বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অদিতার আঁধার : পর্ব--৫

দীপেন ভট্টাচার্য

আগের পর্বগুলো

‘কীভাবে, অদিতা কীভাবে মারা গেল?’ আবার প্রশ্ন করে বিষাণ। সেই প্রশ্ন যেন এক দুঃসহ হতাশায় ভারাক্রান্ত ছিল। বিনতা জানালার বাইরে ঘনায়মান অন্ধকারের দিকে তাকায়, দ্বিধা করে। দ্বিধা করারই কথা। একটি তীক্ষ্ণ শলা অদিতার হৃদযন্ত্রকে ভেদ করেছিল। একটি তীর, যে ধরণের তীর মানুষ ব্যবহার করে নি গত চার হাজার বছর। এখনকার তীরন্দাজরা শুধুমাত্র খেলাধূলায় অংশগ্রহণ করে, তাদের তীর অত্যাধুনিক প্রকৌশলে নির্মিত। কিন্তু এই তীরটি ছিল খুবই সাধারণ, শাল কাঠের লম্বা শলাকা, তবে সামনের শলাকাটি ছিল উজ্জ্বল মসৃণ ধাতুর।


‘আর তার চোখের ভিডিও বোধহয় চালু ছিল না?’ জিজ্ঞেস করে বিষাণ। ‘না,’ উত্তর দেয় বিনতা, ‘অদিতা সান খুব কম সময়ই সেটা চালু রাখতেন।’

প্রতিটি চোখের মণির পেছনে, রেটিনার ওপর খুবই ছোট একটি স্বচ্ছ ক্যামেরা লাগানো থাকে। সেটি দিয়ে মানুষ চোখে যা দেখে তারই ছবি কোনো ধরণের ঝামেলা ছাড়াই তুলে নিতে পারে। কিন্তু সেটাকে চালু করার জন্য কপালের বাঁ দিকে চাপ দিতে হবে। অথবা রেকর্ড করার চিন্তা করলেই হবে, সেই চিন্তাই নিউরন সমষ্টির মাধ্যমে ক্যামেরা চালু করবে। তবে শেষের পদ্ধতির জন্য কিছু অনুশীলনের প্রয়োজন। অনেকে তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ধরে রাখত সেই ভিডিওতে, কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই তাদের একান্ততাকে মূল্য দিত, তাদের চোখের ভিডিও চালু থাকত না।

‘তবে উনি অডিও রেকর্ড করেছেন,’ বলে বিনতা, ‘সেখানে একটা বাঁশির শব্দ ছিল।’ ‘বাঁশি?’ বিস্ময়ে প্রশ্ন করে বিষাণ। ভিডিও না করতে চাইলে অডিও রেকর্ড করার সুযোগ রয়েছে, একটি কানের ভেতরে খুবই ছোট একটি যন্ত্র থাকত।

‘হ্যাঁ, মনে হয় বাঁশ বা ঐ জাতীয় কোনো কিছুর বাঁশী। ইলেকট্রনিক শব্দ নয়,’ উত্তর দেয় বিনতা। একটু দূরে ডকটর তারকার ও স-কুরা অপেক্ষা করে। তাদের দিকে তাকিয়ে বিনতা বলে, ‘ওনারা অপেক্ষা করছেন, তাঁদের বোধহয় আপনার কাছে কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। আমারও আরো কিছু বলার আছে, তবে সেটা পরে বলা যেতে পারে।’

বিষাণ আর বিনতা ফিরে আসে ডকটর তারকার ও স-কুরার কাছে। তারকার গলাটা পরিষ্কার করে নেয়, প্রশ্নটা করতে ইতস্তত করে, তারপর বিষাণের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি কি জানেন অদিতা সান বেঁচে থাকতে চাইছিলেন না?’ বিষাণ এই প্রশ্নে আশ্চর্য হয়। সে এখন বুঝতে পারে কেন তাকে এমন জরুরীভাবে ডাকা হয়েছে। সময় নেয় উত্তর দিতে, সে কি এটা জানত? সে ভাবে, সে জানত আবার জানত না। এই পৃথিবীতে আত্মহত্যা করে মুক্তি পাওয়া যায় না, তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। চাঁদের বুকে তাদের দশ বছরের ছেলে সেনভা হারিয়ে যাবার পরে, নতুন সেনভাকে গ্রহণ না করতে পারার যন্ত্রণা অদিতাকে তাড়া করে বেরিয়েছিল। অদিতা তার মা’র মৃত্যুও গ্রহণ করতে পারে নি। অদিতা বাঁচতে চায় নি, কিন্তু সেই ইচ্ছাকে যে সে সরকারিভাবে নথিভুক্ত করেছিল সেটা বিষাণ জানত না। ‘না,’ উত্তর দেয় বিষাণ, মাথা নাড়িয়ে।

ডকটর তারকার বলেন, ‘অদিতা সান তাঁর এই ইচ্ছেটা নথিভুক্ত করেছেন সাত বছর আগে। ওনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তারপরে দুবার তাঁর মস্তিষ্ককে কপি করা হয়েছে। আপনি বুঝতে পারছেন সেই মস্তিষ্কের মাঝে না-বাঁচার সুপ্ত ইচ্ছাটা প্রথিত আছে। আপনার কি মনে হয় সেই কপি-করা মস্তিষ্কের মাঝে লুকান ইচ্ছা তার নিজের দেহকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে?’

বিষাণ বুঝতে পারে কেন তাকে ডাকা হয়েছে। সে অদিতার সঙ্গীবন্ধু ছিল বলে নয়, বরং অদিতার মস্তিষ্কের একটা বিশেষ দিককে পর্যালোচনা করার জন্য তারকার তাকে ডেকেছে। যে বেঁচে থাকতে চায় না তার কপি-করা মস্তিষ্ক তারই জৈবিক দেহে বসাতে গেলে কিরকম প্রতিক্রিয়া হবে সেটা নিয়ে তারকার চিন্তিত ছিল।

জানালার বাইরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠছে। বাইরে রাস্তায় মৃদু আলো, চলমান যান, কাজ থেকে হেঁটে ফিরছে মানুষ, কিন্তু সেখান থেকে কোনো শব্দ আসে না। কেন জানি বিষাণ সেদিকে তাকিয়ে তার ছোটবেলার কথা ভাবে, দূরে কোথাও বন্দরে জাহাজের বাঁশি বাজছে, জাহাজটা এখনই ছেড়ে যাবে কোলাহলময় লোকালয়, পাড়ি জমাবে নিঃসঙ্গ অথই পারাবারহীন সমুদ্রে। তার নিজের মা’র কথা মনে পড়ে। নতুন চট্টগ্রাম শহর সমুদ্রের জলে ডুবে গেলে তারা চলে এসেছিল বিশালগড়ে। সেখানে জাহাজের বাঁশি আর শোনা যেত না। একদিন সন্ধেবেলা রাস্তা থেকে জাহাজের ভেঁপুর মত শব্দ শোনা গেলে মা বলেছিল, ‘শুনছিস বিষাণ, জাহাজের শব্দ, আমাদের পুরনো বাড়ির কথা মনে করিয়ে দিল। তোর মনে পড়ে ছোটবেলার কথা।’ মা’র এই স্মৃতিটা বিষাণকে সব সময় তাড়া করে বেড়াত, বিষাদে ভরিয়ে দিত। অদিতার মনও তার মা’র স্মৃতিতে ভরে ছিল, প্রায়ই স্বপ্নে মাকে দেখত।

আমরা দুজনাই এক ধরণের বিষাদে পূর্ণ ছিলাম, ভাবে বিষাণ, এক ধরণের মেলানখোলিয়া। মেলানখোলিয়া যা কিনা আমাদের অস্তিত্বকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু মনের বিষাদ কি এমন এক দুর্দমনীয় ইচ্ছায় পরিণত হতে পারে যা কিনা সুপ্ত থেকে নিজের দেহকে বিসর্জন দিতে পারে? অদিতা কি নিজের মস্তিষ্ককে সেভাবে ট্রেনিং দিতে পারে? ধ্যান দ্বারা হৃদযন্ত্রকে হয়ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু তাকে কি বন্ধ করে দেওয়া যায়? কপি করা মস্তিষ্ককে দেহর সাথে সংযোজনের সময় সেটি কি বিদ্রোহ করতে পারে যদি বিদ্রোহের বীজ সেখানে বপিত থাকে?

‘এরকম ঘটনা কি আগে হয়েছে?’ ডকটর তারকারের প্রশ্নে বিষাণের সম্বিত ফিরে আসে।

‘আগে কি হয়েছে? হয়েছে, নতুন দেহকে কপি-করা-মস্তিষ্ক প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে সেগুলো কারিগরি ভুলের জন্য হয়েছে, মস্তিষ্কের সুপ্ত ইচ্ছার জন্য হয় নি। সেইসব ক্ষেত্রে কপি-মস্তিষ্ককে দেহের সঙ্গে সংযোজনে নিতান্তই কিছু ডাক্তারি ভুল করা হয়েছিল,’ বিষাণ বলে।

বিষাণ চাইছিল না অদিতার প্রাণহীন দেহটা দেখতে। তীরটা সরিয়ে অদিতার শরীরকে সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ বিনতা ডামুরি গবেষণাগারেই করেছিল। ডকটর তারকার আর স-কুরার কাছে দরকারি সমস্ত তথ্য ইতিমধ্যেই আছে। নতুন মস্তিষ্ক বসানোর অস্ত্রোপচারের কাজটা প্রায় পুরোপুরিই স্বয়ংক্রিয়, দু-একটা ছোটখাটো সূক্ষ্ণ কাজ স-কুরাই করে নিতে পারে। ডকটর তারকার কাজটার তত্বাবধানে নিযুক্ত। অদিতার কপি-মস্তিষ্ককে ইতোমধ্যে মাটির নিচের ক্রায়োজেনিক হিমাগার থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এই পদ্ধতিটি স্বয়ংক্রিয়, তাপ, চাপ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত বাক্সটি বিশেষ রেল ব্যবস্থায় উঠে আসে এই ঘরটিতে। বিষাণ ঘরে ঢুকেই খেয়াল করেছিল ঘরের কোনায় লাল বাক্সটি।

তারকার জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কি মনে হয় প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া শুরুর সময় হরমোন আর কর্টিসোল মাত্রা ঠিক করা দরকার? আমি জানি এটা খুবই সেকেলে পন্থা, কিন্তু জিন বা ডিএনএ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করার উপায় আমাদের নেই।’

‘না, না, প্রমিত পন্থায় যেভাবে হবার কথা সেভাবেই এগোন,’ বলে বিষাণ, ‘আমরা সবাই একটা প্রাকৃতিক উপায়ে বিবর্তিত হচ্ছি, সেখানে অচেতন মস্তিষ্কে হস্তক্ষেপ করাটা উচিত হবে না। যতক্ষণ না অদিতার চেতনা ফিরে না আসছে ততক্ষণ আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। আপনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া শুরু করুন। আমার যতদূর মনে হয় অদিতা সান তাঁর দেহকে প্রত্যাখ্যান করবেন না।’

বিষাণের কথায় ডকটর তারকার স্বস্তি পেল, সে বিষাণকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল, বিনতার দিকে তাকিয়ে একইভাবে পুরো দেহ ঝুঁকিয়ে বিদায় নিয়ে পাশের অপারেশন ঘরে চলে গেল। স-কুরা তার দেহে প্রথিত যোগাযোগ মাধ্যম দিয়ে অদিতার দেহ যে নীল বাক্সে রাখা আছে সেই বাক্সটাকে চালু করল। একটা চলন্ত বেল্ট বাক্সটাকে অপারেশন ঘরে নিয়ে গেল। অদিতার কপি-করা মস্তিষ্ক রাখা লাল বাক্সটাও একই পদ্ধতিতে সেই ঘরে গেল। বাক্স দুটোর পেছনে স-কুরাও প্রস্থান করল।

বিষাণ ভাবে, নতুন যে অদিতা হবে সে কি মাদ্রে দে দিওস নদীর পাশে পুরনো সেনভার জন্য কাঁদবে। নতুন সেনভাকে তারা দুজনেই ভালবাসতে চেয়েছিল। নতুন সেনভার স্মৃতি, পরিচয়, আত্মউপলব্ধি অবিকল আদি সেনভার মতই ছিল। সেই সেনভা তাদের বাবা আর মা বলেই ডেকেছিল। তারাও তাকে গ্রহণ করতে চেয়েছিল তাদেরই ছেলে হিসাবে, কিন্তু নতুন সেনভা পুড়নো সেনভার সবকিছু ধারণ করেও তাদের ছেলে হয়ে উঠতে পারে নি, কোথায় যেন একটা খাদ থেকে গিয়েছিল। ওপরে গ্রহণ করলেও হৃদয় থেকে সেই সেনভাকে তারা সন্তান হিসাবে মেনে নিতে পারে নি। নতুন সেনভা সেটা বুঝেছিল।

সে কি নতুন অদিতাকে মেনে নিতে পারবে?

এর থেকে মুক্তি নেই, ভাবে বিষাণ, মহাবিশ্বের নিঃস্পৃহ অচেতনার মাঝে এটা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্কট। দীর্ঘজীবী হয়েও আমরা সেই সঙ্কটের নিরসন করতে পারি নি। যে চলে যায় তাকে ঠিক ফিরিয়ে আনা যায় না। চাঁদে সেনভা হারিয়ে যাবার পরে অদিতা ও বিষাণ আর চাঁদে ফিরে যায় নি। মঙ্গলে যাবার জন্য অনেকবার ডাক পড়েছিল কিন্তু সেগুলোতে তারা সারা দেয় নি। মঙ্গলকে দ্বিতীয় পৃথিবী বানানোর তৃতীয় পর্যায় তখন সবে শুরু। বায়ুমণ্ডলের চাপ বাড়ানোর জন্য মেরুতে জমা নিরেট কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে বাষ্পীভূত করা হচ্ছিল আর বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখার জন্য মঙ্গলব্যাপী চুম্বকক্ষেত্র সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছিল। চুম্বকক্ষেত্রের জন্য মঙ্গলকে চক্রাকারে পেঁচিয়ে কিছু অতিপরিবাহী বিদ্যুতের তার বসানো হচ্ছিল। তবু মহাকাশ থেকে আগত শক্তিশালী মহাজাগতিক কণা থেকে বাঁচতে কর্মীদের মাটির নিচে বসবাস করা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মঙ্গলে স্থায়ী বাসস্থান কারুরই হয় নি। ওরকম নিম্ন মহাকর্ষীয় অঞ্চলে বাস করা ছিল মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বায়ুমণ্ডলে বায়ুচাপ ও অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি সম্ভব, গ্রহের উপরিভাগের তাপমাত্রা বাড়ান সম্ভব, মহাজাগতিক কণা থেকে দেহকে রক্ষা করাও হয়ত সম্ভব, কিন্তু সঠিক মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি সম্ভব নয়। আর মানুষের কঙ্কাল আর মাংসপেশি পৃথিবীর মত মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র না পেলে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। তবু কিছু সাহসী অভিযাত্রী মঙ্গলকে স্থায়ী বাসস্থান করতে চেয়েছিল, কিন্তু যেখানে সূর্যালোক অস্পষ্ট, চাঁদ যেখানে নেই, যেখানকার আকাশ দিনের বেলা নীল নয়, যেখানে জল ঝর্ণা হয়ে বয়ে যায় না, যেখানে উঁচু গাছের বন দিনের আলোকে ঢেকে দেয় না, যেখানে রঙিন জংলী ফুলের প্রান্তর পাহাড়ের পাদদেশকে ঢেকে দেয় না সেখানে মানুষ বেশী দিন থাকতে পারে না। তাই মঙ্গল তাদের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে নি।

এর মধ্যে নতুন সেভানের অগ্রহণযোগ্যতা অদিতাকে বিষাদের বিশাল খাদে নিমজ্জিত করল। ধীরে ধীরে অদিতা বিষাণের কাছে অপরিচিতা হয়ে উঠল। নতুন সেভানকে উত্তর আমেরিকার একটি সংশোধানাগারে ভর্তি করার পর বিষাণ আর অদিতার জীবনের পথ আলাদা হয়ে যায়। অদিতা বলত, ‘আমরা যাই করি না কেন তুমি আর আমি পৃথক সত্তা, দুটি আলাদা জীব যাদের মস্তিষ্ক করোটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই কঠিন নিরেট দেয়াল ভেদ করে দুটি মন কখনই এক হতে পারে না। এই ভিন্ন অস্তিত্বই মানুষকে বিবর্তনের পথ ধরে এইখানে নিয়ে এসেছে, আবার এক হতে পারে নি বলে তারা সারা জীবন এই মহাবিশ্বে একাকী জীবন কাটিয়ে গেছে।’

‘তাহলে তুমি, তুমি কিরকম সত্তা তৈরি করতে? তোমার মহাবিশ্ব কেমন হত? সেখানে কি বিষাদ থাকত না?’ জিজ্ঞেস করেছিল বিষাণ।

‘আমি? আমি যদি ঈশ্বর হতাম,’ উত্তর দিয়েছিল অদিতা, ‘আমি যদি ঈশ্বর হতাম আমি আলোর জীব তৈরি করতাম, যে জীবের শক্তির জন্য ঘাস লতা পাতা মাংসের দরকার হয় না, যে জীব সরাসরি নক্ষত্রের বিকিরণ থেকে শক্তি আহরণ করে। সেই মহাবিশ্বে আলোর গতি অসীম না হলেও আমাদের এই হাস্যকর সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার হত না। আমার আলোর জীব নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে বিচরণ করত প্রায় আলোর গতিতে, এমন কি এই অসীম ব্রহ্মাণ্ডের একটি গ্যালাক্সি থেকে আর একটি গ্যালাক্সিতেও সে যেতে পারত। মহাবিশ্বে কত কিছুই না দেখার আছে, কত অজানা গ্রহ, কত বিস্ময়কর সভ্যতা, কত নিহারীকা নক্ষত্র। আমি যদি সেসব তৈরিই করি তো আমার সৃষ্ট জীব কেন আটকা পড়ে থাকবে এই ছোট পৃথিবীতে, মহাবিশ্বের এক কোনায়। আমার সৃষ্ট জীব কেমন করে একটা ভাল শৌচাগার বানান যায় সেই চিন্তায় সময় ব্যয় করবে না।’

নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে বিচরণ করতে চেয়েছিল অদিতা, গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সি। সেই মহাবিশ্বে অস্তিত্বের সংকট নেই, ছেলেকে হারানোর বেদনা নেই, মাকে স্বপ্নে দেখে হতাশার অতল খাদে নিমজ্জিত হবার সম্ভাবনা নেই। সেই মহাবিশ্বের সত্তারা এক ধরনের কোয়ান্টাম ভাষায় কথা বলে, নিজেদের মাঝে যোগাযোগ রাখতে পারে শত আলোকবর্ষ দূরেও। অদিতা বলত যদি মহাবিশ্বকে বিশালভাবে সৃষ্টিই করা হয় তবে সেই বিশালত্বকে দেখবার জন্য, অনুভব করবার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবেরও সৃষ্টি প্রয়োজন।

কিন্তু অদিতা মানুষ হয়ে এমন এক মহাবিশ্বে জন্মেছিল যেখানে আলোর গতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। যেখানে বিবর্তনের খাঁচায় মানুষ শুধু পৃথিবীতেই একটু স্বস্তি নিয়ে থাকতে পারে, যেখানে মানুষের দেহ মহাবিশ্বে চলাচলের জন্য নিতান্তই অনুপযোগী।

তারকার আর স-কুরা অপারেশন ঘরে চলে যাবার পর বিনতা ও বিষাণ কিছুক্ষণ মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘরের মাঝে। দুজনেই একটু অস্বস্তিতে থাকে, মৌনতাটা কিভাবে ভাঙবে সেটা নিয়ে দুজনেই ভাবে। অবশেষে বিষাণ বলে, ‘নিচে একটা ক্যাফে আছে, ওখানে কি যেতে চান?’ বিনতা সায় দেয়। দুজনের কাছেই অনেক প্রশ্ন জমা।

ছিমছাম ক্যাফেতে খুবই হালকাভাবে, প্রায় শোনা যায় না এমন একটা বাজনা বাজছে, করুণ ভায়োলিন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকজন বসা। তাদের মৃদু কথোপকথন আর কফির কড়া গন্ধ জায়গাটাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। কফি নিয়ে জানালার বড় কাচের পাশে দুজন বসে। তৃতীয়ার চাঁদ ততক্ষণে ডুবে গেছে।

বিনতা বলে, ‘আপনাকে অদিতা সান কি কখনও একটা আঁধারের কথা বলেছেন?’ বিষাণ আশ্চর্য হয়, বলে, ‘আঁধার, কি ধরণের আঁধার?’

‘একটা সুনির্দিষ্ট আকারহীন অন্ধকার মেঘ,’ উত্তর দেয় বিনতা, ‘এমন একটা মেঘ যা কিনা আলো শুষে নেয়, যা কিনা আমরা যখন ঘরে একা থাকি তখন ঘরের কোনায় রূপ নেয়, বনের মধ্যে হাঁটলে বনের গভীরতম অংশ থেকে সেটি ছুটে আসে। এমন যেন তার একটা প্রাণ আছে।’ বিষাণ বিনতার কোনো কথাই ধরতে পারে না। বিনতা বলতে থাকে, ‘দু দিন আগে অদিতা সান আমাকে এই আঁধারের কথা বলেন। তিনি নাকি অনেক দিন ধরেই এই আঁধার দেখে আসছেন।’

বিষাণ বিনতাকে অবিশ্বাস করে না, কিন্তু সে জিনিসটা বুঝতে পারে না। বিনতা এমনভাবে এই আঁধারটা বর্ণনা করছে যেন সেটির জীবন আছে। বিনতা বিষাণকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি নিজে সেরকম কখনো কিছু দেখেন নি?’ ‘না,’ উত্তর দেয় বিষাণ। তারপর বলে, ‘আপনি জানেন আমাদের ছেলে সেনভা চাঁদে হারিয়ে গিয়েছিল। সে বায়ুচাপ- নিয়ন্ত্রিত পোষাক পড়ে মানমন্দির থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তাকে আমরা আর খুঁজে পাই নি। ঐ ছোট চাঁদে কেউ কি হারিয়ে যেতে পারে? তাকে যেন কেউ চাঁদ থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি কি জানেন অদিতার যখন আট বছর বয়স তখন সে চাঁদে গিয়েছিল তার বাবা মার সাথে। সেখানে একদিন সে দিগন্তে কিছু একটা দেখতে পায়। দেখতে পায় এবং ভয় পায়। কিন্তু সে বলতে পারে না কি সে দেখেছে। এমন হতে পারে এই আঁধার অদিতার এইসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।’

‘আমিও এই আঁধার দেখেছি,’ বলে বিনতা। ‘আপনি?’ আশ্চর্য হয় বিষাণ। ‘হ্যাঁ, যেদিন অদিতা সান সেই আঁধারকে আমার কাছে বর্ণনা করলেন, সেদিন রাতেই আমার ঘরে একটা আঁধারের মেঘ ঢোকে। আমার মনে হয় না সেটা স্বপ্ন ছিল। এমন যেন সেই অন্ধকার চুপ করে ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে ছিল যখন অদিতা আমাকে সেটির বর্ণনা দিচ্ছিলেন।’ এটুকু বলে বিনতা যেন শিউরে ওঠে। তারপর বলে, ‘এমন যেন সেই আঁধার ডামুরীতে বাসা বেঁধেছে। আমি জানি আপনার পক্ষে এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। যতক্ষণ না আপনি এটা নিজে না দেখবেন ততক্ষণ এটা এরকম হেঁয়ালির মতই লাগবে। আর একটা ব্যাপার, অদিতা সান বলেছিলেন একবার এরকম আঁধার কেটে গিয়েছিল একটা বাঁশীর শব্দে। বন থেকে আসছিল শব্দটা।’

‘বাঁশী? বনের বাঁশী! এরকম একটা বাঁশী অদিতার অডিও রেকর্ডিংয়ে ছিল না?’ প্রশ্ন করে বিষাণ। মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় বিনতা। দুজনেই চুপ করে থাকে। বিষাণ ভাবে, ‘অদিতাকে কে হত্যা করল? যে হত্যা করেছে সে তো জানে এইভাবে মানুষকে হত্যা করা যায় না। নাকি সে জানে না। এরকম মানুষ কি এখনো পৃথিবীতে আছে যারা একেবারেই বিচ্ছিন্ন, যারা এখনো প্রাগৈতিহাসিক তীর ধনুক ব্যবহার করে। ডামুরীর বনে কি তারা লুকিয়ে থাকতে পারে? হয়তো অদিতা অজান্তে তাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছিল, তাদেরকে চমকে দিয়েছিল। সেই বাঁশীর শব্দ কি তাদের সাথেই জড়িত? না, এটা একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার। এই সময়ে কোনোভাবেই ঐ ধরণের মানুষজন ডামুরির অরণ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে না।’

তারপর বিষাণের মনে আর একটি চিন্তা ভর করে। অদিতা বাঁচতে চাইছে না। হয়তো এই পুরো ঘটনাটাই অদিতার সৃষ্টি। অদিতা একবার মৃত হয়ে এই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে চাইছে। কেন যেতে চাইছে সেটা বিষাণ জানে না, কিন্তু অদিতার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষাণের পরিচয় আছে। ডকটর তারকারের আশঙ্কাটা বোধহয় অমূলক ছিল না। অদিতা একবার মৃত হয়ে হয়ত চিরতরে মৃত হবার পন্থা খুঁজছে।

বিনতা বিষাণের কাঁচা-পাকা কোঁকড়ান চুল, চওড়া ললাট, রোদে পোড়-খাওয়া গালের চামড়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে এই মানুষটা অদিতার জীবনের একটা বড় অংশে সঙ্গী ছিল। অদিতা বিষাণকে ভালবেসেছিল, তাদের বন্ধন কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল? ঈর্ষা হয় বিনতার। ভাবে এই মানুষটি অদিতার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছে। কিন্তু সেই ভালবাসা এখন স্মৃতি, হয়ত বেদনাময় স্মৃতি। সেই স্মৃতি কি ছোরার ফলা হয়ে বিষাণকে রাতে জাগিয়ে রাখে, নাকি নিত্যনতুন মোহে ছোরার তীক্ষ্ণতা মুছে যায়? এই মানুষটির নতুন প্রেমিকা কিরকম মানুষ, ভাবে বিনতা।

বিষাণ বিনতার কালো ভুরু দুটির দিকে তাকায়, তারপর কালো চোখের মণিতে যেন নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। তাই দেখে তার কেন জানি মনে হয় এই নারীটি অদিতাকে ভালবাসে। সেই ভালবাসায় অতৃপ্তি রয়েছে, অদিতার মেলানখোলিয়ায় সেই ভালবাসার স্থান পাওয়া কঠিন। বিষাণ ভাবে একটি প্রেম হারিয়ে গেছে চাঁদের প্রান্তরে, আর একটি গড়ে উঠতে পারে নি ডামুরির অরণ্যে। সেই অতৃপ্ত প্রেমের হতাশা বিষাণ যেন বোঝে, সেই আশাহীনতা তাকে বিনতার প্রতি সহমর্মী করে তোলে, সে বিনতার হাত স্পর্শ করতে চায়। কফি টেবিলের দুপাশে বসে অদিতাকে ঘিরে এভাবেই দুজনেরই চিন্তা আবর্তিত হয়, ওদিকে ‘নিলয়ের’ দোতলায় প্রাণহীন অদিতা অপেক্ষা করে পুনর্জন্মের।

1 টি মন্তব্য:

  1. মহাবিশ্বে কত কিছুই না দেখার আছে, কত অজানা গ্রহ, কত বিস্ময়কর সভ্যতা, কত নিহারীকা নক্ষত্র। আমি যদি সেসব তৈরিই করি তো আমার সৃষ্ট জীব কেন আটকা পড়ে থাকবে এই ছোট পৃথিবীতে, মহাবিশ্বের এক কোনায়। - অপূর্ব

    উত্তরমুছুন