অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
একজন ট্র্যাপিজ় শিল্পী – সংগীত-কক্ষের গোলাকার গম্বুজের চূড়ায় এই শিল্পের অনুশীলন করা হয়, এবং মানবজাতির দ্বারা অর্জনযোগ্য কোনো কিছুর মধ্যে এটি অন্যতম কঠিন বলে স্বীকৃত – ওর জীবনের নিত্যকার্যসূচি এমনভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল – প্রথমত সিদ্ধিলাভের জন্য আপোষহীন প্রশিক্ষণ থেকে, আর পরে অভ্যেসবশত, এই সংস্থাতেই যতক্ষণ কাজ করেছে, রাত আর দিনের বাছবিচার না করে, সর্বক্ষণ ট্র্যাপিজ়েই অবস্থান করত। ওর যাবতীয় প্রয়োজন – যদিও তেমন ভারি প্রয়োজন কিছু নয় – ওর চাকর-বাকররাই সেই সবের বন্দোবস্ত করে দিত। নীচে খেয়াল রাখা হত। বিশেষভাবে তৈরি করা পাত্র ভরে নীচে থেকে হাত বদল হয়ে সব প্রয়োজনীয় বস্তু ওপরে চলে যেত। জীবনযাপনের এই পদ্ধতি ওর পাড়া-পড়শিদের কাছে তেমন অসুবিধেজনক মনেই হয়নি। কেবলমাত্র, অন্যদের খেলার প্রদর্শনের সময় ওর ওপরে থাকায় সামান্য কিছু বিঘ্ন ঘটত। যদিও সেই সব সময়ে ও আড়ালে না থাকলেও মোটামুটি নিশ্চল হয়েই থাকত, তবে ওপরে বসে তাকার সময় মাঝে মাঝে দর্শকদের চোখ ওর দিকে চলে যেত। তবে ও এতই পেশাদার ছিল আর ওর বিকল্প পাওয়া বেশ অসম্ভব ছিল যে মালিকরা ওর এইটুকু বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিতেন। আর ওঁরা এটাও বুঝতেন যে ইচ্ছাকৃতভাবে নয় বরং নিয়মিতভাবে অনুশীলন করার জন্যই এই ভাবে থাকে, যাতে ওর শৈলীটা নিখুঁতভাবে বজায় থাকে।
সে যাই হোক, মোটামুটি সব দিক থেকেই ওপরতলাটি পুরোপুরিই স্বাস্থ্যকর ছিল। গ্রীষ্মের মৌসুমে, ছাদের সমস্ত জানলাগুলি খুলে দেওয়া হত, তাজা বাতাস আর সূর্যের ঝলমলে রোশনি ছায়াময় জায়গাটি মহিমান্বিত করে তুলত, আরও ভাল লাগত। সাধারণত, মানুষের সঙ্গে ওর যোগাযোগ বেশ সীমিতই ছিল। তবে কখনো কখনো সহযোগী কোনও দড়াবাজিকর দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওর কাছে চলে আসত। তখন দুজনে মিলে ট্র্যাপিজ়ের রশিকে অবলম্বন করে – একজন ডান দিকে হেলান দিয়ে বসে আর অন্যজন বাঁ দিকে হেলান দিয়ে বসে – আড্ডায় মজে যেত।
অথবা হয়ত মিস্ত্রীরা মাঝে মধ্যে ছাদ মেরামত করতে যেত। তখন খোলা জানলা থেকে উঁকি মেরে ওর সঙ্গে দু-চারটে কথা বলত। কিংবা আপৎকালীন আলোর বন্দোবস্ত তদারক করার জন্য দমকল কর্মীরা সব চাইতে ওপরের গ্যালারিতে যাবার সময় সম্ভ্রমের সঙ্গে ওকে কিছু কথা বলত, তবে কী কথা যে বলত সেটি ওর বোধগম্য হত না। এই দু-একটি ব্যাপার ছাড়া অন্য কোনও ব্যাপারই বিশেষ নজরে পড়ত না। দুপুরের দিকে, নাট্যগৃহ যে সময় ফাঁকা থাকে, কোনও কর্মচারি হয়ত অবাক হয়ে দূর থেকেই খাড়াইয়ের দিকে নজর পড়ে যেত। তবে সেটি এতই উঁচুতে যে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীকে ও নজরই করতে পারত না। বুঝতেও পারত না নিজের অজান্তেই কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছে। হয়ত ট্র্যাপিজ়-শিল্পী প্রশিক্ষণে ব্যস্ত, কিংবা বিশ্রাম নিচ্ছে।
ট্র্যাপিজ়-শিল্পী নিজের জীবন নিরুপদ্রবে এই ভাবেই কাটিয়ে দিতে পারত যদি না ওকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অনিবার্যভাবে ঘোরাফেরা করতে হত। এই ব্যাপারটি ওর কাছে বেশ কষ্টকরই ছিল। সার্কাসের পরিচালক অবশ্য চেষ্টা করতেন যে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীর এই কষ্টভোগ যেন অযথা দীর্ঘায়িত না হয়ে পড়ে। দ্রুতগামী মোটরগাড়িতে – হয় রাতে অথবা সকাল সকাল – ওকে অন্য শহরে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হত যাতে যানজট যতটা সম্ভব এড়ানো যায়। দ্রুতগামী হলেও মোটরগাড়ির গতি ট্র্যাপিজ়-শিল্পীর ইচ্ছে মতই নিয়ন্ত্রণে রাখা থাকত। যদি রেলগাড়িতে যেতে হত, ওর জন্য সম্পূর্ণ একটি কামরা সংরক্ষিত করা হত যাতে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত পড়লেও অন্তত সেটির নিকৃষ্ট বিকল্পের সুবিধা নিতে পারে। কমপক্ষে লাগেজ-র্যাকটিকে যাতে সেই ভাবে ব্যবহার করা যায়, তার প্রচেষ্টা থাকত। যে কোনও প্রদর্শনীর তারিখ ঠিক হয়ে গেলে, ট্র্যাপিজ়-শিল্পীকে নিয়ে যাওয়ার আগেই নাট্যশালায় ট্র্যাপিজ় তৈরি হয়ে যেত, অডিটরিয়ামে প্রবেশের সবকটি দরজাই প্রশস্তভাবে খোলা রাখা হত, করিডরগুলি অন্তরায়মুক্ত রাখা হতে। তবে ট্র্যাপিজ়-শিল্পী এসে দড়ির সিঁড়িতে পা রাখতে না রাখতেই ট্র্যাপিজ়টিকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় আবার ঝুলিয়ে দেওয়া হলেই পরিচালক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন।
এই রকম বহু সফরই পরিচালক সাফল্যের সঙ্গে উৎরে দিতে পারলেও, প্রতিটি নতুন সফরকে ঘিরেই ওঁর অস্বস্তি থেকেই যেত। কারণ, সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে পারলেও প্রতিটি সফরই ট্র্যাপিজ়-শিল্পীর স্নায়ুর ওপরে ওপর একটি ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলত।
একবার এই ভাবেই সকলে একসঙ্গে সফরের জন্য রওনা হলেন। ট্র্যাপিজ়-শিল্পী লাগেজ র্যাকে শায়িত হয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। পরিচালক ওর বিপরীত দিকে জানলার কোণে হেলান দিয়ে বসে একটি বই পড়ছেন। সেই সময় ট্র্যাপিজ়-শিল্পী মৃদুস্বরে ওঁর মনোযোগ আকর্ষণ করল। পরিচালক বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে ওর বক্তব্য শোনার জন্য প্রস্তুত হলেন। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ট্র্যাপিজ শিল্পী বলল, এতদিন পর্যন্ত একটি ট্র্যাপিজ়ে অনুশীলন করলেও, এখন থেকে ওর দুটি লাগবে, একটি ট্র্যাপিজ়ের বিপরীতে আরও একটি ট্র্যাপিজ় না পেলে চলবে না। পরিচালকও তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিয়ে দিলেন। কিন্তু ভবিষ্যতে কখনওই – কোনো পরিস্থিতিতেই – একটি মাত্র ট্র্যাপিজ়ে প্রদর্শনী করবে না, এই কথা বলে ট্র্যাপিজ়-শিল্পী যেন ইশারায় বুঝিয়ে দিতে চাইল যে পরিচালকের সঙ্গে যে চুক্তিই হয়ে থাক না কেন, এই ব্যাপারে পরিচালকের আপত্তি করার কোনও সুযোগই নেই। ভবিষ্যতে কখনও এই রকম কোনও পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও হতে পারেন ভেবে উনি হয়ত শিউরে উঠলেন। দ্বিধাগ্রস্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালক আবারও তাঁর সম্পূর্ণ সম্মতি জানালেন। বললেন, একটি ট্র্যাপিজ়ের চেয়ে দুটি ট্র্যাপিজ় থাকাই ভাল। তাছাড়া নতুন এই বিন্যাসের সব থেকে বড় সুবিধে হচ্ছে যে ক্রীড়াকৌশল প্রদর্শনে অনেক রকম বৈচিত্র আনা যাবে।
তখন হঠাৎ ট্র্যাপিজ়-শিল্পী করে কাঁদতে আরম্ভ করল। খুবই বিচলিত হয়ে পরিচালক উঠে দাঁড়ালেন। ওর কী হয়েছে জানতে চাইলেন। যখন কোনও জবাব পেলেন না, উনি বেঞ্চের ওপর উঠে পড়লেন, ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, ওর গাল নিজের গালে চেপে ধরলেন। ট্র্যাপিজ়-শিল্পীর অশ্রুজল উপচে পড়তে লাগল। অনেকক্ষণ ধরে নানা রকম প্রশ্ন করার পর, তোষামোদ করার পর, ট্র্যাপিজ়-শিল্পী ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘একটিই মাত্র ডাণ্ডা আমার কাছে – কী নিয়ে বাঁচি আমি?’
ট্র্যাপিজ়-শিল্পীকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যাপারটি পরিচালকের কাছে ততক্ষণে অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছিল। কথা দিলেন, পরের শহরে – যেখানে ওঁদের পরবর্তী প্রদর্শন অনুষ্ঠিত হবে – সেখান থেকেই তার করে দ্বিতীয় একটি ট্র্যাপিজ়ের বন্দোবস্ত করতে বলবেন। এত দিন ধরে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীকে একটিমাত্র ট্র্যাপিজ়েই ক্রীড়া প্রদর্শণ করতে দিয়েছেন, সেই জন্য আত্মসমালোচনাও করলেন। ওকে ধন্যবাদ জানালেন এবং উচ্চকণ্ঠে তারিফ করে বললেন যে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীই এই বিশাল ত্রুটির দিকে ওঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এইভাবে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীকে ধীরে ধীরে শান্ত করে তুললেন। তারপর নিজের জায়গায় ফিরে আসতেও পারলেন। কিন্তু তিনি নিজে শান্ত হতে পারেননি। ভারাক্রান্ত মনে, বইয়ের ওপর থেকে আড়চোখে ট্র্যাপিজ়-শিল্পীকে নজর করে দেখলেন। এই ধরণের চিন্তা যদি একবার ওকে অস্থির করতে শুরু করে দেয়, তাহলে কি সেই অস্থিরতা কোনওদিনই পুরোপুরি শান্ত হবে? তার বদলে এসবের তীব্রতা কি আরও বাড়তে থাকবে না? এগুলি কি ওর জীবন আর জীবিকার জন্য বিপদ হয়ে উঠবে না? আপাতত যেভাবে কান্নাকাটি বন্ধ করে শান্তির নিদ্রা এসে মানুষটিকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, পরিচালক যেন শিল্পীর মসৃণ শিশুসুলভ কপালে বিষাদের কুঁড়িটি দেখতে পেলেন।
**********
লেখক পরিচিতি : ফ্রানৎস কাফকা গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক। তাঁকে বলা হয় সাহিত্যে আধুনিকতাবাদের প্রবর্তক। তাঁর স্থান বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম প্রধান চিরায়ত লেখক হিসেবে। জন্মেছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের প্রাগে, ৩ জুলাই ১৮৮৩ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ৩ জুন ১৯২৪ সালে। কাফকা ছিলেন একজন জার্মান-ভাষী ইহুদি চেক লেখক।

0 মন্তব্যসমূহ