সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

হারুকি মুরাকামির গল্প: নীরবতা

 

ইংরেজি ভাষান্তর: আলফ্রেড বার্নবম
বাংলা অনুবাদ: মোস্তাক শরীফ

অতএব আমি ওজাওয়ার দিকে ফিরে জানতে চাইলাম তর্কবিতর্কের সময় কখনো কাউকে ঘুষি মেরেছে কিনা।

‘এরকম প্রশ্ন মাথায় এলো কেন তোমার?’ চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকাল ওজাওয়া। তার সঙ্গে ঠিক যায় না ওভাবে তাকানোটা। যেন আলো ঝলকে উঠেছে কোথাও এবং কেবল তারই চোখে পড়েছে সেটা। দেখা দিয়েই অবশ্য মিলিয়ে গেল ঝলকটা, ফের নিজের স্বাভাবিক, নির্বিকার মুখভঙ্গিতে ফিরে গেল সে।

কোনো কারণ নেই, জানালাম আমি, স্রেফ হঠাৎ মাথায় আসা একটা চিন্তা। বিশেষ কিছু বোঝাতে চাইনি, সাধারণ কৌতূহল থেকেই জিজ্ঞেস করেছি। হতে পারে একান্তই অনাহুত।

প্রসঙ্গ পাল্টানোর উদ্যোগ নিলাম, যদিও খুব একটা আগ্রহী মনে হলো না ওজাওয়াকে। মনে হলো ভাবনার অন্য কোনো জগতে চলে গেছে। মনের মধ্যে কিছু একটা চেপে বসেছে বা দ্বিধায় ভুগছে। তাকে আলাপচারিতায় আগ্রহী করার আশা ছেড়ে জানালা দিয়ে বাইরের রূপালি রঙের বিমানগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

প্রসঙ্গটা কীভাবে উঠল নিজেও জানি না। ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম দুজন, আচমকাই নিম্নমাধ্যমিকে পড়ার সময় কীভাবে বক্সিংয়ের আখড়ায় যাওয়া শুরু করেছিল সে গল্প ফেঁদে বসল সে। খেলাটায় কয়েকবার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এমনকি এখন, একত্রিশ বছর বয়সেও, ফি হপ্তা শরীরচর্চা কেন্দ্রে যায়। ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হলো আমার। প্রচুর ব্যবসা বাণিজ্য করেছি এ লোকের সঙ্গে মিলে। তাকে ঘুষোঘুষি করার ভূমিকায় কল্পনা করাটা একটু কষ্টকর। স্বভাবেও বেশ চুপচাপ, মুখ দিয়ে কথাই সরে না বলতে গেলে। অবশ্য কাজকর্মের বিচারে তার চেয়ে সোজাসাপ্টা কাউকে পাওয়া কঠিন। আন্তরিকতায়ও নিখুঁত। কাউকে চাপাচাপি করে না কোনো ব্যাপারে, কানকথা লাগায় না, অভিযোগ করে না। যতই কাজের চাপ থাকুক গলার স্বর উঁচু করে না, ভ্রু পর্যন্ত কোঁচকায় না। বলতে গেলে এমন এক লোক যাকে পছন্দ না করে পারা যায় না। আন্তরিক, কারো সাতে পাঁচে নেই, আক্রমণাত্মক বলতে কিছুই নেই তার আচরণে। এ মানুষটির সঙ্গে বক্সিংয়ের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। খোদাই জানে কেন এ খেলাটাকে পছন্দ করতে গেছে। প্রশ্নটাও করেছিলাম এ কারণেই।

নিগাতামুখী আমাদের ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষার ফাঁকে বিমানবন্দরের রেস্তোরাঁয় কফি খাচ্ছিলাম দুজন। নভেম্বরের শুরু, আকাশভর্তি মেঘ। এক নাগাড়ে তুষার পড়ছে নিগাতায়, সব বিমানই দেরি করে ছাড়ছে। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করা মানুষে ভর্তি বিমানবন্দর, ফ্লাইটের দেরি হবার প্রতিটি ঘোষণার সঙ্গে আরেকটু করে বেজার হচ্ছে সবার মুখ। রেস্তোরাঁর ভেতর গরমটা বেশ তীব্র, খানিক পরপরই কপালের ঘাম মুছতে হচ্ছিল রুমালে।

‘সত্যি বলতে কী, না,’ অনেকক্ষণ মুখে তালা মেরে রাখার পর হঠাৎ কথা বলে উঠল ওজাওয়া। ‘বক্সিং শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে ঘুষি মারিনি। খেলাটা শুরু করার পরই কথাটা তোমার মাথায় ঢুকিয়ে দেয় তারা। গ্লাভ পরা না থাকলে রিংয়ের বাইরে কাউকেই আঘাত করবে না বক্সাররা। সাধারণ কোনো মানুষ অন্য কাউকে ঘুষি মেরে বেজায়গায় লাগিয়ে ফেললে ঝামেলায় পড়বে; একই কাজ কোনো বক্সার করলে ভয়ঙ্কর একটা অস্ত্র দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা হবে সেটা।’

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

‘সত্যি বলতে কী, একজনকে আঘাত করেছিলাম একবার,’ ওজাওয়া বলল। ‘ক্লাস এইটে পড়ি তখন। বক্সিং শিখতে শুরু করেছি সবে। অজুহাত দিচ্ছি না, তবে ঘুষোঘুষির একটা কৌশলও রপ্ত করে উঠতোে পারিনি তখনও। শরীরগঠনের হাতেখড়ি নিচ্ছি সবে, দড়ি লাফ, স্ট্রেচিং, দৌড় এসব জিনিস। সত্যি বলতে, ঘুষিটা ছোঁড়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। মেজাজ গরম হয়ে গেল আর হাতটাও আপনা থেকেই ছুটে গেল সামনের দিকে। থামাতে পারলাম না। কিছু বোঝার আগেই মাটিতে পেড়ে ফেললাম তাকে। ঘুষিটা মারার পরও সারা শরীর কাঁপছিল রাগে।’

ওজাওয়ার চাচা বক্সিংয়ের একটা আখড়া চালান, এ খেলায় তার নাম লেখানোর এটাই কারণ। ঘাম ঝরানোর ছোটখাট জায়গা না, বিশাল প্রতিষ্ঠান। ওয়াল্টারওয়েট ওজনশ্রেণিতে পূর্ব এশিয়ার দু’বারের এক চ্যাম্পিয়নের হাতেখড়িও ওখানে। আসলে ওজাওয়ার বাবা মা’ই চেয়েছিলেন ওখানে নাম লেখাক সে। ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তাঁরা, বইয়ে মুখ গুঁজে সারাদিন ঘরের মধ্যে পড়ে থাকত। প্রথম দিকে একবিন্দুও ইচ্ছে ছিল না তার, রাজি হয়েছে চাচার প্রতি ভক্তির কারণে। তাছাড়া, নিজেকে বুঝিয়েছিল, ভালো না লাগলে ছেড়ে দেয়ার সুযোগতো থাকছেই। কাজেই, মোটামুটি দায়সারাভাবেই ট্রেনে এক ঘণ্টার দূরত্বে চাচার আখড়ায় যাওয়া আসা শুরু করল সে।

কয়েক মাস পর বক্সিংয়ের ব্যাপারে নিজের আগ্রহে নিজেই বিস্মিত হলো ওজাওয়া। সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, একলা মানুষের খেলা এটা, একা একাই চর্চা করতে হয়। মনে হলো নতুন একটা ভুবন যেন আবিষ্কার করল, উত্তেজনায় ভরা এক ভুবন। বুড়ো বুড়ো মানুষের শরীর থেকে ছিটকে বের হওয়া ঘাম, দস্তানা পরার আঁটোসাটো আর ক্যাঁচকেচে ভাব, মুহূর্তের নোটিসে বিদ্যুতের ক্ষিপ্রতায় ছুটে যেতে প্রস্তুত পেশিওয়ালা মানুষগুলোর গভীর অভিনিবেশ-এ সবই ধীরে ধীরে দখল করে নিল তার ভাবনার রাজ্য। শনিবার আর রোববারগুলো আখড়ায় কাটানো হয়ে দাঁড়াল তার হাতে গোনা দু-একটি শখের একটি।

‘বক্সিংয়ের যে ব্যাপারটি আমার পছন্দ তা হচ্ছে এর গভীরতা। এটাই আমাকে আকর্ষণ করেছিল বেশি। এর সঙ্গে তুলনা করলে মারা এবং মার খাওয়া কিছুই না। এগুলো স্রেফ ফলাফল-ঠিক যেমন জেতা ও হারা। এই গভীরতার শেষ প্রান্তে পৌঁছুলে দেখবে, হারা কোনো ব্যাপার না, কিছুতেই আর আঘাত পাবে না তুমি। সবচেয়ে বড় কথা, সবসময় জেতা যায় না, কাউকে না কাউকে তো হারতে হবেই। মূল ব্যাপার হচ্ছে জিনিসটার গভীরে যাওয়া। অন্তত আমার কাছে সেটাই বক্সিং। যখন খেলায় নামি মনে হয় কোনো গর্তের একেবারে তলায় চলে গেছি; এতই গভীরে যেখানে কেউ আমাকে দেখে না, আমিও কাউকে দেখি না। অন্ধকারের মধ্যে যুদ্ধ করে যাই। একা। তবে এ একা ‘দুঃখী একা’ নয়। আসলে একাকিত্ব তো নানা ধরনের হয়। একটা হচ্ছে ট্র্যাজিক একাকিত্ব যার যন্ত্রণা তোমার স্নায়ুকে ছিঁড়েখুঁড়ে নেয়। আরেকটি আছে যেটি মোটেই ওরকম নয়, তবে ওখানে পৌঁছুতে হলে শরীরকে কেটেছিঁড়ে ছোট করে নিতে হয়। সে কষ্টটা যদি করতে পারো তাহলে এর জন্য যা যা করেছিলে সবই ফেরত পাবে। বক্সিং থেকে এটাই শিখেছি আমি।’

খানিক চুপ করে থাকল ওজাওয়া। ‘আসলে এ সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই না,’ বলল সে। ‘এমনকি মন থেকেই মুছে ফেলতে চাই গোটা ব্যাপারটা, যদিও কখনোই সম্ভব না সেটা। আচ্ছা, সত্যিই ভুলতে চাই এমন কিছু ভোলা এত কঠিন কেন?’ হাসতে শুরু করল সে। হাতঘড়ির দিকে তাকাল। প্রচুর সময় আছে এখনও। কাজেই ফের শুরু করল বয়ান।

যে লোকটাকে মেরেছিল সে ছিল তার সহপাঠী। নাম আওকি। শুরু থেকেই দু-চোখের বিষ ছিল ওজাওয়ার, কেন সে নিজেও জানে না। কেবল জানে, প্রথম দেখার মুহূর্তটি থেকেই প্রচণ্ড ঘৃণা করত তাকে। জীবনে এই প্রথম ঘৃণা করেছিল কাউকে। ‘এটাতো ঘটেই, তাই না?’ বলল সে। ‘হতে পারে মাত্র একবার, কিন্তু এ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সবাই যায়। কোনো কারণ ছাড়াই কাউকে ঘৃণা করতে শুরু করে। অনর্থক কাউকে ঘৃণা করার বান্দা আমি নই, কিন্তু কসম, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের দেখলেই কী যেন ঘটে যায়। এটা যৌক্তিক নয়, মানি। কিন্তু সমস্যা হল, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তোমার ব্যাপারে ঐ লোকটার অনুভূতিও হয় একইরকম।

আওকি ছিল যাকে বলে আদর্শ ছাত্র। রেজাল্ট ভালো ছিল, ক্লাসরুমে সবার আগে বসত, শিক্ষকদের ধামাধরা, এ সবই। জনপ্রিয়ও ছিল বেশ। স্কুলটা ছিল কেবল ছেলেদের, তারপরও সবাই পছন্দ করত তাকে, কেবল আমি ছাড়া। দু চোখে দেখতে পারতাম না ওকে। ছেলেটার চৌকশ, হিসেবী চালচলন ভাল্লাগতো না। যদি জিজ্ঞেস করো তার কোন ব্যাপারটা অসহ্য লাগত, বলতে পারব না। কেবল বলতে পারব, সে যে কোন ধরনের চিজ তা আমি জানতাম। তার অহংকার, চলাফেরায় অহংকারমাখা যে দুর্গন্ধ, এটাই সহ্য হতো না আমার। গোটা ব্যাপারটাই মনস্তাত্ত্বিক, ঠিক যেভাবে কারো শরীরের দুর্গন্ধকে অসহ্য লাগে। তবে আওকি চালাক ছিল খুব, গন্ধটাকে কীভাবে ঢাকতে হয় জানত। ফলে ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেই মনে করত একেবারে পয়-পরিষ্কার সে, দয়ালু আর বুঝদার। যখনই শুনতাম লোকে বলছে আওকি ভাল, আওকি অমুক-বলছি না কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে আমার-গা’টা জ্বলে উঠতো। প্রায় সব ব্যাপারেই আওকি আর আমি ছিলাম একেবারেই ভিন্ন রকমের। আমি ছিলাম চুপচাপ, ক্লাসে বলতে গেলে চোখেই পড়ত না কারো। একা থাকতে পছন্দ করতাম। হ্যাঁ, বন্ধুবান্ধব আমারও ছিল, তবে গোটা জীবনের জন্য সত্যিকারের বন্ধু যাকে বলে তেমন নয়। হতে পারে অল্প বয়সেই পরিণত হয়ে গিয়েছিলাম বেশি। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাবাজি না করে নিজেকে নিয়েই থাকতাম। হয় বই পড়তাম নয় বাবার ধ্রুপদী সঙ্গীতের রেকর্ডগুলো নিয়ে পড়ে থাকতাম নয়তো বয়স্ক মানুষদের কথাবার্তা শোনার জন্য জিমে যেতাম। দেখতে শুনতেও তেমন কিছু ছিলাম না। পরীক্ষার ফল খুব একটা মন্দ ছিল না, আবার আহামরি কিছুও নয়। শিক্ষকেরা আমার নাম মনে রাখতে পারতেন না। কাজেই বুঝতে পারছ, আমি ছিলাম ঐ ধরনের ছেলে যাদেরকে মানুষ খুব একটা চেনে না। বলতে পার চোখে পড়া যাকে বলে আমার ক্ষেত্রে সেটা কখনোই ঘটেনি। বক্সিংয়ের আখড়া, বই বা রেকর্ডের কথা ক্লাসের কাউকে বলিনি। অন্যদিকে আওকি, যা-ই করুক না কেন, যেন পাঁকের সাগরের মধ্যে সাদা একটা রাজহাঁস। ক্লাসের শিরোমণি, সবাই তার মতামতের দাম দেয়, সব ব্যাপারেই সেরা। এমনকি আমিও সেটা স্বীকার করতাম। ছোঁড়ার উপস্থিত বুদ্ধি ছিল আশ্চর্য রকমের। অন্যেরা কী ভাবছে চট করে বুঝে ফেলত এবং চোখের পলকেই জবাব দাঁড় করিয়ে ফেলত। বলতেই হয়, ঘাড়ের ওপর বসানো মাথাটা ছিল যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য তৈরি।

কাজেই সবাই যে তার ব্যাপারে মুগ্ধ ছিল তাতে অবাক হবার কিছু নেই। সবাই, আমি ছাড়া।

‘আমার ধারণা, ওর সম্বন্ধে আমার মনোভাব ঠিকই বুঝতে পারত আওকি। বোকা ছিল না সে। আমাকে যে পছন্দ করত না বেশ বোঝা যেত। অন্তত এটা না বোঝার মতো বোকা আমি ছিলাম না। অন্য কারো চেয়ে বই কিন্তু আমিই বেশি পড়তাম। বয়স যেহেতু কম ছিল, এটা বোঝানোর একটা তাড়নাও ছিল। ফলে, আমি নিশ্চিত, আমাকে নাক উঁচু ভাবত অনেকে। হয়ত ভাবত অন্যদের ছোট করে দেখছি। যেভাবে নিজেকে নিয়ে থাকতাম সেটাও এ ভাবনার জন্য দায়ী হতে পারে।

একদিনের কথা: ক্লাস-টাস শেষ হয়ে আসছে, এমন সময় একটা ইংরেজি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পেলাম। হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না সেটা। কী একটা জিনিস যেন খুব করে চাইছিলাম-কী সেটা এখন আর মনে নেই-বাবা মা-র সঙ্গে চুক্তিতে এলাম, ক্লাসে সবার চেয়ে ভালো ফল করলে আমাকে কিনে দেয়া হবে সেটা। ফলে পাগলের মতো পড়ালেখা করেছিলাম। পরীক্ষায় যা যা আসতে পারে পড়ে ফেলেছিলাম সব। হাতে সময় থাকলেই ক্রিয়ার ধাতুরূপ পড়তাম; গোটা পাঠ্যবইটা বলতে গেলে মুখস্থই করে ফেলেছিলাম। ফলে পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়াটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। বলা যায় জানতামই যে পাবো।

অন্য সবাই অবশ্য খুব অবাক, এমনকি শিক্ষকেরাও। আর আওকি, কী বলব, রীতিমতো হতভম্ব। ইংরেজিতে বরাবরই সেরা ছাত্র সে। ক্লাসে ফল ঘোষণার সময় স্যার রীতিমতো টিটকারি মারলেন তাকে। মুখটা লাল হয়ে গেল তার, হয়তো ভেবেছিল সবাই হাসাহাসি করছে ওকে নিয়ে।

কয়েকদিন পর একজনের কাছে শুনলাম আওকি নাকি আমার নামে গুজব ছড়াচ্ছে। আমি নাকি তার কাছ থেকে দেখে লিখেছি, নইলে এত নম্বর কীভাবে পেলাম? কথাটা কানে আসতেই মেজাজ গরম হয়ে গেল। উচিত ছিল হেসে উড়িয়ে দেয়া, কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিকে পড়া ছেলেরা অত ঠান্ডা মাথার হয় না।

এক দুপুরে ক্লাসের বিরতিতে আওকির মুখোমুখি হলাম। বললাম তার সঙ্গে একা একটু কথা বলতে চাই, সবার কাছ থেকে দূরে কোনো জায়গায়। তারপর বললাম, গুজবটা আমি শুনেছি, ঘটনাটা কী জানতে চাই। কিন্তু আওকি যা দেখাল সেটি হচ্ছে অবজ্ঞা। ভাবখানা, এত খেপার কী আছে? ফাঁকতালে ইংরেজিতে বেশি নম্বর না হয় পেয়েই গেছি, এ নিয়ে এত লুকোচুরির কী আছে এখন, আর অমন হামবড়া ভাব দেখানোর অধিকারই বা আমাকে কে দিয়েছে? আসলে কী ঘটেছে তা তো সবাই জানে, তাই না?

তারপর ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল আমাকে। হয়তো ভেবেছিল শরীর-স্বাস্থ্য যেহেতু ভালো, আর আমার চেয়ে লম্বা সেহেতু শক্তির বিচারেও সে এগিয়ে। ঠিক তখনই সপাটে একটা ঘুষি বসিয়ে দিলাম বদমাশটার মুখে। আমার শরীর যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করে ফেলল কাজটা। সে কাত হয়ে পড়ে পাশের দেয়ালে মাথা ঠুকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত খেয়াল করিনি ঘুষিটা বসিয়েছি বাম গালের মাঝ বরাবর। আওকির মাথা সজোরে ঠুকে গেল দেয়ালে, নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে সাদা শার্টটা ভিজিয়ে দিল। হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে রইল সে, যেন কী ঘটেছে বুঝতে পারছে না। ওদিকে তার চিবুকের হাড়ের সঙ্গে হাতের প্রথম ছোঁয়া লাগতেই আফসোস করতে শুরু করেছি আমি। উচিত হয়নি কাজটা করা। খারাপ লাগছিল খুব, বেহুদা একটা কাজ; আবার এটাও ঠিক, রাগে গা কাঁপছিল তখনও, যদিও কাজটা যে নিছক গর্দভের মতো হয়েছে তাও বিলক্ষণ বুঝতে পারছিলাম।

ভাবলাম আওকির কাছে ক্ষমা চাইব, চাইলাম না। সে ছাড়া অন্য কেউ হলে হয়তো চাইতাম। কিন্তু এই জঘন্য ছেলেটার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ভাবতেই পারলাম না। তাকে আঘাত করার জন্য খারাপ লাগছিল, কিন্তু ‘আমি দুঃখিত’ বলার মতো যথেষ্ট জোরালো ছিল না অনুভূতিটি। ছোকরার প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও বোধ করছিলাম না। ঘুষিই খাওয়া উচিত তার মতো শয়তানের। একটা কীট সে, আর কীটদের পা দিয়ে মাড়াতে হয়। যাই হোক, তাকে আঘাত করা উচিত হয়নি-এ সত্যটা স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করছিলাম, যদিও দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। তাকে ওভাবে ফেলে রেখেই চলে গেলাম।

সেদিন দুপুরের পর ক্লাসে এল না আওকি। হয়ত সোজা বাড়ি চলে গেছে, ভাবলাম। বাকি সারাটা দিন বাজে একটা অনুভূতি কুরে কুরে খেলো আমাকে। এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি পেলাম না। গান শুনতে পারলাম না, পড়তে পারলাম না, উপভোগ করতে পারলাম না কিছুই। ঘন আর ভারি কিছু একটা যেন জমাট বাঁধছে পেটের মধ্যে, এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দিল না-যেন আঠালো কিছু একটা গিলে ফেলেছি। হাতের মুঠোর দিকে তাকিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলাম বিছানায়। একসময় বুঝতে পারলাম কত একা আমি। আওকির কারণেই যে এটা বুঝতে পারলাম এ উপলব্ধিটা তার প্রতি ঘৃণা আরো বাড়িয়ে দিল।

পরদিন থেকেই আমাকে উপেক্ষা করতে শুরু করল আওকি। ভাবখানা, আমার অস্তিত্বই নেই। পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া অব্যাহত রাখল সে। আমিও আর কখনোই কোনো পরীক্ষার জন্য জান লড়িয়ে দিইনি। এর ফায়দা যে কী সেটাই মাথায় ঢুকত না। জানপ্রাণ দিয়ে কারো সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারটাই একঘেয়ে লাগত আমার কাছে। পাশ করার জন্য যা দরকার ঠিক সেটুকুই পড়তাম, বাকি সময়টা কাটাতাম নিজের মতো করে। তখনও নিম্ন মাধ্যমিকে পড়ি, বয়সে কম হলেও শারীরিক কসরতের ফলটা সহজেই চোখে পড়তে লাগল। কাঁধ চওড়া হচ্ছিল, ফুলে উঠছিল বুকের ছাতি। বাহু শক্তপোক্ত, চিবুক টানটান। মনে হল, প্রাপ্তবয়স্ক হবার অনুভূতিটা হয়তো এমনই। বেশ ভালো বোধ করতে লাগলাম। প্রতি রাতে বাথরুমের বড় আয়নাটার সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়াতাম। নিজের শরীর নিয়ে এতটা মুগ্ধ ছিলাম নিজেই।

পরের বছর আওকি আর আমি পড়ে গেলাম ভিন্ন ক্লাসে। প্রতিদিন তাকে দেখতে না হওয়ায় শান্তি পেলাম বেশ। আমি নিশ্চিত, আওকির দিক থেকেও অনুভূতিটা একইরকম ছিল। গোটা ব্যাপারটা তাই খারাপ কোনো স্মৃতির মতো মিলিয়ে যাবে এটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু এত সহজভাবে ঘটল না সব। পরে বুঝেছি, প্রতিশোধ নেয়ার জন্য চুপচাপ অপেক্ষা করছিল আওকি, অপেক্ষা করছিল আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে দেয়ার সঠিক সময়টির জন্য। বেজন্মাটার শরীরভর্তি ঘৃণা।

একের পর এক ক্লাস পার হতে লাগলাম দুজন। সেই একই বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক, তারপর মাধ্যমিক, তবে প্রতি বছরই দুজনের জায়গা হলো ভিন্ন ভিন্ন ক্লাসে, একমাত্র শেষ বছরটি ছাড়া। ওহ, ক্লাসের মধ্যে ফের তার মুখোমুখি হওয়াটা কী জঘন্য যে লেগেছিল! ব্যাটা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, মনে হলো আমার পেট ফাঁক হয়ে গেছে আর পেট থেকে সেই ময়লা থিকথিকে জিনিসটা বেরিয়ে আসছে।’

ঠোট মুচড়ে নিজের কফির কাপের দিকে তাকিয়ে রইল ওজাওয়া। তারপর মুখে মৃদু হাসি নিয়ে তাকাল আমার দিকে। বাইরে মোটা কাচের জানালার ওপারে জেট ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেল। একটা ৭৩৭ বিমান কাঠের গোঁজের মতো মেঘ ফুঁড়ে আকাশে উঠে একসময় হারিয়ে গেল দৃষ্টিসীমা থেকে।

‘প্রথম সেমিস্টারটা বৈচিত্র্যহীনভাবে কেটে গেল। ক্লাস এইট থেকে বিন্দুমাত্রও বদলায়নি আওকি। কিছু মানুষ আছে, যাদের উন্নতি হয় না, অবনতিও হয় না। থেকে যায় ঠিক যেমন ছিল তেমন। তখনও ক্লাসের সেরা ছাত্র সে, জনপ্রিয়তায়ও এক নম্বর। যদিও আমার কাছে তখনও ঘিনঘিনে একটা জীব সে। একজনের দিকে যাতে আরেকজনের দৃষ্টি না পড়ে তার সব চেষ্টাই করতাম। বুঝতেই পারো, তোমার ব্যক্তিগত অপদানবের সঙ্গে একই ক্লাসরুমে থাকাটা মজার কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু করার ছিল না কিছু। অন্তত অর্ধেক দায় তো আমারই!

অবশেষে গ্রীষ্মের ছুটি এলো। হাইস্কুলের ছাত্র হিসেবে শেষ গ্রীষ্মকালীন ছুটি। ফল খারাপ ছিল না আমার, গড়পড়তা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য যথেষ্ট। কাজেই ভর্তি পরীক্ষার জন্য একেবারে জানপ্রাণ দিয়ে লাগিনি। বাবা মা’ও সেভাবে পেছনে লাগেননি, ফলে সবসময় যেভাবে পড়ালেখা করি সেভাবেই পড়তাম। শনিবার আর রোববারে যেতাম জিমে। বাকি সময়টা কাটত পড়াশোনা আর গান নিয়ে।

ওদিকে পড়তে পড়তে বাকি সবার একেবারে জান কাবার। নিম্ন মাধ্যমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত-গোটা স্কুল যেন মুখস্থ করার এক কারখানা। এর আগে কোন ছাত্র কতগুলো ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রিসহ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, সেটা র‌্যাংকিংয়ের কয় নম্বরে এসব ছাড়া শিক্ষকদেরও যেন বলার মতো আর কিছু ছিল না। ছাত্রদেরও না। মাধ্যমিকের শেষে পৌঁছে সবাই যেন স্নায়ুচাপে ভুগছিল। ক্লাসের পরিবেশ ছিল উত্তেজনায় ভরা। সেটাও এতই তীব্র যে রীতিমতো তার গন্ধ ভেসে বেড়াত চারদিকে। স্কুলে প্রথম ভর্তির সময় পছন্দ হয়নি ব্যাপারটা, ছ’ বছর কেটে যাওয়ার পরও না। এতদিনেও সত্যিকারের একজন বন্ধু বানাতে না পারার ব্যর্থতা তো আছেই। বক্সিং না শিখলে আর চাচার জিমে না গেলে একাকিত্বটা আরো মারাত্মক হয়ে উঠতো সন্দেহ নেই।

যাই হোক, গ্রীষ্মের ছুটিতে ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটলো। মাতসুমোতো নামে আমাদের এক সহপাঠী আত্মহত্যা করলো। ছাত্র হিসেবে তেমন ভালো ছিল না। বলতে কি, নজরে পড়ার মতো কিছুই ছিল না। যখন শুনলাম মারা গেছে, চেহারাটাও ঠিকমত মনে করতে পারিনি। আমার ক্লাসেরই ছিল, তবে দুই কি তিনবারের বেশি কথা হয়নি। ঢ্যাঙা আর হালকা পাতলা, ফ্যাকাসে গায়ের রঙ-এর বেশি কিছু মনে পড়ল না তার সম্বন্ধে। মনে পড়ে, আগস্টের পনেরো তারিখের কয়েকদিন আগে মারা গিয়েছিল সে, কারণ তার অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া হয়েছিল আর্মিস্টিস দিবসে (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতি চুক্তির দিবস)। খুব গরম পড়ছিল সেদিন। হঠাৎ ফোন এলো একটা। আমাদের বলা হলো, একটা ছেলে মারা গেছে, সবাইকে তার শেষকৃত্যে যোগ দিতে হবে। ক্লাসের সবাইকে। পাতালট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়েছিল মাতসুমোতো, কে জানে কেন। একটা চিরকুট রেখে গিয়েছিল, যাতে জানিয়েছিল আর স্কুলে যেতে চায় না সে। ব্যস, এর বেশি কিছু না। অন্তত এরকমটাই শুনেছি। স্বভাবতই, আত্মহত্যার ঘটনাটি স্কুলের প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর সিনিয়র ছাত্রদের স্কুলে ডেকে লম্বা বক্তৃতা দিয়েছিলেন হেডমাস্টার, মাতসুমোতোর মৃত্যুতে কীভাবে শোক প্রকাশ করতে হবে, তার এই মৃত্যুর ভার কীভাবে আমাদের সবাইকে বহন করতে হবে, বেশি বেশি পরিশ্রম করে এই শোককে চাপা দিতে হবে এসব। তারপর আমাদের জিজ্ঞেস করা হলো মাতসুমোতো কেন আত্মহত্যা করলো সে সম্বন্ধে কেউ কিছু জানি কিনা। যদি জানি তাহলে তক্ষুনি জানাতে হবে যাতে কারো অজানা কিছু না থাকে। একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না কেউ।

মৃত সহপাঠীর জন্য খারাপ লাগছিল, আবার কেমন অদ্ভুতও লাগছিল ব্যাপারটা। ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিতে হবে কেন? স্কুল ভালো না লাগলে স্কুলে যেও না। মাসছয়েক অপেক্ষা করলেইতো আর কখনও যেতে হতো না জঘন্য স্কুলটাতে। এজন্য নিজেকে শেষ করে দিতে হবে? কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হতে পারে স্নায়ুরোগে ভুগছিল ছেলেটা, প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য দিনরাত ঘাড় গুঁজে পাতার পর পাতা মুখস্থ করাই হয়তো সহ্যের শেষ সীমায় নিয়ে গিয়েছিল। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে ব্যাপারটাকে অদ্ভুত মনে হয় না আর। কারো না কারো ক্ষেত্রে এটি ঘটারই কথা।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষে স্কুল ফের শুরু হবার পর কেমন একটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম। মনে হলো আমার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলছে সহপাঠীরা। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে শীতল, কাটকাট উত্তর আসত। প্রথমে মনে হয়েছিল স্নায়ুচাপের কারণে ঘটছে, যেহেতু সহ্যের শেষ সীমায় আছে সবাই। খুব একটা পাত্তা দিইনি। কিন্তু দিনপাঁচেক পর হঠাৎ করেই হেডমাস্টারের ঘরে ডাক পড়ল।

এটা কি সত্যি, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি জিমে বক্সিং শিখছি? হ্যাঁ, আমি বললাম, কিন্তু এর মাধ্যমে স্কুলের কোনো নিয়মতো ভাঙিনি। কতদিন ধরে যাচ্ছি ওখানে? অষ্টম শ্রেণি থেকে। এটা কি ঠিক যে নিম্ন মাধ্যমিকে থাকতে একবার আওকিকে ঘুষি মেরেছিলাম? হ্যাঁ, মেরেছি। মিথ্যা বলার কারণ ছিল না। এ ঘটনাটা কি বক্সিং শেখার আগে না পরে? পরে, তবে তখনও বক্সিং-এর গ্লাভ পরারও অনুমতি পাইনি, বললাম। আমার ব্যাখ্যা ভদ্রলোকের কানে গেল বলে মনে হল না। গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমি কখনও মাতসুমোতাকে মেরেছি কিনা। হতভম্ব হয়ে গেলাম। আগেই বলেছি তার সঙ্গে ঠিকমতো কথাই হয়নি কখনও, মারতে যাব কেন? এ কথাটাই বললাম হেডমাস্টারকে।

নিয়মিতভাবে স্কুলে মার খেত মাতসুমোতো, হেডমাস্টার জানালেন। নানারকম ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বাড়িতে ফিরত। তার মা অভিযোগ করেছিলেন কেউ একজন স্কুলে, হাতখরচের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য মারপিট করত তাকে। তবে মাকে কখনোই কোনো নাম বলেনি মাতসুমোতো। হতে পারে সে ভেবেছিল নাম বললে মারধরের মাত্রাও বাড়বে। এবং এভাবেই চাপ বাড়তে বাড়তে একসময় আত্মহত্যা করেছে ছেলেটা। ব্যাপারটা কি খুব দুঃখজনক নয়, হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন আমাকে, যে কারো কাছে কিচ্ছুটি বলার উপায় ছিল না বেচারার? প্রচণ্ড অবিচারের শিকার হয়েছে সে, কাজেই এর একটা হিল্লে করতে চাইছে স্কুল। এ বিষয়ে কিছু বলার থাকলে যেন এখনই স্বীকার করি আমি, সেক্ষেত্রে চুপচাপ সুরাহা করে ফেলা হবে বিষয়টার। তা নাহলে তদন্তের ভার চলে যাবে পুলিশের হাতে। ব্যাপারটা কি আমি বুঝতে পারছি?

সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেললাম, আওকি আছে এর পেছনে। তার হাতের ছোঁয়া টের পেলাম গোটা ব্যাপারটায়। নিজের সুবিধার জন্য মাতসুমোতোর মৃত্যুকে ব্যবহার করার মতো কাজ তার পক্ষেই সম্ভব। বাজি ধরতে পারি, এমনকি মিথ্যাও বলেনি সে। বলার দরকারই ছিল না। আমি বক্সিংয়ের জিমে যাই, এটা জেনেছে-খোদাই জানেন কীভাবে! তারপর যখন শুনল কেউ একজন মাতসুমোতোকে পেটাচ্ছে, বাকিটা তো পানির মতো সহজ। একের সঙ্গে কেবল এক যোগ করা। স্রেফ জায়গামতো জানিয়ে দাও আমি জিমে যাই এবং একদিন ওকে পিটিয়েছি। এর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। হ্যাঁ, এখানে ওখানে আরো দু-একটা কথা যোগ করতে হয়েছে, যেমন, ধরা যাক, আমার ভয়ে কীভাবে সিঁটিয়ে থাকত সে, এ কারণে কাউকে কক্ষনো এসব জানায়নি, বা মেরে কীভাবে ওর রক্ত বের করে দিয়েছিলাম ইত্যাদি। এর কোনোটাকেই মিথ্যা প্রমাণ করা যাবে না। বেশ সতর্ক থেকেছে সে এ বিষয়ে। সরল সত্যের মধ্যে সামান্য একটু রঙ চড়ানো এবং তার মধ্যেই এমন একটা তাৎপর্য সৃষ্টি করা যা অস্বীকার করা আমার পক্ষে অসম্ভব। এক বিশেষ দক্ষতাই বলতে হবে এটাকে, নিয়মিত যার চর্চা করে সে।

চোখ গরম করে আমার দিকে তাকালেন হেডমাস্টার, তাঁর দৃষ্টিতেই লেখা-তুমি অপরাধী। যে ছেলে বক্সিং শেখার জিমে যায় তাঁর চোখে ইতোমধ্যেই দুষ্কৃতকারী হিসেবে সন্দেহভাজন সে। তাছাড়া শিক্ষকদের পছন্দের ছাত্রও ছিলাম না আমি। তিনদিন পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাকে নিয়ে গেল পুলিশ। বলাই বাহুল্য, অধিক শোকে আমি তখন পাথর। সাদামাটা একটা পুলিশী তদন্তের মুখোমুখি হতে হলো। পুলিশদের জানালাম, মাতসুমোতোর সঙ্গে বলতে গেলে কখনো কথাই বলিনি। এটা ঠিক যে আওকি নামে এক সহপাঠীকে ঘুষি মেরেছিলাম বছর তিনেক আগে, কিন্তু সেটা ছিল একেবারেই তুচ্ছ, সাধারণ একটা তর্কবিতর্কের ঘটনা। এরপর আর কোনো ঝামেলা ঘটেনি আমার দ্বারা। গুজব আছে তুমি মাতসুমোতোকে মারপিট করতে, ডিউটি অফিসার জিজ্ঞেস করল। হ্যাঁ, গুজবই এটা, আমি বললাম। আমাকে পছন্দ করে না এমন কেউ ছড়াচ্ছে এটা। কোনো সত্য নেই এর মধ্যে, প্রমাণ নেই কোনো, কাজেই তদন্ত করার মতোও কিছু নেই।

পুলিশের আমাকে জেরা করার কথাটা সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়লে। ক্লাসের পরিবেশ হয়ে গেল আরো শীতল। পুলিশী তলব তো বিচারের রায়ের মতোই, বিনা কারণে মানুষকে ধরে নিয়ে যায় না তারা, তাই না? সবাই বিশ্বাস করেছিল মাতসুমোতোকে মারধর করতাম আমি। কে জানে কী সব আজেবাজে গালগল্প ছড়িয়েছিল আওকি, তবে বিনা প্রশ্নে সবাই গিলেছিল সেটা। গল্পটা কী এমনকি সেটা শুনতেও চাইনি আমি। জানতাম নোংরা কিছু হবে। স্কুলের একটু মানুষও কথা বলত না আমার সঙ্গে। যেন ঐকমত্যের ভিত্তিতে নীরবে শাস্তি দেয়া হলো আমাকে। কোনো ব্যাপারে এমনকি জরুরি অনুরোধ করেও ফল পেতাম না। প্লেগের মতোই সবাই এড়িয়ে চলত আমাকে। আমার অস্তিত্বকেই যেন মুছে ফেলেছিল তাদের দৃষ্টিসীমা থেকে। এমনকি শিক্ষকেরাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন আমার দিকে না তাকাতে। ক্লাসে নাম ডাকার সময় নামটা ডাকতেন বটে, তবে আর কিছু কখনোই বলা হতো না আমাকে। সবচেয়ে জঘন্য ছিল শারীরিক শিক্ষার ক্লাস। ছাত্রদের যখন দুই দলে ভাগ করা হতো, কোনো দলেই জায়গা হতে না আমার। কেউ আমার সঙ্গে জুটি বাঁধত না এবং শরীরচর্চার শিক্ষক এমন ভান করতেন যেন ব্যাপারটা ঘটছে না।

নীরবে স্কুলে যেতাম, নীরবে ক্লাস করতাম, নীরবেই ফিরে আসতাম বাড়িতে। দিনের পর দিন। খাঁ খাঁ একটা শূন্যতা চারদিকে। দু’ তিন হপ্তা এভাবে কাটার পর ক্ষুধামন্দা দেখা দিল। কমতে লাগল ওজন। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। স্নায়ু টানটান করে বিছানায় শুয়ে থাকতাম, জঘন্য সব টুকরো ছবির অন্তহীন এক মিছিলে ঠাসা থাকত মাথাটা। জেগে থাকলেও পুরো সময়টা কুয়াশার সাগরে ডুবে থাকত মন। জেগে আছি নাকি ঘুমিয়ে তাও বুঝতে পারতাম না।

এমনকি বক্সিং প্র্যাকটিসও বাদ দিয়ে দিলাম। বাবা মা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন, সমস্যা কী, জানতে চাইলেন তারা। বললাম, কিছু না, স্রেফ ক্লান্ত। কী লাভ ওঁদের বলে! স্কুল থেকে ফিরে নিজের ঘরে লুকিয়ে থাকতাম। করার কিছু ছিল না ওটা ছাড়া। চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে সিনেমার মতো নানা ঘটনা ঘটতে ঘটতাম। কল্পনা করতাম অদ্ভুত সব দৃশ্য। প্রায়ই দেখতাম, মনের সাধ মিটিয়ে ঘুষি মারছি আওকিকে। সে একা এমন সময় পাকড়াও করতাম তাকে, তারপর সমানে দুরমুশ করতাম। আমার চোখে সে কী সেটা বলতাম-একটুকরো আবর্জনা-তারপর পিটিয়ে বাপের নাম ভোলাতাম। সমানে চিৎকার আর কান্নাকাটি করত সে-মাফ করে দাও, মাফ করে দাও-কিন্তু আমি কেবল পিটিয়েই যেতাম, মুখের চেহারা পাল্টে দিতাম মেরে। পেটাতে পেটাতে অসুস্থ হয়ে উঠতাম আমি। প্রথম দিকে ভালোই ছিল ব্যাপারটা, উচিত শিক্ষা হতো হারামিটার। তারপর, ধীরে ধীরে একটা বিবমিষা চাগিয়ে উঠতো আমার মনের মধ্যে, যদিও আওকিকে পেটানো বন্ধ করতে পারতাম না। ছাদের দিকে তাকালেই তার চেহারাটা ভেসে উঠতো, ঘুষি মারতে শুরু করতাম। চাইলেও থামতে পারতাম না। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে উঠতো তার মুখ, বমি করতে ইচ্ছে হতো আমার।

ইচ্ছে হতো সবার সামনে গিয়ে বলি, আমি নির্দোষ, কোনো অপরাধ করিনি। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে? আর আমারই কি ঠেকা পড়েছে ঐ উজবুকগুলোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার যারা আওকির মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা কথা বিনাবাক্যব্যয়ে গেলে?

ফলে করার ছিল না কিছুই। আওকিকে তার প্রাপ্য মারটা দিতে পারিনি, আবার কাউকে নিজের কথাও বুঝিয়ে বলতে পারিনি। স্রেফ মুখ বন্ধ করে গিলে ফেলতে হলো সব কিছু। মাত্র তো ছ’টা মাস আর। এ সেমিস্টারের পর ক্লাস শেষ হয়ে যাবে এবং কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না আর। নীরবতার সঙ্গে আমার লড়াই চলবে আর মাত্র ছ’টা মাস। কিন্তু ততদিন কি টিকে থাকতে পারব? এমনকি একমাসও টিকতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না। বাড়িতে বসে ক্যালেন্ডারের প্রতিটা দিনে টিক দিতাম-আরেকটা দিন গেল, আরেকটা গেল। যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, চূড়ান্ত সর্বনাশের কত কাছে চলে গিয়েছিলাম ভাবতেই অবিশ্বাস্য লাগে।

ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম ইঙ্গিতটা পেলাম মাসখানেক বাদে। নেহাতই দৈবক্রমে, স্কুলে যাওয়ার সময় ট্রেনে মুখোমুখি হয়ে গেলাম আওকির। প্রতিদিন যেমন হয়, ট্রেনে এত ভিড় ছিল যে নড়াচড়া করতেও কষ্ট হচ্ছিল। আর তখনই আমার দিকে মুখ ফেরানো অবস্থায় দেখলাম আওকিকে, দু’তিনজন আরোহীর ওপাশে। ঘুমের অভাবে, স্নায়ুচাপে বিপর্যস্ত চেহারায় নিশ্চয়ই জঘন্য দেখাচ্ছিল আমাকে। প্রথমেই তার সেই বাঁকা হাসিটা হাসল আওকি। ভাবখানা, কেমন যাচ্ছে দিনকাল, য়্যাঁ?

সে যে সবকিছুর পেছনে এটা যে আমি জানি তা আওকিকে জানানোর দরকার ছিল। চোখে চোখ আটকে গেল, একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম চোখ গরম করে। কিন্তু সে অবস্থাতেই হঠাৎ অদ্ভুত একটা আবেগ অনুভব করলাম। আওকির ওপর ভীষণ রাগ আমার, সন্দেহ নেই। ঘৃণা করি ওকে, ইচ্ছে হয় খুন করে ফেলি। কিন্তু ট্রেনের মধ্যেই হঠাৎ করুণার মতো একটা অনুভূতি জাগল আমার ওর প্রতি। মনে হলো, আচ্ছা এই ভাঁড়টার দৌড় তাহলে এতদূরই? নিজেকে সেরা ভাবার জন্য এটুকু পেলেই চলে তার? স্রেফ এটুকু পেলেই তৃপ্তি আর খুশিতে ভরে ওঠে মন? রীতিমতো করুণ মনে হলো ব্যাপারটাকে। একটু দুঃখই অনুভব করলাম তার জন্য। বোকার হদ্দটা জীবনে কোনোদিন সত্যিকারের সুখ বা গর্বের খোঁজ পাবে না ভেবে খারাপই লাগল। এই ভাবনাটা মনে কষ্ট জাগাল যে, দুনিয়ায় এমন মানুষও আছে গভীরতা বলে যার কিছু নেই। দাবি করছি না আমার ভেতর অনেক গভীরতা আছে, তবে এটাতো ঠিক, সত্যিকারের মানুষ দেখলে আমি চিনতে পারি। আর এ ধরনের ছেলেরা? পারে না। স্লেটের মতো চ্যাপ্টা তাদের জীবন। কেবলই সমতল, যা-ই করুক না কেন পরিস্থিতি পাল্টাবে না।

কিছু না, স্রেফ কিচ্ছু না সে!

মনের মধ্যে এ আবেগগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল আর পুরোটা সময় তাকিয়ে ছিলাম আওকির দিকে, যদিও তাকে ঘুষি মারার ইচ্ছেটা পুরোপুরিই উবে গিয়েছিল মন থেকে। নিতান্তই গুরুত্বহীন মনে হচ্ছিল তাকে। সত্যি বলতে কী, আমার কাছে সে কতটা গুরুত্বহীন তা ভেবে বিস্মিতই হয়েছিলাম প্রথমে। তারপর বুঝলাম, এই নীরবতা নিয়ে আরো মাসপাঁচেক অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারব। আমার অহংকার অটুটই আছে। আওকির মতো ঘিনঘিনে প্রাণী টেনে আমাকে তার পর্যায়ে নামাবে, তাতো হতে দিতে পারি না।

মনের সেই ভাবনাই ফুটে উঠল দৃষ্টিতে। আওকি নিশ্চয়ই ভেবেছিল পরস্পরকে দৃষ্টিবাণ হানার একটা যুদ্ধ এটা, কিছুতেই হারা যাবে না যাতে। ট্রেন যখন স্টেশনে পৌঁছুল তখনও চোখাচোখি তাকিয়ে আছি দুজন। শেষে আওকিকেই হার মানতে হলো। চোখের তারাদুটো হালকা কেঁপে উঠল তার, খুবই সামান্য, কিন্তু চোখ এড়ালো না আমার। ধরে ফেললাম সঙ্গে সঙ্গেই। এ যেন এমন এক বক্সারের দৃষ্টি যার পা দুটো শরীরের ভার বহন করতে পারছে না। চেষ্টা করছে সে, কিন্তু পা নড়ছে না। সে অবশ্য জানে না এখনও, ভাবছে পা ঠিকই কাজ করছে। আসলে কিন্তু মরে গেছে ওগুলো। জায়গায় দাঁড়ানো অবস্থায়ই শেষ হয়ে গেছে দুই পা, কাঁধদুটোও এখন আর নাচবে না। ভজকট হয়ে গেছে কোথাও, কিন্তু ঠিক কোথায়, সে বলতে পারছে না।

ঝাড়া হাত-পা হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। ঘুমালাম প্রাণভরে, ইচ্ছেমতো খেলাম, জিমে গেলাম। কেউ হারাতে পারবে না আমাকে। ঘটনা এই না যে আওকিকে হারিয়ে দিয়েছি আমি, ঘটনা হচ্ছে, জীবনের খেলায় আমি হারিনি। যারা তোমার জীবনটাকে বরবাদ করতে চায় তাদের চাপে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাওয়াটা খুব সহজ। এজন্যই ধৈর্য ধরে টিকে থাকলাম পাঁচ মাস। স্কুলে কেউ একটা কথা বলেনি আমার সঙ্গে। ভুল আমার হয়নি, বারবার নিজেকে বললাম, ভুল হয়েছে ওদের। বুক ফুলিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। পাশ করে বেরোনোর পর কিউশুতে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, ঐ স্কুলের বাদবাকিদের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে।

এ জায়গায় এসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ওজাওয়া। আরেক কাপ কফি খাবো কিনা জানতে চাইল। উঁহু, আমি বললাম, তিনকাপ খেয়ে ফেলেছি এর মধ্যে।

‘এমন কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যারা যায়, চাক বা না চাক তারা বদলে যায়,’ সে বলল। ‘বদলটার ভালো দিক যেমন আছে, আছে খারাপ দিকও। ভালো দিক হচ্ছে, তাদেরকে টলানো যায় না। ঐ ছয়মাসের পর বাকি যে কষ্টটা আমার হয়েছে সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না। যেকোনো কিছুই সামাল দিতে পারি। আশেপাশের মানুষের যন্ত্রণাটাও আগের চেয়ে বেশি বুঝি। এটা গেল ভালো দিক, যা আমাকে সত্যিকারের কিছু বন্ধু তৈরির সামর্থ্য দিয়েছে। তবে খারাপ দিকও আছে। সেটা হচ্ছে, মানুষকে বিশ্বাস করা সম্ভব না আমার পক্ষে। বলছি না ঘৃণা করি মানুষকে; এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস হারাইনি মানবতার ওপর। বৌ বাচ্চা আছে আমার। সংসার সাজিয়েছি, একে অন্যকে নিরাপত্তা দিই। বিশ্বাস ছাড়া এসব জিনিস করা যায় না। যেটা বলতে চাচ্ছি তা হলো, হ্যাঁ, সবাইকে নিয়ে সুন্দর একটা জীবন কাটাচ্ছি বটে, তবে খারাপ কিছু যদি ঘটে, কেউ এসে যদি একটানে শেকড়সুদ্ধ সব উপড়ে আনতে চায়...সুখী একটা পরিবার আর চমৎকার সব বন্ধুবান্ধব থাকলেও সে পরিস্থিতিতে কী করব নিজেই জানি না।

কী ঘটবে, যদি কোনোদিন, কোনো কারণ ছাড়াই, তোমার একটা কথাও বিশ্বাস না করে মানুষ? এরকম ঘটে, স্বীকার করতেই হবে। এবং ঘটে আচমকা, আগাম কোনো জানান না দিয়ে। এটা আমি সবসমই ভাবি। শেষবার ঘটেছিল স্রেফ ছয়মাসের জন্য। কিন্তু পরের বার? কেউ বলতে পারে না, কোনো নিশ্চয়তা নেই। জানি না ক’দিন টিকতে পারব পরেরবার। এসব যখন ভাবি অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। দুঃস্বপ্ন দেখি, মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠি। বড় বেশি ঘন ঘন ঘটে এটা, সত্যি। তখন আমার বৌকে জাগাই, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদি, কখনো কখনো এক ঘণ্টা ধরে। এতটাই ভয় লাগে।’

কথা থামিয়ে জানালা দিয়ে মেঘের দিকে তাকায় ওজাওয়া। আগের জায়গাতেই আছে সেগুলো। যেন ভারি একটা ঢাকনা, নেমে এসেছে মহাকাশ থেকে। কন্ট্রোল টাওয়ার, বিমান, নিচের গাড়িঘোড়া, টারমাক, ইউনিফর্ম পরা মানুষজন-সব কিছু থেকে যেন সমস্ত রঙ শুষে নিয়েছে ঢাকনাটা।

‘আওকির মতো লোকগুলোকে ভয় পাই না। ওরকম মানুষ গিজগিজ করছে চারপাশে, চিন্তা নেই তাদের নিয়ে। সামনাসামনি পড়ে গেলে সরিয়ে নিই নিজেকে, যখন দেখি আমার দিকে আসছে, অন্যদিকে চলে যাই। চোখের পলকে চিনে ফেলি এমন মানুষকে। আবার একই সঙ্গে একটা সমীহও অনুভব করি এদের প্রতি। সঠিক সময়টি আসা পর্যন্ত ওঁৎ পেতে থাকা, সুযোগ পেলেই সেটি কাজে লাগানো, মানুষের মনকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার ক্ষমতা-এগুলো হেলাফেলা করার মতো নয়। এ ধরনের মানুষকে এত বেশি ঘৃণা করি যে দেখলে বমি আসে, কিন্তু এটা একটা প্রতিভা, তাও মানি।

তবে যে জিনিসটি আমাকে ভয় পাইয়ে দেয় তা হলো কত সহজে, বিন্দুমাত্র প্রশ্ন না তুলে আওকির মতো জঘন্য মানুষের ছড়ানো নোংরা আবর্জনাকে বিশ্বাস করে মানুষ। আওকিরা নিজেরা ভালো কিছুর জন্ম দেয় না, উল্লেখ করার মতো কিছু নেই মাথায়, কিন্তু কথা বলে খুব সুন্দর করে। সহজসরল মানুষদের যেকোনো কিছুতে বিশ্বাস করাতে পারে এবং তাদেরকে দিয়ে সদলবলে করাতে পারে যা চায় তা। তারা যে ভুল করতে পারে সে ভাবনাটি একবারও আসে না মানুষগুলোর মাথায়। কোনো কারণ ছাড়াই, সারাজীবনের জন্য কাউকে কষ্ট দিতে একবারের বেশি দুবার ভাবে না তারা। নিজেদের কাজের কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না। এরা, এরাই হচ্ছে আসল দানব। এদেরকে নিয়েই দুঃস্বপ্ন দেখি আমি। সেই দুঃস্বপ্নে স্রেফ নীরবতা হয়ে থাকে এরা। চেহারাহীন কিছু মানুষ। বরফগলা জলের মতো চুইয়ে চুইয়ে সবকিছুতে ঢোকে তাদের নীরবতা। অন্ধকারে ঢেকে যায় তখন চারপাশ। আমি গলে যেতে থাকি, চিৎকার করতে থাকি, কেউ শোনে না।’

এদিক ওদিক মাথা নাড়ে ওজাওয়া।

সে আবার কথা শুরু করবে এই অপেক্ষায় থাকি আমি, কিন্তু চুপ মেরে যায় সে। হাত দুটো গুটিয়ে টেবিলের ওপর রাখে।

‘এখনও সময় আছে-একটা বিয়ার খেলে কেমন হয়?’ খানিক পর শুধায় সে।

হুম, খাওয়া যায়, আমি বলি। একটা বিয়ার হলে, আসলেই, মন্দ হয় না!
 
--------------- 


অনুবাদক পরিচিতি:
মোস্তাক শরীফ
গল্পকার। অনুবাদক। শিক্ষক
ঢাকায় থাকেন

৫টি মন্তব্য:

  1. হারুকি মুরাকামির নাম শুনেছি। কিন্তু
    তার কোন লেখা এর আগে পড়িনি। সুন্দর গল্প। বাংলায় অনুবাদও অসাধারণ।

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  4. অসাধারণ গল্প। অনুবাদ চমৎকার।

    উত্তরমুছুন