অনুবাদ : বিপ্লব বিশ্বাস
বউ এসে যে সদরদোর খুলে দেবে সে সময়টুকু অবধি নিকোলাই ইয়েভগ্রাফোভিচ অ্যালমাজফের তর সইল না; হ্যাট, কোট না খুলেই সোজা পড়ার ঘরে চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার বিরস-বদন আর ঘাবড়ে গিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ানো দেখে বউ বুঝে গেল, বিশাল দুর্ভাগ্যজনক কিছু ঘটেছে।
সে চুপ থেকে স্বামীর পিছ পিছ গেল। পড়ার ঘরে ঢুকে অ্যালমাজফ ঘরের এক কোণে খিন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে খানিকক্ষণ খাড়িয়ে থাকল। তারপর হাতের পোর্টফোলিয়োটা দড়াম করে মেঝেতে ফেলে দিল, যেখানে তা আলগা হয়ে পড়ল, এবং তারপর একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে দেহটা ছুঁড়ে দিয়ে বিরক্ত সহকারে হাতের আঙুল মটকাতে লাগল।
সে এক যুবক ও অসহায় আর্মি অফিসার, স্টাফ অফিস অ্যাকাডেমিতে এক শিক্ষামূলক বক্তৃতায় যোগ দিতে গিয়েছিল, আর সবেমাত্র একটা ক্লাস থেকে ফিরেছে। আজ তার প্রফেসরের কাছে শেষ ও কঠিনতম ব্যবহারিক কাজটি উপস্থাপনের দিন ছিল—কাজটি হল, প্রতিবেশের সমীক্ষা।
এতদিন অবধি তার সকল পরীক্ষাই ভালোয় ভালোয় মিটেছে, এবং তার বউ আর ঈশ্বরই জানেন, সে কাজে কতটা ভয়ংকর পরিশ্রম তাকে করতে হয়েছে… শুরুতেই বলা যায়, প্রথমে অ্যাকাডেমিতে ভর্তিটাই তার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরপর দু’বছর লজ্জাজনকভাবে ব্যর্থ হয়ে তৃতীয়বার দৃঢ় প্রচেষ্টায় সে সকল বাধা অতিক্রম করে। তার বউ মদত না দিলে সেই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট শক্তি সে পেত না ; পুরোপুরি তা ত্যাগ করতে হত। কিন্তু ভেরোচকা তাকে কখনোই ভেঙে পড়তে দেয়নি, সব সময় সাহস জুগিয়ে গেছে… প্রতিটা বাধার সম্মুখীন হয়েছে উজ্জ্বল, হাসিহাসি মুখে। একজন পুরুষের অর্থাৎ তার স্বামীর মানসিক পরিশ্রমের খাতিরে ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়োজনীয় বস্তুর স্বার্থে সে নিজের যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছে; সে তার স্বামীর সেক্রেটারি, ড্রাফটসম্যান, পাঠক, পাঠ-শ্রোতা, এমনকি নোটবুকও, একের মাঝে স-ব।
পাঁচ মিনিটের জন্য অখণ্ড নীরবতা যা একমাত্র ভেঙে যায় বাড়ির পুরনো অ্যালার্ম ঘড়িটার বিষণ্ণ শব্দে, দীর্ঘচেনা আর ক্লান্তিকর…এক,দুই,তিন-তিন—দুটো স্পষ্ট টিকটিক শব্দ, আর তৃতীয়টা কর্কশ তোতলামির ঢঙে, অস্পষ্ট। তখনও হ্যাট-কোট না ছেড়েই বসে অ্যালমাজফ, চেয়ারের একদিকে ঘুরে… দুপা দূরে ভেরা দাঁড়িয়ে, চুপচাপ তার সুন্দর অস্থির মুখমণ্ডলে বেদনার ছাপ। অবশেষে তেমন সতর্কতার সঙ্গে সে নীরবতা ভাঙল যা এক মনমরা বন্ধুর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কোনও মহিলার অবলম্বন করা উচিত :
“ঠিকাছে, কলিয়া, কাজের খবর কী? তা কি খারাপ হয়েছে?”
কথা না বলে সে শুধু কাঁধ ঝাঁকাল।
“কলিয়া, তা কি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে? বলো, দুজনে মিলে তা নিয়ে কথাবার্তা বলব।”
অ্যালমাজফ বউয়ের পানে ঘুরে বিরক্তিকর ও আবেগতাড়িত গলায় বলতে শুরু করল, সাধারণত যেভাবে কেউ বলে যখন দীর্ঘকাল সয়ে যাওয়া অপমানের বিষয়ে বলতে থাকে।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। তারা এটিকে বাতিল করেছে, যদি তুমি এটাই জানতে চাও। তা কি দেখতে পাচ্ছ না? সব জাহান্নামে গেছে। রাবিশ সব”—সে পোর্টফোলিয়োর গায়ে লাথ কষাল—“এইসব জঞ্জাল আগুনে ছুঁড়ে ফেলাই ভালো। ওই হল তোমার অ্যাকাডেমি। পরের মাসে কলঙ্কিত আঘাত নিয়ে আমি রেজিমেন্টে ফিরব। আর সবই একটা নোংরা দাগের কারণে… যত্তোসব!”
“কোন দাগ,কলিয়া?” ভেরা প্রশ্ন করে। “এটা তো বুঝতে পারছি না।”
স্বামীর চেয়ারের পাশে বসে সে তার গলা বেড়ে ধরে। অ্যালমাজফ বাধা দেয় না তবুও আহত দৃষ্টি নিয়ে আগের মতো কোণের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকে।
“কোন দাগের কথা বলছ,কলিয়া?” বউ ফের জিজ্ঞেস করে।
“ও একটা সাধারণ দাগ—সবজে পেন্ট। তুমি তো জানো, গতরাতে তিনটে অবধি জেগেছিলাম, ড্রয়িং শেষ করার জন্য। ছকেছিলাম সুন্দরভাবে। প্রত্যেকে সেটিই বলেছিল। আচ্ছা,গতরাতে ওইভাবে বসে থেকে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে আমার হাত কেঁপে গেছিল, আর তাতেই একটা দাগ পড়ে গেছিল—একটা বড়ো দাগ…তা মুছে ফেলতে চেষ্টা করলাম, তাতে বরং আরও ধেবড়ে গেল…অনবরত ভেবে চললাম, কীভাবে এটাকে ভালো করা যায়, তারপর স্থির করলাম, ওই জায়গায় এক ঝাড় গাছ এঁকে দিই…আর তা দারুণ সফল হল, আর কেউই অনুমানে আনতে পারল না, ওখানে একটা বিশ্রী দাগ পড়ে গেছিল। আজ সেটিকে প্রফেসরের কাছে নিয়ে গেলাম। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ', তিনি বললেন, 'খুব ভালো, কিন্তু এই জায়গাটায় কী বসিয়েছেন, লেফটেন্যান্ট ; এই ঝোপগুলো কোত্থেকে গজিয়ে উঠল?' অবশ্যই যা ঘটেছে, তা তাকে খুলে বলা উচিত ছিল। হয়তো তিনি খানিকটা হেসে উঠতেন… কিন্তু না, তিনি তা করতেন না, তিনি এমনই এক নিখুঁত জার্মান, এমনই একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। তাই বললাম, 'ওই জায়গায় কিছু গাছ গজিয়েছে।' 'ওহো, না, না,' তিনি বললেন, ‘আমার হাতের পাঁচটি আঙুলের মতোই এই প্রতিবেশকে চিনি, সেখানে কোনও গাছ থাকতে পারে না।' সুতরাং আমার কথা তার বিরুদ্ধে গেল, এই নিয়ে দুজনের মধ্যে অনেক বাগবিতণ্ডা হল; আমাদের অনেক অফিসারও সেখানে ছিল, তারাও শুনছিল। 'ঠিকাছে', শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন, ‘আপনি যদি এতটাই নিশ্চিত যে এই ফাঁকা জায়গায় গাছ আছে, তাহলে চলুন কালকে আমার সঙ্গে গাড়িতে, সরেজমিনে দেখে আসি। আমি প্রমাণ করে দেব, হয় আপনি অযত্নসহকারে এই কাজটা করেছেন, নয়তো রুশ মানচিত্রাঙ্কন স্কেল দিয়ে প্রায় দু মাইল (তিন ভার্সট্স) দূর থেকে মেপে তা নকল করেছেন…।”
“এখন প্রশ্ন হল, তিনি কীভাবে এতটা নিশ্চিত হলেন যে সেখানে কোনও ঝোপঝাড় ছিল না?”
“হা প্রভু, কেন? কেন এইসব ছেলেমানুষী প্রশ্ন করছ! কেননা, তিনি গত বিশ বছর ধরে এই জেলাকে চেনেন; তার শোবার ঘরের চাইতে ভালোভাবে চেনেন। তিনি জগতের ভয়ংকরতম পণ্ডিত, উপরন্তু একজন জার্মান… যাই হোক, শেষ অবধি তিনি জানতেই পারবেন, আমি মিথ্যে বলেছিলাম আর তাই এ নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করেছি…।”
কথা বলার সারা সময় জুড়ে সে তার সামনের টেবিলের ওপরের ছাইদানি থেকে পোড়া দেশলাইয়ের কাঠিগুলো তুলছিল, আর ছোটো ছোটো টুকরোয় ভাঙছিল। কথা থামানোর সময় সেই টুকরোগুলো মেঝেতে ছুঁড়ে দিচ্ছিল। এই দৃশ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মানসিক দিক থেকে শক্ত হলেও, লোকটার প্রায় কাঁদোকাঁদো ভাব।
দীর্ঘক্ষণ স্বামী-স্ত্রী চুপচাপ বসে রইল। তারপর হঠাৎই ভেরোচকা লাফিয়ে উঠল।
“কলিয়া শোনো”, ভেরা বলল, “আমাদের অ্যাক্ষুনি যেতে হবে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।”
নিকোলাই ইয়েভগ্রাফোভিচ এমনভাবে চোখমুখ কুঁচকে উঠল যেন অসহ্য কোনও যন্ত্রণায় কাতর সে।
“ওহ্, বোকার মতো বোলো না ভেরা”, সে বলল, “তুমি কি মনে করো আমার এখনই গিয়ে ক্ষমা-টমা চেয়ে সবকিছু ঠিক জায়গায় নিয়ে আসা উচিত? মনে করো কি? এতে শাস্তি ডেকে আনবে। দয়া করে বোকামি কোরো না।”
“না, এটা বোকামি নয়”, সশব্দে পদাঘাত করে ভেরা বলল, “কেউ তোমাকে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলছে না। কিন্তু তুমি কি বুঝতে পারছ না, সেখানে যদি আদৌ পুরনো কোনও গাছ না থাকে, আমরা সেখানে গিয়ে কয়েকটি লাগিয়ে দিই।তাহলেই তো হয়।”
“কয়েকটি–গা…ছ!” বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে নিকোলাই ইয়েভগ্রাফোভিচ তাকিয়ে রইল।
“ হ্যাঁ, কয়েকটি বসাতে হবে। যদি তুমি সত্যি না বলে থাকো, তাহলে তাকে সত্যিতে পরিণত করতে হবে।” এসো, তৈরি হও। আমাকে আমার হ্যাট দাও…আর কোটটিও। না, ওখানে নেই ; কাবার্ডে আছে… ছাতা!”
অ্যালমাজফ যখন বুঝল তার ওজর-আপত্তি পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে গেল, তখন হ্যাট-কোট খুঁজতে লাগল। ভেরা ড্রয়ার খুলে নানান ধরনের ছোটো ছোটো বাকসো আর পাত্র বের করে আনল।
“কানের দুল… না, ওগুলো কাজের নয়। এতে কিছু পাওয়া যাবে না তেমন । আহা, এইতো সেই আংটি, দামি পাথর আটকানো। পরে কখনও এটি কিনে ফেরত আনব। এটি খোয়ানো কষ্টকর বটে। ব্রেসলেট… এতেও বেশি কিছু পাওয়া যাবে না, পুরনো আর বেঁকে-কুকে গেছে… কলিয়া, তোমার রুপোর সিগারেট কেসটি কোথায়?”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ওদের যাবতীয় মূল্যবান বস্তুসামগ্রী ভেরার হাতব্যাগে ঢুকে গেল, আর সে পোশাক পরে তৈরি হয়ে শেষবারের মতো নিশ্চিত হতে চাইল ,কোনও কিছু ছেড়ে গেল কি না।
“এবার চলো”, স্থিরসংকল্প করে ভেরা বলল।
“কিন্তু কোথায়?” অ্যালমাজফ ফের বাগড়া দিতে চেষ্টা করল। “অন্ধকার হয়ে আসছে। আর জায়গাটাও এখান থেকে দশ ভার্সট্স দূরে।”
“বোকা কোথাকার ! চলে এসো।”
প্রথমেই তারা একটা বন্ধকি-দোকানে গেল। দোকানি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সূত্রে বিপণ্ণ লোকেদের চেহারা দেখেই ধরে ফেলতে অভ্যস্ত, এবং তাদের দেখে কখনোই সে গলে পড়ে না। তার কাজের ব্যাপারে সে এতটাই নিয়মনিষ্ঠ যে কোনও আগত বস্তুর মূল্য নির্ধারণে যথেষ্ট সময় নেয় এবং এ ক্ষেত্রেও সেটাই করল যাতে করে ভেরার মনে হল সে পাগল হয়ে যাবে। বিশেষ যে ব্যাপারে সে বিরক্ত তা হল, লোকটা তার আংটিটি অ্যাসিড দিয়ে পরীক্ষা করল, তারপর তা ওজন-টোজন করে তার দাম ফেলল, মাত্র তিন রুবল।
“কিন্তু এ তো আসলেই খুব দামি, আকর্ষক।” বেচারা ভেরা বলে উঠল। “এর দাম সাঁইত্রিশ রুবল নিয়েছে, তাও দরাদরি করে।”
তেজারতি কারবারি এমনভাবে চোখ বুজল তাতে মনে হল সে বেশ বিরক্ত।
“আমাদের কাছে সবই এক, ম্যাডাম”, এই বলে পরবর্তী বস্তুটা নিক্তিতে রাখল সে। “আমরা পাথরের ওজন ধরি না, শুধুই ধাতুর ওজন।”
এরপর বিস্মিত ভেরা দেখল তার পুরনো ও বাঁকাচোরা ব্রেসলেটটাই দামি। মোটমাট তারা বেচে-টেচে তেইশ রুবল পেল যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই।
এরপর তারা যখন মালির বাড়ি গেল, পিটার্সবার্গের শ্বেতশুভ্র রাত্রি আকাশ জুড়ে চাঁদোয়া মেলে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে মুক্তোদানার মতো আলো। মালি, একজন চেক, ছোটোখাটো বৃদ্ধ, চোখে সোনার চশমা, সবেমাত্র পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসেছে। সে এদের অনুরোধে হতবাক, আর এত দেরিতে এই অর্ডার নিতে আদৌ রাজি নয়। তাকে বোকা বানানোর জন্য এমন রসিকতায় সে নিঃসন্দেহে সন্দিহান হয়ে উঠল; আর অনাগ্রহের সঙ্গে ভেরার বারংবার পীড়াপীড়ির উত্তর দিল : “আমি দুঃখিত। আমার লোকেদের এই রাতে অদ্দুরে কাজে পাঠাতে পারব না। কাল সকালে হলে যদি চলে, আমি করে দেব।”
এরপর সেই দুর্ভাগা দাগের ব্যাপারে গোটা ঘটনাটা তাকে না বলে পার পাওয়া যাবে না ভেবে ভেরোচকা সেটাই করল। বুড়ো প্রথমে সন্দেহ নিয়ে শুনল, এবং প্রায় বিরাগের সঙ্গে, কিন্তু ভেরা যখন সেই নির্দিষ্ট স্থানে কিছু ঝোপঝাড় পোঁতার পরিকল্পনার কথা তাকে বলল, সে বেশ মনোযোগী হল আর কয়েকবার সহানুভূতির সঙ্গে মৃদু হাসল।
“ওহ্, এই ব্যাপার, ঠিকাছে ও এমন কিছু নয়”, ভেরার বয়ান শেষ হলে বুড়ো রাজি হল। বলল, “আপনি কী ধরনের ঝোপঝাড় চাইছেন?”
যাই হোক, ওরা যখন বুড়োর জমির গাছগাছড়া দেখল, কোনওটাই উপযুক্ত মনে হল না। একমাত্র সম্ভাব্য কাজটি হল সেই স্থানে লাইলাকের ঝাড় বসিয়ে দেওয়া।
বউকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি ফেরার অ্যালমাজফের চেষ্টা ব্যর্থ হল। ভেরা পুরো সময়টা লেগে থাকল, গাছের ঝাড় লাগানো অবধি খুঁট ধরে থাকল, প্রবল উত্তেজনায় ছুটোছুটি করতে লাগল আর কাজের লোকগুলোকে বাগড়া দিতে থাকল। একমাত্র তখনই সে ঘরে ফিরতে রাজি হল যখন নিশ্চিত হল যে লাইলাক গাছের নিচের চাপড়া চারপাশের ঘাস থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না।
পরদিন ঘরে তার মন বসল না। সে তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গেল। সে জানত, পথ অনেকটা, কিন্তু জোর পায়ে হেঁটে সে বুঝল, ঠিকই আছে…সত্যিই, অ্যালমাজফের সারা দেহ ধুলোয় ভর্তি, খিদে আর ক্লান্তিতে তার পা-ই চলছে না যেন, কিন্তু মুখ জুড়ে জয়ের আনন্দ চিকচিক করছে।
“সব ঠিকঠাক! আশ্চর্য! অতি চমৎকার!” বউ যখন তার থেকে দশ পা দূরে তখন তার চোখমুখের উদগ্রীব চেহারা দেখে সে চেঁচিয়ে উঠল। “একবার ভাবো, আমরা দুজন সেই ঝাড়ের কাছে গেলাম, তিনি বারবার সেদিকে তাকিয়ে রইলেন—এমনকি সেই গাছের একটি পাতা ছিঁড়ে চিবিয়েও দেখলেন। জানতে চাইলেন , “এটা কী গাছ?”
“'আমি জানি না, মহামহিম”, আমি বললাম।
“'মনে হচ্ছে, ছোট্ট বার্চ”, তিনি বললেন।
“' হ্যাঁ, মহামহিম, তা হতে পারে।”
এরপর তিনি আমার দিকে ঘুরে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“'আমাকে ক্ষমা করুন, লেফটেন্যান্ট”, তিনি বললেন। ‘বুড়িয়ে যাচ্ছি তো তাই হয়তো ওই গাছ ঠিক চিনতে পারিনি।' ওই প্রফেসর একজন সুন্দর মানুষ, এবং জানেনও অনেককিছু। তাঁকে ঠকিয়ে আমি ব্যথিত। আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রফেসরদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর শিক্ষাদীক্ষা পুরো বিস্ময়কর। কত দ্রুত আর নিখুঁতভাবে তিনি পরিকল্পনাগুলি করেন—মার্ভেলাস!”
কিন্তু ভেরার কাছে এ সকল কথার অর্থ সামান্যই। সে বারবার যেটি শুনতে চাইছে তা হল, ওই লাইলাকের ঝাড় দেখে প্রফেসর কী বললেন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিবরণে তার আগ্রহ—প্রফেসরের চোখমুখের ভাব, যখন তিনি বলছিলেন তাঁর বয়স হয়েছে তখন তাঁর গলার স্বর কেমন ছিল, ঠিক কলিয়া কী বুঝল…
তারা হাত ধরাধরি করে ঘরে ফিরল, অযথাই হাসিতে গলে গলে, যেন তারা ছাড়া রাস্তায় আর কেউ নেই। পথচারীরা তাদের দেখে চকিতে থামল; দুজনকে দেখে তাদের বিচিত্র দম্পতি মনে হচ্ছিল।
সেই রাতের মতো ডিনার আগে কখনোই উপভোগ করেনি নিকোলাই ইয়েভগ্রাফোভিচ। খাওয়াদাওয়ার পর ভেরা যখন এক গ্লাস চা নিয়ে তার পড়ার ঘরে এল, তারা হঠাৎই একে অপরের দিকে তাকাল আর হাসিতে ফেটে পড়ল।
“ কী দেখে এত হাসি পেল?” ভেরা জিজ্ঞেস করল।
“আচ্ছা, তুমি হাসছ কেন?” স্বামী জানতে চাইল।
“ওহ্ বোকামি আর কি। ওই লাইলাক ফুল নিয়ে ভাবছিলাম। আর তুমি?”
“ওহ্, আমারও ওই একই ব্যাপার—আর ওই লাইলাক। আমি ঠিক বলতে যাচ্ছিলাম, এখন থেকে সব সময় ওই লাইলাকই হবে আমার প্রিয় ফুল…।”
******
লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : আলেক্সান্ডার ইভাভানোভিচ কুপ্রিন (১৮৭০ - ১৯৩৮) প্রখ্যাত রুশ বাস্তববাদী লেখক, ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। প্রকৃতিবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে তাঁর লেখার অভিজ্ঞতায় সামরিক শাসন, সামাজিক অবিচার, প্রেম ও মানব-প্রকৃতি জড়িয়ে আছে। প্রথম জীবনে তিনি রুশ আর্মিতে কর্তব্যরত ছিলেন, যার প্রভাব বর্তমান গল্পেও আছে। ১৯১৭র রুশ বিপ্লবের পর তিনি রাশিয়া ত্যাগ করে প্যারিতে চলে যান। পরে মৃত্যুর আগে সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে আসেন। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর The Duel উপন্যাসটি মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য, যেখানে সামরিক জীবনের ভয়ংকর কঠোরতা বর্ণিত। অপরপক্ষে Yama : The Pit (১৯০৯ -১৯১৫) বেশ বিতর্কিত যেখানে বেশ্যাবৃত্তি নিয়ে গভীর খননক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান গল্পটি তাঁর গল্পসংগ্রহ 'A Slav Soul and Other Stories (১৯১৬) থেকে নেওয়া। মূলগল্প : 'A Clump of Lilacs', by Aleksandr I. Kuprin.
অপরদিকে, বিপ্লব বিশ্বাস অনুবাদে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাপুষ্ট। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অবসৃত প্রধান শিক্ষক। তিনি কেন্দ্রীয় সাহিত্য অকাদেমির নথিভুক্ত অনুবাদক। এ রাজ্য, ভিনরাজ্য তথা ভিনদেশের ছোটো, বড় সাময়িক ও দৈনিক পত্র পত্রিকাতে তার গল্প প্রবন্ধ সসম্মানে প্রকাশিত। তার চারটি মৌলিক, একটি প্রবন্ধ, দুটি অনূদিত গল্পগ্রন্থ ও একটি অনূদিত উপন্যাস প্রকাশিত।


0 মন্তব্যসমূহ