মিস্টার পারসনস যখন হোটেল থেকে বের হলেন, ভিক্ষুকটি তখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।
সে ছিল অন্ধ। অন্ধদের চিরাচরিত সাদা ছড়ি ছিল তার হাতে। সেটা দিয়ে সামনের পথটা খুব সাবধানতার সাথে ঠুকে ঠুকে সে পার হচ্ছিল। অনাকর্ষণীয় গড়নের ঘাড়মোটা লোকটির বেশবাস নিতান্তই এলোমেলো আর সাধারণ। পরনের তেল চিটচিটে কোটটিতে অসংখা ভাঁজ আর এবড়োথেবড়ো তালির জঞ্জাল। হাতে ধরে রাখা ছড়িটির বাঁকানো অংশটুকু সে কোনও এক অর্থহীন কারণে প্রবল ঋজুতার সাথে আঁকড়ে রেখেছিল। কাঁধে ঝোলানো কালো ঝুলিটি দেখে ধারণা করা যাচ্ছিল, সে সম্ভবত কিছু একটা বিক্রি করে। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস চমৎকার একটা ফুরফুরে অনুভূতি ছড়াচ্ছিল। সেই সঙ্গে হলুদ উষ্ণ সূর্যের আরামদায়ক উত্তাপে চারপাশের আবহাওয়াটাও ছিল দারুণ মোলায়েম। মিস্টার পারসনস কিছু সময়ের জন্য হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং অন্ধ বৃদ্ধের ইতস্তত ভাবটা তিনি বেশ আগ্রহের সঙ্গেই লক্ষ করছিলেন।
আচমকাই তার মনের মধ্যে জগতের সকল অন্ধের প্রতি একটা শিশুসুলভ বোকা বোকা মায়ার অনুভূতি জন্ম নিলো। তিনি ভাবলেন এই যে আজকের দিনটাতে তিনি সুস্থসবল শরীরে বেঁচে আছেন, এটাই তো দারুণ আনন্দের একটা ব্যাপার! কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া এই অনন্য উপহারের কথা স্মরণ করলেন। সবকিছু তো অনেক অন্যরকমও হতে পারত!
মাত্র কয়েক বছর আগেও তিনি একজন সামান্য দক্ষ মজুরের চেয়ে বেশি কিছু ছিলেন না। অথচ আজ তিনি একজন সফল ইনস্যুরেন্স সেলসম্যান... যিনি কী না একইসাথে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত এবং প্রশংসিত। এই সবকিছুই তিনি একা নিজের কষ্ট আর চেষ্টা দিয়ে অর্জন করেছেন। তাকে সাহায্য করার মতো এই বিশাল পৃথিবীতে একজন মানুষও ছিল না। যাবতীয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করে তাকে এই সবকিছু অর্জন করতে হয়েছে। বয়স ছিল তখনও তারুণ্যের কোঠায়।
অনেকটা পেছনে ফেলে আসা বসন্তের সেই তরতাজা নীলাভ ঠান্ডা বাতাস আজ এই এতদিন পরেও যেন তার অনুভূতিগুলোকে স্পর্শ করে বয়ে যাচ্ছিল।
তিনি এক পা সামনে এগুতেই অন্ধ লোকটি তার সামনে এসে দাঁড়াল এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘স্যার, আমি কি আপনার এক মিনিট সময় পেতে পারি?’
মিস্টার পারসনস বললেন, ‘দেরি হয়ে গেছে! আমার আবার একটা অ্যাপয়েনমেন্ট আছে! তুমি কি আমার কাছে কিছু চাচ্ছ?’
‘আমি ভিক্ষুক নই জনাব! আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমি সত্যিই কোনো ভিক্ষুক নই! আমার কাছে একটি সিগারেট লাইটার আছে, যার দাম মাত্র এক টাকা। এই লাইটারই আমি বিক্রি করি। আপনি ভরসা রাখতে পারেন, এটি খুব ভালো মানের সিগারেট লাইটার।’ বলতে বলতেই অন্ধ লোকটি মি পারসনসের হাতে একটি ছোট জিনিস ধরিয়ে দিলো।
মিস্টার পারসনস একটু বিব্রত আর বিরক্ত হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি বেশ সুদর্শন মানুষ। তার দাগমুক্ত ফিটফাট ধূসর কোট, একই রঙের টুপি আর মালাক্কা ছড়ি তার চমৎকার আভিজাত্য আর অনন্য রুচিবোধের পরিচয় দিচ্ছিল। কিন্তু বলাইবাহুল্য, এই সিগারেট লাইটার বিক্রেতা লোকটি তাকে দেখতে পাচ্ছিল না।
মিস্টার পারসনস মৃদু সুরে বললেন, ‘কিন্তু... আমি তো ধূমপান করি না!’
অন্ধ লোকটি কাতরকণ্ঠে বলল, ‘স্যার, দয়া করে আমার কথা শুনুন। আমি জানি আপনি এমন অনেক মানুষকেই চেনেন যারা ধূমপান করে। তাদের জন্য এটি হতে পারে আপনার তরফ থেকে একটি চমৎকার ছোট্ট উপহার। স্যার, আপনি কি একজন অসহায় বৃদ্ধ লোককে একটু সাহায্য করতে চাইবেন না?’ বলতে বলতে লোকটি মি পারসনসের জামার হাতা আঁকড়ে ধরলো।
মিস্টার পারসনস একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে নিজের বুক পকেটে হাত ঢোকালেন আর দুইটা হাফ ডলার বের করে লোকটার হাতে দিলেন। বললেন, ‘নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারি! যেমনটা আপনি বললেন, আমি তো এটা যে কাউকেই দিতে পারি! লিফটবয়টাকেই তো দেওয়া যায় জিনিসটা! পেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে!’
তারপর নিজের কৌতুহল দমন করতে না পেরে তিনি একটু ইতঃস্তত করতে করতেই বললেন, ‘আপনি কি আপনার দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন?’
হাফ ডলারদুটিকে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে অন্ধ লোকটি বলল, ‘চৌদ্দ বছর স্যার! আজ চৌদ্দটি বছর ধরে আমি দৃষ্টিশক্তিহীন।’ তারপর একটু উদ্ধত ভঙ্গিতে যোগ করল, ‘ওয়েস্টবারির ঘটনা স্যার! আমিও সেই হতভাগ্যদের একজন ছিলাম!’
‘ওয়েস্টবারি! হ্যাঁ... সেই বড় কেমিক্যাল বিস্ফোরণের ঘটনাটা তো? মনে পড়েছে! অনেক বছর যাবত পত্র পত্রিকাগুলো এটা নিয়ে আর কিছুই বলছে না! অথচ এটা সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল!’
‘লোকে ওটার কথা ভুলেই গেছে স্যার! লোকটা ক্লান্তভাবে নিজের পা দুটোর জায়গা বদল করতে করতে বলে চলল, ‘এই কথা আমি আপনাকে বলতে পারি স্যার, যে মানুষটি এর মধ্য দিয়ে গেছে সে কোনোদিনও ওই স্মৃতি ভুলতে পারবে না। শেষ যে দৃশ্যটা আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম... তা হলো, পুরো কেমিক্যালের দোকানটা একটা বড় ধোঁয়ার কুণ্ডুলীতে পরিণত হয়েছিল। আশপাশের বাসাবাড়ির জানালাগুলোও ধোঁয়ায় ভরে উঠেছিল আর সেগুলো ভয়ঙ্কর এক বিকট শব্দ করে ফেটে পড়ছিল।’
মিস্টার পারসনস একটু কাশলেন। কিন্তু সেদিকে তখন অন্ধ লোকটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তখন তার স্মৃতির ট্রেনে উঠে পড়েছে। সেটার গতির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে চলছিল তার স্মৃতিচারণ। এছাড়া তখন সে আরেকটা জিনিসও একইসাথে চিন্তা করছিল। তার মনে হচ্ছিল, হয়তো মি পারসনসের পকেটে আরও কিছু হাফ ডলার থেকে থাকতে পারে! কাজেই তাকে আরও কিছুক্ষণ সময় আটকে রাখতে পারলে মন্দ হয় না!
সে বলোই যাচ্ছিল, ‘একবার চিন্তা করুন স্যার! প্রায় একশ আট জন মানুষ এই দুর্ঘটনাতে মারা গিয়েছিল, দুইশ জন আহত হয়েছিল এবং প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল! অন্ধ হয়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য... ঠিক একদম বাদুড়ের মতো!’ বলতে বলতে সে সামনে এগুচ্ছিল যতক্ষণ না তার নোংরা হাতটা মি পারসনসের কোটের ওপরে স্থির হয়।
‘আমি আপনাকে বলতে পারি স্যার, যুদ্ধেও এর চেয়ে খারাপ কিছু ঘটতে পারে না! আমি যদি যুদ্ধে আমার চোখদুটো হারাতাম তাহলেও একটা কথা ছিল! হয়তো তার জন্য আমাকে আফসোস করতে হতো না। কারণ আমি আমার পরবর্তী জীবনে এটার জন্য ভালো সেবা পেতে পারতাম। কিন্তু আমি তো ছিলাম সামান্য একজন মজুর মাত্র। সামান্য কিছু কাজ করতাম আর সেটার জন্যই আমার কপালে শুধু এটাই জুটেছে! হ্যাঁ আমি এটাই পেয়েছি! আমার ভাগ্যের সাথে ঠিক এটাই ঘটেছে! আর ওদিকে মালিকপক্ষ নিজেরা তখন মজারসে ফায়দা লুটছিল। কারণ তাদের বীমা করা ছিল। তাদের তো হারানোর কিছু ছিল না! তাই তাদের কোনো চিন্তাও ছিল না! তারা...’
‘বীমা!’ মিস্টার পারসনস এবারে অন্ধ লোকটির বলা কথাটার পুনরাবৃত্তি করলেন। হ্যাঁ... এই বীমাই তো আমি বিক্রি করি!’
‘আমি কীভাবে আমার চোখদুটো হারিয়েছিলাম সেই গল্পটা কি শুনবেন স্যার? শুনুন... আমি বলছি আপনাকে!’ অন্ধ লোকটি কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল। তার কথাগুলো এমন তিক্ত আর বারংবার গল্প এক গল্পের দিকে ইশারা করছিল... যা সে সবসময় কিছু পয়সার জন্যই বলে আসছিল।
‘আমি সেদিন সেই কেমিক্যাল শপটাতে ছিলাম। বিস্ফোরণের পরে সবাই সেখান থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাচ্ছিল। বের হতে পারার তখনও একটা সুযোগ ছিল, যদিও আশেপাশের ভবনগুলো তখন একের পর এক বিস্ফোরিত হচ্ছিল। অনেকেই এত কিছুর মধ্যেও নিরাপদে বাইরে বের হওয়ার রাস্তা ঠিকই খুঁজে নিচ্ছিল আর নিরাপদে সেখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আর ঠিক সেইসময়... যখন আমি প্রায় সেই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলাম, বড় বড় পাত্রগুলোর মাঝখানে হামাগুড়ি দিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছিলাম... ঠিক সেইসময় একটা লোক আমার পা চেপে ধরে বলল, প্লিজ আমাকে আগে যেতে যাও... প্লিজ! জানি না লোকটা কী ছিল! হয়তো নির্ঘাত পাগলই ছিল! তবে আমি তাকে মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছি!
সে ছিল অন্ধ। অন্ধদের চিরাচরিত সাদা ছড়ি ছিল তার হাতে। সেটা দিয়ে সামনের পথটা খুব সাবধানতার সাথে ঠুকে ঠুকে সে পার হচ্ছিল। অনাকর্ষণীয় গড়নের ঘাড়মোটা লোকটির বেশবাস নিতান্তই এলোমেলো আর সাধারণ। পরনের তেল চিটচিটে কোটটিতে অসংখা ভাঁজ আর এবড়োথেবড়ো তালির জঞ্জাল। হাতে ধরে রাখা ছড়িটির বাঁকানো অংশটুকু সে কোনও এক অর্থহীন কারণে প্রবল ঋজুতার সাথে আঁকড়ে রেখেছিল। কাঁধে ঝোলানো কালো ঝুলিটি দেখে ধারণা করা যাচ্ছিল, সে সম্ভবত কিছু একটা বিক্রি করে। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস চমৎকার একটা ফুরফুরে অনুভূতি ছড়াচ্ছিল। সেই সঙ্গে হলুদ উষ্ণ সূর্যের আরামদায়ক উত্তাপে চারপাশের আবহাওয়াটাও ছিল দারুণ মোলায়েম। মিস্টার পারসনস কিছু সময়ের জন্য হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং অন্ধ বৃদ্ধের ইতস্তত ভাবটা তিনি বেশ আগ্রহের সঙ্গেই লক্ষ করছিলেন।
আচমকাই তার মনের মধ্যে জগতের সকল অন্ধের প্রতি একটা শিশুসুলভ বোকা বোকা মায়ার অনুভূতি জন্ম নিলো। তিনি ভাবলেন এই যে আজকের দিনটাতে তিনি সুস্থসবল শরীরে বেঁচে আছেন, এটাই তো দারুণ আনন্দের একটা ব্যাপার! কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া এই অনন্য উপহারের কথা স্মরণ করলেন। সবকিছু তো অনেক অন্যরকমও হতে পারত!
মাত্র কয়েক বছর আগেও তিনি একজন সামান্য দক্ষ মজুরের চেয়ে বেশি কিছু ছিলেন না। অথচ আজ তিনি একজন সফল ইনস্যুরেন্স সেলসম্যান... যিনি কী না একইসাথে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত এবং প্রশংসিত। এই সবকিছুই তিনি একা নিজের কষ্ট আর চেষ্টা দিয়ে অর্জন করেছেন। তাকে সাহায্য করার মতো এই বিশাল পৃথিবীতে একজন মানুষও ছিল না। যাবতীয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করে তাকে এই সবকিছু অর্জন করতে হয়েছে। বয়স ছিল তখনও তারুণ্যের কোঠায়।
অনেকটা পেছনে ফেলে আসা বসন্তের সেই তরতাজা নীলাভ ঠান্ডা বাতাস আজ এই এতদিন পরেও যেন তার অনুভূতিগুলোকে স্পর্শ করে বয়ে যাচ্ছিল।
তিনি এক পা সামনে এগুতেই অন্ধ লোকটি তার সামনে এসে দাঁড়াল এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘স্যার, আমি কি আপনার এক মিনিট সময় পেতে পারি?’
মিস্টার পারসনস বললেন, ‘দেরি হয়ে গেছে! আমার আবার একটা অ্যাপয়েনমেন্ট আছে! তুমি কি আমার কাছে কিছু চাচ্ছ?’
‘আমি ভিক্ষুক নই জনাব! আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমি সত্যিই কোনো ভিক্ষুক নই! আমার কাছে একটি সিগারেট লাইটার আছে, যার দাম মাত্র এক টাকা। এই লাইটারই আমি বিক্রি করি। আপনি ভরসা রাখতে পারেন, এটি খুব ভালো মানের সিগারেট লাইটার।’ বলতে বলতেই অন্ধ লোকটি মি পারসনসের হাতে একটি ছোট জিনিস ধরিয়ে দিলো।
মিস্টার পারসনস একটু বিব্রত আর বিরক্ত হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি বেশ সুদর্শন মানুষ। তার দাগমুক্ত ফিটফাট ধূসর কোট, একই রঙের টুপি আর মালাক্কা ছড়ি তার চমৎকার আভিজাত্য আর অনন্য রুচিবোধের পরিচয় দিচ্ছিল। কিন্তু বলাইবাহুল্য, এই সিগারেট লাইটার বিক্রেতা লোকটি তাকে দেখতে পাচ্ছিল না।
মিস্টার পারসনস মৃদু সুরে বললেন, ‘কিন্তু... আমি তো ধূমপান করি না!’
অন্ধ লোকটি কাতরকণ্ঠে বলল, ‘স্যার, দয়া করে আমার কথা শুনুন। আমি জানি আপনি এমন অনেক মানুষকেই চেনেন যারা ধূমপান করে। তাদের জন্য এটি হতে পারে আপনার তরফ থেকে একটি চমৎকার ছোট্ট উপহার। স্যার, আপনি কি একজন অসহায় বৃদ্ধ লোককে একটু সাহায্য করতে চাইবেন না?’ বলতে বলতে লোকটি মি পারসনসের জামার হাতা আঁকড়ে ধরলো।
মিস্টার পারসনস একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে নিজের বুক পকেটে হাত ঢোকালেন আর দুইটা হাফ ডলার বের করে লোকটার হাতে দিলেন। বললেন, ‘নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারি! যেমনটা আপনি বললেন, আমি তো এটা যে কাউকেই দিতে পারি! লিফটবয়টাকেই তো দেওয়া যায় জিনিসটা! পেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে!’
তারপর নিজের কৌতুহল দমন করতে না পেরে তিনি একটু ইতঃস্তত করতে করতেই বললেন, ‘আপনি কি আপনার দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন?’
হাফ ডলারদুটিকে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে অন্ধ লোকটি বলল, ‘চৌদ্দ বছর স্যার! আজ চৌদ্দটি বছর ধরে আমি দৃষ্টিশক্তিহীন।’ তারপর একটু উদ্ধত ভঙ্গিতে যোগ করল, ‘ওয়েস্টবারির ঘটনা স্যার! আমিও সেই হতভাগ্যদের একজন ছিলাম!’
‘ওয়েস্টবারি! হ্যাঁ... সেই বড় কেমিক্যাল বিস্ফোরণের ঘটনাটা তো? মনে পড়েছে! অনেক বছর যাবত পত্র পত্রিকাগুলো এটা নিয়ে আর কিছুই বলছে না! অথচ এটা সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল!’
‘লোকে ওটার কথা ভুলেই গেছে স্যার! লোকটা ক্লান্তভাবে নিজের পা দুটোর জায়গা বদল করতে করতে বলে চলল, ‘এই কথা আমি আপনাকে বলতে পারি স্যার, যে মানুষটি এর মধ্য দিয়ে গেছে সে কোনোদিনও ওই স্মৃতি ভুলতে পারবে না। শেষ যে দৃশ্যটা আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম... তা হলো, পুরো কেমিক্যালের দোকানটা একটা বড় ধোঁয়ার কুণ্ডুলীতে পরিণত হয়েছিল। আশপাশের বাসাবাড়ির জানালাগুলোও ধোঁয়ায় ভরে উঠেছিল আর সেগুলো ভয়ঙ্কর এক বিকট শব্দ করে ফেটে পড়ছিল।’
মিস্টার পারসনস একটু কাশলেন। কিন্তু সেদিকে তখন অন্ধ লোকটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তখন তার স্মৃতির ট্রেনে উঠে পড়েছে। সেটার গতির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে চলছিল তার স্মৃতিচারণ। এছাড়া তখন সে আরেকটা জিনিসও একইসাথে চিন্তা করছিল। তার মনে হচ্ছিল, হয়তো মি পারসনসের পকেটে আরও কিছু হাফ ডলার থেকে থাকতে পারে! কাজেই তাকে আরও কিছুক্ষণ সময় আটকে রাখতে পারলে মন্দ হয় না!
সে বলোই যাচ্ছিল, ‘একবার চিন্তা করুন স্যার! প্রায় একশ আট জন মানুষ এই দুর্ঘটনাতে মারা গিয়েছিল, দুইশ জন আহত হয়েছিল এবং প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল! অন্ধ হয়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য... ঠিক একদম বাদুড়ের মতো!’ বলতে বলতে সে সামনে এগুচ্ছিল যতক্ষণ না তার নোংরা হাতটা মি পারসনসের কোটের ওপরে স্থির হয়।
‘আমি আপনাকে বলতে পারি স্যার, যুদ্ধেও এর চেয়ে খারাপ কিছু ঘটতে পারে না! আমি যদি যুদ্ধে আমার চোখদুটো হারাতাম তাহলেও একটা কথা ছিল! হয়তো তার জন্য আমাকে আফসোস করতে হতো না। কারণ আমি আমার পরবর্তী জীবনে এটার জন্য ভালো সেবা পেতে পারতাম। কিন্তু আমি তো ছিলাম সামান্য একজন মজুর মাত্র। সামান্য কিছু কাজ করতাম আর সেটার জন্যই আমার কপালে শুধু এটাই জুটেছে! হ্যাঁ আমি এটাই পেয়েছি! আমার ভাগ্যের সাথে ঠিক এটাই ঘটেছে! আর ওদিকে মালিকপক্ষ নিজেরা তখন মজারসে ফায়দা লুটছিল। কারণ তাদের বীমা করা ছিল। তাদের তো হারানোর কিছু ছিল না! তাই তাদের কোনো চিন্তাও ছিল না! তারা...’
‘বীমা!’ মিস্টার পারসনস এবারে অন্ধ লোকটির বলা কথাটার পুনরাবৃত্তি করলেন। হ্যাঁ... এই বীমাই তো আমি বিক্রি করি!’
‘আমি কীভাবে আমার চোখদুটো হারিয়েছিলাম সেই গল্পটা কি শুনবেন স্যার? শুনুন... আমি বলছি আপনাকে!’ অন্ধ লোকটি কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল। তার কথাগুলো এমন তিক্ত আর বারংবার গল্প এক গল্পের দিকে ইশারা করছিল... যা সে সবসময় কিছু পয়সার জন্যই বলে আসছিল।
‘আমি সেদিন সেই কেমিক্যাল শপটাতে ছিলাম। বিস্ফোরণের পরে সবাই সেখান থেকে দৌড়ে বের হয়ে যাচ্ছিল। বের হতে পারার তখনও একটা সুযোগ ছিল, যদিও আশেপাশের ভবনগুলো তখন একের পর এক বিস্ফোরিত হচ্ছিল। অনেকেই এত কিছুর মধ্যেও নিরাপদে বাইরে বের হওয়ার রাস্তা ঠিকই খুঁজে নিচ্ছিল আর নিরাপদে সেখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আর ঠিক সেইসময়... যখন আমি প্রায় সেই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলাম, বড় বড় পাত্রগুলোর মাঝখানে হামাগুড়ি দিয়ে কোনোমতে পার হচ্ছিলাম... ঠিক সেইসময় একটা লোক আমার পা চেপে ধরে বলল, প্লিজ আমাকে আগে যেতে যাও... প্লিজ! জানি না লোকটা কী ছিল! হয়তো নির্ঘাত পাগলই ছিল! তবে আমি তাকে মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছি!
লোকটা আমার চেয়ে আকার আকৃতিতে বেশ বড়সড় ছিল আর সে আমাকে সবলে টেনে পিছনে ঠেলে দিয়েছিল তারপর আমার ওপর দিয়েই সেই জায়গা পার হয়ে চলে যায়! আমাকে ময়লা আবর্জনার মধ্যে ফেলে দিয়ে সে সেখান থেকে পালিয়ে গেল! আমি সেখানে পড়ে রইলাম নিতান্তই অসহায়ের মতো। চারপাশের বিষাক্ত ধোঁয়া আর গ্যাস আমাকে প্রায় আচ্ছাদিত করে ফেলছিল...’ কথাটা শেষ করে অন্ধ লোকটি বহুল চর্চিত কান্না গিলে ফেলে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। পরের কথাগুলো সে না বললেও কল্পনা করে নেওয়া যায় এভাবে, ‘খুব খারাপ সময়... সত্যিই খুব খারাপ সময় আমি পার করেছি স্যার!’
অন্ধ লোকটি এটুক বলে শেষ করল, ‘স্যার... এটিই আমার গল্প!’
বসন্তের স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা কম্পমান বাতাস তাদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মিস্টার পারসনস এবারে মুখ খুললেন, ‘গল্পটা বললে বটে কিন্তু ঠিকঠাক তো বললে না! গল্পটা ঠিক এরকম নয়। বরং অনেকটাই অন্যরকম!’
অন্ধ ভিক্ষুকটি ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠে বলল, ‘গল্পটা এরকম নয়? কী বলতে চাইছেন আপনি?’
মিস্টার পারসনস বললেন, ‘তুমি যে গল্পটা শোনালে তা সত্য বটে! এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। তবে তুমি গল্পটাকে একটু ঘুরিয়ে বলেছ!’
‘ঘুরিয়ে বলেছি?’ অন্ধ লোকটি প্রচণ্ড বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল। ভেতরের কাঁপুনিটা তখন তার সর্বাঙ্গে ছড়াতে শুরু করেছে। সে বলল, ‘গল্পটা আমি কীভাবে ঘুরিয়েছি বলুন তো স্যার...’
‘আমিও ছিলাম সেই কেমিক্যাল শপে। গল্পটা তুমি বলেছ আমার দিক থেকে। আমি সেই জায়গাটা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তখন তুমি আমার পা পেছন থেকে টেনে ধরেছিলে আর আমার ওপর দিয়ে পার হয়েছিলে। কারণ তুমি ছিলে আমার চেয়ে অনেকটাই বড়সড়... মি মার্কোয়া!’
অন্ধ লোকটি তখন যেন পাথরে পরিণত হয়েছে। অনেকক্ষণ সে একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। জোরে জোরে ঢোঁক গিলছে সে। তারপর হঠাৎই রীতিমত ঝাঁপিয়ে উঠে বলল, ‘পারসনস... ঈশ্বরের কসম... ঈশ্বরের কসম... আমি ভাবছিলাম হয়তো এটা তুমিই হবে!’ তারপর সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ যা তুমি বললে সেটাই ঠিক... হয়তো সেটাই ঠিক... কিন্তু কী আর আসে যায় এখন বলো? আজ আমি অন্ধ আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনছ আর হয়তো প্রতি মুহূর্তেই মনে মনে হাসছ এই ভেবে যে, আমি আজ অন্ধ হয়ে গেছি!’
অন্ধলোকটির চিৎকার শুনে পথচলতি লোকজন তার দিকে ফিরে ফিরে দেখতে লাগল। সে আবার বলে উঠল, ‘তুমি পার হতে পেরেছ মিস্টার পারসনস, আমি পারিনি! বুঝতে পেরেছ? শুনতে পাচ্ছ তুমি আমার কথা? দেখো, নিজে চেয়ে দেখো... আজ আমি অন্ধ হয়ে গেছি!’
‘ওয়েল... এটা নিয়ে এত হট্টগোল করো না মার্কোয়া!’ মিস্টার পারসনস বললেন, ‘অন্ধ শুধু তুমি একা নও, আমিও!’
----------------
বসন্তের স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা কম্পমান বাতাস তাদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মিস্টার পারসনস এবারে মুখ খুললেন, ‘গল্পটা বললে বটে কিন্তু ঠিকঠাক তো বললে না! গল্পটা ঠিক এরকম নয়। বরং অনেকটাই অন্যরকম!’
অন্ধ ভিক্ষুকটি ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠে বলল, ‘গল্পটা এরকম নয়? কী বলতে চাইছেন আপনি?’
মিস্টার পারসনস বললেন, ‘তুমি যে গল্পটা শোনালে তা সত্য বটে! এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। তবে তুমি গল্পটাকে একটু ঘুরিয়ে বলেছ!’
‘ঘুরিয়ে বলেছি?’ অন্ধ লোকটি প্রচণ্ড বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল। ভেতরের কাঁপুনিটা তখন তার সর্বাঙ্গে ছড়াতে শুরু করেছে। সে বলল, ‘গল্পটা আমি কীভাবে ঘুরিয়েছি বলুন তো স্যার...’
‘আমিও ছিলাম সেই কেমিক্যাল শপে। গল্পটা তুমি বলেছ আমার দিক থেকে। আমি সেই জায়গাটা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তখন তুমি আমার পা পেছন থেকে টেনে ধরেছিলে আর আমার ওপর দিয়ে পার হয়েছিলে। কারণ তুমি ছিলে আমার চেয়ে অনেকটাই বড়সড়... মি মার্কোয়া!’
অন্ধ লোকটি তখন যেন পাথরে পরিণত হয়েছে। অনেকক্ষণ সে একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। জোরে জোরে ঢোঁক গিলছে সে। তারপর হঠাৎই রীতিমত ঝাঁপিয়ে উঠে বলল, ‘পারসনস... ঈশ্বরের কসম... ঈশ্বরের কসম... আমি ভাবছিলাম হয়তো এটা তুমিই হবে!’ তারপর সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ যা তুমি বললে সেটাই ঠিক... হয়তো সেটাই ঠিক... কিন্তু কী আর আসে যায় এখন বলো? আজ আমি অন্ধ আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনছ আর হয়তো প্রতি মুহূর্তেই মনে মনে হাসছ এই ভেবে যে, আমি আজ অন্ধ হয়ে গেছি!’
অন্ধলোকটির চিৎকার শুনে পথচলতি লোকজন তার দিকে ফিরে ফিরে দেখতে লাগল। সে আবার বলে উঠল, ‘তুমি পার হতে পেরেছ মিস্টার পারসনস, আমি পারিনি! বুঝতে পেরেছ? শুনতে পাচ্ছ তুমি আমার কথা? দেখো, নিজে চেয়ে দেখো... আজ আমি অন্ধ হয়ে গেছি!’
‘ওয়েল... এটা নিয়ে এত হট্টগোল করো না মার্কোয়া!’ মিস্টার পারসনস বললেন, ‘অন্ধ শুধু তুমি একা নও, আমিও!’
----------------
মূল গল্প- আ ম্যান হু হ্যাড নো আইজ (A man who had no eyes) , ম্যাকিনলে ক্যান্টর (Mackinlay Kantor)
লেখক পরিচিতি: ম্যাকিনলে ক্যান্টর ছিলেন আমেরিকান সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার। তার পুরো নাম বেঞ্জামিন ম্যাকিনলে ক্যান্টর। ১৯০৪ সালে আমেরিকার আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়েবস্টার শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ত্রিশটিরও বেশি উপন্যাস এবং অসংখ্য ছোটগল্প রচনা করেছেন। ১৯৫৬ সালে তার রচিত ‘অ্যাণ্ডারসনভিল’ উপন্যাসের (আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ওপরে রচিত) জন্য তিনি পুলিৎজার সাহিত্য পুরষ্কারে ভূষিত হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের একজন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন এবং আমেরিকান এয়ারফোর্সেরও তিনি একজন বন্দুকধারী ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ম্যাকিনলে হলিউডের একজন চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি তার উপন্যাস ‘গ্লোরি ফর মি’ অবলম্বনে ‘দ্য বেস্ট ইয়ারস অফ আওয়ার লাইভস’ এর চিত্রনাট্য লেখেন যা এ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়। তিনি বেশকিছু ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেছেন যার মধ্যে ‘স্পিরিট লেক’, ‘ভ্যালি ফোর্জ’ ইত্যাদি অন্যতম।
১৯৭৭ সালে ৭৩ বছর বয়সে ফ্লোরিডায় তার মৃত্যু হয়।
------------
ফাহ্মিদা বারী
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
ঢাকায় থাকেন।



0 মন্তব্যসমূহ