ভসেভোলোদ গার্শিনের গল্প : চার দিন


অনুবাদ : কুলদা রায়

আমার মনে আছে আমরা বনের মধ্যে দিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। নাগফণির ঝোপ ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। চারদিক থেকে গুলি শোঁ শোঁ করে উড়ে আসছিল। ডালপালা ভেঙে পড়ছিল। ক্রমশ বাড়ছিল গোলাগুলি। বনের কিনারায় জায়গায় জায়গায় লাল আগুনের ঝলক উঠছিল। প্রথম কোম্পানির তরুণ সৈনিক সিদোরভকে দেখ মনে মনে ভাবছিলাম, ‘এ আমাদের স্কার্মিশ লাইনে কী করছে?’ সে হঠাৎ মাটিতে ঢলে পড়ল। তারপর চুপ করে আমার দিকে তাকাল। তার চোখদুটো বড় বড়, ভয়ে ভরা। মুখ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। হ্যাঁ, এটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আরও মনে আছে, ঘন ঝোপের মধ্যে, বনের কিনারা থেকে প্রায় ঢিল ছোড়া দূরত্বে, প্রথমবার তাকে দেখেছিলাম। সে ছিল একজন বিশাল মোটাসোটা তুর্কি। আমি নিজে দুর্বল আর রোগা হলেও সরাসরি তার দিকে এগিয়ে গেলাম। একটা শব্দ হলো, আর কিছু একটা আমার পাশ দিয়ে উড়ে গেল। সেটা আমার কাছে বিশাল মনে হলো। কানে ঝনঝন শব্দ হলো। মাথায় এলো—‘সে আমাকে গুলি করল।’ সে আতঙ্কে চিৎকার করে একটা মোটা নাগফণির ঝোপের দিকে পিছিয়ে গেল। ঝোপটা ঘুরে যেতে পারত, কিন্তু ভয়ে কী করছে বুঝতে পারছিল না, কাঁটাভরা ডালের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি আঘাত করলাম, তার হাত থেকে রাইফেল ছিটকে গেল। আবার আঘাত করলাম। অনুভব করলাম আমার বেয়নেট নরম কিছুর মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। গর্জন আর আর্তনাদের মাঝামাঝি কিছু একটা অদ্ভুত শব্দ হলো। তারপর আমি দৌড়ালাম। আমাদের লোকেরা ‘হুররে’ বলে চিৎকার করছিল। মাটিতে পড়ছিল। গুলি করছিল। মনে আছে বন পেরিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে কয়েকটা গুলি ছুড়েছিলাম। হঠাৎ জয়ধ্বনি আরও জোরালো হলো। আমরা সবাই আবার এগিয়ে গেলাম। ‘আমরা’ না বলে ‘আমাদের লোকেরা’ বলা উচিত ছিল, কারণ আমি পিছিয়ে পড়েছিলাম। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগল। আরও অদ্ভুত লাগল যখন হঠাৎ সব কিছু অদৃশ্য হয়ে গেল, সব চিৎকার আর গোলাগুলির শব্দ থেমে গেল। কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না। শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম একটুকরো নীল—নিশ্চয়ই আকাশ। তারপর সেটাও মিলিয়ে গেল।

এর আগে কখনো এত অদ্ভুত অবস্থায় পড়িনি। মনে হচ্ছে পেটের উপর ভর করে শুয়ে আছি। সামনে শুধু একটুকরো মাটি দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা ঘাসের ডগা থেকে একটা পিঁপড়া মাথা নিচু করে একটা ডগা বয়ে নিয়ে চলেছে। গত বছরের শুকনো ঘাসের টুকরো—এটুকুই আমার পৃথিবী। আর এটা দেখছি মাত্র একটা চোখ দিয়ে। কারণ অন্য চোখটা কিছু একটার সাথে শক্ত করে চাপা পড়ে আছে—নিশ্চয়ই যে ডালের উপর আমার মাথা রাখা আছে। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। নড়তে চাইছি, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না কেন পারছি না। সময় কাটছে। ঘাসফড়িংয়ের ডাক শুনতে পাচ্ছি। মৌমাছির গুনগুন শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অনেক কষ্টে শরীরের নিচ থেকে ডান হাত বের করলাম। দুই হাতে মাটি ঠেলে উঠে হাঁটু গাড়ার চেষ্টা করলাম।

হাঁটু থেকে বুক আর মাথা পর্যন্ত বজ্রপাতের মতো তীব্র ব্যথা ছুটে গেল। আবার পড়ে গেলাম। আবার অন্ধকা—আর শূন্যতা।

জেগে উঠলাম। বুলগেরিয়ার নীলকালো আকাশে তারাগুলো এত উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে কেন? তাঁবুতে নেই আমি? তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলাম কখন? নড়াচড়া করতে গেলাম, পায়ে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম।

হ্যাঁ, আমি আহত। বিপজ্জনক কি না কে জানে? ডান আর বাঁ—দুই পা-ই রক্তে জমে গেছে। ছুঁলে ব্যথা আরও বাড়ে। দাঁতের ব্যথার মতো—একটানা কুরে কুরে খাওয়া যন্ত্রণা। কানে ঝনঝন শব্দ, মাথা সীসার মতো ভারী। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম দুই পায়েই গুলি লেগেছে। কিন্তু কী হলো? তারা আমাকে তুলে নিয়ে গেল না কেন? তুর্কিরা কি আমাদের হারিয়ে দিয়েছে? ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগল, প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝলাম আমরা হারিনি। কারণ আমি মাটিতে পড়েছিলাম—সেটা ঠিক মনে নেই, কিন্তু মনে আছে বাকি সবাই এগিয়ে যাচ্ছিল আর আমি যেতে পারছিলাম না। চোখের সামনে নীল কিছু একটা ভাসছিল—পড়েছিলাম ঠিক ওই মাঠের মাঝখানে টিলার উপরে। আমাদের ছোট্ট ব্যাটালিয়ন কমান্ডার সেই মাঠটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তার ঝনঝনে গলায় বলেছিলেন, ‘ওইদিকে যাও, বাছারা!’ আমরা গিয়েছিলাম। তাই হেরে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। তাহলে আমাকে তুলে নেয়নি কেন? জায়গাটা খোলা, দেখতে না পাওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া এখানে নিশ্চয়ই শুধু আমি একা পড়ে নেই। গুলি তো এত দ্রুত চলছিল। মাথা ঘুরিয়ে দেখা দরকার। এখন সেটা আগের চেয়ে করা একটু সহজ। কারণ যখন জ্ঞান ফিরেছিল, আর ঘাসের ডগা বয়ে যাওয়া পিঁপড়াটাকে দেখেছিলাম, তখন উঠতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার পর আগের জায়গায় নয়, চিত হয়ে পড়েছি। তাই তারাগুলো দেখতে পাচ্ছি।

উঠে বসলাম। দুটো পা অকেজো থাকলে উঠে বসা কঠিন। প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চোখে ব্যথার জল নিয়ে বসতে পারলাম।

মাথার উপরে নীলকালো আকাশের একটুকরো। একটা বড় তারা আর কয়েকটা ছোট তারা জ্বলছে, চারদিকে কিছু একটা অন্ধকার আর লম্বা। ঝোপ। আমি ঝোপের মধ্যে আছি—তারা আমাকে দেখতে পায়নি!

মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল।

কিন্তু মাঠে আহত হয়ে ঝোপের মধ্যে এলাম কীভাবে? নিশ্চয়ই যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে হামলে হামলে এদিকে এসেছি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এখন একটুও নড়তে পারছি না, অথচ আগে এই ঝোপ পর্যন্ত টেনে টেনে আসতে পেরেছিলাম। হয়তো তখন একটাই গুলি লেগেছিল, আর এখানে এসে দ্বিতীয় গুলি লেগেছে।

চোখের সামনে হালকা গোলাপি বৃত্ত ঘুরতে লাগল। বড় তারাটা ম্লান হয়ে গেল, কয়েকটা ছোট তারাও মিলিয়ে গেল। চাঁদ উঠছে। বাড়িতে এখন কত ভালো লাগত!

অদ্ভুত শব্দ কানে আসছে। কেউ যেন কাঁদছে। হ্যাঁ, কান্নার শব্দ। কাছেই কি অন্য কেউ পড়ে আছে? পায়ে গুলি খাওয়া বা পেটে গুলি লাগা কেউ? না, শব্দটা এত কাছ থেকে আসছে, অথচ কাছে কেউ নেই বলেই মনে হচ্ছে। হে ঈশ্বর, এ তো আমি নিজেই! করুণ মিনমিনে কান্না। ব্যথা কি সত্যিই এতটাই তীব্র? হয়তো। শুধু বুঝতে পারছি না, মাথাটা এত ভারী আর ঘোলাটে হয়ে আছে। শুয়ে পড়াই ভালো, ঘুমাতে হবে। কিন্তু ঘুম থেকে কি আর জাগতে পারব? যাক গে।

শুয়ে পড়তে যাচ্ছি, এমন সময় চাঁদের আলোর একটা চওড়া ফ্যাকাশে রেখা জায়গাটাকে আলোকিত করে দিল। পাঁচ পা দূরে একটা কালো বড় কিছু পড়ে আছে দেখতে পেলাম। চাঁদের আলোয় জায়গায় জায়গায় কিছু উজ্জ্বল বিন্দু দেখা যাচ্ছে। বোতাম বা সরঞ্জামের কিছু। মৃতদেহ অথবা আহত কেউ।

যা-ই হোক, শুয়ে পড়ব।

কিন্তু না, এটা হতে পারে না! আমাদের লোকেরা পিছু হটেনি। তারা এখানেই আছে, তুর্কিদের হটিয়ে এই জায়গা ধরে রেখেছে। তাহলে কথাবার্তার গুঞ্জন নেই কেন, আগুনের ফটফট শব্দ নেই কেন? হয়তো আমি এতটাই দুর্বল হয়ে গেছি যে কিছু শুনতে পাচ্ছি না। তারা নিশ্চয়ই এখানে আছে, আমি নিশ্চিত।

‘সাহায্য করো! সাহায্য করো!’
আমার গলা থেকে বুনো, কর্কশ, উন্মাদের মতো চিৎকার বেরিয়ে এলো। কিন্তু কারো কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। রাতের বাতাসে শব্দগুলো জোরে ছড়িয়ে পড়ল। বাকি সব নিস্তব্ধ। শুধু ঘাসফড়িংয়ের একটানা ডাক চলছে। চাঁদের গোল মুখ বিষণ্ণভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

ওই লোকটা যদি আহত হত, এই চিৎকারে তার যদি জ্ঞান ফিরে আসত। এটা মৃতদেহ। আমাদের কেউ, না তুর্কি? হে ঈশ্বর! কী আসে যায়? আর ঘুম নেমে এলো জ্বলন্ত চোখের পাতায়।


চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি, যদিও অনেকক্ষণ ধরেই জেগে আছি। চোখ খুলতে চাইছি না। বন্ধ চোখের পাতায় সূর্যের আলো অনুভব করতে পারছি। খুললেই রোদের ঝলক চোখে লাগবে। নড়াচড়াও না করাই ভালো। কাল—কাল ছিল কি?—আহত হয়েছি। একটা দিন কেটে গেছে। আরও দিন কাটবে, তারপর মরে যাব। যাক গে। শরীরটাকে স্থির থাকতে দিই। যদি মাথাটাকেও থামানো যেত! কিন্তু সেটা থামানোর উপায় নেই। ভাবনা আর স্মৃতি মাথার মধ্যে ভিড় করছে। এটাও বেশিক্ষণ নয়, শীঘ্রই শেষ আসবে। তখন শুধু পত্রিকায় দুই-এক লাইন থাকবে—আমাদের হতাহতের সংখ্যা কম—এত জন আহত, স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক ইভানভ নিহত। নামটাও লিখবে না, শুধু লিখবে—একজন নিহত। একজন সৈনিক। ঠিক ওই বেচারা ছোট্ট কুকুরটার মতো।

একটা দৃশ্য মাথায় জ্বলজ্বল করে উঠল। অনেকদিন আগের কথা। কিন্তু এখন আমার এই ভাঙা পায়ে পড়ে থাকার আগের গোটা জীবনটাই অনেক অনেক দিন আগের মনে হচ্ছে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। একদল মানুষ দেখে থামলাম। তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে একটা রক্তাক্ত সাদা পশমের বলের দিকে তাকিয়ে আছে। বলটা করুণভাবে কাঁকিয়ে কাঁকিয়ে কাঁদছে। এটা একটা সুন্দর ছোট্ট কুকুর। ঘোড়ার ট্রামের চাকায় পিষ্ট হয়েছে। মরছিল সে। আমি যেভাবে এখন মরছি। একজন দারোয়ান ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল। কুকুরটার ঘাড়ের চামড়া ধরে তুলে নিয়ে চলে গেল। ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।

কেউ কি আমাকে তুলে নিয়ে যাবে? না, এখানেই পড়ে থেকে মরতে হবে। অথচ জীবন কত সুন্দর! সেদিন—কুকুরের ঘটনার দিন—আমি সুখী ছিলাম। আনন্দে মাতাল হয়ে রাস্তায় হাঁটছিলাম। এমনি এমনি নয়, কারণ ছিল। আহ, যন্ত্রণাময় স্মৃতি, আমাকে একা ছাড়ো, আর কষ্ট দিও না! আগের আনন্দ, এখনকার যাতনা... শুধু যাতনাই থাকুক। সেটা বরং সহ্য করা যায়। কিন্তু স্মৃতি তুলনা করতে বাধ্য করে। আহ, কী কষ্ট! তুমি ক্ষতের চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দাও!

গরম বাড়ছে। রোদ ঝাঁজিয়ে উঠছে। চোখ খুললাম। আগের সেই ঝোপ, আগের সেই আকাশ। শুধু এখন দিনের আলোতে দেখতে পাচ্ছি। আর ওই পড়ে থাকা মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছি। সে তুর্কি। মৃত। চিনতে পারছি তাকে। সে-ই সেই মানুষ।

সামনে পড়ে আছে আমার হাতে নিহত মানুষ। কী কারণে মেরেছিলাম তাকে?

সে মরে পড়ে আছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কোন ভাগ্য তাকে এখানে নিয়ে এসেছিল? সে কে? হয়তো আমার মতো তারও একজন বৃদ্ধ মা আছেন। সন্ধ্যায় তার কুঁড়েঘরের দরজায় বসে থাকেন। উত্তরের দিকে তাকিয়ে, তার প্রিয় ছেলে কখন ফিরবে সেই পথ চেয়ে বসে থাকবেন কতদিন।

আর আমি? আমিও তো... তার সাথে জায়গা বদলে নিতে রাজি আছি। সে কত সুখী—কিছু শুনতে হচ্ছে না, ক্ষতের যন্ত্রণা নেই, মরণ-যাতনা নেই, তৃষ্ণা নেই। বেয়নেট তার বুক ফুঁড়ে হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল।

তার পোশাকে একটা বড় কালো গর্ত, চারপাশে রক্ত। এটা আমার কাজ।

ইচ্ছে করে করিনি। লড়াইয়ে যাওয়ার সময় কারো উপর রাগ ছিল না। কাউকে যে মারতে হবে, সেটা কোনোভাবে মাথায়ও আসেনি। শুধু ভেবেছিলাম নিজের বুকটা গুলির সামনে পেতে দেব। আর তাই করেছিলাম।

এখন কী হলো? আহ, বোকা, বোকা! আর এই বেচারা গ্রামীণ মানুষ—সে মিশরীয় পোশাক পরা ছিল—সে তো আরও কম দোষী। হেরিং মাছের মতো জাহাজে ঠেসে ভরে কনস্টান্টিনোপলে না পাঠানো পর্যন্ত রাশিয়া বা বুলগেরিয়ার নাম শোনেনি। যুদ্ধে যেতে বলা হয়েছিল, তাই গেছে। না গেলে লাঠিপেটা হতো, নয়তো কোনো পাশা রিভলভার দিয়ে তাকে গুলি করে দিত। স্তাম্বুল থেকে রুশচুক পর্যন্ত দীর্ঘ কষ্টকর পথ মার্চ করে সে এসেছে। আমরা আক্রমণ করেছিলাম, সে আত্মরক্ষা করছিল। কিন্তু আমরা কত ভয়ংকর —তার পেটেন্ট করা ইংরেজি পিবডি-মার্টিনি রাইফেলের সামনেও বারবার এগিয়ে আসছিলাম—এটা দেখে তার মনে আতঙ্ক জেঁকে বসেছিল। পিছু হটতে চেয়েছিল সে। আর তখনই তার কালো মুষ্টির এক ঘুষিতে যাকে মেরে ফেলতে পারত, সেই ছোট্ট এক মানুষ ছুটে এসে বুকে বেয়নেট বসিয়ে দিল।

তার দোষ ছিল কি?
আমারই বা কি দোষ ছিল, যদিও মেরেছি আমি? এই তৃষ্ণা অসহ্য।

তৃষ্ণা! এই শব্দের মানে কে জানে! রোমানিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময়, একশ ডিগ্রির বেশি গরমে দিনে পঞ্চাশ কিলো মিটার হেঁটেছিলাম, তবুও এখন যা অনুভব করছি তা কখনো অনুভব করিনি। আহ, কেউ যদি আসত!

হে ঈশ্বর! তার ওই বিশাল ফ্লাস্কে নিশ্চয়ই জল আছে! কিন্তু সেখানে পৌঁছাব কী করে? কত কষ্ট করতে হবে? কিন্তু পৌঁছাতেই হবে।

হামলে হামলে এগোতে শুরু করলাম। পা দুটো টানছে, দুর্বল হাত কষ্টে নিষ্প্রাণ শরীরটাকে ঠেলে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। মৃতদেহটা পনেরো ফুট দূরে, কিন্তু আমার কাছে এটা পনেরো মাইলের চেয়েও বেশি—না, বেশি না, কিন্তু কঠিন। তবু যেতেই হবে। গলা জ্বলছে। তাছাড়া, জল ছাড়া আরও তাড়াতাড়ি মরবে। এখনও একটু সম্ভাবনা আছে।

তাই এগিয়ে চললাম। পা মাটির উপর দিয়ে টানছে। প্রতিটা নড়াচড়া যন্ত্রণা। চিৎকার করছি, কাঁদছি ব্যথায়, তবু এগিয়ে যাচ্ছি। শেষমেশ মৃতদেহের কাছে পৌঁছালাম। ওই যে ফ্লাস্ক... জল আছে—অনেক জল! অন্তত অর্ধেক ভরা। এই জল অনেকদিন চলবে — মরা পর্যন্ত চলবে!

তুমি আমার প্রাণ বাঁচাচ্ছ, আমার বেচারা শিকার! এক কনুইয়ে ভর দিয়ে ফ্লাস্কের বাঁধন খুলতে শুরু করলাম। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়লাম আমার রক্ষাকর্তার বুকের উপর। তার শরীর থেকে পচনের তীব্র গন্ধ আসছে।

তৃপ্তি করে জল খেলাম। জল কুসুম গরম, কিন্তু খাওয়া যাচ্ছে এবং পরিমাণে অনেক। আরও কয়েকদিন বাঁচিয়ে রাখবে। এভরিডে লাইফের ফিজিওলজি বইতে পড়েছিলাম, জল থাকলে মানুষ খাবার ছাড়া এক সপ্তাহেরও বেশি বাঁচতে পারে। একজন আত্মহত্যাকারীর গল্প ছিল সেখানে, সে অনাহারে মরতে চেয়েছিল। তার মরতে অনেক সময় লেগেছিল, কারণ সে জল পাচ্ছিল।

তাতে কী? আর পাঁচ-ছয়দিন বাঁচলে কী হবে? আমাদের লোকেরা পিছু হটেছে, বুলগেরিয়ানরা পালিয়েছে। কাছে কোনো রাস্তা নেই। যেভাবেই হোক মরতে হবে। শুধু তিন দিনের যন্ত্রণার বদলে এক সপ্তাহের যন্ত্রণা দিলাম নিজেকে। এর চেয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়া কি ভালো নয়? পাশেই পড়ে আছে প্রতিবেশীর রাইফেল—চমৎকার একটা ইংরেজি অস্ত্র। হাতটা বাড়াতে হবে শুধু। তারপর, এক মুহূর্তে, সব শেষ। কার্তুজগুলোও পড়ে আছে, গাদা করা। সে শেষ করার সময় পায়নি।

তাহলে কি নিজেকে শেষ করে দেব, নাকি অপেক্ষা করব? কিসের অপেক্ষা? উদ্ধারের? মৃত্যুর? অপেক্ষা করব যতক্ষণ না তুর্কিরা এসে আমার ছাল ছাড়াবে, আহত পায়ের চামড়া টেনে খুলবে? এর চেয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেওয়া ভালো।

কিন্তু মনোবল হারালে চলবে না। ধরে থাকতে হবে, শেষ শক্তি পর্যন্ত লড়তে হবে। যদি পাওয়া কাউকে যায় তাহলে বেঁচে যাব। হয়তো হাড় অক্ষত আছে। তারা সারিয়ে তুলবে। দেশ দেখব, মা দেখব, মাশাকে দেখব।

হে ঈশ্বর, তারা যেন সব সত্যি না জানে! মনে করুক গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই মরে গেছি। দুই, তিন, চারদিন কষ্ট পেয়েছি জানলে তাদের কী হবে!

মাথা ঘুরছে। প্রতিবেশীর কাছে যাওয়া-আসায় শরীর শেষ হয়ে গেছে। আর সেই ভয়ংকর গন্ধ। কত কালো হয়ে গেছে সে... আগামীকাল বা পরশু কেমন দেখাবে? এখানে পড়ে আছি কারণ আমার সরার শক্তি নেই। একটু বিশ্রাম নিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যাব। ওদিক থেকেই বাতাস আসছে, দুর্গন্ধ দূরে নিয়ে যাবে।

পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছি। রোদ মুখ আর হাতে পড়ছে। গায়ে দেওয়ার কিছু নেই। রাত হলে ভালো হত। দ্বিতীয় রাত বোধহয়। ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়লাম।

অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম। উঠে দেখি রাত হয়ে গেছে। সব কিছু আগের মতো। ক্ষতে ব্যথা, প্রতিবেশী আগের মতো বিশাল আর নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে।

তার কথা মাথা থেকে সরাতে পারছি না। যা ভালোবাসতাম, যা প্রিয় ছিল সব ছেড়ে, হাজার মাইল মার্চ করে, খিদে-শীত-গনগনে রোদ সহ্য করে, এখন এই যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে আছি—শুধু এই বেচারা মানুষটার প্রাণ নেওয়ার জন্য? এই খুনটুকু ছাড়া আর কোন সামরিক উদ্দেশ্য পূরণ হলো?

খুন, খুন। আর কে করল? আমি!

লড়াইয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যখন, মা আর মাশা বাধা দেননি, যদিও তারা কেঁদেছিল। একটা ধারণায় অন্ধ হয়ে গিয়ে সেই চোখের জল দেখিনি। বুঝিনি—এখন বুঝছি—প্রিয়জনদের সাথে কী করেছিলাম।

এখন পেছনে তাকিয়ে লাভ কী! যা গেছে তা গেছেই।

আর কত অদ্ভুতভাবে তখন আমাকে দেখেছিল অনেক পরিচিত লোক! ‘পাগল হয়ে গেছে লোকটা! কোথায় কী করছে বুঝছে না!’ কী করে বলতে পারল এ কথা? বীরত্ব, দেশপ্রেম আর এই সব নিয়ে তাদের যে ধারণা, এই কথার সাথে সেটা মেলে কী করে? তাদের চোখে আমি ছিলাম সব গুণের প্রতীক। আর তবু বলল ‘পাগল।’

তাই কিশিনেভ গিয়েছিলাম। ভারী ব্যাগ আর সামরিক সরঞ্জাম বোঝাই করে দেওয়া হলো। হাজার হাজার মানুষের সাথে রওনা দিলাম। তাদের মধ্যে আমার মতো স্বেচ্ছায় যাওয়া লোক হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন। বাকিরা নিয়মিত সৈনিক। তারা হাজার মাইল মার্চ করেছে, সমানভাবে লড়েছে, বরং আরও ভালোভাবে লড়েছে। সুযোগ পেলে সব ছেড়ে চলে যেত, তবু দায়িত্ব পালন করেছে।

একটা ঝাঁজালো ভোরের হাওয়া উঠল। ঝোপগুলো দুলে উঠল, একটা ঘুমন্ত পাখি ডানা মেলে উড়ে গেল। তারাগুলো ম্লান হয়ে এলো। গাঢ় নীল আকাশ ফ্যাকাশে হয়ে নরম সাদা মেঘে ছেয়ে গেল। মাটি থেকে ধূসর ছায়া উঠতে লাগল। আমার তৃতীয় দিন। কীসের তৃতীয় দিন? জীবনের? যন্ত্রণার?

তৃতীয়... আর কটা দিন বাকি? যাই হোক, খুব কম। অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছি। মৃতদেহ থেকে দূরে সরে যাওয়ার শক্তি আর আছে বলে মনে হয় না। শীঘ্রই আমরা সমান হয়ে যাব, তখন আর কেউ কারো কাছে আপত্তিকর থাকব না। জল খেতে হবে। দিনে তিনবার খাব—সকালে, দুপুরে, সন্ধ্যায়।

সূর্য উঠল। বিশাল থালার মতো গোলাকার, ঝোপের কালো ডালপালায় আড়াআড়ি কাটা, লাল—রক্তের মতো। আজ গরম হবে মনে হচ্ছে। তোমার কী হবে, প্রতিবেশী? ঈশ্বর জানেন, এমনিতেই কত ভয়ানক দেখাচ্ছ!

হ্যাঁ, ভয়ানক। তার চুল উঠে যেতে শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবে কালো যে চামড়া ছিল, সেটা সাদাটে হলুদ হয়ে গেছে। ফোলা মুখের চামড়া এতটাই টানটান যে কানের পিছনে ফেটে গেছে। সেখানে পোকা গিজগিজ করছে। বুটপরা পা ফুলে গেছে, হুকের ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় ফোসকা উঁকি দিচ্ছে। পুরো শরীরটা বিশাল ফুলে উঠেছে। আজকের রোদ তার কী করবে?

এত কাছে শুয়ে থাকা অসহ্য। যেভাবেই হোক সরে যেতে হবে। কিন্তু পারব কি? হাত তুলে ফ্লাস্ক খুলে জল খাওয়ার শক্তি এখনও আছে। কিন্তু ভারী নিষ্প্রাণ শরীরটাকে সরানো? তবু নড়তে হবে, সামান্য হলেও—ঘণ্টায় আধ পা হলেও।

পুরো সকালটা কাটল সরতে সরতে। ব্যথা তীব্র, কিন্তু এখন আর কী আসে যায়! সুস্থ মানুষের অনুভূতি কেমন ছিল মনে নেই। সেটা কল্পনাও করতে পারছি না। মনে হচ্ছে ব্যথায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সেই সকালে শেষ পর্যন্ত পনেরো ফুট সরতে পারলাম। আগের জায়গায় ফিরে এলাম। কিন্তু তাজা বাতাস বেশিক্ষণ পেলাম না—পচা মৃতদেহ থেকে ছয়-সাত পা দূরে তাজা বাতাস বলা চলে কিনা সেটাও প্রশ্ন। বাতাসের দিক বদলে গেছে, দুর্গন্ধে বমি-বমি করছে। খালি পেটে টান ধরছে। গলিত বিষাক্ত হাওয়া বারবার গা-গুলিয়ে ঢেউয়ের মতো ভেসে আসছে।

হতাশায় কান্না শুরু হলো।
সম্পূর্ণ ক্লান্ত আর অবশ হয়ে প্রায় অচেতন হয়ে শুয়ে আছি। হঠাৎ... উত্তেজিত মনের কল্পনা নয় তো? না, কল্পনা নয়। হ্যাঁ, কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ঘোড়ার খুরের শব্দ, মানুষের গলার আওয়াজ। চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম, নিজেকে থামালাম। তুর্কি হলে? তাহলে? এই যন্ত্রণার সাথে যোগ হবে আরও ভয়াবহ যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণার কথা পত্রিকায় পড়লেই মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়। জ্যান্ত চামড়া ছাড়াবে, আহত পায়ে আগুন ধরাবে। আরও খারাপ কিছু আশা করা যায়। তারা কতটা নিষ্ঠুর আর কৌশলী। তাদের হাতে মরা কি এখানে এভাবে মরার চেয়ে সত্যিই ভালো? কিন্তু যদি আমাদের লোক হয়? এই ঝোপগুলোকে অভিশাপ দিই! চারদিকে এত ঘন দেওয়াল হয়ে কেন জন্মালে? ভেতর দিয়ে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু একটা জায়গায় ডালের ফাঁকে একটুকু ফাঁক, সেদিয়ে দূরে একটা নিচু জায়গা দেখা যাচ্ছে। ওখানে একটা ঝরনা আছে মনে হয়—যে ঝরনা থেকে যুদ্ধে যাওয়ার আগে জল খেয়েছিলাম। হ্যাঁ, ওই যে বালুপাথরের বড় চাঁই ঝরনার উপর আড়াআড়ি পড়ে আছে। ওটার উপর দিয়েই পার হবে সম্ভবত। গলার আওয়াজ থেমে গেছে। কোন ভাষায় কথা বলছে বুঝতে পারছি না—কান দুর্বল হয়ে গেছে। হে ঈশ্বর! আমাদের লোক হলে... চিৎকার করব। ওই দূরত্ব থেকেও শুনতে পাবে। বাশিবাজুকদের খপ্পরে পড়ার চেয়ে এটা ভালো। কিন্তু এত দেরি করছে কেন? অপেক্ষার যন্ত্রণায় আছি। মৃতদেহের গন্ধও টের পাচ্ছি না, যদিও দুর্গন্ধ আগের মতোই তীব্র।

হঠাৎ ঝরনার পারে কস্যাকদের দেখতে পেলাম! নীল পোশাক, লাল ডোরা ট্রাউজার, বর্শা। অর্ধেক সোৎনিয়া। সামনে কালো দাড়ির একজন অফিসার—অপূর্ব ঘোড়ার পিঠে। দলটা ঝরনা পার হতে না হতেই অফিসার জিনে ঘুরে বসে চিৎকার করল, ‘সামনে, দ্রুত!’

‘থামো, ঈশ্বরের দোহাই, থামো! সাহায্য করো ভাইরা, সাহায্য করো!’ চিৎকার করলাম। কিন্তু ভারী ঘোড়ার খুরের শব্দ, তরবারির ঝনঝনানি আর কস্যাকদের গলার আওয়াজ আমার কর্কশ চিৎকারকে ডুবিয়ে দিল — শুনতে পেল না।

হায় রে! ক্লান্তিতে মুখ থুবড়ে পড়ে কাঁদতে লাগলাম। ফ্লাস্কটা উলটে গেছে। জল গড়িয়ে পড়ছে—আমার জীবন, আমার মুক্তি, মৃত্যুর হাত থেকে অবকাশ। খেয়াল করলাম জল আধ গ্লাসের বেশি বাকি নেই। বাকি সব শুকনো তৃষ্ণার্ত মাটিতে শুষে গেছে।

সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর যে অসাড় হতবুদ্ধি অবস্থা এসেছিল, তা কোন ভাষায় বলব? আধবোজা চোখে নিশ্চল শুয়ে রইলাম। বাতাস বদলাতে লাগল—কখনো তাজা পরিষ্কার হাওয়া, কখনো পচা দুর্গন্ধের ঢেউ। সেদিন প্রতিবেশী বর্ণনার বাইরে ভয়ানক হয়ে উঠেছিল। একবার চোখ খুলে তাকাতে গিয়ে আতকে উঠলাম। তার মুখ নেই। হাড়ের উপর থেকে গলে পড়ে গেছে। মৃত্যুর চিরন্তন হাসিতে ঝকঝকে করোটি এর আগে কখনো এত ঘেন্না লাগায়নি—যদিও করোটি নিয়ে কাজ করার আর পুরো মাথা ব্যবচ্ছেদের সুযোগ অনেকবার হয়েছে। চকচকে বোতামওয়ালা উর্দিপরা এই কঙ্কাল দেখে শিউরে উঠলাম। মনে হলো,  ‘এই হলো যুদ্ধ। এই তার মূর্তি।’

এদিকে জ্বলন্ত রোদ নির্দয়ভাবে পুড়িয়ে চলছে। হাত আর মুখ ঝলসে গেছে। বাকি জলটুকু শেষ হয়ে গেছে। তৃষ্ণা এতটাই তীব্র ছিল যে এক চুমুক খাব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু এক গলায় সব গিলে ফেললাম। আহ, কস্যাকরা এত কাছে থাকতে চিৎকার করলাম না কেন! তুর্কি হলেও এর চেয়ে ভালো হত। বড়জোর এক-দুই ঘণ্টা কষ্ট দিত। কিন্তু এখন কতক্ষণ এই যন্ত্রণায় পড়ে থাকতে হবে জানি না। হে মা, প্রিয় মা! ধূসর চুল ছিঁড়ে ফেলো, মাথা দেওয়ালে ঠোকো, আমাকে যেদিন জন্ম দিয়েছিলে সেদিনকে অভিশাপ দাও, যুদ্ধ নামক এই অভিশাপ পৃথিবীতে এনেছে যারা তাদের অভিশাপ দাও! কিন্তু তুমি আর মাশা হয়তো কখনো জানতেও পারবে না আমি কী কষ্ট পাচ্ছি।

বিদায় মা, বিদায় প্রিয়া, আমার ভালোবাসা! কী যন্ত্রণা, কী কষ্ট! বুক ফেটে যাচ্ছে।

আবার সেই চাপা পড়া ছোট্ট সাদা কুকুরটা! দারোয়ানের দয়া হয়নি। দেওয়ালে মাথা ঠুকে ধুলোর গর্তে ছুঁড়ে ফেলেছিল। তবু বেঁচে ছিল সে। সারাদিন কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু আমি আরও বেশি হতভাগা—তিনটা পুরো দিন ধরে কষ্ট পাচ্ছি। কাল হবে চতুর্থ, তারপর পঞ্চম, তারপর ষষ্ঠ। হে মৃত্যু, কোথায় তুমি? এসো, এসো আমাকে নিয়ে যাও!

কিন্তু মৃত্যু আসে না, নিয়ে যায় না। আর আমি পড়ে আছি সেই ভয়াবহ রোদের নিচে। গলা জ্বালানো এক ফোঁটা জল নেই। পাশে মৃতদেহ বাতাস বিষিয়ে দিচ্ছে। পুরোপুরি পচে গেছে সে। পোকার দল ঝরে ঝরে পড়ছে। সে শেষ হয়ে শুধু হাড় আর পোশাক পড়ে থাকলে আমার পালা আসবে। আমিও এমনই হব।

দিন যায়, রাত যায়। কোনো বদল নেই। সকাল আসে। বদল নেই। আরেকটা দিন যায়।

ঝোপগুলো নড়ছে আর গুনগুন করছে। যেন ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। ‘মরবে, মরবে, মরবে!’ মুরমুর করছে তারা। ‘দেখতে পাবে না, পাবে না, পাবে না!’ অন্য দিকের ঝোপ সাড়া দিচ্ছে।
‘এদিক থেকে দেখা যাবে না!’ কাছ থেকে জোরালো একটা গলা শোনা গেল।

চমকে উঠে এক মুহূর্তে জ্ঞান ফিরল। ঝোপের ভেতর থেকে ইয়াকোভলেভের সদয় নীল চোখদুটো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আমাদের ল্যান্স-কর্পোরাল।
‘কোদাল আনো!’ সে চিৎকার করে। ‘এখানে দুজন আরও আছে—একজন আমাদের, একজন তাদের।’
‘কোদাল এনো না, কবর দিও না, আমি বেঁচে আছি!’ চিৎকার করতে চাইলাম। কিন্তু শুকনো ঠোঁট থেকে শুধু একটা ক্ষীণ গোঙানি বেরোল।
‘ঈশ্বর রে! মনে হচ্ছে বেঁচে আছেন! মি. ইভানভ, শুনতে পাচ্ছেন স্যার? বাছারা! এদিকে এসো তাড়াতাড়ি, ভদ্রলোক বেঁচে আছেন! সার্জন ডাকো!’

আধ মিনিটের মধ্যে জল, ভদকা আর আরও কিছু গলায় ঢেলে দেওয়া হলো। তারপর সব কিছু মিলিয়ে গেল। স্ট্রেচার সুষম দুলুনিতে এগিয়ে চলেছে। ছন্দময় দুলুনি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। জ্ঞান ফিরছে, আবার তন্দ্রায় ডুবছি। ব্যান্ডেজ করা ক্ষতে ব্যথা নেই। শরীরে একটা মধুর অবসাদ ছড়িয়ে আছে।
‘থামো! স্ট্রেচার নামাও! বদলি দল, সামনে আসো! স্ট্রেচার তোলো! এগিয়ে চলো!’

এই হুকুমগুলো দিচ্ছেন পিওত্র ইভানোভিচ। আমাদের চিকিৎসা অফিসার। লম্বা, রোগা, খুব মায়াদয়ার মানুষ। এতটাই লম্বা যে চার জন লম্বা সৈনিক কাঁধে স্ট্রেচার বহন করছে, তাদের মাথার উপর দিয়েও দেখা যাচ্ছে তাঁর লম্বা এলোমেলো দাড়ির মাথাটা আর কাঁধ।

‘পিওত্র ইভানোভিচ!’ ফিসফিস করলাম।
‘কী হলো, বাছা?’ উনি ঝুঁকে পড়লেন।
‘ডাক্তার কী বললেন, পিওত্র ইভানোভিচ? আমি কি শীঘ্রই মরব?’
‘মরবে—কে বলল তোমাকে! মরবে না। সব হাড় ঠিকঠাক আছে। ভাগ্যবান ছেলে! কোনো হাড় বা ধমনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সাড়ে তিনটা দিন কীভাবে টিকে রইলে বুঝতে পারছি না। কী খেয়েছ?’
‘কিছু না।’
‘জল?’
‘তুর্কির ফ্লাস্ক থেকে নিয়েছিলাম। এখন কথা বলতে পারছি না, পিওত্র ইভানোভিচ। পরে বলব।’
‘অবশ্যই, বাছা। ঘুমিয়ে পড়ো।’

আবার ঘুম, বিস্মৃতি।

ডিভিশনের হাসপাতালে জ্ঞান ফিরল। ডাক্তার আর নার্সরা পাশে দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে পিটার্সবার্গের একজন বিখ্যাত অধ্যাপকের পরিচিত মুখ। আমার পায়ের দিকে ঝুঁকে আছেন। হাতে রক্ত। বেশিক্ষণ নয়। তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দাও, বাছা! বাঁচবে তুমি। একটা পা কেটে নিতে হয়েছে অবশ্য। কিন্তু সেটা কিছু না। কথা বলতে পারবে?’

পারলাম। আর এখানে যা বর্ণনা করেছি সব তাঁকে বললাম।
১৮৭৭

**********

লেখক পরিচিতি : ভসেভোলদ মিখাইলোভিচ গারশিন (১৮৫৫–৮৮) একজন রুশ ছোটগল্পকার। তিনি  ছিলেন একজন সেনা কর্মকর্তার পুত্র, যাঁর পরিবার ছিল ধনী ও ভূসম্পত্তির মালিক। যখন রুশ-তুর্কি যুদ্ধ শুরু হয়, তখন গারশিনের বয়স কুড়ির কোঠায়। পিতার পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি তাঁর যৌবনের শান্তিবাদ ত্যাগ করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধে এক আহত সৈনিকের দুর্দশার গল্প ‘চার দিন’ (১৮৭৭) তাঁকে প্রথম খ্যাতি এনে দেয়। একটি ফুলের মধ্যে দেখা অশুভকে ধ্বংস করার জন্য এক উন্মাদের প্রচেষ্টা নিয়ে লেখা ‘রক্তিম ফুল’ (১৮৩৩) তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। গারশিন মাঝে মাঝে এক মানসিক রোগে ভুগতেন, যার ফলস্বরূপ তিনি একটি সিঁড়ির কুয়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ