গল্পপাঠ ওয়েবজিন ।। দশম বর্ষ ২০২৩।। সংখ্যা ৮৭

 

সম্পাদকীয়
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা
--দীপেন ভট্টাচার্য

১৮৪৯ সনে ফরাসী সাহিত্য সমালোচক জ্যাঁ বাপতিস্ত আলফন্স কার লিখেছিলেন, ‘জিনিস যত বদলায়, ততই সে একই থাকে।’ ওপর থেকে দেখে অনেক কিছুই মনে হতে পারে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ বদলায় না। বর্তমানের রুশ-ইউক্রেন কিংবা ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং তাতে মানবিক বিপর্যয়ের পরিমাণ মানুষ হিসেবে আমাদের প্রজাতির জন্য লজ্জাজনক। আমরা সৌরজগতের সুদূরতম প্রান্তে স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান পাঠাতে পারি, কিন্তু এই পৃথিবীর মানুষের দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারি না। আমরা পৃথিবীর সমাজের মধ্য দিয়ে একটা সুতোর রেখা টেনে সবকিছু একটা কার্যকারণে আবদ্ধ করতে চাই। একশ বছর আগে যে সমাজ এখানে ছিল, তাকে আমরা ‘আমাদের সমাজ’ বলে অভিহিত করি। সেই সমাজের সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক? সেই সমাজের একটি লোকও তো এখন বেঁচে নেই। আজকের দুটি সমাজ যদি যুদ্ধ করে, একশ বছর পরও কি বাধ্যবাধকতায় তাদের যুদ্ধ করতে হবে? সেই যোদ্ধারা তো এখনো জন্মায়নি! আমরা সমাজকে ভাবি একটা গাছ, যে তার আকৃতি ঠিক রেখে শুধু তার কোষ বদলাবে। কোষ বদলালে যে আকৃতি বদলে যেতে পারে, তা আমরা স্বীকার করি না। তাই আমাদের মানসিকতা বদলায় না, ওপরে অনেক কিছু বদলাতে পারে – আন্তর্জাল, সামাজিক মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, ব্যবহার্য জিনিসের সহজলভ্যতা – কিন্তু হৃদয় বদলাচ্ছে না, সেটি বরং কঠোর হচ্ছে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করছে। মনে হচ্ছে আন্তর্জাল যত আমাদের তথ্য দিচ্ছে তত আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি। এক বন্ধু লিখেছে যে, এই সময়ে উন্মাদনা থেকে বাঁচতে সে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে – ‘বিশ্ব হতে থাকি দূরে অন্তরের অন্তঃপুরে, চেতনা জড়ায়ে রহে ভাবনার স্বপ্নজালে।’

এই প্রেক্ষাপটে এবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারটির অর্থ ভাবা যেতে পারে। পুরস্কার পেয়েছেন নরওয়ের ইয়ুন ওলাভ ফসে। নোবেল কমিটি বলেছেন তিনি অনুচ্চারিতকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। ফসে লিখেছেন উপন্যাস, কবিতা, নাটক, আর এই নাটকের জন্য তিনি ইউরোপ বিখ্যাত, তাঁকে ইবসেন ও স্যামুয়েল বেকেটের সাথে তুলনা করা হয়। আমরা ফসের সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নই, কিন্তু সেই অপরিচিতি মুহূর্তে ভেঙে যাবে ফসের দু একটা বাক্য পড়লেই। সেখানে প্লটের ঘনঘটা নেই, ধৌর্তিক কৌশল নেই, দ্রুত ত্বরণ অনুপস্থিত, বরং রয়েছে এক ধরণের অবচেতন মনের ফল্গুধারা যা কিনা পাঠককে সম্মোহিত করে। ফসের লেখা একক অস্তিত্বের সংকট, সেখানে কথা বা শব্দ যেন জীবনের ভার বইতে পারে না। দু বন্ধু গেছে নৌকা নিয়ে সমুদ্রে, কিন্তু তাদের কথোপকথন কষ্টকর – একজন বলছে, ‘আমি আদৌ কথা বলতে পারি না, এটা একটা কষ্টকর প্রচেষ্টা – একটা শব্দকে বের করে আনার, আর তারপরে যখন শব্দটা বেরিয়ে যায়, যখন শব্দটা বলা হয়ে গেছে, সেটা এত ভারি মনে হয় যে সেটা আমাকেও নিচে টানিয়ে নামে, সেটা আমাকে ডোবাতে থাকে ডোবাতে থাকে।’ তখন আর একজন বলছে, ‘ব্যাপারটা কি এরকম তাহলে – শব্দগুলো ভারি হয়ে যায়?’

দুজন এক নৌকায় থেকেও তারা একে অপরকে বুঝতে পারছে না, যে কথাগুলো তারা বলছে তা তাদের অস্তিত্বের নিগূঢ়তাকে বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে পাঠক বা দর্শক হিসেবে আমরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। ভাবছি এখানে নতুন কী আছে? কিন্তু মানুষের জীবন কি এরকমই নয়? দূর থেকে বা কাছে থেকে যে দ্বন্দ্ব যে সংঘাত যে রক্তক্ষয় দেখি তা সেই নৌকার মাত্র দুটি মানুষের যোগাযোগের অপারগতার মতোই নয় কি? সাহিত্যর একটি কাজ হলো পাঠকের মনে আত্মজিজ্ঞাসার, আত্মসমীক্ষার, আত্মপরিচয়ের গভীর চিন্তার ইন্ধন দেয়া। এই আত্মপরিচয় সামাজিক পরিচয় নয়, বরং চেতন-অবচেতনের সংযোগস্থলে নিজের চরিত্রটিকে চিনে নেয়া। সেটি হলে ব্যক্তিমানুষ সামাজিক গরিষ্ঠ মতামত, নিয়মনীতির বাইরে এসে পৃথিবীতে নিজের ক্ষণিক অবস্থানের অর্থ করে নিতে পারবে। রূপনারান নামে কোনো এক রূপক নদীর কূলে রবীন্দ্রনাথ জেগে উঠেছিলেন, আত্মসমীক্ষায় লিখেছিলেন – ‘রক্তের অক্ষরে দেখিলাম আপনার রূপ, চিনিলাম আপনারে আঘাতে আঘাতে বেদনায় বেদনায়।’ মহৎ সাহিত্যের সংজ্ঞা কী হতে পারে আমাদের জানা নেই, মহৎ সাহিত্য পৃথিবীর মানুষদের একটি সংঘাতবিহীন কাতারে নিয়ে আসতে পারবে কিনা তাও বলতে পারবো না, কিন্তু আমরা জানি মহৎ সাহিত্য আমাদের ব্যক্তি-অস্তিত্বের অন্তর্বৃত কষ্টিপাথরকে উন্মোচন করতে পারে। সেই উন্মোচন আমাদেরকে প্রতিপক্ষের একজনকে একজন ব্যক্তি, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে বিচার করার সম্ভাবনা দেবে। এই উন্মত্ত ‘মহানভ-অঙ্গনে’ এটুকুই হোক আমাদের ‘পাখা’।
প্রচ্ছদের ছবি : তণুশ্রী বিশ্বাস
চিরায়ত গল্প
মিলান কুন্ডেরা এক বিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধাংশের পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় একজন লেখক। তিনি প্রধানত চেক ভাষায় লেখেন। তবে তার কিছু বই ফরাসিতেও লেখা।

তার জন্ম ১ এপ্রিল ১৯২৯ চেকস্লাভাকিয়ার ব্রানোতে। তার রচনা প্রায় চল্লিশের অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অস্তিত্তের অসহনীয় লঘুতা, অমরত্ব, জীবন অন্য কোথাও, মস্করা, বিদায়ী ভোজসভা, হাসি ও বিস্মরণের বই প্রভৃতি পৃথিবী বিখ্যাত উপন্যাসের লেখক তিনি। 
মিলান কুন্ডেরা চলে গেলেন জুলাই মাসের ১১ তারিখ। 
অনুবাদ : এমদাদ রহমান
এলহাম হোসেন

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক উৎপল দাশগুপ্ত


লেখক পরিচিতি: বেন ওকরি নাইজেরিয়ার মিন্না শহরে জন্মগ্রহণ করেন।কবিতা দিয়ে তাঁর সাহিত্য জগতে প্রকাশ ঘটলেও ক্রমে একাধারে একজন সফল ঔপন্যসিক, গল্পকার, নাট্যকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাসটির নাম The Famished Road । এই উপন্যাসের জন্য তাঁকে ১৯৯১ সনে ম্যান বুকার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
অনুবাদ : প্রবাল দাশগুপ্ত


ফারুক মঈনউদ্দীনের সাক্ষাৎকার :

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : মোস্তফা অভি
আলমগীর-- পর্ব- ৩
মার্গারেট মিচেলে ধারাবাহিক উপন্যাস: 
বই নিয়ে আলোচনা
ইন্দ্রাণী দত্তের উপন্যাস--

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. অসাধারণ লেখক তালিকা।

    উত্তরমুছুন
  2. আবার আরো একখানি অসাধারণ সম্পাদকীয় পড়লাম। সত্যিই তো,
    ‘আমরা সৌরজগতের সুদূরতম প্রান্তে স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান পাঠাতে পারি, কিন্তু এই পৃথিবীর মানুষের দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারি না।’

    শতবর্ষ আগের সমাজকে এখনো আমরা সমাজ বলে তাকে হিসেব করে কথা বলি, এখনো অপারগ হই সত্যি করে মঙ্গলের কথাটি বলতে। হয়তো দেশ সীমানায় টেনে দিই সমাজের ভাবনা, বড্ড কঠিন করে বেঁধে রাখি চিন্তা মুক্তির নৌকো। কতকিছু বদলে বিশাল হয়ে যায় তবু হৃদয় মুক্ত হয় না। দুজন মানুষের দূরত্ব থেকেই যায়।

    সহনে গ্রহনে চর্চায় মহৎ সাহিত্য এই ক্ষনজন্মা মানুষের পারস্পরিক দূরত্ব দূর করুক। ভালেবাসার জয় হোক, জয় হোক সাহিত্যের।

    উত্তরমুছুন