো আমি। শুধু তাই নয়, আমি আরও কিছু বলতে চাই। কারণ রঙহীন ছবিগুলো এবং ফটোর ওপর শোকের প্রতীক কালো ফিতের বাঁধন যে সাধারণ বার্তা দিচ্ছে, তার বাইরেও কিছু বলার আছে। আমি সেগুলোই বলতে চাই। ব্যাস, আর কিছু না। তবু এটাকে আমি পরিষ্কার ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না। এই ক্ষত, অর্থাৎ ব্যথাটাকে ব্যাখ্যা করতে আমি ভয় পাই। রোগটার নাম লিভার ক্যান্সার। কিন্তু সেই জিনিসটার কি নাম, যা একটা মানুষকে সমস্ত রঙ থেকে বঞ্চিত করে? কি নাম দেয়া যায় তার? কি বলা যেতে পারে তাকে?
 
মনে হয়, ছবিগুলোতে যে ধারণা বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা অন্য এক জগতের ধারণা। তারা অন্য জগতের বাসিন্দা। মনে হয়, তাদেরকে নাকচ করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। এই অবজ্ঞা ধারণাও অঙ্কিত হওয়া উচিত ছিলো, যদিও শিল্পীকে বর্জন করেছে রঙ। সে জন্যই এই প্রদর্শনী নামহীন দুঃখকে প্রদর্শন করেছে। কিন্তু এটাও ঠিক নয় যে দর্শক একগ্যালারি থেকে অন্য গ্যালারিতে শুধু ঘুরবে এবং ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কালো ফিতের বাঁধন দেখে মনে করবে, ছবিগুলোর সব রঙ উঠে গেছে।
 
ওয়াই সবসময় এক কদম আগে চলে। মনে হয় তার শরীর স্বতস্ফুর্তভাবে সামনে ঝুঁকে চলে এবং তাতেই মনে হয় সে এক কদম এগিয়েই থাকে। যেনো তার চারপাশে দেখার কিছুই নেই। তার চোখের দৃষ্টি গভীর এবং চকচকে যা প্রগাঢ় অনুভবকে প্রকাশ করে। ওয়াই নিশ্চয় হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারে, রঙহীন ছবিগুলো কি কথা বলে?
------------
 
মূল গল্প: The Colorless Paintings by Ineko Sata
গল্পটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেনঃ শিলোহ আন শিমুরা


লেখক পরিচিতি:  
ইনেকো সাতা, জন্মঃ ১লা জুন, ১৯০৪, নাগাসাকি, জাপান। মৃত্যুঃ ১২ই অক্টোবর, ১৯৯৮, টোকিও।
দীর্ঘজীবি এই লেখকের শৈশব ছিলো কষ্টের। অবিবাহিত বাবা মার সন্তান ছিলেন। শৈশবেই চলে যান টোকিওতে। প্রথমে ক্যারামেল ফ্যাক্টরিতে কাজ নেন। তারপর একটা রেস্তোঁরায় কাজ করেন। তখনই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। সমাজ এবং বিশ্ব সচেতন এই লেখক ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন, সর্বহারা সাহিত্য আন্দোলন, জাপানি কমিউনিস্ট পার্টি এবং ডেমোক্রাটিক ওমেন্স ক্লাবের সাথে।
 
সাহিত্যকর্মের জন্য পুরস্কার পেয়েছেনঃ ‘কাওয়াবাতা' পুরস্কার, ১৯৭৭; 'আসাহি' পুরস্কার, ১৯৮৩; ‘মিনিচি আর্ট' পুরস্কার, ১৯৮৩। তাঁর বহু রচনা রুশ এবং ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

ছোটো গল্প লেখক এবং অনুবাদক হিসেবে জাপানি এই লেখকের খ্যাতি। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে আনবিক বোমা নিক্ষেপের পরবর্তী সামাজিক এবং সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে তাঁর পর্যাপ্ত লেখা আছে। তাঁর বিখ্যাত অনুবাদ গ্রন্থের নাম, “The Crazzy Iris “ ।


গল্পটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন: 
বেগম জাহান আরা 
ভাষাবিদ। অনুবাদক। গল্পকার


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন