বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

দীপেন ভট্টাচার্য'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : অদিতার আঁধার-- দ্বাদশ পর্ব


অদিতার আঁধার
দ্বাদশ পর্ব--

অশান্ত বাতাস বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে আছড়ে ফেলে কালিগর্জন আর বনশিমুল গাছের পাতায়, সেই বাতাসেরই ঝাঁপটায় কাঁপে তাদের শাখা। গাছগুলোর মাঝের শূন্যতা দিয়ে হাওয়া বইতে থাকে কয়লার রেল ইঞ্জিনের মত শব্দ করে। কয়লার ইঞ্জিন? হঠাৎ কয়লার ইঞ্জিনের কথা মনে এল কেন, ভাবে রাস্কো। সেই ইঞ্জিন পৃথিবীর বুক থেকে কবেই উঠে গেছে।

কেবিনের কাঠের মেঝেতে শুয়ে থাকে প্রবীণ রাস্কো, লম্বা চুল ছড়িয়ে থাকে তার পুরাতন কিন্তু পেটা শরীরের নিচে। ডামুরির এই গভীর বনটিকে ভালবাসে সে, অদিতাই তাকে প্রথম নিয়ে এসেছিল এখানে। বনের মধ্যে তাঁবু খাটিয়েছিল তারা, চিত্রা হরিণের দল ভীড় করে জমা হত কৌতূহলে, তাদের গাঢ় কালো চোখ আজও মন পড়ে তার। তাঁবুর খোলা দিকটা দিয়ে আকাশে গাছের চুড়াদের ফাঁক দিয়ে সাদা মেঘ দেখত। অদিতা কখনো তাকে ‘ভালবাসি’ বলে নি, বলার দরকার ছিল না, তাদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল এমনই নিবিড়। কিন্তু অদিতাকে ভুল বুঝেছিল রাস্কো, অদিতা তাকে খুব সহজেই ছেড়ে চলে গিয়েছিল। 

তারপর দেখতে দেখতে দেড়শ বছর চলে গেল। দেড়শটি বছর পার করা কি সহজ কথা, মানুষের স্মৃতি কি দেড়শ বছরের ভার সইতে পারে? কেবিনের ছাদের কাঠ বৃষ্টির জলে ভিজে কালো হয়ে যায়, এই বর্ষা কি সইতে পারবে তার কেবিন? এই কেবিনটি সে নিজ হাতে তৈরি করেছে কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সাহায্য না নিয়ে, আকাশের কৃত্রিম উপগ্রহের দৃষ্টি এড়িয়ে। ডামুরির বনপ্রহরী বা বিজ্ঞানীরা কিছুই জানতে পারে নি, এমন কি অদিতা - এই বিশাল বন যার কিনা নখদর্পণে - সেও এই কেবিনটির সন্ধান পায় নি। সময় নিয়েছে অনেক, পরিশ্রমও, তবু বনের এই গোপন ঘাঁটিকে ব্যবহার করে সে সারা পৃথিবীতে লোহিতক সংগঠনকে পরিচালনা করেছে, মাটির তলায় ভুলে যাওয়া টেলিফোন তারকে ব্যবহার করে। 

আজ যদি এই কেবিনটি জলের তোড়ে ভেসে যায় তাতে রাস্কো অখুশী হবে না। আজ পৃথিবীকে বদলে দেবার দিন। এই দিনটির জন্য সে অপেক্ষা করেছে দেড়শটি বছর। 

চারদিন আগে এই কেবিনেই বৃষ্টির জন্য আশ্রয় নিয়েছিল অদিতা, আশ্চর্য হয়েছিল ডামুরির বনে কেবিনটার উপস্থিতিতে। খাদের ওপাড় থেকে তাকে বৃষ্টির চাদরের মধ্য দিয়ে দেখছিল রাস্কো। অদিতা টের পেয়েছিল বনের মধ্যে একটি অজানা মানুষের উপস্থিতি - ভয় পেয়েছিল। 

অদিতাকে বনের মধ্যে একা পাবার জন্য দুটি বছর অপেক্ষা করেছে রাস্কো। কিন্তু সেই দুটি বছরের পেছনে ছিল শত বছরের পরিকল্পনা। বিষাণ তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, ভাবে রাস্কো। সে নিষেধ করেছিল বিষাণকে মস্তিষ্ক কপি করার প্রকৌশল পৃথিবী পরিচালনা কমিটির হাতে তুলে না দিতে, বিষাণ তার কথা রাখে নি। তাই এই চরম পথ নিতে সে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এটাই কি একমাত্র কারণ? না, এটা একমাত্র কারণ নয়, রাস্কো সেটা ভালভাবেই জানে। এটা একমাত্র কারণ হলে চাঁদ থেকে সে সেনভাকে অপহরণ করত না, সেনভাকে অশির হিসাবে গড়ে তুলত না, আর ডামুরির বনে অদিতার জন্য সে অপেক্ষা করত না। যে অদিতার জন্য সে তার জীবন উৎসর্গ করতে চেয়েছিল সে কিনা সেনভার সামান্য অঙুলি-হেলনে চলে গেল? প্রতিহিংসা একটা ভাল প্রণোদনা, এই যুদ্ধ যতটা না পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্য তার থেকে অনেক বেশী যেন প্রতিশোধ নেবার জন্য। হয়তো পৃথিবীকে বদলে দেবার ইচ্ছা সামান্য প্রতিশোধ স্পৃহা থেকেই উৎসারিত হয়। 

অদিতাকে কাছ থেকে দেখতে, তার ওপর পরীক্ষা করতে গত দু বছর ধরে রাস্কো ডামুরিতে বাসা বেঁধেছে। নদীর ওপাড় থেকে বন গবেষণাকেন্দ্রে অদিতার বিচরণকে মাসের পর মাস চোখে চোখে রেখেছে। দূর থেকে ব্যবহার করেছে এমন একটি যন্ত্র যেখান থেকে উৎসারিত বেতার তরঙ্গ মানুষের মনকে আবেশিত করতে পারে, বিশেষতঃ মস্তিষ্কের আমিগডালায় ভয় সঞ্চার করতে পারে, মনের মধ্যে অন্ধকার মেঘের সৃষ্টি করতে পারে। সেই কালো মেঘ অদিতার মনকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে অবশ করে দিয়েছে, তাঁর বাঁচার স্পৃহাকে দমিয়ে দিয়েছে। সেই বেতার নিক্ষেপণ যন্ত্র সে বিনতার ওপরও একবার ব্যবহার করেছে, বিনতাও অন্ধকার মেঘ দেখেছে। আহা, ডকটর বিনতা! আকর্ষণীয়া বিনতা, ভাবে রাস্কো। বিনতাকেও চমৎকার ভাবে ব্যবহার করা গেছে। 

অদিতাকে সেই বৃষ্টিভেজা রাতে তার কেবিনে আশ্রয় নিতে দেখে রাস্কো পরবর্তী পদক্ষেপগুলি মনে মনে গুছিয়ে নেয়। পরদিন সকালে কেবিনের কাছেই এক পাহাড়ি হ্রদের ধারে সে বাঁশি বাজায়, সে জানত সেই বাঁশীর শব্দ অদিতার কানে পৌঁছাবে। সে যেন হ্যামলিনের ইঁদুর-ধরা বংশীবাদক, অদিতা ঠিকই সেই বাঁশির শব্দ অনুসরণ করে তাকে আবিষ্কার করেছিল, দূর পাথরে বসে তন্ময় হয়ে শুনছিল তার সুর। রাস্কো বুঝেছিল তার পেছনে অদিতার উপস্থিতি। বাজানো শেষ হলে জলাশয়ের ধারেই একটা ছোট বনের দিকে রাস্কো হাঁটে, অদিতা তার পিছু নেয়। বনের ভেতরে রাস্কো অপেক্ষা করছিল। তীরটা ছোড়ার আগে, শেষ মুহূর্তে অদিতা তাকে চিনতে পেরেছিল, চমকে উঠেছিল। তার সাদা লম্বা চুল, সাদা কালো ঘন ভুরু, তীক্ষ্ণ নাক, রোদে-জ্বলা জামা-ছাড়া বাদামী পেটা লোহার মত শরীর বহু বছর আগের - শ খানেক বছর আগের - রাস্কোকে স্মৃতির গভীর অংশ থেকে টেনে তুলতে ত্রিশ সেকেন্ড সময় নিয়েছিল। অদিতার ঠোঁট নড়েছিল, ফিস ফিস করে বলেছিল, “রাস্কো!” সেই অস্ফূট স্বরে ঝড়ে পড়ছিল বিস্ময়। এরপরে রাস্কো অদিতাকে আর সময় দেয় নি, মাটিতে পড়ে থাকা ধনুক তুলে নেয় সে, তাতে তীর গাঁথে, সেই তীর কয়েক সেকেন্ড পরে অদিতার হৃদপিণ্ডে গেঁথে যায়। শুধুমাত্র তখনই যখন অদিতা মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল, তখন রাস্কো হৃদপিণ্ডে একটা ম্লান ব্যথা অনুভব করেছিল। শুধু এটুকুই। 

এরপরে কী হবে সেটা রাস্কোর জানাই ছিল। বিনতা অদিতাকে নিয়ে যাবে বিশালগড়ের মস্তিষ্ক সংরক্ষাণাগারে ‘নিলয়ে’, তারপর বিনতাকে ব্ল্যাকমেল করে আদায় করা হবে অদিতার মস্তিষ্কের নিরাময় কম্পাঙ্ক যে কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে অদিতাকে পরিচালনা করা যাবে যন্ত্রের মতন। অশিরের নেতৃত্বে এই কাজগুলো সময় মতই করা হয়েছে এবং হবে। আহ অশির! অদিতার ছেলেকে সে শুধু অপহরণ করেই ক্ষান্ত হয় নি, তাকে সে তার মা বাবাকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে, এর থেকে বড় তৃপ্তি আর কি হতে পারে! অশির আজ ‘নিলয়ে’ পৌঁছে নিরাময় কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে অদিতাকে কোমা থেকে তুলবে। তারপর? তারপর সে ইতিহাস গড়বে। 

এভাবেই সবকিছুর শেষ হয়, ভাবে রাস্কো। আজ পৃথিবীর ইতিহাস বদলাবে। সে একাই নির্ধারণ করছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। সেই অধিকার কি তার আছে? একটা মানুষ কি জানে অন্য সব মানুষের ভাল কী করে হবে? ইতিহাসে বহু লোক এরকম ভেবেছিল, তাদের প্রচেষ্টা বরং বুমেরাং হয়েছে, তাদের একগুয়েমীতে মানুষের কষ্ট আরো বেড়েছে। এসব কিছুই জানে রাস্কো। নিজের পদ্ধতি সম্পর্কে তার দ্বন্দ্ব আছে, কিন্তু সে বিশ্বাস করে মহাবিশ্বের মাঝে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কটের ওপরে উঠতে হলে বিশাল কোনো কর্ম করতে হবে, সেই কাজ চূড়ান্ত রকম ঋণাত্মক ফলাফল দিলেও। এসব নিয়ে এখন আর ভাবতে চায় না রাস্কো। এই পথ এখন নির্ধারিত, সেই পথ থেকে এখন ফেরার আর কোনো উপায় নেই। 

আকাশ আরো আলোময় হয়ে ওঠে, রোবোট ড্রোনের শব্দ শোনে রাস্কো, গত কয়েকদিন হল তারা খুঁজছে অদিতার আততায়ীকে। আজও সেই ড্রোন তাকে খুঁজে পাবে না। 

*****************************

নিলয়ের বাইরে একটা বেঞ্চে বসে আছে অশির, তার পাশে রাখা একটা ব্রিফকেস। পূবের আকাশে সবে আলো ফুটছে। বেঞ্চের বাঁ পাশে কিছু ফুলগাছ, তারপরে আর একটা বেঞ্চ, সেটাতে মিরা আর সিলোন বসে আছে। আজকের দিনটা কেমন যাবে সেই নিয়ে ভাবতে চায় না অশির। সকালের সূর্য মেঘের পেছনে ঢাকা, এরকম সকাল পছন্দ করে না সে, এরকম সকালের মধ্যে এক ধরণের বিষণ্নতা লুকিয়ে থাকে। বিষণ্নতাকে দুর্বলতা মনে করে অশির, পৃথিবীর ভাগ্য বদলাতে বিষণ্নতার কোনো স্থান নেই। চাইলে সে এখন এখান থেকে চলে যেতে পারে, ফিরে যেতে পারে সমুদ্রের ধারে পাহাড়ে তার গোপন আস্তানায়। প্রেম করতে পারে পাহাড়ের সবুজে মিরার সাথে। না, সেই পথ এখন আর তার নয়, সেই পথ সাধারণ মানুষের জন্য। তার পথ এখন বাঁধা আছে এইখানে, এই ‘নিলয়ে’। নাগানো, চেংডু, দিল্লী, ইসফাহান, লুসাকা, ডেনভারসহ পৃথিবীর প্রতিটি ‘নিলয়ে’ আজ আক্রমণ হবে। 

সময় হয়েছে। অশির পাশে রাখা ব্রিফকেসটা বেঞ্চের হেলান দেবার জায়গাটায় উঠিয়ে বসায়, সেটার একটা নির্দিষ্ট দিক নিলয়ের দিকে মুখ করে ঘুরিয়ে দেয়, তারপর তার হাতের মধ্যে রাখা একটা লম্বা সরু নিয়ন্ত্রণ বাক্সে একটা বোতাম টেপে। 

নিলয়ের প্রধান প্রবেশদ্বার বন্ধ, তার পেছনে দুজন সান্ত্রী দাঁড়িয়ে, তারা সবে পাহারা শুরু করেছে, নিজেদের মধ্য কথা বলছে। তারা হঠাৎ দেখল বন্ধ দরজার মধ্য দিয়েই এক ঘন কালো ধোঁয়ার মত মেঘ প্রবেশ করছে। এটা কীভাবে সম্ভব সেটা তারা বুঝে পেল না, তাদের দরজা খোলার কোনো অনুমতি ছিল না, কিন্তু ব্যাপারটা এমনই অস্বাভাবিক ছিল যে তারা দরজা খুলতে বাধ্য হল। কিন্তু দরজা খুলে তারা বাইরে দিনের আলো দেখল না, কালো মেঘ সব আলো যেন ঢেকে দিয়েছে। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অশিরের তীক্ষ্ণ ছোরা তাদের একজনের হৃদপিণ্ডে প্রবেশ করল, অশিরের পেছনে ছিল সিলোন, তার ছোরা প্রবেশ করল আর একজনের বুকে। দুজন প্রহরীই দরজার বাইরে সিঁড়ির ল্যান্ডিংএ পড়ে গেল। তোমাদের মহান মৃত্যু হল, ভাবে অশির, এরকম মৃত্যুর জন্য মানুষ কতদিন অপেক্ষা করেছে! 

নিলয়ের দোতলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দেয়ালে সারি সারি টেলিভিশন স্ক্রিন বসানো, তার মধ্যে একটা স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছিল নিচের প্রধান দরজা। সেই ঘরে যে দায়িত্বে ছিল সে কিন্তু সেই স্ক্রিনে কোনো মেঘই দেখল না, সে দেখল নিচের প্রহরী দুজন কী যেন একটা দেখে সন্ত্রস্ত হল, তারপর বাইরের দরজা খুলল। ঐভাবে খোলার কথা নয়, সেটা ছিল নিরাপত্তাজনিত প্রটোকলের বিরুদ্ধে। আতঙ্কিত হয়ে নিয়ন্ত্রণকারী দেখল নিচের তলার প্রহরী দুজন আক্রমণকারীদের ছোরার আঘাতে মাটিতে পড়ে গেল। সব মিলিয়ে তিনজন আততায়ী - দুজন পুরুষ ও একজন নারী - দ্রুত ঢুকে গেল নিলয়ের মধ্যে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসা মানুষটি সামনের প্যানেলে একটা বোতামে চাপ দেয়, জরুরী সঙ্কেত বেজে ওঠে, ‘নিলয়ে’ ঢোকার সমস্ত দরজার বাইরে ইস্পাতের দুর্ভেদ্য দরজা নেমে আসতে শুরু করে। নিলয়ের ভেতরেও মূল অংশগুলোও ইস্পাতের দরজার পেছনে সুরক্ষিত হয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দরজা নামার আগেই অশিররা সেই ঘরে প্রবেশ করে। নিয়ন্ত্রণকারী কিছু করার আগেই দেখল একটা কালো মেঘ তার সমস্ত স্ক্রিন ঢেকে দিচ্ছে, তার নিয়ন্ত্রণ প্যানেল ঢেকে দিচ্ছে, এমন কি ঘরে ঢোকা আততায়ীদেরও সে দেখতে পেল না মেঘের আড়ালে। সিলোন তার হাতের ছোরা বসিয়ে দেয় তার বুকে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিলয়ের দায়িত্বে থাকা মানুষটি। 

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বাইরে নিলয়ের মূল অংশে ঢোকার আর কোনো উপায় নেই। সেখানকার সুরক্ষিত দরজাগুলোকে খোলার দুটো উপায়, হয় ভেতর থেকে অথবা সমস্ত নিলয় কেন্দ্রগুলো যেখান থেকে পরিচালনা করা হয় সদূর আফ্রিকা মহাদেশের ভৌগলিক কেন্দ্রবিন্ধুতে অবস্থিত একটি বাড়ি থেকে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের স্ক্রিনগুলোকে ভাল করে খেয়াল করে অশির, তার হাতে খুব বেশী হলে পনেরো মিনিট সময় আছে, তারপরই বাইরে থেকে নিরাপত্তা রক্ষীরা এসে পড়বে। সে জানে এই সময়ে ডকটর তারকার বা সকুরাও থাকবে না। মূল প্যানেলের কয়েকটা বোতাম টিপতে থাকে অশির, স্ক্রিনে একটার পর একটা ঘরের ছবি ফুটে ওঠে। এরকমভাবে মিনিটখানেক সময় নেয় অদিতার ঘরটি খুঁজে পেতে, খুব দূরে নয়, মাটির নিচে প্রথম তলার একটা ঘরে অদিতাকে রাখা হয়েছে। ব্রিফকেসটা নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের একটা দিকে যায় অশির, এই জায়গাটা অদিতার কক্ষের সবচেয়ে কাছাকাছি। ব্রিফকেসটা একটা টেবিলের ওপর রেখে সেটার ডালা খোলে অশির, একটা ছোট পরাবৃত্ত অ্যানটেনা বের হয়ে আসে। সে আশা করছিল নিম্ন কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ মাঝের দেয়াল ও দরজা পার করে অদিতার কাছে পৌঁছুতে পারবে। অশির বিনতার কাছ থেকে পাওয়া অদিতার নিরাময় নম্বরটি অ্যানটেনার নিচের প্যানেলের বোতামগুলোতে চাপ দিয়ে লেখে। একটা সবুজ বাতি জ্বলে, অদিতার মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেছে। অশির দ্রুত আরো কিছু নম্বর প্যানেলে লেখে। অদিতা ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাবে না, তার মস্তিষ্কে পরবর্তী করণীয় কাজগুলোকে এখনই আপলোড করতে হবে। অ্যানটেনার প্যানেলে পরপর কয়েকটা সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে, অশিরের মুখে তৃপ্তির হাসি ফোটে, তাদের অভিযান সার্থক হতে চলেছে। 

অদিতার চোখ খুলে যায়, সে বোঝে না কোথায় আছে, তার কী হয়েছিল। সে উঠে বসে বিছানায়। তাকে কিছু করতে বলা হচ্ছে, কে বলছে সে জানে না, কিন্তু করাটা যে খুব জরুরী সেটা তার মনে হয়। উঠে দাঁড়ায়, দরজা খুলে দেখে বাইরে একটা লম্বা করিডর, করিডরে আলো জ্বলছে। যন্ত্রচালিতের মত সে হাঁটে করিডরে, করিডরের দরজাগুলোর পেছনে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায়, নির্দিষ্ট বায়ুচাপে ও আর্দ্রতায় সব মস্তিষ্ক জমা রাখা হয়েছে। অদিতা করিডরের শেষে একটা লিফট ধরে নিচের ১০ নম্বর তলার বোতামে চাপ দেয়। 

অশির নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে অদিতার অবস্থান পরিবর্তন লক্ষ করে। এখন অ্যান্টেনা থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গ অদিতার কাছে পৌঁছবে না, সে আশা করছে একটু আগে পাঠানো নির্দেশাবলী অদিতা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। 

লিফট নিচে পৌঁছালে অদিতা বের হয়ে প্রথম ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ায়। বাইরের ইলেকট্রনিক প্যানেলের বোতামে কয়েকটা নম্বর টেপে, দরজা খুলে যায়। ভেতরে সারি সারি তাক, তাতে আরো বৈদ্যুতিক প্যানেল। অদিতা যন্ত্রচালিতের মত দ্রুত সেগুলোর অনেক কটায় বোতাম টিপতে থাকে। অশির তৃপ্ত মুখে সেটা দেখে। তার অভিযান সার্থক হতে চলেছে, কয়েক কোটি সংরক্ষিত মস্তিষ্ক এখন ধ্বংস হবে, সেই মস্তিষ্কদের মুক্তি হবে চিরন্তন স্বপ্ন থেকে। 

ধীরে ধীরে প্রতিটি তলার সমস্ত বিদ্যুৎ সরাবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সমস্ত সহায়ক ব্যাটারি ব্যবস্থাকেও বন্ধ করে দেয়া হয়। মস্তিষ্ক সংরক্ষণের জন্য কৃত্রিম আবহাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অদিতা আরো কয়েকটা নম্বর চাপে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সুরক্ষা দরজা খুলে যায়। আবার লিফটে করে ওপরে উঠে আসতে শুরু করে সে। অশির তাকে অভ্যর্থনা করার জন্য লিফটের দরজার সামনে দাঁড়ায়। লিফটের দরজা খুললে অদিতা অশিরকে দেখে। অশিরের নির্দেশে মিরা ব্রিফকেসের যন্ত্রে আর একটা সংকেত ঢোকায় যা কিনা অদিতার মস্তিষ্ককে বাইরের প্রভাবমুক্ত করে। অদিতা যেন স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে, তার দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হয়, মিরা তাকে ধরে ফেলে। অদিতা আশ্চর্য হয়ে অশিরকে দেখতে থাকে। সেভান? সেভান এখানে কেমন করে এল? আর সেভান কবে থেকে এরকম পোষাক পড়তে আরম্ভ করল? না এই মানুষটি সেভান হতে পারে না। অশির বোঝে অদিতার দ্বন্দ্ব। কিন্তু সেই বুঝতে পারার মধ্যে কোনো শান্তি থাকেন না। এতদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ফেটে পড়তে চায়, কিন্তু অশির নিজেকে সামলায়। 

সিলোন দৌড়ে আসে, সে বলে, “আমাদের সময় নেই, আমি বিস্ফোরক যেখানে যেখানে লাগানোর কথা ছিল লাগিয়েছি, আমাদেরকে এখন পালাতে হবে।” সিলোনের কথা অশিরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। সে এক দৃষ্টিতে অদিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁট নড়ে ওঠে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। সিলোন মূল দরজার দিকে দৌড়ায়, মিরা কি করবে ভেবে পায় না, অসহায়ভাবে অশিরের দিকে তাকায়। প্রথম বিস্ফোরণটা হয় নিলয়ের ডানদিকের অংশে, কয়েক সেকেন্ড বাদে বাঁদিকে, অশির দেখে অদিতার পেছনে আগুনের হলকা। সে বলে, “আমার নাম অশির, কিন্তু ছোটবেলায় আমাকে সবাই সেনভা বলে ডাকত। আমি চাঁদে হারিয়ে গেলে আমার বাবা মা আমার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা না করেই আর একটি সেনভার দেহ সৃষ্টি করে আমার কপি-করা মস্তিষ্ক তাতে বসায়। এইভাবে আমি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাই।” 

অদিতার ঠোঁট নড়ে ওঠে, তার থেকে অস্ফূট কয়েকটা কথা বের হয়। তার পেছনেই আর একটা বড় বিস্ফোরণ হয়। মিরা অদিতাকে ধরে মূল দরজার দিকে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু অশির তার জায়গা থেকে নড়ে না, তার মুখে একটা ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও শান্তির অদ্ভূত মিশ্রণ, তার ঠোঁট নড়ে, সেও কিছু বলতে চায়। আর একটা বড় বিস্ফোরণে নিলয়ের মূল বাড়িটা ধ্বংস হয়ে যেতে থাকে। 

(চলবে)


লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।

মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন