আন্তন চেখভের গল্প : বাজি


অনুবাদ : নাহার তৃণা

শরতের এক অন্ধকার রাত। বৃদ্ধ ব্যাংকার তার পাঠকক্ষের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পায়চারি করছিলেন আর ভাবছিলেন, পনেরো বছর আগে, ঠিক এমন এক শরৎসন্ধ্যায় তিনি একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তুখোড় সব মানুষ। তর্কপ্রিয় অতিথিদের মনোজ্ঞ আলোচনায় সেদিনের সন্ধাটা বেশ জমে উঠেছিল। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি তারা মৃত্যুদণ্ড নিয়েও কথা বলেছিলেন। অতিথিদের বেশিরভাগই, যাদের মধ্যে বহু সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন; মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করতেন না। তাদের মতে, এই শাস্তি পুরোনো, অনৈতিক, এবং খ্রিস্টান রাষ্ট্রের জন্য অনুপযুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করতেন, মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সর্বত্র আজীবন কারাদণ্ড বহাল হওয়া উচিত।

“আমি তোমাদের সঙ্গে একমত নই,” অধিকাংশের মতামতের বিপক্ষে সপাটে নিজের মত ঘোষণা করেছিলেন নিমন্ত্রণদাতা। “আমি নিজে না মৃত্যুদণ্ড ভোগ করেছি, না আজীবন কারাদণ্ড, কিন্তু যদি পূর্বানুমান থেকে বিচার করা হয়, তবে মৃত্যুদণ্ডই বরং বেশি নৈতিক এবং মানবিক। মৃত্যুদণ্ড মানুষকে একবারেই মেরে ফেলে, কিন্তু আজীবন কারাদণ্ড তাকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে। কোন জল্লাদ বেশি মানবিক সে যে কয়েক মিনিটেই তোমাকে শেষ করে দেয়, নাকি সে যে বহু বছর ধরে তোমার জীবনটাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে?”

“দুটোই সমান অনৈতিক,” মন্তব্য করলেন এক অতিথি, “কারণ দুটো শাস্তির লক্ষ্যই এক, জীবন কেড়ে নেওয়া। রাষ্ট্র ঈশ্বর নয়; যা ফিরিয়ে দিতে পারে না, তা নেওয়ার অধিকার তার নেই।”

অতিথিদের মধ্যে ছিলেন এক তরুণ আইনজীবী, মাত্র পঁচিশ বছরের যুবক। তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বললেন, “মৃত্যুদণ্ড আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দুটোই অনৈতিক। কিন্তু আমাকে যদি এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, আমি অবশ্যই দ্বিতীয়টিই বেছে নেবো। যেভাবেই হোক বেঁচে থাকা, একেবারেই না থাকার চেয়ে ঢের ভালো।”

আলোচনা ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আজকের বৃদ্ধ ব্যাংকারটি সেই সময় ছিলেন আরও তরুণ, এবং লাগামহীন বেপরোয়া; উত্তেজনায় হঠাৎই খেই হারিয়ে তিনি টেবিলে মুঠি পাকিয়ে আঘাত করে তরুণ আইনজীবীর উদ্দেশ্যে চিৎকার করলেন ,“মোটেই তা নয়! আমি তোমার সঙ্গে বিশ লাখের বাজি ধরে বলছি, তুমি একাকী পাঁচ বছর কারাবাসে টিকতেই পারবে না!”

তরুণটি একইরকম শান্ত গলায় বলল, “আপনি যদি সত্যিই তা মনে করেন, আমিও বাজি ধরছি। তবে পাঁচ নয়, আমি পনেরো বছর থাকবো।”
“পনেরো? ঠিক আছে!” চিৎকার করে উঠলেন ব্যাংকার। “সুধীজন, আমি বিশ লাখ বাজি ধরলাম!”
“ঠিক আছে! আপনি আপনার লাখ টাকা রাখুন, আর আমি রাখছি আমার স্বাধীনতা,” তরুণ আইনজীবী শান্তস্বরে জবাব দিলো।

কাজেই সেই উদ্ভট, অযৌক্তিক বাজিটা সত্যি সত্যিই বাস্তবে রূপ নিলো! ব্যাংকার, অঢেল সম্পদের মালিক, বিলাসী, খামখেয়ালি, বাজিটা ধরে ভীষণ আনন্দ পেয়েছিলেন। নৈশভোজে তিনি তরুণটিকে নিয়ে ঠাট্টা করতে করতে বললেন, “এখনো সময় আছে, বৎস, ভেবে দেখো। আমার কাছে বিশ লাখ তেমন কিছুই না, কিন্তু তুমি হারাচ্ছো তোমার জীবনের তিন-চারটি সেরা বছর। আমি তিন-চার বলছি, কারণ তুমি এর বেশি টিকতে পারবে না। আর মনে রেখো, স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব সহ্য করা বাধ্যতামূলক বন্দিত্বের চেয়েও কঠিন। তুমি যে যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে পারো, এই চিন্তাটাই তোমার পুরো কারাজীবনকে বিষিয়ে তুলবে। তোমার জন্য আমার সত্যিই খারাপ লাগছে।”

সেদিনের সেই বেপরোয়া, বেহিসেবি ব্যাংকার এখন তার পড়ার ঘরে পায়চারি করতে করতে, সবকিছু মনে করছিলেন এবং নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন: “ওই বাজির উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? ওই মানুষটার জীবনের পনেরো বছর নষ্ট হওয়া আর আমার বিশ লাখ উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই বা কী লাভ? এতে কি প্রমাণ হয় মৃত্যুদণ্ড আজীবন কারাদণ্ডের চেয়ে ভালো বা খারাপ? না, না সবই ছিল অর্থহীন, নির্বুদ্ধিতার কাজ। আমার দিক থেকে ছিল বিলাসে-অভ্যস্ত এক মানুষের খেয়ালিপনা, আর তার দিক থেকে ছিল নিছক অর্থলোভ…”

তারপর তিনি সেই সন্ধ্যার পরবর্তী ঘটনাগুলো মনে করলেন। সেইদিন ঠিক হয়েছিল, তরুণ আইনজীবীকে ব্যাংকারের বাগানের এক ঘরে কঠোরতম নজরদারির মধ্যে বন্দিত্বের বছরগুলো কাটাতে হবে। শর্ত অনুযায়ী ঠিক হলো: পনেরো বছর পর্যন্ত তিনি ঘরের চৌকাঠ পেরোতে পারবেন না, কোনো মানুষের মুখ দেখবেন না বা কণ্ঠস্বর শুনবেন না, কোনো চিঠি অথবা সংবাদপত্রও পাবেন না।

তাকে কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র ও বই রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল; তিনি চিঠি লিখতে পারবেন, মদ পান করতে পারবেন, ধূমপান করতে পারবেন। চুক্তি অনুযায়ী বাইরের জগতের সঙ্গে তার একমাত্র যোগাযোগ হবে একটি ছোট্ট জানালা দিয়ে, যা এই উদ্দেশ্যেই বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। তিনি বই, সঙ্গীত, মদ ইত্যাদি যত খুশি চাইতে পারবেন; শুধু জানালা দিয়ে লিখে জানাতে হবে, এবং সেখান দিয়েই তিনি সব জিনিসপত্র পাবেন। চুক্তিতে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় এমনভাবে নির্ধারিত হয়েছিল যাতে তার বন্দিত্ব সম্পূর্ণ একাকী হয়। আর তরুণ আইনজীবী বাধ্য থাকবেন ঠিক পনেরো বছর সেখানে থাকতে। তার বন্দিত্ব শুরু হবে ১৪ নভেম্বর ১৮৭০ সালের দুপুর বারোটায়, শেষ হবে ১৪ নভেম্বর ১৮৮৫ সালের দুপুর বারোটায়।

চুক্তিতে আরও বলা ছিল: তিনি যদি পালানোর সামান্যতম চেষ্টাও করেন, এমনকি মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মিনিট আগেও, তবে ব্যাংকারের বিশ লাখ টাকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল হয়ে যাবে।

কারাবাসের প্রথম বছরে, তার ছোটো ছোটো চিরকুট থেকে যতটা বোঝা যায়, তরুণ বন্দি ভয়ানক একাকীত্ব ও বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন। দিনরাত তার ঘর থেকে পিয়ানোর শব্দ শোনা যেত। তিনি মদ ও তামাক দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এক চিরকুটে তিনি লিখেছিলেন: মদ ইচ্ছাকে উসকে দেয়, আর ইচ্ছাই বন্দির সবচেয়ে বড় শত্রু; তাছাড়া, ভালো মদ পান করে কাউকে না দেখতে পাওয়ার চেয়ে নিরানন্দ কিছু হতে পারে না। আর তামাক তার ঘরের বাতাস নষ্ট করবে। প্রথম বছরে তিনি যে বইগুলো চাইতেন, সেগুলো ছিল মূলত হালকা ধরনের; জটিল প্রেমকাহিনির উপন্যাস, উত্তেজনাপূর্ণ ও কল্পনাপ্রবণ গল্প ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বছরে বাগানলাগোয়া ঘরে পিয়ানোর শব্দ থেমে গেল, আর বন্দি কেবল ক্লাসিক সাহিত্যই চাইতে লাগলেন। পঞ্চম বছরে আবার সঙ্গীত শোনা যেতে লাগলো, এবং তিনি মদ চাইতে শুরু করলেন। যারা জানালা দিয়ে তাকে নজরে রাখতো, তারা জানায়: পঞ্চম বছরের পুরোটা সময়ই খাওয়া-দাওয়া আর ঘুম ছাড়া তরুণটি প্রায় কিছুই করতেন না। সে সময় তিনি বারবার হাই তুলতেন, নিজের সঙ্গে রাগী স্বরে কথা বলতেন। কোনো বই পড়তেন না। কখনো কখনো রাতে তিনি লিখতে বসতেন; ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতেন, আর ভোর হলে যা লিখেছেন সব ছিঁড়ে ফেলতেন। একাধিকবার তাকে কাঁদতেও শোনা গেছে।

ষষ্ঠ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বন্দি ভাষা, দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে গভীর মনোযোগে অধ্যয়ন শুরু করলেন। তিনি এমন উৎসাহে পড়াশোনায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন যে, তার চাওয়া বই জোগাড় করতে ব্যাংকারকে যথেষ্ট ঝক্কি পোহাতে হতো। চার বছরের মধ্যে তার অনুরোধে প্রায় ছয়শো খণ্ড বই সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই সময়েই ব্যাংকার বন্দির কাছ থেকে একটি চিঠি পেলেন :

“প্রিয় কারারক্ষক, আমি এই কয়েকটি লাইন ছয়টি ভাষায় লিখেছি। এগুলো এমন লোকদের দেখান যারা এই ভাষাগুলো জানে। তারা যেন পড়ে দেখে। যদি তারা একটি ভুলও না পায়, তবে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি বাগানে একটি গুলি ছোড়ার জন্য। সেই গুলির শব্দ আমাকে জানাবে যে আমার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। যুগে যুগে, দেশে দেশে, প্রতিভাবানরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেছেন, কিন্তু তাদের সবার অন্তরে একই শিখা প্রজ্জ্বলিত থাকে। আহা, আপনি যদি জানতেন, তাদের বুঝতে পারার ক্ষমতা পেয়ে আমার আত্মা এখন কী অপার্থিব আনন্দ অনুভব করছে!” 

বন্দির ইচ্ছা পূরণ করা হলো। ব্যাংকার বাগানে দু’টি গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিলেন।

দশম বছরের পর বন্দি টেবিলের সামনে স্থির হয়ে বসে থাকতেন, এবং গসপেল ছাড়া আর কিছুই পড়তেন না। ব্যাংকারের কাছে সেটা অদ্ভুত মনে হয়েছিল; যে মানুষ চার বছরে ছয়শোটি জটিল গ্রন্থ আয়ত্ত করেছে, সে কীভাবে প্রায় এক বছর কাটিয়ে দিচ্ছে এমন একটি পাতলা বই নিয়ে, যা বোঝাও সহজ। গসপেলের পর তরুণ ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্মের ইতিহাস পড়তে শুরু করলেন।

বন্দিত্বের শেষ দুই বছরে তরুণ বিপুল পরিমাণ বই পড়লেন, একেবারেই বাছবিচার না করে। কখনো তাকে দেখা যেত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ডুবে আছেন; আবার হঠাৎই বায়রন বা শেক্সপিয়র চাইছেন। তার পাঠানো চিরকুটগুলোতে দেখা যেত একই সময়ে তিনি রসায়নের বই, চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি ম্যানুয়াল, একটি উপন্যাস, আর কোনো দর্শন বা ধর্মতত্ত্বের গ্রন্থ চাইছেন।

তার ওরকম পড়াশোনা দেখে মনে হতো ডুবে যাওয়া এক মানুষ নিজের জাহাজের ভাঙা টুকরোগুলোর মাঝে সাঁতার কাটছে, আর বাঁচার জন্য কখনো এক টুকরো কাঠ, পরক্ষণে আরেকটাকে মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরছে।

দুই.
বৃদ্ধ ব্যাংকার বিগতদিনের স্মৃতি মনে করলেন এবং ভাবলেন, “আগামীকাল ঠিক বারোটায় সে তার স্বাধীনতা ফিরে পাবে। আমাদের চুক্তি অনুযায়ী তাকে আমার বিশ লাখ দিতে হবে। আর সত্যিই যদি তাকে সেই টাকা দিতে হয় তাহলে আমার সর্বনাশ নিশ্চিত; আমি একেবারে কর্পদকহীন হয়ে যাবো।”

পনেরো বছর আগে তার সম্পদের হিসাবই ছিল না; এখন তিনি নিজের কাছেই জিজ্ঞেস করতে ভয় পান তার ঋণ বেশি, নাকি সম্পদ। শেয়ারবাজারে বেপরোয়া জুয়া, উন্মত্ত- বেহিসেবি জীবনযাপন, আর বয়স বাড়ার পরও সে উত্তেজনা তিনি সামলাতে পারেননি। সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তার সম্পদ তলানিতে ঠেকেছে। যে মানুষ একসময় গর্বিত, নির্ভীক, আত্মবিশ্বাসী কোটিপতি ছিল, সে এখন মাঝারি মানের এক ব্যাংকার! বিনিয়োগের সামান্য ওঠানামাতেই তার বুক কাঁপতে থাকে।

“অভিশপ্ত বাজি!” বৃদ্ধ মানুষটি হতাশায় মাথা চেপে ধরে বিড়বিড় করলেন। “লোকটা মরলো না কেন? এখন তার বয়স মাত্র চল্লিশ। সে আমার শেষ সম্বলটুকুও নিয়ে যাবে, বিয়ে করবে, জীবন উপভোগ করবে, শেয়ারবাজারে খেলবে; আর আমি ভিখারির মতো হিংসা নিয়ে তাকিয়ে থাকবো, আর প্রতিদিন তার মুখে শুনবো একই কথা: ‘আমার জীবনের সুখের জন্য আমি আপনার কাছে ঋণী, আপনাকে সাহায্য করতে দিন!’ না, এটা সহ্য করার মতো নয়! দেউলিয়া হওয়া আর অপমান থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ওই মানুষটার মৃত্যু!”

রাত তিনটা বাজলো। ব্যাংকার কান পেতে রইলেন; ঘরের সবাই ঘুমিয়ে আছে। বাইরের নিস্তব্ধ চরাচরে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা গাছের পাতার মৃদু শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। কোনো শব্দ না করার চেষ্টা করে তিনি অগ্নিরোধী সেফ থেকে সেই দরজার চাবিটি বের করলেন; যে দরজা পনেরো বছর ধরে খোলা হয়নি। তিনি গায়ে কোট চাপালেন এবং ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

বাগান জুড়ে অন্ধকার আর ঠান্ডা হাওয়ার দাপট। বৃষ্টি পড়ছিল। স্যাঁতসেঁতে, ধারালো একটা হাওয়ার ঘূর্ণি বাগানময় ছুটে বেড়াচ্ছিল। তীব্রস্বরে সে হুঁ হুঁ করে ডাকছিল আর গাছগুলোকে এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম নিতে দিচ্ছিল না। ব্যাংকার চোখ কুঁচকে তাকালেন, কিন্তু তিনি মাটি, সাদা মূর্তিগুলো, কুটির, এমনকী গাছেদেরও দেখতে পেলেন না। বাগানের যেখানে কুটিরটি ছিল, সেখানে গিয়ে তিনি দু’বার প্রহরীকে ডাকলেন। কোনো উত্তর এলো না। বোঝা গেল, প্রহরী হয়তো আবহাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে, এখন বুঝি দিব্যি রান্নাঘর বা গ্রীনহাউসের কোনো কোণে ঘুমিয়ে আছে।

“যদি আমার ইচ্ছেটা কার্যকর করার মতো সাহস থাকতো,” বৃদ্ধ মানুষটি ভাবলেন, “তাহলে সন্দেহটা সবার আগে প্রহরীর ওপরই পড়তো।”

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তিনি সিঁড়ি আর দরজাটা খুঁজে পেলেন, এবং কুটিরের প্রবেশদ্বারে ঢুকলেন। তারপর তিনি টলমল পায়ে ছোট্ট করিডোরের কাছে পৌঁছে একটি দেশলাই জ্বালালেন। সেখানে কোনো মানুষ ছিল না। একটি খাট ছিল, কিন্তু তাতে কোনো বিছানা পাতা নেই; আর কোণে ছিল একটি কালো ঢালাই-লোহার চুলা। বন্দির ঘরের দিকে যে দরজা চলে গিয়েছে, তার সিলমোহর অক্ষত।

দেশলাইটি নিভে গেলে বৃদ্ধ মানুষটি আবেগে কাঁপতে কাঁপতে ছোটো জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন। বন্দির ঘরে ক্ষীণ আলোর একটি মোমবাতি জ্বলছিল। সে টেবিলের সামনে বসে। পেছন থেকে শুধু তার পিঠ, মাথার চুল, আর দুই হাত দেখা যাচ্ছিল। টেবিলের ওপর, ঘরের দু’টি আরামকেদারায়, আর কার্পেটের ওপর খোলা বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

পাঁচ মিনিট কেটে গেল, অথচ বন্দি একবারও নড়লো না। পনেরো বছরের বন্দিত্ব তাকে স্থির হয়ে বসে থাকতে শিখিয়েছে। ব্যাংকার জানালায় আঙুল দিয়ে টোকা দিলেন, কিন্তু বন্দি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তারপর ব্যাংকার সতর্কভাবে দরজার সিলমোহর ভেঙে তালার ছিদ্রে চাবি ঢোকালেন। মরিচা ধরা তালা অনাভ্যাসে ঘড়ঘড়ে শব্দ করল, দরজাটা কঁকিয়ে উঠল। ব্যাংকার আশঙ্কা করেছিলেন ভেতর থেকে তৎক্ষণাৎ পায়ের শব্দ বা বিস্মিত চিৎকার শুনবেন; কিন্তু তিন মিনিট কেটে গেল, ঘর আগের মতোই নিস্তব্ধ রইল। তিনি ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিলেন।

টেবিলের সামনে বসে ছিল একজন, যাকে স্বাভাবিক মানুষের মতো দেখাচ্ছিল না। সে জীবন্ত এক কঙ্কাল, যার হাড়ের ওপর টানটান ভাবে চামড়া লেগে আছে; মেয়েদের মতো তার লম্বা চুল, আর এক জঙ্গল দাড়িতে ভরতি মুখ। তার মুখটা হলদেটে, মাটির মতো নিস্তেজ সে রং; গাল দেবে গেছে; পিঠ লম্বা আর সরু; আর যে হাতে সে তার দীর্ঘ-ঝাঁকড়াচুলের মাথা ঠেকিয়ে রেখেছিল, সেই হাত এতটাই চিকন ও ভঙ্গুর দেখাচ্ছিল যে তাকাতেও ভয় করছিল। তার চুলে ইতোমধ্যেই রুপালি রেখা দেখা গেছে, তার এই ক্ষীণ, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মুখ দেখে কেউই বিশ্বাস করবে না যে তার বয়স মাত্র চল্লিশ। সে ঘুমিয়ে ছিল…

তার নত মাথার সামনে টেবিলের ওপর একটি কাগজ পড়ে, তাতে মিহি অক্ষরে কিছু লেখা।

“হতভাগা একটা!” ভাবলেন ব্যাংকার, “ঘুমিয়ে পড়েছে এবং সম্ভবত লাখ টাকার স্বপ্ন দেখছে। আমাকে এখন শুধু এই আধমরা মানুষটাকে তুলে নিয়ে বিছানায় ফেলে দিতে হবে, তারপর বালিশ দিয়ে একটু চেপে ধরলেই হবে। অতি নিষ্ঠাবান বিশেষজ্ঞও সহিংস মৃত্যুর কোনো নামনিশানা খুঁজে পাবে না। কিন্তু আগে দেখি, এখানে সে কী লিখেছে…”

ব্যাংকার টেবিল থেকে কাগজটি তুলে নিলেন এবং পড়তে লাগলেন:

“আগামীকাল রাত ঠিক বারোটায় আমি মুক্ত হবো, এবং স্বাধীনভাবে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার অধিকার পাবো। কিন্তু এই ঘর ছেড়ে সূর্যের আলো দেখার আগে, আমি মনে করি আপনাকে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে, এবং সম্পূর্ণ বিবেকের স্বচ্ছতায় আমি আপনাকে জানাচ্ছি; আমি স্বাধীনতাকে ঘৃণা করি, ঘৃণা করি জীবন ও স্বাস্থ্যকে, এবং আপনার বইগুলোতে যেসব জিনিসকে পৃথিবীর জন্য ‘সুন্দর’ বা ‘মঙ্গলময়’ বলা হয়েছে, সেগুলোকেও ঘৃণা করি।”

“পনেরো বছর ধরে আমি মনোযোগ দিয়ে পার্থিব জীবনকে অধ্যয়ন করেছি। এ কথা সত্যি, আমি বহুবছর পৃথিবী বা জনমানুষ দেখিনি, কিন্তু আপনার দেওয়া বইগুলো থেকে আমি সুগন্ধি মদ পান করেছি, গান গেয়েছি, জঙ্গলে হরিণ আর বুনো শূকর শিকার করেছি, নারীদের ভালোবেসেছি… আপনার কবি ও প্রতিভাবানদের জাদুতে সৃষ্ট মেঘের মতো অপার্থিব সুন্দরীরা রাতে আমাকে দেখতে এসেছে, আর আমার কানে ফিসফিস করে এমন সব বিস্ময়কর গল্প বলেছে, যা আমার মাথা ঘুরিয়ে দিতো এক ঘোরলাগা আবেশে।

আপনার বইয়ের হাত ধরে আমি এলবার্জ আর মন্ট ব্ল্যাকের চূড়ায় উঠেছি, আর সেখান থেকে সূর্যোদয় দেখেছি। দেখেছি কীভাবে সন্ধ্যার সূর্য আকাশ, সাগর ও পাহাড়ের চূড়াগুলোকে সোনালি আর রক্তিম আলোয় ভাসিয়ে দেয়। সেখান থেকে আমি দেখেছি কীভাবে আমার মাথার ওপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে এবং ঝড়ো মেঘগুলোকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। আরও দেখেছি সবুজ বন, মাঠ, নদী, হ্রদ, শহর। আমি সাইরেনের শব্দে শুনেছি জাদুকরী মূর্চ্ছনা, আরও শুনেছি রাখালদের অপূর্ব বাঁশির সুর; আমি স্পর্শ করেছি অনিন্দ্য শয়তাদের ডানা; যারা ঈশ্বরের কথা শোনাতে আমার কাছে নেমে আসতো।

আপনার দেওয়া বইয়ে আমি নিজেকে নিক্ষেপ করেছি অতল গহ্বরে, বহু অলৌকিক কাজ করেছি, হত্যা করেছি, শহর জ্বালিয়ে খাক করেছি, নতুন ধর্ম প্রচার করেছি, জয় করেছি পুরো রাজ্য।”

“আপনার বইগুলো আমাকে প্রজ্ঞা দিয়েছে। মানুষের অক্ষয়িষ্ণু চিন্তা যুগে যুগে যা সৃষ্টি করেছে সবই এখন আমার মস্তিষ্কের ছোট্ট পরিসরে সঙ্কুচিত হয়ে আছে। আমি জানি, আমি আপনাদের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী।

“এসব সত্ত্বেও আমি আপনার বইগুলোকে ঘৃণা করি, ঘৃণা করি প্রজ্ঞাকে। আমি এই পৃথিবীর সব আশীর্বাদকে ঘৃণা করি। সবই মূল্যহীন, ক্ষণস্থায়ী, ভ্রান্ত, প্রতারণাময় মরীচিকার মতো। আপনি গর্বিত, জ্ঞানী এবং মহৎ হতে পারেন কিন্তু মৃত্যু আপনাকে পৃথিবীর বুক থেকে এমনভাবে মুছে দেবে যেন আপনি গর্তে থাকা ইঁদুরের চেয়েও তুচ্ছ ছিলেন। আর আপনার উত্তরসূরি, আপনার ইতিহাস, আপনার অমর প্রতিভাবানেরা সবাই পৃথিবী নামের গ্রহের সঙ্গে পুড়ে যাবে অথবা জমে যাবে।

“আপনি বুদ্ধি হারিয়েছেন এবং ভুল পথে হাঁটছেন। আপনি মিথ্যাকে সত্য ভেবেছেন, আর বিকৃতিকে সৌন্দর্য বলে মানছেন। যদি কোনো অদ্ভুত ঘটনার ফলে আপেল বা কমলার গাছে ফলের পরিবর্তে হঠাৎ ব্যাঙ বা টিকটিকি জন্মাতে শুরু করতো, বা গোলাপের সুবাস ঘোড়ার দুর্গন্ধ ঘামের মতো হয়ে যেত, তাহলে আপনি যেভাবে বিস্মিত হতেন। ঠিক তেমন আমিও বিস্মিত হই আপনাদের দেখে, যারা স্বর্গকে ত্যাগ করে পৃথিবীকে বেছে নিয়েছেন। আমি আপনাদের বুঝতে চাই না।

“আপনাদের জীবনের সবকিছুকে আমি কতটা ঘৃণা করি, তা কাজে প্রমাণ করার জন্য আমি সেই বিশ লাখ, যেটিকে ঘিরে একসময় আমি আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখতাম, এবং যেটাকে এখন ঘৃণা করি। সেই টাকার অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ ঘন্টা আগে আমি এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাবো, আর শর্ত ভঙ্গ করবো…”

চিঠিটি পড়া শেষ করে ব্যাংকার সেটি টেবিলে রেখে দিলেন, সেই অদ্ভুত মানুষটির মাথায় চুমু খেলেন, এবং কাঁদতে কাঁদতে কুটির থেকে বেরিয়ে এলেন। শেয়ারবাজারে অনেক বড় লোকসান হওয়ার সময়ও তিনি কখনো নিজের প্রতি এত গভীর ধিক্কার অনুভব করেননি। বাড়ি ফিরে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন, কিন্তু কান্না আর আবেগের কারণে বহুক্ষণ ঘুমোতে পারলেন না।

পরদিন সকালে প্রহরীরা পাংশুটে মুখে দৌড়ে এসে তাকে জানাল যে তারা দেখেছে কুটিরে বন্দি থাকা মানুষটি জানালা দিয়ে বাগানে নেমে গেটের দিকে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ব্যাংকার সঙ্গে সঙ্গে চাকরদের নিয়ে কুটিরে গেলেন এবং নিশ্চিত হলেন যে লোকটি পালিয়ে গেছে। অপ্রয়োজনীয় ঝঞ্ঝাট এড়াতে তিনি টেবিল থেকে সেই চিঠিটি তুলে নিলেন, যেখানে বন্দি শর্তের বিশ লাখ টাকা ত্যাগ করার কথা লিখেছিল; বাড়ি ফিরে তিনি সেটি নিরাপদ সিন্দুকে তালাবদ্ধ করে রাখলেন।

মূল গল্প : The Bet by Anton Chekhov
গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন কনস্ট্যান্স গার্নেট(Constance Garnett)। কনস্ট্যান্স গার্নেট রুশ সাহিত্যকে ইংরেজি পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় করার জন্য পরিচিত। তাঁর অনুবাদগুলো ক্লাসিক হিসেবে ধরা হয়।

**********

লেখক পরিচিতি : আন্তন পাভলোভিচ চেখভ (১৮৬০–১৯০৪) রাশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। পেশায় চিকিৎসক হলেও তিনি সাহিত্য সম্পর্কে বলতেন, “চিকিৎসা আমার স্ত্রী, সাহিত্য আমার প্রেমিকা।” নাট্যকার হিসেবে তিনি চারটি ক্ল্যাসিক রচনা করেছেন। সবচেয়ে বেশি মঞ্চস্থ নাট্যকারদের তালিকায় শেক্সপিয়ার ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নামও উল্লেখ করা হয়। নাট্যকার হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান “থ্রি সিস্টার্স”, “দ্য সিগাল” এবং “দ্য চেরি অরচার্ড” নাটকগুলোর মাধ্যমে।

শুরুতে চেখভের লেখক হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। প্রথমদিকের গল্পগুলো তিনি লিখেছিলেন জীবনযাপন ও পড়ালেখার খরচ জোগানোর জন্য। কিন্তু পরে তাঁর মধ্যে শিল্পীসুলভ উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্ম নিলে তিনি সাহিত্যচর্চায় নতুন রীতি ও প্রবণতার উদ্ভাবন করেন, যা আধুনিক ছোটোগল্পের বিকাশে  বিশেষ প্রভাব ফেলে। তাঁর গল্পগুলো সংক্ষিপ্ত, সংযত, অথচ গভীর মানবিকতায় ভরা। মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা, ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষা, ভঙ্গুর সম্পর্ক, আর জীবনের নীরব বেদনা, চেখভ অবিশ্বাস্য সূক্ষ্মতায় তুলে ধরেছেন। তিনি আধুনিক ছোটোগল্পের রূপকারদের একজন; তাঁর গল্পে নেই অতিরঞ্জনের বাড়াবাড়ি, নেই নাটকীয় মোচড়; বরং আছে জীবনের নিঃশব্দ সত্য। “The Death of a Government Clerk”, “The Bet”, “The Lady with the Dog”, “Ward No. 6”, “The Darling”, “Gooseberries” ইত্যাদি গল্প তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। চেখভের ভাষা সহজ, কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টি সুগভীর। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য মানুষের বিচার করে না; শুধু তাকে দেখায়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ