সময়ের সাগরে আমরা নিমজ্জিত, কিন্তু জলের মতো তা আমাদের গায়ে লাগে না, কোনো ধরণের বাধা ছাড়াই প্রবাহিত হতে থাকে যতক্ষণ না সেকেন্ড ঘণ্টা পার হয়ে বছর কেটে যায়। সময়কে কখনই ধরে রাখা যায় না, এমনকী জগতের সবকিছু স্তব্ধ হলেও বস্তুর একটা কম্পন থেকে যায়, সেই কম্পন সময়কে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বিখ্যাত পদার্থবিদ আর্চিবাল্ড হুইলার বলেছিলেন, সময় হলো সবকিছু একসাথে যাতে সংঘটিত না হয় সেজন্য প্রকৃতির একটি উপায়। করোনার প্রকোপের মধ্যে আমাদের দুটি বছর চলে গেল, আমরা বুঝতে পারছিলাম এই সময়টা চলে যাচ্ছে, কিন্তু তাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। মহাকালের কাছে আমরা সমর্পিত, সেই কাল নৈর্ব্যক্তিক, অমোঘ। তার মধ্যে নিকটজনের অসুস্থতা, বন্ধুর মৃত্যু সবকিছুকে অর্থহীন করে তুলতে পারে। দু বছর আগে কে ভেবেছিল ২০২২ সনের জানুয়ারিতেও আমাদের স্বেচ্ছা-নির্বাসনে যেতে হবে, ইচ্ছামত ভ্রমণ চলবে না। এই দুটি বছর পৃথিবীকে আমাদের নতুন চোখে দেখতে হলো। এই সময়টি মহাযুদ্ধের মতনই, গল্পপাঠের পাঠকদের কাছে অনুরোধ সময়টিকে আপনার দিনপঞ্জীতে ধরে রাখার চেষ্টা করুন, পৃথিবীর ইতিহাসের এটি একটি সন্ধিক্ষণ, সেটির যেমন একটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আছে তেমনই আছে ব্যক্তিগত মূল্যায়ণ। মনোবৈকল্য এড়াতে, জীবনকে অর্থ দিতে, নিয়মিত লেখা একটি উপায় হতে পারে।
গল্পপাঠের এটি হলো অশীতিতম সংখ্যা। এতে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাই। পাঠক ও লেখকের সম্মিলিত উৎসাহে গল্পপাঠ বহু বছর ধরে তার ক্রমান্বয়তা বজায় রাখতে পেরেছে। শুধু এর বর্তমান ও অতীতের সংখ্যাগুলিই নয়, গল্পপাঠের আর্কাইভ পাঠক ও লেখক সবারই চাহিদা মেটাবে এই আমাদের আশা। ২০২২ - নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানবেন।
অনুবাদ – বাদানুবাদ
এ সংখ্যায় সুচরিত চৌধুরীর একটি গল্প আছে স্বাতীর চিঠি নামে। গল্পটির ভাষা আমাদের এক টানে নিয়ে যাবে স্বাতীদির ভালবাসামাখা এক রহস্যময় যবনিকায়। ছোট থেকে ছোটতর গল্পটির ঘোর কাটবে না, আমরা বলব এ ভাবেও লেখা যায়, আমরা সবাই খুঁজব আমাদের স্বাতী সেনকে। এই গল্পটিকে কি অনুবাদ করা যাবে? কীভাবে অনুবাদ করা যাবে ‘কালো কালির কচঙ্গনে স্বাতী সেনের রূপের সাজন’ কিংবা ‘মনের দেয়ালীতে স্বাতী সেনের বিশিখা প্রদীপ’? অনেকেই যথার্থ অনুবাদ হয়নি তাই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের আঙ্গিনায় পৌঁছানো যায়নি বলে আক্ষেপ করেন। গল্পপাঠের এই সংখ্যায় দেবর্ষি সারগীর গল্প বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিপ্লব বিশ্বাস বলছেন, ‘অথচ বাংলা সাহিত্যের অজস্র নোবেল - সম্ভাবনাময় সম্পদকে অনুবাদের মাধ্যমে পশ্চিমে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হইনি।’ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহেই নেই গত এক শ বছরের বাংলা ছোট গল্প, উপন্যাস ও কবিতা বিশ্বমানের। কিন্তু সমস্যাটা শুধু অনুবাদের নয়, সমস্যাটা হল একটি সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বের মানুষের আগ্রহ জন্মানো। ইংরেজি বা জার্মান থেকে বাংলায় ভালো অনুবাদের জন্য আমরা যেমন একজন ইংরেজ বা জার্মানভাষীর ওপর নির্ভর করতে পারি না, তেমনই বাংলা থেকে ইংরেজি বা জার্মান ভাষায় অনুবাদের জন্য আমরা মূলত বাংলাভাষীর ওপর নির্ভর করতে পারি না। এজন্য প্রয়োজন বিদেশী মানুষের বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ জন্মানো। শুধুমাত্র অনুবাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেয়া যাবে না। যতক্ষণ না বিশ্বের মানুষ এই অঞ্চলের প্রতি আগ্রহশীল হবে ততক্ষণ সেই অনুবাদের কোনো পাঠক হবে না। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের মানুষের বাংলার প্রতি যে আগ্রহ জন্ম দিয়েছিলেন আজ তা প্রায় স্তিমিত।
এখানে আমি একটি বিতর্কিত প্রসঙ্গের অবতারণা করি। বিদেশী ভাষাভাষীদের মূল বাংলা থেকে অনুবাদের আর একটি বড় বাধা হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার। নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক ভাষা আমাদের গদ্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু একজন অবাংলাভাষী যে প্রমিত বাংলা শিখেছে – তার জন্য – এই সংখ্যার রুমা মোদকের ‘পিতৃসত্য’ গল্পের সামান্য আঞ্চলিকতাও (‘এভাবে ধাক্কাটা দিলা যেন ঘরের ছাদ ভাইঙ্গা মাথায় পড়তেছে, কথাটা বলতেই মুখ ঝামটায় শামীমা, যা না একখান ঘর, মাথায় পড়লে মাথাও শরম পাইবো।’) একটা বিরাট বাধা মনে হবে। একটি প্রমিত ভাষাকাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার শুধুমাত্র যে বিদেশীদের জন্য বাংলাকে অনতিক্রম্য করে দেয় তা নয়, এমনকী নব্য ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষিত প্রজন্মকে গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।
গল্পপাঠের এই সংখ্যায়ও বেশ কয়েকটি অনুবাদ যাচ্ছে, মিশরিয় সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজের কয়েকটি গল্প এর মধ্যে রয়েছে। বাংলা ভাষাতে অনুবাদ নিয়ে এখন দেশে-বিদেশে যথেষ্ট উৎসাহ দেখা দিচ্ছে, কিন্তু বিষয় হিসেবে অনুবাদ তত্ত্ব বাংলায় এখনো সেরকমভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। সেই কবে ফরাসি Étienne Dolet, ১৫৪০ খ্রীষ্টাব্দে, বলে গিয়েছিলেন অনুবাদককে যে ভাষায় অনূদিত হচ্ছে (লক্ষ্য) এবং যে ভাষা থেকে হচ্ছে (উৎস) এই দুটোতেই সমানভাবে দক্ষ হতে হবে। কিন্তু এর সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন আর একটি শর্ত – যে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে তাতেও অনুবাদককে হতে হবে বিজ্ঞ। এই ব্যাপারে Dolet হয়তো আরো কিছু লিখে যেতে পারতেন কিন্তু ১৫৪৬ খ্রীষ্টাব্দে, তাঁর ৩৭তম জন্মদিনে, ধর্মনিন্দার অপরাধে তাঁর লিখিত বইসহ তাঁকে পুড়িয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। এই দণ্ডের হোতা ছিল প্যারিসের বিখ্যাত সোরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম অনুষদ, বিচারালয় ও তথাকথিত ধর্মদ্রোহিতা বন্ধ করার কুখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ইনকুইজিশন’।
এরপরে, গত ৫০০ বছর ধরে অনুবাদ তত্ত্ব যেভাবেই অগ্রসর হোক না কেন, Dolet-এর তিনটি শর্ত থেকে সে খুব একটা দূরে যেতে পারে নি। আমরা মোটা ভাষায় অনেক সময় বলি অনুবাদ হয় আক্ষরিক হয়, নয় হয় ভাবানুবাদ। বোঝাই যাচ্ছে এরকম মোটা দাগের বিভাগের নিচে অনেক সূক্ষ্ম বোধ ও বিচার কাজ করে। যেমন আমরা বলি অনুবাদকে বিশ্বস্ত হতে হবে, অর্থাৎ উৎসের কোনো অর্থ বদলানো যাবে না, সেখানে কোনো অপসারণ বা বাড়তি সংযোজন করা যাবে না। লেখকের মূল স্টাইলকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, তবে সেটা করতে গিয়ে যদি ভাষাটি জবরজং হয়ে যায় তবে এমন বুদ্ধিমত্তার সাথে সেটিকে বদলাতে হবে যাতে স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট না হয়। সর্বোপরি লেখাটিকে পড়ে যেন মনে না হয় এটি কোনো রোবট অনুবাদ করেছে।
আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ছোটবেলায় বাংলায় রুশ থেকে অনুবাদ পড়ে বড় হয়েছি। সেই সময়ে যাঁরা অনুবাদ করতেন তাঁদের হাত এমনই দক্ষ ছিল যে, কখনো মনে হয়নি যে ভাষা কোথাও আটকে যাচ্ছে। এখানে ছোট করে একটা উদাহরণ দিলে মন্দ হয় না। আন্তন চেখভের একটি গল্প – এর ইংরেজি নাম হলো The Lady with the Dog, রুশ নাম হলো Дама с собачкой (দামা স সাবাচকই)। গল্পটির নাম ইংরেজিতে আক্ষরিক অনুবাদ করা গেলেও বাংলায় সেটি করা গেল না, বাংলায় নামটি হলো ‘কুকুরসঙ্গী মহিলা’। ইংরেজিতে প্রথম বাক্যটি হল People were telling one another that a newcomer had been seen on the promenade — a lady with a dog। এটি মূল রুশকে (Говорили, что на набережной появилось новое лицо: дама с собачкой) মোটামুটি যথার্থভাবে অনুসরণ করেছে যদিও রুশে ‘were telling’-এর (Говорили, গাভারিলি) কর্তা অনুপস্থিত। এই বাক্যটিকে বাংলায় তিনভাগ করে ফেলা হলো – ‘কথাটা সবাই বলাবলি করছিল। সমুদ্রের তীরে একজন নবাগতাকে দেখা গেছে। কুকুরসমেত একজন মহিলা।’ অনুবাদক লিখতে পারতেন - ‘কথাটা সবাই বলাবলি করছিল যে, সমুদ্রের তীরে একজন নবাগতাকে দেখা গেছে – কুকুরসমেত একজন মহিলা।’ কিন্তু ‘যে’ কথাটি পাঠকের স্বতঃস্ফূর্ত পঠনকে বাধাগ্রস্ত করত সেটা অনুবাদক বুঝেছিলেন। আমি বলব তিনটি বাক্যে ভাগ করা সত্ত্বেও অনুবাদক একদিকে অর্থগত, অন্যদিকে লেখকের স্টাইলের প্রতিও বিশ্বস্ত থেকেছেন। তবে জটিল বাক্য অনেক লেখকের ট্রেডমার্ক, সেই বোধটিও অনেক সময় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া লেখকের দায়িত্ব।
গল্পটির শিরোনাম, আক্ষরিকভাবে ভাবলে, ‘কুকুরসমেত একজন মহিলা’ বা ‘কুকুরসহ একজন মহিলা’ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখানে অনুবাদকের নান্দনিকবোধ ‘সমেত’ বা ‘সহ’ কথাটির বদলে ‘সঙ্গী’ শব্দটি পছন্দ করেছে। এখানে বাংলা ভাষার ব্যবহারকারিদের সংস্কৃতি একটা বড় ভূমিকা পালন করছে। রুশ বা ইংরেজীতে ‘কুকুরসহ’ বলতে বাধা নেই, কিন্তু কুকুরকে শুধু পোষা প্রাণী হিসেবে নয়, সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করা বঙ্গদেশে গৃহীত ছিল না (এখনো হয়তো নেই), তাই অনুবাদক গল্পটির নাম ‘কুকুরসঙ্গী মহিলা’ দিয়ে মূল রুশের ধনাত্মক ভাবটি বজায় রেখেছেন।
অনুবাদ নিয়ে আরো অনেক কথা বলার আশা রাখি পরে। আপাতত পাঠকের আর সময় না নিয়ে বলি গল্পপাঠ বেশ কয়েকটি অনুবাদ প্রজেক্টে হাত দিয়েছে, আশা করা যাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের অজানা গল্পকে এই উদ্যোগ বাংলাভাষায় নিয়ে আসতে পারবে।
- দীপেন ভট্টাচার্য
কয়েকটি আয়োজন--
হাসান আজিজুল হকের একটি উপন্যাস ও গল্পের পাঠপ্রতিক্রিয়া--নাহার তৃণা
আরব বিশ্বের সাহিত্য বলতে আরবী ভাষায় রচিত উপন্যাস, ছোটগল্প এবং কবিতাকে বোঝায়। যদিও আরবী সাহিত্য মূলত পঞ্চম শতাব্দীতে শুরু হয়েছিল, কিন্তু ইসলামের স্বর্ণযুগে, অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত, ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। উত্তরণের সেই ধারা আধুনিক কালের আরব বিশ্বের অধিবাসী এবং অভিবাসী ও নির্বাসিত কথাসাহিত্যিক এবং কবিদের মধ্যে চলমান রয়েছে। যদিও বিশ্ব নন্দিত সাহিত্য পুরস্কারের, যেমন নোবেল এবং ম্যান বুকার, তালিকায় হাতে গোণা কয়েকজন সাহিত্যিক রয়েছেন, তবে অনেকেই স্বদেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে সুনাম কুড়িয়েছেন।
বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে স্বদেশী পাঠকের কাছে আরবী সাহিত্যকে পরিচয় করার জন্য বিভিন্ন সাহিত্য সংকলন, ম্যাগাজিন, জার্ণাল এবং ওয়েবম্যাগের ভূমিকা অপরিসীম। অন্যদিকে বিভিন্ন পুরস্কারের, যেমন ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর আরব ফিকশন’ (যা আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গণে ‘অ্যারাবিক বুকার প্রাইজ’ হিসাবে অত্যন্ত পরিচিত) এবং ‘দ্য আরব লিটারেচার প্রাইজ’, ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এ কথা সত্যি যে, প্রাচাত্য ও প্রাচ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরব সাহিত্য আধুনিকতার পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আরবী সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরছে।
সমকালীন আরবী সাহিত্যের বিশেষত্ব হল অত্যন্ত উচ্চস্তরের বিদ্রূপ সাহিত্য, অস্তিত্ববাদ এবং আত্মপরিচয়ের আলোচনা। অনেক আরব দেশের, যেমন ফিলিস্তিনি, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাক, সাহিত্য একটি সমগ্র নির্বাসিত জাতির গল্প, যেখানে শরণার্থী, জোর পূর্বক স্থানচ্যুতি, উৎখাত, বিভাজন, রাষ্ট্রহীনতা, ক্ষতি, মানসিক যন্ত্রণা, ট্র্যাজেডি, ধ্বংসাবশেষ এবং নীরবতার মতো বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে। অন্যান্য আরব দেশে এমন পরিস্থিতি বা পরিবেশ দেখা যায় না। তাই বলা যায়, আরব বিশ্বের ছোটগল্পের, এমনকি উপন্যাস ও কবিতার মধ্যেও, রয়েছে বৈচিত্র্য।--ফজল হাসান
অনুবাদক : এলহাম হোসেন






0 মন্তব্যসমূহ