মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আব্দুলরাজাক গুরনাহ’র আত্মকথন : লেখা ও দেশ


ভাষান্তর : সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত

আবদুলরাজ়াক গুরনাহ’র জন্ম ১৯৪৮ সালে, পূর্ব আফ্রিকার উপকূলবর্তী জ়ানজ়িবারে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘মেমরি অফ ডিপার্চার’(১৯৮৭)-এ দেশত্যাগ করে পালিয়ে আসার অভিজ্ঞতা তিনি বর্ণনা করেছেন। একই প্রসঙ্গ তাঁর পরের উপন্যাসগুলিতে – ‘পিলগ্রিমস ওয়ে’ (১৯৮৮), ‘ডটি’ (১৯৯০) এবং ‘অ্যাডমায়াররিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬), ফিরে ফিরে এসেছে। ১৯৯৪-এ প্রকাশিত হয় তাঁর চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঔপনিবেশিক পূর্ব আফ্রিকার পটভূমিকায় রচিত। উপন্যাস-বিভাগে বুকার-পুরষ্কারের জন্য বইটি তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তাঁর সাম্প্রতিকতম রচনা ‘বাই দ্য সী’ (২০০১)-এ তিনি পুনরায় সাম্প্রতিক অভিবাসন প্রসঙ্গে ফিরে এসেছেন। সালেহ উমর নামে ইংল্যান্ড উপকূলে বসবাসকারী একবৃদ্ধ আশ্রয়প্রার্থীর মুখ দিয়ে কাহিনীটি কথিত হয়েছে, শান্তির খোঁজে যিনি জ়ানজ়িবার ত্যাগ করে চলে আসেন, কিন্তু বারেবারে স্মৃতিরসরণী বেয়ে সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে বাধ্য হন। আবদুলরাজ়াক গুরনাহ একজন সাহিত্য সমালোচকও। ‘এসেজ় অন আফ্রিকান রাইটিং’–এ ‘রি-ইভ্যালুয়েশন’ এবং ‘এসেজ় অন আফ্রিকান রাইটিং–কন্টেম্পোরারি লিটারেচার’ নামে দুটি খণ্ডে সাহিত্য-সমালোচনাধর্মী প্রবন্ধমালার সম্পাদনা করেছেন। কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যান্টারবারি’ত েইংরেজি এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য নিয়ে অধ্যাপনা করেন তিনি। এই নিবন্ধটি, আবদুলরাজ়াক গুনরাহর, নিজের লেখক হয়ে ওঠার কাহিনী। ঔপনিবেশিক-শাসন অবসানের পর যে চরম বিশৃঙ্খলাআর হিংসা জ়ানজ়িবারকে গ্রাস করায় তিনি দেশ ছেড়ে পালিয় েআসতে বাধ্য হন, সেইসব দিন এবং তার পরবর্তী সময়ের ঘটনা তাঁর স্মৃতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলে। সেই স্মৃতির অন্বেষণ এবং বিশ্লেষণই তাঁর রচনার মূল লক্ষ্য।
---------------------------------------------------------------------------------------------------

ইংল্যান্ডে থাকতে শুরু করার প্রথম কয়েক বছরেই –-তখন আমার বয়স এই একুশের আশেপাশে হবে –-আমি লিখতে শুরু করি। খুব পরিকল্পনা করে লিখতে শুরু করেছিলাম বলব না, বরং কিছুটা হোঁচট খেয়েই লেখালেখির দুনিয়াত েএসে পড়ি। এর আগেও লিখিনি তা নয় –-জ়ানজ়িবারে স্কুলে পড়ার সময়েও লিখেছি –-তবে সেসব নেহাতই বন্ধুবান্ধবদের আমোদ দেবার জন্য মজা করে লেখা, অথবা স্কুলের অনুষ্ঠানে অভিনয় করার জন্য কিছু গীতিনাট্য রচনা, বা স্রেফ অলস সময় কাটানোর জন্য হালকা কিছু লেখা। লেখক হবার হাতেখড়ি হিসেবে আমি সেইসব লেখাকে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ ভাবিনি, বা ভবিষ্যতে লেখক হব, এমন ভাবনা থেকেও নয়।

কিসওয়াহিলি হল আমার মাতৃভাষা। আফ্রিকার অন্যান্য ভাষার চাইতে এই ভাষার ইতিহাস একটু আলাদা। ইয়োরোপীয়রা উপনিবেশ গড়ে তোলার আগে থেকেই এটি একটি লিখিত ভাষা ছিল। তবে খুব উচ্চমানের সাহিত্য এই ভাষায় লেখা হয়েছিল, এমন কথা বলা যাবে না। এলোমেলো কিছু লেখালেখির নমুনা মেলে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে। আমার কিশোরবেলাতেও এই ভাষা, কথ্য ভাষার পাশাপাশি লিখিত ভাষা হিসেবে চলত। তবে কিসওয়াহিলির যেসব তৎকালীন রচনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল, সেগুলি মূলত খবরের কাগজে প্রকাশিত কিছু ছোট ছোট কবিতা, অথবা রেডিয়োতে কিছু জনপ্রিয় গল্পপাঠ। ক্বচিৎ কখনও গল্পের বই হিসেবেও পেয়েছি। নীতিকথা বা প্রহসনকে মনোরঞ্জকভাবে পরিবেশন করাটাই ছিল যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য। যাঁরা এই ধরনের লেখা লিখতেন, তাঁরা অন্যান্য পেশার সঙ্গেও যুক্ত থাকতেন – কেউ হয়ত শিক্ষকতা করতেন, আবার কেউ হয়ত সরকার িকর্মচারী। এরকমই কিছু করতে হবে বা করা উচিত, এমন কথা আমার ভাবনাতেও আসেনি। সেই সময়ের পরে কিসওয়াহিলি সাহিত্যের অনেক বিবর্তন ঘটে গিয়েছে, যদিও আমি সে কথায় যাচ্ছি না, আমি কেবল আমার ধারণার কথাই বলছি।

সে যাই হোক, দেশ ছাড়ার সময় আমার উদ্দেশ্য ছিল খুবই সাধারণ। উদ্বেগ আর দুঃখকষ্টে দিন কাটছে তখন। সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে, ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। সেই আঠেরো বছর বয়সী আমার তখন একমাত্রবাসনা, কী করে পালিয়ে যাওয়া যায়, অন্য কোথাও নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে জীবনধারণ করা যায়। লেখালেখি করবার ভাবনা, সেই সময়ে আমার মনের অগোচরেও স্থান পায়নি। ইংল্যান্ডে আসার কয়েক বছর পর অবশ্য লেখালেখি নিয়ে আমার চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে। কারণ হিসেবে বলতে পারি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এতদিন যা কিছু সরল বলেমনে হত, সেসব নিয়ে একদিন দুশ্চিন্তা করতে শুরু করা। এক অলীক এবং বিসদৃশ অনুভূতি আমাকে পেয়ে বসল। বেশ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম আর অন্ধকার হাতড়ে পথ খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। আমার মনোজগতে যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে, সে ব্যাপারে একেবারেই সচেতন ছিলাম না,আবার এই জন্যেই যে লেখালেখি করব বলে ভেবেছি, এটাও ঠিক নয়। লিখতে শুরু করলাম নিতান্তই আকস্মিকভাবে, খানিকটা মানসিক যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট হয়েই, কোনও পরিকল্পনা করে নয়, কেবল মাত্র নিজের যন্ত্রণাকে প্রকাশ করবার তাগিদে। অল্প কিছুদিন পরে মনে হল, আসলে আমি ঠিক কী করতে চাইছি? তাই লেখা থামিয়ে কিছুদিন ধরে ভাবলাম আসলে আমি কী লিখছি। উপলব্ধি করলাম, আমার লেখাগুলো মূলত স্মৃতি হাতড়ে লেখা, আর সেসব স্মৃতি কত প্রগাঢ়, কত দুর্বার, অথচ ইংল্যান্ডে আমার প্রথম কয়েক বছরের গুরুত্বহীন অস্তিত্বের সঙ্গেকতটাই বেমানান। উপলব্ধি করলাম, আমার ফেলে আসা জীবন, ফেলে আসা মানুষজন, চিরতরে হারিয়ে যাওয়া দেশ এবং জীবনচর্যার জন্য অদ্ভুত এক বিহ্বলতা আমার বেদনাকে তীব্রতর করে তুলছে। সেই সময়ে যেমনটি আমার মনে হয়েছিল। প্রথম যখন হাতে কলম তুলে নিলাম, স্মৃতি হাতড়ে আমার এই হারিয়ে যাওয়া জীবন নিয়ে লিখলাম, লিখলাম হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমিকে নিয়ে। সেই সঙ্গে আমার ইংল্যান্ডে অবস্থান নিয়েও লিখলাম, অন্তত এমন এক দেশে আমার অবস্থান নিয়ে, যার সঙ্গে আমার স্মৃতিতে জড়িয়ে থাকা বাসভূমির কোনও মিল নেই। এমন একটি অবস্থান থেকে দেখা, যা আমার ফেলে আসা অপরিমিত অপরাধবোধ আর চেনাজানা অনুশোচনা থেকে অনেক –-বেশ অনেকটাই নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত। আজ আমরা যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছি, ইংল্যান্ডের অজ্ঞাত এক বাস্তবতায় জীবনধারণ করছি, এ তো আমাদেরই পূর্ব কর্মফল, আমরাই হাত ধরে তাকে ডেকে এনেছি। একথা আগেও বলেছি। ফলে আমার মন, সেই প্রথমবারের জন্য গভীর তিক্ততা আর নিরর্থকতায় ভরে উঠল।

পরিচিত কিছু যুক্তি খাড়া করা যেতেই পারে। বলা যেতে পারে দূরদেশে ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে,পরিপূর্ণতা দেয়। স্বাধীন চিন্তা করার ইন্ধন যোগায়। স্মৃতিশক্তিকে উজ্জীবিত করে, যেটা একজন সাহিত্যিকের চারণভূমি। এই ধরনের দূরত্ব হচ্ছে আসলে লেখকের অন্তরাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার একটি বিশৃঙ্খলতামুক্ত সেতু, যার উপস্থিতিতে লেখক বাধাবন্ধহীন হয়ে সৃজনশীল কল্পনার ডানা মেলে ধরতে পারেন। এই যুক্তি মানলে, লেখকের অস্তিত্বের স্বয়ংসম্পূর্ণতাকেও মেনে নিতে হয়। চলমান জগত থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেই তিনি তাঁর সৃজনশীলতার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম। ভাবতেই পারেন ধারণাটা বড়ই সেকেলে, অনেকটা উনবিংশ শতকের লেখকদের কল্পনাবিলাসী নাটকীয়তার মত। তবে এই ধারণা এখনও আবেদন হারায়নি, নানাভাবে টিকে রয়েছে।

দূরত্বকে লেখকের সহায়ক হিসেবে দেখবার একটা যুক্তি হল,কল্পনা করে নেওয়া যে তিনি একটি অবরুদ্ধ জগতের বাসিন্দা। অন্য একটা যুক্তি হল, দূরত্ব লেখকের মনেদ্বন্দ্ববাদী কল্পনাশক্তির উদ্ভব ঘটায়। দ্বিতীয় যুক্তি এটাও বলে যে এই ধরণের দেশচ্যুত হওয়ার প্রয়োজন আছে, কারণ এই বিচ্ছিন্নতা লেখককে নিবিড় অন্তরঙ্গতার দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করে দেয় যাতে তিনি একজন সত্যান্বেষীর নৈর্ব্যক্তিকতা লাভ করে সত্যকে মূক বা লঘু করে দেখানোর প্রয়াস থেকে বিরত হতে পারেন। যদি প্রথম যুক্তিতে আপন স্বদেশের সঙ্গে লেখকের সম্পর্কের নিরিখে উনবিংশ শতাব্দীর কল্পনাবিলাসকে অনুভব করা যায়, তাহলে দ্বিতীয় যুক্তিতে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে শুরু করে তার মধ্যকাল পর্যন্ত প্রচলিত আধুনিকতাবাদের ছোঁয়া পাওয়া যায়। ইংরেজি আধুনিকতাবাদের প্রবক্তা প্রথম সারির বেশিরভাগ সাহিত্যিকই স্বদেশ থেকে অনেক দূরে বসেই সাহিত্যকর্ম করেছেন, যাতে অবক্ষয়জনিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখে তাঁদের উপলব্ধিকে যথাসম্ভব সততার সঙ্গে তুলে ধরতে পারেন।

অন্য আরেকটা যুক্তিও আছে, অপরিচিত পরিবেশে বিচ্ছিন্ন হয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে, লেখক অনেক সময়েই ভারসাম্যবোধ হারিয়ে ফেলেন, মানুষের থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, এবং মানুষের ওপর তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির প্রভাব এবং প্রয়োজনীয়তা কতটুকু সেটা বুঝতেও প্রায়ই ভুল করেন। উত্তর-সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়ায় কথাটি আরও গভীর সত্যে উপনীত। বিশেষ করে সেই সব দেশের লেখকদের ক্ষেত্রে, যাঁদের দেশে এক সময় ইয়োরোপীয় উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। বর্ণের শ্রেণীবিন্যাস এবং জাতিগত নিকৃষ্টতার তত্ত্ব খাড়া করে ঔপনিবেশিকতা বৈধতালাভ করেছিল। সংস্কৃতি-চর্চার নামে, শিক্ষা-প্রসারের নামে এবং উন্নয়নের নামে এই তত্ত্বকে প্রচার করা হয়েছিল।উপনিবেশের অধিবাসীরা যাতে এই তত্ত্ব মেনে নেয় তারজন্যও সব রকম প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। মনে হয়, উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখকদের ক্ষেত্রে সব থেকে বড় অসুবিধে এই যে, ইয়োরোপের অপরিচিত জীবনধারার এক বিচ্ছিন্নতাবোধের মধ্যে বসবাসের ফলে এই তত্ত্ব এঁদের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে, বা করতে পারে। এই সব লেখকেরা প্রবাসী জীবনকে তিক্ত উদাসিনতার সঙ্গে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। এঁদের লেখায় পিছিয়ে পড়া মানুষদের সম্বন্ধে তীব্র শ্লেষের প্রকাশ ঘটে। প্রকাশক আর পাঠককূল এই সব লেখাকে বাহবা দেন, কারণ স্বীকার করতে নাচাইলেও এঁরা পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রতি বৈরীভাব এখনও পরিত্যাগ করতে পারেননি এবং অ-ইয়োরোপীয় যে কোনও সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনায় এঁরা উৎফুল্ল হন এবং লেখককে পুরস্কৃত করেন। অতএব এই যুক্তি মেনে চললে, পরিবেশ বিচ্ছিন্ন লেখকদের বাহবা কুড়োনোর জন্য রূঢ়তার আশ্রয় নিতে হবে, আপন সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞাকে সততার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অন্যথায় এঁরা ভাবপ্রবণ আশাবাদী হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবেন।

দূরত্ব মুক্তি দেয় বা দূরত্ব বিকৃতি নিয়ে আসে –-এই দুটি যুক্তিকেই সরলীকরণ বলে মনে করা যেতে পারে। অবশ্য একথা বলছি না যে, যুক্তিগুলির মধ্যে বিন্দুমাত্র সত্য নেই। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরোটাই আমি জন্মভূমি থেকে দূরে অপরিচিতদের মধ্যে কাটিয়েছি। অন্য কোনও ভাবে কাটানো যেতে পারত, এরকম একটা কথা কল্পনা করাও এখন আমার পক্ষে কঠিন। কখনো কখনো আমি এরকম কল্পনা করার চেষ্টা করি যদিও। কিন্তু ভেবে নেওয়া সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে থেকে যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়ার সময়ে আমি বারবার একই সংকটের সম্মুখীন হয়েছি। অতএব আমার সংস্কৃতি আর আমার ইতিহাসকে বুকে ধরে রেখে লেখালেখি করার সম্ভাবনা একরকম অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। আমার মনে হয় যে কোনও লেখকের জন্যেই বস্তুতপক্ষে সেটা সম্ভব নয়। আমার লেখক জীবনের শুরু ইংল্যান্ডের বিচ্ছিন্ন এক পরিমণ্ডলে। আমার জন্ম যেদেশে, বসবাস সেই দেশে নয় –-এই শর্ত মেনে নিয়ে, তবেই না আমার যত লেখালেখি। অবশ্য এটি আমার অনন্য অভিজ্ঞতা বলে মনে করাও একেবারে সঠিক হবে না, বরং সমকালে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার মধ্যে এটিকেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবেই বরং দেখা উচিত।

ইংল্যান্ডেই আমি ব্যাপকভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। জ়ানজ়িবারে বই কেনা ছিল খরচসাপেক্ষ ব্যাপার, বইয়ের দোকানও সেরকম ছিল না, আর সেসব দোকানের সংগ্রহও ভাল ছিল না। লাইব্রেরির সংখ্যা ছিল কম, আর সমসাময়িক বইও সেরকম পাওয়া যেত না। সবার ওপরে, আমি কী পড়তে চাই, সে সম্বন্ধেও আমার ধারণা স্পষ্ট ছিল না, তাই পড়াশোনাটা এগোত এলোমেলোভাবেই। বই পড়ার সুযোগ যে কতটা সীমাহীন হতে পারে সেটা উপলব্ধি করলাম ইংল্যান্ডে আসার পর। ধীরে ধীরে ইংরেজি আমার কাছে এক প্রশস্ত ভাষা হয়ে দেখা দিল, উদাসিন এক আতিথেয়তার সঙ্গে লেখা এবং জ্ঞানের সমন্বয়।ল েখালেখির একটি দ্বার আমার কাছে উন্মোচিত হল। আমার বিশ্বাস, লেখকরা বই পড়ার মধ্যে দিয়েই লেখালিখি করার প্রেরণা পান। বই পড়ার অনুভূতি এঁরা সযত্নে মনগড়া একটি খাতায় সংরক্ষিত করে রাখেন যা লেখালেখির ব্যাপারে সাহায্য করতে সক্ষম। এই মনগড়া খাতাটি অত্যন্ত সুক্ষ্ম এক ব্যাপার, এই প্রক্রিয়ার বর্ণনা করাটাও সব সময় সহজ হয়ে ওঠে না, যদিও সাহিত্য-সমালোচকেরা সেটা করতেই উঠেপড়ে লাগেন। কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও যান্ত্রিক প্রক্রিয়া এটি নয়, তবে প্রক্রিয়াটিকে যদি সফলভাবে কাজে লাগানো যায় তবে কাহিনীর বিন্যাস যথাযথ এবং বিশ্বাসযোগ্য পথ ধরেই এগিয়ে যাবে। সাহিত্যরচনার ব্যাপারে কিছু বলা অসম্ভব বা সাহিত্যের সমালোচনা হচ্ছে এক ধরণের আত্ম-বিভ্রম –-এই সব কথা বলে আমি কোনও রহস্য সৃষ্টি করতে চাই না। সাহিত্যের সমালোচনা যথার্থভাবেই পাঠ্যবস্তু এবং পাঠ্যবস্তুকে অতিক্রম করা ধারণাগুলোতে আলোকপাত করে থাকে। তবে মনে হয়না শুধুমাত্র সমালোচনা পাঠ করে যে মনগড়া খাতাটির কথা আমি বলতে চেয়েছি, সেটিকে লেখক খুঁজে পাবেন। খাতাটিকে অন্য ভাবে তৈরি করতে হয়, এবং সেটি হল বইপড়ার অভ্যেস।

জ়ানজ়িবারে আমি যে স্কুলশিক্ষা পেয়েছিলাম, এক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্কুলে, যদিও প্রায় শেষ পর্যায়ে, খুব অল্পদিনের জন্যেই আমরা স্বাধীন এবং কিঞ্চিত পরিমাণে বিপ্লবী-রাষ্ট্রের তকমা পেয়েছিলাম। এই বয়সের অধিকাংশ ছেলেমেয়েই স্কুলে যায় এবং শিক্ষালাভ করে, তবে সেই শিক্ষা তাদের কতটা কাজে লাগে, এই বিষয়ে হয়ত কিছুটাসন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। এই শিক্ষা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক, এবং অপ্রাসঙ্গিক। অবাক হতে হয় এই ভেবে,এই পাঠ্যক্রম আসলে অন্য কারও প্রয়োজনের কথা মনেকরেই তৈরি করা হয়েছিল, অথচ দৈবাৎ আমরাই এর উপভোক্তা হয়ে পড়েছি। তবুও সেই সব অন্যান্য স্কুলপড়ুয়াদের মত, এর থেকে আমরাও কিছু কিছু প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করতে পেরেছিলাম। এই স্কুলথ েকে যে সব মূল্যবান শিক্ষা আমি পেয়েছিলাম, তার মধ্যে একটি হল, ব্রিটিশরা বিশ্বকে কোন চোখে দেখে এবং আমাকে কী চোখে দেখে। একথা একদিনই শিখে ফেলেছিলাম তা বলব না, বরং ধীরে ধীরে, স্মৃতিচারণ করতে করতে এবং আরও শিক্ষালাভের মধ্যে দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। একমাত্র স্কুল থেকেই যে লেখাপড়া শিখেছি এমন নয়, আমি মসজিদ থেকে শিখতাম, কোরান-স্কুল থেকে, রাস্তাঘাটে, বাড়িতে, এবং নিজস্ব কিছু অরাজক পড়াশোনার থেকেও। বিভিন্ন সূত্র ধরে শিক্ষালাভ আর স্কুল থেকে পাওয়া শিক্ষার কারণে প্রায়ই পরস্পরবিরোধিতার সম্মুখীন হতাম। এতে অসুবিধে না হলেও মাঝে মাঝে কষ্ট হত, আবার লজ্জাও পেতাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এই পরস্পরবিরোধিতার মোকাবিলা আমার কাছে একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়াল, প্রথম প্রথম যার মোকাবিলাবেশ দুর্বলভাবেই আমাকে করতে হত। ফলে, কোনটা গ্রহণ করতে হবে বা কোনটা প্রত্যাখ্যান, কোনটা স্বীকার করতে হবে কোনটা অস্বীকার, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমার তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে শিখেছিলাম কোন শিক্ষাটা ক্ষণস্থায়ী, আর কোনটা মনে চিরকালের জন্য ছাপ ফেলেদেবে। ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটা মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। জ্ঞানার্জনের আরও জটিল সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছিলাম।

তাই যখন লিখতে শুরু করলাম, নিজেকে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে দিতে পারিনি। আশা করেছি, ভাগ্য সহায় হলে আমার কণ্ঠস্বর শোনাতে একদিন সক্ষম হব। উপলব্ধি করেছিলাম, আমার কিছু সম্ভাব্য পাঠক-পাঠিকা আমাকে বিশেষ এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন, এবং আমাকেও ব্যাপারটা নজরে রাখতে হবে। আমি জানতাম, এমন কিছু পাঠকের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে যারা যতটা সম্ভব নিজেদের আদর্শ, সংস্কৃতি বা জাত্যাভিমান থেকে মুক্ত, বৈষম্যহীন। কতটুকু বলা উচিত, তার জন্য কতটুকু জানা দরকার, আর কতটুকু না বললেও আমার লেখা বোধগম্য হয়ে উঠবে, এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে হয়েছে। ভাবতে হয়েছে এই সব কিছু মেনে কী করে আমার রচনাকে কথাসাহিত্য হিসেবে দাঁড় করানো যাবে।

এই অভিজ্ঞতা আমার একার নয়, তবে এই সব ভাবনাচিন্তা নিয়ে নাড়াচাড়া করার সময় মনে হয়েছে অভিজ্ঞতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ অবশ্যই অনন্যভাবে আমার। এমন তর্ক তোলাই যেতে পারে, আমি যেসব বর্ণনা করছি তা একেবারেই সমসাময়িক নয়, এমন কি কোনও বিশেষঅভিজ্ঞতাও নয়, বরং প্রত্যেক লেখারই একই বৈশিষ্ট্য, আরসেই লেখার সূচনাই হয় প্রান্তিকতা আর ভিন্নতা সম্বন্ধে আত্মোপলব্ধির সাথে সাথে। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, যেসমস্ত জিজ্ঞাসা আমি তুলে ধরতে চাইছি সেগুলো নতুন কোনও জিজ্ঞাসা নয়। কিন্তু নতুন না হলেও তারা বিশিষ্ট, সাম্রাজ্যবাদ, স্বদেশচ্যুতি, আমাদের সময়ের বাস্তবতার দ্বারাপ্রভাবিত। আর এই বাস্তবতার একটা দিক হল হাজারহাজার উদ্বাস্তু মানুষের পালিয়ে এসে ইয়োরোপে আশ্রয় নেওয়া। তাহলে এই প্রশ্ন কেবল আমার একার উদ্বেগের কারণ নয়। আমার সঙ্গে সঙ্গে আরও যারা সাম্রাজ্যবাদের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে ইয়োরোপের অজানা পরিবেশে এসে পড়তে বাধ্য হয়েছে, তারাও হেন বিপুল সমস্যা নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। তাদের এই সাফল্যের ফলশ্রুতি হল, আজ আমরা এই আখ্যানের সূক্ষ্ম এবং স্পর্শকাতর দিকটিকে আরও ভালভাবে বুঝতে পেরেছি। এই বুঝতে পারাটুকু বিশ্বকে তুলনামূলকভাবে কম দুর্বোধ্য করে তুলেছে, বিশ্ব অনেকটাই নাগালের মধ্যে এসে গিয়েছে।






অনুবাদক পরিচিতি
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
বাচিক শিল্পী। গল্পকার। অনুবাদক।
কলকাতায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন