মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

শাহীন আখতার : সখী রঙ্গমালা--৬ষ্ঠ পর্ব

প্রথম পর্বের লিঙ্ক
পঞ্চম পর্বের লিঙ্ক


ষষ্ঠ পর্ব

শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবীর চাক-ভাঙা মৌমাছির হুলে একাই জর্জরিত হয় রঙ্গমালা। আর দেশছাড়া হতে হয় চাকে আগুন দেয়া বৈষ্ণবীকে। রাজচন্দ্র চৌধুরীকে শায়েস্তা করে কারও নিস্তার নাই। বাল্যাবস্থা থেকেই সে বেচঈন স্বভাবের।
যখন যা মন চায়, সেদিকেই দেওয়ের মতো ছোটে। বংশের প্রথম পুত্রসন্তান - ঘরে-বাইরে সবাই লাই দিয়ে বড় করেছে। শৈশবে বাবা-কাকারা ছেলের শিক্ষাদানে ত্রুটি করেন নাই। প্রথমে একজন পন্ডিত, পরে ফারসি হেফজ করার জন্য মুসলমান মুন্সি রেখে দিয়েছিলেন। পন্ডিতমশাই মাটির ওপর খড়ি দিয়ে বর্ণপরিচয় শিক্ষাদান শুরু করলেন। তারপর তালপত্রে অঙ্কশিক্ষা যখন আরম্ভ হলো, তখনই অঘটনটা ঘটল। ঘুমের মধ্যেই তালের ডালের পোঁচে পন্ডিতের টিকি খোয়া যায়। রাজচন্দ্রের আর কাগজের ওপর খাগের কলম দিয়ে মুক্তার মতো গোটা গোটা বাংলা হস্তাক্ষর মকশো করা হয়ে উঠল না। এরপর গায়ে জরির কামদার কাবা চড়িয়ে মাথায় পাগড়ি বেঁধে মুন্সিসাহেবের হাবিলিতে সে ধন্না দিয়েছে কিছুদিন। মুরুব্বিরা ভাবলেন - ছেলে ফারসিতে লায়েক হচ্ছে, যা জমিদারি চালানোর জন্য নিতান্তই আবশ্যক।তা ছাড়া পন্দনামা, গুলিস্তা ও বোস্তা - গ্রন্থদ্বয় পাঠে নীতিশিক্ষার অভাবও দূর হবে। চলন-বলন, কায়দা-কানুন, তরিবত-সহবতে দোরস্ত হবে। যেদিন কাবার তলা থেকে জ্যান্ত কাছিম নিকাল হলো, মুন্সিসাহেব সেই দিনই পাততাড়ি গোটালেন। লেখাপড়ার পাট সাঙ্গ হলো রাজচন্দ্রের। সেই দুঃখ নিয়ে বাবা প্রতাপ নায়ারণ অকালে চোখ বুজলেন। পিতৃহীন চন্দ্রের অভিভাবক হলেন রাজেন্দ্র নারায়ণ। তিনি এক বেলা শাসন করেন তো তিন বেলা মাথায় তুলে রাখেন। উঠতি বয়সের রাজচন্দ্র দিনভর পাখি মারার দোনলা বন্দুক কাঁধে ঘুরে বেড়ায়। ঘোড়া দাবড়ানোতেও ভুলুয়া মুলুকে তার জুড়ি নেই। সামাল সামাল রব পড়ে গেল। গর্বে বুকের ছাতি ফুলে ওঠে রাজেন্দ্র নারায়ণের। বংশের আদিপুরুষ মিথিলাবাসী বিশ্বম্ভর শূরের নাম যদি কেউ রাখতে পারে, গুণের ভাতিজাই রাখবে। চৌধুরীদের শিরায় শিরায় যে নীল রক্ত বইছে, ছোকরার ঘোড়া নাচানোতে সেই আলামত। এদিকে রাজচন্দ্রের ভাঙা গলার স্বর ভরাট হতে শুরু করেছে, দাড়ি-গোঁফ উঁকি দেবে দেবে, এর মধ্যেই পাখি-শিকারে আর মন বসে না। নাওয়া-খাওয়ায়ও অরুচি। ভাতিজার যে তাঞ্জাম আরোহিণী আর রায়তবাড়ির মেয়েছেলের দিকে নজর ঘুরে গেছে - মাইজদীর ঠাকুরের কন্যা চন্দ্রকলার অভিযোগ দাখিল করার আগ পর্যন্ত রাজেন্দ্র নারায়ণ এ ব্যাপারে অন্ধকারেই ছিলেন।

সেদিন কাছারি বসার পরপরই করিমপুর পাথারের পাকা ধান কালামে খেয়ে নেয়ার সম্বাদ আসে। জমিদার রাজেন্দ্র নারায়ণের মাথায় বাজ। গত সনে মানুষ ভাতে মরেছে, গরু-বাছুর খাদ্য হয়েছে চিনাজোঁকের, এবার যদি খেতের ফসল কালাম-পাখি খায়, খাজনা তোলা বিষম দায় হবে। কোম্পানি বকেয়া খাজনার দায়ে জমিজমা আকছার নিলামে তুলছে। আগের সেই ঠাটবাট না থাকুক, রাজা বিশ্বম্ভর শূরের খান্দান, সিমুলিয়ার জমিদারদের মতো ডাকাতদলের থাব্দার হতে পারবেন না। ইংরেজের দেওয়ানি প্রাপ্তির পর এখন যদিও জমিদারগিরির চেয়ে ডাকাত পোষায় লাভ অধিক। ওদিকে রাজচন্দ্র দিনমান কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। অন্দরবাড়ি তলব পাঠিয়ে তার হদিস মেলে না। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। বয়সে নবীন হলেও এক বেলাতেই পাথারের কালাম সাফ করে দিতে পারে, ছোকরার হাতের টিপ এমন তুখোড়। ঘুম থেকে উঠে হারামজাদা গেল কই - রাজেন্দ্র নারায়ণ নাগরা পায়ে ঘর-বাহির করেন।

রাজচন্দ্র তখন বাড়ি থেকে দু ক্রোশ তফাতে দমদমার দিঘির পাড়ে আড়বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছে আর বিজলি চমকের মতো অপর পাড়ের রায়তবাড়িতে ঘন ঘন দৃষ্টি ফেলছে। মশা-মাছিও সাড়া দিচ্ছে না। কেবল একটা দুধেল গাই পাড়া থেকে নাড়া খেতে খেতে লেজ দোলাচ্ছে। বাঁশিতে ফুঁ বাজাতে বাজাতে রাজচন্দ্রের দম ফুরায়, গলা-বুকও চৈত্রের খাল-বিলের মতো শুকিয়ে চৌচির। পাশেই মুশকিল আসান রাম ভাঁড়ারি। সে কলাপাতায় করে দিঘি থেকে জল আনে। তা তীরে বসে পাতায় নাক ডুবিয়ে পান করে রাজচন্দ্র চৌধুরী। বাঁশিটা শোয়া অবস্থায় পাশেই পড়ে থাকে। এবার দিঘির শান্ত জলে টুপটুপ ঢেলা ছোড়ে রাজচন্দ্র। তা চষা খেত থেকে ধুতির কোঁচড় ভরে জোগান দেয় রাম ভাঁড়ারি। হবু জমিদারের সঙ্গে সে পেরে ওঠে না। চষা খেত, দিঘির পাড় আবার চষা খেত - উঠতে-নামতে দফারফা। মাটির ঢেলা ফেলে রাজচন্দ্র ফের হাতে তুলে নেয় আড়বাঁশি। এটি ঠোঁটে না ছুঁইয়ে, এক চোখ বন্ধ করে আরেক চোখে দুরবিনের মতো ধরে। ভঙ্গিটা কাপড়ের কুঠির এক গোরা সাহেবের কাছ থেকে ধার করা। খড়ের মাথাল, পাতলুন আর গামবুটের রসিয়া নাগর। রোজ রোজ যন্ত্রটা চোখে লাগিয়ে দূরের নদীর ঘাটের ধোপানিদের ওপর গোপনে নজর ফেলে। ওতে নাকি তেলেসমাতি আছে। ঘর ছেড়ে এককদমও নড়তে হয় না। খড়খড়ির ফুটো দিয়েই বাজিমাত। এক ধাক্কায় তফাতের লেডিরা হুড়মুড়িয়ে নাকের ডগায় চলে আসে। সেইমতো বুকের পাশ, কোমরের খাঁজ দেখিয়ে কাপড় কাচে, হাসে, কথা কয়। এমন একটা যন্ত্র হাতে থাকলে দিঘির অপর পাড়ের লেডিরা রাজচন্দ্রের চোখ ফসকে বেরোতে পারত না। মাকড়সার জালবন্দী মাছির মতো ভোঁও ভোঁও করে কানত। এদিকে গাছে বাঁধা ধলা টাঙন কখন থেকে পা ঠুকছে। মনিবের মতো সেও বেচঈন স্বভাবের। রাজচন্দ্র একলাফে টাঙনে সওয়ার হয়ে বাড়ির পথ ধরে। পেছন পেছন দৌড়ায় রাম ভাঁড়ারি। সে তখনো পায়দল আদমি। কালো টাঙনের সওয়ারি হতে তার আরও ঢের দিন বাকি।

রাজেন্দ্র খুড়া যখন শিকারে যেতে বললেন, রাজচন্দ্র এককথায় রাজি হয়ে গেল।তবে পাখি মারার আগে তার একখানা দুরবিন চাই। রাজেন্দ্র নারায়ণ জীবনে দুরবিন দেখেন নাই।এ খায় না মাথায় দেয়, তাঁর মালুম নাই।খানিক ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে বেহুদাই তিনি চেতে ওঠেন, ‘যাও দি বাপু, আগে বাপ-ঠাকুরদাদার নাম রাখো যাই। হরে দুরবিন না ছাই - আঁই দেইক্যুম।’

‘না, তা অইতো ন। আমনে আগে কিরা কাড়ি কন, হরে আঁই শিকারে যাইয়্যুম।’

দুরবিনের দাম যাচাইয়ের সময় নয় এখন। জলদি শিকারে না গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। অগত্যা রাগে গজগজ করতে করতে ভাতিজার শর্তে রাজি হন রাজেন্দ্র নারায়ণ।

দুপুরের মধ্যেই করিমপুর পাথারের কালাম সাবাড়। ঝাঁকা ভর্তি কালো কালো পাখি নিয়ে দুজন বারবরদার কাছারিবাড়ি রওনা হয়ে গেছে। রাজচন্দ্রের ঘরে ফেরার চাড় নেই। সে দোনলা বন্দুক কাঁধে আশপাশের বনবাদাড়ে টো টো করে ঘোরে। সঙ্গে ছায়ার মতো মোসাহেব রাম ভাঁড়ারি।

সে সময় চতুর্দোলায় চড়ে মাইজদীর ঠাকুরবাড়ির মেয়ে চন্দ্রকলা বাপের বাড়ি নাইয়র আসছিল। শীতের বেলা দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যায়। রাত নামলেই পথঘাটে চোর-ডাকাতের উপদ্রব। বেহারারা জঙ্গল আর ধানখেতের মাঝখানের কোনাকুনি পথ ধরে।

পালকির চিক সরিয়ে চন্দ্রকলা মাঠ ভরা সোনালি ধানের শোভা দেখছিল। বাপের দেশের সবতাতেই ওর চোখ জুড়ায়। মনে হয়, কত আপন! এই যে আউলা বাতাসে দোল-খাওয়া ধানখেত, দিন শেষের সোনাঝরা রোদ্দুর, ওপাশের বনবাদাড়ে পাখির কিচিরমিচির, দূরে ফিনফিনে কুয়াশার শামিয়ানা - এ বিচিত্র আয়োজন একা চন্দ্রকলার নাইয়র আসার উপলক্ষেই। দিনমান পথ চেয়ে বসে আছেন মা, মেয়ের বিচ্ছেদ-শোকে পাগলিনী মা জননী -

মায়ের সীতা গো

দ্যাশ ছেড়ে বিদেশী গো হলি মা করি পাগল।

সীতার মাথায় লম্বা কেশ, সীতা চলে বাপের দ্যাশ-অ গো।

মায়ের সীতা গো।

কাঁচা বাঁশে ধরছে গো ঘুণে, সীতা সীতা করে মনে গো...



আচম্বিতে জঙ্গল থেকে লাফিয়ে পড়ে বাঘ-ভালুক নয়, দুজন মানুষ। প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে পালকি দাঁড়িয়ে যায়। পিঠে বন্দুকের বাঁটের বাড়ি পড়ার আগেই চার বেয়ারা মাথার পাগড়ি ফেলে দেয় দৌড়। চন্দ্রকলা হুঁশ হারায় না। চিক নামানোর সময় একঝলক দেখেই চিনেছে - বন্দুক হাতে মর্দামি ফলাতে আসা এ নালায়েক আর কেউ নয়, সিন্দুরকাইত রাজবাড়ির কালীর পাঁঠা রাজচন্দ্র। গায়ে-গতরে বেড়ে উঠলেও চন্দ্রকলার পিতৃকুলের যজমানবাড়ির ছাওয়ালই তো! পালকি থেকে নেমে মুখের কাপড় সরায় চন্দ্রকলা। কিন্তু স্থির হয়ে একদন্ডও দাঁড়াতে পারে না। রাজচন্দ্র পেছন থেকে জাপটে ধরে মাটিতে পেড়ে ফেলে। সোনার বরন ধানখেত ধস্তাধস্তিতে মিসমার।

বেহারাদের জঙ্গল পার করে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে রাম ভাঁড়ারি যখন অকুস্থলে হাজির হয়, তখন চন্দ্রকলা খেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে - রণচন্ডীর মতো ভয়াল রূপ। মুখ দিয়ে অভিশাপের তুবড়ি ছুটছে। আর রাজচন্দ্র ঠোঁটের একপাশ হাতের তালুতে চেপে খেতের আলে উবু হয়ে বসে আছে। তাঞ্জাম মাইজদীর দিকে না গিয়ে সিন্দুরকাইতের পথ ধরলেও চৌধ্রীর চেতন হয় না। সে তখনো চন্দ্রকলার মুখের পানের রস মেশানো নিজের কাটা ঠোঁটের লহুর নোনা স্বাদ জিব দিয়ে চাটছে।

চন্দ্রকলা যে শোরগোল তুলে অন্দর-বাহির এক করে রেখে গেছে, তা জনে-জনে জিজ্ঞাস করে জানতে হয় না, রাতে বাড়িতে পা দিয়েই রাজচন্দ্র তোপের মুখে পড়ে। রাজেন্দ্র নারায়ণ পায়ের জুতা খুলে মারতে আসেন তো মা সুমিত্রা নিজের কপাল নিজেই বাড়ি মেরে ভাঙেন - ‘আঁই ওগ্গা ইতর হেডে ধইচ্চি মাগো, বাড়ি আঁই মাইনষ্যে অপমান করি যায়। আহা রে কায়নালী যম, আঁরে তুই উডাই ল, উডাই ল। আঁই আর বাঁইচতাম চাই না।’এখানেই শেষ নয়। ঠাকুরের ঝি বাপের বাড়ি পৌঁছে এমন হুজ্জত করে যে, পরদিন আলো ফোটার আগেই দুই শ ঠাকুর লাঠি হাতে রণে যাত্রা করে। তাদের এক পণ, রাজচন্দ্রকে বন্দী করে সিন্দুরকাইত রাজবাড়ির তাবৎ নারী-পুরুষ কিঙ্কর বানিয়ে তবে জলস্পর্শ করবে। অগ্রে চন্দ্রকলার পিতা শ্রীধর ঠাকুর, পশ্চাতে অন্যরা। হাঁটার তালে তালে যোদ্ধাদের ধুতির কাছা আর দুই শ টিকি ইঁদুরের লেজের মতো বাতাসে দোল খায় আর তাই দেখে মাঠের হাল-বাওয়া চাষিরা গরুর লেজ মলে ছড়া কাটে - ‘দুই শ ইন্দুর দেখি যুদ্ধে চইলাছে/যুদ্ধ কইরবা সকলে মেও ধইরবা কে?’ তাতে ঠাকুরেরা নিরস্ত হয় না। আরও কিছুদূর এগোনোর পর বৃদ্ধ এক ব্রাহ্মণপন্ডিত তাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। তার কথা হলো, যুদ্ধ করা ব্রাহ্মণদের সাজে না। তা ছাড়া চান্দা বীর যেখানে আছে, রণে তাদের পরাজয় অনিবার্য। লাঠি কখনো বন্দুক-গোলার সঙ্গে পেরে উঠতে পারে? তার চেয়ে দুদন্ড গাছতলে বসে ঠান্ডা মাথায় ভাবনা-চিন্তা করা যাক। কন্যার যে ধর্ম নষ্ট হয়েছে, এর একটা হেস্তনেস্ত জরুর করতে হবে। সেইমতো হাতের লাঠি ফেলে দুই শ যোদ্ধা গাদাগাদি হয়ে প্রাচীন এক বটগাছের নিচে বসে। পূজা-আর্চা, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে - কোন কাজটা ব্রাহ্মণ ব্যতিরেকে সম্ভব! সেদিন বটতলা থেকেই চতুর্দিকে দূর-দূরান্তে যত ব্রাহ্মণ ছিল, সবার কাছে খত নিয়ে কাসিদ বেরিয়ে পড়ল। এভাবে চৌধুরীদের সমাজ বন্ধ করার পথ পাকাপোক্ত হলো।

ওদিকে করিমপুর পাথারের জের ধরে সাততাড়াতাড়ি রাজচন্দ্রের বিয়ের লগ্নপত্র হয়ে গেছে। বৈরাতি প্রস্তুত, পুরোহিত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঠাকুররা সব গা ঢাকা দিয়েছে। ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকিতেও কাজ হলো না। বিয়ের লগ্ন বয়ে যায়। কনের পিতা লামচরের কালীচরণ গুহ লেজে-আগুন-লাগা বানরের মতো ছোটাছুটি করছেন। চৌধুরীদের রিশতাদার হওয়ার গরজ তাঁর অত্যধিক। পাত্রের ভালো কাজ বা মন্দ কাজ পাল্লায় তুলে মাপার সময় নয় এখন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়ি ধরে ধরে বারবরদার দিয়ে বস্তা ভরে কড়ি পাঠাতে লাগলেন। ঠাকুরদের ধনুকভাঙা পণ এভাবে কড়ির কাছে বিকিয়ে গেল। অপরাধীকে শায়েস্তা করা গেল না। চন্দ্রকলাকে হেরে যেতে হলো, বুকে এতখানি হিম্মত থাকা সত্ত্বেও।

কোনো কিছু থেকে শিক্ষা নেয়ার পাত্র নয় রাজচন্দ্র চৌধুরী। দন্ড-মুন্ডের কর্তা। বাসনা যেদিকে চালায়, সেদিকেই চলে। ঘরে বউ এল, টাকার ঝনঝনানি বেড়ে গেল। বিয়ের আমোদ-ফুর্তি শেষ হলে মাথায় ফের দুরবিনের ভূত চাপে। চন্দ্রকলার বাড়াবাড়িতে তা কেঁচে গেলেও মালদার শ্বশুর - এবার খায়েশ অপূর্ণ থাকে না। বালিকাবধূ আছে পোষা পাখির নাওয়া-খাওয়া, বিয়েথা নিয়ে। ওদিকে ঘরের বাইরে গোটা দুনিয়াটাই বৃন্দাবন, রাজচন্দ্র বাঁশি ফেলে দুরবিন হাতে সকাল সকাল বেরিয়ে যায়। ফেরে রাত করে। সঙ্গে সাবেক দোস্ত রাম ভাঁড়ারি। কালেভদ্রে কাছারিঘরে বসা হলেও মন টেকে না। কাগজপত্র সামনে নেয়ামাত্র লম্বা লম্বা হাই ওঠে। এভাবে নানা হুজুগে আর গুজবে দিন বয়ে যায়। দুরবিনের কেরামতি পানসে হয়ে গেলে রঙ্গমালার রূপের বার্তা চাউর হতে হতে রাজচন্দ্রের কর্ণে এসে আছড়ে পড়ে। মোটা বকশিশের বিনিময়ে জোড় বাঁধার ভার নেয় শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী। এত দিন পর চৌধুরী যেন আপন ঠিকানা খুঁজে পেল।

রাজচন্দ্রের ওপর থেকে রাজেন্দ্র নারায়ণের মন উঠে যাবার কারণ বিবিধ। ভাতিজা সাবালক হয়েছে বলে চৌকি তুলে নেয়া হয়েছে - আসল ঘটনা তা নয়। রাজেন্দ্র নারায়ণের একমাত্র মেয়ে সুনন্দা বৈধব্য বেশে বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে। কোলে বছর চারেকের ছেলে প্রফুল্লকুমার। এদিকে ফিজা-ঠাকুরদার জমানাও শেষ। রাজেন্দ্র নারায়ণের ঠাকুরদা মহেশ নারায়ণ মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছ থেকে যে পরগনার বন্দোবস্ত করিয়ে আনেন, বাবা উদয় নারায়ণের হাতে তার উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। নবাব আলীবর্দি তখন তখ্ত সামলাতে জেরবার হচ্ছেন। বৃদ্ধ নবাব একের পর এক বর্গি আক্রমণ, ভিনদেশি বণিকদের ক্ষমতাবিস্তার আর প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র ঠেকাতেই ব্যস্ত। কোথায় দরিয়াপাড়ের নদীভাঙার দেশ ভুলুয়া, তস্য পরগনা বাবুপুর - কে তার চুলচেরা হিসাব রাখে। সেই ফাঁকটুকু উদয় নারায়ণ মেধা দিয়ে ভরে তুললেন। ঈশ্বরের কৃপাদৃষ্টিও তাঁর ওপর বর্ষিত হলো। তিনি ছাই মুঠা করে ধরলে সোনা মুঠা হয়ে যায়। বাবুপুরের জলুস অদৃষ্টের ফেরে রাজেন্দ্র নারায়ণ ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর আমল শুরুর পূর্বেই ঘটে গেছে পলাশীর যুদ্ধ। তারপর কত উত্থান-পতন! হালে পাঁচ বছর মেয়াদে জমিদারি ইজারা নিতে গিয়ে তিনি ফতুর হয়ে গেছেন। কিছুতেই কোম্পানির খাঁই মিটছে না। কথার বরখেলাপ করে বছর বছর খাজনা-পত্তর বাড়িয়েই চলেছে। রাজেন্দ্র নারায়ণ যে আরাম-আয়েশ মুলতবি রেখে দিবানিশি চুলের সেতু দিয়ে হাঁটছেন, তা কার জন্য? শরিকে-শরিকে ভাগ হয়ে গেলে জমিদারির থাকে কী? রাজচন্দ্রের যেমন দেওয়ানা স্বভাব - ছোঁড়া বামাকুলের পেছনে ছুটেই নিকাশ হবে। এটা মন্দের ভালো। রাজেন্দ্র নারায়ণ যেন চোখ বোজার আগে নাতি প্রফুল্লকুমারকে গদিতে বসিয়ে যেতে পারেন, সেই ফন্দিফিকির করতে লাগলেন।

রাজচন্দ্র যখন আত্মারাম নরের বাড়িটা রাজবাড়ির আদলে বানাতে শুরু করে, তখন এর খরচাপাতি তার মাসোয়ারার বাইরে মালখানা থেকে দেয়া হয়েছে। তবে ধারে। খাতা-কলমে এতদিনে তা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। প্রথম প্রথম চোখ বুজে টঙ্কা বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে গেলেও এখন ছেলের চোখ ফুটেছে। বাপের হিস্যা কড়ায়-গন্ডায় বুঝে নিতে চায়। রাজেন্দ্র নারায়ণ তা ঠেকাচ্ছেন সম্পত্তি বেহাত হওয়ার ধুয়ো তুলে। রাজচন্দ্র জমিদারি হাতে পেলে যে লাটে তুলবে, এ বাবুপুরের কুকুর-বিড়ালও বোঝে, এক সুমিত্রা দেবী ছাড়া। মা ছেলের ব্যাপারে অন্ধ। তা ছাড়া রাজবাড়ির যে কর্ত্রীর পদটি স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর বেহাত হয়ে গেছে, সেটি যদি ছেলের সুবাদে ফিরে পাওয়া যায় - সে জন্যও তিনি ঘোঁট পাকাচ্ছেন। বউ ঠাকুরানিকে বুঝ মানাতে রাজেন্দ্র নারায়ণ লক্ষ্মণের বাড়া সুবোধ দেওর সাজতেও কসুর করেন নাই। সেসব ভেস্তে গেছে জলের দরে। তারপর রাজচন্দ্র যুগীবাড়ি হানা দিয়ে এমন ঠুয়া খেয়ে আসে যে, তাতে মা-ছেলের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেওর-ভাজের সাময়িক বিরোধ ভঞ্জন হয়। একই ঘটনায় শ্যামপ্রিয়ার চুগলিখোরিতে রঙ্গমালাও দাঁড়াস সাপের মতো ফোঁস করে ফণা তোলে। এ যেন আসমান-জমিন-দরিয়া থেকে ত্রিমুখী আক্রমণ। অথচ কী থেকে কী হয়ে গেল, রাজচন্দ্র চৌধুরী ভাবতে গেলে আজও এর থই পায় না।

সেদিন খুড়ার বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে রাজচন্দ্র গিয়েছিল দেওয়ানগঞ্জ ইঙ্গা চৌধুরীর বাড়ি। ফেরার সময় মাধব পাটনির ঘাটে নাঠা জমিরুদ্দিনের সঙ্গে দেখা। লোকটা জোঁকের মতন। নড়াচড়া করতে গেলে পা জাপটে ধরে - হুজুর মা-বাপ! রাজচন্দ্র বেখেয়ালে ভাবে, জেবে বোধ হয় পারানির কড়ি নাই, নাঠা তাই ভিক মাঙছে। তখনো তার মনে ইঙ্গা চৌধুরীর কথা কয়টা জোয়ারের জলের মতো ছলাৎ-ছলাৎ উঠছে-পড়ছে। জমিদারি জুদা করতে পারবে কি পারবে না, তার আগেই ইঙ্গা কাগজে-কলমে চার আনার হিস্যা চায়। ব্যাটা নেড়ে - মুসলমান। ডাকসাইটে পালোয়ান হলেও অবস্থা এখন পড়তির দিকে। আমানতের খেয়ানত করে যদি? রাম ভাঁড়ারি আর সব ব্যাপারে বুদ্ধির পাহাড়। কাগজ-কলমের কথা উঠলে ফ্যালফ্যাল করে বেকুবের মতো তাকিয়ে থাকে। বকলম যে! পথে আসতে আসতে চৌধুরীর ঝাড়ি খেয়ে মুখ ভার করে আছে সে। এখন দুটি কড়ি দিয়ে নাঠাকে বিদায় করতে হাত উঠছে না। উল্টা দূর দূর করে তাড়াতে চাইছে। যেন নিজে লেখাপড়া শেখে নাই, সেই দোষও নাঠার। রাজচন্দ্রের আবার কড়ির বোঝা বরদাস্ত হয় না। সর্বদা জেব ফাঁকা রেখে ফুরফুর মেজাজে ঘোরাফেরা করে। তবে ভাবগতিকে মনে হচ্ছে, নাঠা কড়ি চায় না, বড় কোনো দাঁও মারার তালে আছে। এ ব্যাটাও নেড়ে - আরেক ধড়িবাজ। রাজচন্দ্র টাঙনে চড়ে কোড়া মারতে যাবে, জমিরুদ্দিন মোচড় মেরে সামনে চলে আসে। এবার আর পা জাপটে ধরে না, সরাসরি রাজচন্দ্রের কানের কাছে মুখ। রাম ভাঁড়ারি তা তা করে তেড়ে আসার আগেই চৌধুরীর ভাবান্তর ঘটে যায়। দুরবিন আমলের সেই বেপরোয়া ভাব। যার সঙ্গে রাম ভাঁড়ারিকেও ভূতের নাচ নাচতে হবে। সত্য যে, কালা যুগীর বউ সৈরপমালার তানা-টানা দুরবিন চোখেই প্রথম নজরে পড়ে রাজচন্দ্র চৌধুরীর। টাঙন ছুটিয়ে গিয়েও সেদিন নাগাল পায় নাই - ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে। এবার নাঠা সঙ্গে আছে, বেটির পালানোর ফাঁকফোকর সিলগালা করে দেবে।

জমিরুদ্দিনের প্রস্তাবে ইঙ্গার চার আনা হিস্যার দাবি বাতাসে উবে যায়। রাজচন্দ্র আরও নির্ভার হয় মলমলের উড়নিখানি ঘাড় থেকে নামিয়ে নাঠাকে বকশিশ দিয়ে, যা দুঘড়ি আগে খিলাত দিয়েছিলেন দেওয়ানগঞ্জের ইঙ্গা চৌধুরী।

এ তো জল না চাইতেই বৃষ্টি! খুশিতে নাঠা বিস্তর দোয়া-দরুদ পড়ে চৌধুরীর মাথায় ফুঁ দেয়। অদূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে রাম ভাঁড়ারি - আগে তো যুগীবাড়ির দুয়ার তক যাওয়া যাক। মালিকের কাঁধের উড়নি কাঁধে ফেরত আসা এক দমের ব্যাপার।

রাম ভাঁড়ারির কোমর জড়িয়ে টাঙনের লেজের কাছটায় বসে হেলেদুলে যাচ্ছে জমিরুদ্দিন নাঠা। রাজচন্দ্রের টাঙন সামনে। এ দিকটায় পথঘাটের বালাই নাই। পরিত্যক্ত ভুঁই, ঝোপ-জঙ্গল। টাঙন জোড়া ধীরে ধীরে কদম ফেলে যাচ্ছে। এই সুযোগে রামার কোমর ছেড়ে জমিরুদ্দিন বাদশাহি জিনিসটা নাকের কাছে ধরে শোঁকে, হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে। মোসাহেবের বিচরণ ডালে-ডালে, নাঠার পাতায়-পাতায়। উড়নিটা ওসারে ছোট হলেও লম্বায় বড়। মাঝখান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললে লাঠিও ভাঙবে না, সাপও মরবে। পেটে ভাত আছে কি নাই, মানুষ দেখে না। উড়নি উড়িয়ে নাঠা আর নাঠার ছেলে নূরুদ্দিন যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবে, তখন তামাম মুলুকে রইরই পড়ে যাবে। রাম ভাঁড়ারিরও জনমের শিক্ষা হবে। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। কালা যুগীর বাড়ির ধারে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে উড়নিখানি মাঝখানে ধরে এক টানে দুভাগ করে ফেলে ছমিরুদ্দিন। রাজচন্দ্র চমকে উঠলেও এর ভেদ বোঝে না। তা ছাড়া যুগীর অন্দরবাড়ির দিকেই তখন তার সবটুকু মনোযোগ। রাম ভাঁড়ারি বেদম রাগে ‘কুত্তার হেডে ঘি হজম অয় না’ বলে গাল দেয়। নাঠা দাঁত বের করে মস্ত সালাম ঠুকে যুগীবাড়ির আগদরজা থেকেই সটকে পড়ে।

কালা যুগীর বউ সৈরপমালা দাওয়ায় বসে চরকায় সুতা কাটছিল। বাড়ির ওপর অশ্বখুরের আওয়াজ। ত্রিসীমানায় মানুষজন কেউ নাই। সুতার খেই তখনো তার হাতে, চরকায় জড়ানোরও সময় পায় না, লোক দুটি উঠানে চলে আসে। সৈরপমালা এক দৌড়ে বড় ঘরে ঢোকে। প্রবল ত্রাসে বুকটা ওর ধড়ফড় করছে। কই যাবে, কই পালাবে দিশামিশা না পেয়ে ঘরের পালা বেয়ে কাড়ে উঠে যায়। চৌধুরী টাঙন ছেড়ে ছোটে সেদিকে। কাঠবিড়ালের মতো গাছ-বাওয়া যার স্বভাব, কাড়ে ওঠা তার বেলায় যে নস্যি - তা কপালদোষে যুগীর জরুর জানা ছিল না।

কাড়ের ওপর হুড়াহুড়ি, দাপাদাপি। উঠান থেকে চারপাশে নজর রাখছে রাম ভাঁড়ারি। তার সামনে দিয়ে ফুড়ৎ করে সৈরপমালা দৌড়ে বেরিয়ে যায় আর ঘরের মধ্যে তারস্বরে চৌধ্রীর চিৎকার - ‘আঁর আন্ডু গেল রে, আন্ডু গেল রে।’ যেমন মজা, তেমন সাজা - মহারাজ তাঁতের গর্তে পড়ে হাঁটু ধরে গলাকাটা মুরগির মতো দাপাচ্ছেন। রাম ভাঁড়ারি পরখ করে দেখে, দরদ ঘোরতর। রাজচন্দ্র নিজে থেকে যে উঠে দাঁড়াবে, এমন আশা কম। এ দন্ডে তার দাওয়াই দরকার।

বাড়ির পেছনের কচুর ডোগার রস আর রান্নাঘরের ছনের চালের ঝুলকালির সঙ্গে চুন মিশিয়ে উঠানে বসে ওষুধ বানায় রাম ভাঁড়ারি। আর আড়চোখে নজর রাখে সৈরপমালার গতিবিধির ওপর। প্রথম কলামুড়ায় গা ঢাকা দিলেও জায়গাটা বোধ হয় অভাগীর মনে ধরে না। তারপর বাড়ির নামার মোরতাক-বন রামা নড়তে-চড়তে দেখে। রাজচন্দ্রের হাঁটুতে দাওয়াই লেপনের ফাঁকে সৈরপমালা মোরতাক-বন থেকে বেরিয়ে উঠানের কোণের বাইলের বেড়ার নিচে সান্দায়, যা রাম ভাঁড়ারির জানার কথা নয়। ভয়ে মেয়েটার কান্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছিল আগেই। এবার রাজচন্দ্রকে লেংচে লেংচে উঠানে নামতে দেখে মাথা ঠিক থাকে না। এক দৌড়ে গড়ের গলাপানিতে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তোলে রাম ভাঁড়ারি।

সে সময় জমিরুদ্দিন নাঠা ছেলে নূরুদ্দিনকে লয়ে যুগীবাড়ির পাশ দিয়ে হাটে যাচ্ছিল। ছেলের মাথায় বাজার করার চাঙারি। তাতে ঘরে-পোষা দুটি ডেকি-মুরগি, যা দিয়ে তেল-নুন সওদা করে বেলাবেলি ফিরতে হবে। নইলে চুলার আগুন তো আগুন, ঘরের বাত্তিও জ্বলবে না। পেটে পাত্থর বেঁধে আন্ধারে হাঁসফাঁস করে মরবে তিন-তিনটা মানুষ। বউয়ের টিটকারি সত্ত্বেও বাপ-বেটা বাদশাহি উড়নি উড়িয়ে যমজ ভাইয়ের মতো বাড়ি থেকে বেরোয়। ততক্ষণে রাজচন্দ্র চৌধুরী গোস্তাকির সাজাস্বরূপ সৈরপমালাকে উঠানের খুঁটিতে বেঁধে মারতে শুরু করেছে। যার নাদানির জন্য বউটার এমন বিড়ম্বনা, এ দন্ডে তার তো চুপ থাকলে চলে না। আবার বারো মুল্লুকের প্রভুর সামনে একা দাঁড়ানোরও হিম্মত নাই নাঠার। সে ছেলে নিয়ে ছোটে রাজগঞ্জের হাটে, যেখানে কালা যুগী হপ্তার বোনা চারখানা মাটিতে থুয়ে, মশারির আধখান গায় দিয়ে খরিদ্দার ভজানোর কায়দা করছে।

‘জমইক্যা নোয়াব যায়, জমইক্যা নোয়াব যায়’ - বাজারের লাগোয়া চালাঘর থেকে বেশ্যারা সুর তোলে। ধুয়ো ধরে ভেড়ুয়ার দল। হাটের দিন। সন্ধ্যা লাগার আগেই বেশ্যাপল্লী সরগরম। চাঙারি থেকে ডেকি দুটি ককককিয়ে সাড়া দেয়। অথচ বেশ্যাদের এমন জবরদস্ত তসলিমের বিনিময়ে জুতসই জবাব ফোটে না জমিরুদ্দিনের মুখে। শরমে তার তো তখন মাথা কাটা যাচ্ছে। একে নওল পুত্র সঙ্গে, তার ওপর কালা যুগীকে জলদি সম্বাদটা দেয়া না গেলে বউটা খুন হয়ে যাবে, যে হত্যাকা-ের ভাগিদার সে নিজেও। আসলে নাঠার স্বভাবটাই এমন - চোরকে বলে চুরি কর, গৃহস্থকে বলে ধর ধর। সে উড়নি দুটি ডেকি-চাপা দিয়ে নূরুদ্দিনকে পথের ধারে দাঁড় করিয়ে নিজে সুড়ৎ করে ঢুকে পড়ে হাটে।

পড়ন্ত বেলায় রাজগঞ্জ বাজারের কাপড়পট্টি বেশ জমজমাট। চৌধুরীদের বসানো হাট। বিকিকিনির ওপর মাশুল আদায় করছে জমিদারের লোকজন। পাইক-বরকন্দাজে গিজগিজ করছে। কুকুরের পালে শিয়ালের মতো কোম্পানির দু-চারজন বন্দুকধারী সেপাই। তাদের রোয়াব জবর। এ মচ্ছবে কালা যুগী যেন মশা-মাছি - নজরেই পড়ছে না। সেপাইয়ের বন্দুক দেখে হয়তো যুগিনীর বোনা মশারির তলায় সান্দাই গেছে। যে নিজের ছায়া দেখে কাপড় ভেজায়, সে দাঁড়াবে চৌধ্রীর কাম-রাঙা চোখের সামনে? ভস্ম হয়ে যাবে না! এ লোককে নিয়ে গিয়ে ফায়দা কী। নাঠা আড়ে আড়ে এগিয়ে তাঁতিদের মাঝখানে কাকের মতো হামলে পড়ে খবরটা রাষ্ট্র করে দেয়।

কানকথায় কে কত দূর কী বুঝেছে - খোদায় মালুম। মুহূর্তেই বাজারে হুলুস্থুল। যুগী-বাইন্যা চাল-ডালের মতো এক হয়ে গেছে। জগাখিচুড়ি অবস্থা। ছড়ানো-ছিটানো কাপড়ের বান্ডিল পড়ে আছে জায়গারটা জায়গায়। দোকানিরা শাট শাট ঝাঁপ ফেলে দেয়। হাট ভেঙে যায় যায়। সেপাইদের বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে না। ওদিকে বেশ্যাবাড়িতে মজা লুটতে যাওয়া হাটুরেরাও তাঁতিদের দলে শামিল হয়ে গেছে।

নূরুদ্দিন চাঙারি মাটিতে নামিয়ে পথের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল। উড়নি জোড়া মুরগির ন্যাদায় মাখামাখি। ফের তা গায়ে চড়াবে, না ফেলে দেবে বুঝতে পারছে না। সওদাপাতিও হয় নাই কিছু। মায়ের কিল-থাপ্পড়ের ভয়ে সে ভেউ-ভেউ কাঁদতে শুরু করে। তার নাকের ডগা দিয়ে ঠ্যালাঠেলি করে লোকজন সব বেরিয়ে যাচ্ছে। সবার আগে আগে চলেছে নাঠা। তার হাত ধরে কালা যুগী হাঁটছে। লোকটা যে রাতকানা - খানিকটা এগিয়ে এ দেখেশুনে বেকুব বনে যায় জমিরুদ্দিন। বাড়ি পৌঁছাতেই তো রাত কাবার হবে। এমনিতে লোকলস্কর জড়ো করতে মাগরিবের ওক্ত পার হয়ে গেছে। মোসাহেবসহ রাজচন্দ্র এতক্ষণে হয়তো লাপাত্তা। পথে পড়ে চৌধুরীদের কাছারিবাড়ি। রাজেন্দ্র নারায়ণ রেড়ির তেলের বাতি জ্বেলে খাতাপত্রের হিসাব মেলাচ্ছেন। পাশে বসে দেওয়ানজি এটা-সেটা বলে বুঝ দিচ্ছে। কাছারির পাইক-পেয়াদারা তখনো বাড়ি যাবার ছুটি পায় নাই। আশপাশের ঝোপঝাড়ে ছত্রাকার হয়ে গাঁজায় দম দিচ্ছে। হাটুরেদের হই-হট্টগোলে রাজেন্দ্র নারায়ণের পিলে চমকে গেলেও ঝোপের মধ্যে হাতে-হাতে ছিলিম ঘোরায় ছেদ পড়ে না। এই অবসরে নাঠা দলে-বলে হুড়মুড়িয়ে চৌধুরীদের কাছারিঘরে ঢুকে পড়ে।

এত মানুষ একসঙ্গে, তাও অতর্কিতে! খাতার ওপর রাজেন্দ্র নারায়ণের হাত দুটি যেন ঝোলা গুড়ে কালো পিঁপড়া - নড়তে-চড়তে অক্ষম। বাজ-পড়া মানুষের মতো খাড়া হয়ে থাকলেও ধড়ে যেন প্রাণ নেই তার। কপালে শুধু খান কতক ভাঁজ খেলে গিঁট লেগে গেছে। দেওয়ানজি গায়েব। কাগজপত্রের উগুইর তলে টিকটিকির লেজের মতো তার ধুতির কোঁচাটা শুধু ডানে-বামে দুলছে।

আগাম খবর না দিয়ে এলেও কাউকে ভয় দেখানো নাঠার দলের উদ্দেশ্য নয়। ওরা ইনসাফ-প্রার্থী। বউয়ের ওপর জুলুম হচ্ছে বিধায় এ যাত্রায় ফরিয়াদি কালা যুগী। তাকে জমিদার রাজেন্দ্র নারায়ণের সামনে ঠেলে দেয়া হলে সে হাত জোড় করে কাঁপতে শুরু করে। তার দাঁতে দাঁতে খিল ধরে গেছে। এখন তাঁতি-জোলাদের তরফ থেকে কে কথা বলবে? এরা ঘটনার আগা-মাথা কিছুই তো জানে না। অগত্যা রাজচন্দ্রের অপরাধের বায়নাক্কা দিতে এগিয়ে যায় চাক্ষুষ সাক্ষী জমিরুদ্দিন নাঠা। তা শুনতে শুনতে গিঁট খুলে রাজেন্দ্র নারায়ণের চওড়া কপালটা ফরসা হয়ে ওঠে। আর উগুইর তল থেকে জামা-ধুতির ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে হাসিমুখে বেরিয়ে আসে দেওয়ানজি। যাক, এ খাজনাপাতির গ্যাঞ্জাম নয়। তা ছাড়া রংপুরের দেবী সিংহের মতো কোনো ডাকাত-সর্দারের হামলা হলে আজ উগুইর তল থেকে বেরোতে হতো না, ওখানেই ভবলীলা সাঙ্গ হতো।

ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়ে রাজেন্দ্র নারায়ণ লাফালাফি জুড়ে দেন। একবার চান্দা বীরকে ডাকেন তো মঙ্গল সিংয়ের নাম ধরে চেঁচান। চান্দা তখন মুগুর ভাঁজতে গেছে ব্রহ্মচারীর আখড়ায়। অগত্যা গাঁজাখোর মঙ্গল সিংই সই। আজ রাজচন্দ্রকে অপদস্থ করার যে মওকা পাওয়া গেছে, তা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। বাবুপুরারা প্রতাপ নারায়ণের পুত্রকে দেখুক, যে ন্যায্যত হবু জমিদার হলেও জমিদার নামের কলঙ্ক। প্রফুল্লকুমারকেও দেখুক, যে দেবশিশু। যার দুধদাঁত ওঠা বাকি, সে কামড়াবে কি!

রাজচন্দ্রের তো চোখ কপালে - নিজের জমিদারির তনখাভোগী পাইক-প্যাদা আসছে তাকে পাকড়াও করতে! সে তো বাড়িতেই ফিরছে। হাঁটুতে দরদ বিধায় ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। মঙ্গল সিংয়ের সাঙ্গোপাঙ্গ পাঁচজনাই গাঁজায় ব্যোম - চোখ খুলতে পারছে না, অন্ধের মতো রাজেন্দ্র নারায়ণের হুকুম তামিল করছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজচন্দ্রের হাতের দোনলা বন্দুকটা হাপিস হয়ে যায়। তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে ষন্ডাগুলি। সে ভালো পা-টা তুলে লাথি মারতে যাবে, এমন বিরাশি ওজনের থাপ্পড় গালে পড়ে যে, মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। দূর থেকে মশাল দেখেই রামা ভেগে গেছে। গেছে যাক। ব্যাটা না পালালে আজ বেহদ্দ ভোগান্তি ছিল কপালে। পাঁচ পেয়াদার সঙ্গে পেরে ওঠা ওর কম্ম নয়।

অগত্যা মঙ্গল সিংয়ের হাতে নিজেকে সোপর্দ করে রাজচন্দ্র। তাকে টাঙন থেকে নামিয়ে কোমরে দড়ি দিয়ে টানতে টানতে যখন কাছারিবাড়ি নেয়া হয়, যেন ডাকাত-সর্দার ধরা পড়েছে, চারপাশে হাটুরেরা তামাশা দেখতে জড়ো হয়ে যায়। আড়ালে দাঁড়িয়ে টিটকারি মারে কেউ কেউ। এদিক-সেদিক থেকে দলা দলা থুতু, মাটির চাক্কা গায়ে এসে পড়ে। চোখের সামনে কালা যুগী, জমিরুদ্দিন নাঠা - সব যেন ভ্রম। আদ্যোপান্ত এ খোয়াব ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না রাজচন্দ্র চৌধুরী।

ঘোর ভাঙার পর রাজচন্দ্র দেখে, সে বাহিরঘরে। তার তত্ত্ব-তালাফিতে ব্যস্ত চাকর যুগিন্দর - ‘হুজুর, এগ্গা দিন এগ্গা রাইত আমনে চোক মেলি চান ন। হা করেন চাই - আমনেরে কাগজির শরবত দি?’

‘দূর অই যা, হারামজাদা! আঁই চোখ বুজি থাকলেও কানা ন।’শরবত তো শরবত, এ বাড়ির জলস্পর্শেও রাজচন্দ্রের অরুচি। কিন্তু যাবে কোথায়? রাজেন্দ্র নারায়ণ মাথায় হাত বোলাতে এলে সে চোখ বুজে ঝিম মেরে থাকে। ব্যাটা দুমুখো সাপ। মঙ্গল সিংকে পাঠিয়ে বেঁধে এনেছে, সেই বাঁধন আবার খুলে দিয়েছে নিজের হাতে। পুরোটাই ভড়ং। রায়তদের চোখে দেবতা সাজার কারসাজি। দেবতার নাতি আবার শিশু অবতার - সবে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমেছেন। তার জন্য মছলন্দের গদি সাজানো হচ্ছে।

কার ওপর রাগ ঝাড়বে রাজচন্দ্র? যুগিন্দর ব্যতিরেকে নজদিকে কে আছে? তার রোষ থেকে বাঁচানোর জন্য মঙ্গল সিংয়ের সাঙ্গোপাঙ্গদের যে অসময়ে ছুটি দেয়া হয়েছে, তা বাবুপুরের দুধের খোকারাও আজ বুঝতে পারছে। কেউ টুঁ শব্দটি করছে না। হাঁটুর দরদ সয়ে এলেই রাজচন্দ্র ফের মাধব পাটনির ঘাট পেরোবে। ইঙ্গা চৌধুরীর চার আনা হিস্যার দাবিই সই।

ঘরের কুলঙ্গিতে তারপিন তেলের শিশি রয়েছে। বাজার থেকে এরল্ড তেল আর সৈন্ধব নুন নিয়ে আসে যুগিন্দর। এ দিয়ে মালিশ করে, তারপিন তেলের সেঁক দিলে যদি বাবুর বেদ্না সারে। তবে শরীরের পীড়ার চেয়ে রাজচন্দ্রের মনের কষ্ট অধিক। আরেকটা রাত গিয়ে দিনের অর্ধেক। অন্দরবাড়ি থেকে ডাক পড়েনি, কেউ একবার এ ঘরে উঁকিও দেয়নি। বিধবা হওয়ার পর মা সুমিত্রার বাইরে আসায় বারণ নেই। দরকার পড়লে আসেনও। কী হলো তবে? তিনিও কি ভিড়ে গেলেন কালসাপের দলে! খুড়ার কারসাজি ভেঙে বলা দূরে থাক, মায়ের সঙ্গে শেষ কবে ভালো-মন্দ কথা হয়েছে, রাজচন্দ্র মনে করতে পারে না। ফুলেশ্বরী রাই দুয়ারে ঝাঁটা লটকানোর দিন থেকেই লাপাত্তা। মায়ের ঘরে ঠাঁই নিয়েছে - সে এটুকুই জানে। দুপুরে আচমকা কালবৈশাখীর তুফান উঠলে দুমদাম শব্দে রাজবাড়ির দরজা পড়ে। তুমুল বাতাস আর আসমান-ছেঁড়া বজ্রনির্ঘোষ। তখন বেশি বেশি মনে পড়ে ঘরের লোকজনের কথা। রাজচন্দ্রের বিছানায় শুয়ে থাকা আর বরদাস্ত হয় না। ঝড়-বৃষ্টি ধরে এলেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রওনা দেয় অন্দরমহলের দিকে। ঝরা পাতা, ভাঙা ডালপালায় উঠান সয়লাব। তার মধ্যে খোঁড়া পায়ে লাঠি ভর দিয়ে হাঁটা আর কচুরিপানার দামে নৌকা বাওয়া একই কথা। তাই দেখে উঠান ঝাড়– দিতে আসা দাসীর দল মুখে আঁচল দিয়ে হাসে। মায়ের ঘরের দরজা পর্যন্ত রাজচন্দ্রের যাওয়া হয় না। অলিন্দে পা দিতেই ‘আঁই তোর হোড়া মুক দেকতাম চাই না’বলে জানালার খড়খড়ি নামিয়ে দেন মা সুমিত্রা। বিফল হয়ে যখন ফিরছে, দেউড়ির মুখে রাম ভাঁড়ারি পায়ের ওপর উবু হয়ে পড়ে। রাজচন্দ্রের দেহে বিদ্যুৎ খেলে যায়। তার নুয়ে-পড়া-শির ফের উঁচু হয়। পেয়াদাদের মশাল দেখে গায়েব হয়ে যাওয়ার কৈফিয়তও রামাকে দিতে হয় না তখন। রাজচন্দ্র তাকে টাঙন সাজানোর হুকুম দিয়ে নিজে সাজতে বসে।

ঝড় থামার পর অল্পই বেলা ছিল। তখন কড়কড়ে রোদ উঠলেও পথঘাট শুকায় নাই। জল-কাদায় রাজচন্দ্রের টাঙনের পা দেবে যাচ্ছে। কনকনে হাওয়ায় তার নিজের হাঁটুর দরদও চিড়বিড়িয়ে ওঠে। কেমন ঘুটঘুটে আন্ধার রাত! এক হাত দূরের কিছু ঠাহর হয় না। এরা ফসলের মাঠ ছেড়ে বাঁধানো সড়ক ধরে। ইঙ্গা চৌধুরীর বাড়ি যাওয়ার নিয়ত করে বেরোলেও খানিকটা গিয়ে টাঙনের মুখ ঘোরায় রাজচন্দ্র। রামা সমঝদার লোক। বোঝে যে, জমিদারির চেয়ে প্রভুর এ দন্ডে দরকার একটা নরম শয্যা আর ততোধিক কোমল দুটি হাত। দুনিয়া উল্টে গেলেও নরবাড়িতে তা বহাল আছে।



এ সময় অদূরের তাল-সুপারির বনে প্যাঁচা-প্যাঁচানি সমস্বরে ডেকে ওঠে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন