চিনুয়া আচেবে'র গল্প : গৃহশান্তি



অনুবাদ : এলহাম হোসেন

জোনাথান ইওয়েগবু নিজেকে বিশেষভাবে সৌভাগ্যবান মনে করে। “সুখে-শান্তিতে বেঁচেবর্তে থাকো, বাবা”- আগেকার অনিশ্চিত ফুরফুরে দিনগুলোতে পুরাতন বন্ধুদের অভিবাদন জানানোর কেতাদুরস্ত রীতির চাইতে এখন এই বাক্যটিকেই তার কাছে বেশি অর্থপূর্ণ মনে হয়। এই অভিবাদনটির শব্দগুলো ওর হৃৎপিণ্ডের গভীরে ঢুকে পড়ে। পাঁচ-পাঁচটা অমূল্য সম্পত্তি নিয়ে যুদ্ধে বেঁচে গেছে সে। সে নিজে, ওর বউ মারিয়া আর ওর চার সন্তানের তিনজন। বোনাস হিসেবে পেয়ে গেছে ওর বাইসাইকেলটা। এটাও একটা অলৌকিক ব্যাপার। তবে পাঁচ-পাঁচটি মানব সন্তানের সঙ্গে এটির তো আর কোন তুলনা হয় না।

এই বাইসাইকেলের ছোট্ট একটি ইতিহাস আছে। যুদ্ধ যখন চরমে তখন একদিন এই বাইসাইকেলটি জরুরী সামরিক কাজে অধিগ্রহণ করা হয়। সেটা ছিল ওর জন্য বিরাট একটা ক্ষতির ব্যাপার। অফিসার মহাশয় যে একজন খাঁটি লোক, সে-ব্যাপারে জোনাথানের কোন সন্দেহ ছিল না। তাই সে আর বাধা দেয় নি। অফিসারের জীর্ণ পোশাক, একটা নীল আর একটা ধূসর কাপড়ের তৈরি জুতা ভেদ করে বের হয়ে আসা বৃদ্ধাঙ্গুল অথবা তাঁর দুই কাঁধে লাগানো পদমর্যাদা নির্দেশক দু’টি তারকা- কোন কিছুই জোনাথানকে মর্মপীড়া দেয় না। কারণ, অনেক ভালো এবং বীর সৈনিক দেখতে এ রকমই বা এর চেয়েও জীর্ণ। তাঁর আচার-আচরণে বরং এক ধরনের দৃঢ়তা বা বলিষ্ঠতার অভাব রয়েছে। জোনাথানের সন্দেহ, ও সম্ভবত অফিসারকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তার মন গলাতে পারবে না। কাজেই, তালপাতার আঁশ দিয়ে তৈরি ঝুড়ির ভেতর হাতড়াতে লাগলো। দুইটা পাউন্ড উদ্ধার করল। এই টাকাটা দিয়ে সে জ্বালানী কাঠ কেনে, যেটা আবার ওর বউ মারিয়া খুচরা মূল্যে ক্যাম্পের অফিসারদের কাছে বিক্রি করে। লভ্যাংশ দিয়ে কিছু মাছ আর কিছু চাল কেনে। সেই সঙ্গে ওর বাইসাইকেলটা ছাড়ানোর তদবির চালায়। সেই রাতে ঝোপের মধ্যে ছোট্ট একটি পরিষ্কার স্থানে, যেখানে ক্যাম্পের মৃতদের কবর দেওয়া হয়েছে এবং যেখানে ওর ছোট্ট ছেলেটারও কবর রয়েছে, সেখানে ও বাইসাইকেলটা পুঁতে রাখে। এক বছর পর যুদ্ধ শেষে যখন এটিকে মাটি খুঁড়ে বের করা হলো, তখন এতে পামওয়েলের গ্রীজ মাখানোর প্রয়োজন হলো। “রাখে আল্লাহ মারে কে,” সে বিস্ময় প্রকাশ করে বলে।

এবার আর কালক্ষেপণ না করে জোনাথান বাইসাইকেলটাকে ট্যাক্সিতে রূপান্তরিত করে ফেলে। বায়াফ্রার ক্যাম্পের অফিসার ও তাদের বউ, বাচ্চাকাচ্চাদের চার মাইল দূরের পাকা রাস্তায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে বেশ কিছু পয়সা কামায়। প্রতি ট্রিপে ওর ভাড়া ছয় পাউন্ড। যার টাকা আছে সে এভাবে খরচ করে মজা পায়। এক পক্ষকাল শেষে ওর সঞ্চয় দাঁড়ায় একশ’ পনের পাউন্ডে।

এরপর জোনাথান চলে গেল ইনুগুতে। ওখানে ওর জন্য আরেকটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার। বার বার চোখ ঘষতে ঘষতে তাকায়। দেখে, নাহ, ঠিকই দেখছে। বাড়িটা এখনও ওর চোখের সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ কথা বলাই বাহুল্য যে, এটিকে অনেক বড় আশীর্বাদ মনে হলেও যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া পরিবারের পাঁচ সদস্যের তুলনায় এটি কিছুই না। এই বিস্ময়টা হলো ওগুই ওভারসাইড গ্রামে ওর বাড়ি। আসলেই, রাখে আল্লাহ মারে কে? এর মাত্র দুই বাড়ি পরেই এক ধনী ঠিকাদারের বিশাল ইটপাথরের ইমারত তো এখন ইটপাথরের পর্বতে পরিণত হয়ে পড়ে আছে। আর জোনাথানের টিন আর কাদামাটির বøক দিয়ে তৈরি ছোট্ট, জীর্ণ বাড়িটি এখনও ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে আছে! এর দরজা-জানালার অবশ্য কোন হদিস নেই। চালের পাঁচটা টিনও উধাও। কিন্তু তাতে কী? ইনগুতে সে তো বেশ আগেভাগেই এসে পড়েছে। বনের মধ্য থেকে তার হাজার হাজার ভাই-বেরাদার বেরিয়ে আসার আগেই সে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পুরাতন টিন, কাঠ, ভেজা তক্তা সংগ্রহ করে ফেলে। একজন দুঃস্থ ছুতারমিস্ত্রি যোগাড় করে ফেলে। সে তার পুরাতন হাডুড়ি, ভোতা মসৃণ করার যন্ত্র আর কিছু বাঁকা, কিছু সোজা, মরিচা পড়া পেরেকের সাহায্যে কুড়িয়ে আনা কাঠ, কাগজ, টিন জোড়াতালি দিয়ে ওর দরজা-জানালাগুলো ঠিক করে দেয় পাঁচ নাইজেরিয়ান শিলিং বা পঞ্চাশ বায়াফ্রান পাউন্ডের বিনিময়ে। পঞ্চাশ পাউন্ড মজুরি শোধ করে দিয়ে উচ্চসিত পাঁচ সদস্যের মাথা নিজ কাঁধে নিয়ে জোনাথান গৃহে প্রবেশ করে।

মিলিটারীদের কবরস্থানের কাছ থেকে ওর বাচ্চারা আম কুড়িয়ে কয়েক পেনির বিনিময়ে সৈনিকদের বউদের কাছে বিক্রি করে। ওর বউ শিমের বিচির পাকোড়া বানিয়ে সকালের নাস্তা হিসেবে প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করে। এভাবে এরা দিনাতিপাত করতে থাকে। জোনাথান পরিবারের উপার্জিত টাকা সঙ্গে নিয়ে দ্বিচক্রযানে চেপে গ্রামে গ্রামে যায় তালমদিরা সংগ্রহ করতে। বাড়িতে এনে ঔদার্যের কার্পণ্য না করে এতে ট্যাপের পানি মেশায়। রাস্তার দু’পাশে সরকারী ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি পানি সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে। এই তালমদিরা দিয়েই সে সৈন্য ও স্বাস্থ্যবান পকেটওয়ালা ভাগ্যবানদের জন্য একটা মদের দোকান খুলে বসে।

খনির মজুর হিসেবে কয়লার কর্পোরেট অফিসে কর্মরত অবস্থায় প্রথম দিকে ওখানে সে প্রত্যেক দিন যেত। এরপর একদিন পর পর। তারপর সপ্তাহে একদিন। কিসে কী হয়, তা দেখার জন্য। অবশেষে একদিন সে যে জিনিসটা দেখতে পেল, তা হলো- তার ছোট্টা বাড়িটা তার ভাবনা নয়, বরং বড় এক আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। তার কিছু প্রাক্তন খনির শ্রমিক বন্ধু যাদের কাজ শেষে যাওয়ার কোন জায়গা নেই, তারা অফিসের বাইরে ঘুমায়। বোর্নভিটার কৌটোয় করে কয়েকজন মিলে খাবার রান্না করে খায়। সপ্তাহর পর সপ্তাহ কেটে যায়। জোনাথান কেন আর অফিসে আসে না, তা আর কেউ বলতে পারে না। জোনাথান ওর মদের দোকানের বাড়বাড়ন্তের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ দেয়।

কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে। পাঁচদিন লাইনের পর লাইনে দাঁড়িয়ে রোদের মধ্যে ধস্তাধস্তি করার পর জমানো টাকার ওপর প্রণোদনা হিসেবে অনাকাক্সিক্ষতভাবে জোনাথানের হাতে বিশ পাউন্ড এসে যায়। পেমেন্ট দেওয়া শুরু হলে অনেকের মতো ওর কাছে এটিকে ক্রিসমাস গিফ্ট বলে মনে হলো। আর যেহেতু খুব অল্পসংখ্যক লোকই এই প্রণোদনার দাপ্তরিক নাম জানে, তাই সবাই এর নাম দেয় বমম-ৎধংযবৎ.

যেইমাত্র জোনাথানের হাতের তালুতে পাউন্ডগুলো রাখা হলো সঙ্গে সঙ্গে সে হাত মুঠোবন্ধ করে ফেলল। পাজামার পকেটে মুঠো করা হাত আর নোটগুলো ঢুকিয়ে ফেলল। ও জানে, ওকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। দু’দিন আগেই এক লোককে সে জনসমূদ্রের মাঝখানে প্রায় পাগল হয়ে যেতে দেখেছে। কারণ, সে বিশ পাউন্ড পাওয়া মাত্রই কোন এক পাষাণ-হৃদয় গুণ্ডা সেটা পকেট থেকে মেরে দিয়েছে। যদিও এমন চরম দুর্দশায় কোন লোককে দোষারোপ করা উচিৎ নয়, তবুও লাইনে দাঁড়ানো অনেকেই বেচারার উদাসীনতার জন্য তাকেই দোষারোপ করেছে, বিশেষ করে, যখন সে পকেটের ভেতরের অংশ টান দিয়ে বের করে তাতে ইয়া বড় একটা গর্ত দেখায় যেন ওদিক দিয়ে খোদ চোরের মাথাটাই ঢুকে যাবে। তবে অবশ্য সে জোর দিয়ে বলছিল যে, টাকাটা সে তার অন্য পকেটে রেখেছিল। সেই পকেটও টেনে বের করে সে দু’টোর তুলনা করে দেখায়। যাই হোক, সবারই সাবধান হওয়াটা জরুরি।

জোনাথান শীঘ্রই টাকাটা বাম হাতে নিয়ে হাতটা পাজামার বাম পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল যাতে ডান হাতটা এই পরিস্থিতিতে কারও সঙ্গে করমর্দন করতে ব্যবহার করতে পারে। দৃষ্টিটা এমনভাবে ঠিক করে নিলো যেন সামনে থেকে এগিয়ে আসা কাউকেই সে দেখতে পাচ্ছে না। বাড়ি ফেরা পর্যন্ত কেউ অবশ্য ওর সঙ্গে করমর্দন করতে এলোও না।

স্বাভাবিকভাবেই জোনাথান বেশ ঘুমকাতুরে। তবুও সে-রাতে প্রতিবেশীদের একে একে সবাই ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত সে জেগে থাকলো। এমনকি রাত একটায় নৈশপ্রহরী ধাতবখণ্ডে একটা বাড়ি দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার পরও সে জেগে থাকলো। অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ল। তবে বেশিক্ষণ হয় নি। প্রচণ্ড শব্দে ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল।

‘দরজায় কড়া নাড়ে কে?’ পাশে শুয়ে ওর স্ত্রী ফিসফিস করে ওর কানে কানে বলে।

‘জানি না,’ এক নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে উত্তর দেয়।

দ্বিতীয়বার দরজায় এত জোরে আঘাতের শব্দ হলো যেন বাঁকা দরজাটা ভেঙ্গে পড়বে।

‘দরজায় কড়া নাড়ে কে?’ সে জিজ্ঞেস করে। ততক্ষণে ওর গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কাঁপছে।

‘আমরা নিশিকুটুম গো,’ ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর এলো, ‘দরজাটা খোল।’

এরপরে দরজায় আবার প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা পড়লো।

মারিয়া প্রথমে চিৎকার করে উঠলো। এরপর জোনাথান। তারপর ওদের বাচ্চাকাচ্চারা।

‘পুলিশ! চোর, চোর! প্রতিবেশী ভাইয়েরা, কে কোথায় আছো।’

‘পুলিশ, পুলিশ! আমরা শ্যাষ! আমরা গেছি রে! কে কোথায় আছো! তোমরা কি ঘুমিয়ে আছো? ওঠো, ওঠো! পুলিশ, পুলিশ!’

অনেকক্ষণ ধরে এ রকম চলল। তারপর সবকিছু হঠাৎ সুনসান নীরব। সম্ভবত ওদের চিৎকারে ভয় পেয়ে চোরেরা পালিয়ে গেছে। একেবারে পিনপতন নিস্তব্ধতা। কিন্তু এটি শুধুই ক্ষণিকের জন্য।

‘কী, সব শ্যাষ?’ বাহির থেকে একটা কণ্ঠ জিজ্ঞেস করলো। “ তোদের একটু সাহায্য করি, খাড়া। অই তোরা কই গেলি রে!”

‘পুলিশ, পুলিশ! চোর, চোর, চোর! তোমরা কে কোথায় আছো? বাঁচাও, আমরা শ্যাষ! পুলিশ ...!’

সর্দার ছাড়াও আরও পাঁচ জনের কণ্ঠ শোনা গেল।

এবার জোনাথান আর ওর পরিবারের সব সদস্য ভয়ে শক্ত হয়ে গেছে। মারিয়া আর ওর বাচ্চারা নীরবে কেঁদে চলেছে। যেন ওরা সবাই কোন এক নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেছে। জোনাথান অনবরত গোঙাচ্ছে।

চোরদের শোরগোলের পর চারপাশে নিস্তব্ধতা ভয়ঙ্করভাবে অনুরণিত হতে লাগলো। জোনাথান সর্দারকে কথা বলতে অনুনয় বিনয় করলো। ‘বন্ধু আমার,’ অবশেষে সর্দার বলে উঠল। “আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা তো করলাম ওদের ডাকতে। কিন্তু ওরা সবাই মনে হয় ঘুমাইয়া পড়ছে। অহন কও দেহি, তোমার লাইগা আমরা কী করতে পারি? অহন তুমিই ডাকতে পার, তাই না? নাকি চাও, তোমার পক্ষ থাইক্যা আমরা ডাইকা দিমু? তুমি বরঞ্চ পুলিশের কাছেই যাও। তাই না?

‘না, তা নয়।” সর্দারের সাঙ্গপাঙ্গরা উত্তর দেয়। জোনাথানের মনে হলো, এখন ও আগের চাইতে আরও বেশি সংখ্যক কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে। এবার সে আরও করুণভাবে গোঙাতে লাগলো। ওর পাগুলো মনে হলো অনেক জবুথবু মেরে গেছে, আর গলা তো শুকিয়ে কাঠ।

‘ দোস্ত, আর কতা কইতাছো না কেন? তুমি কি আমাগো পুলিশ ডাকতে কইতাছো? নাহ।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। এইবার লও, কামের কতাডা কই। আমরা খারাপ চোর নই। আমরা ঝক্কি-ঝামেলা এক্কেবারে পছন্দ করি না। ঝামেলা শ্যাষ। যুদ্ধ শ্যাষ। ব্যাপার-স্যাপার সব নিজেদের মধ্যেই ঠিক কইরা ফালামু। গৃহযুদ্ধ আর না। অহন শুধু গৃহশান্তির সময়। তাই না?’

‘তাই, তাই!’ ভয়ানক স্বওে বাকি সবাই বলে উঠল।

‘তোমরা আমার কাছে কী চাও? আমি গরীব মানুষ। আমার যা ছিল যুদ্ধে তার সব শেষ হয়ে গেছে। তোমরা আমার কাছে কেন এসেছ? কার কাছে টাকা আছে, তা তো তোমরা জানো। আমরা ...

‘ঠিক আছে! তুমি কইতাছ তোমার লগে বেশি ট্যাকা নাই। কিন্তু আমরা তো অহনো এক পয়সাও পাই নাই। তাই জানালাটা খুইল্লা একশ পাউন্ড দ্যাও দেহি। আমরা চইলা যাই। নইলে ভেতরে আইসা তোমাগো বডি বডি কইরা ফালামু। এই যে এমনে ...’

সয়ংক্রিয় বন্ধুক থেকে আগুনের গোলা ছুটলো আকাশের দিকে। এবার মারিয়া ও ওর বাচ্চারা সশব্দে কাঁদতে লাগলো।

‘আহা, ম্যাডাম কাইন্দেন না। হেইডার আর দরকার কি। আমরা তো কইলাম যে, আমরা ভালো চোর। খালি ট্যাকাটা দ্যান। লইয়া চইলা যাই। কোন ক্ষতি করুম না। কিরে আবি, ক্ষতি করুম নাকি?

‘এক্কেবারে না, ওস্তাদ!’ সবাই সমস্বরে বলল।

‘বন্ধুগণ,’ ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় জোনাথান বলল। তোমাদের কথা আমি শুনেছি। তোমাদের ধন্যবাদ। আমার যদি একশ পাউন্ড থাকত ...

‘দ্যাহ, দোস্ত, চালাকি করবা না। তোমার বাড়িতে আমরা চালাকি চালাকি খেলতে আহি নাই। যদি ভুল কইরা তোমার ঘরে ঢুইকা পড়ি তাইলে দেখবা আমরা ভালা মানুষ না। অতএব ...

‘খোদার কসম। তোমরা ভেতরে এসো। খোঁজো, যদি একশ পাউন্ড পাও তবে আমাকে, আমার বউকে ও বাচ্চা-কাচ্চাদের গুলি কওে, মেরে নিয়ে যাও। খোদার কসম করে বলছি। এ জীবনে যে সঞ্চয়টুকু আমি করেছি, তা হলো- এই বিশ পাউন্ড, আমার প্রণোদনার টাকা। এ টাকা ওরা আজই আমাকে দিয়েছে ...’

‘ঠিক আছে। সময় চইলা যাইতেছে। জানালা খোল দেহি। বিশ পাউন্ডই দিয়ে দে। এই ট্যাকা দিয়াই আমাগো চলতে হইবো।’

‘এবার সমস্বরে প্রতিবাদ ধ্বনিত হলো। ‘ঐ ব্যাডা মিছা কতা কইতাছে, ওস্তাদ। ওর লগে অ-নে-ক ট্যাকা আছে। চলেন, ভেতরে গিয়া খুইজ্জা দেহি ভালো কইরা। মাত্র বিশ পাউন্ড? ...’

‘চুপ কর! রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সর্দারের গগণবাদিারী কণ্ঠ ধ্বনিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে শোরগোল থেমে গেল। ‘কই রে? ট্যাকা লইয়া আয়। হপায়।’

‘আসছি,’ বিছানার মাদুরের ওপর রাখা কাঠের বাক্সের চাবির জন্য অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে বলে জোনাথান।

দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই প্রতিবেশীরা সমবেত হলো ওদের সমবেদনা জানানোর জন্য। জোনাথান তখন ফিতা দিয়ে পাঁচ গ্যালন ওজনের একটি জার ওর বাইসাইকেলের সঙ্গে বাঁধছিল। ওর স্ত্রী তখন চুলোর পাশে ঘামছে আর মাটির কড়াইয়ে ফুটন্ত তেলে শিমের বিচির পাকোড়া ভাজছে। এক কোণায় ওর বড় ছেলে গতদিনের তালমদিরার বোতল থেকে তলানি পরিষ্কার করছে।

‘এটা কোন ব্যাপার না,’ সমবেদনা জানাতে আসা প্রতিবেশীদের উদ্দেশে জোনাথান বলে। দড়িতে গীট দিতে দিতে বলতে থাকে, ‘প্রণোদনা আবার কী? গত সপ্তাহে কি আমি এর ওপর নির্ভরশীল ছিলাম? যুদ্ধে আমি যা হারিয়েছি, এটা কি তার চেয়েও বেশি কিছু? প্রণোদনা চুলোয় যা’ক! সবকিছু যেখানে গেছে এটাও যা’ক সেখানে । রাখে আল্লাহ মারে কে।


লেখক পরিচিতি
চিনুয়া আচিবে 
(ইংরেজি ও ইগবো ভাষায়: Albert Chinualumogu Achebe অ্যাল্‌বার্ট্‌ চিনুয়ালুমোগু আচিবে) (জন্ম: নভেম্বর ১৬, ১৯৩০ - মৃত্যু: মার্চ ২১, ২০১৩) নাইজেরিয়ার প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সমালোচক এবং অনেকের মতে আফ্রিকার আধুনিক সাহিত্যের জনক।

চিনুয়া আচিবের জন্ম ১৯৩০ সালের ১৬ই নভেম্বর। ১৯৯০ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে আসছিলেন চিনুয়া। এরপর তিনি প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় কোনো বই লেখেননি। সুদীর্ঘ ১৯ বছর তিনি বার্ড কলেজে ভাষা এবং সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আফ্রিকা-বিষয়ক গবেষণামূলক কাজের অধ্যাপনাও করেছেন। চাকরি জীবনে তিনি নাইজেরিয়ার ব্রডকাস্ট সার্ভিসে কাজ শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে লেখালেখি শুরু করেন।

লেখক হিসাবে চিনুয়া আচিবে আফ্রিকা এবং পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেছিলেন।তার কাজকে মানদণ্ড ধরেই প্রজন্মান্তরে আফ্রিকান লেখকদের কাজের মূল্যায়ন হয়ে আসছে। চিনুয়া আচিবে তাঁর সারা জীবনে ২০ টিরও বেশি লেখা লিখেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি লেখাই রাজনীতিবিদ এবং নাইজেরিয়ার নেতাদের নেতৃত্বে ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করে লেখা। তাঁর বইগুলোতে দেশটির ঔপনেবেশিক সময়ে ইবো সমাজের ঐতিহ্য, দেশটির সংস্কৃতিতে খ্রিষ্টানদের আগ্রাসন এবং আফ্রিকা ও পশ্চিমাদের মধ্যকার প্রথাগত দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠে এসছে। এছাড়াও তিনি অনেক ছ্টে গল্প, শিশু সাহিত্য এবং প্রবন্ধও রচনা করেছেন।১৯৫৮ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস 'থিংস ফল অ্যাপার্ট' এর সুবাদে ব্যাপক পরিচিত লাভ করেন আচিবে। উপন্যাসটি অনুবাদ হয়েছে ৫০ টিরও বেশি ভাষায়। তাছাড়া, বিশ্বজুড়ে উপন্যাসটি প্রায় ১ কোটি কপি বিক্রি হয়। তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস 'অ্যান্টহিলস অফ দি সাভানা' প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। ২০০৭ সালে চিনুয়া আচিবে সম্মানিত হন আন্তর্জাতিক ম্যান বুকার পুরস্কারে।

আফ্রিকার রাজনীতি ও পশ্চিমাদের চোখে আফ্রিকা যেভাবে চিত্রিত হয় সে প্রসঙ্গটি ঘুরে ফিরে এসেছে চিনুয়া আচিবের রচনায়। আফ্রিকার অনেক লেখকের প্রেরণার উৎস তিনি। চিনুয়া আচিবের লেখা কারাগারের দেয়ালও ভেঙে দেয়-বলে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা।




অনুবাদক
ড: এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক
ঢাকায় থাকেন। 
আফ্রিকান সাহিত্য বিশেষজ্ঞ। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ