বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

ধারাবাহিক উপন্যাস অদিতার আঁধার : পর্ব--৬ দীপেন ভট্টাচার্য

দীপেন ভট্টাচার্য
---------------------------------------------------------------------
আগের পর্বগুলোর লিঙ্ক-- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম
---------------------------------------------------------------------
ক্যাফের একটি কোনা থেকে মৃদু পিয়ানোর শব্দ ভেসে আসে। কাচের বড় দেয়াল পেরিয়ে বাইরের অন্ধকারে ফুটপাথের পরে রাস্তার দু-একটা গাড়ির আলো দেখা যায়। কেমন অদ্ভূতভাবে অদিতা তার জীবনে ফিরে এল, ভাবে বিষাণ, বিনতাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কে অদিতাকে হত্যা করতে পারে?’


‘আমি বুঝতে পারছি না,’ বিনতা বলে, তার বাঁ হাতটা কপালে রেখে। মনে হয় সেই হাতটা তার মাথা থেকে একটা সুপ্ত জ্ঞান বের করতে চাইছে যা কিনা এই রহস্যের সমাধান দেবে। ‘আজ সকালে ড্রোন দিয়ে ওনার দেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর পরই নিয়ন্ত্রক দল তদন্ত করতে সেই জলাশয়ের ধারে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত অরণ্যে তারা অন্য কোনো মানুষের সন্ধান পায় নি। কিন্তু মানুষ ছাড়া ঐ তীর আর কে ব্যবহার করবে? পাঁজরের ফাঁক দিয়ে সেই তীর কেমন সুনিপুণভাবে হৃদযন্ত্র ভেদ করেছিল, এর জন্য দক্ষ হাত দরকার।’

‘হমমম,’ বলে বিষাণ গভীর চিন্তায়, ‘তবে আমাদের তীরন্দাজ একটি অ্যানড্রয়েড মানুষ-রোবট হতে পারে।’

‘তা হতে পারে,’ সায় দেয় বিনতা, ‘সেই জন্য হয়তো গোয়েন্দা দল মানুষের চিহ্ন পায় নি।’

‘তীরটা কোথায় এখন?’ বিষাণের প্রশ্ন।

‘এই শহরেই কেন্দ্রীয় ফরেনসিক ল্যাবে। ওরা তীরটার বয়স, বানানোর পদ্ধতি, অতীত ইতিহাস ইত্যাদি অনুসন্ধান করছে। শহরের তীর-ধনুক ক্লাব থেকে আরম্ভ করে ওরা পৃথিবীর সব সৌখিন তীরন্দাজদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’

বিষাণের কপালে চিন্তার ভাঁজরেখা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেদিকে তাকিয়ে বিনতা ভরসার স্থল খোঁজে। আজ সারাদিন খুব ধকল গেছে। প্রথমে অদিতার হৃদপিণ্ড থেকে তীরটা বের করতে বেশ চাপ তাকে নিতে হয়েছে যদিও পুরো অপারেশন রোবট মাধ্যমেই করা হয়েছে এবং অপারেশন-উত্তর নিরাময় পন্থাগুলি অদিতার শরীরের ভেতরের ন্যানোযানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে। এরপর বিশালগড়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগাযোগ করতে হয়েছে। খবর দেবার আধ ঘন্টার মধ্যে দশজনের একটি দল এসেছে, ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা বেশ কঠিন কাজ, পারলে লোকজন তাদের এড়িয়ে যায়। এই দলের আটজন ডামুরি অরণ্যের ভেতরে চলে গেল কয়েকটা ছোট ছোট যানে যে যানগুলো গাছপালার মধ্যে দিয়ে অনায়াসে উড়ে যেতে পারে। ওদের দুজন বিনতার সাথে আদিতার দেহ নিয়ে বিশালগড়ের মস্তিষ্ক সংরক্ষাণাগারের ‘নিলয়ে’ আসে। সারাদিন বলতে গেলে কিছুই খাওয়া হয় নি, আর এখন ক্লান্তিতে ঘুম নেমে আসছে। কফি খেয়েও সেই ঘুম কাটছে না। একটু শুতে পারলে ভাল হত, ভাবে বিনতা। শহরে তার একটা ছোট বাড়ি আছে, এছাড়া নিলয়ের কাছেই হোটেলে থাকতে পারে। একটু দূরেই পাঁচ রাস্তার একটা মোড়, সেখানে পর্যটকদের জন্য ছোট কিন্তু আরামের হোটেল রয়েছে।

‘মানুষ কি আজন্ম হিংসা আর সন্ত্রাসের বীজ বহন করে?’ আনমনা ভাবেই কথাগুলো উচ্চারণ করে বিনতা।


বিনতার ক্লান্তি বিষাণের অলক্ষিত থাকে না, কিন্তু তাকে বিশ্রাম নেবার কথা বলতে তার সাহস হয় না। বিনতার সঙ্গে তার সবে পরিচয় হয়েছে আর বিষাণ বিশ্বাস করে এইসব ক্ষেত্রে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা উচিত নয়। বিনতার প্রশ্নের উত্তর সে দেয় না, এর উত্তর তার ঠিক জানা নেই। অপরকে হত্যা করার আকাঙ্খা সম্বলিত কোনো দৃশ্যমান জিন মানব ডিএনএতে সরাসরি পাওয়া যায় নি যদিও অনেক গবেষক সম্ভাব্যতা তত্ত্ব ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে মানুষকে হিংস্র হবার পেছনে কয়েকটি জিনের ভূমিকা দেখতে পেয়েছেন। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন মানুষের সমাজে সংগঠিত হবার পেছনে হিংস্রতা কাজ করেছে। সে নিজে এই নিয়ে অনেক ভেবেছে। তবে গত কয়েক শ বছর ধরে হিংস্র অপরাধ ও সন্ত্রাসের মাত্রা ক্রমাগতই কমেছে। তবে পৃথিবীতে অপরাধের ছক বদলাচ্ছে, সেই ছকের মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন এল যখন মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া যুক্ত হল। মৃত্যুর যেখানে অর্থ নেই সেখানে সরাসরি খুনের ধারণা বদলেছে। মানুষকে মেরে ফেললেও সে যখন বেঁচে ওঠে তখন নতুন ধরণের খুনীর আবির্ভাব ঘটেছে। 'হত্যা' যেখানে হত্যা নয় সেখানে মানুষকে মেরে ফেলার মধ্যে যে নৈতিক বাধা বর্তমান ছিল তা অনেকের জন্য অপসারিত হয়েছে। তুচ্ছ কারণে, বাক-বিতণ্ডার সূত্র ধরে যে ধরণের হত্যাকাণ্ড তার পরিমাণ, মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে, বেড়ে গেল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল শখের সাইকোপ্যাথিক খুন। মানুষকে হত্যা করার মধ্যে যে এড্রেলানিন হরমোন-জনিত পৈশাচিক উন্মাদনা, শুধুমাত্র সেটুকু অনুভব করার অন্য এক শ্রেণীর খুনী সৃষ্টি হল। এদের মধ্যে একদল হল সিরিয়াল খুনী, তারা ছিল সাইকোপ্যাথ, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। জন্ম থেকে সাইকোপ্যাথদের জিন, মস্তিষ্কের গঠন ইত্যাদি বিচার করে তাদের পূর্ব থেকে চিকিৎসার কথা বিশ্ব পরিচালনা সংস্থা প্রতি পঁচিশ বছর অন্তর বিবেচনা করে, কিন্তু প্রতিবারই প্রতিনিধিরা খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে স্বাধীন চিন্তা বা ফ্রি উইল রক্ষার্থে সেই প্রস্তাবকে পরাজিত করে।


বাইরে রাস্তার আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে বিনতা। সেই ফাঁকে, বিনতার অলক্ষে, তার মুখটাকে দেখে বিষাণ। কালো চুলের একটা গুচ্ছ কানের পাশ দিয়ে গালের ওপর পড়েছে। কানের লতিতে একটা খুবই ছোট দুল, তাতে চমকায় নীল অসিতোপল মণি। সেই মণি সম্মোহিত করে বিষাণকে, সে যেন বিনতার অশরীরী মনকে দেখতে পায় - অশান্ত অথচ শৃঙ্খলাময়, সরল জীবনের যাত্রী অথচ দুঃসাহসে বিমুখ নয়। সেই দুঃসাহসই হয়তো তাকে অদিতাকে ভাল বাসিয়েছিল। শেষের চিন্তাটা বিষাণের অনুমান, কিন্তু বিনতার চঞ্চল চোখের মণিতে এক অতৃপ্ত প্রেমিকার অসাহয়তাই যেন সে দেখেছিল।

বিনতার খেয়াল হয় বিষাণ তাকে দেখছে। নিজের গাল না দেখতে পেলেও বিনতা বোঝে তার মুখ লাল হয়ে উঠছে, সে নিজেও বুঝতে পারে না সেই রক্তিমতার কারণ। বিনতা ভাবে তার দ্রুত কিছু বলার দরকার, তাই কিছুটা না ভেবেই অগোছালভাবে বলে, বিষাণের দিকে না তাকিয়ে, ‘এমন কি হতে পারে অদিতা সান কাউকে এমন একটি জিনিস করতে দেখেছিলেন সেটা সেই জন গোপনে করতে চেয়েছিল, কাউকে দেখাতে চায় নি। সেই সাক্ষাতের বা সাক্ষ্যর স্মৃতি মুছে দিতে সে অদিতাকে হত্যা করেছে?’

বিষাণ বিনতার কথায় বিস্মিত হয়, এই অনুমানটা অমূলক নয়। বলে, ‘আপনি বলছেন সেই স্মৃতি মুছে দিতে সে বা তারা ডামুরির বনে আততায়ী পাঠিয়েছিল যে আততায়ীর চিহ্ন গোয়েন্দা বাহিনী খুঁজে পায় নি, কক্ষপথের উপগ্রহে ধরা পড়ে নি। তাহলে বলতে হবে সেই দল খুবই শক্তিশালী, তারা বিশ্ব পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে?’

বিনতা বলে, ‘কোনো বড় ষড়যন্ত্র বলছেন? কিন্তু অদিতা সান কী এমন দেখেছেন যে তাঁকে হত্যা করে তাঁর স্মৃতি অপসারণ করতে হবে? পৃথিবীর সেই হিংস্র অতীত থেকে তো আমরা সরে এসেছি, তাই নয় কি?’

মাথাটা ওপর নিচ করে বিষাণ, কিন্তু বিনতা বোঝে না তার কথায় সে সায় দিচ্ছে কিনা। কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় বিষাণ, তারপর বিনতার ধূসর গভীর চোখের মণির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আর এক ধরণের খুন হতে পারে, সেটা আবেগজনিত, ক্রাইম অফ প্যাশান।’

বিনতার চোখের তারারন্ধ্র কি বিস্ফারিত হল? দেখা দিল কি সেই চোখে ভীতি কিংবা অনুশোচনা? বিষাণ কল্পনা করে ডামুরির বনে এক ব্যর্থ প্রেমিকার ভাড়াটে আততায়ী একটি আধুনিক ধনুক থেকে ভয়ানক বেগে তীর ছুঁড়ে অদিতার হৃদপিণ্ড ভেদ করছে। হাস্যকর! নিজের কল্পনায় নিজেই হেসে ওঠে বিষাণ।

‘হাসছেন কেন?’ বিনতা প্রশ্ন করে।

‘না এমনিই,’ বিব্রত হয়ে বলে বিষাণ। বিনতা অনেকটা বুঝতে পারে, অথবা বুঝতে চেয়েও এই নিয়ে চিন্তা করতে চায় না। দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হয়, নীরবতা নামে। বিনতা অস্বস্তিকর মৌনতা ভাঙতে কথা খোঁজে, অবশেষে খুঁজে পায়, বিষাণকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি সেনভাকে অদিতা সানের কথা জানাবেন না?’

বিষাণের মাথায় সেনভাকে অদিতার মৃত্যুর সংবাদ জানানোর যে প্রয়োজন সেটা আসে নি, বিষাণের চোখের বিহ্ববলতায় সেটা বোঝে বিনতা।

‘আপনি কি জানেন সেনভা এখন কোথায় আছে?’ বিনতার প্রশ্নের স্বরের মৃদুতায় বোঝা যায় সে বিষাণকে অপ্রস্তুত করতে চাইছে না।

মাথা ওপর-নিচ করে বিষাণ, হ্যাঁ, সে জানে। অদিতা ও বিষাণ দুজনেই বহু চেষ্টা করেছে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, সেনভা তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা প্রত্যাখান করেছে। চল্লিশ বছর কেটে গেছে শেষবার যখন সেনভার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কেম্যান ব্রাক দ্বীপে। অদিতা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে খুব জোর করেছিল, সেনভা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হয়েছিল। সেনভা তার মা বাবার গুণ পেয়েছে, ছোটবেলায় কয়েক বছর সে সংশোধনাগারে থাকলেও বড় হয়ে সে সমুদ্র বিজ্ঞানী হয়েছে। কিউবা দ্বীপের মায়াভরা ত্রিনিদাদ শহর থেকে একটা ছোট জাহাজে ক্যারিব সমুদ্রের গভীর থেকে জেগে ওঠা ছোট কেম্যান ব্রাক দ্বীপে গিয়েছিল অদিতা ও বিষাণ। দু হাজার বছর আগেও এর কাছে আরো দুটি দ্বীপ ছিল - গ্র্যান্ড ক্যামান ও ছোট ক্যামান দ্বীপ, তারা আজ সাগরের নীচে।

সমুদ্রতীরে তরুণ সেনভা তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। মায়ের চোখ, নাক আর ভুরু পেয়েছিল সেভান, আর বাবার চোয়াল আর থুতনি। বাবার মতই অল্প কোঁকড়া চুল, তাতে লালচে আভা। চল্লিশ বছর তখন ছিল তার বয়স। সেনভা তাদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে চায় নি, কিন্তু তারা বাতাসের ট্যাঙ্ক পেছনে বেঁধে সমুদ্রের নিচে ঝাঁপ দিয়েছিল। দ্বীপের অনতিদূরেই জলের নিচে ছিল প্রবাল প্রাচীর, সেই প্রাচীর যেরকম রঙীন, তাতে মাছের বাহারও ছিল রামধনুর বর্ণালীর মতন। সেই প্রাচীরের পরই সমুদ্রের তল হঠাৎ করেই নেমে যায় সাত কিলোমিটার, সেই জায়গাটাকে বলে ক্যামেন ট্রেঞ্চ। উত্তর আমেরিকা মহাদেশ ও ক্যারিব টেকটনিক পাত একে অপরের তুলনায় পাশাপাশি সরে যাবার সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয়েছে সাগরের এই গভীর অংশ। অদিতা, বিষাণ ও সেনভা ডুবুরীর সরঞ্জাম পরে প্রবাল প্রাচীর পার হয়ে সেই অতলস্পর্শী খাদের ধারে ভাসছিল, কি রোমাঞ্চকর জায়গা ছিল সেটা। বিষাণ আজও সেই অতল অন্ধকার স্মরণ করে শিউরে ওঠে। তবু চল্লিশ বছর আগে সেই মুহূর্তে, জলের গভীরে ভাসতে ভাসতে বিষাণ ভেবেছিল ছেলের সঙ্গে তার এক বিশেষ সম্পর্ক রচিত হয়েছে যা দিয়ে সে কিনা ভবিষ্যতের সেতু গড়তে পারবে। না, সেরকম কিছুই হল না, বরং ক্যামান থেকে বিশালগড়ে ফিরলে যতটুকু সম্পর্ক আগে ছিল সেটাও ভেঙে গেল। চাঁদে হারিয়ে যাওয়া প্রথম সেনভার মত দ্বিতীয় সেনভাও তার জীবন থেকে অদৃশ্য হল। অদিতাও পরে ডামুরির বনে চলে গেল।

ক্যামানের সাক্ষাতের প্রায় পনেরো বছর পরে সেনভা একটা বড় অভিযাত্রীদলের সঙ্গে বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা গিয়েছিল ইউরোপার উপরিভাগের বরফের নিচে সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করতে। এই খবরটা সেনভা তাকে দেয় নি, সংবাদ মাধ্যম থেকে তার এই যাত্রার কথা শুনেছিল বিষাণ। সেনভার বৃহস্পতিগামী মহাকাশযানে ওঠা, এক বছর পরে ইউরোপায় অবতরণ, ইউরোপার চিরজমাট বরফকে ড্রিল দিয়ে ভেদ করে তার শীতল সমুদ্রে সাবমেরিন নামানো, সাবমেরিন করে সেই অন্ধকার জলে অভিযান, এর দু বছর পরে পৃথিবীতে ফেরা এ সব কিছুই গণমাধ্যমে এসেছে, পৃথিবীর লোকেরা তাকে চিনেছে, শুধু সে নিজে একটিবারও তার বাবাকে যোগাযোগ করে নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষাণ। বলে, ‘হ্যাঁ, ওকে খবরটা দেয়া দরকার।’

বিনতা বলে, ‘আপনি ওকে ফোন করুন, আমি এর মধ্যে একটু হেঁটে আসি।’ বিনতা চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দাঁড়ায়। বিষাণও দাঁড়ায়, মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে বিনতাকে সাময়িক বিদায় জানায়। বিনতা ক্যাফের বাইরে চলে গেলে বিষাণ কপালের ডানদিকে চাপ দিয়ে সেনভার নাম বলে। এটুকুই যথেষ্ঠ, সেনভা যেখানেই থাকুক, পৃথিবীর যে কোনো জায়গায়, চাঁদে, মঙ্গলগ্রহে কিংবা কোনো গ্রহাণুপুঞ্জের এক্সপেরিমেন্টে, এই যোগাযোগ ব্যবস্থা সেনভাকে ঠিকই বের করবে। কপালের পাশে লাগান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক চিপ সবই জানে কোন সেনভাকে বিষাণ খোঁজ করছে। উত্তর মেরুর ঊর্মিময় সমুদ্রের এক জাহাজে খুঁজে পায় তাকে বিষাণ। এক কালের বরফে ঢাকা আর্কটিক মহাসমুদ্র আজ উন্মুক্ত। উত্তর সাইবেরিয়ার বন্দর থেকে উত্তর কানাডায় সমুদ্রপথে সহজেই যাওয়া যায়। কিন্তু সেই সমুদ্র বেশীরভাগ সময়ই থাকে ঝড়-ঝঞ্ঝায় উত্তাল। সেই উত্তাল সমুদ্রে এক জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সেনভা বলে, ‘হ্যালো।’

পিতা-পুত্রকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে বিনতা ক্যাফের বাইরে বের হয়। হেমন্তের রাত, কিন্তু বাতাস এখনো গরম। পথের ধারের গাছগুলো নিজের আলোয় নানাবিধ রঙে উজ্জ্বল। এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়ার সাথে উদ্ভিদের যোগ, দিনের বেলা সূর্যের থেকে গাছ শক্তি নেয়, রাতের বেলা উচ্ছসিত থাকে সেই গাছ বায়োলুমিনেসেনসের আলোতে, পথচারী চলে গাছের প্রাকৃতিক আলোয়। সেই আলোয় পা ফেলে সাত-পাঁচ ভাবে বিনতা, ‘আবেগজনিত অপরাধ, ক্রাইম অফ প্যাশান,’ বলে বিষাণ তার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। বিষাণ কি বুঝতে চাইছিল তার প্রতিক্রিয়া? তার দৃষ্টি সেকেন্ডখানেক মাত্র স্থায়ী হলেও তার অর্থ বিনতার অলক্ষিত থাকে নি।

‘নিলয়’ থেকে কয়েক শ মিটার হাঁটলেই রাস্তাটা একটা বড় চত্বরে এসে পড়ে। চত্বর থেকে আরো চারটা রাস্তা বেরিয়েছে, মাঝখানে একটা সুন্দর ফোয়ারা। গাড়ি, যানবাহন চত্বরের বাড়িগুলোর পাশে ঘেঁষে যায়, মাঝখানে ধূসর ইঁট বাধানো বড় পথচারীদের হাঁটার আর বসার জায়গা। বাড়িগুলো সরু, দোতলা কি তিনতলা, ওপরে বসবাস, নিচে নানাবিধ দোকান - বই, খাবার, আসবাবপত্র, মনোহারী, সৌখীন প্রসাধনের, টুকটাক দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসের। হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে সব দোকান উঠে গিয়েছিল, মানুষ আন্তর্জাল কম্পুটার মাধ্যমে সব অর্ডার দিত ও বাড়িতে সেগুলো গ্রহণ করত। এই নতুন পৃথিবীতে মানুষ পুরাতন দোকান ফিরিয়ে এনেছে। দিনের বেলা চত্বরে কবুতরের ঝাঁক আনাগোনা করে। ফোয়ারার পাশে বাঁধানো জায়গায় বসে অফিস করা মানুষ বন্ধুদের সাথে মধ্যাহ্নভোজ সারে। এক সময় দোকান যেরকম উঠে গিয়েছিল প্রচলিত অফিসের ধারণাও চলে গিয়েছিল, সবাই তাদের বাড়ি থেকে কাজ করত। এখনও অনেকে করে, তবে পুরনো কাজের জায়গার পরিবেশ অনেক জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ফোয়ারাটা নিয়ে কিছু কিংবদন্তী চালু আছে এই শহরে। একটি তরুণ মেয়েকে নাকি খুব রাতে ঐ ফোয়ারার পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু তার কাছে কেউ যেতে চাইলে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিনতা মনে করে এটা কোনো কৌতুকপ্রিয় তরুণদলের কারসাজি, ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণ ইত্যাদি দিয়ে এরকম বিভ্রম সহজেই সৃষ্টি করা যায়। এখন রাত হয়েছে, দূর থেকে দেখা যায় ফোয়ারার পাশে নিচু বাঁধানো জায়গাটাতে চার-পাঁচজন বসে আছে। তারা গিটার বাজিয়ে গান করছে। ফোয়ারার জল উঠছে নামছে, সাথে সাথে জলের নিচ বসানো বাতিগুলো তাদের রঙ বদলাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে বিমনা হয়ে যায় বিনতা। স্ব-উজ্জ্বল গাছগুলো পেরিয়ে সে তখনো মোড়ে পৌঁছায় নি যখন সে তার পিঠে একটা তীক্ষ্ণ ছুরির মাথা অনুভব করে। চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াবার আগেই শোনা যায় একটি পুরুষ কন্ঠস্বর, ‘ঘুরে দাঁড়াবেন না, আর জরুরী সাহায্যের বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করবেন না, আমরা এই রাস্তার সমস্ত বেতার সংকেতকে জ্যাম করে দিয়েছি, এমন কি ভিডিও ক্যামেরাগুলোও কাজ করছে না। চিৎকার করবেন না। চিৎকার করলে এখনি এই ছোড়া আপনার হৃদপিণ্ডতে প্রবেশ করবে।’ বিনতা ভয়ার্ত চোখে পাশের বাড়ির দোতলাতে লাগানো একটা ক্যামেরা দেখে। সেই কন্ঠটি বলে, ‘ওটা দেখে কোনো লাভ হবে না, আপনাকে এখন কেউ দেখতে পাচ্ছে না।’ বিনতা রাস্তার ওপাড়ে ফোয়ারার পাশে বসা মানুষগুলোর দিকে তাকায়, তারা গান-বাজনায় মশগুল, এদিকে খেয়াল করছে না, আর খেয়াল করলেও তারা বুঝত না এখানে কী হচ্ছে।

জীবনে এরকম ঘটনা তার আগে ঘটে নি। দুদিন আগে রাতে তার ঘরে এক অন্ধকার মেঘ জমা হয়েছিল। সেদিন সে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু মানুষ যে এরকম ভয়ের বস্তু হতে পারে সেটা সে কোনোদিন অনুভব করে নি। তবু এই পৃথিবীতে বিনতার বাস অনেক দিনের, সে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কী চান?’ তার স্বরের স্থিরতা হুমকিদাতাকে কিছুটা সময়ের জন্য বিহ্বল করে দেয়। সেই মৌনতা ভেঙে একটি নারী কন্ঠ বলে, ‘বাঁ পাশের গলিটা দেখছেন। ওদিকে যান।’ ঠিক গলি নয়, দুটো বাড়ির মাঝে দু মানুষ সমান এক চিলতে রাস্তা, সেটা দুটো রাস্তাকে যোগ করেছে।


বিনতার আগে নারীটি গলির দিকে এগিয়ে যায়। তার মুখ দেখে বিনতা বিস্মিত হয়। একটি তরুণ মেয়ে, কত বয়স হবে ত্রিশ? তার পরনে একটা লম্বা কালো পাতলা ওভারকোট, এই গরমে কেউ এরকম পোষাক পড়তে পারে, ভাবে বিনতা। পেছনের পুরুষটি তার একটি হাত বিনতার বাঁ কাঁধে রেখে তাকে গলিটার মধ্যে ঠেলে দেয়, বিনতা মেয়েটিকে অনুসরণ করে। গলিটার মাঝামাঝি যেয়ে যুবতীটি ঘুরে দাঁড়ায়। অন্ধকারে তার মুখটা ভাল করে দেখতে পারে না বিনতা, কিন্তু তার উপস্থিতি বিনতাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়, এই অপহরণ ধর্ষণের প্রচেষ্টা নয়। এই পৃথিবীতে ধর্ষণকে প্রায় বিদায় করে দেওয়া হয়েছে - প্রায়, পুরোপুরি করা যায় নি। যুবতী কোনো ভূমিকা না করে প্রশ্ন করে, ‘আপনারা অদিতার দেহ কোথায় রেখেছেন?’ প্রশ্নটি বিনতাকে বিস্মিত করে। এরা অদিতাকে চেনে? কেমন করে? বিনতা প্রথমে কথা বলে না, ক্লান্ত হয়েছিল সে, তার মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু তারপরই অনুভব করে পেছনে ছোরাটা তার কাপড় ভেদ করছে। সে বলে, ‘ওনার দেহ নিলয়ে আছে।’

‘সে আমরা জানি,’ পেছনের যুবকটির কন্ঠে বিরক্তি, ‘আমরা জানতে চাই নিলয়ের কোথায়?’

‘দোতলায়,’ উত্তর দেয় বিনতা, ‘প্রধান প্রবেশ পথের ওপরেই মাঝখানের ঘরটি হল মন্ত্রণাকক্ষ, তার পেছনেই কোথাও অপরেশন ঘরটির থাকার সম্ভাবনা।’ এই খবরটুকু দিতে বিনতা দ্বিধা করে না, কারণ এটা জেনে ওদের কোনো লাভ হবে না। নিলয়ে ঢোকার সহজ কোনো পথ নেই।

‘অদিতার নিরাময়-নম্বর বলুন,’ যুবতী বলে। প্রতিটি মানুষের একটি নিরাময়-নম্বর বা ফাইল থাকে যেখানে তার শরীর ও মনের বিভিন্ন দশার মান উল্লিখিত থাকে। সেই নম্বরের অধিকারী ছাড়া আর দু-একজন সেটা জানতে পারে, ব্যক্তিগত চিকিৎসক তাদের মধ্যে একজন। ‘না, আমি সেটা বলতে পারব না,’ দৃঢ় গলায় বলে বিনতা। ছোরার ফলাটা পেছনের কাপড় ছিঁড়ে বিনতার ত্বক স্পর্শ করে। ঠাণ্ডা ধাতবের ধারালো ছোঁয়ায় গা শিরশির করে ওঠে বিনতার। তবু চুপ থাকে বিনতা, ছোরাটা ত্বক ভেদ করে, দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করে সে। ‘আপনি না বললে ডামুরি গবেষণাগারের অধ্যক্ষ বলবেন, তাঁর প্রতি আপনার মত আমরা সদয় হব না,’ বলে সেই নারী।

‘আপনারা কি তাঁকে অপহরণ করেছেন?’ প্রশ্ন করে বিনতা, তার স্বর আর্তনাদের মত শোনায়। ওরা দুজনেই চুপ থাকে। অবশেষে বিনতা বলে, ‘২৩১ম৬৮৯। কিন্তু এটা জেনে আপনাদের লাভ কী?’ ছোরাটা তার ত্বক থেকে বেরিয়ে আসে। ‘পাসওয়ার্ড বলুন,’ যুবতীর গলা অধৈর্য। চুপ করে থাকে বিনতা। আবার ছোরার স্পর্শ পায়, ফুঁপিয়ে ওঠে ব্যথায়। ‘আপনার একটি ছেলে আপনার সাথে থাকে, তাই না? কি যেন ওর নাম, নীল?’ আবার দাঁতে দাঁত চাপতে হয় বিনতার, পিঠের রক্তে জামা ভিজছে বোঝে, কিন্তু নীলের কথা ওদের মুখে শুনে সেই উষ্ণ রক্ত যেন শীতল হয়ে গেল। তার হৃদপিণ্ডও যেন একবার থেমে গিয়ে আবার দ্রুত চলতে শুরু করল। ‘আমাদের হাত অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, ডকটর বিনতা,’ যুবতীর গলা যেন বরফের শৈত্যে ঢাকা, ‘নীলের তো অনেক বয়স হল, খুব সাধাসিধে মানুষ, পৃথিবী কি করে চলে বোঝে না।’ সত্যি নীল এমনই একটি মানুষ যদিও তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হল। ‘আপনার কি মনে হয় ওর আপনার মত সহ্যশক্তি আছে?‘ নিরুত্তাপ ভাবে বলে যুবতী। না, নেই, নীলের মুখটা বিনতা ভাবে, সে চিন্তা করতে পারে না কেউ তাকে নির্যাতন করছে। ‘সমুদ্র,’ ফিসফিস করে বলে সে। ‘সমুদ্র? পাসওয়ার্ড হল সমুদ্র?’ পাসওয়ার্ড যে সমুদ্র হতে পারে সেটা যেন সেই নারী মানতে চাইছে না। ‘হ্যাঁ, সমুদ্র,’ দাঁত চেপে কথাগুলো বলে বিনতা, তার কোনরকম দুর্বলতা সে এই বাচ্চাদের দেখাতে চায় না। ডামুরির অধ্যক্ষ, তার ছেলে নীলকে টর্চার করবার হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে এরা পাসওয়ার্ড আদায় করল, কিন্তু অদিতার ফাইল নিয়ে তারা কী করতে পারে, তারা কিছুই করতে পারবে না, ভাবে সে।

ছোরাটা পিঠ থেকে সরে যায়। বিনতা জানে তার রক্তের মাঝে ভাসমান ন্যানোরোবটেরা ইতিমধ্যে ক্ষত সারানোর কাজে লেগে গিয়েছে। সেই রোবটারাই তার ব্যথাটা কমিয়ে দেয়। এর মধ্যে যুবতী তার বাঁ কব্জির চামড়ায় লাগানো কম্পুটার স্ক্রীন চালু করে। অদিতার নিরাময়-নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে তার ফাইলে ঢোকা যায় কিনা সেটা সেই নারী পরীক্ষা করে নেয়। বিনতা বলে, ‘আপনারা কেন অদিতা সানের ফাইল চাইছেন? তার নিরাময়ের ইতিহাস দেখে আপনাদের কী লাভ?’ কথাটা বলেই বিনতার একটা জিনিস মনে হয়। প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোকম্পাঙ্ক ঐ ফাইলে লেখা আছে, সেই কম্পাঙ্কের তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ দিয়ে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনুনাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাহত করা সম্ভব।

দুজনের কেউই বিনতার প্রশ্নের জবাব দেয় না। যুবতী বলে, ‘আমাদের নিয়ে আপনার নিলয়ে ঢুকতে হবে।’

‘সে তো অসম্ভব একটা ব্যাপার,’ বলে বিনতা, ‘আমার নিজেরই নিলয়ে ঢোকার অনুমতি নেই। আজকে ঢুকতে দিয়েছে কারণ আমি অদিতা সানের চিকিৎসক। কিন্তু আপনারা কেন নিলয়ে ঢুকতে চান?’ কয়েক সেকেন্ড মৌন থেকে যুবতীটি বলে, ‘আমরা মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের বিরোধী। আমরা চাই না পৃথিবীর মানুষ মৃত্যুর পরে আবার ফিরে আসুক, কারণ এই প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ। মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে পুনরুজ্জীবিত মানুষ কখনই আদি মানুষটির মত হয় না। এই ব্যবস্থা মানব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, এই কাজের অবসান হওয়া প্রয়োজন।’

যুবতীর কন্ঠের প্রত্যয় বিনতার হৃদয়কে হিম করে দেয়। হ্যাঁ, এদের সম্বন্ধে শুনেছে সে, সংবাদ মাধ্যমে অনেক সময় এই দলটির কথা পরোক্ষভাবে উচ্চারিত হয় যদিও তাদের অস্তিত্বের ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলা হয় না। এরা এই কষ্টকৃত সমাজকে ধ্বংস করে দেবে। আতঙ্ক বিনতাকে গ্রাস করে, সে কোনোরকমে বলে, ‘আপনারা আপনাদের বক্তব্য ভোটে দিতে পারেন। এই বিষয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের মতামত নিতে পারেন। সেটাই কি উচিত হবে না?’

হা হা করে হেসে ওঠে পেছনের যুবকটি, সে বলে, ‘পৃথিবীর মানুষ দুর্বল, তারা অমরত্ব চায়, ভোটাভুটিতে তারা শুধু নিজেদের কাপুরুষতারই পরিচয় দেবে। আসলে সব মস্তিষ্ককে ধ্বংস করে দেওয়া প্রয়োজন। আমরা আবার পুরনো পৃথিবীকে ফিরিয়ে নিয়ে আনতে চাই।’

এই কথাগুলো শুনতে শুনতে বিনতা বুঝতে পারে ধীরে ধীরে ছোরাটা আবার তার ত্বক ভেদ করছে। সে শুনতে পায় যুবতীর কন্ঠ, মনে হয় তার কথা বহু দূর থেকে ভেসে আসে ‘আমরা খুবই দুঃখিত, এই সাক্ষাতের কোনো চিহ্নই রাখা যাবে না।’ ক্লান্ত ছিল বিনতা, আসন্ন মৃত্যুর ছায়াকে সে মনে করল যেন নিতান্তই স্বপ্ন। মনে হল সময় পার হয়ে সেই যুবতীর কথা একটি একটি করে আলাদা উচ্চারিত সিলেবলে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে, ‘তবে আমাদের আবার দেখা হবে, ডকটর বিনতা, যদিও আপনি আমাদের তখন চিনতে পারবেন না।’

বুকের কোথায় পাঁজর আছে জানত সেই দক্ষ আততায়ী, স্ক্যাপুলার হাড়কে পাশ কাটিয়ে পাঁজরের ফাঁক দিয়ে ছোরা খুঁজে নেয় হৃদপিণ্ড। অনায়াসে, হাতের অল্প চাপেই তার তীক্ষ্ণ ফলা প্রবেশ করে বাম নিলয়ে। এরকম সরাসরি আক্রমণ থেকে হৃদপিণ্ডকে রক্ষা করতে শরীরের ন্যানোরোবটরা অসহায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে বিনতা আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে হৃদয়ের গভীরে সেই ছোরার স্পর্শ ছিল কেমন বেদনাহীন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন