মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আব্দুলরাজাক গুর্নার গল্প : খাঁচা ও একটি আলোচনা


(ভাষান্তরঃ উৎপল দাশগুপ্ত)

কখনো কখনো হামিদের মনে হত পুরো সময় ও দোকানেই বন্দি হয়ে আছে, আর এখানেই যেন ওর জীবনের শেষ দিনটাও কেটে যাবে। আজকাল অত অসুবিধে হয় না, আর মাঝরাতে গোপন ফিসফিসানিও শুনতে পায় না, যে আতঙ্কে এক সময় বুকটা তার খালি খালি লাগত। এখন বুঝতে পারে বর্ষার জলে যে খাল তৈরি হয়ে শহরকে শহরতলি থেকে আলাদা করে দেয়, এ তারই আওয়াজ। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। দোকানটা বেশ ভাল জায়গায়, শহরতলি থেকে আসা রাস্তাগুলো শহরের মাঝখানে যেখানে এসে মিলেছে, সেইখানে। আলো ফুটতে না ফুটতেই দোকান খুলে দেয় সে, যে সময়টাতে ভোর থাকতে থাকতেই কাজে যাওয়া মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ে, আর রাতের দলছুট শেষ মানুষটা ঘরে না ফেরা পর্যন্ত সে দোকান বন্ধ করে না। দোকানে বসে বসেই জীবনের সব রকম রূপ তার দেখা হয়ে গিয়েছে, কথাটা বলতে সে খুবই ভালবাসে। দোকানের সব চাইতে ব্যস্ত সময়টুকু ওকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খদ্দেরদের আপ্যায়ন করে কথা বলতে আর হাসি তামাশা করতে দেখা যায়। যে নিপুণতার সঙ্গে খদ্দের আর ব্যবসার সামাল দিত, তাতে নিজেই মনে মনে খুশি না হয়ে সে পারত না। কাজের শেষে বাক্স লাগানো আসন – যেটা টাকাকড়ি রাখবার কাজেও লাগত –তার ওপর ক্লান্ত হয়ে সে বসে পড়ত।

মেয়েটা দোকানে এল একদিন সন্ধ্যেবেলা, বেশ একটু দেরি করেই এল, যখন হামিদ ভাবছিল এবার বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে। দু’দুবার ঢুলেও পড়েছে, যাকে দোকানের জন্য অসময় বোঝানোর কোনও ধূর্ত চাল বলে অনেকেই মনে করতে পারে। দ্বিতীয়বার ঢুলুনি কাটিয়ে যখন সে চমকে উঠল, মনে হল প্রকাণ্ড একটা হাত গলা চেপে ওকে মাটি থেকে তুলে নিল। মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে মেয়েটা ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

দীর্ঘ এক মিনিট উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটা বলল, ‘ঘি। এক শিলিং।’ কথাটা বলতে বলতে মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নিল, যেন ওর দিকে তাকিয়ে থাকাটাও বিরক্তিকর। একখণ্ড কাপড়ে শরীরটা জড়ানো, বাহুর কাছে গুঁজে দেওয়া। নরম সুতির কাপড় ভেদ করে কমনীয় দেহসৌষ্ঠব ফুটে উঠেছে। কাঁধ অনাবৃত, ম্লান আলোয় চকচক করছে। বাটিটা ওর হাত থেকে নিয়ে হামিদ ঘিয়ের টিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। সহসা দুরাশা আর ব্যথায় মন ভরে উঠল। বাটিটা যখন ফেরত দিল, মেয়েটা ওর দিকে তাকাল কি তাকাল না, মনে হল চোখ দুটো যেন পুরনো কোনও ক্লান্তিতে ঠাসা। খেয়াল হল মেয়েটার বয়স বেশ কম, মুখটা গোলাকৃতি, আর একহারা গ্রীবা। একটাও কথা না বলে মেয়েটা পেছন ঘুরে এক লাফে কংক্রিটের নালা – যেটা দিয়ে রাস্তা আর ফুটপাথকে আলাদা করা হয়েছে – সেটার ওপর দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। হামিদ ওর অবয়ব অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে দেখে চেঁচিয়ে উঠে ওকে সাবধান করতে চাইল। অন্ধকারে কোন বিপদ লুকিয়ে আছে জানবে কী করে মেয়েটা? ওকে হাঁক দেওয়ার আবেগটা আটকাতে গিয়ে গলা দিয়ে শুধুমাত্র ঘড়ঘড় একটা শব্দ বেরোল। অল্প একটু অপেক্ষা, মনে ক্ষীণ আশা, মেয়েটা হয়ত হাঁক লাগাবে। কিন্তু রাত্রির গাঢ় অন্ধকারে মেয়েটার স্যান্ডেলের ফটফট আওয়াজটা মিলিয়ে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে এল না।

মেয়েটার একটা আকর্ষণ আছে, আর ওখানে দাঁড়িয়ে ওর কথা ভাবতে ভাবতে কি জানি কি কারণে, যে পথ দিয়ে মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে গেল, অন্ধকারে ঠিক সেখানটাতে একটা গহ্বর দেখতে পেল সে আর নিজের প্রতি বিতৃষ্ণায় মন ভরে উঠল। ঠিকই করেছে মেয়েটা ওকে তাচ্ছিল্য করে। শরীর আর মন আরও বিস্বাদ হয়ে উঠল। একদিন ছাড়া-ছাড়া একবারের বেশি স্নান করার দরকার কখনও তার মনে আসেনি। বিছানা থেকে দোকানে পৌঁছে যেতে মিনিট খানেকের বেশি লাগে না, আর কখনোই দোকান ছেড়ে অন্য কোথাও সে যায়নি। তাহলে আর এত স্নান করার কী দরকার? ঠিক মত ব্যায়াম না করায় পা দুটো কদাকার আকৃতি ধারণ করেছে। দাসত্ববন্ধনে দিন কেটে গেছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এভাবেই চলছে, আহম্মকের মত খাঁচায় বন্দি অবস্থায় জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে। ক্লান্ত মনে সে দোকান বন্ধ করল, মনে মনে জানত যে রাতভর নিজের চরিত্রের দীনতাগুলোকেই প্রশ্রয় দিয়ে যেতে হবে।

পরের দিন সন্ধ্যেয় মেয়েটা আবার দোকানে এল। হামিদ তখন একজন নিয়মিত খরিদ্দারের সঙ্গে কথা বলছিল, ওর নাম মনসুর, বয়সে অনেকটাই বড়, কাছাকাছিই থাকে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যেবেলা আড্ডা মারতে তার দোকানে আসে। ছানি পড়ে লোকটা চোখে প্রায় দেখতেই পায় না, আর এর জন্য ছেলেরা ওকে বিরক্ত করে, মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর রসিকতাও করে ফেলে। কেউ কেউ বলে চোখ ভর্তি পিঁচুটি থাকার জন্যই নাকি মনসুর অন্ধ হয়ে গেছে। মনসুর ছেলেদের পিছু ছাড়াতে পারে না। মাঝে মাঝে হামিদের মনে হয় দোকানে আসার বা ওর কাছে ঘুরঘুর করার পেছনে মনসুরের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। কিংবা হয়ত কেবলই লোকের গায়ের জ্বালা বা নিছক গুজব ছড়ানো ছাড়া আর কিছু নয় সেসব। মেয়েটাকে আসতে দেখেই মনসুর কথা বলা বন্ধ করে ক্ষীণ আলোতে চোখ কুঁচকে মেয়েটার চেহারাটা যত দূর সম্ভব আন্দাজ করতে চেষ্টা করল।

‘জুতোর পালিশ আছে? কালো?’ মেয়েটা জানতে চাইল।

‘আছে,’ হামিদ বলল। গলাতে কিছু আটকে আছে মনে হল। তাই গলা পরিষ্কার করে আবার বলল, ‘আছে।’ মেয়েটা হাসল।

‘এসো, এসো, সোনা। তা আজ আছ কেমন?’ মনসুর জিগ্যেস করল। উচ্চারণটা এত জড়ানো আর ঘড়ঘড়ে যে হামিদের মনে হল কথাটা হয়ত রসিকতা করেই বলা হয়েছে। ‘কী সুন্দর গন্ধ তোমার গা থেকে বেরোচ্ছে, খুব ভাল পারফিউমটা! কণ্ঠস্বর ঠিক জ়ুয়ারদের মত আর গাজ়েল হরিণের মত শরীর তোমার। আচ্ছা বল তো আমাকে, মোসিচানা (সোয়াহিলি ভাষায় কুমারী মেয়ে), আজ রাতে তুমি কখন খালি থাকবে? পিঠে মালিশ করে দেওয়ার জন্য একজনকে আমার দরকার।’

মেয়েটা ওকে পাত্তাই দিল না। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে হামিদ মেয়েটার সঙ্গে মনসুরের একতরফা খাজুরি শুনতে থাকল। মেয়েটার বেলাগাম তারিফ করতে করতে দেখা করার সময় ঠিক করার আপ্রাণ চেষ্টা। ঘাবড়ে গিয়ে হামিদ পালিশের কৌটো আর খুঁজেই পায় না। শেষমেশ পেল যখন, ওর মনে হল এতক্ষণ ধরে মেয়েটা ওকেই লক্ষ্য করছিল, আর ওকে হাতড়াতে দেখে মনে মনে হাসছিল। সেও হাসল, কিন্তু মেয়েটা ভুরু কোঁচ করে দাম মিটিয়ে দিল। মনসুর মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে বকবক করে যাচ্ছিল আর পকেট ঝাঁকিয়ে পয়সার ঝনঝনানি শোনাচ্ছিল। কিন্তু মেয়েটা ঘুরে গিয়ে একটাও কথা না বলে হাঁটা লাগাল।

‘লক্ষ্য করলে মেয়েটাকে? যেন সূর্যও ওর দিকে তাকাতে সাহস পাবে না! কী অহঙ্কার! আসল কথা কি জানো, ওকে বিছানায় আনা কোনও ব্যাপারই নয়,’ মনসুর বলে উঠল। অট্টহাসি চেপে রাখতে গিয়ে শরীরটা অল্প অল্প দুলে উঠছে। ‘খুব শিগগিরই ওকে পেড়ে ফেলব। কত টাকা নেবে মনে হয় তোমার? এরকমই করে থাকে ওরা, এই সব ফাঁট দেখানো আর হ্যাটা করা … একবার শুধু তুমি ওদের বিছানায় নিয়ে গিয়ে ফেল, আর ওদের ভেতরে সেঁধিয়ে যাও, ওরা বুঝে ফেলবে কার কথায় চলবে।’

হামিদ হেসে ফেলে, মানুষে মানুষে শান্তি বজায় রাখতেই হয়। কিন্তু মেয়েটাকে যে লোভ দেখিয়ে কেনা যাবে না, সেটা সে বেশ বুঝতে পেরেছিল। মেয়েটার হাবভাবে এতটাই দৃঢ়তা আর স্বাচ্ছন্দ্য যে ওর বিশ্বাসই হল না মনসুরের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য মেয়েটা অতটা নীচে নামতে পারে। মেয়েটার কথা ঘুরেফিরে তার মনে বারবার আসতে লাগল। যখন একটু একলা হতে পারল সে, মেয়েটার সঙ্গে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে কল্পনা করল। দোকান বন্ধ করার পর, রোজ কয়েক মিনিটের জন্য বৃদ্ধ ফজিরের সঙ্গে কথা বলতে যায় সে। ফজির হলেন দোকানের মালিক, পেছনেই থাকেন। খুবই অশক্ত হয়ে পড়েছেন, বিছানা ছেড়ে নড়তেই পারেন না। দিনের বেলা একজন মহিলা ওঁর দেখাশোনা করেন। কাছেই কোথাও থাকেন তিনি। বিনিময়ে, দোকান থেকে মুদিখানার জিনিস মুফৎ নিয়ে যান। রাতে অবশ্য বৃদ্ধ চান হামিদ তাঁর সঙ্গে অল্প কিছুক্ষণ বসুক। আলাপচারিতার সময় মৃত্যুপথযাত্রীর শরীরের গন্ধে চারদিকে ম ম করে। আলাপচারিতা সামান্যই হত, ব্যবসায় মন্দা নিয়ে গতানুগতিক কিছু কথা আর বৃদ্ধের স্বাস্থ্যকামনায় একটু প্রার্থনা। মন যখন ভাল থাকত না, অশ্রুসজল চোখে ফজির মৃত্যুর কথা বলতেন, আর পরলোকের যে জীবন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে তা নিয়ে আলোচনা। এরপর হামিদ তাঁকে বাথরুমে নিয়ে যেত। খেয়াল রাখত চেম্বার-পট যেন পরিষ্কার আর খালি থাকে। তারপর বেরিয়ে আসত। মাঝরাতে ফজির নিজের মনে কথা বলতে থাকেন, মাঝে মাঝে গলা সামান্য উঁচু করে হামিদের নাম ধরে ডাকতে থাকেন।

ভেতরের উঠোনে খোলা আকাশের তলায় হামিদ ঘুমোত। বর্ষাকাল হলে, ছোট্ট স্টোরে কিছুটা জায়গা খালি করে, ওখানে। রাতগুলো একলাই কাটত তার, বাইরে কখনোই যেত না। প্রায় এক বছর হতে চলল, সে দোকান ছেড়ে কোথাও যায়নি, বা গেলেও কেবল ফজিরের সঙ্গেই কোথাও না কোথাও যেতে হয়েছে তাকে। বুড়ো মানুষটা তখনও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েননি। প্রত্যেক শুক্রবার ফজির ওকে মসজিদে নিয়ে যেতেন। মানুষের ভীড় আর চৌচির হয়ে যাওয়া ফুটপাথে বর্ষার জলের স্রোত, হামিদের মনে পড়ে খুব। বাড়ি ফেরার পথে ওঁরা বাজার হয়ে যেতেন। ফজির কিছু রসালো ফল আর রঙবেরঙের সব্জির নাম করে সেগুলো তুলে নিয়ে ওঁকে আঘ্রাণ করাতে বা স্পর্শ করাতে বলতেন। তেরো-চোদ্দো বছর বয়সে, হামিদ যখন প্রথম শহরে এল, তখন থেকেই বৃদ্ধ লোকটির সঙ্গে সে কাজ করছে। ফজির ওকে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছিলেন, সে দোকানের কাজ দেখত। প্রতিটা দিনের শেষে রাত্তিরটা একাই কাটাত। প্রায়ই বাবা আর মায়ের মুখ মনে পড়ত, আর যে শহরে সে জন্মেছিল সেটার কথা। এখন আর সে ছেলেমানুষ নয়, তবুও ওইসব স্মৃতি মনে পড়লেই সে কেঁদে ফেলত। অনুভূতিগুলো ওকে তাড়া করে ফিরত।

এরপর যেদিন মেয়েটা আবার এল মটরশুটি আর চিনি কিনতে, হামিদ খুব বদান্যতা দেখিয়ে ওজন-টোজন করে দিচ্ছিল। মেয়েটার নজর এড়াল না, অল্প হাসল। হামিদের মন ভরে গেল, যদিও জানে ওই হাসি ছিল উপহাস মেশানো। পরেরবার আবার যখন সে এল, মেয়েটা নিজে থেকেই কথা বলল। অভিবাদন জাতীয় সামান্য কিছু কথা, তবে বলল ভারি মিষ্টি করে। জানাল যে, ওর নাম রুকিয়া আর আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকতে খুব হালেই সে এখানে এসেছে।

‘বাড়ি কোথায় তোমার?’ হামিদ জানতে চাইল।

‘মেম্বেমারিনগো,’ বলল মেয়েটা। একটা হাত ছড়িয়ে বোঝাতে চাইল যে সেটা অনেক অনেক দূরে। ‘সে অনেক ঘুরে পাহাড় পেরিয়ে যেতে হয়।’

সেদিন সুতির যে নীল রঙের পোশাকটা পরে সে এসেছিল, সেটা দেখে হামিদ আন্দাজ করে নিয়েছিল যে মেয়েটা পরিচারিকার কাজ করে। কোথায় কাজ করে জানতে চাইলে মেয়েটা প্রথমে মৃদু গলা খাঁকারি দিল, যেন বলতে চাইল প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক। তারপর জানাল, ভাল কিছু না পাওয়া পর্যন্ত শহরের নতুন একটা হোটেলে সে পরিচারিকার কাজ করছে।

‘সব থেকে বড় হোটেল, ইকোয়াটর, মেয়েটা বলল। ‘একটা সুইমিং পুল আছে আর সব জায়গায় কার্পেট বিছানো। যাঁরা ওখানে থাকেন তাঁরা বেশিরভাগই মজ়ুংগু (টীকাঃ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের যে নামে ডাকা হয়), ইয়োরোপিয়ান। ভারতীয়রাও আছেন কিছু, তবে ওই জংলি লোকেরা, যারা চাদর দুর্গন্ধ করে ফেলে, তাদের একজনও নয়।’

রাত্রে দোকান বন্ধ করার পর পেছন-উঠোনে শোবার ঘরের দরজার সামনে হামিদ নিত্য দাঁড়িয়ে থাকতে শুরু করল। সেই সময় রাস্তাঘাট জনশূন্য, নিস্তব্ধ, দিনের বেলার মত কোলাহলে ভরা সাংঘাতিক পরিবেশ নয়। রুকিয়া ওর ভাবনায় আনাগোনা করতে থাকল, মাঝে মাঝে তার নামটাও সে বলে উঠত। কিন্তু তার কথা মনে পড়লেই নিজেকে নিঃসঙ্গ আর হতভাগ্য মনে হত। প্রথমদিন কীভাবে ওর দিকে তাকিয়েছিল, মনে পড়ে যেত, আর সেই রাত্তিরের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়াটা। ওকে ছুঁতে ইচ্ছে করত … মনে হত, অন্ধকারচ্ছন্ন পরিবেশে বছরের পর বছর থাকার ফলেই ওর এরকম আজকাল মনে হয়। তাই অপরিচিত এই শহরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে কল্পনা করতে থাকে, অপরিচিত একটা মেয়েকে স্পর্শ করাই ওর মুক্তির একমাত্র পথ।

একদিন রাতে, দরজায় তালা লাগিয়ে সে রাস্তায় নেমে এল। আস্তে আস্তে পা ফেলে সব থেকে কাছের স্ট্রীট ল্যাম্পের কাছে চলে গেল, তারপর তার পরেরটার কাছে। একদমই ভয় করছে না, একটু অবাকই হল সে। কিছু একটার নড়ার শব্দ হল, সে ঘুরেও দেখল না। কোথায় যাচ্ছে যখন জানে না, তখন ভয় পাওয়ারই বা কী আছে, যে কোনও কিছুই হতে পারে। এরকম করে ভাবার মধ্যে স্বস্তিও আছে।

একটা বাঁক নিয়ে সারি সারি দোকান দেওয়া একটা রাস্তায় এসে দাঁড়াল সে, দুয়েকটা দোকানে তখনও আলো জ্বলছে। আলোগুলো এড়ানোর জন্য আরও একটা বাঁক নিল। কারোর দেখা মিলল না, না পুলিশের লোকের, না রাতের পাহারাদারের। চৌ-রাস্তার মোড়ে এসে কাঠের একটা বেঞ্চে বসল কয়েক মিনিট। সব কিছু চেনাচেনাই লাগছে, মনে হল তার। এক কোণে একটা ঘড়িঘর, রাতের নৈঃশব্দ্যে মৃদু টিকটিক করে চলেছে। চৌ-রাস্তার চারপাশে সার দিয়ে লোহার স্তম্ভ, নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে। একদিকে সার বেঁধে বাস দাঁড়িয়ে আছে, আর দূর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের কলরোল।

আওয়াজটা অনুসরণ করতে গিয়ে সে টের পেল সমুদ্র বেশি দূরে নয়। সহসা জলের গন্ধ নাকে যেতেই বাবার বাসার কথা মনে পড়ে গেল। তাদের শহরটাও ছিল সমুদ্রের কাছেই। একবার সমুদ্রের তটে আর চড়ায় সে খেলাধুলো করেছিল, যেমন সব বাচ্চারাই করে থাকে। আজকাল তার আর মনেই হয় না যে জায়গাটা একসময়ে ওর নিজের ছিল, বাড়িটা তাদের নিজেদের বাড়ি ছিল। দেখল, জলের তরঙ্গ ধীরে ধীরে কংক্রিটের পাড়ে ভেঙে পড়ে সাদা সাদা ফেনা তৈরি করছে। কোনও একটা জেটিতে এখনও উজ্জ্বল আলো দেখা যাচ্ছে। যন্ত্রপাতি চলার মৃদু শব্দ। এত রাত্রে কেউ কাজে ব্যস্ত, বিশ্বাসই করা যায় না।

খাড়ির ওপারে আলো, আঁধারের বুক চিরে বিন্দু বিন্দু দিয়ে গাঁথা আলোর মালা। কারা থাকে ওখানে? আশ্চর্য হয়ে ভাবে হামিদ। ভয়ে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। শহরের অন্ধকারময় প্রান্তে যে সব মানুষ থাকে, তাদের ছবি সে কল্পনা করতে চেষ্টা করে। ক্রুর দৃষ্টির ভীষণকায় সব মানুষের ছবি তার মনের ভেতর ভেসে ওঠে। তার দিকে তাকিয়ে লোকগুলো যেন অট্টহাস্য করে ওঠে। আলো-আঁধারি মাখানো ফাঁকা কোনও এক জায়গায় শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকা ছায়াময় সব মূর্তি। পরক্ষণেই দেখে, একদল পুরুষ আর নারী একটা দেহকে ঘিরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন কোনও মন্ত্রোচ্চারণের তালে তাল মিলিয়ে ওদের পা পড়ছে। শত্রুর রক্ত ফিনকি দিয়ে পায়ের তলার মাটিকে ভিজিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা জয়ের উল্লাসে ফেটে পড়ছে। কেবল শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কাতেই যে খাড়ির ওপারের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে সে ভয় পাচ্ছে, তা নয়। তার ভয় হচ্ছে এই ভেবে, লোকগুলো ঠিক জানে যে ওরা কোথায় রয়েছে, অথচ সে নিজে কোথায় এসে পৌঁছেছে সেটাই সে ঠাহর করতে পারছে না।

দোকানের দিকে ফেরবার জন্য এবার সে ঘুরল। এত কিছুর পরেও তার মনে হতে লাগল, কিছু একটা করবার হিম্মত তো সে দেখাতে পেরেছে। রাতে দোকান বন্ধ করার পর, আর ফজিরের ডেরায় হাজিরা দেওয়ার পর, সমুদ্রে পাড়ে ঘুরতে যাওয়াটা ওর নিত্যদিনের অভ্যেস হয়ে দাঁড়াল। ব্যাপারটা ফজিরের ভাল লাগে না। অভিযোগ করেন, তাঁকে একা থাকতে হয়। কিন্তু অভিযোগটা হামিদ কানে তোলে না। কখনো-সখনো দুয়েকটা লোক সামনে পড়ে যায়, কিন্তু ওরা না তাকিয়েই দ্রুত চলে যায়। দিনেরবেলায় মেয়েটার প্রতীক্ষায় সে উন্মুখ হয়ে থাকে। দিনরাত মেয়েটাই ওর মন জুড়ে রয়েছে। রাত্রে কল্পনা করে মেয়েটার সঙ্গেই রয়েছে সে। যখন জনশূন্য রাস্তা ধরে চলতে থাকে, কল্পনা করে মেয়েটা তার পাশেপাশেই হাঁটছে, গল্প করছে, হাসছে, মাঝেমাঝে তার কাঁধে হাত রাখছে। মেয়েটা দোকানে কিছু নিতে আসলে একটু বেশি জিনিস দেবার চেষ্টা করে সে। তারপর মেয়েটার হাসি মুখটা দেখার জন্য অপেক্ষা করে। কথাও হয় কখনো-কখনো, অভিবাদন বিনিময়, বন্ধুত্বপূর্ণ কিছু কথাও। কোনও একটা কিছুর টানাটানি থাকলে, বিশেষ খরিদ্দারদের জন্য যে গোপন ভাঁড়ার করা থাকে, সেখান থেকে সে এনে দেয়। যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করতে পারলে কখনো-সখনো মেয়েটার রূপের সে প্রশংসা করে ফেলে, তারপর আশা আর আশঙ্কার দোলায় দুলতে থাকে। বিনিময়ে মেয়েটা ওকে মিষ্টি হাসি উপহার দেয়। মেয়েটার সম্বন্ধে মনসুরের চাল মারা কথাগুলো মনে পড়লে নিজের মনেই হেসে ফেলে সে। কয়েকটা টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যাওয়ার মত মেয়ে ও নয়। বরং ওর রূপের প্রশংসা করে, সৎ সাহস দেখিয়ে, ভালবেসে, তবেই ওর মন জয় করতে হবে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার মত বোলচাল কিংবা ক্ষমতা না আছে ওই প্রায় অন্ধ নোংরা চরিত্রের মনসুরের, না ওর নিজের।

একদিন বেশ রাত করে রুকিয়া দোকানে এল চিনি কিনতে। এখনও ওর পরনে কাজের নীল পোশাকটাই। হাতের তলাটা ঘামে ভেজা। কোনও খদ্দের নেই দোকানে। রুকিয়ারও খুব তাড়া আছে বলে মনে হল না। হামিদকে কত পরিশ্রম করতে হয় বলে ওর পেছনে লাগার চেষ্টা করল।

‘এতক্ষণ দোকানে থাক, তোমার নিশ্চয়ই অনেক টাকা? ওগুলো কি গর্ত করে মাটিতে পুঁতে রেখেছ? দোকানদারদের যে গোপন সঞ্চয় থাকে এ কথা সব্বাই জানে … নিজের শহরে ফেরার জন্য বুঝি তুমি টাকা জমাচ্ছ?’

‘আমার এক পয়সাও নেই,’ হামিদ প্রতিবাদ করে। ‘এখানকার একটা জিনিসও আমার নিজের নয়।’

মেয়েটার চোখেমুখে অবিশ্বাসের হাসি। ‘সে যাই হোক, তুমি তো খাটো খুব,’ বলল সে। ‘মজা করবার সময় তো খুব একটা নেই তোমার।’ হামিদ এক হাতা চিনি বেশি দিতেই সে হাসল।

‘ধন্যবাদ,’ বলে মেয়েটা প্যাকেটটা নেওয়ার জন্য ওর দিকে ঝুঁকে পড়ল। প্রয়োজনের তুলনায় কিছু বেশি সময় ধরে ওভাবেই রইল, তারপর আস্তে আস্তে পেছনে সরে এল। ‘তুমি সব সময় আমায় কিছু না কিছু দাও। আমি জানি, বিনিময়ে তুমিও কিছু চাইতে পার। যখন সেটা চাইবে, তখন কিন্তু তোমাকে এই সব ছোটখাটো উপহারের থেকেও বেশি কিছু দিতে হবে।’

হামিদ লজ্জায় একেবারে মাটিতে মিশে গেল, কোনও জবাব দিতে পারল না। মেয়েটা মৃদু হেসে ফিরে চলল। একবার ঘুরে তাকাল, অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে হামিদের দিকে তাকিয়ে বাঁকা চোখে হাসল।



লেখক পরিচিতিঃ
আব্দুলরজাক গুরনাহ (জন্ম ২০ ডিসেম্বর ১৯৪৮) সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। পেশায় অধ্যাপক। জন্ম জ়ানজ়িবারে। উদ্বাস্তু হিসেবে ১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। মাতৃভাষা সোয়াহিলি। ইংরেজি ভাষায় লেখেন। ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ় পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস –‘প্যারাডাইস’, ‘বাই দ্য সী’। সাম্প্রতিকতম উপন্যাস –‘আফটারলাইভস’। বর্তমান অনুবাদটি ওঁর ছোটগল্প ‘কেজেস’ থেকে করা হয়েছে।



অনুবাদক পরিচিতি
উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক। আলোকচিত্র শিল্প।
কলকাতায় থাকেন। 






খাঁচা গল্পটি নিয়ে আলোচনা
শুভদীপ বড়ুয়া
 
উপনিবেশকাল এবং উপনিবেশোত্তর আফ্রিকা এবং বৃহত্তর-এশিয়া লেখকের সাহিত্য-উপদান। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়া আফ্রিকা ধীরে ধীরে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হচ্ছে, আর দলে দলে স্থানীয়রা হচ্ছেন উদ্বাস্তু। ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন ইয়োরোপ এবং আমেরিকা, বা আফ্রিকারই এক অঞ্চল থেকে রোজগার বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছেন আরেক অঞ্চলে। ‘কেজেস’ বা ‘খাঁচা’ গল্পের নায়ক হামিদ’ও সেরকমই এক তরুণ যাকে অল্প বয়সে দেশের বাড়ি ছেড়ে দূরের কোনও শহরে চলে আসতে হয়েছে ভাগ্যের সন্ধানে। 

উপনিবেশিত-আফ্রিকার যুবসমাজের বিভ্রান্তি তার চোখেমুখে লেগে না থাকলেও, রয়েছে সাধারণ আফ্রিকা-মনের সারল্য এবং দোলাচল। একটি মুদিখানায় সারাটা দিন একভাবে কাটিয়ে দেওয়া হামিদের জীবনে আশার আলো জাগিয়েছিল অপরিচিতা এক তরুণী, যে তারই মত ভাগ্যের সন্ধানে এই শহরে এসে পড়েছিল, একটি হোটেলে পরিচারিকার চাকরি নিয়েছিল। শহরের জীবনের নানাবিধ বিভ্রম আর বিচিত্র সব ভয়ে তাড়িত হামিদ কিছুতেই দোকানটুকু ছেড়ে বেরোত না। 

কিন্তু সেই হামিদ’ই ওই অচেনা মেয়েটির খোঁজে একদিন গভীর রাতে রাস্তায় বেরল। অন্ধকার সমুদ্রের পাড়ে এসে দাঁড়াল। অযাচিতভাবে একটি খুনোখুনির দৃশ্যও দেখে ফেলতে হল তাকে। সর্বক্ষণ একটি খাঁচা বা বর্মের ভেতর বসবাস করা হামিদের কাছে এই অনিশ্চয়তা আর ভয়টুকু ছিল যেন একেবারেই প্রত্যাশিত, যা তাকে একটু অভিজ্ঞ করে তুলবে, বা জীবনের পথে এগোতে সাহায্য করবে। সেই মেয়েটি, যাকে হামিদ মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছিল, যার প্রতি তার বিশ্বাস ছিল যে, টাকা-পয়সা ছড়িয়ে কোনও বিত্তবান তাকে কখনোই বশ করতে পারবে না, সেই মেয়েটিই একদিন তাকে স্পষ্ট জানাল, যে আতিশয্যে হামিদ মেয়েটিকে অতিরিক্ত চিনি বা ডাল ওজন করে দিয়ে রোজ রোজ তুষ্ট করতে চেষ্টা করছে, মুগ্ধ করতে চেষ্টা করে চলেছে, বদলে মেয়েটিও শরীরের ভাগ দিতে তাকে রাজি। কিন্তু তারপর থেকে কিন্তু আরও বেশি বেশি চিনি বা ডাল তুলে দিতে হবে তার জন্য। 

লেখক বলছেন, ‘হামিদ লজ্জায় একেবারে মাটিতে মিশে গেল’, এই অস্বস্তি বা সারল্যটুকু ছিল উপনিবেশ-কালের আগেকার আফ্রিকার সম্পদ। মানুষ ছিল সরল। কিন্তু যে আধুনিকতার জোরে একটি সরল আফ্রিকান-তরুণী সাহস করে নিজের প্রয়োজনীয় কথাটুকু বলে ফেলতে পারছে, হামিদ এখনও সেই সাহস থেকে বেশ কিছু যোজন দূরে। সে আজও রয়ে গিয়েছে একটি পাহারার ভেতর, একটি বর্মের ভেতর, খাঁচার ভেতর। উপনিবেশ-শাসন ধীরে ধীরে আফ্রিকার অনেক কিছু পাল্টে দিয়ে গেলেও, আফ্রিকা নিজে পুরোপুরি বদলে যায়নি এখনও।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন