লিডিয়া ডেভিসের দুটি গল্প


অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত
(১) গুঁটিপোকা

সকালে বিছানায় একটা ছোট্ট গুঁটিপোকা দেখতে পেলাম। বাইরে ফেলার জন্য ভাল জানলাও নেই আর খুব প্রয়োজন না হলে কোনো জীবকেই পিষে দিই না বা মেরে ফেলি না। এই সরু, লোমহীন ছোট্ট গুটিঁপোকাটাকে তুলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বাইরে বাগানে নিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

এটা ঠিক শুঁয়োপোকা নয়, যদিও আকারে একটা শুঁয়োপোকারই সমান। কুণ্ডলী পাকিয়ে যায় না, বরং অনেক জোড়া পা দিয়ে অবলীলায় ঘোরাফেরা করছে। শোবার ঘর ছাড়ার সময় ওটা আমার হাতের তালুর ঢালের ওপরে বেশ দ্রুতছন্দে চলাফেরা করছিল।

কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই, ওটা অদৃশ্য হয়ে গেল – আমার হাতের ওপরদিকে, নিচে, কোথাও নেই। গুঁটিপোকাটা নিশ্চয়ই ছাড়া পেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেছে। ওটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। সিঁড়িটা বেশ অন্ধকার আর ঘন বাদামি রঙ করা। একটা টর্চ জোগাড় করে ওটাকে খুঁজে বের করতে পারতাম, যাতে বেচারা প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু অত দূরে যেতে পারব না – ওকে নিজেকেই পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করতে হবে। তবে ওটা কী করে নিচে নেমে খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাগানে যাবে?

আমি আমার প্রতিদিনকার কাজে লেগে পড়লাম। ভাবলা, ওটার কথা ভুলে গেছি, কিন্তু তা ঠিক নয়। সিঁড়ি বেয়ে যখনই ওঠানামা করতে হয়েছে, আমি সিঁড়িতে ওর দিকটা এড়িয়ে চলেছি। নিশ্চয়ই ও নিচে নামার চেষ্টা করে চলেছে।

শেষমেশ আর পেরে উঠলাম না। একটা টর্চ নিয়ে এলাম। ওই সিঁড়ির সমস্যাটা হল, ওটা খুবই নোংরা। এই অন্ধকারে কেউই সেটা দেখতে পায় না বলে আমি আর ওটা পরিষ্কার করি না। আর গুঁটিপোকাটা হল খুবই ছোট বা খুবই ছোট ছিল। টর্চের আলোয় অনেক কিছুকেই ঠিক ওরই মত দেখাচ্ছিল – কাঠের অন্তন্ত সরু একটা ছিলকা, বা পুরু সুতোর একটা টুকরো। কিন্তু একটু নাড়াচাড়া করে দেখলাম ওগুলো নড়ছে না।

ওর দিকের সিঁড়ির প্রত্যেকটা ধাপেই খুঁজলাম, তারপরে দুটো দিকেই। যখন তুমি একটা প্রাণীকে সাহায্য করতে চেষ্টা করছ তখন তোমার মনে ওই প্রাণীটার প্রতি একটু মায়া পড়েই যায়। কিন্তু শ্রীমানকে কোথাও দেখতে পেলাম না। সিঁড়ির ধাপে অজস্র ধুলো আর কুকুরের লোম পড়ে রয়েছে। বেচারার ছোট্ট শরীরে নিশ্চয়ই অনেক ধুলো লেপটে গেছে, ফলে চলাফেরা করা বা অন্তত গন্তব্যস্থল অবধি পৌঁছনো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। কে জানে ধুলো লেপটে শরীরটা হয়ত শুকিয়ে উঠেছে। তবে ওপরে না গিয়ে নিচেই বা যাবে কেন? সিঁড়ির যে ধাপটাতে ও অদৃশ্য হয়ে গেল সেখানে তো খোঁজা হয়নি। না, অতটা আর যাব না।

নিজের কাজে ফিরে গেলাম। তারপর থেকে গুঁটিপোকাটার কথা ভুলতে আরম্ভ করলাম। ঘন্টাখানেকের মত ভুলেই রইলাম, যতক্ষণ না আবার সিঁড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন হল। এবারে সিঁড়ির একটা ধাপে কিছু একটা দেখলাম যেটা আকারে প্রকারে আর রঙে মিলে যাচ্ছে। তবে সেটা চ্যাপটা আর শুকনো। এটা নিশ্চয়ই সেই শ্রীমান হিসেবে যাত্রা শুরু করেনি। এটা নিশ্চয়ই পাইনের ছোট একটা কাঁটা, কিংবা অন্য কোনও উদ্ভিদের অংশ।

পরেরবার যখন ওটার কথা মনে পড়ল, খেয়াল করলাম বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে ওর কথা ভুলেই গেছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময়েই কেবল ওটার কথা মনে পড়ে। ওটা নিশ্চয়ই সত্যি সত্যিই ওখানেই কোথাও আছে, সবুজ পাতার কাছে পৌঁছনোর পথ খোঁজার চেষ্টা করছে, কিংবা হয়ত মরতে বসেছে। আমার অবশ্য এর মধ্যেই ওটাকে নিয়ে আর বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আশা করি খুব তাড়াতাড়িই ওর কথা আমি বেমালুম ভুলে যাব।

পরের দিকে সিঁড়িতে প্রাণীদেহের গন্ধ লেপটে আছে বলে টের পাচ্ছিলাম, তবে এটা ওর গন্ধ হতেই পারে না। গন্ধ ছড়ানোর পক্ষে ওটা ছিল খুবই ক্ষুদ্রকায়। এতদিনে ওটা নিশ্চয়ই মরে গেছে। বাস্তবে ও এতটাই পুঁচকে যে ওকে নিয়ে অত ভাবাভাবি করা আমার পোষাবে না।


(২) অন্যমনস্ক

বেড়ালটা জানলার বাইরে বসে কাঁদছে। ভেতরে আসতে চায়। বেড়ালের সঙ্গে ঘর করা বা কী কী নিয়ে ওরা বায়না করতে পারে সেটা ভাবতে বসলে নেহাতই সাদাসিধে কয়েকটা কথা তোমার মনে হবে, যেমন ধর, বেড়াল ঘরে ঢোকার প্রয়োজন বোধ করে কিন্তু সেটা কতখানি কাঙ্ক্ষিত। তুমি এটা নিয়ে ভাবতে বসলে আর সেই ভাবনায় এতটাই মশগুল হয়ে পড়লে যে বেড়ালটাকে ঘরের ভেতরে আসতে দেওয়ার কথা ভুলেই গেলে, অর্থাৎ তুমি বেড়ালটাকে ঘরে ঢুকতে দিতে ভুলেই গেলে, আর বেড়ালটা এখনও জানলার বাইরে বসে কেঁদেই চলেছে। তোমার খেয়াল হল যে তুমি বেড়ালটাকে ভেতরে আসতে দাওনি, আর তোমার মনে হল, কী অদ্ভুত যে বেড়ালের ভেতরে আসার প্রয়োজন আর ওর সাদাসিধে বায়নাগুলোর ভালমন্দ নিয়ে ভাবতে থাকা সত্ত্বেও তুমি ওকে ঘরে ঢুকতে দাওনি এবং জানলার বাইরে বসে কাঁদতে ভাধ্য করেছ। এই সব কথা ভাবতে ভাবতে আর এর খাপছাড়া দিকটা অনুভব করতে করতে তুমি বেড়ালটাকে ঘরে ঢুকতে দিলে, কিন্তু খেয়ালই করলে না যে তুমি ওকে ঘরে ঢুকতে দিলে। বেড়ালটা তৎক্ষণাৎ লাফ মেরে পাটাতনে উঠে পড়ল আর খাবারের জন্য চেঁচামেচি শুরু করল। বেড়ালটা খাবারের জন্য চেঁচামেচি করছে সেটা তুমি লক্ষ্য করলে অথচ তোমার ওকে খাওয়ানোর কথা মনেই হল না কারণ তখন তুমি অবাক হয়ে ভাবছ যে নিজের অজান্তেই তুমি বেড়ালটাকে ভেতরে আসতে দিয়েছ। তারপর তুমি লক্ষ্য করলে ওটা খাবারের জন্য চেঁচামেচি করছে কিন্তু তুমি ওকে খাওয়াচ্ছ না আর এটা খেয়াল করে তুমি অবাক হলে যে ওর চেঁচামেচি তুমি শুনতেই পাওনি, তুমি ওকে খাওয়াতে লাগলে আর খেয়ালই করলে না যে তুমি ওকে খাওয়াচ্ছ।
----------------

লেখিকা পরিচিতি: লিডিয়া ডেভিস (৫ জুলাই ১৯৪৭) একজন আমেরিকান লেখিকা যাঁর ছোটগল্পগুলি অনেক সময়েই এক বা দুই পৃষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ছোটগল্প ছাড়া তিনি উপন্যাসও লিখেছেন এবং ফরাসি এবং অন্য ভাষা থেকে অনুবাদও করেন।

অনুবাদক পরিচিতি: উৎপল দাশগুপ্ত। জন্ম কলকাতায়। আদিবাড়ি ওপার বাংলার শ্রীহট্টের পঞ্চখণ্ডে এবং অসমের করিমগঞ্জে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। কর্মজীবনের শুরু ভারত সরকারে অর্থ মন্ত্রক থেকে। কর্মসূত্রে দিল্লী, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং অসমে কাটিয়েছেন। অল্প লেখালেখি আর অনুবাদের কাজ করেন। তবে নিজের লেখালেখির চাইতেও বই পড়তে বেশি ভালবাসেন, বিভিন্ন বিষয়ে। ঘুরে বেড়াতে, অবসর সময়ে গান শুনতে ভালবাসেন। শখের ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কলকাতায় থাকেন।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ