এনথনি ডোয়েরের গল্প : দ্য মাস্টার্স ক্যাসেল


অনুবাদ : কাউসার সারোয়ার

বার্কেসফিল্ডের বাসিল বেবিংটন বাস্কেটবলের মত কাঠের কাজেও সমান অদক্ষ। তরুণীদের সাথে আলাপ জমাতে সে পারলেও সে পদার্থবিদ্যাটা ভালোই জানে যার জোরে কলেজ শেষে বার্কেসফিল্ড অপটোমেট্রিতে চাকুরি পেতে তার সুবিধাই হয়েছে। বাসিলের পিতা-মাতার নিবাস টাম্পায়। গেলবার হারিকেন এন্ড্রুর আঘাতে উনাদের টাম্পার বাড়ির বেসমেন্ট পানি উঠেছিল। বাসিলের বয়স যখন একুশ তখন সে অনুভব করতে শুরু করলো তার নিরানন্দ জীবনে একজন নারী সঙ্গীর বড্ড অভাব। এ সময় নিতান্ত খেয়ালের বসে সে হাওয়াই দ্বীপের মাউনা কিয়া পর্বতের মানমন্দিরে অপটিকস টেকনিশিয়ান হিসেবে চাকুরির জন্য সে সাক্ষাৎকার দিতে গেল।

বাসিলের সাক্ষাৎকারটি অবশ্য পর্বতের চূড়ায় হয়নি। হয়েছিল সমতলে। জ্যোর্তিবিজ্ঞানীরা শুরুতেই তাকে কাজের ধরন সর্ম্পকে সর্তক করে দেন - কাজটিতে আছে নিদারুণ নিঃসঙ্গতা। টানা এক সপ্তাহ আগ্নেয়গিরি চূড়ায় একাকী বসবাস করতে হবে তাকে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের একজন তো কাজটিকে তুলনা করলেন মঙ্গলগ্রহের বাতিঘরের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে। কিন্তু বাসিল তখন নিজের জীবনের গতিপথ পাল্টাতে উদগ্রীব। তাই সে চুক্তিপথে সই করতে সে দেরী করল না। তারপর প্রয়োজনীয় শেষে ভাড়ার জিপগাড়িতে চেপে টানা দুই ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতার মানমন্দিরে এসে উপস্থিত হলো প্রথমবারের মত দায়িত্ব পালন করতে। পর্বতচূড়ায় তখন প্রবল বাতাসের ঝাপটায় পড়ছে বরফ। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা সে বাতাসের ঝাপটা মাথাকে স্পর্শ করার সাথে সাথে বাসিলের মনে হলো কেউ বুঝি তার মাথায় একটি কুড়াল দিয়ে আঘাত করছে।

এ সময় আচমকা মানমন্দিরের দরজা খুলে লালচে চুলের এক ছোটখাটো তরুণী ছুটে এলেন। এসেই তিনি বাসিলের শার্টের কলার চেপে টানতে টানতে তাকে নিয়ে গেল মানমন্দিরের ভেতর। বাসিল থতমত খেয়ে বলে উঠলো, ওও! কি . . .

বাসিল অবশ্য পুরো বাক্যটি শেষ করতে পারলো না। তাকে বাঁধা দিয়ে তরুণী বললেন, তাড়াতাড়ি ভেতরে আসুন বার্কেসফিল্ডের বাসিল বেবিংটন সাহেব।

তারপর সে জোর করে বাসিলের মুখে চারটি এ্যাসপিরিন আর বারো আউন্স ফ্রেসকা ঠেসে দিলো। একটু পর বাসিল যখন খানিকটা ধাতস্থ হল তখন সে বাসিলকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কম্পোস্টিং টয়লেট ও টেলিস্কোপটি দেখালো যার সাথে আমাদের কল্পনার কর্পোনিয়াস টাইপ বৃহৎ আকারের কোন টেলিস্কোপের কোন মিল নেই যেখানে ছোট একটি সিলিন্ডারে চোখ রেখে মহাকাশ দেখতে হয়। বরং এটি ছিল আড়াআড়িতে তেত্রিশ ফুটের দৈর্ঘ্যরে তিনশত টন ওজনের যৌগিক কাঁচের কাঠামো যা প্রতি সেকেন্ডে দুইবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে। তরুণীটির বয়স বাসিলের প্রায় সমান, নাম মুরিল ম্যাকডোনাল্ড। দেখতে বামনাকৃতির হলেও তার চলাফেরায় আছে খাঁচায় বন্দী জাগুয়ারের ক্ষিপ্রতা। কোন মাইক্রোওয়েভ না থাকার জন্য সে দুঃখ প্রকাশ করে জানালো মাইক্রোওয়েভ একটা ঠিকই ছিলো। কিন্তু সেটা রাতের বেলা এমন ভূতুড়ে আওয়াজ করছিল যে বাধ্য হয়ে সে একদিন ওটাকে রাস্তায় নিয়ে লাথি মেরে নিচে ফেলে দিয়েছে। বিদায় নেওয়ার সময় সে বাসিলের হাতে এক বাটি রেজিন ব্রাণ আর স্টিভ ওয়ন্ডার এর গানের সিডি দিয়ে বললো, যখন খুব বেশী একাকীত্বে ভুগবে তখন বারবার হাইয়ার গ্রাউন্ড শুনবে।

এক সপ্তাহ পর তোমার সাথে দেখা হবে-- কথাটি বলে মুরিল যতক্ষণে বিদায় নিলো ততক্ষণে বাসিল প্রায় শতভাগ নিশ্চিত সে ওর প্রেমে পড়েছে। চৌদ্দ হাজার ফুট নিচের সাগরসৈকতে পর্যটকরা যখন সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ এর শব্দ শুনতে শুনতে চিংড়ি ফ্রাই নিয়ে মেতে উঠেছে তখন পাহাড় চূড়ার বাসিন্দা বাসিলের কর্মঘন্টা মাত্র শুরু হয়েছে।

বাতাসের গতিবেগ মাপার সময় বাসিল ওয়ামিয়ারের জ্যোর্তিবিদদের রেডিও রিপোর্ট শুনলো। তারপর খুলে বসলো মুরিলের স্বহস্তে লিখিত লগবইটি। রাতের বেলা সে হাইয়ার গ্রাউন্ড গানটি বারবার শুনলো আর মিল্কি ওয়ের নিচে বোকার মতো নাচতে শুরু করলো ।

মানুষের শেখা শেষ হয় না
সৈনিকের উদ্বেগ কমে না
পৃথিবীর ঘূর্ণন থামে না

অবশেষে রবিবার মুরিল এসে উপস্থিত হলো পরের শিফটের দায়িত্ব পালন করতে। মুরিলকে দেখে বাসিলের হৃদয় হৃপিন্ডের খাঁচার ভেতর ব্যাঙের মত লাফাতে শুরু করলো। বাসিল তাকে নিজ হাতে কফি বানিয়ে খাওয়ালো আর জানালো গত ক’দিনে সে পঞ্চান্নটি উল্কাপাত দেখেছে। কথাটি শুনে মুরিলের সবুজ চোখে চাঞ্চল্য শুরু হয়। একথা সেকথার ফাঁকে সে বাসিলকে নিজের স্বপ্নের কথাম, নিজের বিশ্বাসের কথা শোনায়। মুরিল বিশ্বাস করে মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহ কোন না কোন সোলার সিস্টেমের অংশ। সে উচ্ছ্বাস ভরা কন্ঠে বাসিলকে বলে, ভাবো তো যদি প্রতিটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গ্রহরা ঘুরতে থাকে তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে ? যদি শত শত বিলিয়ন পৃথিবী মহাবিশ্বে থাকে তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? হয়তো এমন কোন পৃথিবী পাওয়া যাবে যেখানে আশি ফুট পর্যন্ত আমরা এক লাফে লাফিয়ে উঠতে পারবো! হয়তো এমনও পৃথিবী আছে যেখানে কচ্ছপের মত ক্ষুদ্রাকৃতির মানুষরা কচ্ছপের মত ক্ষুদ্রাকৃতির শহরে বসবাস করে।

পরবর্তী এক সপ্তাহে বাসিল কেবল মুরিলকেই স্বপ্ন দেখলো যেখানে মুরিল প্রচন্ড বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল সামলাতে ব্যস্ত। নিচ থেকে আগ্নেয়গিরির চূড়ার দিকে সে যতবারই দেখেছে ততবারই সে দেখেছে ঘন মেঘের আবরন চূড়াটিকে ঘিরে রেখেছে আর সেখানে একটু পর পর দেখা যায় বজ্রপাতের নীলচে আলো। বাসিলের মনে হচ্ছিলো মুরিল যেন কোন এক দেবীর মতই ওই চূড়ায় বসে আছে আর তার উপস্থিতিই ঘোষনা করছে ওই নীলচে আলো।

প্রতি রবিবারের এক ঘন্টা যখন তাদের শিফট পরিবর্তন হয় কেবল তখনি বাসিলের সাথে মুরিলের সাক্ষাৎ হতো। তা সত্ত্বেও বাসিল ভেবে পায় না তার জীবনের আর কোন মূর্হুতগুলোর সে এমন আকাঙ্খা নিয়ে অপেক্ষা করেছে। মুরিল কোনদিন তাকে স্পর্শ করেনি। সে কখনও খেয়াল করেনি বাসিলের সদ্য ছাঁটা চুলের স্টাইল কি কিংবা জিজ্ঞেস করেনি কিভাবে সে সপ্তাহটি কাটিয়েছে। মুরিল কখনও বলেনি তার কোন ব্রয়ফ্রেন্ড আছে কিনা। বরাবরই সে বাসিলকে দরজা খুলে দিয়েছে। নিয়ন্ত্রন কক্ষের ছোট বিছানায় পরিষ্কার চাদর বিছিয়ে রেখেছে। এভাবেই যখন সব কিছু ছক বেঁধে চলছিল তখন পঞ্চম মাসের মাথায় মুরিল একদিন বাসিলের কাঁধে খোঁচা মেরে বলল, বাসিল আমি সবসময়ই একটা কথা বলি। যদি তুমি সত্যিই কিছু পেতে চাও তাহলে তোমাকে তার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

কথাটি পরের পুরো সপ্তাহে বাসিলের একাকীত্বে বারবার ফিরে আসলো। ও কথার মাধ্যমে মুরিল কি বলতে চেয়েছে? কথাগুলো কি কেবল বাসিলের জন্যই সীমাবদ্ধ? কিছু শব্দটি দিয়ে কি সে তার নিজেকেই বুঝিয়েছে? সে কি এতদিন ধরে বাসিলের আহবানের জন্য অপেক্ষা করছে?

টানা সাতদিন চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় রাত কাটানোর পর রবিবার দিন বাসিল প্রোটকল ম্যানুয়ালের পৃষ্ঠা কেটে পঞ্চাশটি কাগজের হৃদয় তৈরী করলো। তারপর সে প্রতিটি কাগজে আবেগঘন ভাষায় লিখলো - মাছ যেমন পানিকে ভালবাসে আমি তেমনি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমাকে সেভাবেই ভালবাসি যেভাবে বেকনের সাথে ডিম মিশে আছে । তারপর কাগজের হৃদয়গুলোকে সে মানমন্দিরের সর্বত্র সেঁটে দিলো। হৃদয়গুলো জায়গা করে নিলো দরজার পেছনে, টয়লেট পেপারের রোলের ভেতর, রেজিন ব্রাণের ভেতর। মুরিল নিচ থেকে উঠে এলো উপরে আর বাসিল নেমে গেলো নিচে। সারাটা সপ্তাহ মুরিলের মনের অবস্থা কল্পনা করে বাসিলের দিন কাটলো। মুরিল হয়তো লেখাগুলো দেখে উচ্ছ্বাসিত হয়েছে, আবেগে ভেসেছে কিংবা নিদেনপক্ষে বিস্মিত হয়েছে । কিন্তু পরের সপ্তাহে বাসিল যখন মানমন্দিরে উঠার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল তখন ওয়াইমিয়া থেকে তাকে একজন তত্ত্বাবধায়ক ফোন করলেন। তিনি জানালেন তারা অভিযোগ পেয়েছেন বাসিল মুরিলের সাথে অশোভন আচরন করেছেন এবং অভিযোগের ব্যাপারে একজন আইনজীবীও খোঁজখবর নিচ্ছেন। তারা আর বাসিলকে কাজে রাখতে পারছেন না।

বাসিল চলে গেল ইউগুয়েনের এক অপথালমোলজিস্ট সেন্টারে। পরবর্তীতে সে যোগ দিলো পোকাটিলো শহরের ল্যান্সক্রাফটসে। শহরটি আইডাহোর নবম সুখী শহর। সে ভেবেছিলো দূরত্ব যত বাড়বে ততই তার হৃদয় ভাঙ্গার যন্ত্রণা কমবে। কিন্তু ক’দিন পরপর তার স্বপ্নে ঠিকই আগ্নেয়গিরি, চুল থেকে বিচ্ছুরিত বিদ্যুৎ এর দেবী আর অপমানের কথা ফিরে আসছিল। আকাশ যেভাবে নীলকে ভালবাসে আমি সেভাবে তোমাকে ভালবাসি। ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর ভেতর যে ভালবাসা, তোমার জন্য আমার তেমন ভালবাসা। বাসিল ভাবালো পৃথিবীর সকল এক তরফা ভালাবাসাগুলো আসলে কোথায় জমা যায়? এ কি বাতাসে মিশে যায় নাকি এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে ভেসে বেড়ায় আর হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় নিজেদের জন্য যোগ্য একটা স্থান ?

এভাবেই নব্বইয়ের দশক শেষ হলো। শুরু হয় পরের দশক। হাওয়াই থেকে বিদায় নেওয়ার এগারো বছর পর এক বৃহস্পতিবার বাসিলকে পাকড়াও করলো ইংরেজী বিভাগের মাতাল সেক্রেটারি ম্যাগস ফুটরেল যে কিনা আধা ঘন্টা ধরে বাসিলের নাম নিয়ে দুষ্টামি করার পর বাসিলের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে।

ম্যাগের গাড়িটি ছিল ফোর্ড রেঞ্জার। কম্বল পোড়ালের যেমন কালো রং হয় তেমনি রং তার চোখের চারপাশে। সে পছন্দ করে ডেফ ল্যাপার্ডের গান আর ঘুমের সময় সে যে টিশার্ট পরে তাতে লেখা থাকে - যে ঠোঁট মদ স্পর্শ করে সে ঠোঁট অন্য ঠোঁটে দ্রুত মিশে যায়। তারা অনাড়ম্বরভাবেই বিয়েটা সেরে নেয়। তারপর আল কমিক্স ওয়ারহাউজের বিপরীতের ক্লার্ক স্ট্রিটে দুই বেডের একটি র‌্যাঞ্জার বাড়ি ভাড়া নেয়। মাতৃত্বকালীন সময়ের পুরোটায় গম্ভীর, সংযত থাকার পর ম্যাগস ওটিসের জন্ম দেয়। ওটিসের চোখগুলো ছিল আকারে বড়। ওটিসের প্রথম বছরে বাসিল পোকাটিলোর প্রায় প্রতিটি টিলায় ওটিসকে স্ট্রলারে নিয়ে ঘুরেছে এবং এমনভাবে নিজের ওজন কমিয়েছে যেন সে জীবনের অনিশ্চিয়তাকে ঝেড়ে ফেলছে। এ সময়ের সেরা রাতগুলোতে সে তার জীবন কেমন হতে পারতো তা ভাবা বন্ধ করে তার বর্তমানে সে মেনে নিতে পারতো।

কিন্তু ওটিসের বয়স যখন পাঁচ তখন একদিন বাসিল টের পেলো ম্যাগস তার সকালের পেপসির সাথে জ্যাক ডেনিয়েল হুইস্কি মিশিয়ে পান করে। সে ম্যাগসের গাড়ির কম্পাটমেন্টে আধা বোতল আর ¯েœা বুটে এক পাঁইট হুইস্কি খুঁজে পায়। এ নিয়ে ম্যাগসের কাছে যখন সে জানতে চায় তখন ম্যাগস জানায় সে তার পানাসক্তি কমাবে এবং এখন থেকে সপ্তাহের যে বারগুলোর শেষে ণ আছে কেবল সেসব বারেই সে পান করবে। তারপর ম্যাগস রামাদায় একটা কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলে যায় এবং পরপর চার রাত আর বাড়ি ফিরলো না।

কিছুদিনের ভেতর দেখা গেলো ওটিস এক অখ্যাত সুপারহিরোর আলখেল্লা পরতে শুরু করেছে। কি কিন্ডারগার্ডেন কি দুপুরের খাবার এমনকি রাতের ঘুমানোর সময়েও সে আলখেল্লাটি পরে থাকতে শুরু করলো। ডাঃ ও’কিফী জানান ছেলেটি বাড়ির যন্ত্রণাকর পরিবেশ থেকে নিজেকে আড়াল করতে আলখেল্লার আশ্রয় নিয়েছে এবং শীঘ্রই এই অভ্যাস ত্যাগ করবে। কিন্তু দেখা গেলো আট বছর বয়সেও ওটিস আলখেল্লা ত্যাগ তো করলই না বরং গোসলের সময়েও তা পরতে শুরু করলো। ওদিকে ম্যাগসও রাতের বেলা মগ ভর্তি ওয়াইল্ড তুর্কি নিয়ে নিয়মিত বাড়ির গেস্ট রুমে অবস্থান করতে শুরু করলো। এ সময় রোজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে বাসিলের মনে হতো সাজা ভোগের জন্য সে কোন এক কারাগারে ফিরছে।

অক্টোবর মাসে আল কমিক্স ওয়ারহাউজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর নিকোলাস নামের এক মোটাসোটা সাদা দাঁড়ির ঠিকাদার ওয়ারহাউজের খালি ভবনে সংস্কার শুরু করে এবং ভবনের সামনে দুটো ধাতব টাওয়ার বসিয়ে মূল ফটকে লোহার ভারী গেট সংযোজন করে। পরবর্তী মার্চ মাসে ভবনের সামনে একটি সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেলো যার দু’পাশে ছিলো দুটি ধাতব মাথার খুলি যা থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো। সাইনবোর্ডটিতে লেখা ছিলো মাস্টার্স ক্যাসেল শীঘ্রই উদ্ভোধন হতে চলেছে।

নিকোলাস বাসিলকে আশ^স্ত করলো সংস্কারকৃত ভবনটিতে পারিবারিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। সে ওটিসকে হাই ফাইভ দিতে হাত উঁচিয়ে ধরে কিন্তুএকজন আগন্তুকের সাথে হাই ফাইভ দিতে ওটিস মোটেই আগ্রহ দেখালো না। নিকোলাস দেখতে ছিলেন অনেকটা কাঠের গুড়ায় আবৃত ফোকলা দাঁতের সেন্ট নিকের ন্যায়। তবে বাসিল নিকোলাসের আশ্বাসবাণীতে ভরসা পেলো না। সে ভাবলো শীঘ্রই এলাকাটি এস এন্ড এম ডানজনের মত বিনোদন কেন্দ্রে পরিনত হবে এবং ক্লার্ক স্ট্রিট পরিনত হবে বিপথগামী মানুষের আড্ডাখানায়। আর তেমনটা হলে এমন পরিবেশে সে নির্ঘাত উন্মাদ হয়ে পড়বে আর ওটিসের চিন্তার জগৎএও হবে স্থায়ী পরিবর্তন। তেমনটা হলে বাসায় ফেরার কোন টানই সে আর অনুভব করবে না।

এপ্রিলের প্রথম দিনটি ছিল অন্য রকম। সেদিন ম্যাগস বাসিলের আগে বিছানা ছাড়লো। তারপর একগাদা ডিম ভেজে ঘোষনা করলো আজ সে থেকে সে নিজের পায়ে আবারও শক্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সে তার গাড়িটা পরিষ্কার করবে, গাড়ির তেল পাল্টাবে এবং স্কুল শেষে আজ সে ওটিসকে ডাঃ ও’কিফী এর কাছে নিয়ে যাবে। ল্যান্সক্রাফটসের অফিস থেকে বিকেল চারটার বাসিল তাই বেশ ফুরফুরে মেজাজেই সেদিন ঘরে ফিরলো। তারপর একে একে অ্যালকোহলের সব বোতল এমনকি মাউথওয়াশ পর্যন্ত সে বেসিনে খালি করলো। এরপর চুলোতে মাশরুম সেদ্ধ বসিয়ে ব্রয়লার চালু করে সে রান্নাঘরের টেবিলে আইপ্যাড খুলে বসলো। প্রথমে সে কিছুক্ষণ বিড়ালের ইয়োগা দেখলো। তারপর দেখলো একটি ডলফিনের ভিডিও যেখানে দেখানো হল ডলফিনটি যখন দুঃখ পায় তার রং পাল্টে বেগুনী হয়ে যায়। এ ভিডিওটি দেখা শেষ না হতেই সে খুলে বসলো নতুন বেস্ট সেলিং বই মেমোয়ারস অফ এ প্ল্যানেট হান্টার সর্ম্পকে একটি নিবন্ধ যেখানে একটি ছবি দেখামাত্রই বাসিলের হৃৎপিন্ডটা যেন লাফ দিয়ে গলার কাছে চলে আসলো। ছবির মানুষটির নাম মুরিল ম্যাকডোনাল্ড।

সেই সবুজ চোখ, সেই সরু নাক। ল্যাব পোষাক পরিহিত আভিজাত্যময় মুরিলকে দেখে ভ্রম হয় এই ভেবে যে টেলিস্কোপ সেটের সামনে কমলা চুলের জোয়ান ডিডিয়ন বসে আছেন। প্রায় বিশ বছর পর মুরিলের কন্ঠাস্থির হাড় দেখামাত্র বাসিলের ভেতর যে আকাঙ্খার জোয়ার বয়ে গেল তাতে সে আনায়াসে পুরো রান্নাঘরটিকে এলোমেলো করে দিতে পারে।

নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে কিভাবে মুরিলের নেতৃত্বে নাসার একটি দল সৌরজগৎ এর বাইরে ৫৪০ টি নতুন গ্রহ আবিষ্কার করেছে এবং তারা খুঁজে পেয়েছে ৬০ আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবীর মতই আরেকটি পাথুরে গ্রহকে যার তাপমাত্রা জীবনধারনের উপযোগী। বর্তমানে মুরিল ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স এর একটি পদক লাভ করেছে, জনপ্রিয় টেলিভিশন শো টুডে শোতে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে এবং রানী এলিজাবেথ এর সাথে ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক এর ভোজে অংশগ্রহণ করেছে। বাসিল এবার মেমোয়ারস অফ এ প্ল্যানেট হান্টার বইটি ডাউনলোড করে তা খুলে বসলো। বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়েছে সাত বছর বয়সী মুরিলের কার্ডবোর্ড দিয়ে রকেট বানানোর গল্প। দ্বিতীয় অধ্যায়টি মুরিলের হাইস্কুল সম্পর্কিত। বইয়ের চল্লিশ পৃষ্ঠায় মুরিল বলল হাওয়াই দ্বীপের অবর্জারভেটরিতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার গল্প।

এ পর্যায়ে বাসিল রান্নাঘরের চারপাশে চট করে চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে। ঠিক আছে।

এ সময় সে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে লক্ষ্য করলো নিকোলাস এক টুকরো প্লাইউড হাতে নিয়ে মাস্টার্স ক্যাসেল থেকে বের হচ্ছে। আকাশের রং তখন বেগুনি। ঘড়িতে সময় সন্ধ্যা ছয়টা বেজে পনেরো মিনিট। পাঁচটার ভেতরেই ওটিসকে নিয়ে ম্যাগের ফিরে আসার কথা। বাসিল মাশরুম সেদ্ধটা সেন্টার পয়েন্টে বসিয়ে দিয়ে স্মৃতির ঝর্ণায় আবারও হারিয়ে গেলো।

রোজ সন্ধ্যায় যে পথটি অবর্জারভেটরির ছায়ায় ঢাকা পড়তো সে পথের উপরেই অবর্জারভেটরির ফ্যাকাশে গম্বুজটি আকাশের বুকে জ¦লজ¦ল করতো। গাড়ি থেকে নামার পর যে পথে দাঁড়িয়ে সে হাঁটু চেপে ধরে শ্বাস নিয়ে বুকের ধড়ফড়ানি কমিয়ে স্বাভাবিক করতো সে পথেই পাহাড়ের চূড়ো থেকে ধূলোর ঝড় নেমে আসতো। ওই একই পথ দিয়ে সে মুরিলের জন্য এনেছিলো দাদীমার তৈরী করা ম্যাকারনি ও চিজ। সেই সাথে আরো এনেছিলো মাইকেল বল্টনের সিডির রেকর্ড কারণ দোকানী বলেছিল ইনি নাকি শ্বেতাঙ্গ স্টিভ ওন্ডার।

পড়তে পড়তে বাসিল মনে মনে ভাবলো, হয়তো আমার উপস্থাপনা ভালো ছিল না, হয়তো আমি ছিলাম বেশী সরল কিন্তু আমার ভালবাসাটা ছিল শতভাগ খাঁটি, তাই না ?

আটচল্লিশ পৃষ্ঠায় মুরিল লিখেছে,

প্রতি সাত দিন অন্তর অপর অপটিকস টেকনিশিয়ান, একজন পুরুষ- অপরজন সবসময়ই থাকতেন পুরুষ- ফিরে আসতেন মন্থর গতিতে চোখ পিটপিট করে। এদিকে ঘুমের অভাব এবং পাতলা বাতাসের কারনে আমার চোখও ছোট হয়ে থাকতো। আমিও হারাতাম গতি।

প্রচন্ড ঠান্ডার রাতগুলোতে নির্জন একাকীত্বে তারার রাজ্যের ভেতর আমি অপেক্ষায় থাকতাম কখন বড় দরজাটি খুলে যাবে এবং প্রাচীন আলো এসে পড়বে আমার আয়নায়। এভাবেই আমি শিখেছিলাম কিভাবে দেখতে হয়।

সত্যি বলতে যখন অপর অপটিকস টেকনিশিয়ানরা আসতেন, তখনও আমি ফেরৎ যেতে চাইতাম না।

এরপর তৃতীয় অধ্যায়ের ভেতর মুরিল চলে যায় ক্যালটেকের কেপলার প্রোগ্রামে যোগ দিতে, এনি লেভটিজ এর সাথে ফটো শ্যুট করতে এবং ইত্যাদি ঘটনায়। এটা কি সম্ভব মুরিলের ৪৬০ পৃষ্ঠার বইতে বাসিলের জন্য একটা শব্দও খরচ করেনি?

বাসিল এবার বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো টেনে টেনে দেখলো। তারপর সার্চ বাটনে নিজের নামটি দিয়ে খুঁজলো। কোন কিছুই পাওয়া গেল না। ঘড়িতে সময় সাতটা বেজে পনেরো। র্ক্লাক স্ট্রিট রাতের অন্ধকারে ঢেকে আছে। বাসিলের মনে হলো সে পোড়া গন্ধ পাচ্ছে, তার জীবনের আর রান্না ঘরের। এ সময় স্মোক এলার্ট সিস্টেম ঘন্টা দিতে শুরু করলে সে তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া বের করে দিলো আর সেদ্ধ মাশরুমের প্যানটি চুলো থেকে সরিয়ে ছুঁড়ে ফেলল সামনের খোলা লনে। সাতটা বিশ মিনিটে বাসিল যখন রান্নাঘরের চেয়ারে দাঁড়িয়ে স্মোক ডিটেক্টরটি বন্ধ করছিলো তখন ম্যাগের ফোর্ড রেঞ্জার গাড়িটি তীব্র গতিতে মাশরুমের প্যান পেরিয়ে সামনের বাম্পারকে ঝোপের ভেতর ঢুকিয়ে থামলো।

গাড়ি থামা মাত্রই আলখেল্লাবিহীন ওটিস ফোঁপাতে ফোঁপাতে এক দৌড়ে চলে গেল নিজের রুমে। ম্যাগ গাড়ির ইঞ্জিন চালু রেখে দরজা বন্ধ না করে নিজের বড় হাতব্যাগটি নিয়ে দুলতে দুলতে ঘরের দরজাায় এসে বলল, ধোঁয়ায় দেখি সব ভরিয়ে রেখেছো।

ওটিসের কি হয়েছে?

ম্যাগ বাসিলের কথার জবাব না দিয়ে রান্নাঘরের ক্যাবিনেটগুলো খুলে ভেতরের জিনিসগুলো সব এলোমেলো করতে লাগলো। বাসিল আবারও জিজ্ঞেস করলো, এতক্ষণ কোথায় ছিলে? ওটিসের আলখেল্লা কোথায়?

ততক্ষণে ম্যাগ কেবিনেট থেকে আধা ডজন বোতল মেঝেতে ফেলেছে। রূঢ় গলায় সে বলল, আমি খুলে নিয়েছি ওই আলখেল্লা।

ডাঃ ও’কিফী খুলে নিতে বলেছেন আলখেল্লা?

না। ডাঃ ও-ফ্ল্যাপিং- কিফী বলেন নাই। আমি, আমি, আমি খুলেছি। ও’কিফীর ওখান থেকে বেরিয়ে আমি ওকে নিয়ে রমাদা বারে গিয়েছিলাম। বারের সবাই একমত যে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়–য়া কোন ছেলের সব সময় আলখেল্লা পরে থাকার কোন কারণ নাই এবং এভাবে আলখেল্লা পরে থাকলে ওর যে সহপাঠীরা ওকে এখনও পাগল ভাবেনি তারাও শীঘ্রই ওকে পাগল ভাবতে শুরু করবে। তাই আমি আলখেল্লাটি খুলে নিয়েছি।

বাসিল গম্ভীর গলায় বলল, তুমি আমাদের ছেলেকে নিয়ে বারে গিয়েছিলে?

হ্যাঁ। আমি ওকে মানুষ দেখাতে ওখানে নিয়ে গিয়েছি। সত্যিকারের সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ দেখাতে- কথাগুলো বলতে বলতে ম্যাগ পা পিছলে মেঝেতে পড়ে গেল।

ততক্ষণে বাসিল স্মোক ডিটেক্টর মেশিনটি খুলে ফেলেছে। তারপর ধীরে সুস্থে মেশিনটি রান্নাঘরের সিঙ্কের ভেতর ফেলে দিয়ে সে একটা জমাট পিজা ওভেনে বসিয়ে চলে গেল সদর দরজায়। দরজার বাইরে তখনও ম্যাগের গাড়ির ইঞ্জিনটি চলছিল। বাসিল নিজেই গাড়িটি ড্রাইভ করে গাড়িটিকে বাড়ির ড্রাইভওয়েতে নিয়ে পার্কিং করলো। তারপর গাড়িতে বসে হিসেব কষে বের করার চেষ্টা করলো তার কাছে থেকে মুরিলের আবিষ্কার করা ষাট আলোক বর্ষ দূরের অন্য পৃথিবীর দূরত্ব কত হতে পারে।

ঘরে ফিরে বাসিল দেখলো ম্যাগ ডিশওয়াসারে হেলান দিয়ে বসে আছে। বাসিলকে দেখে সে বিড়বিড় করে বলল, এপ্রিল হল সেই মাস যে মাসে জিনিষপত্র ফেলে দিতে হয় না।

বাসিল লক্ষ্য করল ম্যাগের হাতব্যাগের ভেতর ওটিসের আলখেল্লাটি রয়েছে। সে ব্যাগ থেকে আলখেল্লাটি বের করে নিজের হাতে নিলো। তারপর ওভেন থেকে পিজাটি বের করে তা কাটলো এবং দু টুকরো পিজা ও এক গ্লাস দুধ নিয়ে চলে গেল ওটিসের রুমে। তারপর পুত্রকে মেঝেতে বসিয়ে বন্ধ করে দিলো ঘরের দরজা। ওটিস যখন দুধের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিলো তখন বাসিল পুত্রের গলায় আলখেল্লাটা বেঁধে দিয়ে আলখেল্লা দিয়েই ছেলের চোখের জল মুছে দিলো। বাপ বেটা যখন নিরবে তাদের পিজার টুকরো শেষ করছিল তখন পুরো বাড়ি ছিল নিরব-নিস্তব। খাওয়ার পর ওটিস যখন ঘরের ভেতর খেলনা গাড়ি চালাতে শুরু করলো তখন বাসিল কল্পনায় দেখল সে পুত্রকে সাথে নিয়ে পোকাটিলো বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে যেখান থেকে তারা সারারাত বিমানে চেপে পরদিন দর্শক হিসেবে হাজির হবে টুডে শোতে যে শোতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে থাকবে মুরিল। শোয়ের ভেতর সে বাসিলকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে এবং শোয়ের ভেতরেই সে উপস্থাপক আল রকারের উদ্দেশ্যে বলে উঠবে এই মাত্র সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপটি আবিষ্কার করেছে। ভালবাসলে আক্ষেপ থাকে না কিন্তু তা প্রকাশ না করলে আক্ষেপ থেকে যায়। তারপর মুরিলের অনুরোধে নিরাপত্তাকর্মীরা বাসিল ও ওটিসকে নিয়ে যাবে অনুষ্ঠান মঞ্চে যেখানে মুরিল দু’হাত প্রসারিত করে বলবে, আসো আসো বার্কেসফিল্ডের বাসিল বেবিংটন। টিভি পর্দায় এসময় বাসিলকে দেখা যাবে বেশ চিকন এবং অনুষ্ঠানের প্রযোজকরা আল রকারকে তার কানে লাগানো এয়ারফোনে জানাবে অনুষ্ঠানটিকে নিয়ে এত টুইট হচ্ছে যে টুইটার ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। মূর্হুতগুলোকে যেন সে আরও লম্বা করতে থাকে। এ পর্যায়ে আল রকার ওটিসের সম্মানে ছোট একটি আলখেল্লা নিজের পেছনে ঝুলাবে যা দেখে সেদিন রাতেই পুরো আমেরিকার অর্ধেক মানুষ ছোট আলখেল্লা পরতে শুরু করবে। আল তাদেরকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি তার ইয়েটে কাটাতে আমন্ত্রন জানাবে যেখানে বাসিল তাকে মাশরুম ভাজা খাওয়াবে এবং ইয়েটের ছাদে বসে এক্স ব্যান্ড ডপলার রাডার দিয়ে ওটিসসহ ঝড়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে। বাসিলের তৈরী করা মাশরুম খেয়ে আল কিছুটা অশ্লীলভাবেই বলবে এটিই তার খাওয়া সেরা মাশরুম ভাজা। বাসিল প্রশংসাটা প্রশান্ত চিত্তে গ্রহণ করবে এবং সাথে সাথে এটাও বলবে তার শিশু পুত্রের সামনে যেন আল অশ্লীল শব্দ উচ্চারন না করে।

ওটিসের খেলনা যখন বাসিলের পায়ে আঘাত করে তখন বাসিল বাস্তব জগৎ এ ফিরে আসে। সে সামনের লনে গিয়ে পোড়া মাশরুম ভাজাটা তুলে নিয়ে ফেলে দেয় ডাস্টবিনে। এ সময় রাস্তার অপরপাশের মাস্টার্স ক্যাসেলের স্পটলাইট দুটো নিচ থেকে সরাসরি আকাশপানে আছড়ে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে বাসিল বিড়বিড় করে বলল, আমরা তো ফ্লোরিডায় যেতে পারি। সেখানে আমরা মা-বাবার সাথে থাকতে পারি।

বাসিল রান্নাঘরে ফিরে দেখে ম্যাগ ডিশওয়াশারে হেলান দিয়ে নাক ডাকছে। সে একটা বালিশ এনে ম্যাগের মাথার নিচে রাখলো। তারপর নিজের হাতের এঁটো বাসন পরিষ্কার করলো। বাসন পরিষ্কারের ফাঁকে বাসিল জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। দেখা গেলো মাস্টার্স ক্যাসাল এর ঠিকাদার নিকোলাস তার বাড়ির সদর দরজায় কিছু একটা রেখে যাচ্ছে। চোখাচোখি হতেই নিকোলাস বাসিলের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে নিজের ট্রাকে উঠে চলে গেলো। খানিক বাদে বাসিল সদর দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে দুটো হ্যাডল্যাম্প আর একটি খাম রাখা আছে। খামের উপর লেখা, ছেলেটাকে নিয়ে ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসো।

খামের ভেতর ছিল একটা কংঙ্কাল অবয়বের চাবির রিং আর একটি চাবি।

বাসিল ঘরে ঢুকে একে একে টেবিলের উপর রাখা নিজের আইপড, মেঝেতে পড়ে থাকা ম্যাগ আর নিজের হাতের চাবি রিংটি দেখলো। তারপর সোজা ওটিসের রুমে ঢুকে তার মাথায় একটা হ্যাডল্যাম্প বেঁধে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে সে পেছনের দরজা দিয়ে ঘর থেকে বের হলো যেন ছেলে তার মাকে ওভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাতে না দেখে। এরপর দু’জনে মাথার হ্যাডল্যাম্প জ¦ালিয়ে ক্লার্ক স্ট্রিট পেরিয়ে হাজির হলো মাস্টার্স ক্যাসেলের দোরগড়ায়। আশেপাশের বেগুনী আলোতে ক্যাসলটি দেখতে ছিল ভীতিকর। মনে হচ্ছিল পাতাল ফুঁড়ে হাজির হয়েছে কোন এক পিশাচের উপসানালয়।

আমরা কি ভেতরে যাচ্ছি বাবা? - ওটিস প্রশ্ন করল। বাসিল চাবি দিয়ে দরজাটা খুলতে খুলতে কল্পনা করলো ভেতরে ঢুকেই হয়তো তারা দেখতে চলেছে মুখে বল গ্যাগস বাঁধা, দেহের সাথে সেঁটে থাকা ল্যাটেক্সের পোষাক পরিহিত কিছু মানুষকে। কিন্তু তার পরিবর্তে সে তার টুপির আলোয় দেখলো প্রায় বিশ ফুট দূরে একটি দশ ফুট উঁচু দূর্গ দেখা যাচ্ছে যেখানে আছে চৌকা আকৃতির মিনার। মিনারে উড়ছে ছোট পতাকা। দূর্গের চারপাশে ঘিরে আছে পরিখা, তৃণভূমি ও গ্রাম যেখানে আছে কোমড় সমান উঁচু উইন্ডমিল আর আস্তাবল। প্রবাহিত হচ্ছে ছোট একটি নদী। আশেপাশে দেখা যাচ্ছে পাঁচ ফুট উঁচু ছোট ছোট ওক গাছ যার প্রতিটি ডালে অসংখ্য পাতা। পাতাগুলো দেখতে একেবারে জীবন্ত যার নিচে আছে ছোট ছোট ওয়াগন যার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তিন ইঞ্চি উচ্চতার কাঠুরিয়া। আলো আঁধারির অদ্ভূত আলোতে ওমন নিখুঁত, সূক্ষèভাবে তৈরী করা অপার্থিব জগৎকে দেখে বিভ্রান্ত বাসিল যেন ভাষা হারিয়ে ফেলে। ওটিসের কথায় বাসিলের চমক ভাঙ্গে। সে শুনলো ছেলে বলছে , বাবা এটা মিনি গলফ কোর্স! পুট-পুট!

তাদের বামদিকে নুড়ি পাথরের একটি রাস্তা ছিলো যেখানে সাইনবোর্ডে লেখা আছে গর্ত#১। বোর্ডের পাশেই দুটো গলফ দন্ড, দুটো বল, একটি স্কোরবোর্ড সত্যিকার ঘাসের উপর পড়ে থাকতে দেখা গেল। ওটিস তার নীল কোর্টের উপর আলখেল্লাটা ঝুলিয়ে কপালের ঠিক মাঝ বরাবর হেড ল্যাম্পটা সেট করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, রেডি?

বাবা-ছেলে গলফ দন্ড দুটো নিয়ে শুরু করল খেলা। তারা ফুটপাতে খেলল, টানেলের ভেতর খেলল, সিঁড়ির নিচে খেলল। এ সময় তারা দেখল কাঠের আস্তাবলের ভেতর কাঠের ছোটাকৃতির ঘোড়া, হাতুড়ি উঁচিয়ে নিশ্চল বসে থাকা খর্বাকৃতির কামার, বাসার চালের নিচে বাসা বানানোয় ব্যস্ত চড়–ইপাখি। প্রতিটা হোলে বল ফেলার মাধ্যমে তারা এগিয়ে গেল কেন্দ্রের দূর্গের দিকে। ওটিস খেলতে খেলতে উঠে পড়ল দূর্গের চারপাশের পানির উপর ভাসমান সেতুর উপর। গভীর মনোযোগের সাথে বলের গতিপথ মাপতে ব্যস্ত ওটিসকে দেখতে দেখতে বাসিল ভাবলো, মুরিলের স্মৃতিতে তার উপস্থিতি না থাকলেই বা কি এসে যায়? অবশেষে সে তার স্বপ্নকে বাস্তবে দেখেছে, দেখেছে অন্য আরেক পৃথিবীকে ঠিক যেভাবে নিকোলাস তৈরী করেছে তার পৃথিবীকে। অনেক সময় মানুষ কেবল নিজের ভালবাসাকেই ভালবাসে এবং এক্ষেত্রে আমরা কিই বা করতে পারি! অপ্রাপ্তিতে অবশ্য কিছু প্রাপ্তিও আছে। বাসিল ফ্লোরিডা চলে যাওয়ার বিষয়ে মনে মনে হিসেব কষতে শুরু করলো - বিমান ভাড়া, ম্যাগের সাথে বিচ্ছেদ, সন্তানকে নিজের কাছে রাখার অধিকার, স্কুলের খরচ, টাম্পাতে বাসিলের মা-বাবার বাড়ির আয়তন। বাসিল লক্ষ্য করল সে আবেগে ভারাক্রান্ত হচ্ছে না বরং নিজেকে তার অনেক হালকা মনে হচ্ছে যেন সে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এক টানে চৌদ্দ হাজার ফুট উঁচুতে উঠে এসেছে আর তার পায়ের নিচে ছড়িয়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃর্ণ জলরাশি।

বাবা-ছেলে এখন আঠারোতম গর্তের সামনে। ওটিস বাবার চেয়ে বিশ পয়েন্টে এগিয়ে। হেড ল্যাম্পের আলোয় বাসিল দেখলো দূর্গের প্রহরীরা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তীরন্দজরা তীর নিয়ে প্রস্তুত আর দুর্গের দেয়ালটি তার বুকে আটকে থাকা পরিখার এপাশ ওপাশ সংযোগকারী সেতুর সোনালী শেকলের মতই চকচক করছে ল্যাম্পের আলোতে। টি এর উপর নিজের বলটি বসাতে বসাতে হঠাৎ ওটিস বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কিন্তু আলখেল্লাটি আরও কিছুদিন পরবো।

আমি জানি বাবা।

আমার আরও কিছুদিন ওটা পরতে হবে।

তুমি যতদিন খুশি পরো।

ওটিস এবার গলফ দন্ড দিয়ে সজোরে বলটিতে আঘাত করলো আর বলটি গিয়ে পড়লো সোজা দেয়ালে আটকে থাকা ঝুলন্ত সেতুর মাঝখানের গর্তের ভেতর। এমন শট হাজারে একবার হয়। সাথে সাথে দূর্গটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠে। তিন ইঞ্চির প্রহরীরা তাদের চার ইঞ্চির হলবের্ডকে নিচু করলো। তীরন্দাজরা নিচু করলো তাদের ধনুক। দূর্গের জানালাগুলো সহ চারপাশের ওক কাঠের বনে আলো জ¦লে উঠলো। দূর্গের চিমনি দিয়ে সত্যিকার ধোঁয়া দেখা গেল আর আটকে থাকা ঝুলন্ত সেতুটি সশব্দে আছড়ে পড়ল পরিখার উপর। তারপর ব্যানারম্যানের রাজকীয় রক্ষীরা একে একে এসে দাঁড়াল সেতুর উপর। এক বীণাবাদক তাদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে আসলো এবং এমন সুরের ঝংকার তুললো যা শুনে কল্পনায় বাসিলের মনে হল সে স্টিভ ওন্ডারের হাই গ্রাউন্ড গানের সুর যেন শুনতে পাচ্ছে -

কেউ আমাকে নিচে নামাতে পারবে না

না না

যতক্ষণ না আমার পা পড়বে হাই গ্রাউন্ডে।

. . . একসময় বীণাবাদকের সুরের ঝংকার শেষ হয়। সে চলে যায় প্রাসাদের ভেতর। তার পিছু অনুসরন করে রাজকীয় প্রহরীরা। তারপর ঝুলন্ত সেতুটি উঠে আটকে যায় দূর্গের দেয়ালে। দূর্গের বাতির পাশাপাশি ওক বনের বাতিগুলোও একে একে নিভতে শুরু করে।

ওটিস এবার বাবার দিকে নিজের খেলার স্কোরটি দেখিয়ে বলল, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করেছি বাবা।

বাসিল ওটিসকে নিয়ে মাস্টার্স ক্যাসেলের বাইরে বেরিয়ে আসে রাতের আকাশের নিচে। তারপর ক্যাসলে তালা দিয়ে তারা ক্লার্ক স্টিটের কোনায় দাঁড়িয়ে হেডল্যাম্পের আলো নিভিয়ে উপরের দিকে তাকায়। সেখানে তারা দেখে ভেসে বেড়ানো মেঘের পেছনে জ্বলজ্বল করছে কয়েকটি তারা। আর তারা নিচ দিয়ে একটি জেট বিমান ডানার আলো জ্বালিয়ে নিভিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।




লেখক পরিচিতি
এনথনি ডোয়ের
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে ১৯৭৩ সালে জন্ম। 
ঔপন্যাসিক। গল্পকার। 
ছোটগল্পের বই : The Shell Collector (2002)
উপন্যাস : 
 About Grace। 





অনুবাদক পরিচিতি
কাউসার সারোয়ার
চট্টগ্রামে বাড়ি। 
কৃষিবিদ।
অনুবাদক। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ