অনুবাদ: লুনা রাহনুমা
একটু আগেই বাবাকে কবর দিয়েছে মোহাম্মদ। কবরস্থান থেকে বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল কাঁধের বোঝা যেন আরও ভারী হয়েছে। বয়স্ক মানুষের মতো নুয়ে পড়েছে সে। ধীরে ধীরে হাঁটছে। মাত্র ত্রিশে পা রেখেছে। জীবনে কখনও নিজের জন্মদিন পালন করেনি। একেকটি বছর কেটে গেছে, আর প্রতিটি বছর ছিল একই রকম। অভাব, বঞ্চনা, ও হাল ছেড়ে দেওয়া মনোভাব তার জীবনকে এমন এক দুঃখে আচ্ছন্ন করেছিল, যা সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে। বাবার মতো মোহাম্মদ নিজেও কখনও অভিযোগ করেনি। সে ভাগ্যে বিশ্বাসী ছিল না, এমনকি ধার্মিকও না।
বাবার মৃত্যু মোহাম্মদের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। পরিবারে সে সবার বড়। আর তাই পুরো পরিবারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। তিনটি ভাই আর দুটি বোন। একজন ডায়াবেটিক মা, যিনি এখনও বাতিলের খাতায় পড়েননি। আগের আরও অনেকবারের মতোই মোহাম্মদের সর্বশেষ চাকরির প্রচেষ্টাটিও ব্যর্থ হয়েছে। আর এখন তার ভয় লাগছে। ব্যাপারটা ভাগ্যবান বা দুর্ভাগা হবার প্রশ্ন নয়। মোহাম্মদ বলে, এই ব্যাপারটি হচ্ছে তারচেয়েও বেশি অন্যায়গত সমস্যার। যা আসলে দরিদ্র হয়ে জন্ম নেয়ার মতো দুর্ভাগ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বেকারত্বের প্রতিবাদে মোহাম্মদ অর্থ মন্ত্রণালয় সদর দফতরের সামনে আর বসবে না। স্নাতক পাশ কিছু প্রাক্তন বেকার চাকরি পেয়ে গেছে। কিন্তু মোহাম্মদ তাদের মধ্যে একজন নয়। তার ইতিহাসের শিক্ষাগত সার্টিফিকেটটি কাউকে আকৃষ্ট করেনি। সে স্কুল কলেজে পড়াতে পারত। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই মুহূর্তে কাউকে নিয়োগ দিচ্ছে না।
কাপড়ের আলমারিতে লুকিয়ে রাখা একটি পুরোনো স্কুলব্যাগ বের করে আনে মোহাম্মদ। ব্যাগের ভেতর থেকে ডিপ্লোমাসহ তার শিক্ষাগত সমস্ত কাগজপত্র এবং নথি বের করে সিঙ্কে একটি ছোট স্তুপ করল। তারপর সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তীক্ষ্ণ চোখে মোহাম্মদ তাকিয়ে থাকে আগুনের দিকে। আগুনের শিখা কাগজের অক্ষরগুলোকে গিলে খাচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত কোনো কারণে তার নাম ও জন্ম তারিখ পুড়ছে না। এক টুকরো কাঠ দিয়ে মোহাম্মদ আগুন উস্কে দিল যতক্ষণ পর্যন্ত না সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়। পোড়া গন্ধ পেয়ে মোহাম্মদের মা ছুটে এলো।
“পাগল হয়ে গেছ তুমি! ডিপ্লোমার কাগজ পোড়ালে কোনো লাভ হবে? এরপর শিক্ষক পদে চাকরির আবেদন করবে কেমন করে? তিনটি বছর ধোঁয়ায় চলে গেল!”
একটি শব্দও উচ্চারণ না করে মোহাম্মদ সিংক থেকে ছাই তুলল। ছাই বিনে ফেলল। তারপর সিঙ্ক পরিষ্কার করল। আর নিজের হাত ধুয়ে নিল। মোহাম্মদ শান্ত থাকে। একটু আগের কাজ সম্পর্কে কিছু বলা, বা নিজের পক্ষে সাফাই গাইবার কোনো ইচ্ছা তার নেই। যে কাগজের টুকরো তাকে কোথাও পৌঁছে দিবে না, সেই কাগজ ধরে ঝুলে থেকে লাভ কী? মোহাম্মদের মুখের ভাষা অভিব্যক্তিহীন। মা তাকে ওষুধ নিয়ে আসার কথা মনে করিয়ে দেয়। বলে, ওষুধের দোকানদার বাকিতে ওষুধ দেবে।
কিছুক্ষণ পরের কথা। মোহাম্মদ একটি বেঞ্চে বসেছে আর মাটিতে পিঁপড়ার লম্বা সারির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। যে ছেলেটি তার কাছে একটি খুচরো সিগারেট বিক্রি করেছে, তাকে বলে সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিতে। তারপর মোহাম্মদ ধীরে ধীরে সিগারেট টানতে থাকে। পিঁপড়াগুলো তাদের বহন করে আনা বোঝা জমা করে যেখান থেকে এসেছিল আবার সেখানে ফেরার পথ ধরে।
মোহাম্মদ মনস্থির করে ফেলেছে: সে তার বাবার ফলের ভ্যান চালাবে। ভ্যানের অবস্থা খারাপ। চাকাগুলো মেরামত করতে হবে। একটি পচে যাওয়া তক্তা বদলাতে হবে। স্কেল ঠিক করতে হবে। আর বোচাইবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে যে হচ্ছে ফল ও সবজির জোগানদার।
মোহাম্মদ টাকা পাবে কোথায়? বাবার অসুস্থতায় মা তার সমস্ত গয়না বিক্রি করে দিয়েছে। মায়ের কাছে গহনার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সে "মাইক্রোক্রেডিট" সম্পর্কে শুনেছে। চেষ্টাও করেছিল একবার। কিন্তু পূরণ করার জন্য অনেকগুলো ফর্মের একটা মোটা স্তুপ দেয়া হয়েছিল মোহাম্মদের হাতে। এতসব কাগজপত্র মুহূর্তে মোহাম্মদের আগ্রহ নাশ করে দিয়েছিল। নিজের ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট পুড়িয়ে ফেলার জন্য এবারে সে অনুতপ্ত হতে আরম্ভ করে।
মোহাম্মদ যে আর্টস অ্যান্ড লেটারস অনুষদে লেখাপড়া করত, সেখানে একটি র্যাফেলে সে মক্কার ভ্রমণ টিকেট জিতেছিল। সেই একবারই জীবনে ভাগ্যবান হয়েছিল সে। কিন্তু সৌভাগ্যের সুবিধা ভোগ করতে পারেনি। শুধু প্লেনের একটা টিকেট দিয়ে কী করবে মোহাম্মদ? হজ্জ্ব করতে মক্কা যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। আর তাছাড়াও, হজ্জ্ব পালনের জন্য অন্যান্য খরচ বহন করার সামর্থ নেই তার। বিমান কোম্পানির কাছে মোহাম্মদ টিকেটের মূল্য ফেরত চেয়েছিল। কিন্তু তারা অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। এরপর সে শুধু যা করতে পারত তা হচ্ছে কোনো হজ্জ্বযাত্রীর কাছে প্লেনের টিকেটটি বিক্রি করে দেওয়া। টিকেটের দামের এক তৃতীয়াংশ মূল্যে একজন গ্রাহকও পেয়েছিল মোহাম্মদ। কিন্তু টিকেটে যাত্রীর নাম পরিবর্তন করতে ট্রাভেল এজেন্টকে ঘুষ দিতে হয়েছে। আর সবকিছুর পর সামান্য যে পরিমাণ অর্থ তার হাতে এলো, তা দিয়ে সে পিতার রেখে যাওয়া ভ্যান মেরামত করেছে। আর অবশেষে, মোহাম্মদ আপেল ও কমলা বিক্রি করতে শুরু করে।
মোহাম্মদ জানত বোচাইব অসাধু আর অসৎ লোক। তার বাবা তাকে প্রায়ই বলত এই কথা। সামান্যতম কালক্ষেপন না করেই বোচাইব জানিয়েছে যে মোহাম্মদের বাবা তার কাছে দেনাদার ছিলেন। মৃত্যুর আগে শেষ দুটি বিল তিনি পরিশোধ করেননি। বাবার ঋণের ব্যাপারে বোচাইবের কথার সত্যতা যাচাইয়ের কোনো উপায় ছিল না। তবু মোহাম্মদকে লোকটির সঙ্গে চুক্তি করতে হলো। কারণ বোচাইবই একমাত্র ব্যক্তি যে বাকিতে পণ্য বিক্রি করে। বিনিময়ে সে ক্রেতার কাছ থেকে দশ থেকে পনের শতাংশ লভ্যাংশ ধার্য করে। মোহাম্মদ তর্ক করেনি। বোচাইবের কাছে সে দুই বাক্স কমলা ও এক বাক্স আপেলের জন্য অর্থ জামানত রাখল। সঙ্গে কয়েক ঝুড়ি স্ট্রবেরিও চাইল।
বোচাইব একদিন মোহাম্মদকে একটা কোনায় নিয়ে গেল। চাপা কণ্ঠে সে মোহাম্মদের ছোট বোনের কথা জানতে চায়। মোহাম্মদ জানায় তার বোন ভালোই করছে। এখন সে কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
“তুমি জানো, তোমার বাবা আমার সঙ্গে ওর বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,” বোচাইব বলে। “আমি বিয়ে করতে চাই। সংসার করতে চাই। এমনকি তুমি আর আমি ব্যবসায় পার্টনারও হতে পারি। ফলের ব্যবসায় তুমি কূল করতে পারবে না। এখানে ব্যাপক প্রতিযোগিতা। আর তাছাড়াও, এই ব্যবসায় জায়গা মতো পৌঁছাতে গেলে তোমাকে পুলিশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।”
বোচাইবের দিকে তাকিয়ে দেখে মোহাম্মদ। মাথা নিচু করে থাকে। তারপর কিছু না বলেই চলে এলো সেখান থেকে।
মোহাম্মদ কিছুতেই বুঝতে পারছিল না ফলের ভ্যানটিকে সে কোথায় দাঁড় করাবে। কিছু বিক্রেতা এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। অন্যরা নিজেদের ব্যবসায়িক বুদ্ধি মাফিক স্পট খুঁজে নিয়েছে। বেশিরভাগই চৌরাস্তার কাছাকাছি অথবা কোনো ট্রাফিক সার্কেলে। অল্প ঘুরে মোহাম্মদ বুঝতে পারল যে সবগুলো সেরা স্পট দখল হয়ে গেছে। তাই সে ফলের গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। গলার স্বর চড়িয়ে মোহাম্মদ কাষ্টমারদেরকে ডাকে তার কমলা ও আপেল কেনার জন্য। কিন্তু গাড়ির হর্ন ছাপিয়ে কেউ তার ডাক শুনতে পেল না। মোহাম্মদ যখন একটি মুদি দোকানের পাশে মাত্র এক মুহুর্তের জন্য তার ফলের ভ্যানটি থামিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মুদি দোকানের মালিক তেড়ে এলো। চিৎকার করে বলে, “এই ছোকরা, তুমি কি পাগল? তোমার সমস্যা কী? আমি ব্যবসার লাইসেন্স কিনেছি। আর আমি সরকারকে ট্যাক্স দেই। তুমি যদি আমার সামনে এসে গেড়ে বসো তাহলে আমি জীবিকা নির্বাহ করব কীভাবে বাছা? যাও, এখান থেকে সরে যাও!”
প্রথমদিন মোহাম্মদ শুধু ঘুরলো। এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায়। তাতেও সে পণ্যের অর্ধেকের বেশি বিক্রি করে ফেলল। মোহাম্মদ বুঝতে পেরেছে সে যদি অন্য বিক্রেতারা চলে আসার আগেই একটা ভালো জায়গায় তার ফলের ভ্যান দাঁড় করাতে চায়, তাহলে পরদিন সকালে তাকে অনেক আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে।
সেই রাতে খাওয়ার সময় মোহাম্মদ তার ছোট বোনের দিকে তাকায় আর বোনকে বোচাইবের বাহুতে কল্পনা করে। মনে মনে মোহাম্মদ লজ্জা অনুভব করল। অমন একটা বর্বরের হাতে একটি অল্পবয়সী ও নিষ্পাপ মেয়ে। কখনই না।
ডিনার শেষ করে মোহাম্মদ তার মাকে কথাটা জানায়। বোচাইব তাকে বাবার ঋণ পরিশোধ করতে বলেছে। মোহাম্মদের মা বলেন, “তোমার বাবা ঋণ সহ্য করতে পারতেন না। তিনি যত দ্রুত সম্ভব পাওনাদারের ঋণ পরিশোধ করে দিতেন। বোচাইব একটা বদমাশ। তার কাছে ধার থাকার কোনো প্রমাণ নেই। শয়তানটার কথা ভুলে যাও। আমার ওষুধ এনেছ মনে করে? একটা মাত্র ট্যাবলেট আছে আমার কাছে।”
মোহাম্মদ বই ভর্তি একটা বাক্স বের করে। বাড়ির সামনে সে অনেকগুলো বই বিছিয়ে রাখল বিক্রির জন্য। ইতিহাসের বই, পেপারব্যাক উপন্যাস এবং চামড়ার মলাটে একটি ইংরেজি বই "মবি-ডিক"— যা সে হাই স্কুলের সিনিয়র বর্ষে ইংরেজি ক্লাসে প্রথম হওয়ার জন্য পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল। মোহাম্মদ শুধু তিনটি বই বিক্রি করল। ওষুধ কেনার জন্য যেটুকু যথেষ্ট। "মবি-ডিক" বইটা কেউ কিনতে চায়নি, তাই সে বইটা নিজেই রেখে দিল। সেই রাতে মোহাম্মদ বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা পুনরায় পড়ল। আর বুঝতে পারল যে তার ইংরেজিতে কিছুটা মরচে পড়ে গেছে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে মোহাম্মদ সুন্দরী জিনেবের কথা ভাবে। দুই বছর ধরে সে জিনেবকে ভালোবাসে। কিন্তু টাকা না থাকায়, কাজ না থাকায়, নিজের বাড়ি না থাকায় বিয়ে করা অসম্ভব। মোহাম্মদের কষ্ট হয়। জিনেবকে সে কী প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, যখন তার কাছে দেবার মতো কিছুই নেই? কিন্তু এই মুহূর্তে তার উপর চেপে বসা আরও কিছু কর্তব্যের অগ্রাধিকার আছে। আর সে বুঝতে পেরেছে যে একটি একটি করে সমস্যার মোকাবেলা করলে সে সফলকাম হতেও পারে। জিনেব হয়তো তার জন্য অপেক্ষা করবে।
জিনেব এক ডাক্তারের অফিসে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করে। মোহাম্মদকে সে সত্যি ভালোবাসে। কারণ বাবার একমাত্র কন্যা জিনেব মোহাম্মদকে পরামর্শ দিয়েছিল তারা দুজন বিয়ে করে ফেলে। আর বিয়ের পর দুজন জিনেবের বাবার বাড়িতে থাকবে। কিন্তু মোহাম্মদ আত্মাভিমানী ছেলে। স্ত্রীর উপর নির্ভর করে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করা, তার কাছে কল্পনাতীত ব্যাপার।
মোহাম্মদ আর জিনেব সাধারণত একটি ক্যাফেতে দেখা করত। তারা অনেক কথা বলত। দুষ্টামি করত। প্রায়ই হাসিতে ফেটে পড়ত। তারা দুজন একান্তে ঘনিষ্ট সময় কাটিয়েছে, তিন মাসেরও বেশি হয়ে গেছে। শেষবার দেখা হয়েছিল যখন জিনেবের চাচাতো বোনের রুমমেট কোথাও বেড়াতে গিয়েছিল আর সে ওদেরকে তার ছোট অ্যাপার্টমেন্টটি ধার দিয়েছিল।
“একদিন,” জিনেব বলে, “ একদিন আমরা এই গুপ্ত সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছাব। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। আমি ঠিক জানি। আমি অনুভব করতে পারি। তোমার একটা ভালো চাকরি হবে। এই জ্যাল-জেলে ডাক্তারের চাকরিটা আমি ছেড়ে দেব। আর আমরা আমাদের নিজস্ব জীবন আরম্ভ করব মোহাম্মদ। তুমি দেখো।”
“হ্যাঁ, কোনো একদিন। কিন্তু জিনেব তুমি জানো, কখনই আমি ওই ভঙ্গুর নৌকাগুলিতে চড়ে বসব না, আর অবৈধ অধিবাসী হবো না। তোমার পরিকল্পনা আমি জানি: কানাডা! হ্যাঁ, আমরা সবাই কানাডা যাব। আর আমরা সবাই জান্নাতে যাব। কথাটা কোথাও লেখা আছে। কিন্তু এইমুহূর্তে আমাকে একটা বিশাল পরিবারের মুখে খাবার জোগাতে হবে। আমার মায়ের যত্ন নিতে হবে। আর আমার ফলের ভ্যানের জন্য একটি ভালো জায়গা পেতে লড়াই করতে হবে।”
জিনেব মোহাম্মদের হাত ধরে আর চুমু খায়। মোহাম্মদ জিনেবের হাত ধরে, ও একই কাজ করে।
ভোর ছয়টায় বিছানা ছাড়ল মোহাম্মদ। যতটা সম্ভব কম আওয়াজ করার চেষ্টা করে। যেন একই ঘরে থাকা তার ভাইরা জেগে না যায়। ঘরে আছে বিশ বছর বয়সী নাবিল, যে একজন লাইসেন্সবিহীন ট্যুর গাইড। পুলিশের সঙ্গে যার প্রায়শই ঝামেলা হয়। আর আছে আঠারো বছরের নুররেদিন। সে হাই স্কুলের ছাত্র। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত সে একটা বেকারিতে কাজ করে। আর এরপর আছে ইয়াসিন। বয়স পনেরো। বুদ্ধিমান, অলস, সুদর্শন ও আধ্যাত্মিক ছেলে। ইয়াসিন তার মাকে কথা দিয়েছে সে একদিন কোটিপতি হবে আর মাকে পিরামিড দেখতে নিয়ে যাবে।
মোহাম্মদ হাত মুখ ধুয়ে, এক টুকরো রুটি গিলে, ফলের ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেল। সরু রাস্তার কোণায় একটি পুলিশ অফিসার মোহাম্মদকে থামায়।
“এটা কি তোর বুড়ো বাপের ভ্যান। সে কোথায়?”
“তিনি মারা গেছেন।”
“আর অমনি তুই এর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিস, যেন কিছুই হয়নি?”
“সমস্যা কী? সৎপথে জীবনযাপন করা কি হারাম?”
“বেয়াদবি করবি না। তোর কাগজ!”
মোহাম্মদ তার কাছে থাকা সমস্ত কাগজপত্র পুলিশের হাতে দিল।
“ইন্সুরেন্স নেই। কল্পনা করা যায়? তুই যদি এই ভ্যান রাস্তায় কোনো বাচ্চার উপরে তুলে দিস, তাহলে জরিমানা কে দিবে? তুই?”
“ফলের গাড়ির জন্য ইন্সুরেন্স লাগে কবে থেকে? নতুন শুনলাম।”
পুলিশটি একটুকরো কাগজ বের করে চোখের কোণ দিয়ে মোহাম্মদকে দেখতে দেখতে কিছু লিখতে থাকে। কিছুক্ষণ পর বলল, “খুব বোকার অভিনয় করে যাচ্ছিস তুই— ভান করছিস যেন কিছুই বুঝিস না।”
“আমি কিছুই করছি না। আমাকে কাজ থেকে দমিয়ে রাখার জন্য সবকিছু করছেন আপনি।”
“ঠিক আছে, তুই এখন যেতে পারিস। কিন্তু ইন্সুরেন্সের ব্যাপারটা মাথায় রাখবি। তোর ভালোর জন্যই বলছি আমি।”
তারপর পুলিশটি মোহাম্মদের ফলের ভ্যান থেকে দুই হাতে কমলা ও আপেল তুলে নিল। একটি আপেলে কামড় দিয়ে মুখ ভরা আপেল নিয়ে বলল, “তুই এখন চলে যা!”
মোহাম্মদ ভ্যান রাখার মতো একটি ভালো জায়গা খুঁজে পেয়েছে। এখনও বেশ সকাল। ফলের ভ্যান দাঁড় করিয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল। একটা গাড়ি এসে থেমেছে। ড্রাইভার গাড়ির জানালা নামিয়ে দিয়ে আদেশ করে: “এক কেজি করে দাও। বেছে বেছে ভালো দেখে দিও।” পরের কাস্টমারের তাড়া কম ছিল। তারা গাড়ি থেকে নেমে এলো। হাতে ধরে ফল পরীক্ষা করল। দাম জিজ্ঞেস করল। দর কষাকষি করল। এবং কয়েকটি কমলা কিনল।
একঘন্টা পর আরেকজন বিক্রেতা এসে উপস্থিত হলো। তার কাছে একটি সজ্জিত ফলের ভ্যান, যেখানে দেখা যাচ্ছে কিছু দামী এবং বিরল বিদেশী ফল সহ আরও ভালো, আরও আকর্ষণীয় সব পছন্দ রয়েছে কাষ্টমারের জন্য। লোকটির কিছু নিয়মিত খদ্দের আছে। চোখের দৃষ্টি আর সামান্য মাথার ঝাঁকুনি দিয়ে লোকটি ইঙ্গিত দিল যে মোহাম্মদের উচিত এই জায়গা থেকে সরে যাওয়া। কোনোরকম প্রতিবাদ ছাড়াই মেনে নিল মোহাম্মদ। আবারো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজকের সুন্দর সকালটা এভাবেই কাটাবে। আগামীকাল সে আরও বৈচিত্র্যের সন্ধান করবে।
দিনশেষে মোহাম্মদ সকালের সবগুলো ফল বিক্রি করে ফেলল। পুনরায় ভ্যানে ফল তুলতে সে বোচাইবের কাছে যায়।
সেদিন সন্ধ্যায় মোহাম্মদ ক্লান্ত থাকলেও জিনেবের বাবার বাড়ি গেল জিনেবকে দেখতে। তারা মোহাম্মদকে পছন্দ করে। মোহাম্মদ জিনেবকে তার সমস্ত দিনের গল্প শোনায়। আর বাড়ি ফেরার আগে সে জেনেবের সঙ্গে কয়েকটা প্যানকেক খায়।
ইত্যবসরে সাদা পোশাকের এক পুলিশ এসে মোহাম্মদের মায়ের সঙ্গে দেখা করেছে। পুলিশ মোহাম্মদের কথা জিজ্ঞেস করেছে। জানতে চেয়েছে মোহাম্মদকে কেন "বেকার গ্র্যাজুয়েট" গ্রুপে দেখা যায় না আর। অসহায় বৃদ্ধা দ্বিধা ও আশংকা নিয়ে যথাসাধ্য উত্তর দিয়েছে। পুলিশ মোহাম্মদের মায়ের হাতে একটি সমন ধরিয়ে দেয়। সমন মোতাবেক মোহাম্মদকে সন্ধ্যায় পুলিশ স্টেশনে যেতে হবে। পুলিশ কোনো ভালো সংবাদ নিয়ে আসেনি বুঝতে পেরে মোহাম্মদের মা কাঁদতে আরম্ভ করে। তিনি অফিসারকে কথাটি জানানো ভালো মনে করলেন, “আমার ছেলে রাজনীতি করে না।” কোনো উত্তর না দিয়ে পুলিশটি চলে গেল।
মোহাম্মদের মা যখন সমনটি তার হাতে দিলেন তখন মোহাম্মদ সেটির দিকে একবার তাকিয়ে নিঃশব্দে পকেটে রেখে দিল।
“একটু পরে আমি পুলিশ স্টেশনে যাব। তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। আমি যদি না যাই, তাহলে তারা আমাকে খুঁজতে আসবে। সেটি আরও খারাপ হবে।”
“বাবা, পুলিশের এমন আগমন আমার ডায়বেটিস বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারি। আমার মুখ শুকিয়ে গেছে। একদম ভালো বোধ করছি না আমি।”
“এই লোকগুলোকে বেতন দেওয়া হয় আমাদের জীবনে সমস্যা তৈরি করার জন্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা এসেছে আমাদের মতো দরিদ্র পরিবার থেকেই। কিন্তু মাতা আপনি জানেন, গরীবরা একে অপরকে পছন্দ করে না।”
পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে মোহাম্মদ দীর্ঘ সময় একটি বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। বার বার উঠে গেল, জানার চেষ্টা করল কেন তাকে ডাকা হয়েছে। কেউ জানে না। তার সন্দেহ হলো যে তাকে শুধুই ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে এই সমন পাঠানো হয়েছে। প্রথমবার যখন সে বেকার গ্র্যাজুয়েটদের বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল তখনও এমন একটা সমন এসেছিল তার নামে। মোহাম্মদের পাশে বসে আছে একজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধটি স্পষ্টতই দরিদ্র। একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না। মনে হচ্ছে বুড়ো ঘুমিয়ে পড়েছে। এই লোকের বিরুদ্ধে কার কী অভিযোগ থাকতে পারে যে শুধু কাশছে ও থুথু ফেলছে, আর যে বৃদ্ধটি এখন হাসপাতালে থাকলেই বরং বেশি ভালো হতো? মোহাম্মদ বুড়োর কাছ থেকে একটু সরে গেল। যক্ষ্মা ধরার ভয় পাচ্ছে সে।
লম্বা আলখাল্লার মতো পোশাক পরিহিত একজন মহিলাও আছে এই ঘরে। সে সিগারেটের পর সিগারেট টানছে আর জীবনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বসে আছে। “আমার গ্রামে আমি সুখেই ছিলাম। হে খোদা, কেন আমি আহাম্মকটাকে বিয়ে করতে গেলাম যে এখন আমাকে পরিত্যাগ করেছে?”
মহিলাটি মোহাম্মদকে সাক্ষী রেখে বলল: “আমি একটা বেশ্যা! এটা বলতে আমার লজ্জা লাগে না। কিন্তু একদিন এই সবকিছু বদলে যাবে। আপনারা দেখবেন। আমি জানি। বেশিদিন এমন চলতে পারে না…”
মাঝরাতের দিকে একটা লোক মোহাম্মদকে ইঙ্গিত করে তাকে অনুসরণ করতে।
মোহাম্মদের পরিচয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়া আরম্ভ হলো।
বিশুদ্ধ জিজ্ঞাসাবাদ।
প্রাক্তন সহকর্মীদের সঙ্গে মোহাম্মদের যোগাযোগ নেই জেনে পুলিশ অফিসারটি বেশ কৌতূহল বোধ করে। জানতে চায় ইসলামপন্থীরা মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিনা।
“না, আমার বাবার মৃত্যুই সবকিছু বদলে দিয়েছে। আমি বাবার ভ্যান চালানোর দায়িত্ব নিয়েছি। যা আমাদের পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।”
“হ্যাঁ, আমি জানি। কেমন চলছে ব্যবসা?”
“ভালো করে আরম্ভই করিনি এখনো।”
“জানো তো, অলৌকিক বলে কিছু নেই। কিছু মানুষ আছে যারা সিস্টেম বুঝে যায় আর ভালো আয় রোজগার করে। আবার কিছু আছে হাঁদারাম— যারা হারু-পার্টি। এখন পুরোটা নির্ভর করছে তোমার উপরেই।”
পুলিশ অফিসার যে চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছিল তা বুঝতে মোহাম্মদের কিছুটা সময় লাগল: পুলিশের চর হও আর একটা লাভজনক অবস্থায় পৌঁছে যাও। আর ব্যবসা করার চিন্তাকে বিদায় জানাও।
“ব্যাপারটা নিয়ে ভালো করে চিন্তা করো। আগামীকাল আমি তোমার সাথে দেখা করব স্বাধীনতা ট্রাফিক সার্কেলে। এখন বাড়ি যাও।”
মোহাম্মদ জানত পরের দিন সে যদি নির্ধারিত জায়গায় হাজির হয়, তাহলে তাকে পুলিশের প্রস্তাব মেনে নিতে হবে।
খুব সকালে উঠে মোহাম্মদ ভ্যান নিয়ে বিখ্যাত ট্রাফিক সার্কেল থেকে বেশ দূরে একটা শ্রমজীবী পাড়ার দিকে রওনা দিল। তার মায়ের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। একটা নতুন প্রেসক্রিপশন লাগবে। মোহাম্মদ কিছু হিসাব-নিকাশ করেছে। ডাক্তার আর ওষুধের পেছনে এই অপ্রত্যাশিত ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই তার কাছে। মাকে সে সরকারি হাসপাতালে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সঙ্গে তার সতেরো বছরের বোনও আছে। মা আর বোনকে হাসপাতালের দরজায় ছেড়ে দিয়ে মোহাম্মদ ফল বিক্রি করতে আরম্ভ করে। বুঝতে পারল এই জায়গাটা একটা দুর্দান্ত স্পট। হাসপাতালে আসা লোকজন রোগীদের জন্য ফল কিনেছে। এক ঘন্টা পর, দুজন পুলিশ অফিসার আসে। তাদের একজন মহিলা পুলিশ মোহাম্মদের সামনে থেমে বলে: “তোর কাগজপত্র দেখা।”
মোহাম্মদ তার কাগজ দেখাল।
“এটা তোর পাড়া না। তুই এখানে কী করছিস?”
“আমার মাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি; তার ডায়বেটিক হাই।”
“মাশাল্লাহ! ভালো করেছ যে মাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছ। কিন্তু আরো ভালো করবে যদি তুমি এখান থেকে চলে যাও বাছা। এইবার তোকে জরিমানা দিতে হবে না। কিন্তু তোকে সতর্ক করছি। ফলের ভ্যান নিয়ে তুই এখানে আর আসবি না। কথাটা পরিষ্কার হয়েছে?”
“কিন্তু এটাই আমার জীবিকা নির্বাহের পথ।”
“বৎস, খোদার এই পৃথিবী অতি সুবিশাল।”
মোহাম্মদের বলতে ইচ্ছে করছিল যে স্পষ্টতই খোদা দরিদ্রদের পছন্দ করেন না। আর এই পৃথিবী কেবলমাত্র সম্পদশালীদের জন্যেই সুবিস্তৃত। কিন্তু নিজেকে সে বোঝায়, “সেটা ভালো হবে না। তাতে কেবল আমার দুৰ্ভাগ্যজনক অবস্থার অবনতি হবে। এমনকি এরা আমাকে নাস্তিকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করতে পারে।”
মোহাম্মদ সম্ভবত নাস্তিক নয়। কিন্তু এখন যেহেতু ইসলামপন্থীরা প্রায় সর্বত্রই বিরাজ করছে তাই নিজেকে সে ধর্ম থেকে দূরত্বে রেখেছে। মোহাম্মদের পিতা তাকে বলত, “মুমিনের জন্য নির্ধারিত হয় কষ্ট; আল্লাহ্পাক মুমিনকে পরীক্ষা করেন কষ্ট দিয়ে। তাই পুত্র আমার, ধৈর্য ধরো!”
মোহাম্মদ যখন ভ্যান নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছে ঠিক তখন তার সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। ড্রাইভার, যাকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছিল, সে তার বাড়িয়ে ধরা ঝুড়িতে ভ্যানের সমস্ত ফল ওজন করে ঢেলে দিতে বলল। “সব ফল কিনতে চাই আমি। আজ আমার আনন্দ উদযাপনের দিন; আজ আমার ছেলে হাই-স্কুল পাশ করেছে। বিশ্বাস করতে পারো? ছেলেকে আমি লেখাপড়া করতে আমেরিকা পাঠাব। হ্যাঁ, জনাব, আমেরিকায়। কারণ এই দেশে তুমি দিনরাত লেখাপড়া করে পাশ করতে পারবে আর তারপর কোথাও চাকরি খুঁজে পাবে না। কিন্তু তোমার কাছে যখন একটা আমেরিকান ডিগ্রি থাকবে, তখন সবাই তোমাকে চাকরি দেবে। আমি খুব খুশি। সে আমার একমাত্র ছেলে। আমার মেয়েগুলো গোনায় পড়ে না। আমি তাদের বিয়ে দিতে পারছি না। ওদেরকে কেউ চায় না… আচ্ছা, তাড়াতাড়ি করো। তাড়াতাড়ি। জলদি! দাম কত হলো? দ্রুত হিসাব করো বাপু। তুমি চাইলে আমি তোমাকে হিসাবে সাহায্য করতে পারি।” মোহাম্মদের কথা মতো লোকটি তার মোবাইল বের করে সংখ্যা টিপতে লাগল। “আচ্ছা, দুশো তিপ্পান্ন রিয়াল আসে।” মোহাম্মদের হাতে লোকটি তিনশ রিয়াল দিল। বলল, "তুমি এর যোগ্য। তুমি ভালো ছেলে— বোঝা যায়।”
মোহাম্মদ তার ভ্যান পাইকারি বাজারের দিকে ঠেলতে লাগল এবার। বোচাইবের কাছে আর যাবে না। এবার সে নগদ অর্থে ফল কিনবে।
বিকেলের শেষে মোহাম্মদ তার ভ্যান দূরে রেখে জিনেবের অফিসের সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। আশেপাশে বিপুল সংখ্যক ব্যস্ত তরুণ-তরুণী দেখা যাচ্ছে। মোহাম্মদ অবাক হয়ে ভাবছিল এই লোকগুলো জীবিকা নির্বাহের জন্য কত ধরণের উপায় বের করেছে: দ্রুত হাতে গাড়ি ধোয়া; বয়স্কদের সাহায্য করা; ড্রিংকসের খালি ক্যান দিয়ে খেলনা তৈরি করা; অথবা আমেরিকান সিগারেট লুজ বিক্রি করা, হাতে আঁকা পোস্টকার্ড, ম্যাপ, অথবা মাইকেল জ্যাকসন ও বেন হার্পারের ছবি বিক্রি করা। লাল পোশাক পরা ব্যায়ামবিদরা শারীরিক কলা-কৌশল দেখাচ্ছে; বানরের প্রশিক্ষক আছে, তোতা প্রশিক্ষক, পাইরেটেড ডিভিডি বিক্রেতারা আছে যাদের কাছে সব স্বাদের ফিল্ম পাওয়া যায়— ভারতীয়, লেটেস্ট আমেরিকান, ক্লাসিক ফিল্ম, মিশরীয় কিংবা ফরাসি ফিল্ম। জ্যাকেটে মাইক্রোফোন লাগানো গল্পকারও আছেন এখানে। শুধু সাপুড়ে, জ্যোতিষী, যাদুকর ও অন্যান্য প্রতারকগণ অনুপস্থিত।
এরপর হঠাৎ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সবার মাঝে। রাস্তার বিক্রেতারা সব ছুটতে আরম্ভ করেছে— নিরাপত্তা রক্ষীরা তাদের তাড়া করেছে। সহিংসতায় পুলিশ দুইজনকে ধরতে সক্ষম হলো— একজন পাখিওয়ালা, অন্যজন ডিভিডি বিক্রেতা। চলল হাতাহাতি, অপমান। তোতাপাখিটি চিৎকার করতে থাকে। ডিভিডিগুলো ভেঙে গুড়িয়ে পড়ে আছে মাটিতে। সেখানে কার্ক ডগলাস অভিনীত "স্পার্টাকাস" সিনেমাটিও আছে। সিনেমার যা অবশিষ্ট আছে তা হচ্ছে শুধু ডিভিডির মোড়ক। আটক বিক্রেতা দুজনকে সরকারি নিরাপত্তা ভ্যানে তোলা হলো। মোহাম্মদের চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সে তার মায়ের কথা ভাবে। তার পুরো পরিবারের কথা ভাবে। ক্রোধ গিলে ফেলে নিজেকে বলে, “জিনেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে আমার।”
জিনেবের সঙ্গে দেখা করে ভালো লাগে মোহাম্মদের। জিনেবকে সে তার সমস্ত দিনের গল্প শোনায়। রাস্তার বিক্রেতাদের উপর পুলিশের আক্রমণের ঘটনাটি এড়িয়ে গেল। মোহাম্মদ প্রস্তাব করে বন্দরের কাছে একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় গিয়ে তারা মাছ খাবে। শীঘ্রই তারা দুজন এমনভাবে হাসতে লাগল যেন তারা বসন্ত দিনে কোনো অনিন্দ্য সুন্দর তৃণভূমিতে হাসতে থাকা দুটি শিশু। মোহাম্মদ জিনেবকে বলে, “পুলিশ স্পার্টাকাসকে পরাজিত করেছে! স্পার্টাকাস ভ্যানের টায়ারের নিচে পিষ্ট হয়েছে।”
তারা দুজন হেঁটে বাড়ি ফিরল। রাস্তায় কয়েকটি পথশিশুকে দেখল আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ তৈরি করছে। তাদের একজন মোহাম্মদের কাছে সিগারেট চাইল। “আমি ধূমপান করি না,” মোহাম্মদ বলে, “ এটা রাখো। খাবার কিনো।”
তাদের পাশ দিয়ে ধীরগতিতে পুলিশের ভ্যান যায়। পতিতাদের কাছে কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। জিনেব লক্ষ্য করল একটা মেয়ে একটা পুলিশের পকেটে ব্যাংক-নোট ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এটা রুটিন। কাজগুলো এভাবেই চলে।
তারা দুজন আবারও তাদের বিয়ে নিয়ে আলোচনা করে।
“আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে জিনেব; মাত্রই কাজ আরম্ভ করেছি আমি। আমাকে একটা বড় দাও মারতে হবে আগে।”
“কী বোঝাতে চাইছ তুমি?”
“ভয় পেয়ো না। আমি ডাকাতি করব না! কিন্তু আমি সত্যিই চাইছি বাজারে একটি দোকান নিতে। আমাদের প্রতিবেশীদের একজন বেশ অসুস্থ। তার দোকানটা বাজারের মধ্যখানে একটা ভালো জায়গায় আছে। তিনি যদি দোকানটা আমাকে দিতেন তাহলে খুব ভালো হতো। আমি তাকে একটু একটু করে দোকানের মূল্য পরিশোধ করে দিতে পারতাম। দোকানটা আমি দেখেছি। লোকটির সন্তানরা দোকানের ব্যবসা চালাতে চায় না। তারা ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান। তাই তাদের চাকরির সমস্যা নেই। কিন্তু দোকানটা এইমুহূর্তে আমার সমস্ত সমস্যার আদর্শ সমাধান। আমার মা লোকটির সাথে কথা বলবে।”
জিনেব বলে, “তোমার কথা ঠিক আছে। কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত। আমাদের নিজেদের একটা জায়গা দরকার। এমনকি সেটি যদি একটা কোনো খুপরি, দেয়ালের মধ্যে একটা গর্ত, কিংবা একটা চালা…”
বাড়িতে পুরানো টিভিতে একটা অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির রাজত্ব উদযাপনের ত্রিশ বছর। টিভি স্ক্রিনে রাষ্ট্রপতি হাজির হয়েছেন সস্ত্রীক। স্ত্রীটির স্বাস্থ্য অনেক বেড়ে গেছে। তারা দুজনেই মেকআপ করেছে। উত্তম পোশাক পরেছে। অতি উত্তম পোশাক। ভীষণ পরিপাটি দুটি মানুষ। মাথার একটি চুলও স্থানচ্যূত হয়নি। কেতাদুরস্ত। মুখে তৃপ্তির হাসি। রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে ক্যামেরা অনুসরণ করছে তাদের প্রাসাদে, নিখুঁতভাবে ছেঁটে রাখা বাগানের গাছ এবং ঘাসে পানি দেওয়ার স্বয়ংক্রিয় ঝর্ণা মেশিনের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী বলেন, “আমার স্বামী এত পরিশ্রম করেন যে আমাকে বাধ্য করতে হয় তাকে খানিক বিশ্রাম নেওয়াতে। আল্লাহকে ধন্যবাদ, দেশ ভালো চলছে। দেশের জনগণ কৃতজ্ঞ আছে; প্রতিদিন তারা আমাদের সমর্থন জানায়। কারণ তারা বুঝতে পারছে যে আমাদের দেশ উন্নত হচ্ছে এবং সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!”
রাষ্ট্রপতি হাত তুলে এমন একটা অঙ্গভঙ্গি করলেন, যেন তিনি কোনো শিশুর দিকে হাত নাড়ছেন।
টিভিতে এই দৃশ্যগুলোর সঙ্গে একটা তৈলাক্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজছে, যা মোহাম্মদের স্নায়ুতে গিয়ে আঘাত করতে থাকে। মোহাম্মদের মা ঝিমাচ্ছে। ভাই বোনেরা ঘুমাতে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ইয়াসিন মোহাম্মদকে তার রিপোর্ট কার্ড দেখায়। প্রতিটি বিষয়েই শিক্ষক কমবেশি একই কথা লিখেছে: “বুদ্ধিমান ছেলে, মেধাবী ছাত্র, কিন্তু অলস। আরও ভালো করতে পারত।” ইয়াসিন হেসে বলল, “ক্লাসে আমি বোরড হয়ে যাই। আর, তাছাড়া, পড়াশোনা করে লাভ কী? তুমি নিজেই তো দেখেছ। পাগলের মতো লেখাপড়া করেছ, আর তারপর কোথাও চাকরি পাওনি। এখন তুমি বাবার ভ্যান চালাচ্ছ।”
ছোট ভাইকে মোহাম্মদ কিছু আশার বাণী শোনাতে চাইল। কিন্তু কাজটা বেশ কঠিন। দেশে অত্যাধিক অবিচার, অতিবেশী বৈষম্য ও অনাচার বিদ্যমান।
ইয়াসিন জানায় যে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় সে দেখেছে পুলিশ একটা লোককে মারছে। লোকটি চিৎকার করছিল আর চারপাশে লোকজন জড়ো হয়েছিল। কিন্তু কেউ ব্যাপারটিতে হস্তক্ষেপ করেনি। “লোকটাকে আমি চিনতে পেরেছি। ওই কাচের বিল্ডিংটির তত্ত্বাবধায়ক ছিল সে। আমাদের এলাকার অন্যপাশের বিল্ডিংটি। লোকটিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে কী কারণে তা কেউ জানে না। লোকটি আজ একটা মুরগি চুরি করেছিল। খুব উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল রাস্তায়। লোকটা চিৎকার করছে আর মুরগিটিও। কারণ লোকটা কিছুতেই মুরগীটাকে ছাড়ছিল না।”
পরদিন খুব ভোরে মোহাম্মদ ফল কিনতে রওনা হলো। এবার সে আরও বেশি পদের ফল কিনল। বাজার থেকে বের হবার সময় এক প্রাক্তন বিক্ষোভকারীর সঙ্গে দেখা হয় তার। লোকটি টাউন হলে একটা চাকরি পেয়েছে।
“আরও চারজন কেরানির সঙ্গে একটা অফিসে বসি আমি। ওখানে আমি কিছুই করি না।” লোকটি বলে। “তাদের কয়েকজনের কাছে কাজের কিছু ফাইল আছে, কিন্তু আমার নেই। ওখানে বসে থেকে থেকে আমি বিরক্ত। তাছাড়া আমাকে এখনও তারা একটা পয়সা দেয়নি। ছয় মাস হয়ে গেছে। আমি ধার করে চলছি। আমার কাছে মনে হয়, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন স্নাতককে বিভিন্ন অফিসে নিয়োগ দিয়েছে শুধু আমাদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য। আসলে তাদের কাছে আমাদের জন্য কোনো কাজ নেই। আর তোমার কী খবর মোহাম্মদ?”
“এই যেমন দেখছেন।”
শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিল তারা পরস্পরের কাছ থেকে। দশ মিনিট পর, মোহাম্মদ যখন ট্রাফিক লাইটের লাল আলোতে অপেক্ষা করছিল, তখন সাদা পোশাকের দুজন পুলিশ তাকে টেনে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেল।
“তুই আর তোর বন্ধু কী কথা বলছিলি?”
“কিছু না।”
প্রথম চড়টা চমকে দিল মোহাম্মদকে। সে চিৎকার করে উঠল। পেটে একটা ঘুষি পড়ল এরপর।
“চালাকি করবি না হারামির পুত। বল, তোর বন্ধুর নাম কী?”
“তার নাম ভুলে গেছি আমি।”
আরেকটা চড় পড়ল। কিছু পথচারী থেমে গেছে রাস্তায়। একটা পুলিশ লোকগুলোকে ধমক দিল। “সরে যান সবাই! এ একটা চোর। আপনাদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছি আমরা। আমাদের কাজ করতে দিন। কোনো ধরণের ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করবেন না কেউ।”
মোহাম্মদ কেঁদে ফেলল, “এটা সত্যি না! আমি চোর না!”
জনতার ভিড় বাড়তে দেখে পুলিশ মোহাম্মদের ফলের ভ্যান আর মোহাম্মদকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দিল। ভ্যানের সমস্ত ফল ছিটিয়ে পড়েছে মাটিতে।
রাস্তার লোকজন মোহাম্মদকে সান্ত্বনা জানায়। তারা তাকে ফলগুলো মাটি থেকে তুলতে সাহায্য করল। যদিও বেশিরভাগ স্ট্রবেরি থেতলে গেছে। কয়েকটি লোক বলল, “জঘন্য কাজ! কী লজ্জাজনক! একজন দরিদ্র বিক্রেতাকে এভাবে আক্রমণ করা।” “এদের আচরণ দেখলে মনে হয় যেন তারা মাফিয়া সিনেমায় অভিনয় করছে। এই বেজন্মাগুলো সব তাদের ভাগ চায়!” “এভাবে চলতে পারে না! একদিন না একদিন খোদা সত্য প্রকাশ করবেন।” “সৃষ্টিকর্তা ধনীদের পক্ষে!”
তর্ক চলতে থাকে।
“ইতর! কাফের! সবার সঙ্গেই খোদা আছেন! খোদা আছেন সর্বত্র।”
সহমর্মিতার প্রকাশ হিসেবে লোকজন মোহাম্মদের কাছ থেকে ফল কেনার সিদ্ধান্ত নিল। মোহাম্মদ অক্ষত থাকা স্ট্রবেরিগুলি বেছে তাদের হাতে দেয়।
আর কাজ করতে ভালো লাগছে না তার। মোহাম্মদ এখন অসুস্থ বোধ করছে।
সে বাড়ি ফিরে গেল। ভ্যানটাকে সরিয়ে রাখে। তারপর বাড়িতে ভাইদের অনুপস্থিতির সুযোগে একটুখানি ঘুমিয়ে নিতে ও কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নিল।
মোহাম্মদ একটা স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নে বাবা একটা সাদা পোশাক পরে মোহাম্মদকে তার সাথে যোগ দেওয়ার জন্য ইশারা করছে। তিনি কিছু বলছিলেন কিন্তু মোহাম্মদ তার কথা শুনতে পাচ্ছে না। মৃতের সঙ্গে যুক্ত হবার কোনো ইচ্ছে নেই মোহাম্মদের। হঠাৎ করে মোহাম্মদের মা স্বপ্নের ভেতর উপস্থিত হয়ে বলেন, “তিনি তোমাকে যা করতে বলছেন তা শুনো না মোহাম্মদ; তিনি এখন খোদার কাছে আছেন, সম্ভবত জান্নাতে।”
মোহাম্মদের ঘুম ভেঙে গেল। সে বিক্ষিপ্ত বোধ করছে; স্বপ্নটি ভয়ংকরভাবে বাস্তব ছিল।
এখন তাদের এমন একটা সুসময় চলছে যে মোহাম্মদ ও জিনেবের মোবাইল ফোন আছে। সেন্ট্রাল মার্কেট থেকে মোহাম্মদ দুটো পুরোনো মোবাইল কিনেছে। ফোনগুলো সাধারণ। কোনো মাসিক ফি নেই। শুধু মোবাইলে একটা রিচার্জেবল সিম কার্ড আছে। ক্রেডিট শেষ হয়ে গেলেও বাইরে থেকে আসা কল রিসিভ করা যায় এগুলোতে।
মোহাম্মদ তার ফলের ভ্যানকে উন্নত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভ্যানের একপাশে সে হাতে চেপে জুস বানানোর একটা মেশিন রেখেছে। অন্যপাশে সে আগের চেয়েও আকর্ষণীয়ভাবে বিভিন্ন ধরণের ফল সাজিয়েছে। ফলের একটি মূল্যতালিকাও সংযুক্ত করেছে ফলের পাশে। আর ভ্যানটিকে সুন্দর দেখানোর জন্য সে গায়িকা উম্মে কুলথুমের একটি ছবি ঝুলিয়েছে। এমনকি সে একটি মাছি তাড়ানোর ব্যাটও কিনেছে।
মোহাম্মদ মনে হয় রাস্তার ভ্রাম্যমান বিক্রেতা হবার জন্যেই তার ভাগ্য-নির্ধারিত হয়ে আছে। কারণ যারা পুলিশের সাথে হাত মিলিয়েছে, সবগুলো ভালো জায়গা তারাই দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এক সকালে সে হাসপাতালের এলাকায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, যেখানে তার ফলের ব্যবসা ভালো ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন পুলিশ অফিসার এসে উপস্থিত হলো সেখানে আর মোহাম্মদকে ঘিরে ফেলল।
“উম্মে কুলথুম! তার গান তুমি পছন্দ করো? আমরাও করি। কিন্তু কেন তুমি আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রপতির পছন্দের গায়িকাকে বাদ দিয়ে এমন এক বয়স্কা গায়িকার ছবি ঝুলিয়ে রেখেছ যে বহু আগে মারা গেছে? আমাদের রাষ্ট্রপতিকে খোদা দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধি দান করুন!”
“এটা আমার মাথায় আসেনি। আপনারা চাইলে আমি এই গায়িকার ছবি সরিয়ে দিতে পারি।”
“না, থাকুক। কিন্তু উপরে আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রপতির একটি সুন্দর ছবি ঝুলিয়ে রাখো। আর সেটি যেন উম্মে কুলথুমের ছবির চেয়েও বড় হয়। ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে।”
অফিসাররা চলে গেল। শীতল ঘামে জবজবে হয়ে গেছে মোহাম্মদ। প্রায় প্রতিদিন এইসব হয়রানির যথেষ্ট হয়েছে তার। জিনেবকে ফোন করে ঘটনাটি জানায় সে।
“তারা চায় তুমি তাদের দলে যোগ দাও। এই লোকগুলো পচে গেছে। এদের হাড় পর্যন্ত কলুষিত। এদের সঙ্গে লড়াই করে যাবার জন্য আমি তোমাকে বাহবা দেই মোহাম্মদ।”
“আমার কি আর কোনো উপায় আছে জিনেব?”
“তাহলে কি আমরা আজ সন্ধ্যায় দেখা করব?”
“হ্যাঁ, আজ রাতে দেখা হবে।”
পৃষ্ঠা জুড়ে রাষ্ট্রপতির ছবি ছাপানো একটি পুরানো নিউজপেপার খুঁজে পেল মোহাম্মদ। ছবিটাকে সে ভ্যানে টাঙানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পেপারটি বারবার পড়ে যেতে থাকে। তাই ছবিটাকে সে ভাঁজ করে একটি বাস্কেটের নিচে রেখে দিল। পুলিশ যদি আবার তাকে রাষ্ট্রপতির ছবির কথা বলে তাহলে সে ছবিটি বের করবে।
মোহাম্মদ যখন ব্যস্ত রাস্তায় খরিদদারের জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন এক নিউজপেপার বিক্রেতা মোহাম্মদের হাতে একটি আরবি পেপার দিল। পেপারের প্রথম পাতায় লেখা ছিল, “কেলেঙ্কারি: সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের এক এম.পি. কানাডায় অভিবাসন ফরম পূরণ করিয়ে বেকার গ্র্যাজুয়েটদের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। ফাইল প্রতি ৫০০ রিয়াল। ভুক্তভোগী জনতা ২৫২ জন। এম.পি.কে অভিযুক্ত করা হয়নি।”
মোহাম্মদ এই প্রতারণা সম্পর্কে জানে। আর সে নিজেও এই প্রতারণার শিকার হতো— যদি কোনোদিন সে প্রয়োজনীয় "ফাইল ফি" জমাতে পারত।
হকারটি মোহাম্মদকে বলে, “দেখুন, আমরা সব অনাচার সম্পর্কে লিখতে পারি, অরাজকতার নিন্দা জানাতে পারি, কিন্তু তাতে কিছুই পরিবর্তন হয় না। হারামজাদাটা এখনও এম পি আছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে লোকটা। আর কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।”
“দেখুন একদিন যদি এইসব ভুক্তভোগীদের মধ্য থেকে একজন কেউ এম. পি.র গলা কেটে ফেলে তাহলে আমি আশ্চর্য হবো না। সর্বোপরি, ন্যায়বিচার রক্ষার দায়িত্ব আপনি সর্বদাই নিজের হাতে নিতে পারেন।
আচমকা প্রবল গন্ডগোল আরম্ভ হলো।
মোহাম্মদ অনুমান করে পুলিশ রাউন্ডে এসেছে। ফলের ভ্যানটিকে লুকানোর জন্য সে ঝট করে একটা সরু গলির ভিতরে ঠেলে দিল। একটি উল্টে যাওয়া আবর্জনার বিন নিয়ে ঝগড়া করছে কয়েকটি বিড়াল। বাচ্চারা প্লাস্টিকের বন্দুক দিয়ে খেলছে।
গভীর একটা শ্বাস নিল মোহাম্মদ। মাটিতে বসে দুই হাতে নিজের মাথাটি ধরে রাখল কিছুক্ষণ। একবার মনে হচ্ছিল সবকিছু ছুড়ে ফেলে দেয় চিরদিনের মতো। কিন্তু তারপর সে মায়ের কথা ভাবে। জিনেবের মুখ, ভাই বোনদের কথা মনে করে… মোহাম্মদ উঠে দাঁড়িয়ে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।
অগণিত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মোহাম্মদ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ফল বিক্রির কাজ করে যাচ্ছে। তবে একদিন সকালে তার বেশ খারাপ লাগল। সকালে যখন সে ভ্যান বের করছিল তখন ভ্যানের একটা চাকা খুলে পড়ে যায়। এটা শুধু দুর্ঘটনা নাকি কারো ষড়যন্ত্রের ফল, মোহাম্মদ তা বলতে পারে না। কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে তার ঝামেলা আছে। যারা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে মোহাম্মদের সমালোচনার বিপক্ষে। একদিন পাশের বাড়ির পুরুষটি বলছিল, “তুমি যদি এভাবে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকো, তাহলে তুমি আমাদের সবার জন্য বিপদ ডেকে আনবে। কেন তোমাকে সবকিছু টেনে নামাতে হবে? তুমি কি চাও সবাই ধনী হয়ে যাক? তুমি একজন কমিউনিস্ট, তাই না? তুমি বরং নিজেকে একটু শান্ত করো। কারণ, এই দেশে পুলিশ যখন কাউকে গ্রেপ্তার করে তখন কেউ জানে না সে কোন আকৃতি নিয়ে ফিরবে।”
“দেখলেন তো, আপনিও কিন্তু সরকারের সমালোচনা করছেন।”
“না, আমি শুধু যা ঘটছে তাই বলছি। আমি সুখী মানুষ; আমার জীবন ঠিকঠাক আছে।” তারপর লোকটি গলার স্বর সর্বোচ্চে তুলে চিৎকার করতে লাগল, “আমাদের প্রেসিডেন্ট দীর্ঘজীবী হোক! আমাদের ফার্স্ট লেডি দীর্ঘজীবী হোক!”
মোহাম্মদ ভ্যানের চাকা মেরামত করতে লেগে গেল। কয়েকটি বাচ্চা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। তারা সাহায্য করতে চায়। সহসা ভ্যানটি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে যায়। আর মোহাম্মদ ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাস্তার প্রথম মোড়ে একটি পুলিশ এসে থামায়।
“এভাবে তুই কোথায় যাচ্ছিসরে?”
“কাজে যাচ্ছি।”
“তোর কাজের অনুমতিপত্র?”
“আপনি খুব ভালো করেই জানেন যে এমন কিছুর অস্তিত্ব নেই।”
“হ্যাঁ, আমি জানি। তবে সেটি অন্য আকারেও থাকতে পারে।”
মোহাম্মদ না বোঝার ভান করে।
পুলিশ অফিসার বলল, “ব্যাপারটা তোর জন্য খারাপ হলো ছোকরা। এই প্রতিক্রিয়ার জন্য তোকে অনেক মূল্য দিতে হতে পারে। আচ্ছা, পরে দেখা হবে।”
ঘুরে না তাকিয়েই মোহাম্মদ চলে গেল। সে একটা শবযাত্রার কাছে ছুটে গেল। সেখানে অনেক মানুষ। আর আশ্চর্য ব্যাপার যে তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে জাতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে।
মোহাম্মদ একজনকে জিজ্ঞেস করল কাকে দাফন করা হচ্ছে। “একটা গরিব লোক। আপনার আমার মতো সাধারণ একজন। কেউ জানে না কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। গত সপ্তাহে লোকটিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ইন্টারনেটে কিছু করার কারণে। আর তারপর গতকাল তার বাবা-মা বাড়ির দরজার সামনে ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখে।
“পুলিশের হাতে খুন?”
“নিঃসন্দেহে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই,” নিচু গলায় বলে লোকটি। “চমৎকার মানুষ ছিলেন তিনি। একটা ক্যাফেতে কাজ করতেন। আর সন্ধ্যায় ইন্টারনেটে খেলতেন।”
মোহাম্মদ তার ফলের ভ্যান ঠেলে মিছিলের পিছু নিল। লক্ষ্য করে সাদা পোশাকের পুলিশ ছবি তুলছে।
মৃতদেহ দাফন শেষে মোহাম্মদ পাইকারি বাজারের দিকে রওনা হলো।
ঘটনাটি ভয়ংকর ছিল। উঠে দাঁড়ানোর সময় পর্যন্ত পেল না মোহাম্মদ। ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশ অফিসার, একজন পুরুষ ও একজন মহিলা, মোহাম্মদকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার ভ্যানটিকে আটক করেছে।
“বাজেয়াপ্ত করা হলো!”
“বেআইনিভাবে পণ্য বিক্রি করতে পারিস না তুই। তোর কাজের অনুমতি নেই। লাইসেন্স নেই। তুই সরকারকে কর দিস না। রাষ্ট্র থেকে চুরি করছিস। সুতরাং তোর খেলা এখানেই শেষ: এই ফলের ভ্যান এখন থেকে বাজেয়াপ্ত হলো।”
মহিলা পুলিশটি বলল, “এখন ভাগ। আদালতে হাজির হবার আদেশনামা পাবি তুই। চলে যা এখান থেকে!”
মোহাম্মদ মাটিতেই পড়ে থাকে। কারণ অন্য অফিসারটি তখনও তাকে লাথি মারছে।
পথচারীরা দাঁড়িয়ে পড়েছে দেখতে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতিবাদ করল। পুলিশ তাদের হুমকি দেয়। একটা জিপ এলো, আর জিপ থেকে একজন অফিসার নামল। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা শুনে পুলিশটি আবার জিপে উঠে মিলিয়ে গেল।
এরপর একটি পুলিশ ভ্যান এলো। ভ্যান থেকে কয়েকজন পুলিশ নেমে এসে মোহাম্মদের ফলের ভ্যান থেকে পড়ে যাওয়া ফলগুলো তুলে জড়ো করে। এদের মধ্যে একজন পুলিশ একটি আপেলে কামড় পর্যন্ত বসালো, যেটি সে মাটি থেকে তুলেছে।
শক্তিহীন মোহাম্মদ কিছুই বলল না। সে রাস্তায় এলোমেলো ঘুরতে থাকে। এইমাত্র যা ঘটে গেছে তাতে সে বিমূঢ়। চিন্তা করতে অক্ষম। নিজের অজান্তেই তার পা দুটি তাকে টাউন হলের দিকে নিয়ে গেল। সে মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। সামনের টেবিলে বসে থাকা লোকটি তর্জনী দিয়ে কপালের একপাশে বৃত্তাকারে ঘোরাতে থাকে, আর বোঝায় যে মোহাম্মদ একটা পাগল।
“তুমি কি মনে করো যে চাইলেই তুমি ঠিক এইভাবে মেয়রের সঙ্গে দেখা করতে পারবে?”
“কেন না? তার সাথে আমার কথা বলা দরকার।”
“নিজেকে তুমি কী মনে করো? তুমি কি ধনী কেউ? তুমি কি খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন? এখন যাও এখান থেকে। আমাকে শান্তিতে চা খেতে দাও।”
মোহাম্মদ জোর দিয়ে বলল, “তাহলে অন্তত ডেপুটি মেয়র…”
“তারা সবাই এখন অফিসের বাইরে। গভর্নর একটি নতুন মসজিদ উদ্ভোদন করছেন আজ।”
“আগামীকাল আসি?”
“আমার কাছে থেকে একটা পরামর্শ নাও বাপু: চিন্তাটা তুমি মাথা থেকে ফেলে দাও।”
“ঠিক আছে। কিন্তু যাওয়ার আগে আপনাকে আমার জানাতে হবে কেন আমি মেয়রের সাথে কথা বলতে চাই।”
“কেন?”
“পুলিশ আমার জীবিকা নির্বাহের একটি জিনিস বাজেয়াপ্ত করেছে। যে ভ্যানে করে আমি ফল বিক্রি করি। ওটা আমার জীবনযাত্রার একমাত্র মাধ্যম।”
“আর তুমি মনে করো যে তোমার সুন্দর চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে মেয়র পুলিশকে শাসন করবে?”
“ন্যায়বিচারের স্বার্থে করবে।”
“আচ্ছা, অদ্ভুত ছেলে তো তুমি! কোথা থেকে এসেছ?” গলাটা একটু নিচু করে লোকটা বলে, “এই দেশে তুমি বিচার দেখেছ কোথায়?” তারপর লোকটি একটুখানি সরে গেল। একটা লাঠি হাতে করে আবার ফিরে এলো। বলল, “এখন চলে যাও! নয়তো তোমার সুন্দর মুখ আমি ভেঙ্গে দেব।”
মোহাম্মদ আর জোরাজুরি করল না।
সেই সন্ধ্যায় সে জিনেবের সঙ্গে দেখা করল। জিনেব বলেছে মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে সে টাউন হলে যাবে। এছাড়াও জিনেবের মাথায় আরেকটি পরিকল্পনা আছে।
“আমরা যদি অভিযোগ নিয়ে সরাসরি পুলিশ প্রধানের কাছে যাই তাহলে কেমন হয়?”
“কেন নয়?”
তারা দুজন পুলিশ সদর দফতরে গেল।
সদর দফতরে কোনো কর্মকর্তাই মোহাম্মদের ঘটনাটি জানে না। জিনেবই প্রথম কথা বলে।
“আচ্ছা, সেইক্ষেত্রে প্রথমে আমরা চুরির অভিযোগ আনব!”
“আপনি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে যাচ্ছেন? আপনারা কোথায় আছেন বলে মনে করেন, সুইডেন?” একটি দুষ্ট হাসি দিয়ে প্রশ্ন করে অফিসার।
“আমরা শুধু আমাদের ভ্যান ফেরত চাই।”
“বুঝেছি। আপনার আইডি কার্ড দিন আমাকে। আমি ফটোকপি করে রাখছি। আর আমার কাছে কোনো সংবাদ এলে আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।”
জিনেব অফিসারের কথা বিশ্বাস করল না। সে আইডি দিতে অস্বীকার করে। মোহাম্মদকে হাত ধরে টানে জিনেব। আর তারা দুজন বেরিয়ে গেল পুলিশের সদর দফতর থেকে।
দীর্ঘ সময় ধরে দুজন রাস্তায় হাঁটল। হাত ধরে। অথবা পরস্পরের কোমরে হাত রেখে।
ওদের পাশে এসে একটি গাড়ি থামে: সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসারদের গাড়ি।
“তোমাদের কাগজ… তোমরা বিবাহিত নও। রাতের এই সময়ে নির্জন রাস্তায় হাঁটা বেআইনি।”
জিনেব তার নারীসুলভ মুগ্ধতা ব্যবহার করে অফিসারটিকে অনুরোধ করে তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট না করতে।
“আমার বাবা ভীষণ রাগী। দয়া করে আমাদের যেতে দিন! আমরা বাড়ি চলে যাব। আমরা দুজন ভুল কিছু করিনি।”
“আচ্ছা, যাও। তোমাদের এবার ছেড়ে দেওয়া হলো।”
তারা দুজন সোজা বাড়ি ফিরে গেল।
খুব অস্থির একটা রাত কাটে মোহাম্মদের। মাকে সে ভ্যান বাজেয়াপ্তের ঘটনাটি জানায়নি। ওর বাবা বলেছিল, স্ট্রেস তার মায়ের ডায়বেটিস বাড়িয়ে দেয়।
পরের দিন খুব ভোরে মোহাম্মদ গা ধুয়ে নিল। বাবার মৃত্যুর পর এই প্রথমবার সে নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্পূর্ণ সাদা কাপড় পরেছে। মা ঘুমাচ্ছে। মাকে না জাগিয়ে মোহাম্মদ মায়ের কপালে একটা চুমু খেল। ঘুমন্ত ভাই বোনগুলোকে এক ঝলক দেখল। তারপর দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। ভাইয়ের পুরানো মোটরবাইকটি নিয়ে মোহাম্মদ একটা গ্যাস স্টেশনে গিয়ে থামে। সেখানে একটা প্লাস্টিকের পানির বোতলে পেট্রল ভরল। বোতলটা একটা ছোট ব্যাগে ভরে সে টাউন হলের দিকে গেল।
টাউন হলে পৌঁছে মোহাম্মদ কোনো একজন অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে চাইল।
কিন্তু কেউ মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলো না।
পুলিশ যেখানে তার ভ্যানটি আটক করেছিল, মোহাম্মদ সেখানে গেল।
আবার তারা সেখানে এসেছে। মোহাম্মদ আর দুজন পুলিশ। ভ্যানটি কাছাকাছি পড়ে আছে। খালি।
মোহাম্মদ পুলিশের কাছে গেল। নিজের সম্পত্তি ফেরত চায়।
পুরুষ পুলিশটি মোহাম্মদকে জোরে একটা থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে বলে, “দেখ নোংরা ইঁদুর, মেরে আমি তোর বিষ্ঠা বের করার আগেই তুই এখান থেকে চলে যা!”
মোহাম্মদ আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। এবার মহিলা পুলিশটি তার পালা গ্রহণ করে। সে মোহাম্মদকে চড় মারল আর মোহাম্মদের মুখে থুথু দিল। বলল, “তুই একটা জঘন্য কীট। আমাদের সকালের নাস্তা নষ্ট করছিস তুই! কোনো শিষ্টাচার নেই তোর মধ্যে। তুই কেউ না।”
মোহাম্মদ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। একটি কথাও বলছে না। নড়াচড়া করছে না। তার মুখের ভাষা অপরিবর্তিত। চোখ দুটি লাল। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। মোহাম্মদের ভিতরে কিছু একটা বিস্ফোরিত হতে চলেছে। এইভাবে সে দুই বা তিন মিনিটের মতো স্থির থাকল। যা মোহাম্মদের কাছে অনন্তকালের মতো অনুভূত হয়।
পুরুষ অফিসারটি বলে, “যা। ভাগ। চলে যা এখান থেকে। তোর ভ্যান— ওটা তুই আর কখনো দেখতে পাবি না। তোর খেলা শেষ। তুই আমাদেরকে সম্মান করিসনি। আর তার জন্য আমাদের প্রিয় দেশে তোকে মূল্য দিতে হবে।”
মোহাম্মদের মুখ শুকনো। লালা তেতো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মোহাম্মদ ভাবছে, আমার কাছে যদি একটা বন্দুক থাকত, তাহলে আমি সেই বন্দুক খালি করতাম এই হারামজাদাগুলোকে গুলি করে। আমার কাছে বন্দুক নেই, কিন্তু এখনও আমার কাছে শরীর আছে। আমার জীবন, আমার নষ্ট জীবনটা আছে। এটিই আমার অস্ত্র।
মোহাম্মদ উঠে দাঁড়াল। আর পুলিশ দুটির কাছ থেকে দূরে সরে গেল। মোটরবাইক স্টার্ট করে সে টাউন হলের দিকে গেল।
বাইকটিকে একটি খুঁটিতে তালা দিয়ে মোহাম্মদ আবার ভেতরে গেল। মেয়র অথবা মেয়রের কোনো একজন ডেপুটির সঙ্গে কথা বলতে চায়। সামনের ডেস্কে বসা লোকটি আগের দিনের চেয়ে আজ আরও বেশি রেগে গেল। অফিসের বাইরে এসে মোহাম্মদ ছোট ব্যাগে রাখা পেট্রলের বোতলটির কথা মনে করে। পরনের সাদা পোশাক টেনে সোজা করে মোহাম্মদ আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কেউ তাকে লক্ষ্য করছে না।
দিনটি হচ্ছে ডিসেম্বরের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল। ১৭ই ডিসেম্বর। কিছু বিক্ষিপ্ত দৃশ্যের এক বিভ্রান্ত চিত্র দ্রুত বেগে ছুটে আসছে মোহাম্মদের মনের দৃশ্যপটে। তার মা বিছানায় পড়ে আছে। বাবা কবরে। মোহাম্মদ নিজে আর্টস এন্ড লেটারস অনুষদে। জিনেব হাসছে। জিনেব রাগছে। জিনেব তাকে অনুরোধ করছে কিছু না করতে। মা বিছানা থেকে উঠে তাকে ডাকছে। যে মহিলা পুলিশটি আগে তাকে থাপ্পড় মেরেছিল, যে মহিলা পুলিশ আবার তাকে চড় মেরেছিল, সেই মহিলা পুলিশের মুখ। মোহাম্মদের শরীর এমনভাবে বেঁকে যাচ্ছে যেন সে নিজেকে একটা জল্লাদের কাছে উৎসর্গ করেছে। নীল আকাশ। একটি বিশাল গাছ মোহাম্মদকে আশ্রয় দিয়েছে। গাছের নিচে জিনেবের কোলে সে। মোহাম্মদ, একটি ছোট্ট শিশু, স্কুলে যেন দেরি হয়ে না যায় তার জন্য দৌড়াচ্ছে। ফরাসি ভাষার শিক্ষক মোহাম্মদের প্রশংসা করছেন। মোহাম্মদ কলেজে পরীক্ষা দিচ্ছে। বাবা-মাকে সে তার ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট দেখাচ্ছে। "বেকার" শব্দের পাশে তার ডিপ্লোমাটিকে গেঁথে রাখা হয়েছে। সিঙ্কে মোহাম্মদের ডিপ্লোমার কাগজ পুড়ছে। আবার তার বাবার দাফন। চিৎকার। পক্ষীর দল। রাষ্ট্রপতি এবং তার স্ত্রীর মুখে বিশালাকৃতির কালো সানগ্লাস। যে মহিলা পুলিশটি তাকে চড় মেরেছিল। অন্য যে লোকটি তাকে অপমান করেছিল। আকাশে উড়ে যাওয়া চড়ুইদের একটা মিছিল। "স্পার্টাকাস"। একটি পাবলিক ফোয়ারা। মোহাম্মদের মা এবং তার দুই বোন পানি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আবারও পুলিশ, তাকে নৃশংসভাবে মারছে, অপমান করছে, মারছে, অপমান করছে, হাতাহাতি চলছে…
শেষ আরেকবার মোহাম্মদ মেয়রের সঙ্গে দেখা করতে চায়। অসম্মতি আর অপমান জুটলো। সামনের ডেস্কের লোকটি তাকে হাতের লাঠি দিয়ে ধাক্কা দিলো। আর মোহাম্মদ মাটিতে পড়ে যায়। মোহাম্মদ নিঃশব্দে উঠে টাউন হলের প্রধান প্রবেশপথের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে পেট্রলের বোতলটি বের করে নিজের গায়ে ঢেলে দিল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। পুরো বোতল খালি না হওয়া পর্যন্ত। তারপর সে তার লাইটার জ্বালায়। এক মুহূর্তের মতো লাইটারের আগুনের দিকে তাকাল। আর তারপর লাইটারটিকে নিজের কাপড়ের দিকে টেনে নিল।
মুহূর্তেই জ্বলে উঠেছে আগুন। কিছুক্ষণের মধ্যে মোহাম্মদের জ্বলন্ত শরীরের দিকে ছুটে এলো জনতার ভিড়। সামনের ডেস্কে বসে থাকা লোকটি চিৎকার করে উঠল। লোকটি তার গায়ের জ্যাকেট দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মোহাম্মদ মশালে পরিণত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছানোর আগেই আগুন নিভে গেছে। কিন্তু মোহাম্মদের শরীর মনুষ্য অবয়বের সকল সাদৃশ্য হারিয়েছে। তার পুরো শরীর সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেছে। একটা পোড়া ভেড়ার মতো।
সামনের ডেস্কের লোকটা কাঁদছে। “সব দোষ আমার। আমার উচিত ছিল ছেলেটাকে সাহায্য করা।”
মোহাম্মদ এখন হাসপাতালে আছে। পুরো শরীর কাফনের মতো ব্যান্ডেজে মোড়ানো। সে কোমায় আছে। হাসপাতালের লবিতে একটা চাঞ্চল্য উঠল এই সময়। সাদা কোট পরা ডাক্তার ও নার্সরা একটা হলওয়ের দিকে দৌড়াচ্ছে। সেটি মোহাম্মদের রুমের দিকে গেছে। রাষ্ট্রপতি হাসপাতালে এসেছেন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদের দুর্ভাগ্যের কথা জেনেছেন। রাষ্ট্রপতি মোটেই খুশি নন। তিনি সেই মেয়রের কথা শুনেছেন যিনি মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেছিল। রাষ্ট্রপতি মেয়রকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দিলেন। রাষ্ট্রপতি ক্ষুব্ধ। তিনি জানতে পেরেছেন যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি মোহাম্মদের ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে।
ডাক্তারদের একটি দল রাষ্ট্রপতিকে হাসপাতাল কক্ষে অনুসরণ করছে।
অশ্লীল এবং হাস্যকর মহড়া।
গোটা দেশে বিদ্রোহ আরম্ভ হয়েছে। মাথার চুল শক্ত করে বেঁধে নিয়ে জিনেব একটি বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তার মুঠি উত্থাপিত হচ্ছে। সে গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। জিনেব চিৎকার করছে।
মোহাম্মদ মারা গেল ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারী।
দেশের সর্বত্র বিক্ষোভ চলতে থাকে। দেশের জনগণ চিৎকার করে বলছে, “আমরা সবাই মোহাম্মদ!”
রাষ্ট্রপতি দেশ ছাড়লেন চোরের মতো। তারা-ভরা এক রাতে রাষ্ট্রপতির বিমানটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
আরও বিক্ষোভ হলো।
মোহাম্মদের ছবি এখন সর্বত্র: যা রাষ্ট্রযন্ত্রের বলি এবং প্রতীক। মোহাম্মদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছুটে এসেছে দেশে।
এমনকি একজন চলচ্চিত্র প্রযোজকও এলো তাদের সঙ্গে দেখা করতে। অশ্রুসিক্ত প্রযোজক মোহাম্মদের মায়ের হাতে একটি খাম তুলে দিয়ে বলল, “দয়া করে এই সাহায্য গ্রহণ করুন; এটা খুব বেশি না। ভাগ্য এমনই, নিষ্ঠুর আর অন্যায্য।”
লোকটি নিচু হয়ে কাঁদতে থাকা মায়ের কানে ফিসফিস করে বলল, “ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি আর কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। কোনো সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেবেন না। আপনাকে আমি সাহায্য করব। মোহাম্মদের গল্প আমি বলব। সারা বিশ্বের জানা উচিত আসলে কী ঘটেছে। মোহাম্মদ একজন বীর। সে একটা শিকার। আর সে একজন শহীদ। আমরা কি একমত হয়েছি? আপনি আমাকে ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। আমাকে এখন যেতে হবে। কিন্তু আপনার যদি কিছু প্রয়োজন হয় তাহলে এই যে আমার কার্ড। আর এখানে একটা মোবাইল ফোন আছে যাতে আপনি আমাকে কল করতে পারেন।”
লোকটির কথা কিছুই বুঝতে পারছে না মোহাম্মদের মা। কিন্তু তার মেয়েরা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে: “এই লোকটি আমাদের ভাইয়ের মৃত্যু কিনতে চায়। আর এখান থেকে সে কিছু লাভ করতে চায়! কী এক দুঃস্বপ্ন! কী নিদারুণ নিশাস্বপ্ন! মোহাম্মদের গল্প অন্য কারো নিজের লাভের জন্য নয়। এটি এক সাধারণ মানুষের গল্প। অন্যান্য লক্ষাধিক মানুষের মতো একজন মানুষ, যে জীবনে চূর্ণ-বিচূর্ণ, অপমানিত, প্রত্যাখ্যাত ও পর্যুদস্ত হবার পর এমন এক স্ফুলিঙ্গে পরিণত হয়েছে যা পুরো বিশ্বে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে কেউ কখনো চুরি করতে পারবে না।”
---------------
মূল গল্প: তাহার বেন জেলুন
ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ: রিটা এস. নেজামি
লেখক পরিচিতি: তাহার বেন জেলুন, একজন মরক্কোর লেখক। জন্ম ১ ডিসেম্বর ১৯৪৪। তাঁর লেখালেখির পুরোটাই ফরাসি ভাষায় রচিত, যদিও তাঁর প্রথম ভাষা দারিজা। বেন জেলুন বর্তমানে বসবাস করছেন ফ্রান্সের প্যারিসে। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন।
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাস L’Enfant de Sable (দ্য স্যান্ড চাইল্ড নামে ইংরেজিতে অনূদিত) ব্যাপকভাবে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
১৯৮৭ সালে, তিনি তাঁর লেখা উপন্যাস La Nuit Sacrée (পবিত্র রাত) এর জন্য প্রিক্স গনকোর্ট পুরস্কার পান। তাহার বেন জেলুন এর লেখা ১৯৯৬ সালের উপন্যাস Les raisins de la Galère (কঠোর পরিশ্রমের ফল), যা বর্ণবাদ ও নারীর অবস্থান সম্পর্কে ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ধারণার প্রতিফলন। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র, নাদিয়া (আলজেরীয় বংশোদ্ভূত এক ফরাসি তরুণী), যে তরুণী ফরাসি সমাজে নিজের অবস্থান নির্ণয় করতে বর্ণবাদ ও বর্জনের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
১৯৯৩ সালে তিনি ইতালীয় গবেষণা কেন্দ্র আর্কাইভিও দিসারমো কর্তৃক প্রকাশিত সাংবাদিক পুরস্কার গোল্ডেন ডাভস ফর পিস এওয়ার্ড লাভ করেন। তাহার বেন জেলুন ২০০৪ সালে Cette aveuglante Absent de lumière (দিস ব্লাইন্ডিং অ্যাবসেন্স অব লাইট) এর জন্য আন্তর্জাতিক ডাবলিন সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৫ সালে তিনি তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য কর্মের জন্য প্রিক্স ইউলিসি পদক পেয়েছেন।
অনুবাদক পরিচিতি:লুনা রাহনুমা, লেখক ও অনুবাদক।
প্রকাশিত গ্রন্থ ৬টি। কাব্য গ্রন্থ: "ভালোবেসে এঁকে দিলাম অবহেলার মানচিত্র" (১৯৯৯)
কাব্যগ্রন্থ: "ফুঁ" (২০০০)
গল্পগ্রন্থ: "নারীবৃক্ষ" (২০২২)
অনুবাদ গল্পসংকলন: "দিগন্তের দিকে হেঁটে যাওয়া মেয়েটি।" (২০২২)
উপন্যাস: "সুখ নদী দুখ নদী।" (২০২৩)
অনূদিত উপন্যাস: "বাঁকা পাঁজরের মেয়ে" (২০২৪)বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সুইন্ডনে বসবাস করছেন।


0 মন্তব্যসমূহ