ইভান সের্গেইয়েভিচ তুরগ্যেনেভের গল্প : জেলা চিকিৎসক


অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

শরতকালের এক সন্ধেবেলা প্রত্যন্ত একটি এলাকা থেকে ফেরার পথে ঠাণ্ডা লেগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। ভাগ্য ভালো যে জ্বর বাধালাম জেলা সদরের একটি সরাইখানায় পৌঁছনোর পরে। একজন ডাক্তারকে ডেকে আনতে বললাম। আধঘন্টার মধ্যেই জেলা চিকিৎসক চলে এলেন। মাঝারি উচ্চতার রোগা মানুষ একজন; কালো চুল। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার প্রচলিত বড়ি লিখে দিলেন, একটি সরষের পুলটিস চড়াতে বললেন, দক্ষতার সঙ্গে পাঁচ রুবলের একটি নোট আস্তিনে গুটিয়ে রাখলেন, তারপর অন্যদিকে ফিরে শুকনো কেশে আসন ছেড়ে বাড়ি যাবার উপক্রম করতে না করতেই কীভাবে যেন আলাপচারিতায় মশগুল হয়ে থেকে গেলেন। জ্বর জ্বর ভাব নিয়ে ক্লান্তই বোধ করছিলাম। রাতটা হয়তো অনিদ্রায় কাটাতে হবে, একজন হাসিখুশি সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে বেশ ভালোই লাগল। চায়ের আয়োজন করা হলো। ডাক্তারবাবু মন খুলে কথা বলতে লাগলেন। বিচক্ষণ মানুষ; রসস্নিগ্ধ এবং প্রাণচঞ্চলতার সাথে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। আজব সব ঘটনা ঘটে যায় পৃথিবীতে। কত মানুষ আছেন, যাঁদের সঙ্গে জীবনের অনেকটা সময়ই কেটে যায়, অথচ তাঁদর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার আগ্রহবোধই হয় না। আবার এমন মানুষও আছেন যাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সময়টুকুও ঠিক মতো জোটে না, অথচ স্বল্প আলাপের পরই বাঁধ ভেঙে মনের কথা বেরিয়ে আসে – হয় আমার মনের কথা ওঁর কাছে – নয়তো ওঁর মনের কথা আমার কাছে। সযত্নে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো – আমরা যেন স্বীকারোক্তি দিচ্ছি। এই নতুন বন্ধুটির আস্থা কীভাবে অর্জন করেছিলাম জানা নেই – তবে এর ফলশ্রুতি স্বরূপ – একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা আমাকে বললেন। আমার অনুকূল পাঠকদের জন্য সেই কাহিনীটি আমি বলতে চাই। কাহিনীটি ডাক্তারবাবুর নিজের ভাষায় বলার চেষ্টা করব।

‘আপনি হয়তো জানেন না,’ দুর্বল, কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে আরম্ভ করলেন (নিঃসন্দেহে বিশুদ্ধ বেরেজ়োভ নস্য নেওয়ার অভ্যাসের পরিণাম), ‘এখানকার জজ সাহেব, মিলভ পাভেল লুকিচকে চেনেন? ... চেনেন না ওঁকে? ... বেশ তো, না জানলেও চলবে,’ (গলা খাঁকারি দিলেন, চোখ কচলে নিলেন।) ‘যাই হোক, যে ঘটনার কথা আপনাকে বলতে যাচ্ছি – আমার ভালো করেই মনে আছে – সেই ঘটনা ঘটেছিল লেন্টে, ঠিক বরফ গলার সময়েই। আমি ওঁর গৃহেই উপস্থিত ছিলাম – মানে সেই জজ সাহেবের গৃহে – তাস খেলছিলাম। ভারি ভালো মানুষ ছিলেন জজ সাহেব, তাস খেলতে খুবই ভালবাসতেন। হঠাৎ’ (বার বার হঠাৎ কথাটা বলা ডাক্তারবাবুর মূদ্রাদোষই বলতে পারেন।) ‘ওরা আমাকে বললেন, “একজন ভৃত্য আপনার খোঁজ করছে”, আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী দরকার ওর?’ওঁরা বললেন, একটা চিরকুট নিয়ে এসেছে – নিশ্চয়ই কোনও রুগির কাছ থেকেই নিয়ে এসেছে’ ‘তাহলে চিরকুটটা দিন আমাকে’, আমি বললাম। তার মানে রুগির কাছ থেকেই এসেছে – ভালো কথা – বোঝেনই তো – আমাদের রুজি রোজগারের সওয়াল ... ব্যাপারটা এই রকম: একজন ভদ্রমহিলা, বিধবা, আমাকে লিখেছেন। তিনি বলছেন, “আমার মেয়ে মৃত্যুশয্যায়। ঈশ্বরের দোহাই, আপনি একবার আসুন!” উনি আরও লিখেছেন, “আপনার আসার জন্য ঘোড়া পাঠিয়েছি” ... সে তো ভালো কথা। কিন্ত উনি যে থাকেন শহর থেকে কুড়ি মাইল দূরে, এই মাঝরাতে বেরোতে হবে, আর রাস্তার অবস্থাও তো কহতব্য নয়, বিশ্বাস করুন! তাছাড়া ভদ্রমহিলা নিজেও তো সচ্ছল নন, রৌপ্য মুদ্রায় বড়জোর দুটো রুবল পাওয়া যাবে – সেটাও পাওয়া যাবে কিনা জানি না। পারিশ্রমিক হিসেবে হয়তো কাপড়ের একটা থান আর এক বস্তা ওটমিলই পাওয়া যাবে। আর বোঝেনই তো কর্তব্যবোধের দায় – একটি প্রাণী মরতে বসেছে। হাতে ধরা তাসগুলো কাল্লিওপিনের – প্রাদেশিক কমিশনের সদস্য উনি – ওঁকে ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। দেখলাম, নড়বড়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি সিঁড়ির পাশে দাঁড় করানো, চাষবাসে কাজে লাগানো দুটো ঘোড়া জোতা – মোটা – ভীষণ মোটা ঘোড়া – শতছিন্ন জিন চাপানো – কোচোয়ান বসে আছে, সৌজন্যবশত টুপিটা হাতে ধরা। তার মানে, মনে মনে ভেবে নিলাম, “বোঝাই গেল বন্ধু, আমার এই সব রুগিরা রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়নি” ... হাসছেন তো – তাহলে বলি আপনাকে – আমার মতো গরীব মানুষকে এই সব কিছুই হিসেবের মধ্যে রাখতে হয় ... কোচোয়ান যদি ফুলবাবুর মতো মুখ করে বসেই থাকত, টুপিটা মাথা থেকে নামাতোই না – এমনকি আপনাকে দেখেই দাড়িগোঁপের আড়ালে হাসি লুকোতো আর চাবুকটা ঘন ঘন হাঁকাতো – তাহলে নির্দ্বিধায় ছয় রুবলের প্রাপ্তির আশা করতেই পারতেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে, যেটা চোখের সমনে দেখছি, বেশ অন্য রকম গন্ধ পাচ্ছি। তবুও মনে হলো, এটা এড়িয়ে যাবার কোনও উপায় নেই। কর্তব্যবোধকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো উঠিয়ে নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে তো? সবে ওখানে গিয়ে পৌঁছেছি। রাস্তার বীভৎস অবস্থা। ঝর্ণা, তুষার, নালা আর হঠাৎ একটা বাঁধ ভেঙে পড়ল! সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার! যাই হোক, শেষমেশ পৌঁছে গেলাম। কাঁচা, ছোট্ট একটা কুঁড়ে। জানলা থেকে আলোর শিখা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। একজন বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা হলো। বেশ সম্ভ্রান্ত একটি টুপি পরে আছেন। “ওকে বাঁচান!” বললেন উনি। “এখনতখন অবস্থা ওর!” আমি বললাম, ‘দয়া করে ব্যাকুল হবেন না – রোগিণী কোথায়?” “এদিকে আসুন।” ছোট, পরিচ্ছন্ন একটি ঘরে এলাম। ঘরের কোণে একটা ল্যাম্প জ্বলছে। বিছানায় বছর কুড়ির একটি মেয়ে শুয়ে আছে, অচেতন। গা পুড়ে যাচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী। জ্বরে বেহুঁশ। ঘরে আরও দুটি মেয়ে – ওরই বোন হবে – ভয়ার্ত, চোখে জল। “কালকে,” ওরা আমাকে বলল, “ও পুরোপুরি সুস্থ ছিল, খিদেও ভালোই ছিল। আজ সকালে মাথা ঘোরাচ্ছে বলল, আর এই সন্ধেবেলা, হঠাৎ কী যে হলো, দেখতে তো পাচ্ছেনই।” আবার বললাম, “দয়া করে অস্থির হবেন না।” সান্ত্বনা দেওয়া ডাক্তারের কর্তব্য, বুঝতেই পারছেন – আমি ওর পাশে গিয়ে কিছুটা রক্ত বের করে দিলাম। সরষের পুলটিশ চড়াতে বললাম। তাছাড়া একটা মিক্সচারের কথা লিখে দিলাম। তার মধ্যে আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম – দিব্যি করে বলছি! এই রকম একটা মুখ জীবনে আর দেখিনি! এক কথায় বলা যেতে পারে – মেয়েটি পরমাসুন্দরী! অনুকম্পায় মন বিগলিত হয়ে উঠল। এমন মিষ্টি চেহারা, এত মায়াবী চোখ! ... ঈশ্বরের অসীম করুণা! ও সহজ হয়ে উঠল। ঘাম দিলো। মনে হলো জ্ঞান ফিরেছে, চার পাশে তাকিয়ে দেখল, হাসল, তারপর মুখের ওপর হাত বোলালো। বোনেরা ওর ওপর ঝুঁকে পড়ল। “কেমন লাগছে এখন?” জিগ্যেস করল ওরা। “ঠিকই” বলে অন্যদিকে ফিরে শুল। তাকালাম ওর দিকে। ঘুমিয়ে পড়েছে। “বেশ,” আমি বললাম, “এবার রোগিণীকে একলা থাকতে দিন।” অতএব আমরা পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। একজন পরিচারিকা কেবল থেকে গেল – যদি দরকার পড়ে। বৈঠকখানায় টেবিলের ওপর একটা সামোভার রাখা, আর এক বোতল রাম। আমাদের পেশায় এটি না থাকলেই নয়। ওরা আমার জন্য চা নিয়ে এল। রাত্রে থেকে যাবার অনুরোধ করল ... রাজি হয়ে গেলাম। এত রাতে যাবই বা কোথায়? বৃদ্ধা কাতরাতে কাতরাতে জিগ্যেস করতে লাগলেন, “কী হয়েছে?” বললাম, “ও সেরে উঠবে। উদ্বিগ্ন হবেন না। বরং একটু বিশ্রাম করে নিন। রাত দু’টো বাজতে চলেছে।” “কিন্তু কিছু যদি ঘটে যায়, আপনি কাউকে পাঠাবেন তো আমাকে জাগানোর জন্য?” “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।” বৃদ্ধা চলে গেলেন। মেয়ে দু’জনও নিজেদের ঘরে চলে গেল। বৈঠকখানায় আমার জন্য বিছানা করে দিয়ে গেল। যাই হোক, আমি গিয়ে শুয়ে পড়লাম – কিন্তু কি আশ্চর্য, ঘুম এলই না! অথচ খুবই ক্লান্ত ছিলাম। রোগিণীর কথা মাথা থেকে সরাতেই পারলাম না। শেষমেশ আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। আমি উঠে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, “একবার গিয়ে দেখেই আসি আমার রোগিণী কেমন আছে।” বৈঠকখানার পাশেই ওর শোবার ঘর। যাই হোক, নেমে গিয়ে খুব সন্তর্পণে দরজা খুললাম। বুক ধুকপুক করছে! ভেতরে তাকালাম। পরিচারিকাটি ঘুমে কাদা, মুখ হা করে, এমনকি নাকও ডাকছে, হতভাগীর! কিন্তু রোগিণী আমার দিকে মুখ করে শুয়ে, হাতদুটি ছড়ানো। আহা, বেচারি! ওর দিকে এগিয়ে গেলাম ... সহসা মেয়েটি চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল! “কে উনি? উনি কে?” আমি থতমত খেয়ে গেলাম। “ভয় পাবেন না, ম্যাম,” বলে উঠলাম, “আমি ডাক্তার। এখন কেমন আছেন আপনি, দেখতে এসেছি।” “আপনিই ডাক্তারবাবু?” “হ্যাঁ, আমিই ডাক্তার। আপনার মা আমাকে শহর থেকে ডেকে এনেছেন। আমরা আপনার শরীর থেকে কিছু রক্ত বের করে দিয়েছি, ম্যাম। এখন আপনি ঘুমোনোর চেষ্টা করুন। ঈশ্বরের আশীর্বাদে, এক কি দু’দিনের মধ্যেই আপনাকে আমরা সারিয়ে তুলব।” “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু, আমাকে মরতে দেবেন না – দয়া করুন, আমাকে মরে যেতে দেবেন না।” “এরকম কথা বলছেন কেন? প্রার্থনা করি, ঈশ্বর আপনাকে ভালো করে তুলুন!” নিশ্চয়ই আবার জ্বরটা বেড়েছে, মনে মনে ভাবলাম। নাড়ি পরীক্ষা করলাম। ঠিকই ধরেছি, জ্বর বেড়েছে। মেয়েটি আমার পানে তাকাল। তারপর আমার হাতটি চেপে ধরল। “বলি আপনাকে ... কেন আমি মরতে চাই না। বলছি আপনাকে ... আমরা দু’জনে ঘরে একলাই রয়েছি, কেবল, দয়া করে ... কাউকে কিছু বলবেন না ... একটু কাছে আসুন ...” আমি ঝুঁকে পড়লাম। ওর ঠোঁটদুটো একেবারে আমার কানের কাছে চলে এলো। কেশরাশি দিয়ে আমার কপোল স্পর্শ করতে লাগল। স্বীকার করতেই হবে মাথা ঘুরতে লাগল আমার। ও ফিসফিস করে কিছু বলতে লাগল – একটি কথাও আমার বোধগম্য হলো না ... প্রলাপ বকছে ও! ফিসফিস করে বলে যেতেই লাগল – এত দ্রুত বলে চলল –যেন রুশ ভাষাতেই কথা বলছে না। অবশেষে কথাবলা সাঙ্গ হলো – কাঁপতে কাঁপতে মাথাটা বালিশে নেমে এলো। শাসনের ভঙ্গীতে আঙ্গুল তুলে বলে গেল, “কাউকে বলবেন না, ডাক্তারবাবু, মনে রাখবেন কিন্তু।” অনেক কষ্টে ওকে শান্ত করলাম। পান করার মতো কিছু ওকে দিলাম। পরিচারিকাকে ঘুম থেকে তুলে, আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।

এই পর্যন্ত বলে ডাক্তারবাবু আবার নস্যি নিলেন – বেশ উত্তেজনাসহ। মনে হলো নস্যির প্রভাবে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য।

“যাই হোক,” আবার বলতে আরম্ভ করলেন, “পরের দিন, আমার প্রত্যাশার বিরুদ্ধে, রোগিণীর অবস্থার কোনও রকম উন্নতি হলো না। আকাশপাতাল ভাবতে লাগলাম। আচমকা ঠিক করে ফেললাম, এখানেই থেকে যাব, যদিও অন্যান্য রোগীরা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন ... বুঝতেই পারছেন, এই ব্যাপারটা মোটেই উপেক্ষা করা যায় না ... এরকম কিছু করলে পসার মার খাবে। তবু বলি, প্রথমত, এই রোগিণীটি বাস্তবিকই বিপদাপন্ন। দ্বিতীয়ত, আসল কথাটা কবুল করেই নিই, মেয়েটি আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করছে। তদুপরি, পরিবারটির প্রত্যেককেই আমার ভালো লেগে গেছে। এঁরা দরিদ্র হতে পারেন, কিন্তু পরিবারটি যে সংস্কৃতিবান, সেটি মানতেই হবে... এঁদের পিতৃদেব পণ্ডিত মানুষ ছিলেন, একজন গ্রন্থকার। অবশ্যই দারিদ্র্যের মধ্যে মারা গেছেন, কিন্তু মৃত্যুর আগে সন্তানসন্ততির জন্য চমৎকার শিক্ষার বন্দোবস্ত করে যেতে পেরেছিলেন। অনেক বইও রেখে গেছেন। আন্তরিকভাবে অসুস্থ মেয়েটির চিকিৎসা করছিলাম বলেই হয়তো, কিংবা অন্য কোনও কারণেই হয়তো – আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি – ওঁরা সকলেই আমাকে পরিবারের একজন মনে করেই স্নেহ করতেন ... ইতোমধ্যে শহরে যাবার রাস্তাটি আরও শোচনীয় হয়ে উঠল। বলতে গেলে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল – এমনকি শহর থেকে ওষুধ আনানোও কঠিন হয়ে পড়ল ... অসুস্থ মেয়েটির অবস্থার উন্নতিও হচ্ছিল না ... একটির পর একটি করে সিন চলে যাচ্ছিল – কিন্তু – এখানে – ” (ডাক্তারবাবু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।) “কথাটা কীভাবে আপনাকে বলব, বুঝে উঠতে পারছি না ...” (আবার নস্যি নিলেন, গলা খাঁকারি দিলেন, এক চুমুক চা খেলেন।) “অযথা ভণিতা না করে – সোজাসুজিই কথাটা বলে ফেলি। আমার রোগিণী – কী বলি?...ও আমার প্রেমে পড়ে গেছিল ... ঠিক তা নয়, ঠিক প্রেমে পড়েছিল বলা যায় না – তবে ... কীভাবে বলি?” (ডাক্তারবাবু লজ্জারুণ মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।) “উহুঁ,” দ্রুত লয়ে বলে চললেন, “প্রেমই বটে! নিজেকে নিয়ে পুরুষমানুষের অহেতুক উচ্চ ধারণা পোষণ করা মোটেই কাম্য নয়। মেয়েটি শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী এবং বই পড়তে ভালবাসে। আর আমি তো লাতিন ভাষা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছি। নিজের চেহারা নিয়ে,” (ডাক্তারবাবু সামান্য হেসে নিজের দিকে তাকালেন) “সেটি নিয়েও গর্ব করার মতো কিছু নেই। তবে পরমেশ্বরের কৃপায় আমি অর্বাচীন নই। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলেই চিনতে পারি। দু’চারটে ব্যাপার সহজেই বুঝতে পারি আমি। যেমন ধরুন, আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা – সেটাই ওর নাম – আমার প্রেমে পড়ে যায়নি, তবে আমার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ কিংবা সম্মানজনক বা অন্য কোনও ধরণের অনুভূতি ছিল। যদিও আমার মনে হয়, নিজের অনুভূতি সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। তবে নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই ওর অনুভূতির স্বরূপটি অনায়াসে বুঝে নেওয়া যায়। তবে,” (ডাক্তারবাবু এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো অসংলগ্নভাবে বলে যাচ্ছিলেন, সলজ্জে আরও কয়েকটি কথা যোগ করলেন) “খুবই এলোমেলোভাবে বলে চলেছি – আপনি হয়তো ঠিক মতো বুঝতে পারছেন না – তাই আপনার অনুমতি নিয়ে গুছিয়ে সব কথা বলি আপনাকে।”

এক গ্লাস চা পান করে শান্ত হয়ে উনি বলতে আরম্ভ করলেন।

“ঠিক আছে, বলি তাহলে। আমার রোগিণীর অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হতে লাগল। আপনি তো চিকিৎসক নন, তাই যখন ডাক্তার বেচারা বুঝতে পারেন রোগীকে সারিয়ে তোলার ক্ষমতা ক্রমশ ওর হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন ওর মনের দশা কী হয় সেটা আপনি বুঝতে পারবেন না। কোথায় হারিয়ে গেল ওর আত্মবিশ্বাস? সহসা যায় না। আপনার মনে হতে থাকে, যা জানতেন সবই ভুলে গেছেন। অন্যেরা লক্ষ করতে থাকে যে আপনি কতটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন। রোগীও আপনার ওপর আর ভরসা রাখতে পারেন না। রোগের উপসর্গগুলি নিতান্ত অনিচ্ছুকভাবে জানায় আপনাকে। আড়চোখে আপনার দিকে তাকায়, কানাকানি করে বলে ... উফ! কী ভয়ানক ব্যাপার! এই রোগের চিকিৎসা নিশ্চয়ই আছে, খুঁজে যদি বের করা যায়। তাই নয় কি? চেষ্টা করছ তুমি – কিন্তু না – খুঁজে পাচ্ছ না! ওষুধ দিয়েও সেটি কার্যকরী হবার জন্য যথেষ্ট সময় দিচ্ছ না। একবার একটি ওষুধ দিলে – তারপরেই আবার অন্য কোনও ওষুধ। একবার চিকিৎসাবিধানের একটি বই খুলে বসলে – এই তো পেয়েছি, তুমি ভাবলে! মাঝে মাঝে, ভগবানের নাম নিয়ে একটি বিধান বাছাই করে নিলে – লাগে তুক ... না লাগে তাক ... ইতোমধ্যে একটি মানুষ কিন্তু মরতে বসেছে, আর কোনও ডাক্তার হলেই বাঁচিয়ে দিতে পারতেন। “আরেকজন ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই,” শেষমেশ বলেই ফেললে, “পুরো দায়িত্বটাই একার ঘাড়ে চাপাতে পারব না।” আর এই কথা বলার সময় কী বোকা বোকাই না লাগবে তোমাকে! যাই হোক, আস্তে আস্তে সইয়ে নিতে শিখে যাবে, কোনও ব্যাপারই নয়। একটি মানুষ মারা গেছে – তোমার দোষও তো নয়! ডাক্তারি শাস্ত্র মেনেই তো তুমি ওর চিকিৎসা করেছ! তবে এই সব হীনমন্যতার থেকেও যে ব্যাপারটা তোমাকে আরও বেশি যন্ত্রণা দেবে সেটা হলো যে ওঁরা তোমাকে অন্ধের মতো ভরসা করেন, আর তোমার মনটা খচ খচ করবে, ওঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারছ না। আর আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই অন্ধভাবে আমাকে ভরসা করে বসে আছেন। ওঁরা ভুলেই গেছেন যে ওঁদের কন্যা ভয়ানক বিপদের মধ্যে রয়েছে। আর নিজের পক্ষ থেকে আমিও ওঁদের আশ্বস্ত করে যাচ্ছিলাম যে খুব গুরুতর কোনও ব্যাপারই নয়। অথচ ভেতরে ভেতরে ক্রমশ আমি হতাশায় ভেঙে পড়ছি। তার ওপরে আমাদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে রাস্তার দশা এতটাই সঙ্গিন হয়ে উঠেছে যে ওষুধ নিয়ে আসতে কোচোয়ানের সারাটা দিনে লেগে গেল। রোগিণীর ঘর ছেড়ে আমি এক পলকের জন্যও বেরোইনি। বেরিয়ে আসতে পারছিলাম না। ওকে মজার মজার গল্প শোনালাম। তাস খেললাম। সারারাত ধরে বিছানার পাশে বসে ওকে নজরে রাখলাম। অশ্রুসজল নয়নে বৃদ্ধা মা কৃতজ্ঞতা জানালেন। কিন্তু আমি মনে মনে বলতে লাগলাম, “আমি মোটেই আপনার কৃতজ্ঞতার যোগ্য নই।” খোলাখুলি বলি আপনাকে – আজ কথাটা গোপন রাখার কোনও মানেই হয় না – আমি আমার রোগিণীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। আর আলেকসান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনাও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছিল। আমি ছাড়া আর কাউকেই ওই ঘরে আসতে দিত না। আমার সঙ্গে গল্প করতে আরম্ভ করল। আমার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে চাইত – আমি কোথায় পড়াশোনা করেছি, আমার আত্মীয়স্বজন কারা – যাঁদের সঙ্গে আমি দেখা করতে যাই – আমি কী ধরণের জীবনযাপন করি। আমার মনে হয়েছিল, ওকে এত কথা বলতে না দেওয়াই মঙ্গল। কিন্তু ওকে কথা বলতে নিষেধ করার ব্যাপারে – একটু কড়া করে নিষেধ করার ব্যাপারে – বুঝতেই পারছেন, কিন্তু আমি শক্ত হতে পারতাম না। মাঝে মাঝে মাথায় হাত দিয়ে বসে মনে মনে নিজেকেই তিরস্কার করতাম, “কী করছ তুমি, এক নম্বরের পাজি লোক তুমি!” ... আমার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ আঁকড়ে ধরে থাকত। সতৃষ্ণ নয়নে অনেকক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্য দিকে ঘুরে যেত। বলত, “আপনি কত ভালো!” জ্বরে ওর হাতদুটো পুড়ে যাচ্ছে। চোখদুটো ছলছল করছে। “সত্যি বলছি,” মেয়েটি আবার বলল, আপনি খুবই স্নেহশীল, ভালো একজন মানুষ। আমাদের প্রতিবেশীদের মতো আপনি নন ... এতদিন আপনাকে চিনতাম না কেন!” “আপনি শান্ত হোন, আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা,” বললাম আমি ... “আমার বিশ্বাস, কীভাবে এই বিশ্বাস আমার হলো, জানি না আমি ... তবুও আপনি শান্ত হোন ... সব ঠিক হয়ে যাবে, আপনি আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন।” “এখানে কথাটা আপনাকে বলে দেওয়াই ভালো,” ডাক্তারবাবু সামনে ঝুঁকে পড়ে বড় বড় চোখ করে বলে চললেন, “ওঁরা প্রতিবেশিদের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করতেন না। নিম্নশ্রেণির মানুষেরা ওঁদের সমকক্ষ ছিলেন না আর বিত্তশালী মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে ওঁদের মর্যাদায় আঘাত লাগত। সত্যি বলতে কি ওঁরা ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতিবান একটি পরিবার। বুঝতেই পারছেন, আমি শ্লাঘা বোধ করতাম। মেয়েটি কেবলমাত্র আমার হাত থেকেই ওষুধ নিত ... বেচারি ... কোনও রকমে আমার সাহায্য নিয়ে উঠে বসত – সাহায্যও নিত ... আর আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে ... মনে হতো আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ক্রমশ ওর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে চলেছিল – সময়ের সঙ্গে ওর অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল। মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। ও মরেই যাবে, ভাবনাটা আমাকে গ্রাস করে ফেলল। বিশ্বাস করুন, আমারও বাঁচবার ইচ্ছেটাও হারিয়ে ফেললাম। ওর মা, ওর বোনেরা, সবাই আমার ওপর ভরসা করে আছেন, আমার চোখের দিকে তাকাতেন ... ধীরে ধীরে আমার প্রতি ওদের ভরসাও ক্ষীণ হতে লাগল। “আচ্ছা? কেমন দেখছেন ওকে?” “হ্যাঁ, ঠিকই আছে, ভালো আছে ও!” “ভালোই আছে, বটে!” আমি নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! যাই হোক, একদিন রাতে, রোগিণীর পাশে একলাই বসেছিলাম। পরিচারিকাটিও ওখানেই ছিল, আর তীব্র নাসিকাগর্জন সহকারে ঘুমোচ্ছিল। ওকে দোষ দিতে পারি না। বেচারিও খুবই শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। সন্ধে থেকেই আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনার শরীর একদম ভালো যাচ্ছিল না। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল। মাঝরাত পর্যন্ত এপাশ ওপাশ করে ছটফট করছিল। শেষমেশ মনে হলো ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্তত ছটফট করাটা বন্ধ হয়েছে। ঘরের কোণে পবিত্র ছবির সামনে প্রদীপটি জ্বলছে। আমি বসে আছি, মাথাটা নামানো। চোখও একটু লেগে এসেছে। হঠাৎ মনে হলো কে যেন আমাকে পাশ থেকে স্পর্শ করল। ঘুরে তাকালাম ... হে ভগবান! আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে --- ঠোটদুটি দ্বিধাবিভক্ত ... ওর গালদুটি জ্বলজ্বল করছে। “কী হয়েছে?” “ডাক্তারবাবু, আমি কি মরে যাব?” “কী অলক্ষুণে কথা!” “না, ডাক্তারবাবু, না! বলবেন না যে আমি বেঁচে থাকব – ও কথা বলবেন না! যদি আপনি বুঝতে পেরে থাকেন ... দোহাই আপনার ... আমার কাছে কিছু লুকোবেন না – আমার অবস্থাটা ঠিক কী,” খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। “যদি সত্যিই জানতে পারি যে আমার বাঁচার কোনও আশা নেই ... আমি সব কথা আপনাকে বলে যেতে চাই – সব কিছু!” “আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা, মিনতি করছি – ” “শুনুন, আমি একফোঁটাও ঘুমোইনি ... আমি আপনার দিকেই তাকিয়েছিলাম – অনেকক্ষণ ধরে ... ঈশ্বরের দোহাই! ... আমি বিশ্বাস করি আপনাকে, আপনি সজ্জন মানুষ, সৎ মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু পবিত্র – আমি সেই সব কিছুকে সাক্ষী রেখে আপনার কাছে মিনতি করছি – দয়া করে সত্যি কথাটা বলুন আমাকে! ... যদি জানতেন সত্যিটা জানা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ... ডাক্তারবাবু, ঈশ্বরের দোহাই আপনাকে, বলুন আমাকে ... আমি কি বিপদের মধ্যে আছি?” “কী বলি বলুন তো আপনাকে, আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা, ... প্রার্থনা করুন।” “দোহাই আপনার, মিনতি করছি আপনাকে!” “কোনও কিছুই আপনার কাছে লুকিয়ে রাখতে পারব না,” আমি বললাম, “আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা, বিপদে আপনি সত্যিই আছেন, কিন্তু ঈশ্বর করুণাময়।” “আমার মৃত্যু হবে! মৃত্যুই হবে আমার।” মনে হলো, ও খুবই খুশি হয়েছে। ওর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল – এতটাই উজ্জ্বল, যে আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। “ভয় পাবেন না! একটুও ভয় পাবেন না! মরতে আমি একটুও ভয় পাই না!” আচমকা কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসল। “এখন – হ্যাঁ, এবারে আমি আপনাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি ... মন থেকে জানাই ... আপনি দয়ালু ... আপনি খুব ভালো – আপনাকে ভালোবাসি আমি!” বিস্মিত চোখে ওর পানে চাইলাম ... ভূতগ্রস্তের মতো। বুঝতেই পারছেন নিজেকে কতটা দুঃখী লাগছে! “শুনেছেন তো – আমি আপনাকে ভালোবাসি!” “আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা – সত্যিই কি আমার সেরকম যোগ্যতা আছে – ” “না, না, ও কথা বলবেন না – আপনি আমাকে বুঝতে পারেননি” ... তারপরেই সহসা বাহু প্রসারিত করে, দুই হাতে আমার বদন আঁকড়ে ধরল, বারবার চুম্বন করতে লাগল ... বিশ্বাস করুন – আমি প্রায় জোরে জোরে বিলাপ করতে লাগলাম ... হাঁটু গেড়ে বসে বালিশে মাথা গুঁজে দিলাম। কোনও কথা বলল না। কেবল আমার চুলের ভেতর ওর কাঁপা আঙ্গুলের স্পর্শ অনুভব করলাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শুনতে পেলাম। ওকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম, আশ্বস্ত করতে লাগলাম ... ঠিক কী কী ওকে বলেছিলাম – জানা নেই। “আপনি মেয়েটিকে জাগিয়ে দেবেন,” বলে উঠেছিলাম, “আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ – বিশ্বাস করুন ... একটু শান্ত হোন।” “যথেষ্ট আদিখ্যেতা হয়েছে!” ও গোঁ ধরে বলল। “ওদের নিয়ে অত মাথা না ঘামালেও চলবে। জেগে গেলে যাবে! আমার কিচ্ছু এসে যায় না! আমি তো মৃত্যুর দিকে এক পা বাড়িয়েই রয়েছি, আপনি তো জানেন ... আপনার এত ভয় পাবার কী আছে? কেন ভয় পাচ্ছেন আপনি? নিন, মাথাটা তুলুন ... নাকি আপনি আমাকে ভালোবাসেন না ... কে জানে, আমি হয়তো ভুল বুঝেছি ... যদি তাই হয় – আমাকে ক্ষমা করে দিন।” “আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা, কী বলছেন আপনি! ... আমি ভালোবাসি আপনাকে। আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা।” চোখে চোখ রেখে আমার পানে তাকাল। বাহু প্রসারিত করে ধরল। “তাহলে আপনি আমাকে আপনার বুকে টেনে নিন।” খোলাখুলিই বলি আপনাকে – জানিন না, সেদিন রাতে পাগল হয়ে যাইনি কী করে। মনে হচ্ছিল, আমার রোগিণী আত্মহত্যা করতে চাইছে। পুরোপুরি নিজের বশে আছে বলে মনে হচ্ছিল না। এটাও বুঝেছিলাম, যদি ওর মনে না হতো যে ও মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, আমি ওর ভাবনায় আসতামই না। বাস্তবিকই, প্রেমকে অনুভব না করেই কুড়ি বছর বয়সেই ঝরে যাওয়া, বড়ই দুঃখের ব্যাপার। আপনিও বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। এটাই ওকে কষ্ট দিচ্ছিল। নিরাশ হয়ে পড়েছিল। আমাকে নিয়ে স্বপ্নটা ছুঁতে চাইছিল। বুঝতে পারছেন এখন? আমাকে শক্ত করে আলিঙ্গনে ধরে রাখল, কিছুতেই ছাড়িয়ে নিতে দেবে না। “দয়া করুন আমাকে, আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা, নিজের জন্যও একটু ভাবুন,” বললাম আমি। “কেন?” বলল ও। “নিজেকে নিয়ে ভাবার কী আছে? আপনি তো জানেননি আমি মরতে বসেছি” ... কথাটা বলেই যেতে লাগল ... “যদি জানতে পারতাম যে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে – আবার যৌবনলাবণ্য নিয়ে বাঁচব – লজ্জা পেতাম খুব ... হ্যাঁ লজ্জা পেয়ে যেতাম ... কিন্তু এখন কেন পাবো?” “কিন্তু, কে বলল আপনি মরেই যাবেন?” “ওহো ছাড়ুন এই সব সান্ত্বনা দেওয়া কথাগুলো! আমাকে ছলনা দিয়ে ভোলাবেন না ... মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস নেই আপনার – নিজের মুখটা দেখে নিন একবার” ... “আপনি বেঁচে থাকবেন, আলেক্সান্দ্রা আন্দ্রিয়েভনা! আমি আপনাকে সারিয়ে তুলব। আপনার মায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ চেয়ে নেব – আমরা দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করব – আমরা সুখী হবো।” “কিছুতেই না, কখনোই না, আপনি আমাকে বলে দিয়েছেন। আমাকে মরতেই হবে – আপনি কথা দিয়েছেন আমায়” ... কথাটা বড়ই নিষ্ঠুর লাগছিল – অনেক কারণেই কথাটা আমার পক্ষে নিষ্ঠুর। ভেবে দেখুন তুচ্ছ ব্যাপারগুলো মাঝে মাঝে কীভাবে নাড়া দিয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় তেমন কিছুই নয়, অথচ কষ্ট দেয়। ওর মনে হলো আমার নাম কী জিগ্যেস করার। পদবী নয় আমার নামটা। দুর্ভাগ্য আমার, আমাকে ত্রিফোন নামে ডাকা হবে। বাস্তবিকই ত্রিফোন ইভানিচ নামে। বাড়ির প্রত্যেকেই আমাকে ডাক্তারবাবু বলেই ডাকতেন। তাতে অবশ্য আমার কিছু করার নেই। “ত্রিফোন, ম্যা’ম।” ভুরু কুচকে মাথা নাড়ল, বিড়িবিড় করে কিছু বলল। ফরাসী ভাষায় এবং নিঃসন্দেহে অপ্রীতিকর কোনও কিছু! তারপরে ও হেসে উঠল – সেটাও বেশ বিসদৃশভাবে। যাই হোক, সারা রাত এই ভাবেই ওর সাথে কেটে গেল। ভোর হবার আগেই আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম, নিজেকে পাগল পাগল লাগছিল। এরপরে সকালের চা পান করে ওর ঘরে যখন ফিরে গেলাম তখন দিনের আলো। হে ঈশ্বর! আমি ওকে ঠিক মতো চিনতেই পারলাম না। কবরে যাদের শোয়ানো হয়, তাদেরকেও এর চাইতে সজীব দেখায়। আত্মমর্যাদার সঙ্গে হলফ করে বলি, আমি বুঝতেই পারি না – আজও আমি ভালো করে বুঝে উঠতেই পারিনি – কী করে সেই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাও সহ্য করতে পারলাম। তিন দিন তিন রাত ধরে আমার রোগিণী লড়াই করতে থাকল। আর রাত্তিরগুলো কী ভয়ানক! কী সব কথা বলে গেল আমাকে! আর শেষের সেই রাত্রে – আমি ওর পাশে বসেই, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে চলেছি, একটিই প্রার্থনা, “ওকে নিয়ে নাও, যত দ্রুত সম্ভব, আর আমাকেও ওরই সঙ্গে নিয়ে নাও।” সহসা বৃদ্ধা মা ঘরে চলে এলেন, অপ্রতাশিতভাবেই। অত সন্ধেবেলাতেই ওঁকে – মেয়েটির মা’কে – বলেছি, ওর আরোগ্যলাভের আশা খুবই ক্ষীণ, একজন যাজককে খবর দিয়ে রাখাই ভালো। মা’কে দেখতে পেয়েই অসুস্থ মেয়েটি বলে উঠল, “ভালোই হলো, তুমি এলে। আমাদের দুজনকে একবার দেখ, আমরা দুজনে দুজনকে ভালোবাসি – দুজনেই দুজনকে বাকদান করে ফেলেছি।” “ও কী সব বলছে, ডাক্তারবাবু?” চোখমুখ লাল হয়ে উঠল আমার। “মনের ভুলে বলছে”, আমি বললাম। “জ্বর তো।” কিন্তু মেয়েটি বলে উঠল, “এমন কথা বলবেন না। একটু আগেই তো আমাকে একেবারে অন্য কথা বলছিলেন – আমার আংটি গ্রহণ করলেন। অস্বীকার করছেন কেন? আমার মা খুবই ভালো – উনি মাফ করে দেবেন – উনি বুঝবেন – আর আমি তো মরতে বসেছি ... মিথ্যে বলতে যাব কেন? দিন, আপনার হাতটা আমাকে দিন।” এক লাফে উঠে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। বৃদ্ধা মহিলাটি, অবশ্যই পুরো ব্যাপারটি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।

“আর বেশি সময় নেব না আপনার। আর আমার পক্ষেও এই সব স্মৃতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমার রোগিণী পরের দিনই চলে গেল। ঈশ্বর ওর আত্মাকে শান্তি দিন,” ডাক্তারবাবু বললেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও বললেন, “মৃত্যুর ঠিক আগেই পরিবারের সবাইকেই ঘর ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করল। একমাত্র আমিই ওর কাছে থাকব।”

“ক্ষমা করবেন আমাকে,” ও বলল। “হয়তো আমিই আপনার চোখে দোষী হয়ে আছি – আমার অসুস্থতা – তবু বিশ্বাস করুন, আপনাকে ছাড়া আর কাউকেই আমি এতটা ভালবাসিনি ... আমাকে ভুলে যাবেন না ... আমার আংটিটা আপনিই রাখুন।”

ডাক্তারবাবু মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি ওর হাত ধরলাম।

“আহ!” বললেন উনি, “চলুন আমরা অন্য কোনও কথা বলি – নাকি ছোট এক দান বাজি খেলতে আপনার আপত্তি নেই? আমার মতো মানুষের এত বেশি আবেগপ্রবণ হওয়া উচিতই নয়। কেবল একটি কথাই সর্বদা মনে রাখতে হবে আমাকে। কীভাবে বাচ্চাদের কান্না থামানো যায় আর স্ত্রীর বকুনির হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। সেই সময় – কী বলে যেন – ওই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার সুযোগ হয়ে যায় ... হ্যাঁ – এক ব্যবসায়ীর কন্যাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করি – পণ হিসেবে সাত হাজার পেলাম। আকুলিনা – ওর নাম। ত্রিফোন নামটির সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়। বদমেজাজি মহিলা – স্বীকার করতেই হবে, তবে সারা দিন পড়ে পড়ে ঘুমোয়, ভাগ্যিস! ... ব্যাপারটা মন্দ নয় – কী বলেন?”

অল্প কিছু বাজি ধরে দু’জনে তাস খেলতে লাগলাম। ত্রিফোন ইভানিচ আমার কাছ থেকে আড়াই রুবল জিতে নিলেন। বেশ রাত করেই বাড়িমুখো হলেন। সাফল্য লাভ করে যারপরনাই খুশি।

**********

লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : ইভান সের্গেইয়েভিচ তুর্গ্যেনেভ (নভেম্বর ৯, ১৮১৮-সেপ্টেম্বর ৩, ১৮৮৩) একজন বিখ্যাত রুশ ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং ঔপন্যাসিক। ১৮৫২ সালে প্রকাশিত তাঁর ছোটগল্পের সংকলন আ স্পোর্টসম্যানস স্কেচেস-কে রুশ বাস্তববাদী সাহিত্যে এক অন্যতম মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৮৬২-তে প্রকাশিত তার কালজয়ী উপন্যাস ফাদার্স অ্যান্ড সানস উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। গল্পটি THE DISTRICT DOCTOR, BY IVAN S. TURGENEV-এর অনুবাদ।

অপরদিকে, উৎপল দাশগুপ্তের জন্ম কলকাতায়। আদিবাড়ি ওপার বাংলার শ্রীহট্টের পঞ্চখণ্ডে এবং অসমের করিমগঞ্জে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার। কর্মজীবনের শুরু ভারত সরকারে অর্থ মন্ত্রক থেকে। কর্মসূত্রে দিল্লি, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং অসমে কাটিয়েছেন। অল্প লেখালেখি আর অনুবাদের কাজ করেন। তবে নিজের লেখালেখির চাইতেও বই পড়তে বেশি ভালবাসেন, বিভিন্ন বিষয়ে। ঘুরে বেড়াতে, অবসর সময়ে গান শুনতে ভালবাসেন। শখের ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কলকাতায় থাকেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ