বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

গল্পপাঠ আড্ডা ২ : রিমি মুৎসুদ্দির সঙ্গে কথাসাহিত্যিক রুমা মোদক ও সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম


‘মানুষের কোন গল্পই নতুন নয়।
সমস্ত পুরনো প্রাচীন,
দারিদ্র বঞ্চনা অপমানে
শতছিন্ন!’

ছোটোগল্পের সংজ্ঞা নিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের একাডেমিক ডিসকোর্সে একটা ক্রাইসিস রয়েছে। ছোটোগল্পে ওপেন এণ্ডেড টেকস্ট কিরকম হওয়া উচিত? একরৈখিক গদ্যেরই বা দিশা কি? সামাজিক রাজনৈতিক চেতনার বিভিন্ন দিগন্তে ছোটোগল্পের উদ্ভাসিত হওয়া কি একান্ত প্রয়োজনীয়? এইসব নানাবিধ বিষয় নিয়ে গল্পকারের আড্ডার দ্বিতীয় পর্বে আমার সঙ্গে রয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার রুমা মোদক এবং তরুণ গল্পকার সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম। আড্ডায় উল্লেখিত গল্পগুলোর লিঙ্ক এখানেই যুক্ত করা হয়েছে। কৌতুহলী পাঠক পড়ে নিতে পারবেন। 

রিমি মুৎসুদ্দি 
রুমা, আপনার ছোটগল্পের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, বাংলাদেশের জীবন এবং সেই জীবন নিয়ে নানারকম টানাপোড়েন, ক্ষোভ, বিপণ্নতা, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব –এসবই মিলেমিশে রয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপণ্ণতা আপনার গল্পে ফুটে ওঠে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আপনার গল্প ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর।’

রুমা মোদক
প্রসঙ্গটি বিব্রতকর গল্পটি আমার কাছে খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী গল্প নয়। একটি বিব্রতকর প্রসঙ্গ অনেকদিন লেখার উপকরণ হিসাবে মাথায় নিয়ে ঘুরেছি। শেষে একটি রাষ্ট্রীয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে গল্পটি সম্পন্ন করতে পেরেছি। লেখার ক্ষেত্রে আমি নিজের সম্পর্কে দুটি কথা বলি, প্রথমত আমি অভিজ্ঞতার বাইরে কিছু লিখি না, আর দ্বিতীয়ত গল্প বানানোর চেষ্টা করি না। অর্থাৎ জীবনাভিজ্ঞতায় অভিঘাত করে না, আমাকে আলোড়িত করে না এমন কিছু নিয়ে আমি লিখতে প্ররোচিত হই না। কিংবা বলা যায় লেখার জন্য কেবল কোনো লেখা আমি লিখি না। ফলে ঐ যে কথাটি বললেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম বাংলাদেশের জীবন, জীবন নিয়ে টানাপোড়নের ক্ষোভ বিপণ্নতা ইত্যাদি আমাদের মতো চেতনাগতভাবে অনগ্রসর একটি সমাজকে যা আষ্টেপৃষ্টে বিপণ্ন করে রেখেছে, সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে আমার মনোজগত তাতে আলোড়িত হবে, ব্যক্তিজীবন বিপর্যস্ত হবে, লেখকসত্তা তাড়িত হবে এটাইতো স্বাভাবিক।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
রুমা মোদকের দ্বিতীয় গ্রন্থের নাম গল্প হওয়ায় ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’ বাড়তি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। গল্পের শুরুর বাক্য কাঠামো অন্য গল্প থেকে আলাদা। শুরুতে সরল বাক্যে টুকরো টুকরো দৃশ্যপট তৈরি করেছেন। এটি আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন পরবর্তী প্রভাব এবং একটি পরিবারের ধর্মীয় মূল্যবোধের দ্বন্দ্বের জন্য গল্পটি একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণও। তবে পড়তে গিয়ে দু একটি বিষয় মনে হচ্ছিল আরেকটু মনোযোগ দিলে ভালো হতো, যেমনঃ মোনা মেয়েটির সাথে সমীরদের পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। মানে সংকটটা নিম্ন বর্ণের, না অন্য ধর্মের? ‘রাজলক্ষ্মী’ নামটি একই সঙ্গে ব্যক্তি ও স্থানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করায় পাঠক সামান্য অসচেতন হলে ছন্দপতনের আশংকা রয়েছে।

তবে রুমা মোদকের আরেকটি গল্প নিয়ে কথা বলতে চাই, ‘সে সন্ধ্যায় দ্রৌপদী এসেছিল।’ এই গল্পের ভেতরের গল্প, বিস্তৃতি আরও বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে। সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরুর দ্বন্দ্বটা আমরা যেমন করে দেখি, রুমা মোদক সেখানে আরও একটি মোচড় এনেছেন। ধর্মের ভিত্তিতে শ্রেণী বিভাজন ছাড়াও মানুষের সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার বিষয়টির কারণে তার অবস্থানগত পার্থক্য তৈরি হয়, এ বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করেছেন গল্পে। জ্যোতিষের লুঙ্গি হাতে হাতে যাওয়ার মত নির্মম মানবিক সংকট উঠে এসেছে। এই ঘটনাটা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটা সাদাকালো ছবির দৃশ্য তুলে আনবে পাঠকের চোখে। সেখানে পাক আর্মিরা বাঙালি পুরুষের কাপড় সরিয়ে পরীক্ষা করছে তার ধর্ম। এই যে দৃশ্যপট তুলে আনা এটা লেখকের দক্ষতা। তবে বিকল্প শব্দ ব্যবহার প্রয়োজন। গল্পের প্রথমদিকে ‘সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু' শব্দ দুটোর অপরিমিত ব্যবহার হয়েছে।

রুমা মোদক
পাঠক সাদিয়া তো লেখকও বটে। যে আলোচনাই করবে মাথা পেতে নেবো। হ্যাঁ, হয়তো মোনার পরিচয়টা প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে তোমার মনে হয়েছে। লেখক হিসেবে এ কাজটা আমি করেছি সচেতন ভাবে। চেয়েছি পাঠক আবিষ্কার করুক,গল্পের শেষে একবার মাত্র মোনার ধর্মীয় পরিচয়টা উল্লেখ করেছি, এর আগে সমীরের পরিবারের যে আচরণ, আচরণগতভাবে বর্ণ হিন্দু পরিবারের এটা খুব অচেনা চিত্র নয়। আর মোনা যে নিম্নবর্ণের হিন্দু নয়, এটা বুঝিয়েছি পার্বতীর পর্যন্ত মন্দিরে উঠতে পারার অধিকারের মাধ্যমে।
হিন্দু পরিবারগুলোতে কিন্তু নিম্নবর্ণের হিন্দুরা গৃহকর্মীর কাজ করে।

যাই হোক, এই ব্যাখ্যাটুকু কিন্তু একদম আমার দেয়া উচিত হচ্ছে না। লেখা হয়ে যাবার পর পাঠকের ব্যাখ্যাই কিন্তু শেষ কথা। এক্ষেত্রে পাঠক যে জায়গাটিতে কমিউনিকেট করতে পারছেন না, তার ব্যার্থতা সম্পূর্ণ লেখকের।

ধন্যবাদ সাদিয়া সে সন্ধ্যায় দ্রৌপদী এসেছিল  গল্পটির অন্তর্গত ভাবটি ধরতে পারার জন্য। লেখক হিসাবে আমি পাঠকপ্রিয়তা ততোটা আশা করি না, যতোটা পাঠকের মনোযোগ আশা করি।

রিমি মুৎসুদ্দি 
 রুমাদি এক্ষেত্রে আমার ধারণা একটু ভিন্ন। ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’ গল্পে যেমন মোনার সম্পূর্ণ পরিচয় পাঠক একেবারে শেষে পায় সেরকমই ‘গল্পটি মামুলি স্পিডব্রেকারের’ গল্পে আবার সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিমূর্তি স্পিডব্রেকার নিজেই গল্পের একটা চরিত্র হয়ে গিয়েছে-- তা পাঠক একেবারে শেষে জানতে পারে। পাঠককে এইভাবে রহস্যময়তার আবহে বদ্ধ রেখে গল্পের শেষ পর্যন্ত একটা নাটকীয়তা বজায় রাখা-- তা আপনার গল্পগুলোকে একটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। গল্পগুলো পড়ার পরে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলাম। বিজলী মার্কা সাবান অথবা কালের পোস্টমাস্টার গল্পে টিলা বাবু আর রূপালির গল্পের মধ্যে বিজলী মার্কা সাবানের ঢুকে পড়া যেমন নাটকীয়তার সৃষ্টি করেছে, তেমনি অন্ত্যজ মানুষের জীবন ও তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ, হতাশা, জেদ সব ফুটে উঠেছে। তুলনায় হরিপদ কেরাণির মেটামরফসিস গল্পে বরং একেবারে শেষে হরিপদর এ ডি এম স্যারের
টেবিলে চিঠিখানা ছুড়ে মারার ঘটনা পাঠকের কাছে অনেক বেশী প্রেডিক্টেবল মনে হয়েছে।

রিমি মুৎসুদ্দি
সাদিয়া আপনার বেশিরভাগ গল্পেই বাংলাদেশের মফস্বলজীবনকে খুব কাছ থেকে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আপনি কি নিজের শিকড়ের সঙ্গে কোন সংযোগ স্থাপন করেন গল্পটি লেখার সময়? জলের দাগ গল্পটি এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
জলের দাগ’ গল্পটি মফস্বল নয়। খুলনা অঞ্চলের ভৈরব নদীর পাশে 'আজইগাঁতি ‌গ্রামকে' কেন্দ্র করে, যেখানে নদীর ঘাটের ডাক আসছে, মূল চরিত্র মাছ ধরা বা ফসলের খেতির বদলে ঘাটের ইজারায় মহাজনের সঙ্গে কাজ করতে যাচ্ছে।

মফস্বল ছেড়েছি বহুদিন। তবে শৈশবই আসলে মানুষের আজীবনের মানসিক গঠনে রাজত্ব করে মনে হয়। মফস্বলের জীবন বিস্তৃত। আদতে মফস্বল শুনলেই যে বহু নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত একটা দৃশ্যপট তৈরি হয় এর বিপরীত দিকও রয়েছে যেটা অনুভবের। মফস্বলের মানুষ বাড়িতে পানি না থাকলে মহল্লার পুকুরে গোসল করতে যায়। এখনও পাঁচশ টাকায় অঙ্কের মাস্টারের বাড়িতে সকাল বেলা ব্যাচে পড়া যায়। সহজেই মুদি দোকানি বাকিতে চাল দিয়ে দেয়। মফস্বলে বড় বড় গাছ থাকে। কোট পাড়া, কলেজ রোড বা ময়রা পট্টি নামে কমন কিছু জায়গা থাকে। আবার ধরুণ অনেক হীনমন্যতাও বেশি আছে যাকে বলে ভিলেজ পলিটিক্স। আমাদের শৈশব কৈশোরে জাতীয় রাজনীতি মফস্বল জীবনে অতো বেশি প্রভাব রাখেনি যতটা নগর জীবনে রেখেছে। অনেক ঘটনাই আমরা একদিন বাদে জানতাম। তবে এখন নাগরিক জীবনে যা-ই দেখি সেই দেখার সঙ্গে কোথাও না কোথাও হয়ত মফস্বলের জীবন দেখার অনুভূতিও মিলেমিশে যায়। মফস্বল নিয়ে লিখতে গেলে দোকানে লাগানো রঙিন পোস্টার পাই, সোনার দোকানে ঠাণ্ডা খাওয়ার গল্প বলতে পারি, মাস্টারমশাইয়ের ধুতি আর কালো ছাতা নিয়ে হেঁটে আসার কথা বলতে পারি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মফস্বল আর গ্রামেই বাস করে। তাই গল্প বলতে গেলে তাদের গল্প আসবে স্বাভাবিক। তবে লেখা দিয়ে কতটা সংযোগ তৈরি হয় তা পাঠক বলবে।

রুমা মোদক
সাদিয়া ব্যক্তিগতভাবে গ্রামের মেয়ে কিনা জানিনা। আমি কিন্তু গ্রামের মেয়ে নই। একবারে নিপাট মফস্বল মানে জেলাসদরের মেয়ে। গ্রামের সঙ্গে আমার সংযোগ খুবই কম। যতদূর জানি সাদিয়া ফরিদপুরের মেয়ে। তবে ও ঘুরে বেড়ায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। লেখার বিষয় চরিত্র উপাত্ত সে পথে ঘাটেই খুঁজে নেয় এবং তা সার্থকতার সঙ্গেই উপস্থাপন করে। জলের দাগ গল্পটিতে আজাই গাতী গ্রামের একটি ঐতিহ্যের ছবি পাই, ‘গাস্বী পার্বনে-- 
'আশ্বিনে রান্ধে কার্তিকে খায়, 
যে বর মাংগে সে বর পায়’।

আমরা ছোটবেলায় মফস্বলজীবনেও এসব রীতি আচার পালন করতে দেখেছি মা-ঠাকুমাদের। মফস্বলে বাস করেও এখন আর এসব তেমন দেখি না। সাদিয়ার গল্পের মধ্য দিয়ে এই একটি বিলুপ্তপ্রায় আচারের সাথে পাঠকের প্রথম কিংবা পুুনরায় পরিচয় হয়, সেই সাথে গল্পটিতে গ্রামীণ প্রচলিত জীবন ও জীবিকাবিচ্ছিন্ন মানুষের পরাজিত হবার একটি ইংগিতও আছে। যদিও শিউলির মৃত্যুর কোন যুক্তি সঙ্গত কারণ গল্পটিতে নেই, তবে একজন গর্ভবতী নারীর এরকম মৃত্যু অসম্ভব নয়। কিন্তু গ্রামের মানুষের সেই যে ধারণাটি ''যে মানুষ গাঙ বাঁচায় সে অত সহজে ছাড়েনা' --তবে কি পশ্চাৎপদ মানুষের অবৈজ্ঞানিক ধারণাটিকেই সত্য প্রমাণ করে শিউলির মৃত্যু, প্রশ্নটি থেকে যায়।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
গ্রামে শৈশবটা পেলেই মনে হয় ভালো হতো। যে বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে চাই তা জন্মগতভাবেই জানতাম। এখন বরং খুঁজে বের করে পড়তে হয়, মানুষের সাথে কথা বলতে হয়। ফরিদপুর সদরে বড় হয়েছি। ফরিদপুর জনপদের দিক থেকে পদ্মার পাড়ের বহুকালের প্রাচীন সমৃদ্ধ শহর। তবে নানাবাড়ি দয়ারামপুর হওয়ায় ছোটবেলায় বহুবার গ্রাম দেখা হয়েছে। এই ফরিদপুরের মানুষ পল্লী কবি জসীম উদ্দীন, মৃণাল সেন, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আলমগীর কবির, অম্বিকাচরণ মজুমদার, তারেক মাসুদ এবং আমাদের বঙ্গবন্ধু। ওপার বাংলা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কোনো প্রসঙ্গ আনলে ফরিদপুরকেই টেনে আনে বলে একটা গর্ব আছে আমার।

আমাদের প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা তাঁর বড় ভাইয়ের কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন, গাছেদের কী ঈশ্বর আছে ? জলের দাগ গল্পে নারীর সারারাত ধরে ব্লিডিং হবার কথা বলতে চেয়েছি, মিসক্যারেজ। আর ওতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জল ও মাটির সাথে সম্পর্কিত পেশা বদলের কারণে এটা প্রকৃতির এক ধরণের প্রতিশোধ। অবৈজ্ঞানিক ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কেন হবে? আমি নিজেও এই প্রকৃতির হিসেব ব্যক্তি জীবনে বিশ্বাস করি। অবৈজ্ঞানিক বললে এডগার এ্যালেন পো'র বাস্তব ও স্বপ্নের মধ্যকার বিভ্রান্তিগুলো পুরো বাতিল বলে খারিজ করে দিতে হবে। কিন্তু দেখুন এই একই ইমপ্রেশনিস্ট পদ্ধতি পো'রও আগে নিকোলাই গোগল পর্যন্ত নীরিক্ষা করে গেছেন। গোগলের 'শিনেল' গল্পের বাস্তব চরিত্রগুলোর কল্পনার মিশেলের ভাবনা খেয়াল করলেই সেটা স্পষ্ট হয়। অথচ দস্তয়ভস্কি পর্যন্ত বলছেন, "রাশিয়ার সব গল্প বেরিয়ে এসেছে গোগলের 'শিনেল' গল্প থেকে।" তবে লেখার দুর্বলতার কারণে হয়ত পাঠকের কাছে তা অস্পষ্ট বলে রুমাদি যুক্তিগত কারণ নেই বলছেন বা ‘অবৈজ্ঞানিক’ ধারণা করছেন। এই দায় নিশ্চয়ই আমার।


রিমি মুৎসুদ্দি :
রুমা আপনার লেখায় দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালবাসার প্রতিফলন দেখা যায়। আপনি কি মনে করেন, লেখক তাঁর লেখায় দেশপ্রেমের প্রতিফলন ঘটাবে না দেশপ্রেম নিহিত থাকবে লেখার মধ্যে? সাদিয়া আপনার কি মনে হয়?

রুমা মোদক
 লেখকের দেশকাল থাকতে নেই। কোন নির্দিষ্টকাল এবং দেশ অতিক্রম করে সর্বকালের সর্বজনের হয়ে উঠার সাধনাই লেখকের সাধনা। তবে যে মাটি ও শিকড়ে, যে কালে ও সময়ে তার জন্ম বেড়ে ওঠা তাকে লেখক কেন কোন মানুষেরই তো অস্বীকার করার উপায় নেই। আর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ তো একজন মানুষের স্বতন্ত্র্ পরিচয় যদি তা তাকে সংকীর্ণ প্রতিক্রিয়ায় বন্দী না করে ফেলে। দেশপ্রেম অন্তরে নিহিত থাকে বলেই লেখায় তা প্রতিফলিত হয়। তবে সেই দেশপ্রেম যদি রাজনৈতিক নেতার ভাষণ কিংবা শ্লোগান হয়ে উঠে তবে তো গল্পের শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয়। সচেতনভাবেই একজন লেখককে সংযত হয়ে লিখতে হয় বলে আমি মনে করি। দেশপ্রেম উপস্থাপিত হতে হয় নান্দনিক ভাষ্যে তথা সংকীর্ণতা অতিক্রম করে সার্বজনীন হয়ে।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 লেখকের দেশকাল থাকতে নেই এই ভাবনার দু'রকম ব্যাখ্যা হবে। লেখক পুরো পৃথিবীর সব মানুষের মানবিক বিষয়কে ধারণ করবেন যেমন সত্যি তেমনি তার সাহিত্যে মূল উপজীব্য তারই জনপদ হয় সেও সত্যি। কোন লেখকই অন্য ভূখণ্ডের কথা বলে কখনো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। শেক্সপিয়ার তো বলেই দিয়েছেন, মানুষের মৌলিক মানবিক বিষয় মাত্র কয়েকটি আর এই সাহিত্যের খোরাকও তাই। দেখুন চাহিদাগুলো কিন্তু সব দেশের সব রাষ্ট্রের মানুষেরই এক। তবুও দীর্ঘদিন ধরে একটি জনপদের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠে লেখক আগে তারই প্রতিনিধিত্ব করেন।

লেখায় দেশপ্রেম নিহিত না থাকলে তো প্রতিফলন হবেনা। তবে কোন সাহিত্যকর্মই একেবারে অমন থাকতে নেই বা এই হলে সাহিত্য কর্ম বলা যাবে না এই ছাঁচে ফেলতেই আমি রাজি নই। যখন যেভাবে ভাবনা আসবে সেভাবেই লেখা উচিত। সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে কখনো লেখায় দেশপ্রেম থাকবে, কখনো থাকবে না। কখনো স্রেফ নিছক একটা অন্য প্রসঙ্গের বাক্যও ট্রিগার করতে পারে তৃতীয় ভাবনাকে। মানে যা দেখাচ্ছি এবং পাঠক যা দেখলেন এই দুয়ে মিলে পাঠকের মধ্যে তৈরি হতে পারে তৃতীয় দৃশ্যপট. অনেকটা সিনেমার মন্তাজ এর মতো।


রিমি মুৎসুদ্দি :
 সাদিয়া আপনি যে জীবন কাছ থেকে দেখেছেন বা দেখেন নি তার প্রতিফলন পড়েছে আপনার লেখায়। সংবাদপত্রের শিরোনাম, গোর- এই গল্পগুলোর মধ্যে একটা রহস্যময়তা ফুটিয়ে তুলেছেন। এই রহস্যময়তা কি গল্পের গতিকে কোথাও ব্যাহত করেছে বলে আপনার মনে হয়? রুমা আপনি গল্পগুলো পড়ে থাকলে একটু উত্তর দেবেন।

রুমা মোদক
 সাদিয়ার গোর গল্পটি আমার খুব পছন্দের একটি গল্প। তার কারণ এর রহস্যময়তা নয়, বরং ব্যক্তিমানুষের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানায়। রহস্যগল্পও কথাসাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধধারা। তবে পাঠক হিসাবে এ দুটি (গোর ও পা) গল্প পড়ে আমার মনে হয়েছে সাদিয়া রহস্য গল্পলেখার উদ্দেশ্যে গল্পগুলি লেখেনি। তবে যে রহস্যময়তা তৈরি করেছে তা পাঠককে বরং গল্পগুলি শেষপর্যন্ত পড়তে আগ্রহী করেছে।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 রুমাদি খুব ঠিক ধরেছেন, আমি রহস্যময়তা তৈরির জন্য গল্পগুলো ওভাবে লিখিনি। গল্প বলার মধ্য তৈরি হয়েছে হয়ত রহস্য।

চোখে দেখা ও সংবদেনশীলতা দিয়ে কল্পনা করতে পারা দুটোই লেখকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেখা এবং না দেখা দুটো মাধ্যমেই লেখার ভাবনা তৈরি হতে পারে। ‘গোর’ এবং ‘পা’ দুটো গল্পই সামাজিক সংকটের একটি চিত্র তবে বর্ণনা পরাবাস্তবতা নির্ভর। জেন্ডারের কারণে স্বভাবতই এই দুই গল্পের কোনটাই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এমন অনুভূতি বা ঘটনা কারো না কারো জীবনে ঘটছে আমার আশেপাশে।

পেদ্রো হুয়ান গুটিয়েররেজ-এর সেই সাংহাইতে খেলা দেখানো পিপিংটম শো এর সুপারম্যানের জীবন অথবা ধরুণ তলস্তয়ের মাসল্ভা কাতিউশা চরিত্রটা লেখকের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব? অথচ সুপারম্যান ও কাতিউশা দুজনের গল্প বলতে বলতে কিউবা বিপ্লবকালীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাশিয়ার কৃষ্টি কালচার সবই এমনভাবে তুলে এনেছেন যে লেখককেই খোদ ওই চরিত্র বলে মনে হয়। সার্থক সাহিত্যকর্ম। আমরা শুধু দেখে বা শুনে শুনে যে কতো জীবন ধারণ করে ফেলি তার ইয়াত্তা নেই। এ জন্যই হয়ত লেখার একটা আনন্দ আছে যেখানে ভাবনার বিলাসীতা করা যায়।

যা হোক 'সংবাদ শিরনাম' একেবারে নগর জীবনের ঘটনা। একদিন মাঝরাতে কমলাপুর রেল স্টেশনে দাঁড়িয়েছিলাম । সেখানে সিএনজি চালক ও যাত্রীদের মধ্যেকার সম্পর্ক দেখেই চট করে মাথায় এসেছিল গল্পের বীজটা। লিখতে বসে সেটা ধরন ধারণ প্রকরণ বদলে নিজের ইচ্ছেমত একটা আকার নিয়েছে। আমিও ওকে ওর মতো যেতে দিয়েছি নিজস্ব প্রবাহে।


রিমি মুৎসুদ্দি :
 রুমা আপনি একজন নাট্যকার। আপনার গল্পগুলোতে নাটকীয়তা আছে। এই নাটকীয়তা আরোপিত নয়। পাঠককে তা স্তম্ভিত করে, স্তব্ধ করে দেয়। ছোটগল্পের আকারে এইভাবে জীবনভাষ্য ফুটিয়ে তোলার শৈলী বিষয়ে কিছু বলুন।

রুমা মোদক
আামি নাটক লেখা শুরু করেছি কিন্তু অনেক পরে। গল্প লিখছি সেই কলেজজীবন থেকে। তারও আগে কিংবা পরে কবিতাও লিখেছি। সংসার যমজসন্তান কর্মজীবন ইত্যাদি অনিবার্য প্রতিবন্ধকতার কারণে গল্পলেখার ক্ষেত্রে বেশ একটা দীর্ঘবিরতি ছিল। তখন নাটকগুলো মঞ্চে জীবিত ছিল বিধায় নাট্যকার হিসাবে পরিচিতি পেয়ে গেছি। মূলত গল্প লেখায় শুরু থেকেই আমার চেষ্টা ছিল নিজস্ব একটা ক্রাফট তৈরির, যা কিনা আমার গল্পের প্রতি পাঠককে আগ্রহী করবে কিংবা আমাকেও একটি স্বতন্ত্র্তা দেবে। প্রতিটি গল্পে সেই শৈলী বিনির্মাণের চেষ্টা থাকে যেন পাঠক  পাঠ শেষে একটা কিছু আবিষ্কারের আনন্দ পায়। কোন পাঠক যখন বলেন কোন একটা গল্প তিনি পুনঃপাঠ করে নতুন আবিষ্কারে স্তব্ধ হয়ে গেছেন তখন মাঝেমাঝে শৈলী তৈরিতে শ্রম বা প্রচেষ্টা সার্থক মনে হয়। মূলত গল্পকার যখন গল্প লেখেন তিনি নিজে কিন্তু পরিণতি জানেন। মুন্সিয়ানা হলো সেই পরিণতি আগে থেকেই পাঠককে বুঝতে না দেয়া। এই বুঝতে না দেয়াটাই হয়তো নাটকীয়তা। গল্পলেখার ক্ষেত্রে এচেষ্টা সচেতনভাবেই করি। কতটা পারি পাঠকই বিবেচক।

রিমি মুৎসুদ্দি :
সাদিয়া আপনার গল্পের অ্যাপ্রোচ জার্নালিস্টিক। আপনার পেশা সাংবাদিকতা কি আপনার লেখায় কোন প্রভাব ফেলে।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 পেশা নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলবে লেখায় কিন্তু অ্যাপ্রোচ বা উপস্থাপনের কৌশলটা জার্নালিস্টিক, এটা কেমন ঠিক ধরতে পারছি না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তুলনামূলক বেশি কমিউনিকেটিভ শব্দ ব্যবহার করে কাজ করতে হয়।পাঠক যেন সহজে শব্দটা পড়ার সাথে সাথে বুঝতে পারে। পেশা হয়ত এই সহজ বাক্য ব্যবহারের একটা অনুশীলন করিয়ে দেয়।

সবসময়ই নতুন নতুন খবর, নানা জনপদের ভিন্ন ভিন্ন গল্প শুনতে হয় কাজের খাতিরেই। এটাও একটা ভালো দিক মনে হয় এ পেশার। জীবন দেখার  ব্যাপ্তি বাড়াতে কিছুটা টুলস হিসেবে কাজ করে। তবে তিন বাক্যে একটা খবর জানানো আর গল্পের কাঠামো একই রকম হবে না।

রুমা মোদক
 সাদিয়ার গল্পে এ ধাঁচটা কিছুটা আছে। তবে এটা বরং তার বর্ণনার ধারাকে সহজ করে তুলেছে বলে আমার মনে হয়েছে।

রিমি মুৎসুদ্দি :
 লেখক মাত্রেই সমাজসচেতন। একজন গল্পকার কি তাঁর লেখার মধ্যে সমাজসচেতনতা বাধ্যতামূলকভাবে ফুটিয়ে তুলবেন। এক্ষেত্রে যদি আমরা বাংলা সাহিত্যের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ করি, তাহলে চিত্রটা ভিন্ন পাব। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক-- এঁদের তিনজনের লেখার মধ্যে এই ভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। আবার সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আল মাহমুদকে যদি লক্ষ করি সেক্ষেত্রেও ভিন্ন বৈচিত্র্য লক্ষ করব।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 ‌'লেখক মাত্রই সমাজসচেতন' এভাবে বললে কেমন একটা দায় তৈরি করে দেবার প্রচেষ্টা টের পাওয়া যায়। রিমিদি কী বলেন? সমাজ নিয়ে না লিখে শুধু যদি কেউ ব্যক্তিগত জীবনবোধ থেকেই দারুণ কিছু কবিতা লিখে ফেলে তবে আমরা তাকে সাহিত্যকর্ম বলবো না? প্রভাবিত হবো না? আমার তো মনে হয়, বাধ্যকতা দিয়ে লিখতে গেলে যাচ্ছেতাই ভাবে নিজের স্ট্যান্ড নেবার প্রচেষ্টাটাই আরও নগ্ন হয়ে ওঠে যেটা লেখকের জন্য ক্ষতির। অমন হলে তাঁর কবিতা বা গল্প না লিখে প্রবন্ধ লেখা উচিত।

রিমি মুৎসুদ্দি
 হ্যাঁ, সাদিয়া আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে সহমত। লেখক অবশ্যই সংবেদনশীল হবেন। সমাজের বিভিন্ন ঘটনা তাঁকে আলোড়িত করবে। তবে সেই আলোড়ন তাঁকে গল্পে ফুটিয়ে তুলতেই হবে এরকম কোন বাধ্যকতা নেই। এ প্রসঙ্গে দেবেশ রায়-এর ‘দুপুর’ গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল। একটা দুপুরকে ঘিরে একই পরিবারের ভিন্ন বয়সী মানুষদের ভাবনা চিন্তার মাঝে দুপুরও যেন কখন গল্পের চরিত্র হয়ে ঢুকে পড়েছে। নবারুণ ভট্টাচার্য নিজেকে বলতেন 'আজকের সাহিত্যের সার্কাসে’ স্বঘোষিত ‘আউটসাইডার’-এর ভূমিকা নিয়ে বিপদজনক ট্রাপিজ-আঁধারে তুলকালাম ঝাঁপ দিতে চাওয়া লেখক।”(উদ্ধৃতি- নবারুণ ভট্টাচার্য- বাক্য মধ্যবর্তী নীরবতা- অগ্নি রায়)।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
বিভূতিভূষণকে আমি তারাশঙ্কর ও মানিক থেকে কিছুটা আলাদা করব। তিনি মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্কের সমন্বয়েই গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। তাঁর লেখায় চমকে দেবার প্রবণতা নেই কিন্তু পড়তে পড়তে প্রতিটি ঘটনাতেই যেন আবেশ করে রাখেন পাঠককে। সে তুলনায় তারাশঙ্কর ও মানিক আরও বেশি বস্তুবাদ ও জীবন ঘনিষ্ঠ। চমকে ওঠা আছে তাদের তৈরি মানবিক আচরণে, চরিত্রে। এই চমকে দেয়া ওয়ালিউল্লাহর লেখাতেও আছে।

তারা প্রত্যেকেই একটি কাজ করেছেন, পাঠককে ভুলিয়র-ভালিয়ে নিয়ে মূল বক্তব্যটি পড়িয়ে দিয়েছেন। এই ৫ জনের কারও লেখাতেই পাঠক শুরুতেই বুঝবে না, ঠিক কোন বক্তব্যটা সে পড়তে যাচ্ছে। এটাই তাদের লেখার প্রধান আকর্ষণ মনে হয়। তবে সচেতনতার বিষয় নিয়ে যদি বলি, ওয়ালিউল্লাহ ও আল মাহমুদ এর লেখায় মুল বক্তব্যটি পাঠককে দিতে চরিত্রটিকে প্রথম থেকেই তিনি ওই আদলে তৈরি করেছেন। সে তুলনায় বাকি তিনজন একটি লেখায় কয়েকটি গল্প তুলে ধরে বিবেচনার দায়িত্ব পাঠকের উপরই রাখেন ।

রুমা মোদক
লেখক আসলে কী লিখবেন পুরোটাই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। লেখক পাঠক রুচির অনুসারী হবেন আমি এটা মোটেই সমর্থন করি না। বরং পাঠকের রুচি তৈরি করে দেয়ার দায়িত্ব খানিকটা লেখকের উপর বর্তায়। একজন লেখক কেন লেখেন? মারিয়ো বার্গেস ইয়োসার সাথে এক সাক্ষাৎকারে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, আমি এমন কোনো ভালো সাহিত্যের হদিস জানি না যা প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের গুণগান করে। ভালো সাহিত্যে সবসময়ই প্রতিষ্ঠিত জেঁকে বসা ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধকে ভেঙে নতুন জীবনযাপনের, নতুন সমাজগঠনের প্রবণতা থাকে। মোটামুটিভাবে আমার মতামতও তাই।

আমি মনে করি লেখক সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল মানুষ। তার জীবনলব্ধ অভিজ্ঞান তিনি প্রকাশনা করে পারেন না বলেই তিনি লেখক। তার শিক্ষা-রুচি-জীবনদর্শন সেই জীবনকে দেখার দৃষ্টি তৈরিতে আর প্রকাশ ভঙ্গিতে বিরাট ভূমিকা রাখে বলে আমার মনে হয়। এক্ষেত্রে তাঁর যে ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গিতাঁকে লেখক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে তার ফলে স্বাভাবিকভাবেই এস্টাব্লিশমেণ্টএর সাথে তাঁর একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মার্কেজ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে যে, একজন লেখক লেখেন তাঁর পরিপার্শের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধের একটি উপায় হিসাবে।

মূলত প্রত্যেক লেখকেরই একটা আদর্শিক নির্মাণ থাকে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা যদি বলেন, মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নিষ্পেষণে জীবনের বাহ্যিক আচরণের মধ্যেও তিনি কিন্তু মনোজাগতিক বৈচিত্র্যতা খুঁজেছেন। কিন্তু ব্যক্তিমানুষের অন্তর্দহন কিংবা অস্তিত্ববাদী সংকটের জন্য তিনি কিন্তু সবসময় সমাজ-সংস্কার-রাষ্ট্রের প্রতি দোষারোপ করছেন না। আন্থন চেখভ তার আমলার মৃত্যু গল্পেই ভান দমিত্রিচ যখন একটা হাঁচি দেয়ার অপরাধে গ্লানিতে মরে যায় তখন কিন্তু রাশিয়ার অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তৃতীয় আলেকজান্দ্রা বিপ্লবীদের ফাঁসি দিচ্ছেন, এক ভয়ার্ত আশঙ্কাময় জীবনযাপন ভীষণ রূপকায়িত হয়ে উপস্থিত হয় আমাদের কাছে। ওয়ালীউল্লাহর গল্পে, যেমন খুনী গল্পের রাজ্জাক খুন করে পালিয়ে বেড়ানো ছেলেটি যখন মোমেন হয়ে বাঁচতে চায় তার চরিত্রও কিন্তু ভয় শঙ্কাতাড়িত। অন্যত্র তিনি সমাজ সম্পর্কের সচেতন হলেও এখানে কিন্তু সমাজের দায়ী দিকটির প্রতি ইংগিত নেই। অন্যদিকে মানিক সচেতনভাবে ফ্রয়েডীয় মনোবীক্ষণ আর মার্কসবাদীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ দ্বারা প্রভাবিত। এখন আমরা পাঠক কিন্তু তাদের নির্দেশ করতে পারি না কোনটা লেখা উচিত কিংবা অনুচিত। আমরা পাঠক হিসাবে ভালো লাগা না লাগা ব্যাখ্যা করতে পারি কেবল। আসলে এই খণ্ডিত উদহারণগুলোর মাধ্যমে আমি যা বলতে চেয়েছি তাহলো, লেখক কী লিখবেন পুরোটাই তার ব্যক্তিগত শিল্প-বিশ্বাসে। তবে সংবেদশীল মানুষ হিসাবে লেখকের পক্ষে সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নৈর্ব্যক্তিক থাকা অসম্ভব।

রিমি মুৎসুদ্দি :
লেখক সমাজ সংস্কারক নন-- তিনি সমাজের দর্পণ হতে পারেন। এই বিষয়ে আপনাদের কি মতামত।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 লেখক সমাজ সংস্কারক নন আবার সমাজের দর্পণ হতে পারেন এই ভাবনার মধ্যে বিরোধ নেই। লেখায় সমাজের দ্বন্দ্ব অসঙ্গতি উঠে এলেই তো সেটা দর্পণ আবার ওটাই তো সংস্কারেরও অংশ। লেখক দুটোই হতে পারেন। আবার সবসময় শুধু সমাজ নিয়েই লিখতে হবে তাও না হতে পারে। কোন কিছুই আসলে একেবারে ম্যান্ডেট দেবার মতো করে এক রৈখিক নয় লেখকের জন্য। শুধু কোন এজেন্ডা নিয়ে লিখছেন এই অনুভূতিটা যেন পাঠক না পায়। সেটা সৃজনশীলতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক মতবাদ হয়ে ওঠে।

রুমা মোদক
আমার মনে হয় এ প্রশ্নের উত্তর আগের বক্তব্যে অনেকখানি এসে গেছে। সরাসরি সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব লেখকের কখনোই হতে পারে না। বাংলা গদ্য সাহিত্যের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিন্তু ইতিহাসে সমাজ সংস্কারক হিসাবেই চিহ্নিত। আবার মার্কেজের কাছে ফিরতে হয়, সমাজ পরিবর্তনের বিধ্বংসী ইচ্ছা যদি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কিংবা সুচিন্তিত ভাবে সাহিত্যে প্রয়োগ করা হয় তবে সাহিত্য মান হারায়। অন্যদিকে নানা বিষয়ে বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও বঙ্কিমচন্দ্রের স্থান সাহিত্যিক হিসাবেই নির্ধারিত।

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
লেখকের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নৈব্যক্তিক থাকা অসম্ভব-- রুমাদির এই ভাবনার সাথে আমি পুরোপুরি একমত। একই সঙ্গে মনে করি, লেখায় রাজনৈতিক মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা যেন পাঠক টের না পায় সেই সচেতনতাও লেখকের। পাঠককে ট্রিগার করতে হবে তার অনুভূতি নিয়ে খেলাতে খেলাতে। যদি প্রথমেই বুঝে যায়, লেখকের একটি উদ্দেশ্য আছে তবে সে দুর্বলতাও লেখকের নৈব্যক্তিক হতে না পারা।



রিমি মুৎসুদ্দি
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের কথাই বলছি, প্রায় প্রতিটা মিডিয়া হাউসেই পুরুষতান্ত্রিকতার ছোঁয়া রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে রুমাদি ও সাদিয়া আপনারা দুজনেই নিজেদের লেখা এমন একটা স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন, সেখানে আলাদা করে মনে হয় না লেখাটা একজন নারী লেখকের। সাধারণত মহিলা লেখকদের প্রতি এই অভিযোগ এখনও বর্তমান যে তাঁরা লেখায় আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতে পারে নি। আপনাদের দুজনের বলিষ্ঠ ও সপ্রতিভ লেখা এই সমস্ত যাবতীয় অভিযোগ ভুল প্রমাণ করে।


সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 তিনশ বছর আগেও যে ভূখণ্ডে সতীদাহ প্রথা আর বিধবা বিবাহ বিধিনিষেধ ছিল সেখানে এত দ্রুত লেখার মতো সৃজনশীল বিষয়ে নারীর সম-অবস্থান তৈরি কঠিন। কয়েক বছর আগেও এ দেশে ‘বেগম’ পত্রিকা ছাড়া নারীরা লেখার জায়গা পেত না। ধর্মীয় অনুশাসন, সংস্কারের ট্যাবুর প্রথম প্রভাবটা পড়ত নারীর ওপর। সামগ্রিকভাবে দেখলে বিশ্ব সাহিত্যেও নারীর প্রবেশ দেরিতে। আঠার শতকের আগে কতজন নারী লেখকের নাম আমরা জানি বলুন? এই তুলনায় বাংলা সাহিত্যের নারী লেখকরা বরং যথেষ্ট প্রগ্রেসিভ। সেই কবে পাঁচশ বছর আগে চণ্ডী দাশের মৃত্যু নিয়ে ‌‌'রামী' নামক এক নারী পদ তৈরি করেছিলেন। এরপর সেই পথে হাঁটতে শুরু করলেন স্বর্ণকুমারী, বেগম ফয়জুন্নেসা থেকে রোকেয়া,মহাশ্বেতা, সুফিয়া কামাল। এরপর সেলিনা হোসেন রিজিয়া রহমান অথবা আমাদের আগের প্রজন্মের নাসরীন জাহান, শাহীন আখতার। তাদের কারও লেখায় কিন্তু সেই ‘নারীসুলভ আড়ষ্ঠতা’ পাইনা। তবুও জীবন যাপনে, ধরনে, সমাজে অংশগ্রহণের তারতম্যে কিছু প্রভেদ হবে স্বাভাবিক। আর পার্থক্যটা লেখায়ও ছাপ ফেলতে পারে। এই রে আড্ডা তো দেখা যাচ্ছে শেষ হচ্ছে না।  



রুমা মোদক
মিডিয়া পুরুষতান্ত্রিক বলে লেখক হিসাবে কোনভাবে বৈষম্যের স্বীকার হয়েছি, এমন কক্ষণো মনে হয় নি।

আর নিজ লেখার ক্ষেত্রে পাঠের জগত বোধহয় একটা লেখকসুলভ প্রস্তুতি তৈরি করে দিয়েছে ।বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের পাঠ আমার লেখক সত্তাকে অন্তত নারীসত্তায় সীমাবদ্ধ করে রাখে নি বলেই আমি মনে করি। ঠাকুরমার ঝুলি ঠিক মতো হাত থেকে রাখার আগেই উত্তরাধিকার সূত্রে ঘরেই পেয়ে গেছি তিন বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এমনকি মাক্সিম গোর্কিকেও। পৃথিবীর পাঠশালায় হাত রেখেছি, অপু দুর্গার সাথে সাথে পরিচয় হয়ে গেছে পাভেলের সাথেও।

কৈশোরের এই পাঠ্যাভ্যাসই তো মনে হয় লেখকের মানস জগত তৈরি করে দিয়েছে। পরবর্তী পাঠ কিংবা জীবনাভিজ্ঞতাজাত অভিজ্ঞানও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করেছে। সেক্ষত্রে জীবন ও জগতকে দেখতে পেরেছি মানবিক দৃষ্টি দিয়ে। কোন সীমায়িত মূল্যবোধে নয়।

আর লেখার ক্ষেত্রে এই যে নারীসুলভতার উর্দ্ধে ওঠা তা আমার খুব সচেতন প্রয়াস নয়। বলা যায় মানস জগৎটাই তো সেভাবে তৈরি। তবে নারীদের নিয়ে লিখি যখন তখন বুঝি, নারী হওয়া একজন লেখকের জন্য বিশেষ সুবিধা। কারণ একজন নারী যেভাবে নারীর মনস্তাত্বিক সংকট উপলব্ধি করতে পারে একজন পুরুষ কখনোই তা পারবে না।

রুমা মোদক
শেষ কথা, আসলে আড্ডা বলেই বোধহয় এই পাল্টা কৈফিয়ত টৈফিয়ত দিতে পারছি। তাই না রিমি? আসলে ইন্টারভিউ হলে কিন্তু ভাবতাম, কী এমন লিখেছি যে নিজের লেখা নিয়ে বলার দুঃসাহস করি!

আমি ভাবি--   আমি আসলে লেখালেখির ওয়ার্কশপের মধ্যে আছি। যদি লেখা চালিয়ে যাই, তবে শেষদিন পর্যন্ত তাই ভেবে নিজেকে ক্রম উত্তরণের চেষ্টাই করে যাবো। আর সত্যি কথা কি, যখন ক্লাসিক কোন লেখা পড়ি তখন নিজের লেখা নিয়ে বড়ই হতাশ বোধ করি। বোধকরি এই অতৃপ্তি থেকে লেখক সত্তার মুক্তি নেই।


সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
 আর বোধহয় সময়ের সঙ্গে পেরে উঠছি না। এটুকুই থাক। কী আর জানি। ওই দু তিনটে গল্প লিখেই এত কথা বললে মানুষ হাসবে। আসলে লেখকদের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে পোঁছাবার আগে লেখা নিয়ে কথাই বলা উচিত না। আপনি নিজেও জানেন, এখানে যা বলছি লেখার টেবিলে আসলে এর কোন জ্ঞান কোন বুদ্ধি খাটেনা। ওটা ভিন্ন জগত। সেই জগত লেখার ভেতরই থাকা উচিত। বাংলাদেশের একজন শক্তিশালী ভালো গল্পকার আমার প্রিয় শাহনাজ মুন্নী আপা। তিনি কী বলেন জানেন? আমার লেখাই তো আমার আড্ডা, সাক্ষাৎকার। এর বাইরে একটি কথাও বলবো না। ভাবনাটা আমি রেসপেক্ট করি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন