মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আব্দুর রাজাক গুরনাহ'র গল্প : আমার মা আফ্রিকার একটি খামারবাড়িতে থাকতেন


অনুবাদ : ফারহানা রহমান

“আমার মা আফ্রিকার একটি খামারবাড়িতে থাকতেন।“ মুনাহ তার মেয়ে কাদিজাকে এই কথা বলতে শোনে। কাদিজা চায় ওর বন্ধুদের সামনে ওকে সবাই কাদি বলে ডাকুক—এটাই তার পছন্দ। আর মুনাহ এ কথাটি যথাসম্ভব মনে রাখতে চেষ্টা করে। কাদি ওদের বাসায় সেদিন বিকেলে তার ঘনিষ্ট বান্ধবী ক্ল্যারা আর অ্যামির সঙ্গে বসে বসে ভিডিওতে আউট অফ আফ্রিকা সিনেমাটি দেখছিল। প্রায় প্রতি রোববার দুপুরে ওরা যে কোনো এক বন্ধুর বাসায় বসে ভিডিওতে সিনেমা দেখে। কাদিজাদের বাসায় ভিডিও থাকলেও অন্যদের বাসায় ছিল ডিভিডি।

সিনামাটি মনের ভেতর অনুরণিত হওয়ার জন্য শেষ হওয়ার ঠিক পর মুহূর্তেই কিছুক্ষণের জন্য এক গভীর নীরবতা নেমে আসে। আর ঠিক তখনই কাদি কথাটি বলে উঠলো। সিনামাটিতে প্রান্তরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কর্কশ কান্নার মতো হাহাকার হয়ে বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল একটি মাত্র বাক্য – ‘আফ্রিকাতে আমার একটি খামার ছিল!’ এবং আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল এই কথাটির করুণ প্রতিধ্বনি। লেখক কারেন ব্লিক্সেন, সিনামাটিতে ট্র্যাজেডির রূপ দেওয়ার জন্যই এমনটি করেছিল। হারানো প্রেম, হারানো খামার, হারানো স্বর্গ, যেন সবকিছু হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার সেই গোপন হাহাকারের প্রতিধ্বনি। আর তখনই কাদি বলে উঠলো “আমার মা আফ্রিকার একটি খামারে থাকতেন।”

মুনাহ দ্রুত ওদের কাছে গিয়ে বলতে চেয়েছিল যে ব্যাপারটা মোটেই তেমন কিছু নয়, যেভাবে কাদি বলছে। এটা আসলেই তেমন কিছুই নয়। কিন্তু সে শুনতে পেল যে কাদি কথাটি বলার সাথে সাথেই কেউ একজন হেসে উঠলো। ওর বন্ধুরা বিস্মিত হয়েছে দেখে মুনাহ পিছিয়ে আসলো। অ্যামি বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চাইলো, সত্যি বলছিস? তোর মা সত্যি সত্যিই আফ্রিকাতে ছিল? অ্যামিকে অবাক হয়ে হাসতে দেখে মুনাহ ভাবল অ্যামি হয়তো কথাটি বিশ্বাস করেনি তাই ব্যঙ্গ করে হেসেছে। ও হয়তো মনে করেছে, কাদির বলা কথাটি আসলে বন্ধুদের সাথে বানিয়ে গালগপ্প করে মজা করে বলার জন্যই বলা। সে তার কিশোরী বন্ধুদের সামনে গর্ব করার জন্যই হয়তো শুধু কথাটি বলেছে।

মুনাহ’র ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া অনেক গল্পের মধ্যে থেকে এই গল্পটি আবারও এতদিন পর মনে পড়ে গেলো। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল ওরা খুব গল্প শুনতে ভালোবাসতো। মাঝেমাঝে বাচ্চারা হঠাৎ করেই কোনো একটি গল্প বলার জন্য জেদাজেদি শুরু করে দিত। ওদেরকে দেখে মনে হোতো আগে বলা কোনো গল্পের বাকি অংশ যেন ওদেরকে এখনই শুনতে হবে। বড় ছেলে জামাল তো একটি গল্প শুনলে সেটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ মনে রাখতো। আর এমনভাবে গল্পটি নিয়ে আলোচনা করতো যেন গল্পের ভেতরের সমস্ত চরিত্রের সাথেই ওর খুব ভাব আছে। মনে হোতো ও যেন সবাইকেই ব্যক্তিগতভাবে চেনে।

‘ওহহো আব্দাল্লাহ চাচাতো সবসময়ই টাকাপয়সা নিয়ে এমনই কিপটামিই করতো, তাই না মা? লোকটা আসলেই সুবিধার ছিল না। খুব কঞ্জুস ছিল।‘

আর এখন তো জামাল এতোই বড় হয়ে গেছে যে ওর সাথে কোনো কথাই বলা যায় না। সারারাত বন্ধুদের সাথে বাড়ির বাইরে ঘুরে বেড়ায়। শুধু ঈশ্বরই জানেন কোথায় ও কী করে বেড়ায়? ওর জামাকাপড় থেকে ক্যামন যেন ধোঁয়ার আর পচা পচা মিষ্টি উৎকট একটি গন্ধ ভুড়ভুড় করে ভেসে আসে। এসব দেখেই বোঝা যায় যে এ বয়সের ছেলেপেলেরা আসলে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। ওই গন্ধে মুনাহ’র বমি বমি পায়। ছেলের রুমে গিয়ে দুর্গন্ধময় এসব জামাকাপড় ধোয়ার জন্য আনতে গেলেই ও মা’র সাথে রেগেমেগে চিৎকার চ্যাচামেচি শুরু করে দেয়। ছেলেটা ওসব নোংরা দুর্গন্ধময় জামাকাপড়ই পরতে পছন্দ করে। আর দু’পা টেনে টেনে মেঝেতে ঘসে ঘসে এমনভাবে হাঁটে যেন ওর পাছাটাই শরীর থেকে উধাও হয়ে গেছে। ছোটবেলার সেইসব আজগুবি গল্পগুলোর ব্যাপারে তার এখন আর কোনোই আগ্রহ নেই। তবে মাঝেমাঝে এমন হয় যে ওসব গল্পের ব্যাপারে কিছুটা উৎসাহ না দেখিয়ে ওর আর কোনো উপায় থাকে না। কারণ মুনাহ মাঝেমাঝে ওই গল্পগুলোর ভেতর থেকে এমনকিছু চরিত্রের কথা ওঠায় যাদেরকে অতীতে সে খুব ভাল করে চিনত বলে একসময় খুব গর্ব করতো। আর এখন এ ধরণের গল্প শুনলেই সে শুধু ঘনঘন তার মাথাটাকে নাড়াতেই থাকে। ও এমন একটা ভাব করতে থাকে যেন মুনাহ এসব গল্প তাড়াতাড়ি শেষ করে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলা শুরু করে দেয়। আর রীতিমতো ভীষণ অস্থির আর চিন্তিত হয়ে ওঠে যেন ওর মা এইগল্প গুলোকে রসিয়ে রসিয়ে বলে আর না বাড়ায়। ওর ব্যাবহারে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে।

কাদি কিন্তু আবার এমন নয়। ওর সবকিছু ঠিকঠাক মনে থাকতো না। তাই ওকে অনেক কিছুই মনে করিয়ে দিতে হোতো। “ ওহহো! তুমি তো জানোই যে আমার ওমর চাচা কে ছিলেন। তাঁরই তো একটি খামারবাড়ি ছিল। আর আমি যখন মাত্র চোদ্দ বছরের কিশোরী ছিলাম তখন আমার এই ওমর চাচার বাসাতেই আমি কয়েক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম।

আর এভাবেই অপ্রত্যাশিতভাবেই মাঝেমাঝে কাদির এই সব গল্পগুলো মনে পড়ে যেতো। আজকেও ঠিক তেমনটাই হয়েছে। সিনামাটির স্মৃতিবিতাড়িত মধুর অতিত এবং গভীর আবেগময় কাহিনী দেখার পর তার সেই খামারটির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল আর ঠিক তখনই সে ঘোরগ্রস্তের মতোই ওর বন্ধুদের সামনে বলে উঠেছিলো। ‘আমার মা’ও আফ্রিকার একটি খামারবাড়িতে থাকতেন।‘

আর সেই সত্যি কথাটি বুঝতে পেরেই আসলে কাদির বন্ধুটি এমন করে বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলো। সে খুব ভাল করেই জানতো যে আউট অফ আফ্রিকা সিনেমাটির মতো এতো দারুণ রোম্যান্টিক জীবন কাদির মা আফ্রিকার সেই খামারে কখনো কাটায়নি। এসব শুধু সিনেমাতেই সম্ভব, বাস্তবে নয়। ওখানে অতিবাহিত জীবন সম্পর্কে কোনো বিবরণ শোনা ছাড়াই সে নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে কাদির মা বাস্তব জীবনে আফ্রিকার যে খামারে থাকতো, সেটা সিনেমার মতো এতো খোলামেলা বিস্তীর্ণ আকাশের নিচে অবস্থিত খামার বাড়ি ছিল না। সেখানে বাবলা গাছের ঘন ছায়ায় ঘেরা কোনো বিশাল পথও দেখতে পাওয়া যেত না। আর নিশ্চিতভাবেই সেখানে ল্যাম্পের মিটমিটে আলোজ্বলা কোনো বিশাল বারান্দাও ছিল না। খুব সম্ভবত সেই আফ্রিকা ছিল টেলিভিশনে দেখা সেই শহরগুলোর মতো যেখানে হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করে। আর নোংরা বিশাল কোনো ক্ষেতের উপর দিয়ে অসংখ্য ছোট ছোট বাচ্চারা তাদের মায়েদের পিছন পিছন হেঁটে বেড়ায়। আসলে আফ্রিকা সম্পর্কে আমরা সবাই টেলিভিশনের পর্দায় এমন সব দৃশ্যই সবসময় দেখে আসছি।

কাদির বন্ধুটি সম্ভবত চিন্তাই করতে পারেনি কাদির মা এভাবে ভাবতে পারে। এমনকি সে চমকেও যায়নি। মুনাহ যে তার আফ্রিকার একটা খামার বাড়িতে কিছুদিন থাকার বিষয়টা নিয়ে এতো বেশি উৎসাহিত হয়ে বোকার মতো বাচ্চাদের আলোচনা আর গালপপ্পের মধ্যে ঢুকে পড়তে যাচ্ছিলো, সেটা ভেবেই তার এখন ভীষণ লজ্জা লাগলো। কেন সে এতো ত্যাক্ত বিরক্ত বোধ করছিল তা নিয়েও সে ভাবতে লাগলো। কাদি যে ওদের কাছে এসব কথা শোনার জন্যে অনুনয় বিনয় করছিল, সেকথা ভেবেও মুনাহ অবাক হয়, কাদি বলছিল, প্লিজ আমার মা’র সামনে এমন ভাব দেখাবি যে তিনি সত্যি সত্যিই সেই সিনেমার নায়িকার মতো আফ্রিকার খামার বাড়িতে থাকতেন। মনে রাখিস আমিও কিন্তু সব সময় তোদেরকে খুব গুরুত্ব দেই। এরপর সম্ভবত ব্যাপারটি আর কাদির অনুনয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল না। কাদি সত্যি সত্যিই ভাবত যে সিনেমায় দেখা সেই নায়িকার জীবনের মতোই তার মাও আফ্রিকার একটি খামার বাড়িতে থেকে নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন।

বাচ্চাগুলোর বয়স মাত্র চোদ্দ বছর। আর সে কিনা ওদের অপ্রয়োজনীয় নানান কথা বলে বিব্রত করতে যাচ্ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, কাদি খুবই বিব্রত হতো যদি সে গিয়ে বাচ্চাগুলোর সামনে বলত যে আফ্রিকাতে সে যে খামার বাড়িতে ছিল সেটা একটি বিলাসবহুল খামার বাড়ি মনে হতে পারে এমন কোনওকিছুই ওটাতে ছিল না। আসলেই ওটা ছিল একটি জনবহুল অথচ ছোট্ট মুর্গীর ফার্ম। সবচেয়ে বড় কথা, সেটা আফ্রিকাতেই ছিল না। তবে ওটা প্রকৃতপক্ষে এমন একটি স্থান ছিল যেখানে ঘাস এবং পাতার ঘ্রাণ থেকে শুরু করে আবহাওয়ার ক্ষুদ্রতম পরিবর্তন পর্যন্ত সবকিছুই এমনকি সেই খামারবাড়ির নামটি পর্যন্ত ছিল আফ্রিকান।

যতক্ষণ না ওর মেয়ে আবারও বন্ধুদের সাথে কথা বলা শুরু করলো ততক্ষণ পর্যন্ত মুনাহ রাগেদুঃখে পক্ষঘাতগ্রস্তের মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে একসময় রাগ মিইয়ে যেতে লাগলো আর তার বদলে সেখানে আফসোস এবং অপরাধবোধ ছড়িয়ে যেতে থাকলো।

বাচ্চাদের জগত তো একেবারেই ভিন্ন একটা জগত। তার উষ্ণ হৃদয়ের কোমলমতি মেয়েটা আর ওর দয়ালু বন্ধুবান্ধবরা যদি একটি আহত কচ্ছপ বা অসহায় সিল মাছকেও আটকে থাকতে দেখে, তাহলেও ওরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দেয়। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে যারা ওদেরকে এসব ব্যাপারে সহানুভূতিশীল করে তুলেছে, তাঁদের দুঃখকষ্টের ব্যাপারে কিন্তু এসব বাচ্চারা সবসময়ই উদাসীন হয়েই থাকে।

বিষণ্ণ স্মৃতিগুলো মুনাকে কাঁদায়। অতীত স্মৃতি সে ভুলতে পারে না কিছুতেই। সেই দুঃসহ স্মৃতি কেন ওকে ছেড়ে যায় না সেটাও সে বুঝতে পারে না। সে অবাক হয়ে ভাবে যে, বাড়ি থেকে দূরে থাকা রাস্তার মানুষগুলো কি ঠিক এইরকমভাবে ভুগতে থাকে? মুনা এটা ভেবেও বিস্মিত হয় যে দূরত্ব মানুষের স্মৃতিকে কতটাই না বদলে দেয়।

তার কানের কাছেই এসব কথাবার্তা আলোচিত হচ্ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা এমন ছিল যেন তাকে নিয়ে কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না। বরং এখানে সে যেন শুধুমাত্র একজন সাধারণ শ্রোতা।

মুনাহ’র বাবা বেশ কয়েক মাস বাড়িতে অনুপস্থিত ছিলেন। এবং তিনি যে খুব শিগ্রি বাড়িতে ফিরে আসবেন এমন কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না। ছোটবেলায় তার বাবার এই অনুপস্থিতি সে খেয়ালই করতো না। বাবার এইভাবে কিছুদিন পর পর বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টির সাথে সে পুরাপুরি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। বরং ওর বাবা যখন বাড়িতে থাকতো তখনই শুধু ও বুঝত যে বাবা বলে কেউ একজন বাড়িতে আছেন। এরপর এমন ঘটতে থাকল যে ওদের মা যে-কোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য অথবা যে-কোনো একটি বড় কাজ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ওদের বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকতেন। আসলে ওদের বাবাই সেটা চাইত যে ওদের মা যেন কোনো সিদ্ধান্ত একা না নেন। আর সেটা সম্ভবও ছিল না, কারণ, টাকাপয়সা সব বাবার কাছেই থাকতো। আর তিনি যখন অনেক দিন পর পর বাড়িতে ফিরে আসতেন শুধু তখনই তিনি বাড়ির প্রয়োজনে টাকাপয়সা খরচ করতেন আর সংসারের যা কিছু করার তখনই করতেন। পরে মুনাহ বুঝতে পেরেছিল যে বাবার অনুপস্থিতিতে মা আসলে অসহায় হয়ে পড়ে এবং মা’র সাথে সাথে থেকে মুনাহ আর ওর বড় বোনের জীবনটা বিষণ্ণতায় ভরে উঠেছে।

বাবার এই অনুপস্থিতি এমকময় মুনাহ’র মা’র জীবনকে একেবারে বিপন্ন করে তুলল। এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পরলেন। মাথায় হাত দিয়ে তখন তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। তাঁর মাথার ভেতর খুব ব্যাথা করছে বলে সারাক্ষণ অভিযোগ করতেন। একসময় এমন হল যে তিনি একেবারে অচল হয়ে পরলেন, এমনকি সামান্য একটা কাজ করতে পারার ক্ষমতাও তাঁর আর রইলো না। ওদের বিষণ্ণ মা যখন নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকতো তখন মুনাহ এবং ওর বড় বোন নিজেদের খিটখিটে মেজাজকে বশে রাখার জন্য মা’র চারপাশে পা টিপে টিপে ঘুরঘুর করতো। মা’র এই অবিরাম কান্নাকাটির সময় নিজেদের ভীষণ অসহায় লাগতো। তবে কোনো কিছুই ওদের মা’র এই অবিরাম কান্নাকাটি থামাতে পারতো না। মাঝে মাঝে এমন হতো যে ওদের মধ্যে কেউ একজন হয়তো সামান্য একটু ব্যাথা পেয়েছে আর তাতেই মা সারাদিন ধরে এমনই হাউমাউ করে কান্নাকাটি করতো যে শেষপর্যন্ত ওদের তিনজনের সম্মিলিত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নাকাটির মধ্য দিয়েই পরিস্থিতিটা একেবারে স্থবির হয়ে যেতো।

এরকমই একটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ওদের বড় খালা আমিনা এসে একদিন মুনাহকে তাঁর সাথে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমিনা খালা বললেন, “দুই মেয়েকে সামলাতে সামলাতেই তোদের মা একেবারে নাকাল হয়ে পড়েছে। আমি কয়েক দিনের জন্য আমার খামার বাড়িতে মুনাকে নিয়ে যাচ্ছি যাতে মুনাহ’র বড় বোন হাওয়া ওর মাকে দেখে-শুনে রাখতে পারে। আর মুনাহকে বললেন তুই আমার সাথে গ্রামে চল। ওখানে অনেক কিছু করার আছে। খামারবাড়িতে আমার সাথেই কাজে লেগে যেতে পারবি।

মুনাহ’র মনে করতে পারে না গ্রামে গেলে যে তার স্কুল কামাই হবে এ কথাটি কেউ উঠিয়েছিল কিনা। কিন্তু যাওয়ার কথা শুনেই তার প্রথমেই এ কথাটি মাথায় আসলো যে গ্রামে গেলে তার কয়েকদিনের জন্য স্কুল কামাই হয়ে যাবে। পরবর্তী একঘণ্টার মধ্যেই মুনা কয়েকদিন থাকার মতো জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়ে, শেষবার তার বাবার দেয়া উপহার পশমি চাদরটি গায়ে জড়িয়ে তার খালার সাথে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসস্ট্যান্ডে এসে অপেক্ষা করতে লাগলো। সেই শালটির কথা তার মনে আছে কারণ সেবারই প্রথম সে ওই শালটি পরেছিল। খামারটি তাদের শহর থেকে মাত্র পনেরো মাইল দূরে ছিল। ছোটবেলায় সে বহুবার সেই খামারে বেড়াতে গিয়েছে। আর ওমর খালুর সাথেও তার বছরে চার-পাঁচবার দেখা হোতো। কারণ খালু শহরে এলেই তাদের সাথে দেখা করার জন্য বাসায় আসতেন। তবে এবার যে সে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই এই খামারবাড়িতে থাকবে সেটি সে আগে বুঝতেই পারেনি।

ওমর খালু তেমন একটা হাসতেন না। তবে তিনি বদরাগী বা অসুখী মানুষও নন। তিনি গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন এবং হাসাহাসি কম করতেন। তবে মুনাহ’কে ফুটপাথ ধরে তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি মুচকি মুচকি হাসছিলেন। আর সেসময় তিনি ছাউনি দেওয়া বারান্দায় বসে বসে তালপাতা দিয়ে ঝুড়ি বানাচ্ছিলেন। তাদের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসার শব্দ শুনেই তিনি ওদের দিকে মুখ তুলে তাকালেন। এবং সেসময় তাঁর চেহারায় এক অব্যক্ত হাসি ফুটে উঠেছিলো।

আমিনা খালার বাড়িটা ছিল একটি ঢালের মাঝামাঝি স্থানে। সেই ঢালের নীচে দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট ঝর্না। ঝর্ণাটির দুপাশের ছয় একর জমি নিয়ে এই খামারটি গড়ে উঠেছে। খামারে কাটানো প্রথম রাতের কথা আর গ্রামের অখণ্ড নিস্তব্ধতার কথা মুনাহ’র সবসময় মনে পড়ে। সে রাতে চারপাশে কী ভীষণ সুনসান নীরবতা বিরাজ করছিল। সেই নিস্তব্ধটাকে ঠিক নীরবতা বলা যাবে না। কারণ, সেই নিঃসীম স্তব্ধতার ভেতরে আঁচড় কাটতো রাতের নিজস্ব অতিপ্রাকৃত বাতাসের হিসহিসে শব্দ। তাতে রাতের শ্রবণাতীত অবর্ণনীয় রহস্য আরও ঘনীভূত হত। বাড়ির বাইরে গেলেই সেই নিস্তব্ধতা তার উপর নীরব গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ঘুমের ভেতর সে শুনতে পেত এমনই এক তীক্ষ্ণ বিদীর্ণ কর্কশ চিৎকার যা ওকে ঘুম থেকে জেগে উঠতে বাধ্য করত। আর চোখ খুললেই সব মিলিয়ে যেত। আর সেসময় সে জলা থেকে ব্যাঙের গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেত না।

খালা তাকে থাকার জন্য একটি আলাদা রুম দিয়েছিলেন। আমিনা খালা বলেছিলেন, ‘এখন থেকে কয়েক সপ্তাহের জন্য তুমি এই রুমটিতেই থাকবে আর তাহলেই তুমি বেশ সাচ্ছন্দেই থাকতে পারবে বলে মনে হয়।‘ সেটি একটি ছোটখাটো বাড়ি ছিল। মাত্র দুটো শোয়ার ঘর আর একটি স্টোর রুম নিয়ে তৈরি করা ছোট কৃষক পরিবারের জন্য উপযুক্ত করে বানানো একটি বাড়ি। যে-ঘরটাতে এখন মুনাহ থাকছে, বছরের অন্য সময়ে এটাও একটি স্টোর রুম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। সাদা দেয়ালে রঙের ছোপ ছোপ দাগ আর ফলের রস ছিটকে পড়ার দাগ এমনভাবে স্থায়ী হয়ে দেয়ালে বসে গিয়েছে যে সেগুলোকে আর তুলে ফেলা সম্ভব হয়নি। পরিত্যক্ত ছোট জানালাটা ঢালের উপর ঝর্না থেকে বেশ দূরে একসারি কলাগাছের ডালপালা দিয়ে ঢেকে ছিল।

দিনের বেলা মুনাহ ওর আমিনা খালার সাথেই সময় কাটাত আর তাঁর ফাইফরমাশ খাটত। সে বুঝতে পারতো, যেহেতু সে একটি চোদ্দ বছরের কিশোরী, ফলে তার খালা তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখে। এদিকে খামারে থাকতে এসে সে খালাকে ঘরবাড়ি ঝাড়ু দেওয়া, রান্নাবান্না করা, কাপড় ধোয়া এইধরনের নানা কাজে সাহায্য করতে শুরু করলো। এমনকি ফলমূল ধুয়েমুছে ঝুড়ির ভেতর সাজিয়ে শহরের বাজারগুলোতেও পাঠাতে লাগলো। প্রথম প্রথম মুনাহ এসব কাজ করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়তো, কিন্তু পরে দেখা গেলো এরকম একঘেয়েমি কাজের মধ্যেই সে পরম আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে। বিকেলের দিকে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে না গেলে এবং ওমর খালুর মন-মেজাজ ভাল থাকলে তিনি প্রায়ই মুনাহকে নিয়ে খামারের নানান কাজকর্ম ঘুরে ঘুরে দেখাতেন। আবার মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে খালু আমের ঘন সবুজ বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাস স্ট্যান্ডের কাছে এসে নানান লোকের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। ওই বাস স্টপেজে একটা ছোট দোকান ছিল যেখানে বেঞ্চিতে বসে বসে লোকজন চা-কফি খেতে খেতে সবাই আড্ডা দিতো। প্রথমদিন তিনি মুনাহকে ওখানে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ”ভেতরে যাও আর সবার সাথে কথা বল।‘ এরপর থেকে গাছের নিচে বসে ওমর খালু যখন পুরুষদের সাথে গল্পে মেতে উঠতেন, মুনাহ তখন পেছনের বাড়ির ভেতর নারীদের সাথে আড্ডা দিত।

একদিন অন্য একজন লোক আড্ডা থেকে উঠে ওদের সাথে সাথে হেঁটে বাড়ির দিকে আসলো। লোকটা ওমর খালুর চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট ছিল। খুব সম্ভবত ত্রিশের কাছাকাছি হবে লোকটার বয়স। হাসিখুশি মুখ আর উজ্জ্বল চোখের সেই মানুষটার নাম ছিল ঈশা। ওমর খালু মুনাকে বলেছিল, ঈশা তাদের একজন কাছের প্রতিবেশী। মুনা তাঁদের পেছনে পেছনে হাঁটছিল এবং দুজনের কথাবার্তার ভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিল তাদের ভেতর বেশ অন্তরঙ্গতা আছে। পরে মুনা জানতে পেরেছিল ঈশা আগে প্রায়ই খালাখালুকে ওর বাসায় নিমন্ত্রণ করত। কিন্তু কিছুদিন আগে সে তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে পেম্বায় কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। ঈশা এলে বারান্দায় ওমর খালুর সাথে আড্ডা দিতেন আর কফি খেতে খেতে দুজনে হাসাহাসি করতেন। মাঝে মাঝে আমিনা খালাও তাদের সাথে বসতেন। ঈশা তাদের খুবই ভালো বন্ধু ছিল। আমিনা খালা তার স্ত্রী আর সন্তানদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। খালা তাকে ছেলে বলে ডাকতেন এবং নিজের ছেলের মতোই আদর করতেন।

ঈশা সব সময় মুনাহকে কাছে ডেকে খোঁজখবর নিত। কিন্তু মুনাহ অবাক হয়ে লক্ষ করে যে যখন অন্যরা কেউ খেয়াল করে না তখন লোকটি ভীষণ কৌতূহল নিয়ে ওকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। মুনাহ’র প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি হতো। বেশ কিছুদিন এভাবেই চলতে থাকলো। ধীরে ধীরে ঈশা প্রতিদিন আসতে শুরু করল। তার গভীর ও গোপন চাউনিতে মুনার শরীরে জ্বালা ধরে যেত। ঈশাকে দেখে মনে হতো ওর ওঠার কোনো তাড়া নেই। এরপর একদিন ঈশা মুনার দিকে তাকিয়ে গোপনে মুচকি হাসি ছুঁড়ে দিল। মুনাও অন্য দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ওর প্রতি মুচকি হাসি ছুঁড়ে দিলো।

সেখানে যাকিছু ঘটছিল তা অন্যদের না বোঝার কোনো কারণ ছিল না। এরপর ঈশা আসলেই ওমর খালুকে বেশ ভীত-সন্ত্রস্ত আর অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যেত। ও যেখানে থাকা অবস্থায় মুনাহ কাছে আসলেই আমিনা খালা ওকে কোনো না কোনো কাজ ধরিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিতো। তবে খালা-খালু দুজনের কেউই মুনাকে কখনই এ বিষয় নিয়ে কোনোকিছু বলেনি। ঈশার ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি আর চোরা চাহনি মুনাকে ভীষণ আলোড়িত করতো। আবার সে সবকিছু মিলিয়ে ভয়ও পেত। যেহেতু ঈশা ওকে কখনো কিছুই বলেনি আর তার খালা-খালুও এ ব্যাপারে বেশ সতর্ক ছিল ফলে মুনাহ নিজেকে নিরাপদই মনে করতো। এবং এ সবকিছুকে সে আসলে নিছক খেলা হিসেবেই নিয়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ একদিন রাতে দেখা গেলো ঈশা এসে মুনাহ’র জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত সে আগেও অনেকবার এভাবে জানালা দিয়ে মুনাহকে রাতের বেলা চুপি চুপি দেখেছে। জানালাটি অবশ্য দেয়ালের বেশ উঁচুতেই ছিল। আর কাঠের দুটি পাল্লা দিয়ে সেই জানালাটি আটকানো থাকতো। প্রথম দিকে মুনাহ একা একা ঘুমাতে ভয় পেত বলে কাঠের দুটি পাল্লাই বন্ধ রাখতো। পরে সে একটা পাল্লা খুলে রেখেই ঘুমাতে শুরু করে। তার সাথে কিছু একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে, এমন অনুভূতি নিয়েই সেদিন রাতে মুনাহ’র ঘুম ভেঙে গেলো। প্রথমেই তার চোখ পড়লো জানালার দিকে। কুয়াশাচ্ছন্ন সে রাতে বাইরে, একটি ছায়ামূর্তির মাথা জানালার পাশ থেকে সরে যেতে দেখার মতো যথেষ্ট আলোর আভা ছিল। আতঙ্কিত হয়ে নিজের ঊর্ধ্বশ্বাস চাঁপা দিতে মুনাহ নিজের হাত দিয়েই সে নিজের মুখ চেপে ধরল। মুহূর্তের মধ্যেই সে বুঝতে পারল লোকটি আসলে ঈশাই ছিল। নিজেকে শান্ত রেখে ঘুমের ভান করে সে চুপচাপ সেই রাতে বিছানায় পড়ে রইলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবার ঈশার ঘন শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। আর বুঝতে পারলো যে কোনো একটি বিশেষ আকর্ষণের টানে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরেই মাথার অবয়বটি অদৃশ্য হয়ে গেলো। কিন্তু সে ভয়ে জানালাটি আর আটকাতে পারলো না। মুনাহ এই চিন্তায় ভয় পাচ্ছিল যে, যদি ও জানালা বন্ধ যায় আর সেই সুযোগে ঈশা ওর কাছে আসার জন্য ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে তাহলে কী হবে? বাকী রাতটুকু ও আধো-ঘুম আধো-জাগরণের মধ্যে জানালার দিকে মুখ করে ঝিমোতে লাগলো।

পরদিন সকালে উঠেই সে বাইরেটা দেখতে গিয়ে দেখতে পেল যে জানালার নীচে একটা শক্ত মাটির ঢ্যালা পড়ে আছে যার উপর দাঁড়িয়ে ঈশা ঘরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে ছিল। যদিও সেখানে দাঁড়ানোর পরও ওকে জানালার গরাদের উপর ভর দিতে হয়েছিল। সেই সন্ধ্যায় ঈশা ওদের বাড়িতে দেখা করতে এলে মুনাহ উঠানের ভেতরেই বসে থাকে। এবং ঈশাকে অভিবাদন জানানোর সময় বুঝতে পারে যে ওর কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে।

সেই রাতে মুনাহ জানালার দুপাট’ই বন্ধ করে না ঘুমিয়েই জেগে জেগে ঈশার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। একসময় সে বুঝতে পারল যে ঈশা জানালার বাইরে এসে দাঁড়িয়ে জানালাটি ধাক্কা দিয়ে খোলার চেষ্টা করছে । অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করে জানালা খুলতে না পেরে সে মুনাহকে অনুনয় বিনয় করতে লাগলো, “দ্যাখো, তুমি আমার কাছ থেকে লুকিয়ে থেকো না, প্লিজ।”

মুনাহ অন্ধকারের ভেতর চুপচাপ শুয়ে শুয়ে ঈশার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সে জানালার গরাদ ছেড়ে দিতেই মুনাহ ধরাস করে পড়ার একটি শব্দ শুনতে পায়। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে সে ভীষণ ভীত এবং আতংকিত বোধ করতে লাগলো। সকালে উঠে প্রথমেই সে আমিনা খালাকে সবকিছু খুলে বলল। পুরো ঘটনা শুনে আমিনা খালা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। তাঁকে দেখে এতোটাই দুঃখী মনে হচ্ছিল যেন মুনাহ তাঁকে কোনো একটি ভীষণ লোকসানের কোনো খবর শুনিয়েছে। তিনি শুধু এটুকুই বললেন যে, ‘এসব কথা তোমার ওমর খালুকে কখনো বোলো না।‘

এরপর তিনি মুনাহ’কে ওর সমস্ত জামাকাপড় গুছিয়ে নিতে বললেন। এবং পরের এক ঘণ্টার মধ্যেই বাস ধরার জন্য তারা দুজন আম গাছের নিচের বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো। ওমর খালু ওদের এতো তাড়াহুড়োর কারণ বুঝতে না পেরে জানতে চাইলেন, ”কোনো সমস্যা হয়েছে? এভাবে হঠাৎ ওকে নিয়ে যাচ্ছ কেন?”

আমিনা খালা বললেন, ‘না কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু আমি ওর মাকে কথা দিয়েছিলাম যে আজকেই ওকে ওদের বাসায় পৌঁছে দেব। তাই ওকে রেখে আসতে যাচ্ছি। বুঝতেই তো পারছ বেশ কয়েক সপ্তাহ থেকেই তো ও এখানে আছে।‘

কাদির ডাকাডাকিতে হঠাৎ মুনাহ বর্তমানে ফিরে এলো, “মা! তুমি কোথায়?” কাদি চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ডাকতে লাগলো।

চোদ্দ বছর বয়সী ভীষণ নিরাপদ ও হাসিখুশি কিশোরী কাদি রান্নাঘরে এসে ঢুকল। মুনাহ এতক্ষণ খাবার টেবিলের চেয়ারে বসে অতীতের স্মৃতি রোমান্থন করছিল। কাদি পিছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরায় ওর লম্বা কালো চুলগুলো মুনাহ’র মাথার উপর ছড়িয়ে পড়লো।

মা’র কপালের উপর চুমু খেয়ে কাদি জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এখানে কি করছ মা?’

তারপর মুনাহ’কে কোনো কথার উত্তর দিতে না দিয়েই রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে বলে উঠলো, “আমরা কিন্তু আজকে সবাই মিলে অ্যামির বাসায় গিয়ে সিনেমা দেখব, বুঝলে? তবে চিন্তা কোরো না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তোমার কাছে তোমার মেয়ে ঠিকঠাক ফিরে আসবে।‘

মুনাহ কাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আচ্ছা শোন কাদি, ওটা কিন্তু আফ্রিকার কোনো খামার বাড়ি ছিল না, বুঝেছিস?’

“ওহ, ও! তুমি আমাদের সব গল্প শুনে ফেলেছ তাহলে?’ কাদি বলল।

‘হায় হায়! আমি তো ওদের কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য আর ওদেরকে হিংসায় জ্বালানোর জন্যে এসব চাপা মারছিলাম। তুমি এগুলোও শুনে ফেললে? যাহ্‌!’

 



অনুবাদক পরিচিতি
ফারহানা রহমান
কবি। গল্পকার। অনুবাদক। প্রবন্ধকার।
ঢাকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন