বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

লাতিন আমেরিকার ছোটগল্প: পটভূমি ও পর্যালোচনা


আলম খোরশেদ

উত্তর আমেরিকার সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমা ল, গোটা দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় দ্বীপা লের মোট কুড়িটি স্প্যানিশভাষী ও একটি পর্তুগিজভাষী দেশ ব্রাজিলকে নিয়ে যে বিশাল ভূখণ্ড, তার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার অভিন্নতা তাকে দিয়েছে একক ও স্বতন্ত্র একটি ভৌগোলিক অভিধা, লাতিন আমেরিকা। 

তার এই ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সাযুজ্যসমূহের মধ্যে অন্যতম, মায়া, আজটেক ও ইন্কা সভ্যতার সন্তান আদিবাসী আমেরিকানদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত দীর্ঘ তিনশত বছরের স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ উপনিবেশ, উপকূলা ল ও বিশেষত ক্যারিবীয় দ্বীপসমূহে আফ্রিকা থেকে বলপূর্বক আনীত কৃষ্ণাঙ্গ দাস-শ্রমিকের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রভাব, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্ব থেকে শুরু করে অদ্যাবধি সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন অপশক্তির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, দেশীয় স্বৈরাচারী সামরিক একনায়কতন্ত্রের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা এবং পাশাপাশি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ও রাজনীতির এই জটিল আবর্ত, উত্থান-পতন এবং সপ্রাণ গতিময়তা তাকে স্থাপন করে বিশ্বের মনোযোগ-এর কেন্দ্রে। বিশেষত ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবান বিপ্লবের বিজয়, ১৯৭৩ সালে চিলেতে সালবাদোর আয়েন্দের নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত সমাজতন্ত্রী সরকারের অধিষ্ঠান, ১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়ায় সান্দিনিস্তা বাহিনীর ঐতিহাসিক বিজয় এবং এল সালবাদোর, পেরু, বলিবিয়া প্রভৃতি দেশে গৌরবোজ্জ্বল গণজাগরণ বিশ্বের নিপীড়িত, প্রগতিকামী মানুষদের কাছে আশা, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও বিজয়ের প্রতীক এবং প্রেরণার এক অনিঃশেষ উৎস হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে লাতিন আমেরিকা নামের এই অগ্নিগর্ভ মহাদেশকে। লাতিন আমেরিকার এই বহুমাত্রিক নিজস্ব বাস্তবতার অভিঘাত পড়েছে অবধারিতভাবে তার শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনেও। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, গ্রহণ-বর্জন ও দেয়া-নেয়ার পালা সাঙ্গ করে, অনেক নিরীক্ষা, ধ্বংস ও নির্মাণের পথ বেয়ে লাতিন আমেরিকার শিল্প-সাহিত্যও আজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তার এক স্বতন্ত্র পরিচয়, কেড়ে নিয়েছে বিশ্বের মনোযোগ পুনর্বার। সংক্ষেপে তার পটভূমিটি এরকম।

স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ উপনিবেশের শেষপাদে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই লাতিন আমেরিকার সচেতন জনগোষ্ঠী ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ফরাসি রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা ও শিল্প-ভাবনার সচেতন ও সংগঠিত চর্চার উদ্বোধন ঘটায়। তার রাজনৈতিক ফলাফল ১৮১০ সাল থেকে ১৮২০ সালের মধ্যে পারাগুয়াই, চিলে, ব্রাসিল প্রভৃতি দেশের উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন-এর সূত্রপাত এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তি। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষত সাহিত্যে তার প্রভাব আসে রোমান্টিক আন্দোলনের চেহারায়। এর পুরোধা ব্যক্তিত্ব আর্হেন্তিনা ও কলম্বিয়ার ঔপন্যাসিক হোর্হে আইসাকস্ ও হোসে র্মামল। এক ধরনের সরল আদর্শবাদের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত আবেগ, কল্পনাবিলাস ও আত্মত্যাগের উদ্দীপনায় রচিত এইসব সাহিত্যে স্পষ্টতই ফরাসি প্রভাব ছিল প্রবল। ঘটনাচক্রে এই পর্যায়েই রচিত হয় লাতিন আমেরিকার প্রথম ছোটগল্প। আর্হেন্তিনার সমাজ ও রাজনীতিসচেতন লেখক এস্তেবান এচেভারিয়ার ‘এল মাতাদেরো’ নামের গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৮৩৮ সালে। এর আঙ্গিকে রোমান্টিকতার ছাপ স্পষ্ট থাকলেও বিষয়ের বাস্তবানুগতা ছিল লক্ষণীয়। ঐতিহাসিকভাবে এচেবারিয়াই লাতিন আমেরিকার ছোটগল্পের জনক, যদিও সাহিত্যের এই নতুন শাখাটির পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯১৭ সালে উরুগুয়াই-এর লেখক ওরাসিয়ো কিরোগার ‘Stories of Love, Madness and Death’-এর প্রকাশ অবধি। বস্তুত ব্যাপক ও গভীরতর অর্থে আধুনিক লাতিন আমেরিকান ছোটগল্পের প্রকৃত পথিকৃৎ কিরোগা। তিনি শুধু অজস্র আধুনিক, স্বকীয় ও শিল্পোত্তীর্ণ গল্প রচনা করেই ক্ষান্ত হননি, এর আঙ্গিক, কৌশল ও দর্শন নিয়েও প্রচুর চিন্তা-ভাবনা করেছেন, যার পরিচয় বিধৃত তাঁর ‘Decalogue of the Perfect Short Story Writer’ গ্রন্থে, ছোটগল্প লেখকদের কাছে অদ্যাবধি যা পথ-নির্দেশকের মর্যাদা পেয়ে আসছে। পুরোপুরি বিদেশী ভাবধারানির্ভর এই সরল, অপরিণত রোমান্টিক আন্দোলন প্রায় গোটা ঊনবিংশ শতক ধরেই সক্রিয় থাকে, যার আরেক রূপ লক্ষ করা যায় ১৮৬০ ও ১৮৭০-এর দিকে প্রধানত ব্রাজিল ও পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে। রোমান্টিক আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রজন্ম বলে খ্যাত এই ধারায় যুক্ত হয় ‘রিয়েলিজম’-এর অঙ্গীকার। এর প্রধান প্রণোদনা তখন অব্দি ইউরোপীয় প্রভাব হলেও আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের জীবনচর্যা ও পরিবেশ বর্ণনায় এক বিশেষ লাতিন আমেরিকান মাত্রা যুক্ত হয় তাতে। পেরুর রিকার্দো পালমা (১৮৩৩-১৯১৯) ‘Costumbrismo’ নামে এক বিশেষ ধরনের লাতিন আমেরিকান রোমান্টিসিজম-এর ধারা প্রবর্তন করেন যার মূল উপজীব্য স্থানীয় লোককথা, সঙ্গীত, আচারধর্মী ও নিসর্গ বন্দনা। কিন্তু শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই সহজিয়া সাহিত্য আন্দোলনের তীব্রতা স্তিমিত হয়ে আসে এবং তার পরিবর্তে জন্ম নেয় এক যথার্থ, শক্তিশালী আন্দোলন, লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের ইতিহাসে যা ‘Modernismo’ বলে খ্যাত। এর প্রধান প্রবক্তা নিকারাগুয়ার কবি রুবেন দারিয়ো (১৮৬৭-১৯১৬)। ১৮৮৮ সালে তাঁর নিরীক্ষাধর্মী গ্রন্থ ‘Azure’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হয় ‘Modernismo’ ধারার জয়যাত্রা। এই আন্দোলনের প্রধান ক্ষেত্র কবিতা হলেও কথাসাহিত্যেও তার প্রভাব অনুভূত হয় প্রবলভাবে। এর মূল অনুপ্রেরণাও ফরাসি সাহিত্য, তবে তার কলাকৈবল্যবাদী অংশটুকু। বস্তুত ‘মদার্নিজমো’ আন্দোলন আর কিছুই নয় শব্দের শুচিতা, প্রতীকের পরাকাষ্ঠা, ভাষার সঙ্গীতময়তা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, দৃশ্যগ্রাহ্য বর্ণনা, বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রবণতার সংমিশ্রণে গঠিত ইউরোপীয় বুর্জোয়া সাহিত্য-চিন্তারই লাতিন আমেরিকান সংস্করণ। তবে তার তাৎক্ষণিক জৌলুস, অভিনবত্ব, আপাত গভীরতা ও আঙ্গিকগত উৎকর্ষ প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পায় এবং লাতিন আমেরিকান সাহিত্যকে এর সম্পূর্ণ নতুন রূপান্তরের পথে নিয়ে যায়। এর প্রভাব এমন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যে খোদ স্পেনে গিয়ে লাগে তার ঢেউ এবং আধুনিক স্পেনীয় সাহিত্যরুচির অনেকটাই গড়ে ওঠে এই সুবাদে। এই ‘মদার্নিজমো’ আন্দোলনেরই ফসল আধুনিক লাতিন ছোটগল্পের জনক ওরাসিয়ো কিরোগা, যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি পরিবর্তিত লাতিন আমেরিকান বাস্তবতার সঙ্গেও নিজেকে চমৎকারভাবে মেলাতে সক্ষম হন। এই ‘মদার্নিজমো’ আন্দোলনেরই আরেকটি অংশ ব্রাজিলে ‘Vanguardist Movement’ নামে কাজ করে যেতে থাকে, তবে তাদের প্রধান ক্ষেত্র হয় চিত্রকলা। জার্মান এক্সপ্রেশনিজম, ফরাসি সুররিয়ালিজম ও কিউবিজম-এর প্রভাবে তা অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠে। ফলে অচিরেই ১৯৩০-এর দশকে এই আন্দোলন তার তীব্রতা হারায় এবং অনেকটা যেন বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া স্বরূপই শুরু হয় এক ধরনের স্থানীয় সাহিত্যের চর্চা, ঐতিহাসিকেরা যার নাম দিয়েছেন ‘Regionalism’। এর মূল বক্তব্য বহির্মুখী দৃষ্টির বদলে নিজের দিকে ফিরে তাকানো। অচেনা, অনাত্মীয় বিদেশী বাস্তবতার অনুকরণ না করে নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সাহিত্য নির্মাণ। এরই স্থানীয় নাম ‘Criollismo’। ‘Criollo’ শব্দের অর্থ খাঁটি লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভূত। অর্থাৎ লাতিন আমেরিকার নিজস্ব বংশধরদের নিজস্ব জীবনচর্যা, আশা-আকাক্সক্ষাকে তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে তার উপযোগী এক নিজস্ব ভাষা ও রীতিতে সাহিত্য রচনার ধারারই নাম ‘Criollismo’। ইতোমধ্যে মেহিকান বিপ্লব ঘটে গেছে। তাকে কেন্দ্র করে সমগ্র মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় জেগে ওঠে প্রবল স্বাজাত্যবোধ। তারই প্রতিফলন ‘Regional’ সাহিত্যের তৎকালীন বিকাশ ও জনপ্রিয়তা। এই ধারার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মধ্যে ছিলেন বেনেসুয়েলার রমুলো গায়েগোস (১৮৮৪-১৯৬৯), ইকুয়েদরের হোর্হে ইকাজা (১৯০৬-১৯৭৮), আর্হেন্তিনার মানুয়েল রোহাস্ (১৮৯৬-১৯৭৩) ও মেহিকোর মারিয়ানো আসুয়েলা (১৮৭৩-১৯৫২)। এঁদের অধিকাংশের উপজীব্য বিষয় ছিল প্রধানত আদিবাসী চাষাদের সঙ্গে উপনিবেশ স্থাপনকারী ও শাদা চামড়ার প্রভুদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ, কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের ব নার ইতিহাস এবং এ-জাতীয় প্রত্যক্ষ লাতিন আমেরিকান বাস্তবতা। আর আঙ্গিকেও এঁরা সচেতনভাবে আ লিক ভাষা, প্রকাশভঙ্গি ও অন্যান্য লোকজ উপকরণের সফল প্রয়োগ ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে কিছুদিনের জন্য এই ধারাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ইতোমধ্যে স্পেনের গৃহযুদ্ধে (১৯৩৬-১৯৩৯) স্প্যানিশ রিপাবলিকের পরাজয় ঘটে এবং অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবী স্বেচ্ছা-নির্বাসনে আসেন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। ‘Criollismo’-র সুবাদে ফরাসি প্রীতির অবসান হয়েছিল, এবারে ঘটে মাদ্রিদ-মুখিতার অবলুপ্তি। এরই মধ্যে বেজে ওঠে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দামামা। যুদ্ধ শেষে বহু ইউরোপীয় পরিবার দেশান্তরী হয়ে আশ্রয় নেন এই মহাদেশে, যার মধ্যে বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের সংখ্যাই বেশি। ফিরে আসেন মাদ্রিদ ও পারিবাসী অনেক প্রবাসী লাতিন আমেরিকান লেখকও। সামন্তবাদ ও আভিজাত্যবাদ-এর পরিবর্তে ক্রমে গণতন্ত্রায়নের সুবাদে একদিকে যেমন বুর্জোয়া বিলাসিতায় ভাটা পড়ে, সেইসঙ্গে তা একশ্রেণির লেখকের ইউরোপমনস্কতায়ও বাদ সাধে। নতুন প্রজন্মের লেখকেরা বরং নিজেদের শেকড় থেকেই খুঁজে নিতে চান আধুনিকতার প্রাণরস। এইভাবে ১৯৪০-এর পর থেকেই প্রকৃত অর্থে লাতিন আমেরিকান সাহিত্য স্বনির্ভর ও প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন মূল্যবোধ তাকে করে তোলে আধুনিক ও আত্মবিশ্বাসী। নগরযন্ত্রণা, মনোসমীক্ষণ, চেতনাপ্রবাহ, স্বগত সংলাপ, আঙ্গিকের জটিলতা ও বিশ্ববীক্ষার জটিল রসায়নে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে ক্রমশ ফুটে ওঠে এক নতুন চরিত্র, আর্হেন্তিনার হোর্হে লুইস বোর্হেস যার প্রধান স্থপতি। 

১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় বোর্হেসের গল্পগ্রন্থ ‘Ficciones’, লাতিন আমেরিকান গল্পের অভিজ্ঞতায় যা এক সম্পূর্ণ নতুন সংযোজন। একাধারে কবি ও প্রাবন্ধিক বোর্হেস তাঁর এই গল্পসমূহে বাস্তবতার প্রচলিত সংজ্ঞাকে অস্বীকার করেন, গল্পের সরল কাঠামোকে দুমড়ে-মুচড়ে তার মধ্যে স্বপ্ন-কল্পনার উপাদান মিশিয়ে দেন যথেচ্ছভাবে, শাদাকালো সমাজ জিজ্ঞাসার পরিবর্তে জীবন ও অস্তিত্ব বিষয়ে গূঢ় দার্শনিকতার অবতারণা করেন এবং এইভাবে নতুনত্বের আকাক্সক্ষায় উদ্বেল লাতিন আমেরিকার শিক্ষিত, সচেতন পাঠক ও লেখকগোষ্ঠীকে জয় করে নেন দ্রুত। লাতিন আমেরিকার এই সময়ের সাহিত্যে ফকনার, জয়েস, কাফকা, বেকেট, সার্ত্রর সামগ্রিক প্রভাবের চেয়ে বোর্হেসের একক প্রভাব অনেকগুণ বেশি। যে কারণে তাদের বর্তমান সাহিত্য মননে পাশ্চাত্যের কাছাকাছি হলেও আত্মায় এখনো দেশকালের অনুবর্তী। বোর্হেসের সমসাময়িক দুই লেখক কুবার আলেহো কার্পেন্তিয়ের (১৯০৪-১৯৮০) ও গুয়াতেমালার মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস (১৮৯৯-১৯৭৪)। স্বদেশে কিছুকাল সাহিত্যচর্চার পর রাজনৈতিক কারণে দুজনকেই বেশ কিছুকাল পারিতে কাটাতে হয়। উল্লেখ্য, বোর্হেসও তাঁর যৌবনের একটা বড় অংশ ইউরোপে অতিবাহিত করেন। তো কার্পেন্তিয়ের ও আস্তুরিয়াস পারিতে থাকাকালীন সেখানকার সুররিয়ালিস্ট গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসেন এবং তাদের প্রভাবে নিজেদের মননে নির্মাণ করে নেন বাস্তবতার এক ভিন্ন সংজ্ঞা যার সঙ্গে বহিঃপরিবেশের চেয়ে বেশি আত্মীয়তা অন্তর্লোকের, প্রামাণিকতার চেয়ে জরুরি চেতন-অবচেতনের দ্বন্দ্ব ও বিশ্লেষণ, স্বপ্ন-কল্পনার সংশ্লেষণ। লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের উল্লেখমাত্রই প্রথমে যে শব্দবন্ধের কথা মনে পড়ে সেই ‘ম্যাজিকাল বা ম্যাজিক রিয়েলিজম’-এর ‘ম্যাজিক’ অংশের প্রথম প্রণোদনা আসে বোর্হেস এবং উল্লিখিত সাহিত্যিকদ্বয়ের সুররিয়ালিস্ট সংস্রব থেকেই। যদিও পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকার নিজস্ব পরাবাস্তব ভূ-প্রকৃতি রাজনীতির অবিশ্বাস্য, ঐন্দ্রজালিক উত্থান-পতন, পুরাণ ও লোককথার গোলকধাঁধা, তীব্র আবেগের চড়াসুরে বাঁধা জনমানসের কল্পনাবিলাস, অসংখ্য নাটকীয় উপাদানে ভরা, বিভিন্ন পরস্পর-বিরোধী ঘটনায় আকীর্ণ প্রায় গল্পের মতো জীবনযাপন ইত্যাদি বহুবিধ সত্যের প্রত্যক্ষ অভিঘাতে তাঁদের সেই ম্যাজিকপ্রীতি আরো সুদৃঢ় ও সংগঠিত হয়ে ওঠে, তার সঙ্গে যুক্ত হয় এক নিজস্ব, নতুন মাত্রা। ইতোমধ্যে স্বদেশে শুরু হয় স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন। কার্পেন্তিয়ের ও আস্তুরিয়াস দুজনেই দেশে ফিরে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁদের সাহিত্যে যুক্ত করে সমাজ ও সমকালীন চেতনার নতুন মাত্রা। এরই মধ্যে ১৯৫৯ সালে ঘটে যায় ঐতিহাসিক কিউবান বিপ্লব, লাতিন আমেরিকার রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে অদ্যাবধি যা বিপুলভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। লাতিন আমেরিকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রায় সকলেই কিউবান বিপ্লবকে সমর্থন ও সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন, কুবা ও কাস্ত্রো হয়ে উঠেছিল তাঁদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। কর্তাসার, মার্কেস, ফুয়েন্তেস ও য়োসার মতো পরবর্তীকালের খ্যাতনামা লেখকেরা এর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন তাঁদের সাংস্কৃতিক মুক্তি। বস্তুত কার্পেন্তিয়ের, আস্তুরিয়াস ও বোর্হেসের একক ব্যক্তিত্বের প্রভাব ও কিউবান বিপ্লবের সাফল্যের পরপরই লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে জেগে ওঠে এক আশ্চর্য পুনর্জাগরণের জোয়ার, যার সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ নামের এক সম্পূর্ণ নতুন সৃজনশীলতার ধারা, সামাজিকভাবে যে সাফল্যের নাম দেয়া হয় ‘Boom In Latin American Literature’ বলে। আক্ষরিক অর্থেই বিস্ফোরণের মতোই ব্যাপক ও তীব্রতায় ভরা এই সাহিত্যিক উৎসারণ, যার প্রধান ক্ষেত্র মূলত উপন্যাস হলেও ছোটগল্পের ভূমিকাও যেখানে একেবারে নগণ্য নয়। ষাটের দশকে পরপর কটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায় এবং লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্য উঠে আসে একেবারে বিশ্ব-মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৬১ সালে স্যামুয়েল বেকেটের সঙ্গে যৌথভাবে ‘International Publisher’s’ পুরস্কার পান বোর্হেস। একে একে প্রকাশিত হয় আলেহো কার্পেন্তিয়ের-এর ‘Explosion in a Cathedral' (১৯৬২), পারাগুয়াইয়ের লেখক আউগুস্তো রোয়া বাসতোস-এর ‘Son of Man’ (১৯৬০), আর্হেন্তিনার অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পকার হুলিয়ো কর্তাসার-এর আশ্চর্য উপন্যাস ‘Hopscotch’ (১৯৬৩), চিলের হোসে দোনোসোর ‘Coronacion’ (১৯৬৫), মেহিকোর কার্লোস ফুয়েন্তেস-এর ‘The Death of Artemiro Cruz’ (১৯৬৪), পেরুর মারিয়ো বার্গাস য়োসার ‘The Green House’ (১৯৬৬)। ১৯৬৭ সালের সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন প্রথম লাতিন আমেরিকান কথাসাহিত্যিক গুয়েতেমালার মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস, যাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক গল্পের সঙ্কলন ‘Weekend in Guatemala' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। সবশেষে ১৯৭০-এ প্রকাশিত হয় কলম্বিয়ার লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের অত্যাশ্চর্য উপন্যাস ‘One Hundred Years of Solitude’-এর ইংরেজি অনুবাদ। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে যায় বিশ্বজুড়ে; লেখক, পাঠক, সমালোচক, প্রকাশক সকলেরই অকুণ্ঠ প্রশংসা পায় তা এবং বিক্রিও হতে থাকে শনৈ শনৈ এবং তার পর থেকে অদ্যাবধি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য, বিশেষত গল্প, উপন্যাস বিশ্ব-সাহিত্যে সর্বোচ্চ সম্মানের আসন দখল করে আছে, বিশ্বব্যাপী পড়েছে তার প্রভাব, দেশে ও বিদেশে গড়ে উঠেছে ম্যাজিক রিয়েলিজম-এর অনুসারী তরুণ, প্রতিভাবান লেখকগোষ্ঠী।

লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের ‘বুম’ প্রজন্মের লেখকদের অধিকাংশ মূলত উপন্যাসকেই তাঁদের প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করলেও, পাশাপাশি ছোটগল্পেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। বস্তুত বর্তমানে বিশ্বসাহিত্যের সর্বাধিকসংখ্যক শিল্পোত্তীর্ণ ছোটগল্প লেখা হচ্ছে লাতিন আমেরিকাতেই। ছোটগল্পের এক বিশাল পাঠকগোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে সমগ্র লাতিন আমেরিকায়। লাতিন আমেরিকার প্রধান লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য প্রধানত গল্পই লিখেছেন। যেমন বোর্হেস, কর্তাসার, উরুগুয়াইর হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি, মেহিকোর হুয়ান রালফো, ব্রাজিলের ক্লারিস লিসপেক্তর। কর্তাসার-এর ‘End of the Game and Other Stories’ (১৯৬৭), ‘Blow Up & Other Stories’ (১৯৬৮) ও ‘Change of Light & Other Stories’ (১৯৭৪) গ্রন্থসমূহ লাতিন আমেরিকান ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন। কর্তাসার তীব্রভাবে সমাজসচেতন লেখক হলেও প্রধানত গল্পের আঙ্গিক, ভাষা ও স্টাইলের প্রতিই মনোযোগ দিয়েছেন বেশি। বস্তুত বোর্হেসের পরে গল্প-ভাষায় আধুনিকতার দীক্ষা পেয়েছেন লাতিন আমেরিকান লেখকেরা এই কর্তাসারের কাছ থেকেই সর্বাধিক। কর্তাসার-এর গল্পসমূহই আক্ষরিক অর্থে ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ ধারার বিশুদ্ধ ফসল। ওনেত্তির ‘A Dream Comes True’ গল্পগ্রন্থে মধ্যবিত্তের নগর জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা ও হুয়ান রুলফোর ‘Burning Plane & Other Stories’-এ মেহিকোর চাষীদের ব নার জীবন নিয়ে লেখা মানবতাবাদী গল্পসমূহ লাতিন আমেরিকার ছোটগল্পের অপর দুই উল্লেখযোগ্য ধারা। তবে মোটের ওপর ম্যাজিক রিয়েলিজম ঘরানারই প্রভাব এখন পর্যন্ত বেশি। ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কলম্বিয়ার ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস উপন্যাস লেখার পাশাপাশি ‘No One Writes to the Colonel & Other Stories’ (১৯৬২) ও ‘Innocent Erendira & Other Stories (১৯৭২)-এর মতো ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতাঘন অত্যাশ্চর্য গল্পের সঙ্কলনও উপহার দিয়েছেন। তেমনি, মেহিকোর লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসও লিখেছেন ‘Burnt Water & Other Stories’-এর মতো শক্তিশালী গল্পগ্রন্থ।

লাতিন আমেরিকান কথাসাহিত্যের এইসব দিকপালের ঐতিহ্য অনুসরণ করেই একান্তভাবে লাতিন বাস্তবতার উপযোগী ভাষা ও আঙ্গিকে একের পর এক শিল্পশোভন সমাজসচেতন উন্নতমানের সাহিত্য রচনা করে চলেছেন পরবর্তী প্রজন্মের লেখকেরা, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, চিলের ইসাবেল আয়েন্দে (১৯৪২), নিকারাগুয়ার সের্হিয়ো রামিরেস (১৯৪২), পুয়ের্তোরিকোর রোসারিও র্ফেরে (১৯৪২), উরুগুয়াইয়ের ক্রিস্তিরা পেরি রোসি (১৯৪১) এবং এদোয়ার্দো গালেয়ানো (১৯৪০), চিলের আন্তোনিয়ো স্কারমেতা (১৯৪০), পেরুর আলফ্রেদো ব্রিসে এচেনিকে (১৯৩৯), মেহিকোর হোসে এমিলিও পাচেকো (১৯৩৯) আর্হেন্তিনার লুইসা বালেনসুয়েলা (১৯৩৮) ও কুবার সেবেরো সার্দুই (১৯৩৭) প্রমুখ।


তীব্র সমাজসচেতনতা, প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ব্যাপক পড়াশোনা, ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পৃক্তি, আধুনিক আঙ্গিক সচেতনতা ও অনবদ্য ভাষারীতির স্বর্ণ সম্মিলনে রচিত লাতিন আমেরিকার বর্তমান কথাসাহিত্য, যার উল্লেখযোগ্য অংশই ছোটগল্প, সমগ্র বিশ্বের আধুনিক, প্রগতিশীল লেখকদের কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও প্রেরণাবিশেষ, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। 





নোট.
‘জাদুবাস্তবতার গাথা: লাতনি আমরেকিার গল্প’ শীর্ষক সম্পাদিত গ্রন্থের ভূমিকা


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন